ওসমান হাদির কবর যেয়ারত করতে গেলাম মৃত্যুর প্রায় বিশ-পঁচিশদিন পরে। দুপুরের দিকে—যোহরের পরপর। ঢাবি মসজিদের সংস্কার কাজ চলছিল, সরাসরি কবর দেখার সুযোগ ছিল না—তবু সেই মধ্যদুপুরে আট-দশজন মানুষ কবর জেয়ারতের উদ্দেশ্যে ভীড় করেছিলেন। আমি অবশ্য একা ছিলাম না। আমার সাথে ছিলেন তকি ওসমানি সাহেবের এক ভাতিজা—বাংলাদেশে এসেছেন ব্যাবসায়িক-বুদ্ধিবৃত্তিক সফরে। এর মধ্যে হাদির কবর জেয়ারতের জন্যও সময় বের করলেন। আমাকে বলছিলেন, ‘আমি হাদির জন্য পত্রিকায় কলাম লেখেছি, বেশ কয়েকটা।’ উত্তরটা শুনে খানিকটা অবাক হলাম। মনে মনে ভাবলাম, হাদি কীভাবে এত এত মানুষকে স্পর্শ করলেন?
ক) সাধারণভাবে ভাবলে উত্তরটা খুবই সহজ। হাদির মৃত্যুর সাথে জড়িয়ে আছে এক মর্মান্তিক ঘটনা। শুধু কি মর্মান্তিক—মর্মান্তিক মানে তো অনাকাঙ্ক্ষিত, হাদির দৃষ্টিতে এই মৃত্যু তো কোনোভাবেই অনাকাঙ্ক্ষিত নয়, হাদি তো এমন মৃত্যুর অপেক্ষাতেই নিজেকে প্রস্তুত করেছেন, ‘যুগ যুগ’ ধরে। সর্বশেষ সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, “আমি ছোটবেলা থেকে এই স্বপ্নটা দেখি… আমি স্বপ্ন দেখি একটা তুমুল মিছিল হচ্ছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে। সেই মিছিলে আমি আছি। কোনো একটা বুলেট এসে আমার বুকটা বিদ্ধ করে দিয়েছে এবং আমি হাসতে হাসতে শহীদ হয়ে গেছি।” তবে, নিছক বীরত্বের গল্প দিয়েও হাদিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়।
আবু সাঈদের মৃত্যুটা নিশ্চয়ই হাদির চেয়েও বেশি বীরোচিত, তবে আবু সাঈদের চেয়েও হাদির গুরুত্বটা আরও অনেক বেশি। প্রতিতুলনার কাজটা খানিকটা অস্বস্তিকর, অবশ্য জুলাইয়ের প্রথম শহীদের প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান রেখেই প্রশ্নটা করি—সাঈদের দর্শন নিয়ে পাকিস্তানি কোন লেখক পত্রিকায় কলাম লেখেছেন? সেই সম্ভাবনা খুবই কম। হাদির মৃত্যুর কয়েকদিনের মধ্যেই আমরা আইআইইউএমে একটা অনুষ্ঠানের আয়োজন করলাম। আলোচনা হবে বাংলাতে, তবু আমাদেরকে অবাক করে দিয়ে এক কাশ্মিরি যুবক উপস্থিত হলেন। যুবক বললেন, আমার স্ত্রী আমাকে বলেছেন, আমি যাতে আপনাদের অনুষ্ঠানে অবশ্যই উপস্থিত হই। আমি যাতে কাশ্মিরি জনতার পক্ষ থেকে ওসমান হাদির প্রতি সালাম ও শ্রদ্ধা পৌঁছে দেই।
খ) ঢাকা ডায়ালগের পক্ষ থেকে আমরা মুসা আল হাফিজকে ওসমান হাদির সম্পর্কে আলোচনা করতে অনুরোধ করেছিলাম। মুসা আল হাফিজ চমৎকার ব্যাখ্যা পেশ করেন—তিনি হাদির পাড়া-পরিবার-পড়াশোনার ইতিহাসটা তুলে ধরতে চেষ্টা করেন। মুসা আল হাফিজের ভাষায় ওসমান হাদি একদিনে জন্ম নেননি, তিনি তার পরিবার-পূর্বপুরুষ-পীরালির সিলসিলা বহন করেন। হাদির গ্রামের বাড়ি ঝালকাঠির নলছিটিতে—মুসা আল হাফিজ নলছিটির ঐতিহাসিক তাৎপর্য বর্ণনা করেন। হাদির পরিবারের সাথে কায়েদ সাহেব হুজুরের সম্পর্ক ছিল অতি ঘনিষ্ঠ। রাজনৈতিক শিক্ষালাভের আগেই হাদি বাংলার নিজস্ব রুহানিয়াতের যত্ন লাভ করেন।
গুলিবিদ্ধ হবার সপ্তাহ দুই আগে হাদির দাওয়াতে ইনকিলাব সেন্টারে গেলাম। হাদি বলছিলেন, ‘ভাই আমিও আলেম পরিবারের সন্তান, আমাদের জন্য মূলধারায় কাজ করা কতটা কঠিন, সেটা আপনি ভালো করেই জানেন। দোয়া করবেন ভাই, যাতে লড়াইটা চালিয়ে যেতে পারি, যাতে জুলাই বিপ্লবকে ধারণ করতে পারি। হাদিকে নিয়ে অনেক আলোচনা হচ্ছে, আরও অনেক আলোচনা হবে, তবে আমরা যাতে হাদির আত্মপরিচয়টা ভুলে না যাই।
গ) মুসা আল হাফিজের আলোচনা শেষ হতেই ঢাবির কয়েকজন ছাত্র একটা জটিল প্রসঙ্গ সামনে নিয়ে আসলেন। তারা বলছিলেন, হাদিকে তো নিছক মাদরাসা/ট্র্যাডিশনাল পরিচয়ে আটকে ফেলা অসম্ভব। হাদি নারী প্রশ্নে রক্ষণশীল শর্তাদি মানতে রাজি ছিলেন না। হাদির কাজকর্মে যেমন ছেলেরা যুক্ত ছিলেন, একইভাবে জুমা-শান্তার মতো মেয়েরাও হাদির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতেন। হাদি গানবাজনা নিয়েও ‘ইসলামি বলয়ের’ সাংস্কৃতিক সীমারেখা ভাঙতে চেষ্টা করেন। এগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
হাদি যেমন আলেম পরিবারের সন্তান ছিলেন, মাদরাসার ছাত্র ছিলেন। একইভাবে হাদি ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, তিনি রাজনৈতিক ইসলামের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত ছিলেন। পরিচিত ছিলেন রাজধানীকেন্দ্রিক বুদ্ধিবৃত্তিক তৎপরতার সাথেও। একদিন হাদি বলছিলেন, ভাই আপনার সাথে প্রথম কবে ও কোথায় দেখা হয়, সেটা কি আপনার মনে আছে? আমি মাথা চুলকালাম। হাদি হেসে বললেন, আপনার সাথে আমার প্রথম দেখা হয় দুই হাজার ষোলোতে। আপনি একজনের সাথে দেখা করতে আসছিলেন, ফার্মগেটে, একটা ‘ছাত্র সংগঠন নিয়ন্ত্রিত’ মেসে। আপনার সাথে আরও বেশ কয়েকবার দেখা হয়, চিন্তা পাঠচক্রে, ফরহাদ ভাইয়ের ডেরায়। কথাটা বলতেই আমরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসতে শুরু করলাম।
ওসমান হাদি ফ্যাসিবাদি ঢাকায় বিকশিত হয়েছেন, অন্য অনেক তরুণের মতো তার মধ্যেও সমন্বয়ের প্রশ্নগুলো কাজ করতো, সেটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। হাদি নিশ্চিতভাবে তার আলেম পরিবার-পীরালি মাদরাসাকে ‘ত্যাগ’ করেননি। বুকের গভীরে লালন করেছেন ঝালকাঠি নেসারিয়া আলিয়ার ভালোবাসা, কায়েদ সাহেব হুজুরের আধ্যাত্মিকতা। তবে একইসাথে হাদি সেই ‘প্রাচীন-পবিত্র ভালোবাসা’য় আটকেও থাকতে চাননি—হাদি চেয়েছেন সংশয়, ভাঙচুর ও পুনঃনির্মাণ। জুমা-শান্তার মতো মেয়েরা যেমন হাদির সাথে সংযুক্ত ছিলেন, হাদির সাথে যুক্ত ছিলেন তার স্ত্রী—এত বিপদের মধ্যেও বাংলাদেশের কেউ যার চেহারাটা এখনো দেখতে পারেনি। একে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। বৈপরীত্য, নাকি সমন্বয়? একটা নির্দিষ্ট সংজ্ঞায় ফেলা যথেষ্ট কঠিন।
হাদি শাহাবাগে জুলাই ঘোষণার দাবিতে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন। আমি সংহতি জানাতে গেলাম। হাদি আমাকে দেখেই বুকে জড়িয়ে নিলেন। লোকজন ছিল হাতেগোনা কয়েকজন। হাদি বলছিলেন, ভাই ‘ইসলামি ছাত্রসংগঠনগুলোকে’ আসতে বললে আরও অনেক মানুষ হতো। তবে আমি চেয়েছি যারাই আসুক, ‘অরগানিক-অথেন্টিক’ভাবে আসুক। ‘অরগানিক-অথেন্টিক’ শব্দদুটো কি হাদিকে বুঝার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শব্দ?
ঘ) ওসমান হাদি বেঁচে থাকলে কি আমরা তাকে এতটা গুরুত্ব দিতাম, এতটা সম্মান করতাম? করতাম না। আমার মনে আছে, হাদি ইনকিলাব কালচারাল সেন্টারের জন্য বইয়ের তালিকা বানাবেন। আমি যাতে তালিকা বানাতে সাহায্য করি, সেজন্য তিনি ফোন করলেন, বার বার নক দিচ্ছিলেন। আমি তালিকা দিয়েছিলাম বটে, তবে খানিক সময়ক্ষেপণও করেছিলাম।
হাদিকে তো ফিরে পাবেন না, আপনার আশেপাশের মেধাবী-উদ্যমী ‘পাগল’দের গুরুত্ব দিতে চেষ্টা করেন। তারা যদি কোন উদ্যোগ নেয়, কোনো প্রতিষ্ঠান বানাতে চায়, কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, তবে যথাসম্ভব সাহায্য করতে চেষ্টা করেন। হাদি যথেষ্ট মেধাবী ছিলেন, এ নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই, তবে ঢাকাকেন্দ্রিক ‘স্টাবলিশমেন্টে’ হাদির প্রবেশাধিকার ছিল অতি সামান্যই। ‘স্টাবলিশমেন্ট’-বিরোধী লড়াইটা মোটেই সহজ নয়। এক হাদি থেকে কি হাজার হাদি জন্ম নিতে পারে না? অবশ্যই জন্ম নিতে পারে। সেজন্য দরকার মেন্টরশিপ-মোটিভেশন-স্পন্সরশিপ। আপনি যদি বুদ্ধিজীবী, সাহিত্যিক বা পেশাজীবী হন, তবে তরুণদের সময় দিতে চেষ্টা করেন। পাশাপাশি, এক-দুইটা ছোটখাটো প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত হন, শুভানুধ্যায়ী হিসেবে—বিশ্বাস রাখেন, একটু যত্নই দরকার, বাংলাদেশের মাটি অত্যন্ত উর্বর।
হাদি ভাই, আল্লাহ আপনার কুরবানিকে কবুল করুক।
আমাদের মতো যুবকদের জন্য মোটিভিশনাল স্পীচ এবং এদের সাথে ধারাবাহিকভাবে লেগে থাকা দরকার ,এরা যদি ভালো সঙ্গ পায় তাহলে এক একটা হাদী ভাই থেকে বাংলাদেশকে আরো ভালো কিছু উপহার দিবে .