সমুদ্রে শেকড় গজানোর মতো বিছানা আমার।
অমন অক্টোপাসের শরীর—ক্লান্তিহীন শুয়ে থাকা, অথচ ভিতরে এক গহ্বরের নীরবতা ক্রমে ভেঙে উঠছে। আমার নিঃশ্বাসে জোয়ার আসে, আবার ফিরে যায় অচেনা উপকূলে। জানালার ওপারে হাওয়া কেবল ঘুরে বেড়ায়—যেন তার ঘ্রাণে লেগে থাকা পুরোনো কোনো স্মৃতি, যে মুছে গেলেও শব্দ রেখে যায়।
আমি জানি, ঘুমের নিচে একটা বিশাল সমুদ্র ঘুরে বেড়ায়, যেখানে আমার নিজের ছায়াও ডুবে গেছে। আমি তবু হাত বাড়াই—স্পর্শ করি জল, দেখি—জল এখন আমারই হাত হয়ে উঠেছে। কখন যে নিজেকে হারিয়েছি, মনে নেই। আমি তাকিয়ে থাকি, দেখি—দেয়ালে আমার মুখ পড়ে আছে, অথচ আশ্চর্য, এই মুখটা আমার নয়! এমন এক ধরনের ক্লান্তি জমে থাকে শরীরে, যা ভাষা পায় না। ঘুমও পায় না। কেবল অন্ধকার নিজের মতো করে আমাকে ব্যবহার করে চলে—একেক রাতে একেক ছায়া হয়ে। সম্ভবত যেদিন প্রথম বুঝেছিলাম—ছায়ারও একটা রং আছে, অন্ধকারের মতো হালকা, অথচ যাকে স্পর্শ করলে পুড়ে যায়!
দিন পেরিয়ে রাত্রির ভেতর আমি প্রায়শই হেঁটে যাই—
একটা অচেনা গলির দিকে। যেখানে হাহাকারের কোনো শব্দ হয় না, শুধু গন্ধ ছড়ায়—পুরোনো বই, শরীর, চুলের নিচে জমে থাকা ঘামের মতো। আমি জানি, কোথাও একটা নদী শুকিয়ে গেছে, আর তার তলায় পড়ে আছে আমারই হাতের লেখা কয়েকটা অসমাপ্ত বাক্য—“আমি বেঁচে আছি, অথচ বেঁচে নেই…”
বিছানার এক কোণে আমি প্রায়শই তাকিয়ে দেখি—
একটা কালো রেখা চলে গেছে সোজা বালিশ পর্যন্ত, যেন কোনও মৃত রেললাইন। তার ওপারে কারও পদচিহ্ন নেই। আমার কানে তখন শোনা যায় অদ্ভুত এক শব্দ—যেন কেউ হাঁটছে দূরের কোনো সমুদ্রের তলদেশে, ধীরে ধীরে, নিঃশব্দে।
আমি ভাবি,
যে মানুষ একবার নিজের ছায়া হারায়, সে কি আর কখনও আলোয় ফিরে আসে? নাকি তার পেছনে জেগে থাকে এক অনন্ত ভ্রমণ, যা কাউকে চিনতে পারে না, শুধু চেনার অভিনয় করে যায়?
এখন আমার শরীরে প্রতিদিন কিছু ছিদ্র তৈরি হয়।
সেই ছিদ্র দিয়ে আলো ঢোকে, আবার বেরিয়ে যায় ক্লান্ত বাতাসের মতো। আমি তবু শুয়ে থাকি—
বালিশের নিচে চাপা পড়ে থাকা শিকড়গুলোর শব্দ শুনি। ওরা যেন ফিসফিস করে বলে, “তুমি এখন জল, তুমি এখন অনন্ত।”
এই যে জীবন, এই যে প্রতিদিনের ওঠানামা—
কখনও মনে হয়, আমি আসলে একটা নীরব যন্ত্র, যে প্রতিটি নিশ্বাসে অচেনা মুহূর্ত তৈরি করে। একটা পাখি উড়ে যায়, আর আমি শুনি তার ডানার নিচে জমে থাকা নির্জনতার বেদনা। অন্যদিকে একটা বাতাস ঘুরে বেড়ায়, আমি টের পাই—এই বাতাসও একসময় কারও শরীরের গন্ধ বয়ে এনেছিল।
মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করি, আর দেখি—
আমার ভিতরেও একটা ঘর আছে। সেই ঘরে কেউ নেই, শুধু দেয়ালের নড়ে ওঠা। তারা কথা বলে—বলার ভেতরে কোনও অর্থ নেই, শুধু নড়াচড়া, দুলুনি, হালকা শ্বাস। মাঝে মাঝে মনে হয়, এই পৃথিবীটা আসলে একটিমাত্র দীর্ঘ নিঃশ্বাস, যা ছেড়ে দিলে সবকিছু হালকা হয়ে যায়—এমনকি বেঁচে থাকাও!
আমার ক্লান্তি এখন জলের মতো, স্বচ্ছ নয়, বরং ঘন, সাদা, ঠান্ডা। তার ভেতর দিয়ে হাঁটতে গেলে পা কেঁপে ওঠে। ধরো, যদি একদিন সত্যিই হারিয়ে যাই, তবে কি কেউ আমাকে খুঁজবে, নাকি আমার বিছানার নীচে জমে থাকা ধুলোই হয়ে উঠবে আমার উত্তরাধিকার?
নিঃশব্দতারও এক ধরনের গন্ধ আছে—
শুকনো লবঙ্গ, পুরোনো কালি, আর একফোঁটা না লেখা প্রেমপত্রের মতো। আমি প্রতিরাতে সেই গন্ধ শুঁকি, যেন বুঝে ফেলি—আমি এখনও আছি, আমার ভিতরে এখনো কেউ চুপ করে বসে আছে।
আমার বিছানাটা এখন প্রায় সমুদ্র।
আমি তাতে ডুবে আছি—
জলের নিচে হাতড়ে পাই কিছু অসমাপ্ত বাক্য,
কিছু নামহীন মুখ, কিছু অদ্ভুত শ্বাস।
এদের মধ্যে কোনোটাই আমার নয়, তবু আমি ওদেরই মতো হয়ে যাই।
আমি আর ঘুমোতে পারি না, কেবল নিজেকে গুটিয়ে ফেলি—ভেজা কাপড়ের মতো, যার ভেতর লবণ জমে আছে। আমার রক্তে এখন প্রতিদিন একটুখানি নীল চুপচাপ জমে ওঠে, যেন কারও আকাশ আমার শরীরে আশ্রয় নিয়েছে।
সব শেষে আমি জানালার দিকে তাকাই।
রাতের আলো মরে এসেছে, কিন্তু কাঁচে প্রতিফলিত আমার মুখটা এখনও বেঁচে আছে—তার ঠোঁটে একটুখানি নীরব হাসি, যেন কেউ বলছে, “তুমি এখনও হারাওনি, তুমি কেবল রঙের মধ্যে মিশে গিয়েছো।”
এখন আমি স্থির।
আমার বিছানার নিচে সমুদ্র ঘুমায়,
আর আমি তার ঢেউ শুনি—
ধীরে ধীরে, শ্বাসের মতো, অনন্তকাল ধরে।
জব্বর তো— বিছানার নিচে সমুদ্র! ঢেউ ওঠে, হাওয়া বয়, গর্জন আসে…