অভ্যুত্থানের পরে চারিদিক যখন শান্ত হয়ে আসছিল, আমার এক বন্ধু সরাসরি জিজ্ঞেস করলেন, জুলাই অভ্যুত্থানে আমরা কী পেলাম। ততদিনে নানামুখী আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কেউ বলছেন, গণতন্ত্র উদ্ধারের জন্য ছিল এই আন্দোলন। কেউ বলছেন, শুধু একটা নির্বাচনের জন্য আমরা এতগুলো মানুষ রক্ত ঝরাই নাই; আমাদের নতুন বন্দোবস্ত চাই। কিন্তু এইসব আমার কাছে পানসে লাগছিল। একটা রিল্যাক্স মুড নিয়ে বললাম, আমিও যে এই দেশের মানুষ, এই মাটিতে যে আমারও অধিকার আছে, অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সেই অনুভতিটা পেয়েছি আমি।
এইটা হাসির কথা না। ছোটবেলা থেকে, বা বলা যায়, যেদিন মাদরাসায় ভর্তি হয়েছি, সেদিন থেকে এই অনুভূতিটা হারিয়ে ফেলেছিলাম। এ দেশের পথঘাট সব অচেনা হয়ে গিয়েছিল, আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম আমার স্কুল, আমার প্রিয় খেলার মাঠ।
মেধাবুদ্ধি ভালো দেখে আব্বু আগ্রহ করলেন ক্যাডেটে পড়াবেন। তখন মেহেন্দিগঞ্জে থাকি। আমি আর আমার ফুপাত ভাই সেই খবর শুনে দুজনে নেভি স্টাইলের ক্যাপ মাথায় বসিয়ে পাতারহাট বাজারের এ মাথা থেকে ও মাথা মার্চপোস্ট ঢঙে চক্কর লাগালাম। কিন্তু ক্লাস ফাইভ শেষ করতে করতে তাবলিগের উসিলায় আব্বুর মন বদলে গেছে, আমাকে মাদরাসায় দেবেন। হাইস্কুলের শিক্ষকরা, আব্বুর কলিগ, প্রতিবেশী মুরব্বিরা সকলে হা হা করে উঠলেন, বলেন কী, এত ভালো ছেলেটাকে নষ্ট করবেন? আব্বু কারও কথায় গা করেননি। গত কোরবানির ইদেও বাড়ির বড় নানা, যিনি সোনালী ব্যাংকের জিএম ছিলেন, খুবই উচ্চ শিক্ষিত মানুষ, আমার সামনেই আব্বুকে বললেন, মোর্শেদের (ডাক নাম) মেধা ভালো ছিল, ও সুযোগ পেলে অনেক বড় হতে পারত।
আমার সুযোগ হারিয়ে গেছে মাদরাসায় ভর্তি হবার দিনই। চুলকানি নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেলে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মাদরাসায় পড়ো নাকি? মাদরাসায় পড়লে এমন চুলকানি হয়।’ বয়স কম ছিল, তবু তাচ্ছিল্যটা ঠিক টের পেয়েছি। গাড়িতে অন্য ছাত্ররা হাফ ভাড়া দেয়, আমাদের আইডি কার্ড নাই, আমরা দিতে গেলে উল্টা ধাতানি খেতে হয়। স্কুলের বন্ধুদের দেখা পেলে ওরা খেলতে ডাকে, লজ্জা পাই, ওদের মতো প্যান্ট তো নাই, পাজামা পরে খেলি। খেলতে খেলতে বুঝি, আমি আলাদা হয়ে গেছি। আলগোছে দূরে সরে যাচ্ছি।
এখন আর আমার ১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ মার্চের উৎসব নাই, ২১ ফেব্রুয়ারির প্রভাত ফেরি নাই। গৌরনদী পুলিশ স্টেশনের মধ্যখান দিয়ে মাদরাসায় যাবার যে পথ, সে পথ পার হতে গিয়ে পুলিশ দেখলে গুটিয়ে যাই। ‘কালেকশনে’ যাই মাদরাসার জন্য মুষ্টিচাল নিতে। নিজের জন্যে না, এতিম, যারা মাদরাসায় খোরাকির খরচ দিতে পারেন না, তাদের জন্য। আনুষ্ঠানিক ভাষায়, ‘ইসলামের খেদমতের জন্য’। তবু লোকে নিচু চোখে দেখে, যদিও ইসলাম নিচু না, আমি অন্যায় কিছু করছি না। একবার মাহফিল উপলক্ষে শিকারপুর বাজারে একটা টেবিল নিয়ে বসলাম। মাইকে দানের গীত গাইতে লাগলাম। তা দেখে এক দূরসম্পর্কের নানা টিটকারি করলেন, ‘মাদরাসায় গিয়া এখন ভিক্ষার থালা নিয়ে বসছো?’
২০০১ সালে কাকরাইল মাদরাসায় পড়েছি, কোরআনের হাফেজ তখন। পাশে রমনায় পহেলা বৈশাখে বোমা হামলা হয়। প্রচণ্ড শব্দে মাদরাসাসুদ্ধ কেঁপে ওঠে। জানালা দিয়ে দেখি, অর্ধনগ্ন নারী-পুরুষের আতঙ্কিত ছোটাছুটি। পুলিশ আসে এবং তারপর থেকে প্রায় দিনই আসে তারা। ভিআইপি রোড ধরে প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, রাষ্ট্রপতির গাড়ি যায়, মাদরাসার ছাদে রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিশ। শুক্রবার আমরা ভালোমন্দ খাওয়ার উদ্যোগ করি। মুরগি আনি শান্তিনগর বাজার থেকে। সাউন্ডবক্সে বাজছে চিৎকারের মতো গান: ও প্রিয়া তুমি কোথায়। নতুন শিল্পী এসেছে, আসিফ। টিপটপ ঘুরে শান্তিনগর মোড়ে যাওয়ার আগেই শুনি গুলির আওয়াজ। আওয়ামীলীগের এমপি ডাক্তার ইকবাল সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে মিছিলে হামলা করেছেন।
আরেকদিন শুনি, বায়তুল মোকাররমের খতিব উবায়দুল হকের টেলিফোন লাইন কেটে দিয়েছে সরকার আর মুফতি আমিনী ও শাইখুল হাদিস গ্রেপ্তার হয়েছেন। মৎস ভবন থেকে মিছিলের পর মিছিল আসছে ভিআইপি রোড ধরে। কখনও পুলিশ বা লীগের ধাওয়া খেয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ছে কাকরাইলের গেট ভেঙে। বিজিবি নামছে। এক শুক্রবার লুকিয়ে পেপার আনলাম, আমেরিকার টুইন-টাওয়ারে হামলা হয়েছে। আমাদের তখন গোপন পাঠ্য ছিল ‘মাসিক রহমত’। মাদরাসার এক বড় ভাই দেখে সবগুলো পত্রিকা কেড়ে নিলেন পুড়িয়ে ফেলবেন বলে। আমরা আর পত্রিকা কেনা বা পড়ার সাহস করলাম না।
এই সময় প্রথম ‘জঙ্গি’ শব্দটা দেখলাম। এরপর থেকে বাকি জীবন প্রমাণ করতে কেটে গেলো যে, আমি ওই জঙ্গি কেউ না। আগে ‘রাজাকার’ শব্দ শুনেছি বহুবার। জ্ঞাতি নানারা শঙ্কিত ছিলেন, মাদরাসায় পড়ার ফলে কোনো উপায়ে আমি ‘রাজাকার’ হয়ে যেতে পারি। ফলে মাদানীনগর মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে পড়াশুনার একটা আগ্রহ তৈরি হয়। মনজুর আহমদ লিখিত ‘ফিরে চলো একাত্তরে’ বইটার কথা মনে আছে।
স্বাধীনতা দিবসে ক্লাস টিচারের কাছে আবেদন করি, যেন আজ আমাদের একাত্তর নিয়ে আলাপ করার সুযোগ দেন। সহপাঠীরা মিলে বিজয়নগর মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর ঘুরে আসি। বিজয় দিবসে দল বেঁধে দেখতে বের হই—সংসদ ভবন, জিয়া উদ্যান, নভোথিয়েটার। ফার্মগেটে নৌবাহিনীর একটা ব্যান্ড দল সানাই বাজিয়ে দেশাত্মবোধক গান গাইছে। আমরা মাথায় জাতীয় পতাকার ব্যাজ বাঁধি। কেউ জিজ্ঞেস করলে প্রবল উৎসাহে বলি, ‘আমরা কওমি মাদরাসায় পড়ি।’
মাদরাসায় হক-বাতিলের দ্বন্দ্ব শিরোনামে বিতর্ক অনুষ্ঠান হয়, সেখানে মওদুদি হন বাতিল ফেরকার গুরু আর জামায়াতে ইসলামী হয় ভ্রান্ত রাজনৈতিক দল। আমাদের সমর্থন থাকে ‘জমিয়ত’ নামের একটা দলের প্রতি (যারা এখন কয়েক ভাগে বিভক্ত), কারণ তারা দেওবন্দি, আবার একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি। একাত্তরে হাফেজ্জি হুজুরের বক্তব্য ‘এই যুদ্ধ জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের যুদ্ধ’ শক্তভাবে আঁকড়ে ধরি। কিন্তু জামায়াত বিরোধিতা বা মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষ প্রমাণে কোনো লাভ হয় না—মাদানীনগরের নিরাপরাধ শিক্ষক আকবর আলী হুজুর গ্রেপ্তার হন রমনা বটমূলের বোমা হামলায়। আমাদের মাদরাসা মিডিয়ায় ট্রিটমেন্ট পায় ‘মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী’ ‘জঙ্গি’ মাদরাসা। মাদরাসা থেকে লুকিয়ে একুশে বইমেলায় গেলাম, ঢোকার সময় যেমন তেমন, বের হওয়ার সময় পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের জেরে সব বই রেখে চলে আসতে হয়। বইগুলো বহুদিন ধরে টিফিনের টাকা জমিয়ে কিনেছিলাম।
২০০৫ সালে দেশজুড়ে বোমা হামলা হলে ভয় পাই প্রচণ্ড। সত্যি বলতে কি, সেই প্রথম টের পাই, এই দেশ আমার হাতছাড়া হয়ে গেছে। যদিও বয়স তখন খুব বেশি না, বিশ হবে কি হবে না। ওই ঘটনার পর পুরো দেশ আমার জন্য, আমার বন্ধুদের জন্য জাহান্নাম হয়ে ওঠে। তখন ইসলামোফোবিয়া মানে বুঝতাম না, শুধু টের পেতাম, ভেতরে ভেতরে মাটি সরে গেছে পায়ের তলা থেকে, আমরা ভিনদেশি হয়ে গেছি। পরের কয়েক বছর সেই ভয় ক্রমশ বাড়তে থাকে নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে।
বাড্ডা মিফতাহুল উলুম মাদরাসায় পড়ি তখন। কাকরাইল থেকে ভিড় ঠেলে ‘সুপ্রভাত’ বাসে লাফ দিয়ে উঠতে যাব, জানালার পাশে বসা একজনকে কাঁধের ব্যাগটা বাড়িয়ে অনুরোধ করলাম একটু ধরতে। তিনি স্পষ্ট বললেন, ‘বোমা নাই তো?’ আরেকবার ছুটিতে বেড়াতে গেলাম বগুড়া। মহাস্থানগড় যাব, লেগুনায় উঠেছি। পাশের ভদ্রলোক নাকসিঁটকে বললেন, ‘আপনারা জঙ্গি না তো?’ আমরাও ছাড়লাম না, বললাম, যে জঙ্গিরা ধরা পড়েছে, তাদের লেবাস তো আপনার মতো, তো আপনি না তো? পরের বছর ভর্তি হলাম, নারায়ণগঞ্জ, হাজীপাড়া। সাইনবোর্ড থেকে ট্যাক্সি ক্যাবে চড়ে চাষাড়া যাচ্ছি। পুলিশ ধরল রাস্তায়। সবাইকে নামিয়ে, এমনকি গাড়ির পাপোশ পর্যন্ত উল্টিয়ে চেক করল। অথচ পাশ দিয়ে সাই সাই করে বহু গাড়ি চলে যাচ্ছে। একদিন দেখি, মাদরাসার সামনে মাটিতে বসে আছে সুস্থ সবল পরিচ্ছন্ন এক পাগল। বকোয়াস করছে। বন্ধুদের কয়েকজন জানালেন, ইনি গোয়েন্দা হতে পারেন।
এ বছর বিশ্বকাপ ফুটবল আছড়ে পড়ল দেশের তরুণদের মাথায়। মাদরাসার খেলা পাগল ছেলেরা রাতে লুকিয়ে বের হন, কিন্তু কর্তৃপক্ষ তাদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বোধ করেন। আমার মেজো কাকার বাসা ছিল মুরাদপুর, জিরো পয়েন্ট। ফাইনালের ঠিক পর দিন তার বাসা থেকে মাদরাসায় যাওয়ার পথে র্যাবের হাতে পড়লাম। কারণ সামান্য। একটা ফার্মেসিতে ঢুকেছিলাম। হুজুর দেখে দোকানি কোরআন-হাদিস নিয়ে নানান টিপ্পনী কাটতে থাকেন। অসহ্য লাগল। বললাম, ‘মিয়া, বোম মারলেও তো মুখ থেকে একটা সুরা বের হবে না, কোরআন নিয়ে এত কথা বলেন।’ ব্যস, পুলিশ-র্যাব ডেকে তিনি তাদের হাতে তুলে দিলেন।
এমন এক জীবন আমাদের তখন, একদল বন্ধু ঢাকা থেকে গ্রাম দেখতে গেলেন আমাদের। প্রতিবেশীরা ফিসফাস করতে লাগল, কারা আসছে, কোত্থেকে আসছে। শেষে বন্ধুদের সামনেই আব্বু তার আশঙ্কার কথা জানালেন। আনন্দের ভ্রমণে বিষাদ নামল, তারা তড়িঘড়ি ঢাকায় ফিরে গেলেন।
২০১১ সালে লালবাগ মাদরাসায় ‘দাওরায়ে হাদিস’ (যা এখন স্নাতকোত্তর সমমান) পড়া পর্যন্ত কখনো ‘রাজাকার’ কিংবা ‘জঙ্গি’ ইস্যু ক্ষণে ক্ষণে আঘাত হানতে লাগল। মাঝে একদিন প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা মুফতি আমিনী (যার কাছে বুখারি শরিফ পড়েছি) পল্টন ময়দানে ঘোষণা করলেন ‘হরকাতুল জিহাদ যারা করেন, তাদের ঠ্যাং ভেঙে দেবেন’। তার বহু দিন পরে জিহাদপন্থি দলটি ‘আইডিপি’ নামে গণতান্ত্রিক দল গঠন করতে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক সভাসমাবেশ করল। ‘জঙ্গি’ ট্যাগ হয়ে গেলো ডালভাত। ইসলামপন্থি দলের কর্মীরাও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে জঙ্গি ট্যাগ দিতেন। এমন ঘটনার মুখোমুখি হয়েছি একাধিকবার।
খেলাফত মজলিসের সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে পরিচিত ‘দাবানল শিল্পী গোষ্ঠী’ একটা অনুষ্ঠান করল কচি-কাঁচা মিলনায়তনে। অনুষ্ঠানে হট্টগোল লাগলে আমাদের বন্ধু আবু বকরকে আয়োজকরা কয়েকজন মিলে জঙ্গি বলে পুলিশে ধরিয়ে দিল। পুলিশ তাকে গাড়িতে তুলল। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে লাগলাম তাকে ছাড়াতে, এক মুরব্বিমতন লোক আমাদের বোঝালেন যে, আমরা যেন ‘শাসনতন্ত্রের’র কর্মী বলে নিজেদের পরিচয় দিই। কারণ আপনি কোনো দল করেন না মানে আপনার জঙ্গি হওয়ার চান্স আছে।
মাদরাসা শেষ করে কমলাপুর মেসে থাকতে শুরু করি চাকরি-বাকরির অপেক্ষায়। মেসে প্রায় পুলিশ রেড দেয়। আমি ‘ঢাকা টাইমস’ নামে একটা পত্রিকায় কাজ নিলাম। প্রেসকার্ড থাকত সঙ্গে। পুলিশ সে সব থোড়াই কেয়ার করে। একবার রেড দেওয়ার সময় প্রেস কার্ড ছুড়ে ফেলল তারা এবং পরিষ্কার গলায় বলল, ‘আপনাকে উচিত এখনই অ্যারেস্ট করা।’ কাজ শেষে মেসে ফিরতে গিয়ে মাঝেমধ্যে রাত হত। আমার মা-বাবা এখনও জানেন না যে, একে একে তিনবার মেসে ফেরার পথে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে আমাকে। রাতভর পল্টন কিংবা রমনা থানায় কাটিয়েছি, মশার কামড়ে পা ফুলে গেছে। পরদিন মুচলেকা দিয়ে ছাড়া পেয়েছি।
এভাবে ২০১৩ সালের ৬ এপ্রিল আসে, হেফাজত আসে। মাঝখানে আসে শাহবাগ আন্দোলন। মনে আছে, একবার শাহবাগের এক কর্মীর সঙ্গে আমরা তর্কে জড়াই এবং সে আমাদের সদম্ভে বলে, তারা চায় এই দেশে ইসলামকে কবর দিয়ে যেতে। হেফাজতের সমাবেশের ঠিক আগের রাতে আমরা শাপলা চত্বরে হাঁটছি। পরিচিতজনরা দলে দলে ঢাকায় ঢুকছেন। আমাদের বুকের ছাতি ফুলে ওঠে। মনে হয়, ক্রমশ ভয় কেটে যাচ্ছে। ২০০৫ থেকে ২০১৩, এই দীর্ঘ সময়ের নিগ্রহ আমাদের নানাভাবে গড়েও তুলছিল। একটা অংশ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে ঢুকে পড়লেন, অনেকে সামু বা সচলায়নের মতো ব্লগে সক্রিয় হলেন, কেউ কেউ মাদরাসা অনুরাগী বুদ্ধজীবীদের সংস্পর্শে গেলেন, কেউবা মনোযোগী হলেন সাহিত্যে, কেউ সাপ্তাহিক বা মাসিক পত্র প্রকাশে নামলেন। কোথাও দমবার পাত্র তো ছিলাম না। ফলে শাহবাগ তখন পুরো দেশকে ডমিনেট করলেও সমসাময়িক বুদ্ধিজীবীদের অনেকে ইসলামপন্থিদের পক্ষে মুখ খুলতে লাগলেন, যা এর আগে ছিল বিরল।
পরের মাসে ৫ মে’র নৃশংস ঘটনাটি ঘটল। দ্বিতীয়বার আমরা ভয় পেলাম, ভয়ে কুঁকড়ে গেলাম। আব্বু ফোন দিচ্ছিলেন, এলাকায় তিনটা লাশ এসেছে, আমি যেন বাড়ি চলে যাই। আমার ছোট ভাই হাসান মাদরাসা থেকে পালিয়ে শাপলা চত্বর গিয়েছিল, ওর সঙ্গে যোগযোগ করতে পারছিলাম না, পত্রিকায় ছবি দেখি সোনালী ব্যাংকের সিঁড়িতে হুবহু ওর মতো একটা কালো কাবলি পরা ছেলের মৃতদেহ পড়ে আছে। ধৈর্য রাখা কঠিন হয়ে যায়। বন্ধুদের একাংশ সশস্ত্র লড়াইয়ের চিন্তা করতে থাকে। রাজনৈতিক সমাবেশগুলোতে জামায়াত-বিএনপি-হেফাজতকে ‘একই বৃন্তের তিনটি ফুল’ বলে হরেদরে গ্রেপ্তার করার বৈধতা উৎপাদন করা হয়। রাজাকার, জঙ্গির সঙ্গে আমরা নতুন একটা তকমা পেলাম ‘হেফাজতি’। হেফাজত কর্মী সন্দেহে গ্রেপ্তার চলে নির্বিবাদে। একটু ভালো ঘরের ছেলেরা দেশ ছাড়তে থাকে—চাকরি বা পড়ালেখার অজুহাতে। আমার বাবা আমেরিকা প্রবাসী এক পরিবারের কন্যা ঠিক করেন, যেন তারা আমাকে আমেরিকা নিয়ে যায়।
কোনও ন্যায্য বা যৌক্তিক আন্দোলনে মাদরাসা পড়ুয়া বা হুজুররা যুক্ত হওয়াতেও জটিলতা দেখা দেয়। দেখা যায়, ১৪ সালের নির্বাচন পূর্ববর্তী আন্দোলন, কিংবা পরে ‘নিরাপদ সড়ক’ আন্দোলন বা কোটাবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় কেউ চাইতেন না মাদরাসা পড়ুয়ারা এতে জড়িত হোক। এটা ছিল আরেক সংকট। ফলে একটা দীর্ঘ সময় কাটে স্থবিরতায়। ২০১৭ সালে হেফাজতের সঙ্গে আওয়ামীলীগ সরকার সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন করে এবং কওমি সনদের স্বীকৃতির ঘোষণা দেয়। আমরা একটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়ি। আমি তখন চাকরি করি আল-ফাতাহ প্রকাশনীতে। ম্যানেজার একটা পত্রিকা এনে দেখান, যাতে হেফাজত মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী ‘তৌহিদি জনতা বুকের তাজা রক্ত দিয়ে হলেও প্রতিহত’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা চেয়েছিলাম, আওয়ামীলীগের হাতে এই স্বীকৃতিটা না হোক। কিন্তু হলো। ২০১৮ সালের নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে সংসদে বিল পাস করে আইনি বৈধতাও দেওয়া হলো। এবং বিনিময়ে ২০১৯ সালে ‘শোকরানা মাহফিল’ মঞ্চস্থ হয় আমাদের অবশিষ্ট নৈতিক শক্তিটুকু নষ্ট করে দেওয়ার জন্য। সারাদেশের ডিসি-এসপিদের মাধ্যমে বিভিন্ন মাদরাসা থেকে জবরদস্তিমূলক শিক্ষার্থীদের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হাজির হতে বাধ্য করা হয়।
গোপালগঞ্জের বিখ্যাত আলেম শামছুল হক ফরিদপুরীর ছেলে, একটি কওমি মাদরাসা বোর্ডের প্রধান মাওলানা রুহুল আমিন খান (পরে যিনি বায়তুল মোকাররমের খতিব হন) ‘কওমি জননী’ উপাধি দেন শেখ হাসিনাকে। কবি আবিদ আজম সেদিন আমাকে ইনবক্স করে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে যে এত ‘উলামায়ে ছু’ (মন্দ আলেম) আছে আমার জানা ছিল না।’ সেই শোকরানা মাহফিলে শেখ হাসিনার নামে একটা মানপত্র পাঠ করার জন্য আমাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়, কিন্তু বিষয়টা এত জঘন্য লেগেছিল তখন যে তাতে সাড়া দিতে মন সায় দেয়নি।
এক ধরনের শঠ আলেমের দৌরাত্ম চলতে থাকে সমান তালে। ভেতরে বাহিরে আমরা হয়ে পড়ি চরম অসহায়। এই অসহায়ত্বই বারুদ হয়ে জ্বলে উঠেছিল ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে। যদিও বরাবরের মতো প্রথম দিকে হুজুরদের জুলাই আন্দোলনে জড়াতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কেননা, এটা একে তো কোটা সংক্রান্ত আন্দোলন, কওমি পড়ুয়াদের জন্য তো এ দেশে কোনো ভ্যাকেন্সি নাই, কোটার আন্দোলনে তাদের কী। তাছাড়া মাদরাসা সংশ্লিষ্টরা ততদিনে আওয়ামী বেষ্টনীতে আটকা পড়ে ছিলেন জাটকা মাছের মতো। কিন্তু আমরা, মাদরাসার প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা অভ্যুত্থানে শরিক হয়ে গেছি নিজ নিজ উদ্যোগে।
আমি আমার কথাই বেশি বললাম, যেন ব্যক্তির জায়গা থেকে সঙ্কট এবং সেই সঙ্কটের মধ্য দিয়ে আমাদের, মানে মাদরাসা পড়ুয়াদের আকাঙ্ক্ষাটা বোঝা যায়। প্রতিটি ইসলামপন্থি, বিশেষ করে প্রতিজন মাদরাসা পড়ুয়া, আরও বিশেষ করে বললে কওমি পড়ুয়া কমবেশি সবাই একইভাবে সাফার করেছেন। তাই একটা অভ্যুত্থান হোক এটা ছিল আমাদের প্রত্যাশিত এবং বলা যায় অবধারিত ছিল। জহির রায়হান যেমন মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকে বলেছিলেন ‘সময়ের প্রয়োজনে’, তেমনি এখানেও আমরা সময়ের প্রয়োজনে জড়িয়ে গেছি সত্য, শতাধিক মাদরাসা পড়ুয়া শহিদ হয়েছেন সেটাও ঠিক, কিন্তু ভেতরে একটা অঙ্গার হওয়া আকাঙ্ক্ষাও ছিল বৈ কি।
কী সেই আকাঙক্ষা? সেটা হলো, আমরা আউটসাইডার না, এই দেশেরই মানুষ আমরা, এই মাটিরই অংশীদার। অর্ধশত বছর ধরে আটকানো অর্গলটা এবার অন্তত খুলুক। আমাদের যেন নিম্নবর্গীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক বলে ট্রিট করা না হয়। মুক্তিযুদ্ধের পরে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম, যে কখনো মোল্লা, কখনো রাজাকার, কখনো জঙ্গি, কখনো হেফাজতি বলে তাচ্ছিল্য ও নিপীড়নের শিকার হয়েছে, এর যেন অবসান হয়। আমাকে যেন কোনো অফিসে ইন্টারভিউ দিতে গিয়ে শুনতে না হয়, আমরা তো অফিসার চেয়েছি, হুজুর চাই নাই। এই দেশে যদি বিহারী, নৃগোষ্ঠী, চা-শ্রমিক বা বেঁদে জনগোষ্ঠীর সমঅধিকারের জন্য সোচ্চার থাকেন মানবতাবাদীরা, তাহলে আমরা কি তাদের চেয়েও হীন হয়ে গেছি কেবল স্বেচ্ছায় ইসলামের শাস্ত্রীয় পাঠকে বেছে নেওয়ার কারণে? এটা কি ন্যায্য? মাদরাসা পড়ুয়া এবং বিশেষ করে কওমি পড়ুয়াদের ওপর যেই বিমানবিকতা চেপে বসে আছে, সমাজের নিচুতলা থেকে উঁচুতলার সবখানে যেই নোংরা মানসিকতার কুণ্ডুলি পাঁকানো হয়েছে, সেখান থেকে মুক্তি চেয়েছি। জানি না, এই অভ্যুত্থানের পরেও যদি রাষ্ট্রের বা সমাজের একই আচরণ চলতে থাকে, যদি আমাদের জন্য বাংলাদেশ এক খণ্ড গাজা হয়ে থাকে, তাহলে বাকি সবার জন্য দেশটা ক্রমশ ইসরায়েল হয়ে উঠবে কি না।
মাশা-আল্লাহ সুন্দর লেখা।