মন ও মননের সফর : তহা আবদুর রহমানের বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন (১ম পর্ব)
১ম পর্বের পর…
তহা আবদুর রহমান: আসলে আপনার জিজ্ঞেস করা উচিত—কেন আমি তুরাস ও ঐতিহ্য নিয়ে লেখা শুরু করলাম। আধুনিকতার বিষয়ে যাওয়ার আগে আমি যখন আমার প্রথম দিকের বইগুলো লিখেছিলাম যেমন—দর্শনের বিজ্ঞান, যুক্তিবিদ্যা, তখন দেখলাম পাঠকরা সেগুলোর প্রতি খুব একটা আগ্রহী নন। সবার দাবি—বইগুলো খুব কঠিন, জটিল এবং পরিভাষাগুলো দুর্বোধ্য। অথচ অন্যান্য বইসমূহের প্রতি পাঠকরা ব্যাপক হারে ঝুঁকছিল। সেগুলো দর্শনের বই হিসেবেও গণ্য করা হতো। বইগুলোর প্রস্তাবনার সঙ্গে আমি একমত ছিলাম না। কারণ আমার পড়াশোনা এবং দর্শনের মূল উৎসের ব্যাপারে আমার ব্যাপক জানাশোনা থাকার কারণে আমি সেগুলোর সঙ্গে একমত হতে পারিনি। আমি ভাবলাম—এ তো বড় চ্যালেঞ্জ। বইগুলোর কারণে প্রথমত বাস্তবতা বিকৃতি হচ্ছিল। দ্বিতীয়ত এর মাধ্যমে অনেক বুদ্ধির অপচয় হচ্ছিল। হয়তো এর পেছনে কোনো খারাপ নিয়ত ছিল না। বরং যারা লিখেছেন, তাদের জ্ঞানের পরিধি ঐটুকুই ছিল। আমি মনে করলাম, এই ভুল ধারণাগুলো সংশোধন করি এবং এটি আমার দায়িত্ব। সেই সময়ে ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চলছিল—পূর্ব ও পশ্চিমে। আমি চাইলাম এই ঐতিহ্যের প্রতি ন্যায়বিচার করতে। আমি ঐতিহ্যকে পুনরায় মূল্যায়ন করতে চাই। হে আল্লাহ, এরা এই তুরাস ও ঐতিহ্যের প্রতি অবিচার করেছে, আমি সুবিচার ও ইনসাফ করতে চাই। আমি ঐতিহ্যের পুনরায় মূল্যায়নের কাজ করলাম। তবে তার জন্য আমি মার্কসবাদ বা অন্য কোনো বিদেশি পদ্ধতি ব্যবহার করিনি। বরং আমি ঐতিহ্যের ভেতর থেকেই এমন কিছু পদ্ধতি খুঁজে বের করলাম যা সেই ঐতিহ্যকে জন্ম দিয়েছিল। তাই এটির নাম দিয়েছি ‘আসল’ যা ‘আমদানিকৃত পদ্ধতি’র বিপরীত। অতএব এই ‘মূলগত প্রক্রিয়া’র ভিত্তিতেই ঐতিহ্যের মূল্যায়ন উপস্থাপন করেছি।
এরপর আমার সামনে আরেকটি চ্যালেঞ্জ এলো—আধুনিকতার চ্যালেঞ্জ। সবাই আধুনিকতার ডাক দিচ্ছিলেন। কিন্তু যখন জিজ্ঞেস করা হতো ‘আধুনিকতা বলতে আপনি কী বোঝেন?’, তারা ঠিক সেভাবে বুঝতেন, যেভাবে অন্যরা সংজ্ঞায়ন করেন। আমি বিষয়টি উল্টেপাল্টে দেখলাম। দেখলাম—আধুনিকতার দিকে এই দৃষ্টিভঙ্গির সংশোধন হওয়া দরকার। তখন আমার কাছে দুটি বিষয় পরিষ্কার হলো:
১. আধুনিকতা কোনো একটি একক জিনিস নয়, বরং অনেক ধরনের আধুনিকতা। ২. আধুনিকতা কেবল ফরাসি বিপ্লব-পরবর্তী সময়ের জন্ম নয়। বরং এটির জন্ম জাতিসত্তার জন্মের সঙ্গে হয়েছিল। প্রতিটি জাতির নিজস্ব আধুনিকতা রয়েছে। একেবারে মানুষ সৃষ্টির সময় থেকেই।
আমার কাছে যে বিষয়গুলো পরিষ্কার হয়েছে, তা হলো—প্রথমত আধুনিকতার রূপ অনেক। দ্বিতীয়ত আধুনিকতার চিন্তাটি পুরোনো। এই দুটি বিষয় সামনে রেখে আধুনিকতার মর্ম বয়ান করলাম। আধুনিকতা হলো কিছু সার্বিক মূল্যবোধের সমষ্টি যা মানবজাতি সবসময় অনুসরণ করে এসেছে। আমি দেখলাম মানবজাতি তার যাত্রার শুরু থেকে আজকের এই দিন পর্যন্ত এই মূল্যবোধগুলো মেনে আসছে। যেমন, পৃথিবীর প্রতিটি প্রাচীন জাতি ন্যায়বিচার, সত্য এবং সততা ইত্যাদির মতো মূল্যবোধগুলোর কথা বলেছে। আমি সেসব মূল্যবোধের কথা বর্ণনা করেছি। যেমন—সামগ্রিকতা, ইত্যাদি। সবগুলো মূল্যবোধের কথা সকল জাতি—অন্তত আমার জানা জাতিসমূহের ইতিহাসের সকল জাতি—বলেছে। সুতরাং স্বয়ং ইসলামেরও আধুনিকতা ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে ইসলামের নিজস্ব একটি ‘আধুনিকতা’ ছিল। তাই আমি আধুনিকতার ‘আত্মা’ এবং তার ‘প্রয়োগ’-এর মধ্যে পার্থক্য করেছি। প্রয়োগ আলাদা হতে পারে, কিন্তু আত্মা এক। এই তত্ত্বের ওপর ভিত্তি করেই আমি আমার পরবর্তী কাজগুলো করেছি।
আবদুর রহমান নাসের: আপনার একটি বইয়ের কথা মনে পড়ছে—’রুহুল হাদাসা’। এখানে একটি সামগ্রিক মূলনীতির দিকে গিয়েছেন যে, আধুনিকতা কী, এবং কোন কোন মৌলিক নীতি ও মূল্যবোধগুলো আধুনিকতার প্রতিনিধিত্ব করে।
তহা আবদুর রহমান: সেই মূল্যবোধসমূহ কোনগুলো তা বর্ণনা করেছি এবং এগুলোই আমি সব সভ্যতা ও সব সংস্কৃতির মধ্যে অনুসন্ধান করেছি।
আবদুর রহমান নাসের: তাহলে আমরা বলতে পারি ইসলামেরও আধুনিকতা রয়েছে।
তহা আবদুর রহমান: অবশ্যই। আজ তো রাসুলুল্লাহ (সা.) এবং খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে যে আধুনিকতা ছিল সেটি নবায়ন করা বেশ প্রয়োজন।
আবদুর রহমান নাসের: আচ্ছা। ২০১২ সালে আপনার ‘রূহুদ্দীন’ (ধর্মের আত্মা) গ্রন্থটি প্রকাশ পায়। একটি গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত হয়। এখান থেকেই আপনি ‘আমানতভিত্তিক তত্ত্ব’ সূচনা করেন। এই বিষয়ে আরও একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছেন। বলা যেতে পারে তহা আবদুর রহমানের বিশেষ দর্শনের ভিত্তিপ্রস্তর এখান থেকেই।
তহা আবদুর রহমান: নৈতিক মূল্যবোধের বাহক দার্শনিক।
আবদুর রহমান নাসের: আচ্ছা। আপনার এই বিশেষ দার্শনিক কাঠামো ‘আমানতভিত্তিক দর্শন’-এর মূল কথা কী?
তহা আবদুর রহমান: আহ।
আবদুর রহমান নাসের: যেমন দার্শনিকরা জিজ্ঞেস করেন—দর্শন কী? তেমনি আমি আপনাকে আপনার নিজস্ব দার্শনিক চিন্তা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছি: ‘আমানতভিত্তিক তত্ত্ব’ কী?
তহা আবদুর রহমান: এটি মূলত একটি নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন দর্শন, যার ভিত্তি হলো বিশ্বাসের ওপর। এটা স্বীকৃত। আমার জন্য এটি একটি মৌলিক সত্য, যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অবশ্য আমি একাধিক ক্ষেত্রে এটা দলিল দ্বারা প্রমাণ করেছি যে পৃথিবীতে এমন কোনো প্রকৃত দার্শনিক নেই যিনি বিশ্বাসী নন—তিনি তা জানুন বা না জানুন। প্রতিটি প্রকৃত দার্শনিকই বিশ্বাসী। বিষয়টি তিনি জানুন বা না জানুন। এটা আমার মত।
আবদুর রহমান নাসের: কীভাবে তিনি জানবেন না।
তহা আবদুর রহমান: কারণ তিনি যখন দর্শনচর্চা করেন, তিনি অজান্তেই অনেক ঈমানি বা বিশ্বাসগত অর্থ ব্যবহার করেন। সেগুলো তাঁর গবেষণা ও দার্শনিক চিন্তার মধ্যে অজান্তেই অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। একটি সহজ উদাহরণ দিই—একজন নাস্তিক দার্শনিক হাইডেগার। আমি আপনাদের বলে রাখি, তাঁর বইয়ে এমন কোনো কথা বা আহ্বান নেই যার মূল উৎস ধর্মে পাওয়া যাবে না। তাঁর মূলভাষ্য হয়তো ধর্মে থাকবে, কিংবা খ্রিস্টান ও ইসলামি সুফিবাদে পাওয়া যাবে।
আবদুর রহমান নাসের: আপনি ধর্ম বলতে যেকোনো ধর্ম বোঝাচ্ছেন? শুধু ইসলাম নয়।
তহা আবদুর রহমান: ধর্ম বলতে বোঝাচ্ছি—উপাসনা। অর্থাৎ এমন এক পরম শক্তির প্রতি আত্মসমর্পণ, যিনি এই মহাবিশ্ব পরিচালনা করেন এবং সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। এই চেতনাটি হাইডেগারের বইয়ে বিদ্যমান। বলা হয়—তিনি এমন এক বিশ্বাসী, যিনি নিজেকে চেনেন না। তবে উপরিদৃষ্টিতে আমার মনে হয়, তিনি তা জানেন, কিন্তু প্রকাশ্যে স্বীকার করেন না। এর প্রমাণ—তাঁর শেষের দর্শন পড়লে বুঝবেন সেখানে যে ধারণাগুলো উল্লেখ আছে, যেমন ভাষার ক্ষেত্রে তাঁর যে দার্শনিক চিন্তাগুলো যেন সুফিবাদীদের ভাষায় কথা বলছেন। তিনি ভাষার দার্শনিক বিশ্লেষণে ঠিক সেই অর্থগুলোই ব্যবহার করেছেন যা সুফিদের কাছে পাওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে তিনি এমন স্তরে উন্নীত হন, যেখানে তাঁর লেখালেখি হতো ‘আধ্যাত্মিক বিশুদ্ধতা’ বা ‘সাফা’ নিয়ে। বুঝেছেন তিনি ‘সাফা বা বিশুদ্ধতা’ নিয়ে কথা বলছেন। আর এটিকে অস্তিত্বের সঙ্গে দার্শনিক সংযোগে যুক্ত করেছেন। তাঁর এই বিষয়গুলোকেই হাইডেগারীয় দর্শন বা সৃজনশীলতা বলে অভিহিত করে পাঠ করা হয়। এমনকি নিৎশে বা অন্যান্যদের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। আমরা যারা দার্শনিক তাদের কাজ হলো এই দার্শনিকদের কথাগুলো বিশ্লেষণ করে সেই মূল উৎসগুলো বের করে আনা, যা তারা ধর্ম থেকে গ্রহণ করেছেন, কিন্তু তারা সেখান থেকেই নেওয়ার কথা স্বীকারও করেননি।
প্রথম যুক্তি হলো, দর্শন আঠারো শতকের আগে কখনো প্রকাশ্যে ধর্মের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। এই সময়ের পূর্বে দর্শন ও ধর্মের মধ্যে এমন কোনো বিচ্ছেদের ধারণা ছিল না। বরং দর্শন ও ধর্ম একে অপরকে সহায়তা করত; কখনো দর্শন ধর্মকে সেবা দিত, আবার কখনো ধর্ম দর্শনকে। উভয়ের মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান ছিল; তারা একে অপর থেকে অর্থ ও ধারণা গ্রহণ করত।
কিন্তু আলোকায়ন যুগে এসে বলা হলো—দর্শন ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন। অথচ আলোকায়নের প্রতিষ্ঠাতারাও অজান্তেই ধর্মীয় ধারণা গ্রহণ করছিলেন। আমাদের জন্য ‘কান্টের’ উদাহরণই যথেষ্ট। তাঁর দর্শন সে সময়ের খ্রিস্টীয় ধারার ‘পবিত্রতা বা শুদ্ধতার’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। যেমন, তাঁর একটি দর্শন হলো—’সৎ নিয়ত’ বা ‘ভালো উদ্দেশ্য’। এর মধ্য দিয়ে ‘নিয়ত’ মূলত ধর্মীয় ধারণা, ধর্ম থেকে নেওয়া। তাদের অনেক স্বীকৃত নীতিনৈতিকতা বিষয়কে এভাবে ব্যাখ্যা করা যাবে। তাঁর নৈতিকতা ছিল ঈমানভিত্তিক। কিন্তু তারা তাকে বুদ্ধিবৃত্তিক রূপ দিয়েছেন। এমনকি যারা ধর্ম অস্বীকার করে, তারাও কোনো না কোনোভাবে ধর্মীয় ধারণাকে বুদ্ধিবৃত্তিক পোশাকে নিজেদের লেখায় ব্যবহার করে।
আবদুর রহমান নাসের: এখন আমরা “আমানত-তত্ত্ব”-এ ফিরে আসি। এখানে প্রশ্ন হলো—আমানতের বিপরীত কী?
তহা আবদুর রহমান: এর বিপরীত হলো “অধিকারভিত্তিক মালিকানা”। অর্থাৎ, ‘আমানত’ মালিকানার বিপরীত। দেখা যায়, সপ্তদশ শতাব্দী থেকে “মালিকানা” ধারণা মানুষের চিন্তায় প্রবল হয়ে ওঠে। দেকার্ত থেকে শুরু করে। দেকার্ত বলেন: মানুষ বিশ্বকে অধিকার করে, মানুষই বিশ্বের প্রভু; বুদ্ধি বিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। এই প্রভুত্ববোধই এমন এক দর্শনের জন্ম দেয়, যা আমানতবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। অন্যদিকে সক্রেটিস বলতেন: “আমি দর্শনকে ভালোবাসি”, অর্থাৎ আমি তার ওপর আমানতপ্রাপ্ত, আমি তার মালিক নই। আমি তার প্রতি আকাঙ্ক্ষা অনুভব করি। আকাঙ্ক্ষা বা আগ্রহ আমানত। তাঁর কথার অর্থ—আমি দর্শনের ইচ্ছা করি, তাকে অধিকার করি না। বিষয়টি তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন। আমি দর্শন অধিকার করি না, কেবল এর ইচ্ছা করি। এর অর্থ দাঁড়ায়—তাঁর সঙ্গে দর্শনের সম্পর্ক হলো আমানতের সম্পর্ক। অথচ আমরা দেকার্তকে পড়লে দেখি—এক ধরনের পূর্ণ মালিকানাভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তি, যেখানে জ্ঞানকে শুধুমাত্র অধিকার করার মাধ্যমেই বোঝা হয়। সেখানে “আমানত” ধারণা অনুপস্থিত।
আবদুর রহমান নাসের: আমানতের ধারণা হলো—মানুষ মালিক নয়, বরং আমানতদার।
তহা আবদুর রহমান: মানুষ আমানতদার, মালিক নয়। তার কাছে যা কিছু আছে, সবই একেকটি আমানত। তাকে যা কিছুই প্রদান করা হয়, সবই আমানত বা গচ্ছিত সম্পদ। সেগুলো ব্যবহার করার অধিকার আছে। আর আপনি যে সেগুলো ব্যবহার করছেন, তাও এক ধরনের আমানত। মানুষের কাছে যাই আছে, তা আমানত। এটাই ‘ই’তিমান’-এর মর্ম।
আবদুর রহমান নাসের: সবকিছু আল্লাহর মালিকানাধীন।
তহা আবদুর রহমান: এজন্য পৃথিবীকে উল্টে দেওয়ার প্রয়োজন নেই; বরং কিছু ব্যবহারের সময় আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা প্রয়োজন। আমরা যেন অনুভব করি যে আমরা কিছুরই মালিক নই, বরং সবকিছুর আমানতদার। তবে এর অর্থ এই নয় যে, আপনি সবকিছুর সঙ্গে সম্পর্কটাই পরিবর্তন করে জিনিসপত্র ত্যাগ করবেন এবং তা থেকে বিমুখতা প্রকাশ করবেন। না না, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং যত বেশি আপনি কোনো কিছু নিজের কাছে রাখবেন, তত বেশি তার প্রতি দায়িত্বশীল হবেন। কারণ “আমানতবোধ” দায়িত্ববোধের জন্ম দেয়। যা কিছুই আপনার কাছে গচ্ছিত রাখা হয়, সবকিছুর জন্য আপনি জবাবদিহি। অন্যদিকে “মালিকানা” ধারণায় দায়িত্ববোধ কমে যায়। আপনি সেগুলো এমনভাবে ব্যবহার করবেন যেন আপনার মালিকানাধীন। আপনার যা ইচ্ছা তা করবেন। আর যেন আপনি নিজের কর্মের জন্য দায়ী নন। কিন্তু আমানতের ক্ষেত্রে দায়িত্ববোধ সবসময় জাগ্রত থাকে।
যদি আমরা প্রতিটি বস্তু ও জীবের সঙ্গে এই উপলব্ধি নিয়ে আচরণ করি, তাহলে আমরা প্রতিটি কাজে নিজেদের দায়িত্বের ব্যাপারে সদা সচেতন থাকব। আজ এই নৈতিক দিকটিই অনুপস্থিত।
আবদুর রহমান নাসের: এই নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আপনি আধুনিকতার সমালোচনা করেছেন।
তহা আবদুর রহমান: ঠিক তাই। নৈতিকতার প্রাসঙ্গিকতা এখানেই। কারণ এই দায়িত্ববোধ থেকে নৈতিকতার জন্ম।
আবদুর রহমান নাসের: আমানত-তত্ত্বের ক্ষেত্রে একটি প্রশ্ন। আমার মনে পড়ছে, এ বিষয়ে একটি বইয়ের শিরোনাম ছিল—আল-ফিকহ আল-ই’তিমানী এবং আল-ফিকহ আল-ই’তিমারী বা এ রকম কাছাকাছি কিছু। সেখানে ফিকহ-সম্পর্কিত ঐতিহ্যগত (তুরাসি) চিন্তাপদ্ধতির সমালোচনা করা হয়েছে। যদি এই বিষয়ে কিছু বলতেন।
তহা আবদুর রহমান: আচ্ছা। ফিকহ আল-ই’তিমান এবং ফিকহ…-এর মধ্যে পার্থক্য? প্রথমত প্রচলিত ফিকহকে সাধারণত আদেশ-নিষেধের সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়। আপনার সঙ্গে ফিকহের সম্পর্ক বা ফিকহের সঙ্গে আপনার সম্পর্ক একটি বাধ্যবাধকতার সম্পর্ক। আল্লাহ এই সম্পর্কটি বাস্তবায়নে আপনাকে বাধ্য করেছেন। আমি বলব না ফিকহের বাস্তবতা এটির চেয়ে অনেক দূরে। তবে কোরআন থেকে যেভাবে বুঝেছি সে হিসেবে আমার মতে, ফিকহের পরিধি এর চেয়েও বিস্তৃত। আপনি প্রশ্ন করতে পারেন: উস্তাদ তহা, আপনি কীভাবে বলেন যে, সম্পর্কটি বাধ্যতামূলক সম্পর্ক নয়? আদেশ-সম্বলিত সম্পর্ক কীভাবে বাধ্যতামূলক সম্পর্ক নয়? আমরা কোরআন পড়লে দেখব—আল্লাহ যখনই কোনো আদেশ বা নিষেধ দেন, তার আগে তিনি বান্দার ওপর তাঁর নিয়ামতের কথা স্মরণ করিয়ে দেন। এর অর্থ হলো—যেহেতু আমি তোমাকে নেয়ামত দান করেছি, ফলে আমার সঙ্গে তোমার সম্পর্কটি হবে “চুক্তি” বা “অঙ্গীকারভিত্তিক সম্পর্ক”। আমি তোমাকে যে আদেশটা দেব, সেটা পালন করতে তুমি ওয়াদাবদ্ধ। সুতরাং, আদেশভিত্তিক সম্পর্ক বস্তুত আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকারভিত্তিক সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ক বাহ্যিক জবরদস্তি নয়, বরং অভ্যন্তরীণ বাধ্যবাধকতা যার ভিত্তি ঈমান। এটিকে যদি অঙ্গীকারসমূহের প্রেক্ষাপটে দেখি যেমন পবিত্র কোরআনে এসেছে, তাহলে শুধু সেগুলো পাঠ করলেই অনেকটা যথেষ্ট হবে।
আমার বিশ্বাস এবং আমি বলে থাকি—কোরআন যতখানি আদেশ ও বিধানগ্রন্থ নয়, তার চেয়ে বেশি “অঙ্গীকারের গ্রন্থ”। কিন্তু গবেষকগণ এই অঙ্গীকারের দিকটি উপেক্ষা করে শুধু বিধানগুলোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
কেন এমনটি হয়েছে? কারণ তারা কেবল হুকুম (বিধান) কোথায় আছে, সেটাই খুঁজতেন; তারপর সেই হুকুমটিকে তার অঙ্গীকারভিত্তিক প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে নিতেন।
আবদুর রহমান নাসের: উদাহরণ?
তহা আবদুর রহমান: বহু বিধানই। সকল বিধান। উদাহরণস্বরূপ, বনি ইসরাইল সম্পর্কে বহু আয়াতে অঙ্গীকারের উল্লেখ রয়েছে। এমন কত আয়াত! এমনকি নবীদের সঙ্গেও অঙ্গীকারের কথা এসেছে। কোরআন তো অঙ্গীকারের আলোচনায় পরিপূর্ণ। যাই হোক দর্শকরা কোরআনে দেখে নেবেন; আমরা আয়াত উল্লেখ করছি না যেন আয়াতে কোনো ভুল না হয়ে যায়। আমার মতে, শরয়ী বিধানকে দুটি জিনিসের দিকে ফিরিয়ে নিতে হবে—প্রথমত, যে অঙ্গীকারের প্রেক্ষাপটে বিধানটি এসেছে; দ্বিতীয়ত, আয়াতের সেই উপসংহারের দিকে যার মাধ্যমে বিধানটি সমাপ্ত হয়েছে। আমরা দেখি, কোরআনে বহু বিধান এমন সংবাদবোধক বাক্য দিয়ে শেষ হয়, যেখানে আল্লাহর সুন্দর নামসমূহ উল্লেখ থাকে। যেমন একটা বিধানের কথা শেষ হলো, এরপর বলা হলো: নিশ্চয় আল্লাহ অন্তরের গোপন বিষয় জানেন, বা বলা হলো: আল্লাহ প্রজ্ঞাময়, ইত্যাদি। সুতরাং কোনো বিধান বোঝা বা সেখান থেকে মাসআলা নির্গত করা উচিত সেই সমাপ্তবাক্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে। সুতরাং, অঙ্গীকার-প্রেক্ষাপট ও সমাপ্তবাক্যের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে ফিকহকে নতুনভাবে পাঠ করা দরকার। যদি আমরা এই প্রেক্ষাপটসমূহ মেনে কোরআন অধ্যয়ন করি, তাহলে আমাদের সামনে অনেক দিগন্ত উন্মোচিত হবে এবং এটা প্রতীয়মান হবে যে, ঐশী বিধানাবলি মানুষেরই নির্বাচিত। এর অর্থ কী? এর অর্থ হলো—এটি মানুষের সঙ্গে আল্লাহর অঙ্গীকারভিত্তিক সম্পর্ক। মানুষ এই অঙ্গীকারের ভিত্তিতে এটি বাছাই করেছে। সে বেছে নিয়েছে—আল্লাহর যা ইচ্ছে তা তিনি মানুষকে আদেশ করুন, তাঁর যা ইচ্ছে তা নিষেধ করুন। ফলে শরিয়তের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হবে মুক্তির সম্পর্ক, শৃঙ্খলিত করার সম্পর্ক নয়। শরিয়ত মানুষকে মুক্ত করে, আবদ্ধ করে না।
আবদুর রহমান নাসের: আনুমানিক ২০১৭ সাল থেকে একাধিক বইয়ের একটি সিরিজ বের হয়। যেগুলোর মাধ্যমে আপনি আমানতভিত্তিক তত্ত্বকে বাস্তবতায় প্রয়োগের চেষ্টা করেছেন। বিশেষ করে ‘ছুগুরুল মুরাবেতা’ গ্রন্থটি নিয়ে একটু আলোচনা করতে চাই। কারণ পূর্বের কাজগুলো ছিল বেশি তাত্ত্বিক। এই বইয়ে আপনি সেই (আমানত-দর্শন) চিন্তাকে বাস্তব দুনিয়ার ওপর প্রয়োগ করেছেন। এই বইয়ে আপনি উম্মাহর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেছেন, তাই অনেক আলোচনা-তর্কও উঠেছিল। এই বইয়ে আপনার সমালোচনার ভঙ্গি ছিল শক্তিশালী। কেন এই তাত্ত্বিকতা থেকে বাস্তবতায় নেমে আসলেন?
তহা আবদুর রহমান: যখন আমি এই তত্ত্বের ভিত্তি স্থাপন করি, তখন সেটিকে কিছু নীতি ও মূল্যবোধের কাঠামোয় নির্ধারণ করেছিলাম। পাঠকদের কাছে এটি এমন এক তত্ত্ব মনে হয়েছিল, যা বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে—একেবারে আদর্শবাদী। কারণ বাস্তবতা তো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেগুলো কিছু নীতি ও মূল্যবোধের সমষ্টি। আর মূল্যবোধ সাধারণত আদর্শ হয়। আর বাস্তবতা আদর্শ নয়। তাই এই বইয়ে আমি দেখাতে চেয়েছি যে “আমানত-তত্ত্ব” একটি তাত্ত্বিক কাঠামো হলেও এটি দিয়ে ইতিহাসকেও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। এটি শুধু বাস্তবে প্রয়োগযোগ্যই নয়, বরং মূল্যবোধ যেমন বাস্তব ঘটনাকে ব্যাখ্যা করে, তেমনি ইতিহাসকেও ব্যাখ্যা করতে পারে। সাধারণভাবে ইতিহাসকে কেবল ঘটনাবলির মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়; কিন্তু আমি দেখিয়েছি, মূল্যবোধও ইতিহাস ব্যাখ্যার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এই কারণে “ছুগুরুল মুরাবাতা” আমার জন্য ছিল একটি মূল্যবান সুযোগ। এটি ছিল আমানত-তত্ত্বকে বাস্তবে প্রয়োগের জন্য একটি জীবন্ত উদাহরণ। আমি এটি প্রয়োগ করেছি তিনটি সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে:
১. ইসরায়েলি–ইসলামি সংঘর্ষ ২. আরব–আরব সংঘর্ষ ৩. ইসলামি–ইসলামি সংঘর্ষ
আমি দেখাতে চেয়েছি, এই আমানত-তত্ত্বের ধারণাগুলো উম্মাহর ইতিহাসে ঘটে যাওয়া অতীত ও বর্তমানের বহু ঘটনা কীভাবে ব্যাখ্যা করতে পারে? বাস্তবে এটি ছিল বই লেখার জ্ঞানিক কারণ। তবে এর পেছনে একটি আবেগিক কারণও ছিল। কারণটি হলো, যখন আরব বিশ্বে ইসরাইলকে গ্রহণের বিষয়টির স্বাভাবিকীকরণ শুরু হলো এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যা করার করলেন—যে বিষয়গুলো সম্পর্কে আমরা অবগত। তখন আমি অনুভব করলাম, উম্মাহর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে তাদের পবিত্র স্থানসমূহে যে অধিকার এবং নিজের ভূমিতে তাদের যে অধিকার তা নিয়ে। এটি ছিল আবেগগত কারণ, যার ভিত্তি হলো ঈমানের প্রতি ভালোবাসা, মুসলিম ও পবিত্র স্থানসমূহের প্রতি দায়বোধ। এই সংবেদনশীলতা থেকেই আমি বইটি লিখেছি। তখনকার ঘটনাবলির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থেকেই এটি রচিত হয়েছে। আজ হয়তো তার অনেকটা অতিক্রম করে এসেছি। তবে আজকের বাস্তবতা হয়তো আরও কঠিন, আরও ভয়াবহ। আমার পরবর্তী লেখায় সেই প্রাণ ছিল যা “ছুগুরুল মুরাবাতা” লেখার সময় ছিল। যদিও পরের লেখাগুলো “আশ-শাররুল মুতলাক বা পরম মন্দ” নামক দিগন্তে উড্ডয়ন করছিল। সুতরাং, “পরম মন্দ” নিয়ে আমার যা লেখালেখি তা মূলত “ছুগুরুল মুরাবাতা”রই পূর্ণতা বা তারই ধারাবাহিকতা। পরম মন্দ বলতে এমন এক মন্দকে বুঝিয়েছি, যে মন্দ অসংখ্য রূপে রূপান্তরিত হয় যে এর দ্বারা সৃষ্ট ঘটনা সম্পর্কে অনুমান করা কঠিন। যদি আয়ু দীর্ঘ হয় তাহলে এ বিষয়েও একটি পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ লিখতে চাই।
আবদুর রহমান নাসের: এই প্রশ্নটি ‘আমানত-তত্ত্ব’কে বাস্তবতার ওপর প্রয়োগের জন্য যেসব বই রচনা করেছেন সে সম্পর্কেই। এই মুহূর্তে আমি পড়ছি “আত-তহাদ্দিয়াতুল আখলাকিয়্যাহ ফি সূরাতিল ইত্তিসালি ওয়াস-সূরাহ”—যদি এই বই সম্পর্কে কিছু বলতেন? কেন আপনি ছবি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ালেন?
তহা আবদুর রহমান: প্রথমত আমার কাছে স্পষ্ট হয়েছে যে, ছবির কিছু আপদ রয়েছে। যে আপদগুলো মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক এবং মানুষের সঙ্গে আল্লাহর সম্পর্ক—উভয়ের ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। আমার মতে ছবি এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে যে, এটি মানুষের পরস্পর সম্পর্ক নষ্ট করে। সাধারণত মানুষের ধারণা—ছবি যোগাযোগ বাড়ায়, কিন্তু বাস্তবে এটি অনেক সময় বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি করে। মৌলিকভাবে এটাই ছিল আমার ধারণা। আপনি বলতে পারেন—কীভাবে? আপনি যেকোনো স্থানে যান, দেখবেন প্রত্যেকেই নিজের মোবাইলে ডুবে আছে। যেন একজনের জগৎ অন্যজনের জগৎ থেকে পৃথক। কেন এমন হলো? কারণ ছবি মানুষকে তার পাশের জন থেকেও বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। সুতরাং বলা যায় ছবি যত না মানুষকে যুক্ত করে, তার চেয়ে বেশি দূরত্ব তৈরি করে। এর ওপর ভিত্তি করেই আমি মনে করেছি—ছবির কিছু আপদ রয়েছে। সেজন্য ছবির কয়েকটি ক্ষতিকর দিক তুলে ধরেছি: কেবল দেখার প্রবণতা, অতিরিক্ত উন্মুক্ততা, গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ।
মূলত ছবির কারণেই এই সমস্যা। এর মূল কারণ হলো, আমাদের ছবির সঙ্গে সম্পর্ক “দখল ও ব্যবহার”-ভিত্তিক, “আমানত ও দায়িত্ব”-ভিত্তিক নয়। যদি এটি আমানত হিসেবে দেখা হতো, তাহলে ছবি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ তাতে মানুষে মানুষে ও মানুষের নিজের সঙ্গে প্রকৃত সংযোগ স্থাপনে ভূমিকা রাখত। সঙ্গে আরেকটা বিষয়—ছবির আধিপত্য আমাদের অন্য ইন্দ্রিয়, বিশেষ করে শ্রবণশক্তির উপকার থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এসব কারণেই ছবির বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি।
আবদুর রহমান নাসের: আচ্ছা, এই গ্রন্থে আপনি বলেছেন—”ছবি” বা “চিত্র”-এর ধারণা তার ব্যাপক অর্থে ইসলামি সভ্যতা থেকে উৎসারিত নয়; বরং এটি এসেছে অন্য কোনো বৌদ্ধিক কাঠামো থেকে। সেই কাঠামোর সঙ্গে ছবির সম্পর্ক নিয়েও আপনি আলোচনা করেছেন। অনুগ্রহ করে সহজভাবে আমাদের বুঝিয়ে বলুন—এই ধারণাটি কী? কীভাবে বলা যায় যে “ছবি” ইসলামি সভ্যতার নিজস্ব উৎস থেকে আসেনি?
তহা আবদুর রহমান: দর্শনশাস্ত্রের ইতিহাসের শুরু থেকেই জ্ঞানের ক্ষেত্রে “দৃষ্টি”কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন ভাষায় ‘চিন্তা’ বোঝাতে যেসব ধারণা ব্যবহৃত হয়, দেখা যায় সেগুলোর মূল অর্থ দৃষ্টিশক্তি বা দেখা। এমনকি আরবি ভাষাতেও ‘নজর’ শব্দটি ‘বৌদ্ধিক চিন্তন’ বা মানসিক পর্যালোচনার অর্থ গ্রহণ করেছে গ্রিক ধারণার প্রভাবে। এভাবে ‘দৃষ্টি-দর্শন’কে উপলব্ধির অপরাপর উপায়গুলোর ওপর প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। দেখাকেই জ্ঞানের ভিত্তি এবং উপলব্ধির মূল বলে ধরা হয়েছে। এই দৃষ্টিকেন্দ্রিকতার আধিপত্যই শেষ পর্যন্ত এমন অবস্থার জন্ম দিয়েছে, যেখানে ছবি বা দৃশ্যরূপ অন্যান্য উপলব্ধিগত মাধ্যমের ওপর কর্তৃত্ব বিস্তার করেছে। অন্যদিকে ধর্মের গণ্ডির বাইরে “শ্রবণ”-এর তেমন আর গুরুত্ব রইল না। ‘শ্রবণ’ অর্থ আপনি কোনো জিনিস দেখছেন না, বরং ঐ জিনিস সম্পর্কে সংবাদ পাচ্ছেন। ‘দৃষ্টির’ বিবেচনায় এই সংবাদই নিজ মূল্য হারিয়ে ফেলেছে। আমি যখন “ছবির আধিপত্য” বলি, তখন বোঝাতে চাই—যেন আমরা শ্রবণকে ভুলে গেছি। আর শ্রবণকে ভুলে যাওয়া মানে ওহিকে ভুলে যাওয়া; অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্কের সূত্রকে ভুলে যাওয়া। ফলে দৃষ্টি যেন আল্লাহর সঙ্গে সেই সম্পর্কের স্থলাভিষিক্ত হয়ে বসেছে। অথচ আমরা আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা’আলাকে দেখতে পারি না, কিন্তু তাঁর বাণী শুনতে পারি। সুতরাং ছবির এই আধিপত্য মানুষের শ্রবণশক্তিকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, ওহি ও অন্য যে সত্য শ্রবণ করা উচিত, তা শোনার ক্ষমতাই ক্ষীণ হয়ে যায়। অতএব, ছবির পাশাপাশি শ্রবণের মর্যাদা পুনরুদ্ধার হওয়া প্রয়োজন। কারণ শ্রবণই হলো ঐশী সম্বোধনের সঙ্গে আমাদের সংযোগের পথ। পক্ষান্তরে দৃষ্টি আমাদের যোগাযোগের মাধ্যম নয়। এটি শুধু চারপাশের সৃষ্টিজগৎ নিয়ে চিন্তার মাধ্যম।
আবদুর রহমান নাসের: এখানে “নজর” শব্দটি কি আরবি দার্শনিক অর্থে ব্যবহার করেছেন অর্থাৎ চিন্তন বা বুদ্ধিবৃত্তিক দৃষ্টি বোঝাতে? শুধু চোখে দেখা উদ্দেশ্য নয়?
তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ, এটি “নজর” বা চিন্তন। এ কারণেই শরিয়তকে “শোনা” (সাম’) হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে, আর বুদ্ধি হলো “দেখা” বা চিন্তা করা। তাই আমাদের উচিত “শোনার” গুরুত্ব আবার ফিরিয়ে আনা। আমি এটাকেই অত্যন্ত জরুরি মনে করি।
আবদুর রহমান নাসের: সম্প্রতি একটি বক্তৃতায় আপনি বলেছেন: “আমাদের উড়ন্ত চিন্তা থেকে স্থিত চিন্তার দিকে যেতে হবে।” এই “স্থিত চিন্তা” বলতে আপনি কী বোঝাতে চেয়েছেন?
তহা আবদুর রহমান: আসলে আমার চিন্তা ক্রমাগত পরিবর্তিত হচ্ছে—সময়ের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সঙ্গে তা বিকশিত হচ্ছে। উম্মাহর সাম্প্রতিক ঘটনাবলি আমাকে বাধ্য করেছে পূর্বের লেখাগুলোর ধারাবাহিকতায় “প্রতিরোধ” ধারণাটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে। আমি উপলব্ধি করেছি, এই ধারণার সঙ্গে আরও কিছু ধারণা যুক্ত রয়েছে, যা চিন্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। আজ আমরা যে প্রতিরোধ দেখছি, তার ভেতরে এমন কিছু ধারণা আছে যা চিন্তার বিকাশে ব্যবহার করা সম্ভব। এর মধ্যে একটি হলো “ছাগর বা প্রহরাস্থল” ধারণা। এখান থেকে “ছুগুরুল মুরাবাতা বা সীমান্তের প্রহরাস্থল”। আমার কাছে “ছাগর” হলো নির্দিষ্ট শত্রুর মুখোমুখি হয়ে নির্ধারিত স্থান প্রহরা দেওয়া। হোক তা যুদ্ধের সম্ভাবনা, কিংবা সীমান্তরক্ষা বা অন্য কোনো চ্যালেঞ্জ। ঠিক তেমনি, চিন্তারও নিজস্ব “সীমান্ত” থাকা দরকার—এমন কিছু অবস্থান, যেখানে দাঁড়িয়ে চিন্তাকে রক্ষা করা হবে, বিরোধীদের প্রতিহত করা হবে এবং সমমনা মানুষদের আকৃষ্ট করা হবে। অন্তত বিরোধীদের প্রতিরোধ করা হবে। তাই চিন্তার জন্য “প্রহরা” প্রয়োজন। এই কারণেই চিন্তার আর শুধু আকাশে ভাসমান থাকার অধিকার নেই। বরং তাকে নির্দিষ্ট চিন্তাগত অবস্থানে নেমে আসতে হবে, সেখানে অটল থাকতে হবে এবং সেখান থেকেই প্রতিরোধ চালাতে হবে—হোক তা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে, কিংবা সময়ের চ্যালেঞ্জের বিরুদ্ধে। তাই আমি বলেছি—আজকের বিশ্বে এবং উম্মাহর ওপর নেমে আসা চ্যালেঞ্জগুলোর প্রেক্ষাপটে চিন্তাকে আর ভাসমান রাখা যায় না; বরং তাকে নির্দিষ্ট সীমান্ত গড়ে তুলে সেখান থেকেই এমন সব চ্যালেঞ্জের মোকাবিলায় নামতে হবে, যেগুলোর মুখোমুখি আজ উম্মাহ এবং সমগ্র মানবতা।
আবদুর রহমান নাসের: আমি জানি, এই আলোচনায় আমরা আপনার অনেক সময় নিয়েছি। তবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে। আমরা আপনার ভাবনা, বৌদ্ধিক ও দার্শনিক কর্মভুবন নিয়ে কিছুটা পরিক্রমা করার পর এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে আসতে চাই। আপনি বলেছেন, আরব-ইসলামি সংস্কৃতি এক বিশ্বজনীন সংস্কৃতি ও সভ্যতা হয়ে উঠতে পারে। কীভাবে তা সম্ভব? কীভাবে আরব-ইসলামি সংস্কৃতি নিজ সীমা অতিক্রম করে একটি সার্বজনীন সভ্যতা-সংস্কৃতিতে রূপ নিতে পারে?
তহা আবদুর রহমান: প্রথমেই বলি—এখনই সময়। আজ ইসলামের দান দেওয়ার সময়। কারণ মুসলিম বিশ্ব, বরং পুরো বিশ্ব যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি আসলে তা অনেক বড়। এসব চ্যালেঞ্জের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হতে পারলেই, এগুলোর মধ্যেই সৃজনশীল হয়ে উঠতে পারবে। তবে প্রশ্ন বাকি থাকে—এটি কোন পথে অর্জন হবে?
এই পথে অগ্রসর হওয়ার জন্য প্রথম শর্ত হলো—নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য থেকে শুরু করা। প্রথমত, মানুষের প্রকৃত স্বরূপকে বোঝা—একজন মুসলিমের কাছে মানুষ কী? দ্বিতীয়ত তার ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য থেকে যাত্রা করা।
আমার দৃষ্টিতে মানুষ মূলত একটি নৈতিক সত্তা, শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক সত্তা নয় যেমনটি বলা হয়ে থাকে। কারণ প্রাণীরাও তাদের সীমার মধ্যে বুদ্ধিসম্পন্ন। কিন্তু নৈতিকতাই মানুষকে অন্য সত্তা থেকে আলাদা করে। কেন? কেননা নৈতিকতা মূলত “মূল্যবোধ” উপলব্ধি ও বাস্তবায়নের ওপর দাঁড়িয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। এই মূল্যবোধগুলো একেকটি আদর্শ যেগুলোকে সামনে রেখে আমরা বাস্তব জীবনে চলার চেষ্টা করি। এগুলো আদর্শই থেকে যায়। আর প্রাণী এই আদর্শ কল্পনা করতে পারে না। প্রাণী বাস্তবতাকে অতিক্রম করতে পারে না। সে বাস্তবতার সঙ্গেই আটকে থাকে। বাস্তবতা থেকে আলাদা হয়ে কোনো আদর্শ কল্পনা করে আবার তা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে না। সুতরাং মানুষের বিশেষত্ব হলো—সে একটি নৈতিক-আদর্শবাদী সত্তা।
দ্বিতীয়ত, আমার মতে ইসলামের বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিকতা। বরং বলা যায়, মানুষের পূর্ণতা অর্জনের মাধ্যম এই ইসলাম। আর মানুষের পূর্ণতা হলো নৈতিক পূর্ণতা। এ কারণেই হাদিসে এসেছে: “আমি তো প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দিতে।” এখানে “মাকারিমুল আখলাক” বলতে অতিরিক্ত বা বিলাসী গুণাবলি বোঝানো হয়নি; বরং এমন মৌলিক নৈতিক গুণাবলি বোঝানো হয়েছে, যা মানুষকে পরিপূর্ণ করে তোলে। অতএব, আমাদের সামনে রয়েছে দুটি অনস্বীকার্য সত্য:
১. মানুষ একটি নৈতিক সত্তা। ২. ইসলাম একটি নৈতিক ধর্ম, মানুষের স্বভাবজাত প্রকৃতির ওপর যার ভিত্তি। স্বভাবজাত প্রকৃতিই হলো নৈতিকতা।
তাই আমাদের প্রয়োজন একটি “নৈতিক চিন্তাধারা”। নৈতিক চিন্তাধারার অর্থ কী? যে চিন্তাধারা মানবজাতির জন্য এমন কিছু মূল্যবোধ নির্ধারণ করবে, যেগুলো তারা অনুসরণ করবে, এবং যেগুলোকে এমন আদর্শ হিসেবে মেনে নেবে যা তাদের সিদ্ধান্ত, আচরণ ও কার্যক্রমকে পরিচালিত করবে। আজকের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—বিশ্ব আজ মূল্যবোধের বিপর্যয়, এমনকি মূল্যবোধের বিলোপের পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। আমরা পশ্চিমা বিশ্বে, মধ্যপ্রাচ্যে এবং সারা বিশ্বে যে ঘটনাগুলো দেখছি, তা থেকেই বোঝা যায়—মানবতা আজ শুধু নৈতিকতার প্রয়োজন আছে এমন নয়; বরং যদি ইসলামি নৈতিকতা ও মূল্যবোধ তাকে রক্ষা না করে, তবে মানবতার ধ্বংস অনিবার্য। অন্য কোনো কিছু তাকে রক্ষা করতে পারবে না। তাই আমি মনে করি—আজকের বিশ্বে ইসলামি নৈতিকতাই মানবতার একমাত্র মুক্তির পথ। আর এই নৈতিকতা গড়ে উঠতে হবে সেই প্রতিরোধের চেতনার ওপর, যা আমরা আজ প্রত্যক্ষ করছি।
আবদুর রহমান নাসের: ২০২৩ সালে আপনার নবীজির সিরাত বিষয়ে সর্বশেষ বইটি প্রকাশিত হয়েছে। এত দীর্ঘ সময় ধরে গবেষণা ও লেখালেখির পর এখন কেন আপনি সিরাত নিয়ে লিখলেন?
তহা আবদুর রহমান: অবশ্যই, যে নৈতিক উদ্বেগের ব্যাপারে বারবার বলেছি—আমাদের এমন একটি নৈতিক দর্শন প্রয়োজন যা আমরা বিশ্বের সামনে পেশ করতে পারব, যার মাধ্যমে আমরা আমাদের সমস্যাগুলো মোকাবিলা করব, আপদগুলো দূর করব, আর বিশ্বকে তার মূল্যবোধগত সংকট থেকে বের করে আনতে অবদান রাখব। শুধু সংকট নয়, বরং বর্তমানের মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শূন্যতা থেকেও। বিশ্বকে সংকট থেকে বের করায় এই অবদানের লক্ষ্যে আমি অনুসন্ধান করতে চেয়েছি—কোথায় আমি এমন নৈতিকতা খুঁজে পাব, যা মানবতাকে পথ দেখাতে পারে এবং আমাদের ওপর আসা বিপদ দূর করতে পারে। আমার কাছে যেহেতু ইসলাম সব ধর্মকে পরিপূর্ণ করেছে এবং নৈতিকতাকেও পূর্ণতা দিয়েছে, তাই এই নৈতিকতাকে আমাদের নবি ﷺ-এর জীবনচরিতে খোঁজা। তাই আমি রাসুল ﷺ-এর সিরাত নিয়ে গবেষণা করি। অবশ্য মানুষ গভীর অনুসন্ধান ছাড়াই স্পষ্ট বুঝতে পারে—সত্যবাদিতা ও আমানতদারিতা এই দুটি গুণ নবি ﷺ-এর মৌলিক বৈশিষ্ট্য ছিল, যা নবুওয়তের আগেই তাঁর মধ্যে বিদ্যমান ছিল। এই দুটি গুণ যেন তাঁর স্বভাবজাত ছিল। এমনকি এ নামেই তিনি পরিচিত ও বর্ণিত হতেন।
ভাবলাম—কীভাবে মেলানো যায়? আমি লক্ষ করলাম—সত্যবাদিতা বুদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত, আর আমানতদারিতা ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। আরও লক্ষ করলাম—সিরাতের বহু ঘটনায় নবি ﷺ মানুষকে সত্যের শিক্ষা দিয়েছেন, আবার অনেক ঘটনায় আমানতের শিক্ষা দিয়েছেন। বিশেষত মক্কায় সত্যের শিক্ষা, আর মদিনায় আমানতের শিক্ষা বেশি দেখা যায়। অর্থাৎ, নবি ﷺ প্রথমে সাহাবীদের সত্যবাদিতার ওপর গড়ে তুলেছেন, তারপর আমানতের ওপর। ফলে তারা মক্কায় সত্যবাদী মানুষ হিসেবে গড়ে উঠেছিলেন, এরপর মদিনায় তারা আমানতদার মানুষে পরিণত হয়েছিলেন। এর প্রমাণ হলো বিভিন্ন চুক্তি ও দলিল, যা দেখায় যে নবি ﷺ সাহাবীদের এই সময়ে আমানতের ওপর শিক্ষা দিতেন। এই পর্যবেক্ষণ থেকে আমার কাছে স্পষ্ট হলো—সত্য একটি মক্কি মূল্যবোধ, আর আমানত একটি মাদানি মূল্যবোধ। নবি ﷺ এই দুটিকে একত্র করেছেন এই ভিত্তিতে যে, এই দুটি মূল মূল্যবোধ, যেখান থেকে সব মূল্যবোধ শাখা-প্রশাখা হিসেবে বের হতে পারে। সত্যবাদিতার মূল্যবোধ হলো বুদ্ধির মূল্যবোধ, আর আমানতের মূল্যবোধ হলো কর্ম বা ইচ্ছাশক্তির মূল্যবোধ। এইভাবে নবি ﷺ একটি নতুন প্রজন্ম গড়ে তুলেছিলেন যেখানে কিছু মূল্যবোধ বুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত, আর কিছু ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে যুক্ত। পাঠক যদি বইটি পড়েন, তাহলে বুঝতে পারবেন। শুধু এই দুটি মূল্যবোধ দিয়েই আমাদের নতুন প্রজন্মকে গড়ে তোলা সম্ভব, যাতে তারা একটি সৎ ও উপকারী প্রজন্ম হিসেবে গড়ে ওঠে এবং মানবতা ও উম্মাহকে তার চলমান সংকট ও মূল্যবোধ ও নৈতিকতার শূন্যতা থেকে বের করে আনতে অবদান রাখতে পারে। এই ফলাফল আমাকে এই কথা বলতে উদ্বুদ্ধ করেছে—হয়তো এমন একটি দিন আসবে, যখন শিক্ষাবিদরা এবং ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম এই দুটি মূল মূল্যবোধের (সত্যবাদিতা ও আমানত) গুরুত্ব বুঝবে এবং এমন শিক্ষামূলক ও ব্যবহারিক কর্মসূচি তৈরি করবে, যা শিক্ষার্থীদের এই দুটি গুণ অর্জনে সহায়তা করবে। সমস্ত মূল্যবোধ একসঙ্গে শেখানো সম্ভব না হলেও এটি উপকারী হবে; কারণ বাকি মূল্যবোধগুলো এই দুটি থেকেই উৎপন্ন হতে পারে।
আবদুর রহমান নাসের: তাহলে সত্যের মূল্যবোধ বুদ্ধি, আর আমানতের মূল্যবোধ ইচ্ছাশক্তি?
তহা আবদুর রহমান: ঠিক তাই। যেন আমরা বুদ্ধিকে গড়ে তুলছি এবং ইচ্ছাশক্তিকেও গড়ে তুলছি। সুতরাং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ এই ভিত্তিতেই পুনর্গঠিত হওয়া উচিত—বুদ্ধির শিক্ষা সত্যের মাধ্যমে এবং ইচ্ছাশক্তির শিক্ষা আমানতের মাধ্যমে।
আবদুর রহমান নাসের: এই বইটি কি আপনার শেষ বই? আপনি বলেছিলেন, “পরম মন্দ” নিয়ে লিখতে পারেন। অবশ্য গাজার ঘটনাপ্রবাহ শেষ হলে ইনশাআল্লাহ। তাহলে কি মনে করেন সিরাত রচনা ও “পরম মন্দ” সম্পর্কে রচনার মাধ্যমে আপনার প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়ে গেছে?
তহা আবদুর রহমান: না, এখনো না, এখনো না।
আবদুর রহমান নাসের: কী লিখলে আপনি মনে করবেন আপনার প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়েছে?
তহা আবদুর রহমান: যদি আল্লাহ আমাকে জীবন দান করেন এবং এমন সুযোগ দেন যে আমি কোরআন নিয়ে একটি বই লিখতে পারি—যা আমার সব কাজের সুবাসিত সমাপ্তি হবে—তাহলে আমি মনে করব প্রকল্পটি সম্পূর্ণ হয়েছে। এটাই আমি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট কামনা করি—তিনি যেন তা আমার জন্য সহজ করে দেন এবং আমাকে আমার আশা থেকে বঞ্চিত না করেন, ইনশাআল্লাহ। তিনি আমাকে কখনোই তাঁর অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত করেননি।
আবদুর রহমান নাসের: ইনশাআল্লাহ, তিনি আপনাকে এবং আমাদের—আপনার পাঠককেও—এ ধরনের কাজ থেকে বঞ্চিত করবেন না। আল্লাহ আপনাকে সুস্থতা, দীর্ঘ জীবন এবং আপনার আকাঙ্ক্ষিত রচনা সম্পন্ন করার তাওফিক দান করুন। আচ্ছা, এবারের প্রশ্ন—আপনি আধুনিকতা ও পাশ্চাত্য দর্শনের সমালোচনা করেছেন। কেউ বলতে পারে—আপনি কেন নিজের সমালোচনা না করে অন্যের সমালোচনা করলেন? কেন মানুষের বিভিন্ন বিষয়ে সমালোচনা? যেমন আপনি ঐতিহ্যের সমালোচনা করছেন। আপনি এসে বললেন—আমি ঐতিহ্য মূল্যায়নের পদ্ধতিতে নতুনত্ব আনব। সেখানে কি আত্মসমালোচনার চেয়ে “অন্য”-র সমালোচনা বেশি ছিল না?
তহা আবদুর রহমান: আত্মসমালোচনা আমার লেখায় আছে, তবে তা ভিন্ন মাত্রায়। যেমন আমার বই ‘রুহুদ দ্বীন’-এ আত্মসমালোচনা আছে। যদি আপনি অধ্যয়ন করেন, দেখবেন আমি অনেক বিষয়ে আত্মসমালোচনা করেছি। তেমনি আমার বই “ছুগুরুল মুরাবাতা”তেও আত্মসমালোচনা রয়েছে। কিন্তু আমার উদ্দেশ্য আত্মসমালোচনাকেন্দ্রিক ছিল না। কারণ আমাদের আত্মপরিচয় ইতিমধ্যেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি মাত্রাতিরিক্তভাবে সমালোচিত হয়েছে। আমার উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম ও আরব মানুষের মধ্যে নতুন উদ্যম জাগানো। বিশেষ করে যে ব্যক্তি এই উম্মাহর মঙ্গল কামনা করে তার মধ্যে। অবশ্য যেখানে স্পষ্ট ভুল প্রকাশ পেয়েছে, যা মেনে নেওয়া সম্ভব নয় সেখানে সমালোচনা করেছি। যেমন আমি যখন বলি যে, ইসলামি দার্শনিকরাই কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইসলামি দর্শনকে আড়াল করে ফেলেছেন—এটি নিঃসন্দেহে কঠোর সমালোচনা। আর যারা দর্শনচর্চায় নিয়োজিত তারা সাধারণত এ কথা গ্রহণ করতে চায় না। তারা মনে করেন—দর্শন কেবল অন্যদের কাছেই আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—আমাদের কাছেও দর্শন আছে, তবে তা তাদের ধারণা ও কাঠামোর অনুরূপ নয়। দর্শন একটিমাত্র রূপে আবদ্ধ থাকতে বাধ্য নয়। আমাদের দর্শন অন্যদের দর্শনের থেকে ভিন্ন। তবে এর অর্থ এই নয় যে আমরা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। মোটেই না। আমরা একে অপরের কাছ থেকে গ্রহণ করতে পারি, তবে তা হবে সমালোচনা ও পরিমার্জনার মাধ্যমে। আমি বলি, আমি একটি নীতি গ্রহণ করেছি, যা আমার চিন্তা ও লেখালেখির প্রতিটি ক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হয়ে উঠেছে: “যা কিছু অন্যের কাছ থেকে নেওয়া তা প্রশ্নবিদ্ধ থাকবে, যতক্ষণ না তা সত্য প্রমাণিত হবে।” অর্থাৎ, আমরা যাই অন্যদের কাছ থেকে গ্রহণ করি, তা আগে সমালোচনার মুখোমুখি হবে—যতক্ষণ না তার সত্যতা প্রমাণিত হয়। এর মানে কী? এর অর্থ হলো—যখনই আমি কোনো ধারণা বা তত্ত্ব গ্রহণ করি, তখন তা সমালোচনার আলোকে যাচাই করব, যতক্ষণ না নিশ্চিত হই যে তা সত্য; এবং শুধু তাই নয়, এর পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণও থাকতে হবে। অর্থাৎ সমালোচনা চলতেই থাকবে, যতক্ষণ না তার সত্যতার পক্ষে শক্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। যদি সমালোচনা করার পরও তার সত্যতার কোনো প্রমাণ না পাই, তবে আমি তা গ্রহণ করব না। সুতরাং নীতি হলো: “প্রত্যেক বহিরাগত বিষয় প্রশ্নসাপেক্ষ—যতক্ষণ না তার সত্যতা প্রমাণিত হয়।”
এবং দ্বিতীয় নীতি: “প্রত্যেক নিজস্ব (ঐতিহ্যগত) বিষয় গ্রহণযোগ্য, যতক্ষণ না তার অসত্যতা প্রমাণিত হয়।” অর্থাৎ, আমি আমার ঐতিহ্য থেকে যা উত্তরাধিকারসূত্রে পাই, তা আমি জীবন্ত রাখি, ব্যবহার করি, যতক্ষণ না তার মধ্যে ভ্রান্তি বা দুর্বলতার দিকগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তখনই আমি তা পরিত্যাগ করি। বুঝলেন? আমি কোনো কিছুই অন্ধভাবে গ্রহণ করি না, আবার প্রমাণ ছাড়া প্রত্যাখ্যানও করি না। অন্যের কাছ থেকে যা আসে—তা আমি প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত প্রত্যাখ্যান করি; আর নিজের ঐতিহ্য থেকে যা পাই তা প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত গ্রহণ করে চলি।
আবদুর রহমান নাসের: তাহলে অন্যের সমালোচনা যেমন ছিল, তেমনি আত্মসমালোচনাও ছিল।
তহা আবদুর রহমান: হ্যাঁ, আমার লেখায় এটি রয়েছে।
আবদুর রহমান নাসের: আপনি ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ ও পরাজয়ের কথা উল্লেখ করেছেন। এরপর আপনি সম্পূর্ণভাবে বদলে যান এবং সেই বুদ্ধিবৃত্তিক কারণ বোঝার চেষ্টা করেন, যে মন-মানসিকতা আরব ও মুসলিমদের পরাজিত করতে সক্ষম হয়েছিল। এখন, ৫০ বছরেরও বেশি সময় পরে, আমরা গাজার বর্তমান যুদ্ধ দেখছি—যা ইতোমধ্যে ১৪ মাস ধরে চলছে। অতীত ও বর্তমানের মধ্যে আপনি কী পার্থক্য দেখেন? এবং এই দুই সময়ের মাঝে যে চিন্তাগত উৎপাদন হয়েছে, সেটিকে আপনি কীভাবে দেখেন?
তহা আবদুর রহমান: আমি বলব—১৯৬৭ সালের পরাজয় আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। তখন আমি মনে করতাম, এটি মূলত একটি “বুদ্ধির সংকট”—আরবি চিন্তা অনেক পিছিয়ে গেছে, আর নতুন কিছু আবিষ্কার বা সৃজনশীলতার সক্ষমতা হারিয়েছে। আমি সেই ব্যর্থতাকে বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত করেছিলাম। দীর্ঘদিন আমি এই ধারণায় স্থির ছিলাম, এবং অপেক্ষা করছিলাম—কখন এই বুদ্ধি আবার তার সৃজনশীল শক্তিতে ফিরে আসবে। অবশেষে “তুফানুল আকসা” ঘটল, এবং আমি বিস্মিত হলাম। যা দেখলাম তা হলো প্রতিরোধকারীদের মাঝে অসাধারণ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা। তারা শত্রুর মোকাবিলায় এমন সব উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা দেখিয়েছে, যা আগে দেখা যায়নি। শুধু তাই নয়, তাদের নৈতিক শক্তি এবং ঈমানি দৃঢ়তাও আমাকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। এতে আমার সেই “সংকট-ধারণা” যেন ভেঙে গেল। আমি দেখতে পেলাম—এই মানুষগুলোই আজকের দিনে ইসলামি, আরব ও মুসলিম বুদ্ধির সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিনিধি। এখন আমি বলতে পারি, আমার সেই সংকটের অনুভূতি আজ দূর হয়ে গেছে। এই সংঘর্ষের ফলাফল যাই হোক না কেন, আমি “তুফানুল আকসা”-কে দেখি ইসলামি ও আরবি চিন্তার নতুন সূচনা হিসেবে—কিন্তু এটি কেবল তাত্ত্বিক সূচনা নয়, বরং বাস্তব ও কার্যকর সূচনা। এটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন বিশ্বের সকল জাতি নতুন নেতৃত্ব, নতুন আদর্শ ও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত খুঁজছে, যা তাদের মস্তিষ্ক ও ইচ্ছাশক্তিতে ছেয়ে যাওয়া ভ্রান্ত মূল্যবোধ থেকে বের করে এনে নতুন মূল্যবোধের দিকে নিয়ে যাবে।
আবদুর রহমান নাসের: আমরা আপনার অনেক সময় নিয়ে ফেলেছি, তাই শেষ প্রশ্নে আসি। আপনার এই বিশাল গ্রন্থসম্ভার, যেখানে প্রতিটি রচনা মৌলিক ও নতুন এবং আপনি দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা কাজ করতেন। এই দীর্ঘ সময় ধরে এমন উৎপাদনশীল থাকতে আপনার দৈনন্দিন রুটিন কী ছিল?
তহা আবদুর রহমান: সত্যি বলতে, আমার প্রধান চালিকাশক্তি ছিল একটি লক্ষ্য—সর্বোচ্চ সম্ভব পরিমাণে জ্ঞান আহরণ করা। আমি চাইতাম, যদি সম্ভব হতো, আমি সব দার্শনিকের বুদ্ধিকে আমার চিন্তায় একত্রিত করতাম। আমি বিভিন্ন দার্শনিকদের বক্তৃতা ও রচনা পড়তাম, এমনকি যারা একে অপরের বিরোধিতা করেন তাদেরও। আমি সবকিছু গ্রহণ করতাম শেখার জন্য, যাতে আমার প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় যুক্তি, ধারণা ও পদ্ধতি বুঝতে পারি। আমার প্রকল্প ছিল মুসলিম ও আরব বুদ্ধিকে পুনর্জাগ্রত করা।
আবদুর রহমান নাসের: শেষ প্রশ্ন। এই কঠোর ও গভীর কাজের মধ্যে আপনার পরিবার কীভাবে এই দীর্ঘ অনুপস্থিতি ও নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততাকে গ্রহণ করেছিল?
তহা আবদুর রহমান: আমি ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে খুব কথা বলতে পছন্দ করি না, তবে সংক্ষেপে বলি: আমার পক্ষ থেকে অনেক ঘাটতি ছিল, কারণ আমি প্রায় সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন ছিলাম। আমার পরিবারের ওপর শুধু ধৈর্য ছাড়া আর কিছু ছিল না। তারা আমার সঙ্গে ধৈর্য ধরেছে, কারণ আমি তাদের যথাযথ সময়, ভালোবাসা ও সান্নিধ্য দিতে পারিনি।
আমি একটি ছোট ঘটনা বলি। মরক্কোর আঞ্চলিক ভাষায় বলা হয় “দাওয়ারা”, যার অর্থ দুটি: বেড়ানো বা কাউকে ঘোরানো। একবার আমি আমার ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। “আমি তোমাকে ঘোরাব” এর অর্থ স্পষ্ট করে মূলত আমি আমার অবহেলার পরিমাণটা বোঝাতে চাই। কারণ, আমি নিজেকে পুরোপুরি কাজে ব্যস্ত রেখেছিলাম এবং আমার সন্তানদের যথেষ্ট সময় দিতে পারিনি। তবে আমি আমার স্ত্রীর ওপর ভরসা করতাম যে, তিনি তাদের দেখাশোনা করবেন এবং আমার পক্ষ থেকে তাদের লালন-পালনে যে ঘাটতি ছিল, তা পূরণ করার চেষ্টা করবেন। আমি আপনাকে বলতে পারি, আমার সন্তানদের শৈশবে তাদের সঙ্গে বাইরে বের হওয়ার ঘটনা হাতেগোনা। সম্ভবত পুরো জীবনে দশবারের বেশি নয়। এমনকি একবার প্রথমবারের মতো আমি আমার ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বের হলাম। খুবই বিরল ঘটনা ছিল এটি। আমরা একটি বাগানে হাঁটতে গিয়েছিলাম। তখন আমি তাকে বললাম, “চলো, তোমাকে ঘোরাই” অর্থাৎ একটু হাঁটাহাঁটি করি। আমরা কিছুক্ষণ হাঁটার পর সে তার মায়ের দিকে ফিরে বলল, “আব্বু তো আমাকে ঘোরাননি?” কারণ সে “ঘোরানো” কথাটির অর্থ বুঝেছিল আক্ষরিকভাবে অর্থাৎ শুধু ঘোরানো। এটি প্রমাণ করে যে, বেড়াতে যাওয়ার ধারণাটিই তার মনে গড়ে ওঠেনি, কারণ আমি তাকে সেই অধিকারটি দিইনি, যা আমার দায়িত্ব ছিল। এটাই আমার অবহেলা। যদিও তাদের মা তাদের নিয়ে বেড়াতে যেতেন, কিন্তু আমার দিক থেকে তা যথেষ্ট ছিল না। এমনকি আমার ছেলে কল্পনাও করতে পারত না যে আমি তাকে নিয়ে বেড়াতে বের হব; বরং সে ভাবত, আমি শুধু তাকে “ঘোরাব”। আমি জানি না, আমি কি এই প্রচলিত আঞ্চলিক কথাটির অর্থ ঠিকভাবে আপনার কাছে পৌঁছাতে পেরেছি?
আবদুর রহমান নাসের: জি। বুঝতে পেরেছি। কিন্তু তারা আপনার যে কর্ম ও অর্জন, তাতে তারাও সমান অংশীদার। কারণ তারা ধৈর্য ধারণ করেছেন।
তহা আবদুর রহমান: তারা অনেক কিছু সহ্য করেছে। অর্থাৎ আমার পরিবার অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছে; আর্থিক ও মানসিক সব দিক থেকে। আমি তখন একজন সহকারী অধ্যাপক ছিলাম, কিন্তু আমার আয় এতটাই সীমিত ছিল যে, পড়াশোনার খরচ (বইপত্র ইত্যাদি), বিদেশ ভ্রমণের ব্যয়, আর দৈনন্দিন জীবনের খরচ—সব একসঙ্গে সামাল দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হতো না। তাই আমরা খুব হিসাব করে খরচ করতাম, একটু একটু করে সঞ্চয় করতাম, যেন বছরের শেষ দিকে আমি ইউরোপের কিছু নির্দিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারি অথবা সেখানে এক-দুমাস অবস্থান করতে পারি। সেখানে আমি লাইব্রেরি ও গ্রন্থাগারগুলোতে ঘুরে বেড়াতাম, যতটা সম্ভব বই সংগ্রহ করতাম, তারপর সে বইয়ের ভারী বোঝা নিয়ে নিজের দেশে ফিরে আসতাম যাতে সেগুলো পড়ে উপকৃত হতে পারি।
আবদুর রহমান নাসের: উস্তাদ তহা আবদুর রহমান, আমাদের এত প্রশ্নের ধৈর্যসহকারে উত্তর দেওয়ার জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ।
তহা আবদুর রহমান: আমিও আপনাদের ধন্যবাদ জানাই। আমাকে এই সুযোগ করে দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞ। যদিও আমি বদ্ধপরিকর ছিলাম—নিজের জীবনী নিয়ে কথা বলব না। এমনকি কখনো ভাবিনি—কোনো দিন নিজের জীবন নিয়ে বই লিখব। তবে এটি ছিল আমার জীবনীর একটা অংশ—আমার চিন্তা-জীবনী। আপনাদের প্রস্তুতি ও প্রশ্নগুলো সত্যিই প্রশংসনীয়। এই প্রশ্নগুলো সে-ই করতে পারে যে আমার বইগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এবং বইয়ে বর্ণিত বিভিন্ন ইস্যু ও সমস্যা ভালোভাবে আয়ত্ত করেছেন। এজন্য আমি কৃতজ্ঞ। ধন্যবাদ আপনাদের সবাইকে।