মন ও মননের সফর : তহা আবদুর রহমানের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন (১ম পর্ব)

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন : আবদুর রহমান নাসের

সাজ্জাদ ইউনুস

[তহা আবদুর রহমান বর্তমান বিশ্বের একজন স্বীকৃত মুসলিম দার্শনিক। মরক্কোর এই নন্দিত ব্যক্তিত্ব শৈশবের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেই এক গভীর বৌদ্ধিক লক্ষ্য সামনে রেখে পাড়ি জমান ফ্রান্সে। পাশ্চাত্যের জ্ঞানতাত্ত্বিক পরিবেশে দীর্ঘ অধ্যয়ন সত্ত্বেও তিনি কখনো বিলাসী জীবন বা বুদ্ধিবৃত্তিক প্রভাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেননি; বরং সুস্পষ্ট এক উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। তাঁর সেই লক্ষ্য ছিল—ইসলামি ঐতিহ্য, বিশেষত আরবি ভাষা ও সভ্যতার অন্তঃস্থ নৈতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক শক্তি থেকে উৎসারিত একটি স্বতন্ত্র দর্শন নির্মাণ, যা মুসলিম মানসিকতার পুনর্জাগরণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে তিনি শুরু করেন এক বিস্তৃত চিন্তা-প্রকল্প, যেখানে নৈতিকতা তাঁর দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ—تجديد المنهج في تقويم التراث، روح الدين، سؤال الأخلاق—ইত্যাদিতে তিনি দেখিয়েছেন, ইসলামি চিন্তা কেবল ঐতিহ্যগত নয়; বরং আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সক্ষম এক জীবন্ত বৌদ্ধিক শক্তি। ফ্রান্স থেকে ফিরে তিনি রিবাতে শিক্ষকতার পাশাপাশি অধ্যবসায়ের সাথে এই প্রকল্প বাস্তবায়নে অবিরাম কাজ করে গেছেন এবং বৈশ্বিক বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এক স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তুলেছেন। ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর প্রকাশিত তাঁর একটি সাক্ষাৎকার আরব বিশ্ব ও জ্ঞানী মহলে নতুন করে আলোড়ন তোলে। আশ-শারক্ব-এ প্রচারিত এই আলোচনায়, যা গ্রহণ করেন আবদুর রহমান নাসের, উঠে আসে তাঁর শৈশবের শিক্ষণীয় ঘটনা, শিক্ষাজীবন, ফ্রান্সে গমনের পেছনের মহৎ উদ্দেশ্য এবং তাঁর চিন্তার বিবর্তন। পাশাপাশি আলোচিত হয় গ্রিক দর্শনের বাস্তবতা, ইসলামি দর্শনে গাজালির কাজের মূল্যায়ন, আধুনিক গাণিতিক যুক্তিবিদ্যায় ইবনে তাইমিয়্যার অবদান, আধুনিকতার সমালোচনা এবং ইসলামি মূল্যবোধের দার্শনিক ব্যাখ্যা ইত্যাদি। সাক্ষাৎকারের শেষে তিনি জোর দিয়ে বলেন—বর্তমান বিশ্বের নৈতিক ও বৌদ্ধিক সংকট উত্তরণের কার্যকর পথ ইসলাম; এবং তিনি তা কেবল দাবি হিসেবে নয়, বরং যুক্তি ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে সুদৃঢ়ভাবে উপস্থাপন করেন।]সাজ্জাদ ইউনুস


আসসালামু আলাইকুম, আমি আবদুর রহমান নাসের। আপনাদের স্বাগত জানাই “পডকাস্ট আল-শারক”-এর নতুন এক পর্বে। আজকের অতিথি মরক্কোর চিন্তাবিদ ও দার্শনিক তহা আবদুর রহমান। এই পর্বটি একটি বৌদ্ধিক জীবনী—যেখানে আমরা তহা আবদুর রহমানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো ও অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে আলোচনা করব, যেগুলো তাঁর চিন্তা ও কর্মকে প্রভাবিত করেছে। পাশাপাশি তাঁর কিছু গ্রন্থ নিয়েও আলোচনা করব এবং তিনি উত্থাপন করেছেন এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পর্যালোচনা করব। আশা করি এটি আপনাদের জন্য উপকারী হবে।


আবদুর রহমান নাসের: উস্তাদ তহা আবদুর রহমান, “পডকাস্ট আল-শারক”-এ আপনাকে স্বাগত। আপনি ১৯৪৪ সালে মরক্কোর আল-জাদিদা শহরে জন্মগ্রহণ করেন, যখন দেশটি ফরাসি উপনিবেশের অধীনে ছিল। সেই সময় আপনার বেড়ে ওঠা কেমন ছিল? যদি সংক্ষেপে বলতেন।

তহা আবদুর রহমান: পরম করুণাময় আল্লাহর নামে শুরু করছি। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক সত্যনিষ্ঠ, বিশ্বস্ত নবীর ওপর এবং তাঁর সম্মানিত পরিবার-পরিজনের ওপর। আমার শৈশব জীবন খুব বিস্ময়কর ছিল না, তবে এতে কিছু শিক্ষা ও প্রজ্ঞার বীজ ছিল। ছোটবেলায় যখন আমি বর্ণমালা শিখছিলাম, তখন সেগুলো মনে রাখতে বেশ কষ্ট হতো। আমার বাবা আশঙ্কা করতেন যে আমি হয়তো পড়াশোনা শিখতে পারব না। তাই তিনি আমাকে সৎ ও নেককার মানুষদের কাছে নিয়ে যেতেন এবং তাদের কাছে আমার জন্য দোয়া চাইতেন। এতে আমার মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মায় যে আমি অবশ্যই সে অক্ষরগুলো শিখব এবং আমি অবশ্যই শিখব। আর ছোট বয়স সত্ত্বেও একদিন বাবার সেই ইচ্ছা পূরণ করব। এভাবেই আমি বাবার কাছেই মক্তবে পড়াশোনা শুরু করি। তিনিই আমাকে কোরআনের একটি বড় অংশ—প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ (৪০ হিজব)—মুখস্থ করান। পরে বিদ্যালয়ে ভর্তি হই। এভাবেই শুরু হলো স্কুলজীবন। তখনকার স্কুলগুলোকে বলা হতো ‘মাদারিসুল আ’য়ান’। আর তা ছিল মূলত ফরাসি শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে। আমাকে এ-ধরনের বিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে কারণ আরবি ভাষার স্কুল খুব কম ছিল। প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনে পাঁচ বছর কাটাই। একটি বিশেষ ঘটনা শোনাই আপনাদের। ছোটবেলায় আমি আমার ধর্মের প্রতি খুব অনুরাগী ছিলাম। আর এ বয়সেই ফরাসিদের প্রতি এক ধরনের বিরূপ মনোভাব বরং শত্রুতা পোষণ করতাম। একদিনের ঘটনা। আন্দোলনকারীরা শহরে দোকানপাটসহ সবকিছুতে সাধারণ ধর্মঘট ও বিক্ষোভের ডাক দেয়। পরদিন যখন স্কুলে আসলাম। ফরাসি শিক্ষক আমাদের ফরাসি ভাষায় একটি করে বাক্য গঠন করতে আদেশ করলেন। আমি একটি বাক্য গঠন করলাম। আমি লিখেছিলাম, “আমি দেখেছি লোকেরা দোকানদারদের দোকান বন্ধ করতে আদেশ করছে।” এতে শিক্ষক খুব রেগে যান এবং আমাকে এমনভাবে মারেন যা আমি কখনো ভুলব না। সে দিন শিক্ষকের আঘাতে আমি মাটিতে পড়ে যাই। আমি তখনও ছোট। বড়জোর তখন আমার বয়স ১২ বছর হবে। এই ঘটনাটি আমার জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। আমি বলতাম, আমি যখন বড় হব, এই মানুষটি থেকে প্রতিশোধ নেব। যাই হোক, সময় চলতে থাকল। আমি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে মাধ্যমিকে উঠলাম। মাধ্যমিকের কিছু অংশ আল-জাদিদা শহরে পড়ি। পরে দারুল বায়দা’তে স্থানান্তর করি। এভাবেই চলতে থাকি। অনেকগুলো ঘটনা ঘটে। যাক, আমি কথা লম্বা করতে চাচ্ছি না। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চলতে থাকে। অনেক ঘটনা। আসলে আমি ব্যক্তিগত জীবনের সব ঘটনা বলতে পছন্দ করি না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। যা আমি আমার কিছু সুহৃদকে জানিয়েছি। দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত এসব ঘটনা অন্য কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে হয়তো বলা যেতে পারে। এসব বর্ণনা করি শিক্ষাগ্রহণের উদ্দেশ্যে কিংবা আমার কথার প্রমাণস্বরূপ।

আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি, অনেক ঘটনা ঘটেছিল। পরে আমি ফ্রান্সে যাই। ১৯৬৮ সালের ছাত্র আন্দোলনের সময় আমি সেখানেই অবস্থান করছিলাম। এসব বিষয়ে আপনারা অবগত আছেন। আমি তো ভুলে যাওয়ার উপক্রম। যাই হোক, ফ্রান্স গমনের সময় আমার মনে দুটি বড় চিন্তা ছিল:

প্রথমত, ১৯৬৭ সালের পরাজয়ের পর মুসলিম ও আরবরা কীভাবে নিজেদের পুনর্গঠন করবে; কীভাবে জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা অর্জন করবে যা দ্বারা তারা প্রতিপক্ষের ওপর বিজয় লাভ করতে সক্ষম হবে। অর্থাৎ সে বয়সে তদনুযায়ী চিন্তা করতাম এই আর কি।

আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল, যুক্তিবিদ্যার জ্ঞান অর্জন। যুক্তি ও বুদ্ধির কাঠামো ও পদ্ধতি শেখা, যাতে আমি সেই উপায়গুলো ব্যবহার করে নিজের প্রতিপক্ষ এবং মুসলিমদের প্রতিপক্ষদের মোকাবিলা করতে পারি। আমার অন্তরে সবসময় ঈমান ছিল। আমার বাবা আমার মধ্যে এমন এক ঈমান রোপণ করেছিলেন যা কখনো মুছে না। এই ঈমানই ছিল আমার জীবনের চালিকাশক্তি। আমার বিশ্বাস, যদি একটি শিশু ঈমান হারায়, তবে সে পথ হারাবেই—যদি না আল্লাহ তার জন্য কল্যাণ চান। ঈমান হলো শিশুর মধ্যে একটি বীজ, যা থেকে সব ভালো জন্ম নেয় এবং তার জীবনকে সঠিক পথে পরিচালিত করার মাধ্যম হয়।

এরপর দ্বিতীয় বিষয় হলো, আমি দর্শনের পাঠ নিয়েছি। আমার দর্শন পাঠের পুরো সময়জুড়ে সর্বদা মৌলিক উপাত্ত ছিল পশ্চিমানির্ভর। আমি এই ভেবে অবাক হতাম—কেন দর্শন একেক ভাষায় একেক রকম? যেমন ধরুন আমি ইংরেজি টেক্সট পড়ছি, সেখানে যে চিন্তা উত্থাপিত হয়েছে, তা ফরাসি ভাষায় লিখিত টেক্সটে ভিন্ন। জার্মান ভাষায় পড়লাম, তাতে সেই ভিন্নতা। তখন আমি নিজেকে প্রশ্ন করতাম, ইসলামি দর্শন কোথায়? আমি প্রসিদ্ধ মুসলিম দার্শনিকদের কাছে ফিরে যাই। দেখি, তারা গ্রিক চিন্তার ভঙ্গিতে কথা বলে। তাদেরই আলাপ, তাদেরই ধারণাসমূহ। নিজস্ব ইসলামি ধারণাভিত্তিক দর্শন নয়। ফলে আমি সিদ্ধান্ত নিই, আমাকে এমন উপকরণ অর্জন করতে হবে, যা ইসলামি মৌলিকতা থেকে উদ্ভূত একটি দর্শন নির্মাণে আমাকে সক্ষম করে তুলবে। যা শুধু ইসলামি মূল উপাত্ত নয়, বরং ইসলামি মূল্যবোধ থেকে আহরিত হবে। ফ্রান্স সফরে এটাই ছিল আমার চিন্তা।

আবদুর রহমান নাসের: আমি ১৯৬৭ সালে একটু ফিরে যেতে চাই। কারণ এটি ছিল ঐতিহাসিক মুহূর্ত শুধু উস্তাদ তহা আবদুর রহমানের জন্য নয়, বরং অন্যান্য আরব গবেষক ও চিন্তাবিদদের জন্যও এটি ছিল চূড়ান্তকারী একটি সময়। কারণ আসলেই এটি ছিল বিপর্যয়ের সময়। আপনি দর্শন ‘৬৭-র আগে পড়েছিলেন? নাকি ‘৬৭-র পরই দর্শনের পাঠ শুরু করেন?

তহা আবদুর রহমান: না, ‘৬৭-র আগে। ‘৬৩ সাল থেকেই শুরু। এর কিছু অংশ পড়ি মরক্কোতে; ফরাসি ও আরবি ভাষায়। এরপর পাঠ সমাপ্ত করার জন্য সফর করি। পরে মরক্কোতেই ইজাযা অর্জন করি। এরপর ফ্রান্সে আরেকটি সম্মাননা। ‘৭২ সালে দর্শনশাস্ত্রে বিশেষায়িত ডক্টরেট অর্জন করি ফ্রান্স থেকে। মরক্কোতে রাষ্ট্রীয় ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করি ‘৮৫-তে।

আবদুর রহমান নাসের: পড়াশোনা ও গবেষণার জন্য কেন দর্শনকেই নির্বাচন করেছিলেন?

তহা আবদুর রহমান: আমার দুটি উদ্দেশ্য ছিল: প্রথমত, একটি ইসলামি দর্শন গড়ে তোলা। দ্বিতীয়ত, দর্শন পাঠ যুক্তিবিদ্যার যেসব উপায়-উপকরণ ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে, তা আয়ত্ত করা। যুক্তিবিদ্যার পাঠ ঐ সময় দর্শনের অধীনে ছিল। পরে এটি স্বতন্ত্র বিষয়ে রূপ ধারণ করে গণিতের সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে গাণিতিক যুক্তিবিদ্যা চালু হয়, ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবদুর রহমান নাসের: ১৯৬৭ সালে এমন কী ঘটেছিল, যা আপনার মধ্যে এই পরিবর্তন সৃষ্টি করল?

তহা আবদুর রহমান: সেটি ছিল ভয়াবহ পরাজয় এবং তার সঙ্গে যুক্ত ছিল মিথ্যা প্রচারণা। আমাদের বোঝানো হচ্ছিল যে আমরা জিতেছি, অথচ বাস্তবে আমরা পরাজিত হয়েছিলাম। আমি আশা করি এমন ঘটনা আর না ঘটুক। এই ঘটনা আমাকে একজন কিশোর—কিশোর নয়, তরুণ হিসেবে জীবনে কিছু অর্জন করার প্রতি ধাবিত করে। আসলে এই ঘটনা আমায় দারুণভাবে প্রভাবিত করে। যাই হোক, সেই সময় আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল। মরক্কোতে প্রথম লিসান্স যে বছর সম্পন্ন করি, সে বছরের শেষের দিকের ঘটনা এটি। অনেকগুলো ঘটনাই ছিল। তবে আমি এটিই বর্ণনা করছি। ঘটনাটি হলো, ভূমধ্যসাগরীয় ছাত্রদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। আমি সে সময় খোঁজাখুঁজি করছিলাম, ভূমধ্যসাগরের আওতায় কোন কোন দেশ পড়ে। অবশ্য সকল ছাত্রদের মধ্য থেকে অনুষদের ডিন আমাকেই ঐ সম্মেলনে পাঠান। আমি গেলাম সেখানে। গিয়ে দেখি একজন ইসরায়েলি ঐ সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী হিসেবে উপস্থিত। বিষয়টি আমার কাছে খুব কঠিন ছিল। এই ঘটনাটিও আমি ভুলতে পারি না।

আবদুর রহমান নাসের: এখানেই আপনি বুদ্ধির পাঠের দিকে ধাবিত হলেন? কোন বিষয়টি আপনাকে বুদ্ধিভিত্তিক পড়াশোনার প্রতি ধাবিত করেছিল?

তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ, বুদ্ধিভিত্তিক পড়াশোনা ইত্যাদি। অথচ সে ইসরায়েলি আমার প্রতি কোনো বিদ্বেষ করেছে এমন নয়। তবে আমার মনে হচ্ছিল, সেই ইসরায়েলি যেন সর্বত্র আমার প্রতিপক্ষের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল। যে প্রতিপক্ষ আমাকে সেই সম্মেলনেও পিছু করছিল। এই ঘটনাও আমার মনে গভীর ছাপ সৃষ্টি করে। এরপর আমার গবেষণা চলতে থাকে। আমার প্রথম ডক্টরেটের জন্য ভর্তি হই। আমার প্রথম ডক্টরেটের বিষয় ছিল—দর্শনের ওপর ভাষার প্রভাব। এখানেই আমি দেখিয়েছি—আমরা যেসব দর্শন পড়ি, সাধারণত সেগুলো মানবজাতির যৌথ দর্শন বলে মনে করা হয়। আসলে সেগুলো নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে সম্পর্কিত দর্শন: হয় জার্মান, নয় ইংরেজ, নয় ফরাসি—এর বাইরে কিছু নয়। আমি আমার গবেষণায় এই বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করেছি। প্রথম প্রস্তাবনায় এটাও দেখিয়েছি যে, এই অর্থে ইসলামি দর্শন বলতে কোনো দর্শন ছিল না।

আবদুর রহমান নাসের: এমনকি ঐতিহ্যগত অর্থেও না, অর্থাৎ ইসলামি ঐতিহ্যের মধ্যেও নয়?

তহা আবদুর রহমান: আমি মনে করি—নেই। শুধু মনে করি তাই না; বরং দলিল-প্রমাণ দ্বারা সাব্যস্ত করেছি, পশ্চিমা সংস্কৃতিতে যে অর্থে দর্শন বিদ্যমান, সেই অর্থে কোনো ইসলামি দর্শন নেই। অর্থাৎ যেমনভাবে পশ্চিমা দর্শন তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে ধারণা, অর্থ ও বিষয়বস্তু গ্রহণ করে, তেমনটি নয়। অন্য দর্শনগুলো তাদের নিজ নিজ ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে দার্শনিক বিষয়বস্তু ও ধারণা গ্রহণ করে।

আবদুর রহমান নাসের: ইসলামি দর্শন অনেকাংশে গ্রিক দ্বারা প্রভাবিত ছিল।

তহা আবদুর রহমান: ইসলামি দর্শন গ্রিক ভাষার দ্বারা এমনভাবে প্রভাবিত ছিল, যা আমি বলব অজ্ঞতার নির্দেশ করে।

আবদুর রহমান নাসের: এখানেই ইবনে রুশদ সম্পর্কে আপনার মতামতের ব্যাপারটি চলে আসে।

তহা আবদুর রহমান: আমি মনে করি মুসলিম দার্শনিকরা কোনো নতুনত্ব সৃষ্টি করেননি। নতুনত্ব নয়; তারা শুধু একটা কাজই করেছেন। তা হলো, এমন দুটি বিষয়ের মাঝে মিল সৃষ্টি করতে চেয়েছে, যাদের মধ্যে আসলে কখনো মিল সম্ভব না। তাদের কাজটা ছিল—ইসলামি বিশ্বাস ও গ্রিক মূল্যবোধের মাঝে সামঞ্জস্য সৃষ্টি করা। যে গ্রিক দর্শন ছিল ইসলামি মূল্যবোধের বিপরীত মেরুতে অবস্থিত এক ভিন্ন বিশ্বাস। সুতরাং এই সংযোগ স্থাপন তো অসম্ভব। তা সত্ত্বেও তারা এই কাজটিই করেছে—উভয়ের মাঝে মিল সৃষ্টি করতে চেয়েছে।

আবদুর রহমান নাসের: অনেক চিন্তাবিদ মনে করেন যে, দর্শন ও ধর্মের মাঝে স্পষ্ট ফারাক বিদ্যমান—এই ধারণা কি ঠিক?

তহা আবদুর রহমান: না। দেখুন, যে দর্শনের চিন্তা আমি করি, আর যে দর্শন আমাদের কাছে পৌঁছেছে—দুটি ভিন্ন জিনিস। আমাদের কাছে যে ফিলোসফি পৌঁছেছে তা গ্রিক দর্শন। আর আমি যে দর্শনের দিকে আহ্বান করি এবং যে দর্শনটি আমি দেখতে চাই তা হলো—ইসলামি সভ্যতা-সংস্কৃতি, ইসলামি মূল্যবোধ, ধারণা-বিষয়বস্তু এবং তার যুক্তিতর্ক থেকে উৎসারিত এক দর্শন। এ কাজটাই তো হয়নি।

আবদুর রহমান নাসের: ঠিক। আপনার এই সিদ্ধান্তই কি ইবনে রুশদের সম্পর্কে আলাদা অবস্থান নিতে আপনাকে বাধ্য করেছিল? অথচ অনেকেই মনে করে ইবনে রুশদ একজন গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক এবং আধুনিক পশ্চিমা দর্শন তাঁর কর্ম ও প্রচেষ্টার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

তহা আবদুর রহমান: এই দিক থেকে তিনি মহান। আমি তাঁর এই মূল্য অস্বীকার করি না যে, তিনি ইসলামি সংস্কৃতি থেকে, অর্থাৎ তাঁর হাতে থাকা ইসলামি দর্শন থেকে সব ইসলামি কাঠামো সরিয়ে দেন এবং সেটিকে ইসলামি উপাদানের মিশ্রণ থেকে পরিষ্কার করে আবার পশ্চিমে ফিরিয়ে দেন। ‘আমাদের সরঞ্জাম আমাদেরই ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে’। দর্শনকে তার মূল গ্রিক উৎসের দিকে ফিরিয়ে দেন, যেখানে ইসলামের কোনো নামগন্ধ নেই। ফলে পশ্চিমারা তাদের নবজাগরণের সময় এটিকে গ্রহণ করে। কারণ তাদের আর কষ্ট করে সেই দর্শনকে পরিশোধন করতে হয়নি, যা তারা আল-ফারাবি, ইবনে সিনা এবং আল-কিন্দি থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছিল। অর্থাৎ, এসব দার্শনিক ইসলামি দর্শনে যা কিছু প্রবেশ করিয়েছেন, ইবনে রুশদ সবকিছু ছেঁটে ফেলেন। তিনি ইবনে সিনা ও অন্যদের নিয়ে উপহাসও করতেন। ফলে, তাঁর কাছে পৌঁছানো দর্শন যা আল-ফারাবি, ইবনে সিনা ও আল-কিন্দির মাধ্যমে এসেছিল, সেখান থেকে সব ইসলামি প্রভাব পরিষ্কার করেন। ফলে পশ্চিমা দার্শনিকরা তাদের কাঙ্ক্ষিত হারানো জিনিস খুঁজে পায় তাঁর কাজে। ইবনে রুশদের মাধ্যমে তারা পায় মূলত ব্যাখ্যাকৃত এরিস্টটলকে। এরিস্টটলকে কেন্দ্র করে যার যাত্রা। ইসলাম দ্বারা প্রভাবিত যে সংযোজনগুলো করা হয়েছিল, সেগুলোর কারণে নয়। এই দিক থেকে তিনি সফল ছিলেন। তবে, আমি নিজে দর্শনের ইতিহাস পড়লেও তা নিয়ে গভীরভাবে কাজ করিনি বা বিশেষজ্ঞ হতে চাইনি। কিন্তু কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছি। ইবনে রুশদের হাতে থাকা অনূদিত পাঠগুলো নিয়ে সেগুলোকে মূল গ্রিক এরিস্টটলীয় পাঠের সঙ্গে তুলনা করেছি—গ্রিক ভাষায়। এতে আমি উভয়ের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছি। এমনকি ইবনে রুশদের নিজেরও কিছু ভুল ছিল। তিনি এরিস্টটলকে তার মূল রূপে পুরোপুরি বুঝতে পারেননি। তবুও গবেষকেরা বলেন তিনি এরিস্টটলকে সম্পূর্ণভাবে বুঝেছেন। যদি আমি বিশেষজ্ঞ হতাম, তাহলে এই বিষয়ে আরও অনেক কিছু উন্মোচন করতে পারতাম। ইবনে রুশদের এরিস্টটল-বোধ গ্রিক মূল পাঠের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না।

আবদুর রহমান নাসের: আমি এই বিষয়ে একটু ভেতরে যেতে চাই। কারণ প্রায়ই ইবনে রুশদকে গাজালির বিপরীতে দাঁড় করানো হয়। বলা হয়, দর্শনকে যিনি বিজয়ী করেছেন তিনি ইবনে রুশদ। অন্যদিকে গাজালি দর্শনের সমালোচনা করেছেন, দার্শনিকদের ভ্রান্তি তুলে ধরেছেন। যদি আপনি গাজালি সম্পর্কে নিজ মতামত জানাতেন এবং আপনি গাজালি থেকে কীভাবে কী আহরণ করেছেন?

তহা আবদুর রহমান: প্রথমত, গাজালির সঙ্গে আমাকে প্রায়ই সম্পর্কিত করা হয়। সত্যি বলতে আমার পাঠকরা এই ব্যাপারে ভুল করেছেন। আমার তাঁর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক ছিল না, বিশেষ করে শুরুতে। তবে আল্লাহর ইচ্ছায় আমার দর্শন অধ্যয়নের পথ কিছুটা গাজালির সঙ্গে মিলে যায়। তিনি যেমন উসূল অধ্যয়ন করেছেন, আমিও তেমন করেছি। আমি যেমন উসূলে যুক্তিবিদ্যার ব্যবহার সমর্থন করি, তিনিও তা করেছেন। আমি দার্শনিক ভ্রান্তি নিয়ে কথা বলেছি, তিনিও বলেছেন। আরও অনেক ব্যাপার আছে। যেমন তিনি কিছু বিশেষ অভিজ্ঞতা করেছেন, আমিও তাই করেছি। এভাবে কিছু মিল আছে। সুতরাং কেউ আমার লেখা পড়লে মনে করেন আমি যেন তাঁর থেকেই নিয়েছি।

এমনকি এই দারুণ দেশ তুরস্কেও আমি শুনেছি, সমালোচকেরা আমাকে গাজালির ব্যাখ্যাকারদের একজন মনে করেন! কিন্তু তা সঠিক নয়। আমি গাজালির দিকে ফিরি অনেক পরে—আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা গ্রহণের পর। ভাবলাম, গাজালি কী করেছেন, কী লিখেছেন তা দেখে নিই। এভাবেই গাজালিকে পড়া হয়। দেখলাম, দর্শনের ওপর তাঁর ভালো দখল ছিল। এও দেখলাম, নৈতিকতার ক্ষেত্রে তাঁর বড় অবদান রয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে তিনি আমাকে বিস্মিত করেছেন। যেটি আমি সম্পূর্ণভাবে খণ্ডন করেছি। বিষয়টি হলো, তিনি এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যার প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিলেন। তিনি মনে করতেন এরিস্টটলীয় যুক্তি সার্বজনীন, মানবিক এবং সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য—অর্থাৎ, এরিস্টটল যুক্তিবিদ্যার যেসব নিয়মকানুন রচনা করেছেন, তা সব নিয়মই সকল মানববুদ্ধির জন্য প্রযোজ্য। এমনকি তিনি ভিন্ন জগৎ কল্পনা করতেন। আর বলতেন—ভিন্ন জগতেও এরিস্টটলীয় যুক্তি-নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

আপনি তাঁর বিখ্যাত তত্ত্ব সম্পর্কে অবগত আছেন— “ليس في الإمكان أبدع مما كان” অর্থাৎ—বর্তমানে যা আছে, তার চেয়ে অধিক উৎকৃষ্ট কিছু সম্ভব নয়। তাই তিনি সম্ভাব্য বিভিন্ন জগতের অস্তিত্ব কল্পনা করতেন। তিনি বলতেন, যদি আমরা ধরে নিই যে অন্য জগৎও আছে, তাহলে সেখানকার নিয়মগুলোও অবশ্যই এরিস্টটলীয় যুক্তির অধীন হবে। আমি এই মত পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করি। এরিস্টটলীয় যুক্তি এই পৃথিবীতেও সর্বত্র প্রযোজ্য নয়। এমন অনেক বিষয় আছে যেখানে এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যা কাজে আসে না। আধুনিক যুক্তিবিদরা ইতিমধ্যেই এরিস্টটলীয় যুক্তিবিদ্যাকে ছাড়িয়ে গেছেন এবং নতুন ধরনের গাণিতিক যুক্তি তৈরি করেছেন। গাজালি সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে, তিনি নাকি দর্শনের পেট থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেননি। আসলে কথাটি ঠিক।

আবদুর রহমান নাসের: দর্শনের সমালোচনা সত্ত্বেও?

তহা আবদুর রহমান: দর্শনের সমালোচনা সত্ত্বেও। তিনি মূলত দর্শনের সমালোচনা করেছেন বলতে দর্শনের বিষয়বস্তুর সমালোচনা করেছেন। যেমন: বিশ্বের চিরন্তনতা, বা ইবনে সিনার মতামত ইত্যাদি। ইবনে সিনার এই কথায় আমার কষ্ট হয় যে, আল্লাহ কেবল সামগ্রিক বিষয় জানেন, খুঁটিনাটি বিষয়গুলো না; কিংবা কোনো না কোনো উপায়ে পুনরুত্থান অস্বীকার করা। এসব বিষয়ে আমি বলি—গাজালি সঠিকভাবে তাদের সমালোচনা করেছেন। তাদের খণ্ডনের ক্ষেত্রে গাজালি ঠিক করেছেন। কিন্তু আমি গাজালির মতো তাদেরকে কাফির বলার মতো চরম অবস্থানে যাই না।

আবদুর রহমান নাসের: তিনি দার্শনিকদের সমালোচনা করেছেন, কিন্তু নিজেও এক অর্থে দার্শনিক। কারণ তিনি দর্শনের উপকরণই তো ব্যবহার করেছেন।

তহা আবদুর রহমান: তিনি যুক্তিবিদ্যা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন শুধু। তিনি কি ইসলামি দর্শন সৃষ্টি করেছেন? কঠোর যুক্তিবাদী অর্থে—না। তবে নৈতিক-সুফি অর্থে তিনি নতুনত্ব সৃষ্টি করেছেন। যা আমরা তাঁর ইহইয়াউ উলূমুদ্দীন গ্রন্থে দেখি। অন্যদিকে ইবনে তাইমিয়্যাহ পুরোপুরি তো বলব না, তবে আংশিকভাবে তাঁকে অতিক্রম করেছেন। তিনি এরিস্টটলীয় যুক্তির সমালোচনা করতে সক্ষম হয়েছেন। কোরআনে বিদ্যমান ও ইসলামি ঐতিহ্যের ভেতর থেকে নতুন যুক্তি-পদ্ধতি বের করার ক্ষেত্রে দারুণ চেষ্টা করেছেন। যেমন কিয়াসুল আওলা, কিয়াসে তামসিল ইত্যাদি। অন্যদিকে গাজালি কী করেছিলেন? তিনি এরিস্টটলীয় যুক্তি গ্রহণ করে কোরআনের মধ্যে সেই যুক্তির সঙ্গে মিলে এমন আয়াত খুঁজতে থাকেন, এবং এগুলোকে “মিযান” নামে অভিহিত করেন। মূলত ‘মাওয়াযীন’ হলো এরিস্টটলীয় যুক্তি। তিনি “আস-সিরাতুল মুস্তাকীম” নামে একটি বই লিখেছেন, যেখানে এই “মিযান” বর্ণনা করেছেন। মূলত তা এরিস্টটলীয় যুক্তিরই রূপ।

পরে ইবনে তাইমিয়্যাহ এসে তাঁকে অতিক্রম করেন এবং যুক্তির সমালোচনায় এমন কিছু বলেন যা আধুনিক তত্ত্বের সঙ্গেও মিলে যায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, যারা ইবনে তাইমিয়্যাহর চিন্তা নিয়ে কাজ করেছেন, তারা আধুনিক যুক্তির সরঞ্জাম পুরোপুরি আয়ত্ত করতে সক্ষম হননি। ফলে তারা তাঁর কাজের যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারেননি।

আবদুর রহমান নাসের: মরক্কোতে ফেরার পর আপনি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হয়েছেন?

তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ।

আবদুর রহমান নাসের: এবার আমি একটু এগিয়ে আশির দশকের দিকে আসি। কারণ দেখা যায়, ‘তাজদীদ’ বা সংস্কার বিষয়টি আপনার কাছে অধিক গুরুত্ব বহন করে। এখানে তাজদীদ বা সংস্কার তার ব্যাপক অর্থেই ধরা হচ্ছে। যেমন—কালামশাস্ত্রের সংস্কার, বুদ্ধির সংস্কার, তুরাস বা ঐতিহ্যের সংস্কার। আপনি জ্ঞানের যেসব ক্ষেত্র নিয়ে কাজ করেন সকল ক্ষেত্রে এই ‘তাজদীদ’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। আপনাকে কোন জিনিসটি এই পথে নিয়ে গেল? আপনার দৃষ্টিতে অতীত (ঐতিহ্যের নবায়ন), বর্তমান (অর্থাৎ আপনার তাজদীদ) এবং এই বর্তমানই ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কন করবে। প্রশ্ন হলো, এই অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতের মাঝে সম্পর্কের ধরনটা কী?

তহা আবদুর রহমান: প্রথমত, ‘নবায়ন’ বা ‘তাজদীদ’-এর ধারণাটি আমার মতে ইসলামি সংস্কৃতিতে একটি মৌলিক ধারণা। প্রমাণ হলো, হাদিসে এসেছে—”তোমাদের ঈমানকে নবায়ন করো।” প্রাচীন আরবি সংস্কৃতিতে তাজদীদকে কিন্তু ‘ইবদা’ তথা নব-আবিষ্কার বলা হয় না। তাই আমি আমার প্রথম দিকের বইগুলোতে ‘ইবদা’ বা ‘সৃজনশীলতা’র বদলে ‘সংস্কার’ শব্দটি ব্যবহার করেছি। যদিও আমার উদ্দেশ্য ছিল সৃজনশীলতাই। এটা প্রথম কথা।

দ্বিতীয়ত, আমি যেসব বিষয় অনুন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বর্তমান মুসলিম উম্মাহর জন্য উপকারী বলে মনে করি তা খুঁজে বের করার চেষ্টা করতাম। উদাহরণ হিসেবে আমি ‘কালামশাস্ত্র’-এর কথা বলতে পারি। কেউ বলতে পারে, উস্তাদ তহা একজন যুক্তিবিদ্যা বিশেষজ্ঞ, তিনি কীভাবে কালামশাস্ত্র নিয়ে কাজ করছেন? আসলে আমার উদ্দেশ্য ছিল—কালামশাস্ত্রের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ‘লজিক্যাল মেথডোলজি’ বা যৌক্তিক পদ্ধতিটি বের করে আনা। আপনি যদি কালামশাস্ত্র সম্পর্কিত আমার বইটি পড়েন, তবে সেখানে বিভিন্ন ফেরকা, তাদের তর্কযুদ্ধ, তর্কবিতর্ক ইত্যাদি দেখবেন না। বরং আমি চেষ্টা করেছি সেই পদ্ধতিগুলো খুঁজে বের করতে যা বিভিন্ন চিন্তা-বিদ্যালয় অনুসরণ করত। যৌক্তিক পদ্ধতিটি বের করে গবেষক বা পাঠকের সামনে পেশ করতে। হয়তো তারা অতীত ও বর্তমানের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি করতে তা থেকে উপকৃত হবে। অর্থাৎ, আমরা অতীতের বিষয়বস্তু না নিলেও, বর্তমানের অসংখ্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে কমপক্ষে অতীতের কার্যকর পদ্ধতিগুলো গ্রহণ করতে পারি। যেসব চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন আজ আরব ও মুসলিম উম্মাহ। এটা দ্বিতীয় পয়েন্ট।

আবদুর রহমান নাসের: তার মানে আপনার কাছে ‘তাজদীদ’ মানে সৃজনশীলতা এবং নতুন কিছু তৈরি করা নয়। আর যা ইসলামি ঐতিহ্যে আগে থেকেই প্রচলিত ছিল। আচ্ছা এখন প্রশ্ন—আপনি ছয় বা সাতটি ভাষায় পারদর্শী। আপনি এই ভাষাগুলো কীভাবে শিখেছেন এবং এই ভাষাগুলোতে আপনি দর্শন পড়েন?

তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ, আমি পড়ার এবং বোঝার উদ্দেশ্যে এই ভাষাগুলো শিখেছি, যাতে আমার দাবির পক্ষে প্রমাণ হিসেবে পেশ করা সম্ভব এমন সব তথ্য খুঁজে বের করতে পারি।

আবদুর রহমান নাসের: ভাষাগুলো কী কী?

তহা আবদুর রহমান: ভাষাগুলো হলো—আরবি, ফরাসি, ইংরেজি, জার্মান, গ্রিক এবং কিছুটা ল্যাটিন।

আবদুর রহমান নাসের: কীভাবে শিখেছেন?

তহা আবদুর রহমান: পুরোনো ভাষাসমূহ আমি ফ্রান্সে পড়েছি। জার্মান ভাষার মতো জীবন্ত ভাষাগুলো মরক্কোতেই শিখেছি। গ্যোটে নামক ইনস্টিটিউটে ভর্তি হয়েছিলাম এবং সেখানে জার্মান ভাষার পাঠ নিয়েছি। আমি জার্মানকে দার্শনিক ভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিলাম। কারণ আমার মতে, দর্শনচর্চার জন্য এটি সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা। আমার জানা অন্যান্য ভাষা যেমন ফরাসি বা ইংরেজির চেয়ে দর্শনচর্চায় জার্মান ভাষার ক্ষমতা অনেক বেশি।

আবদুর রহমান নাসের: এই কারণেই অনেক গবেষক আপনাকে ‘মার্টিন হাইডেগার’-এর পাশে দাঁড় করান, বিশেষ করে কাইনুনা তথা সত্তাতত্ত্বদর্শনে। মনে হয়, আপনি স্বীকৃতি দিচ্ছেন যে, জার্মান ভাষা একটি উচ্চতর দার্শনিক ভাষা?

তহা আবদুর রহমান: ঠিক তাই। আমি তাদের ধারণার গঠনশৈলী, যুক্তি দেওয়ার পদ্ধতি এবং দাবির ধরনগুলো খুঁজে খুঁজে উপকৃত হতে চেষ্টা করেছি। আর বুঝতে চেয়েছি তারা কীভাবে এসবকিছু করে? কেউ বলতে পারে, উস্তাদ তহা আপনি তাদের মতোই কাজ করেছেন। আসলে আমি কোনো নির্ধারিত ভাষার অনুকরণ করিনি, বরং এসব সংস্কৃতির পদ্ধতিগত অর্জনগুলোকে আত্মস্থ করে নিজের সংস্কৃতি এবং ইসলামি-আরবি ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মিলিয়ে নতুনভাবে সাজাতে চেয়েছি।

আমি একটি সহজ উদাহরণ দিই। একদম সহজ উদাহরণ দিচ্ছি। খুব সহজ করে বলি। ধরুন ‘ওজুদ’ (অস্তিত্ব) শব্দ যেটা নিয়ে এত হইচই। যদি আমরা বিভিন্ন ভাষার দিকে তাকাই। যেমন ফরাসি ভাষায় একে বলা হয় ‘একজিসতঁস’। এখানে ‘তঁস’-এর অর্থ হলো ‘দাঁড়িয়ে থাকা’ বা ‘প্রতিষ্ঠিত হওয়া’। পাশ্চাত্য দার্শনিকরা যখন অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলেন, তখন তারা জিনিসের স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ওপর জোর দেন। অর্থাৎ—ওজুদের সংজ্ঞায় তারা বলেন—কোনো বস্তুর নিজে নিজেই অস্তিত্ব লাভ করা। সে কারণে দেখবেন তারা গ্রিকদের ‘ওজুদ’-এর মর্মের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে। যা প্রাচীন আরবরা “جوهر” (জওহর) শব্দ দিয়ে অনুবাদ করেছিলেন। সুতরাং গ্রিকদের কাছে “جوهر” (জওহর) মানে যে বস্তু নিজ থেকেই প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু “جوهر” শব্দটি আরবদের কাছে এই অর্থ বহন করে না। ‘জওহর’-এর অর্থ হলো কোনো বস্তুর মূল অংশ, সার বা মর্ম। যদিও এটি মূলত ফারসি শব্দ, আরবি শব্দ নয়। মূল ফারসি শব্দটি আরবরা ব্যবহার করেছিলেন ‘কোনো বস্তুর মূল অংশ’ বোঝাবার জন্য। অন্যদিকে যদি আরবি “وجود” শব্দটির দিকে তাকান, দেখবেন—এর মূল অর্থে ‘নিজে নিজেই অস্তিত্ব লাভ করা’র মতো কোনো অর্থ নেই। আরবি ভাষার আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাকালে দেখতে পাই—এর অর্থ কোনো কিছু লাভ করা বা অর্জন করা। “وجدتُ” মানে আমি কিছু লাভ করেছি। যখন আমি অস্তিত্ব নিয়ে কথা বলি, তখন আমি ওজুদের ভেতর ‘লাভ করা বা অর্জন করা’র অর্থ প্রবেশ করাব। যদি পশ্চিমারা ‘একজিসতঁস’-এর অর্থে “স্থিত হওয়া” অর্থটি এনে বসাতে পারে, তাহলে একজন আরবি হিসেবে আমার উচিত ‘ওজুদ’-এর ভেতর “অর্জন” বা “প্রাপ্তি” অর্থটিই সংযোগ করা। এটি ছিল এমন একটি শব্দের উদাহরণ যেটি নিয়ে মানুষ অধিক হারে আলাপ করে।

কিন্তু কী হলো? আপনি লক্ষ করবেন—আরবি লেখালেখিতে যখন অস্তিত্ব নিয়ে কেউ কথা বলেন, তারা পশ্চিমা যেভাবে ভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত অর্থ ধার করে নিজের ভাষার শব্দ সংজ্ঞায়িত করে, আরবিতেও তারা পাশ্চাত্য ভাষার মতো করে ‘ওজুদ’কে সংজ্ঞায়িত করেন। এর ফলে আরবি সংস্কৃতির প্রেক্ষাপট আর যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতি থেকে নকল করা হলো তার মধ্যে একটি সংঘাত তৈরি হয়। ফলে সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এভাবে নতুন কিছু সৃষ্টি করা কখনোই সম্ভব নয়। কারণ এটি এমন দুই প্রেক্ষাপটের মাঝখানে মেলবন্ধন সৃষ্টির চেষ্টা যা অসম্ভব। সুতরাং মস্তিষ্ক স্থবির হয়ে পড়ে। আর আমরা প্রবেশ করি ব্যাখ্যার জগতে। চলতে থাকে একের পর এক ব্যাখ্যা। এরপর ব্যাখ্যারও ব্যাখ্যা লিখতে থাকি। ইত্যাদি। আমাদের কাছে দর্শন যেভাবে পৌঁছেছে, তা যেন আমাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তাবাহী বুদ্ধিকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।

আবদুর রহমান নাসের: সম্ভবত এই কারণেই আপনি দর্শনে নিজস্ব পরিভাষা সৃজন করেন?

তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ। হ্যাঁ। এটাই কারণ। এটি মূলত উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে যেন আমি এমন নতুন ধারণা সৃজন করি যা ইসলামি সংস্কৃতির সঙ্গে সংযুক্ত। যেন আমরা দর্শনচর্চা করতে পারি এবং তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের চিন্তাভাবনাকে উন্নত করতে পারি। যেমন—আপনি যদি আমার বই ‘ফিকহুত তারজমা’ পড়েন, দেখবেন আমি ১০০ পৃষ্ঠা নির্ধারণ করেছি দেকার্তের ‘কজিতো’র অনুরূপ অনুবাদ করতে। ‘কজিতো’র অনুবাদ এভাবে করা হয়—আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। এই বাক্যটি আরবি নয়। এই বাক্যে আরবির কিছুই নেই। এমনকি যখন আমরা এটিকে আরবিতে রূপান্তর করতে চাই; বলতে হবে—(أفكر، فأنا أوجد أو أنا موجود) আমি চিন্তা করি, তাই আমি অস্তিত্বশীল। কিন্তু প্রকৃত আরবি এখানে অনুপস্থিত। কারণ…

আবদুর রহমান নাসের: আপনি অনুবাদ কীভাবে করেছেন?

তহা আবদুর রহমান: আমি অনুবাদ করেছি—(انظر، تجد) আমি ‘ওজুদ’ শব্দকে তার মূলের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছি। মূল অর্থ—(الظفر بشيء) কোনো কিছু পাওয়া বা লাভ করা। তেমনিভাবে ‘নাজর’ শব্দটি আরবি ভাষায় দুটি অর্থে ব্যবহার হয়। চোখের দৃষ্টি দিয়ে দেখা, আবার এর অর্থ হলো বুদ্ধি বা অন্তর্দৃষ্টির মাধ্যমে উপলব্ধি করা। সুতরাং (انظر، تجد) এই বাক্যে আমি ‘ওজুদ’-এর মূল অর্থ তথা ‘পাওয়া’ আর ‘নজর’-এর উভয় অর্থ ‘চোখের দেখা বা বুদ্ধির উপলব্ধি’কে একত্রিত করেছি।

আবদুর রহমান নাসের: এখান থেকেই দর্শন এবং ভাষার মধ্যকার গভীর সম্পর্কটি স্পষ্ট। আমার মনে পড়ছে, আপনার প্রথম পিএইচডি সম্ভবত দর্শন এবং ভাষার সম্পর্ক নিয়ে ছিল। আমি সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করছি—দর্শনই হলো তহা আবদুর রহমানের মূল আগ্রহের বিষয়। এর ভেতর দিয়েও তিনি অন্যান্য শাখার দিকে অগ্রসর হয়েছেন। যেমন—ভাষা, যুক্তিবিদ্যা এবং অন্যান্য শাখার দিকে। প্রকৃতপক্ষে দর্শনই সব জ্ঞানের জননী।

তহা আবদুর রহমান: অবশ্যই। যেমনটি আগেও ছিল, এমনকি এখনো আছে। যদিও এখন বিভিন্ন ক্ষেত্র ও বিভাগে আলাদা হয়ে গেছে। এর কারণ হলো—দর্শন আসলে কী? একজন প্রকৃত দার্শনিক সারাজীবন দর্শনচর্চা করার পরেও হয়তো জীবনের শেষ সময়ে শেষ যে প্রশ্নটি রাখেন, তা হলো—’দর্শন আসলে কী?’ আমি বলি—ফালসাফা হলো, সহজ করে বলি, ‘হিকমত’ বা ‘প্রজ্ঞা’। তবে এটি মুসলিম দার্শনিকদের ব্যবহৃত অর্থে নয়, বরং ইসলামের ব্যবহৃত অর্থে।

আবদুর রহমান নাসের: কেমন? আপনি কি সংক্ষেপে এর ব্যাখ্যা দেবেন?

তহা আবদুর রহমান: হুঁ। ব্যাখ্যা তো অনেক দীর্ঘ।

আবদুর রহমান নাসের: সংক্ষেপে ও দ্রুতভাবে।

তহা আবদুর রহমান: হুঁ। ‘সোফিয়া’ যখন গ্রিকদেরও আগে মধ্যপ্রাচ্যে দুই নদীর মধ্যবর্তী যে সংস্কৃতি, তাতে এটির ব্যবহার ছিল। সেখান থেকেই তা গ্রিক সংস্কৃতিতে প্রবেশ করে। ওই মধ্যপ্রাচ্যীয় সংস্কৃতিতে এর উদ্দেশ্য ছিল—হিকমা বা প্রজ্ঞা। আমরা হিকমা বলতে যা বুঝি, সেটাই। আর তা হলো, এমন জ্ঞান যা জীবনে প্রয়োগ করা হয় এবং যা পুরোহিত বা জ্ঞানী ব্যক্তিরা সংরক্ষণ করতেন। এজন্য পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, “যাকে প্রজ্ঞা (হিকমা) দেওয়া হয়েছে, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়েছে।” কারণ গ্রিকের পূর্বের সংস্কৃতিগুলোতে প্রাচ্য সভ্যতায় এর ব্যবহার ছিল। সেখান থেকে তাওরাতীয় সভ্যতায় এটি প্রবেশ করে।

আবদুর রহমান নাসের: গ্রিকদের কাছে প্রজ্ঞার অর্থ কী ছিল?

তহা আবদুর রহমান: আমি বলেছি—সক্রেটিসের আগে প্রজ্ঞা মানে ছিল এমন জ্ঞান যে অনুযায়ী আমল করা হয়। কিন্তু সক্রেটিসের পর এর অর্থ হয়ে গেল: ‘প্রজ্ঞার ভালোবাসা’। হিকমা নয়, শুধু হিকমার প্রেম। সক্রেটিস নিজেই বলতেন, “আমি প্রজ্ঞাবান নই, বরং আমি প্রজ্ঞার একজন প্রেমিক বা অন্বেষণকারী।” কারণ ওই সময়ে যে জ্ঞান অনুযায়ী আমল করা হয় তার প্রতি ব্যাপক শ্রদ্ধা ছিল। তো তিনি বলতেন—আমি এটি ভালোবাসি। আর হিকমার প্রতি আমার ভালোবাসার প্রমাণ হলো—আমি সে জ্ঞান অনুযায়ী জীবনযাপন করব। তাই সক্রেটিসের পুরো দর্শন ছিল নৈতিকতাকেন্দ্রিক। তাঁর ইচ্ছে ছিল এই হিকমার উপযুক্ত হতে। যাতে করে তিনি সে অনুপাতে আমল করতে পারেন। এজন্য তিনি বলতেন—”আমি প্রজ্ঞাবান নই, বরং আমি প্রজ্ঞার অন্বেষণকারী।” অবশ্য অনেকেই বলেন—এটি প্রোটাগোরাস প্রমুখ থেকে এসেছে। সে যাই হোক, এটি সম্পূর্ণভাবে সক্রেটিসের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে।

আবদুর রহমান নাসের: আমরা দর্শন, বুদ্ধিবৃত্তিক বুদ্ধিকে বোঝার আলোচনায় কখনো প্রাচ্যে, কখনো বা পাশ্চাত্যে বিচরণ করলাম। এবার আসি একটি নতুন অভিজ্ঞতায়। যদিও তা কিছুটা অদ্ভুত মনে হবে। সেটা হলো—তাসাউউফের অভিজ্ঞতা। একটি পথ দার্শনিক পথ, বুদ্ধিবৃত্তিক পথ। এরপর আমরা দেখি—আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার একটি পথ আছে। যা আপনার চিন্তাধারায় প্রভাব ফেলেছে। অর্থাৎ—তীব্র অভিজ্ঞতা। আপনি আসলে সুফিবাদে প্রবেশ করলেন কীভাবে?

তহা আবদুর রহমান: আমার ধারণা ছিল না আপনি এ-ধরনের প্রশ্ন এত স্পষ্টভাবে করবেন। কিন্তু সত্যিই আপনি খুব গুরুত্বপূর্ণ বাস্তব কথা বলেছেন। আসলে দর্শনের মূল উৎসই হলো সুফিবাদ। কারণ সক্রেটিসের আগের মানুষ যারা প্রজ্ঞার কথা বলতেন, তাদের কাছে প্রজ্ঞা দ্বারা উদ্দেশ্য ছিল এমন জ্ঞান যে অনুযায়ী আমল করা হয়। হিকমার এই মর্ম তাদের কাছে বিদ্যমান ছিল। যার সঙ্গে ধর্মের গভীর সম্পর্ক ছিল। প্রজ্ঞা আর ধর্ম সম্পূর্ণরূপে একাকার ছিল। এমনকি ঐ সময় অনেক ধারা প্রসিদ্ধ ছিল। আমি এর সূক্ষ্ম ইতিহাসে প্রবেশ করতে চাই না। সুতরাং হিকমা বলতে বোঝানো হতো এমন জ্ঞান যা দ্বারা আমল করা হয়। অর্থাৎ—এমন জ্ঞান যার সঙ্গে ধর্মের গভীর সম্পর্ক। কারণ সে সময় আমল করা হতো ধর্ম অনুসারেই। সেজন্য আরবরা পরবর্তীতে যাকে ‘তাসাউফ’ নামে অভিহিত করত সেটি নির্গত হয় ‘সোফিয়া’ মূল ধাতু থেকে। তার সেই প্রাচীন অর্থে। ফলসফা আবিষ্কারেরও আগের যে অর্থ ছিল সে অর্থে। পরে কী হলো? হিকমাকে তার ব্যবহারিক মূল থেকে পৃথক করে ফেলা হলো। ফলে শুধু দর্শন আর জ্ঞানের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হলো। ব্যবহারিক দিকটি বাদ দেওয়া হলো। সুতরাং ফালসাফা হয়ে গেল শুধু দৃষ্টিপাত তথা দর্শন।

আবদুর রহমান নাসের: আপনি যখন তাসাউফের কথা বলেন বা সেই পথে হাঁটেন, তখন আপনি আসলে দর্শনের সেই আদি রূপটিই প্রয়োগ করেন।

তহা আবদুর রহমান: আমি ফালসাফাকে সেই আদি রূপে চর্চা করি। ঠিক ফালসাফা মূল অর্থে যেমন অনুশীলনের বিষয় ছিল, হিকমা যেভাবে চর্চার বিষয়। সুতরাং, এই তাসাউফ হলো ফালসাফার মূল। তবে ফালসাফা তাসাউফের ব্যবহারিক দিককে অস্বীকার করেছে।

আবদুর রহমান নাসের: আপনি কীভাবে তাসাউফে প্রবেশ করলেন?

তহা আবদুর রহমান: আমি দর্শন পড়েছি। যুক্তিবিদ্যা পড়েছি। যুক্তিবিদ্যা আমাকে বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা দেখিয়ে দিয়েছে। তাই আমি চেয়েছি এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে। আর বুদ্ধির এই সীমাবদ্ধতাকে ‘আমল’ ছাড়া অতিক্রম করা সম্ভব নয়। কারণ আমল বা কাজ বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তার চেয়ে আলাদা প্রজাতির জিনিস। কাজ আপনার বুদ্ধির নতুন দিগন্ত খুলে দেয়, যা কেবল চিন্তা করে পাওয়া সম্ভব নয়। ফলে আমল আমাকে বুদ্ধির দিগন্ত প্রসারিত করতে সাহায্য করেছে। তবে এই আমল বা কাজ হতে হবে আমলে সালেহ বা ‘সৎ কাজ’। যেকোনো আমল হলে চলবে না। বরং আমলে সালেহ হতে হবে যা আপনার বুদ্ধিকে প্রসারিত করতে সাহায্য করবে। এটাই ছিল সেই পথ যেটি আমাকে ‘আমল’ সম্পর্কে অন্বেষণের প্রতি ধাবিত করেছে। আমি ‘চিন্তা-দর্শন’ অন্বেষণ করেছিলাম। আর চিন্তা আমাকে একটি নির্দিষ্ট সীমায় নিয়ে এসেছে, তখন আমি আমল বা কাজের দিকে ফিরে গেলাম, যাতে আমি সেই স্তরে পৌঁছাতে পারি যেখানে চিন্তা আমাকে পৌঁছে দিতে পারবে না। আর আমলের সর্বোচ্চ রূপ আমার দৃষ্টিতে আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা, যা সুফিবাদের মধ্যেই প্রকাশ পায়। যদি তা সঠিক শর্ত ও নিয়মে অনুশীলন করা হয়। অর্থাৎ আমি বলছি না যে, যেকোনো অভিজ্ঞতা যেকেউ দাবি করে তা তাসাউফ। অর্থাৎ—সুফিবাদের কিছু শর্ত আছে, এবং এই শর্তগুলো অবশ্যই পূরণ হতে হবে। অন্যভাবে বলতে পারি—চিন্তা কোনো বস্তুর সঙ্গে আপনার সম্পর্ককে আদর্শিক সম্পর্ক বানায়। আর আমলের মাধ্যমে ‘অনুসরণমূলক’ সম্পর্ক স্থাপন করা প্রয়োজন পড়বে আপনার। কারণ ‘অনুসরণমূলক’ সম্পর্ক আর বুদ্ধি দ্বারা সৃষ্ট কোনো কিছুর সঙ্গে আদর্শিক সম্পর্ক এক নয়; বরং ভিন্ন বিষয়। আর আমলের জন্য প্রয়োজন অনুসরণ। এই কারণে আমি আমলের পথে এসেছি। যেমন ধরুন, একটি অদ্ভুত যন্ত্র তৈরি করা হলো। যেকোনো মানুষকে এটা বলা যাবে না যে, আসুন এটি ব্যবহার করুন। বরং সেখানে একজন নির্দেশক থাকতে হবে, যিনি যন্ত্রটি কীভাবে ব্যবহার করবে তা বর্ণনা করবেন। সুতরাং মানুষের পক্ষে একাকী আমলের দিশা পাওয়া সম্ভব নয়। বরং এর জন্য একজন উস্তাদের প্রয়োজন হবে, যিনি তাকে আমলের দিশা দেবেন। তাই আমি আমলের ক্ষেত্রে শিষ্যত্ব গ্রহণে শরণাপন্ন হয়েছি, যেভাবে তাত্ত্বিক জ্ঞানের জন্য শিক্ষকের শরণাপন্ন হয়েছিলাম।

আবদুর রহমান নাসের: আশির দশক থেকে এখন পর্যন্ত তাসাউফ আপনার কাছে দর্শনেরই একটি ব্যবহারিক প্রয়োগ?

তহা আবদুর রহমান: ঠিক তাই। দর্শন তার যে প্রায়োগিক দিকটি হারিয়ে ফেলেছিল, আমি তা যোগ করেছি মাত্র। এমন আমল যা বুদ্ধিবৃত্তির উপকার করে। আমল ছাড়া দার্শনিক চিন্তার প্রসারে আর কিছুই উপকারে আসে না। অবশ্য সে আমল হতে হবে অনুসরণমূলক আমল। তাত্ত্বিক কল্পনাগত সম্পর্ক নয়; বরং অনুসরণমূলক সম্পর্ক হতে হবে। কারণ প্রকৃতপক্ষে অনুসরণ ছাড়া আমল প্রতিষ্ঠা হয় না। যারা মনে করেন অনুসরণ ছাড়া আমল সম্ভব, তারা মিথ্যা বলছেন।

আবদুর রহমান নাসের: আমরা কথা বলছি নৈতিক দর্শন নিয়ে। এটিই আপনার বিশেষায়িত ক্ষেত্র। এই বিষয়েই আপনি লেখালেখি করেন এবং এখানে সমালোচনা করেন এবং এই বিষয়কেই ঘিরে আপনার কর্মতৎপরতা। এখন আমাদের আলাপ চলছে তাসাউফ নিয়ে। আর আপনি এর আগে ইমাম আবু হামেদ আল-গাজালি এবং ‘ইহইয়াউ উলূমুদ্দিন’ এবং তিনি কেমন ছিলেন এবং মুসলিম বিশ্বের অন্যতম ব্যক্তিত্ব হিসেবে নৈতিক দর্শন বা ইসলামি ঐতিহ্যে তাঁর কী অবদান ছিল ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করেছেন। অনুষ্ঠান শুরুর আগে আমরা এ বিষয়ে কথা বলছিলাম। তখন আপনি বলেছিলেন ইসলামি ঐতিহ্যে নৈতিক দর্শনের ওপর তেমন বেশি কাজ হয়নি। আপনি কি ব্যাখ্যা করবেন কীভাবে এই খাতে কাজ হয়নি?

তহা আবদুর রহমান: এই বিষয়ে আমি নিজেই হতবাক। আমি আপনাকে একটি গোপন রহস্য বলব? হুঁ। এমন এক রহস্য যা কেউ উন্মোচন করতে পারেনি। সেই রহস্যটি হলো ‘অনুকরণ’। আমার এই প্রস্তাবনায় যারা নৈতিক দর্শন নিয়ে কাজ করেন, তাদের অনেকেই হইচই করবেন। ইসলামি নৈতিক দর্শনের বিকাশে প্রধান বাধা ছিল এরিস্টটলের নৈতিক দর্শনের অনুবাদ ও অনুকরণ। এরিস্টটলের দর্শন আরবিতে অনুবাদ হয়ে ইসলামি চিন্তাধারায় এতটাই প্রভাব ফেলেছিল যে, এটি প্রকৃত ইসলামি নৈতিকতাকে আড়াল করে দিয়েছিল। আপনি বলতে পারেন—কীভাবে? এটি দার্শনিক তো বটেই, ফকিহ, মুতাকাল্লিম—সবার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।

মাসকুয়াহর বই থেকে শুরু করে ইবনে রুশদ, আল-গাজালি প্রমুখের কাছে দেখবেন, এমনকি ইবনে তাইমিয়া পর্যন্ত—সবাই গ্রিক দর্শনের সেই চারটি প্রধান গুণের (সাহস, ন্যায়বিচার, সংযম এবং সম্ভবত প্রজ্ঞা) কথা বলেছেন। এই গুণগুলো প্লেটো নির্ধারণ করেছিলেন এবং এরিস্টটল দার্শনিক রূপ দিয়েছিলেন। এই গ্রিক আদর্শগুলো আরব সভ্যতায় স্থানান্তরিত হয়ে ইসলামি নৈতিকতার ওপর প্রভাব ফেলে। আপনি সর্বদা সাহস, সংযম, বুদ্ধি, সম্ভবত প্রজ্ঞা—এটিকে তারা আকল (বুদ্ধি) বলে—সেগুলো নিয়ে আলাপ হতে দেখবেন। অবশ্য এগুলো মূল্যবোধ, ঠিক আছে। কিন্তু শাখাগত মূল্যবোধ; ইসলামের মৌলিক ও প্রধান মূল্যবোধ নয়।

আবদুর রহমান নাসের: ইসলামের মূল মূল্যবোধ কী?

তহা আবদুর রহমান: ইসলামের মৌলিক মূল্যবোধ হলো—তাকওয়া (খোদাভীতি), আমানত (বিশ্বাসযোগ্যতা) এবং সিদক (সততা)। এগুলোই হলো মূল ভিত্তি। তাদের লেখায় এই মৌলিক মূল্যবোধের সন্ধান পাওয়া যায়নি। আপনি দেখবেন ফকিহরা যখন কথা বলতেন, তারা ‘সংযম’ ইত্যাদির কথা বলছেন। অবশ্য এগুলো আখলাক ও নৈতিক মূল্যবোধ; কিন্তু সেগুলো শাখাগত গুণাবলি। উদাহরণস্বরূপ সেগুলো তাকওয়ার একটি শাখা বা উপগুণ। তারা এগুলোকে মূল গুণ মনে করতেন। বাস্তবে তা মৌলিক নয়; বরং এগুলো ইসলামের শাখাগত গুণাবলি। এই গ্রিক নৈতিক পর্দা তাদেরকে ইসলামি নৈতিক মূল্যবোধগুলো স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করার পথে বাধা সৃষ্টি করেছে। আর এই মূল্যবোধগুলোকে আমরা নৈতিকতার মূল ভিত্তি ও মৌলিক মূল্যবোধ হিসেবে গণ্য করতে পারি।

আবদুর রহমান নাসের: গাজালির মতো আর কেউ নৈতিক দর্শনে অবদান রেখেছেন?

তহা আবদুর রহমান: গাজালিও অনুকরণ করেছেন। এমনকি ‘ইহইয়া’তে তিনি সাহসকে এমনভাবে পেশ করেছেন যেন এটি মৌলিক মূল্যবোধ। শালীনতা নিয়ে কথা বলেছেন যেন এটি মূল নৈতিকতার একটি। তবে তাঁর অবদান অস্বীকার করছি না। কিন্তু প্রকৃত বিন্যাস—কোনটা মৌলিক, কোনটা শাখাগত—এ ব্যাপারে আমরা কথা বলছি। ধরুন—ঈমান। ঈমান কি নৈতিকতা ও মূল্যবোধসমূহের সর্বাগ্রে অবস্থিত নয়? কিন্তু এটি অবহেলিত। এমনও হতে পারে তিনি ঈমানকে মূল্যবোধই মনে করেন না। পুণ্যগুণ মনে করেন না। এটিকে অন্তশ্চেতনা, আকিদা-বিশ্বাস হিসেবে দেখেছেন শুধু। ব্যাস। অথচ ঈমানকে নৈতিক গুণাবলি ও মূল্যবোধের তালিকার সবার শীর্ষে রাখা উচিত।

আবদুর রহমান নাসের: আচ্ছা। এটা তো ছিল সাহিত্য উৎপাদন নিয়ে আলাপ। তবে আমাদের সুফিবাদের বিভিন্ন ধারা ছিল। আমার মনে হয় তারা নৈতিকতা ও আখলাকের ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়েছিল, কিন্তু তেমন কোনো সুসংগঠিত লিখিত উৎপাদন তৈরি হয়নি।

তহা আবদুর রহমান: তাসাউফ সুস্পষ্ট কোনো তত্ত্ব বা দর্শন তৈরি করেনি, তবে সাহিত্য সৃষ্টি করেছে। ভালো মানের সাহিত্য, এবং সেখান থেকে দার্শনিকের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক দর্শন বের করা সম্ভব।

আবদুর রহমান নাসের: এটাই আপনি করার চেষ্টা করেছেন?

তহা আবদুর রহমান: এখন আমার জীবনে অল্প কিছু দিন অবশিষ্ট।

আবদুর রহমান নাসের: আল্লাহ আপনাকে দীর্ঘায়ু দান করুন।

তহা আবদুর রহমান: আমি চাই আপনাদের মতো তরুণরাই এসব নির্দেশনার আলোকে কাজটা করেন। অন্তত আমি যে ফলাফলে পৌঁছেছি প্রথমে সেগুলোর উপযোগিতা যাচাই করুন। আমি যা বলেছি যদি তা সঠিক হয়, তাহলে তার ওপর নৈতিক দর্শন তৈরি করুন। বিশেষ করে এখন এর বেশ প্রয়োজন। আমি একটি উদাহরণ দিই। আমি বলেছিলাম—বার্লিন প্রাচীর যখন ভেঙে পড়েছিল, পূর্ব ইউরোপের মানুষগুলো ধর্ম এবং নৈতিকতার জন্য তৃষ্ণার্ত ছিল। যদি মুসলিমদের তখন একটি সুসংগঠিত ধর্মীয় ও নৈতিক দর্শন থাকত, তবে সেই পূর্বের মানুষগুলো ইসলামের প্রতি ধাবিত হতো। এই দেয়ালের মাধ্যমেই তাদের কাছে ধর্ম পৌঁছার রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তখন মুসলমান আর আরবরা এক উপত্যকায়, আর পুরো দুনিয়া অন্য উপত্যকায় বিচরণ করছিল।

আবদুর রহমান নাসের: এই নৈতিক দর্শনের আলোচনার সূত্র ধরে বলি, শতাব্দীর শুরুর দিকে আপনি একটি নতুন প্রকল্প শুরু করেন। আপনার একটি বই যা সম্ভবত ২০০০ সালে প্রকাশিত হয় ‘سؤال الأخلاق’। প্রসঙ্গত আপনার বইসমূহের মধ্যে এটিই আমার প্রথম পড়া। অবশ্য একটু দেরিতে পড়েছিলাম ২০১৪ সালের দিকে। কেন আপনি ‘আধুনিকতার সমালোচনা’ নামক একটি নতুন বৌদ্ধিক প্রকল্পে মনোনিবেশ করলেন? আপনি নৈতিকতা থেকে আধুনিকতার সমালোচনায় আসলেন—কেন এই পরিবর্তন?

তহা আবদুর রহমান: নৈতিক দর্শন থেকে আধুনিকতার সমালোচনার দিকে মনোযোগী হলাম কেন?

আবদুর রহমান নাসের: অর্থাৎ আপনার মূল কাজ দর্শন ও নৈতিক দর্শন। এরপর এখন আপনি আধুনিকতার সমালোচনায় রচনা করলেন আপনার এই প্রথম বইটি দিয়ে।

তহা আবদুর রহমান: আসলে আমি শুরুতে কেবল নৈতিক দর্শন নিয়ে কাজ করিনি। আমি সামগ্রিকভাবে দর্শন নিয়ে কাজ করেছি। এখানে আমি আমার পাঠক ও দর্শকদের একটি বিষয় পরিষ্কার করতে চাই—অনেক সমালোচক, বরং অধিকাংশই আমার ‘ফিকহুল ফালসাফা’ বইটির যে উদ্দেশ্য সেটার বিপরীতটা বুঝেছেন। যে পক্ষ আমার কোনো লেখার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে না তারা মনে করেছেন—দর্শন ধর্মের ভেতরে ঢুকে গেল। অন্যরা মনে করেছেন এটি কেবল একটি ‘ইসলামি দর্শন’। এখানেই শেষ। কিন্তু ‘ফিকহুল ফালসাফা’ কোনো দর্শন নয়, এটি একটি ‘বিজ্ঞান’। কারণ আমি এখানে দর্শনকে বাইরে থেকে একটি প্রপঞ্চ হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেছি। একজন সমাজবিজ্ঞানী যেভাবে সামাজিক প্রপঞ্চ পাঠ করেন এবং একজন ঐতিহাসিক ঘটনা পর্যবেক্ষণ করেন। আমি দর্শনকে বাইরে থেকে বর্ণনা করছিলাম। একজন দার্শনিক কীভাবে তাঁর ধারণা তৈরি করেন, কীভাবে যুক্তি সাজান এবং কীভাবে দাবি উত্থাপন করেন। অর্থাৎ দার্শনিক কীভাবে তাঁর দাবি উত্থাপন করেন এবং এসবকিছুর ওপর কীভাবে দলিল পেশ করেন? মোটকথা আমি দর্শনকে বাইরে থেকে বর্ণনা করতে চেয়েছি। সুতরাং, ফিকহুল ফালসাফার অর্থ হলো দর্শনের বিজ্ঞান। শুধু দর্শনের বয়ান নয়। এটি একটি বিষয়। অবশ্যই এরপর দর্শন নিয়ে কাজ হয়েছে। যেমন ‘ফালসাফাল ই’তিমানিয়া’তে এর ব্যবহার হয়েছে।

আবদুর রহমান নাসের: আচ্ছা। আপনার নিজস্ব দার্শনিক গঠনে। আমরা এই বিষয়ে একটু পরে আসছি। আপনি কেন ২০০০ সালে আধুনিকতার সমালোচনা শুরু করলেন?

মন ও মননের সফর : তহা আবদুর রহমানের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন (২য় পর্ব)

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments