শহিদ ওসমান হাদির সাংস্কৃতিক লড়াই

সীমান্ত আকরাম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং সংস্কৃতিতে ভারতীয় আগ্রাসন শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে চূড়ান্ত রূপ নেয়। ভারত তাদের অর্থায়িত এজেন্টদের মাধ্যমে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও সংস্কৃতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে চেয়েছে। বিগত কয়েক দশক বাংলাদেশের মুসলমানরা এ সাংস্কৃতিক আধিপত্যের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ থেকে মুক্তি পাওয়ার আশা প্রায় হারিয়ে ফেলেছিল। ঠিক তখনই, ২০২৪-এ ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান ঘটে, যা এক বিপ্লবের রূপ নেয়। ফলে জুলাই বিপ্লব এক পরিবর্তন এনে দেয় এবং বাংলাদেশে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের কবর রচনা হয়।

এভাবে জাতি মুক্তি পায় খুনি হাসিনার স্বৈরাচারী শাসন ও ভারতের রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য থেকে। এখন দেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে, নতুন এক বাংলাদেশের। জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে সে স্বপ্নে বীজ বপন করার কাজটা নতুন করে শুরু করেছিলেন ওসমান হাদি।

সংস্কৃতির গোলামি থেকে আজাদির লড়াই জারি রেখেছিলেন ওসমান হাদি। হাদি বুঝতে সক্ষম হয়েছিলেন সংস্কৃতির আজাদি ছাড়া বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সংস্কৃতিতে কিংবা তাহজিব-তমদ্দুনে পশ্চিমা ও ভারতীয় সংস্কৃতির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন ওসমান হাদি। ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে এক অপ্রতিরোধ্য কণ্ঠস্বর ও চব্বিশের জুলাইয়ের অন্যতম আপসহীন ছিলেন তিনি। একটি গুলির বিপরীতে সপ্তাহব্যাপী লড়াই শেষে রেখে গেলেন সাহস, প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের মতো কিছু শব্দ, যার প্রতিচ্ছবি ছিলেন হাদি নিজেই। প্রার্থনারত কোটি মানুষের বিপরীতে জীবন বিনাশের হুমকিতে থেমে না যাওয়া ওসমান হাদি পাড়ি জমালেন অন্তিম পথের যাত্রায়। কেমন ছিল এত অল্প সময়ে সংস্কৃতিক লড়াই চালিয়ে যাওয়া ওসমান হাদির পথচলার গল্প?

মাত্র ৩২ বছর বয়সে, বক্তব্য, স্লোগান, কবিতা, প্রতিবাদ বা প্রতিরোধে সাহসের যে কণ্ঠ মানুষের মন থেকে আকাশের সীমানা ছাড়িয়েছে তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত শহিদী মৃত্যু। ওসমান হাদিকে নতুন করে আবিষ্কার করে ’২৪ এর জুলাই গণঅভ্যুত্থান। গণঅভ্যুত্থানে আন্দোলন, স্লোগান, মিছিল, বিদ্রোহের মিশেলে যেন নির্মিত এক পূর্ণাঙ্গ প্রাণ হাদি। জুলাইকে ধারণ করে জুলাইয়ের চেতনায় উজ্জীবিত এক সৈনিক হাদি কখনো পিছপা হননি। জুলাইয়ের সহযোদ্ধারা বিত্ত-বৈভব, অর্থ-সম্পদ ও ক্ষমতা মোহে বিপ্লবের রঙ হারালেও অবিচল ছিলেন ওসমান হাদি।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অভিজ্ঞতা ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নিজেই গড়ে তুলেছেন ‘ইনকিলাব মঞ্চ’ নামের নতুন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম। এই মঞ্চ থেকে তিনি খুনি হাসিনার ফাঁসি, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবি, জুলাই শহিদদের স্বীকৃতি, অপরাধীদের বিচার এবং ‘জুলাই চার্টার’ ঘোষণার দাবিতে রাজপথ ও সভা-সমাবেশে সরব ছিলেন। টকশো, সামাজিক মাধ্যম সবখানেই তার উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘জান দেব, জুলাই দেব না’ এমন স্লোগানে প্রতিজ্ঞা নিয়েছিলেন শরীফ ওসমান হাদি।

ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র হয়ে ওসমান হাদি বারবার গর্জে উঠেছেন অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, দুঃশাসন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে; আর লড়াই করেছেন ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে। চলমান রাজনৈতির নতুন বন্দোবস্তে কাজ করেছে সমানতালে। নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণের স্বপ্নে বিভোর ছিলেন ওসমান হাদি।

রাজধানী ঢাকার রাজনীতির কোলাহল, মিছিলের স্লোগান আর টকশোর উত্তপ্ত বিতর্ক—সবখানেই যিনি ছিলেন দৃপ্ত ও নির্ভীক। সমর্থকদের কাছে তিনি ‘জাতীয় বীর’ ও প্রতিবাদী রাজনীতির এক মূর্ত প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন ওসমান হাদি। কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না, কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গনে কাজ করেছেন।

‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ। এই বইয়ের প্রতিটি লাইন যেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে একেকটি জ্বলন্ত বারুদ। সমসাময়িক প্রেক্ষাপট, দ্রোহ আর শাহাদাতের তপ্ত নিঃশ্বাস এই বইয়ের পাতায় পাতায় গেঁথে আছে। একজন কিংবদন্তি হিসেবে তিনি যে সাহসের পরিচয় দিয়ে গেছেন, তা এই বই পড়লে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া যায়। বইয়ের শুরুতে তিনি তার পিতাকে উৎসর্গ করে বলেছিলেন, “আব্বাকে, যার ডাকে লাল হয়ে ওঠে শিমুল বাগান/ঝড়ের রাইতে আজও কানে বাজে আব্বার আজান।” তার কবিতার পঙ্‌ক্তিমালায় শেকড়ে স্নিগ্ধ সুবাস লুকায়িত আছে। আবহমান বাংলা সংস্কৃতির নির্যাস রয়েছে কবিতার পরতে পরতে।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ওসমান হাদির অন্তর্দৃষ্টি খুলে দেয়। ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্ন লালন করতে থাকেন। সব ধরনের আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষাই ছিল তার অঙ্গিকার। সাহসী ভূমিকা, ঝাঁঝালো বক্তব্য আর আপসহীন অবস্থানের কারণে অল্প সময়েই তিনি হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

স্পষ্টভাষী হাদির বক্তব্য যেমন সমর্থকদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে, তেমনি তার কিছু মন্তব্য ও ভাষা ব্যবহার নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে। তার কিছু শব্দচয়ন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। তবু তিনি পিছিয়ে যাননি। বরং আরও উচ্চকণ্ঠ হয়েছেন। বারবার হত্যার হুমকি দেয়া হয়েছে। তিনি বলেছিলেন, ‘জীবননাশের আশঙ্কা সত্ত্বেও ইনসাফের লড়াই থেকে পিছিয়ে যাব না।’

ইনকিবাল মঞ্চ হয়ে ওঠে আধিপত্যবাদবিরোধী প্ল্যাটফরম। এই প্ল্যাটফরম থেকে ভারতবিরোধী অবস্থান নিয়ে একটি সমর্থক গোষ্ঠী গড়ে তোলেন ওসমান হাদি। তিনি একইসঙ্গে ভারতীয় আগ্রাসন নিয়ে সোচ্চার ছিলেন। আধিপত্যবাদবিরোধী একাধিক কর্মসূচিও পালন করেছেন। বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে ভারতের অবৈধ ও একতরফা সকল বাঁধ ভেঙ্গে ফেলার দাবিতে ‘গণধিক্কার ও ভাঙ্গার গান’ এবং বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ভারতের পানিসন্ত্রাসের প্রতিবাদে ও আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোতে ভারতের অবৈধ বাঁধ উচ্ছেদের দাবিতে ঢাকা থেকে ত্রিপুরার ডুম্বুর বাঁধ অভিমুখে ছাত্র-জনতার লং মার্চে ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে সহযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে মাঠে নামেন তিনি।

ভারতে বাংলাদেশের সহকারী হাইকমিশনে হামলা, আজমির শরীফ দখলের ষড়যন্ত্র এবং সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের প্রতিবাদে কর্মসূচি ঘোষণা করে ইনবিলাব মঞ্চ। ভারতীয় দূতাবাস অভিমুখে ‘প্রতিবাদ র‌্যালি ও স্মারকলিপি প্রদান’ করা হয় এবং ভারতে ভয়াবহ সংখ্যালঘু নির্যাতন ও উগ্র সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানববন্ধনের আয়োজনও করেছিলেন।

একদিকে রাজনৈতিক সক্রিয়তা অন্যদিকে জুলাই অভ্যুত্থানকে বাঁচিয়ে রাখতে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড—দুটোই সমানতালে করে গেছেন ওসমান হাদি। জুলাই নিহতদের স্বীকৃতি এবং আহতদের যথাযথ চিকিৎসা দিতেও তিনি সর্বদা সোচ্চার ছিলেন। এসব কর্মকাণ্ড ওসমান হাদিকে আলোচিত করেছিল। জুলাই ঘোষণাপত্র এবং পরে জুলাই সনদ নিয়েও তিনি বক্তব্য দেন নিয়মিত, যা তাকে আলোচনায় নিয়ে আসে। জুলাইকে বাঁচিয়ে রাখতে তিনি রাতদিন পাগলের মতো মাঠে ময়দানে সরব ছিলেন। দেড় বছরে প্রায় শতাধিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছিলেন।

এর মধ্য উল্লেখযোগ্য—২৪ এর গণঅভ্যুত্থানে আহত বীর যোদ্ধাদের অতিদ্রুত চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবিতে ‘মুমূর্ষু সমাবেশ’, জুলাই ম্যাসাকারে জড়িত সকল অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করার দাবিতে রায়ের বাজার গণকবর অভিমুখে ‘গণদোয়া ও মর্সিয়া মিছিল’, সন্ত্রাসী ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ ও ফ্যাসিবাদের দোসর রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর পদত্যাগের দাবিতে ‘বিপ্লবী ছাত্রজনতার জুলাই জমায়েত’, জুলাই বিপ্লবের শ্লোগান মুছে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী স্লোগান লিখন কর্মসূচি ‘রক্তের দাগ আঁকি’, ছাত্রজনতার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত সকল মামলা প্রত্যাহার ও আটককৃতদের অনতিবিলম্বে মুক্তির দাবিতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স অভিমুখে ‘বিক্ষোভ ও পতাকা মিছিল’, শহিদ আবরার ফাহাদের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ‘জাতীয় আগ্রাসনবিরোধী দিবস’ পালন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসীদের বিচারের দাবিতে ‘সার্বভৌম মশাল মিছিল’, বাহাত্তরের বাকশালী সংবিধান বাতিলের দাবিতে ‘লাল কার্ড সমাবেশ’, গণহত্যাকারী সকল আওয়ামী সন্ত্রাসীকে অবিলম্বে গ্রেফতার ও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের দাবিতে প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন সম্মুখে ‘জুলাই যোদ্ধাদের গণঅনশন’, গণহত্যাকারী খুনি হাসিনা ও আওয়ামী লীগের বিচারের দাবিতে ‘জজবা জমায়েত’, মানববন্ধন, বিক্ষুব্ধ মশাল মিছিল, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘেরাও কর্মসূচি, বিক্ষুব্ধ আজাদী মিছিল, কফিন মিছিল, শহিদী মিছিল ইত্যাদি কর্মসূচি পালন করেছেন। জুলাই যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ স্থান রামপুরা, যাত্রাবাড়ি, উত্তরা, মিরপুর, শাহবাগে শহীদদের স্মরণে দোয়া, গণইফতার, মিলাদ মাহফিল, গণসেজদার আয়োজন করেছিলেন।

এছাড়াও তিনি ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৩ সালের শাপলার হত্যাকাণ্ডের বিচারের দাবিতে সরব ছিলেন। ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনে হত্যা এবং সীমান্ত হত্যা নিয়েও সর্বদা বক্তব্য দিয়েছেন এবং আয়োজন করেছেন ‘শহীদি সমাবেশ’-এর। এ উপলক্ষ্যে বিভাগীয় শহরগুলোতে মাসব্যাপী গণসংযোগ কর্মসূচি পালন করেছেন। তার আয়োজনের সকল কর্মকাণ্ডের ব্যানার, ফেস্টুন ও দেয়ালিকার ভাষা ও স্লোগান বাংলাদেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতিতে নতুন ধারা ও নতুন বয়ান তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। এসব কর্মকাণ্ডে তিনি মুসলিম মিল্লাতের কৃষ্টি-কালচার, রীতিনীতি তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হোন। তিনি প্রতিটি সভা-সমাবেশে ও কর্মকাণ্ডে প্রতিবাদী গান, কবিতা পাঠ, আবৃত্তি, পথনাটক ও তথ্যচিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতেন। তিনি জানতেন, বক্তব্যের চেয়েও সাংস্কৃতির কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে মানুষের বিবেককে জাগ্রত করা যায় সহজে।

ওসমান হাদি বুঝতে পেরেছিলেন যে লড়াইটা স্রেফ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে না; বরং দিল্লির আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে। এই আধিপত্যবাদের নানা ডাইমেনশনের মধ্য থেকে সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে বেছে নিয়েছিলেন তিনি। প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, বাংলাদেশি সংস্কৃতি দিয়ে মোকাবেলা করবেন ভারতীয় আধিপত্যবাদী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের। লক্ষ্য বাস্তবায়নে তিনি গড়ে তুলেন ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার। সাংস্কৃতিক গোলামি থেকে দেশকে রক্ষা করতে অমরণ প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। দেশীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় নিরলস কাজ করেছেন। নানান কার্যক্রমের মাধ্যমে জাতিকে আধিপত্যবাদ সংস্কৃতির গোলামি থেকে আজাদি এনে দিতে চেয়েছেন।

ইসলামি তাহজিব-তমুদ্দুনের আলোকে সংস্কৃতির নানান কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। নবীজির ধরায় আগমনের খুশিতে সুবহে সাদিকে নাতে রাসুলের সুরে ‘মাওলিদ মিছিল’-এর আয়োজন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শবে বরাতের রাত্তিরে নাত, কবিতা ও গজলের মজমা ‘ঝরে আবে জমজম’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ‘এলো খুশির ঈদ’ শিরোনামে চাঁদরাতে ঈদের মিছিলের আয়োজন করেছেন। মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে ভাষা শহীদদের কবর জিয়ারত ও ফাতেহা পাঠের আয়োজন করেছেন। হাজার বছরের আবহমান বাংলার সংস্কৃতিকে তুলে ধরার লক্ষ্যে পহেলা বৈশাখে নববর্ষের আনন্দ র‌্যালির আয়োজন করেছেন।

এছাড়াও তিনি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের ব্যানারে পাঠচক্র, সভা-সেমিনার, ‘কবিতার অক্ত’ নামে কবিতা পাঠের আসর, একক বক্তৃতার অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ইতিহাসের মুক্তি’  এবং ‘শাহবাগ-উত্তর জমানায় সার্বভৌম সংস্কৃতির নিশানা’ শীর্ষক আলোচনা সভা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সংস্কৃতিতে নতুন গতি আনার চেষ্টা করেছেন। ‘ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে সংবিধান প্রশ্ন : মুজিববাদ নাকি জনমুক্তি?’ নামে ‘সংবিধান সংলাপ’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সাংবিধানিক কাঠামো সম্পর্কে জনগণকে সোচ্চার করার চেষ্ঠা করেছেন। আজাদির ঐতিহাসিক তিন পর্ব ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ কর্মশালা আয়োজনের মধ্য দিয়ে তরুণদের বুদ্ধিবৃক্তিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে চেয়েছেন।

ইনকিলাব সেন্টারের ব্যানারে সাপ্তাহিক এককালাপ নামে ধারাবাহিকভাবে—‘গাঠনিক প্রক্রিয়া ও আগামী দিনের রাজনীতি’, ‘গণঅভ্যুত্থানোন্তর বাংলাদেশে সংহতির প্রাসঙ্গিকতা ও জরুরত’, ‘তুমি কে, আমি কে? বাঙ্গালাহ ও বাঙ্গালীর শুরুর গল্প’, ‘শেখ সাদীর কারিমা ইন্দো-পার্সিয়ান সাংস্কৃতিক জগত’, ‘ইন্টেরিম আমলে যাহা দেখিলাম, যাহা বুঝিলাম, যাহা বুঝিবার চাই!’ এবং ‘বাংলাদেশি-সিনেমা কেন ও কিভাবে বাংলা-সাহিত্যের চাইতে আলাদা একটা লিগ্যাসির ঘটনা?’ ইত্যাদি শিরোনামে বুদ্ধিবৃক্তি আন্দোলনের নতুন বন্দোবস্তো করতে চেয়েছেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েল পায়রা চত্বর, টিএসসিতে জুলাই গণহত্যার ১০০তম দিনে শহীদদের স্মরণে শোকগীতি, পথনাট্য, দোয়া ও শহীদি স্মৃতিকথায় ‘কান্দে আমার মায়’ শিরোনামে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। ১৬ ডিসেম্বর, শাহবাগ মোড় বিজয় দিবসে ‘বিজয়ের লাল জুলাই’ শিরোনামে অনুষ্ঠানে ‘লাল জুলাই’ গানের প্রিমিয়ার শো, ভিডিও ডকুমেন্টেশন ও শহিদী স্মৃতিকথা, স্বাধীনতা সংগ্রামের ফটো এক্সিবিশন আয়োজন করেছেন।

শরীফ ওসমান হাদির রচনায় মাবরুর রশিদ বান্নাহ পরিচালনায় ‘লাল জুলাই’ শিরোনামে লাল জুলাই ডকুমেন্টারি মিউজিক্যাল ভার্সন প্রকাশিত হয়েছে। রাহাত শান্তনু ও জনতার কবিয়ালের কণ্ঠে জুলাই গণঅভ্যাত্থানে খুনি হাসিনার কর্মকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এ গান রীতিমতো আলোড়ন সৃষ্টি করে।

তিনি ইনকিলাব মঞ্চের ব্যানারে জুলাইকে ধারণ করে দুটি বই প্রকাশ করেন। গতবছর একুশে বইমেলায় ‘জুলাইয়ের স্লোগান, গ্রাফিতি ও গাইল সমগ্র’ প্রকাশিত হয়েছে। এরপর প্রকাশিত হয় ‘জাতিসংঘ প্রতিবেদনে জুলাই অভ্যুত্থান : মানবাধিকার সংকট ও সমাধান’। প্রকাশনাদুটি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দালিলিক হিসেবে সমাদৃত হয়েছে।

ওসমান হাদি শুধু কোনো ব্যক্তির নাম নন; তিনি বিপ্লবের এক জ্বলন্ত প্রতীক। অন্যায়কে প্রশ্ন করার, ফ্যাসিবাদের চোখে চোখ রেখে দাঁড়ানোর এবং নির্ভীকচিত্তে সত্য উচ্চারণের এক সাহসী নাম। জুলাই বিপ্লবের অস্থির দিনগুলোতে যখন মানবিকতা ছাপিয়ে আতঙ্ক আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল মানুষের বিবেককে, তখন ওসমান হাদি হয়ে উঠেছিলেন দৃঢ়তার অবয়ব। মঞ্চে কিংবা মাইকের মাইক্রোফোনের সামনে তার কণ্ঠে ছিল না বিন্দুমাত্র জড়তা, দৃষ্টিতে ছিল না অণু পরিমাণ ভয় বা সংশয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্য বলার ঝুঁকি আছে ঠিকই, তবে নিশ্চুপ থাকার দায় আরও ভয়াবহ। আধিপত্যবাদ ও শোষণের বিরুদ্ধে চলার পথে অবিচল থেকে লালন করেছেন ন্যায়ের ওপর দাঁড়ানো এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন।

তার প্রতিষ্ঠিত ইনকিলাব মঞ্চ ছিল নিপীড়িত মানুষের আশ্রয়, প্রতিবাদী তরুণদের কণ্ঠস্বর, আর ওসমান হাদি ছিলেন সেই কণ্ঠের ভাষ্যকার। তার মুখ থেকে বের হওয়া শব্দগুলো ছিল আগুনের গোলার মতো; কিন্তু সে আগুন পোড়ানোর জন্য নয়, অন্ধকারকে আলোকিত করবার। তিনি বারবার বলেছেন, ‘ভয় পেলে চলবে না, ইতিহাস ভীরুদের ক্ষমা করে না।’

ওসমান হাদি বিশ্বাস করতেন, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা শুধু রাজনৈতিক দাবি নয়, এটি একটি সাংস্কৃতিক লড়াইও। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি তরুণদের যুক্ত করেছিলেন সাংস্কৃতিক আন্দোলনে। প্রতিবাদের ভাষা, স্লোগান ও সভা-সমাবেশের আয়োজনের মাধ্যমে তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে এবং ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছেন। তরুণ প্রজন্মের কাছে তিনি রেখে গেছেন সাহস, নৈতিকতা ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার উত্তরাধিকার।

ওসমান হাদির চিন্তা ও দর্শন আগামী দিনের গণতান্ত্রিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনে প্রেরণা জুগাবে। অধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এ যুগের মুয়াজ্জিন শহীদ ওসমান হাদি ফ্যাসিবাদী সাংস্কৃতিক কাঠামো ও ভারতীয় আধিপত্যেবাদের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে এই দেশের জন্য নিজের জীবনটুকু কুরবান করেছেন। আজ মুসলিমবঙ্গের খেটে খাওয়া সংগ্রামী মানুষ তথা বাংলাদেশপন্থীদের প্রতিরোধের এক সাহসী কণ্ঠস্বর শহীদ ওসমান হাদি।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments