০৫.১০. ২০০৬
বারবার প্রশ্ন জাগছে। নিজেকেই প্রশ্ন করছি—কেন লিখি?
আগে কখনো এ নিয়ে ভাবিনি, তা নয়। কিন্তু হে অনবরত সওয়াল! কোথা থেকে আসছো তোমরা? শুনো, আমি লিখি, তোমাদের যন্ত্রণায়।
আমি লিখি—কারণ নীরবতা অনেক সময় বোঝা হয়ে যায়। হৃদয় সেই বোঝা সইতে পারে না। শব্দ তখন নিজের গরজে বেরিয়ে আসে—যেভাবে বাঁশির সিনা ভেদ করে বেরিয়ে আসে শ্বাস।
আমি লিখছি।
কারণ যাকে আমি খুঁজি, সে আমার ভেতরেই হাঁটছে।
এই লেখা কোনো জ্ঞানের জাহিরি নয়। আমি কিছু জানি বলে লিখছি, তা নয়। লিখছি, আমি পুড়ছি বলে। যে পুড়ে, সে নীরব থাকতে পারে না। আমার লেখা সেই মজবুরী। কিন্তু আত্মার আগুনকে শব্দের মাধ্যমে মুক্ত করা যায়? না, কেবল চেষ্টা করা যায়। আমি পুড়ছি, কিন্তু আমার লেখা আগুনের ছাই নয়। সে উড়তে থাকা শিখা।
আমি লিখি—কারণ অর্থ স্থির নয়। একটি শব্দ বহু জগৎ বহন করে। যে পাঠক যেমন, লেখা তার কাছে তেমন মুখ দেখায়।
এইখানে যুক্তি দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, কিন্তু সত্য ডাকে—ঘরে আয়।
লেখা মানে হকের সাথে মোলাকাতের দাবি নয়। লেখা মানে তাকে তালাশ, মোলাকাতের অন্তর্ভূমি।
কারণ যদি না লিখি, ইশক আমাকে পিষে ফেলবে।
আমার লেখা অসহ্য হয়ে ওঠা আশেকানার স্বীকারোক্তি।
আমি লিখি—কারণ দিল কথা না বললে বদন ভারী হয়ে যায়।
আমি লিখি, যেন শব্দ আশেকানার ওজন ফিরে পায়।
কলম থেকে নিশ্চিত হয় আমার শব্দের সিজদা।
কারণ অস্তিত্ব এক নয়, তার তাজাল্লি জাহির হয় নানা রূপে। সত্তা এক, তার প্রকাশরীতি অনেক। লেখা সেই প্রকাশের এক দর্পণ।
লেখা সত্তার সেই মোহনায় যাবার ব্যাকুলতা,
যেখানে হক নিজেকে দেখান মানুষের ভাষায়।
হক প্রত্যেক বিশ্বাসীর ধারণা অনুযায়ী তাজাল্লি দেন।
লেখা সেই তাজাল্লির বহুরূপী ছায়া।
তবু এখানে একটি সংশোধন দরকার।
আমি লিখি, ব্যাপারটা সহি নয়।
কারণ ‘আমি’ লিখলে ভুল হয়।
লেখা তখনই সত্য হয়, যখন লেখক গরহাজির থাকে।
প্রকৃত লেখা মানে নিজেকে সরিয়ে দেওয়া,
যাতে অর্থ নিজেই কথা বলে।
হৃদয় যদি প্রস্তুত না থাকে, জ্ঞান অবতরণ করে না।
লেখা তাই অর্জন নয়, লেখা হচ্ছে আগমন।
আমি লিখি—কারণ নীরব নাফস নিজেকে সংশোধন করে না।
মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু তার অজানা আত্মা।
লেখা তাই প্রথমত কোনো পাঠকের জন্য নয়; লেখা হলো নিজের সামনে নিজের বিচার বসানো।
আমি লিখি—
কারণ এই যুগে ফিতনা সবচেয়ে বেশি আসে সঠিক ভাষার ছদ্মবেশে।
ভুল নিয়ত নিয়ে বলা সত্যও মানুষকে ধ্বংস করে।
একুশ শতকে সেই ফিতনা আসে তথ্যের প্রাচুর্যে, মতের বাজারে, ধর্মের পণ্যায়নে।
লেখা তাই এখানে তাজকিয়ার (আত্মশুদ্ধি) একটি অনুশীলন।
আমি লিখি—
কারণ আমল ছাড়া ইলম
একুশ শতকে সবচেয়ে নিরাপদ মিথ্যা।
সত্যের ওপর অন্তর স্থির না হলে
বুদ্ধিও সত্য দেখে না।
আমি লিখি, যেন কলমের শব্দ
অন্তরের শব্দের সঙ্গে বিরোধে না যায়।
আমি লিখি—
কারণ হক কখনো উচ্চ স্বরে আসে না,
সে আসে হকের বৈশিষ্ট্যে সজ্জিত হয়ে।
হক হৃদয়ে নামলে মানুষের পুরো জীবন ভিজে যায়।
আমি লিখি, যেন আমার ভাষা
সেই সিক্ততাকে হারিয়ে না ফেলে।
আমি লিখি—
কারণ প্রেম প্রশ্ন করে না,
সে দাবি করে সবকিছু।
আত্মার সাত উপত্যকা এখনো অতিক্রম করতে হয়।
তালাশ, প্রেম, জ্ঞান, বিস্ময়,
একত্ব, বিস্মরণ,
আর শূন্যতায় মিলন ঘটাতে হয়।
লেখা সেই যাত্রার মানচিত্র ,
লেখা পথে ফেলে যাওয়া চিহ্ন।
ফলে আমি তালাশে বের হই। শেষে গিয়ে দেখা যায়
যাকে খুঁজছিলাম,
সে আমি নই,
আবার আমিই।
এই ধাঁধা না লিখলে আমি বাঁচতে পারি না।
আমি লিখি, যেন আমি অস্তিত্বের শ্বাস-প্রশ্বাস অনুভব করি।
আমি লিখি—
কারণ ভাষা শুধু জানার মাধ্যম নয়;
ভাষা অস্তিত্বকে প্রকাশ করে,
অস্তিত্বকে প্রশ্নে আনে।
লিখা আমার জন্য খোলা প্রশ্ন,
যেখানে প্রতিটি শব্দ আমাকে নিজেকে পুনরায় খুঁজতে শেখায়।
আমি লিখি—
কারণ ভালোবাসা চুপচাপ আসে,
মৃত্যু চুপচাপ চলে যায়,
আর মানুষ চুপচাপ পড়ে থাকে।
লেখা হলো সেই চুপচাপের কণ্ঠ,
যা সব ব্যথাকে শব্দে পরিণত করে।
আমি লিখি—
কারণ যদি না লিখি,
আমার হৃদয় নিঃশব্দে পড়ে থাকবে,
শব্দহীন রাতগুলো আমার ভেতর জমে থাকবে,
আর কেউ তা বুঝবে না।
০৬. ১০.২০০৬
কেন লিখি, প্রশ্নটা আবারো জাগছে। সরছে না মাথা থেকে। কারণ স্পষ্ট। জবাব এখনো স্পষ্ট হয়নি। আমাকে লিখতে বলে কে? প্রেম, যন্ত্রণার অনুভূতি বা জীবনের গভীর অনুভূতিগুলোই লেখাকে আহ্বান করে। কিন্তু আমার লেখা কি আরো অত্যাবশ্যকীয় আবেগীয় ও আধ্যাত্মিক তাগিদ নয়? সেটা গতকালের ডায়েরিতে এনেছি।
আমাকে লিখতে বলে দ্বীন। কিন্তু আমি বেশি লিখছি দুনিয়া নিয়েই। কারণ দ্বীন কেবল আখেরাতের জন্য নয়; দ্বীন দুনিয়ার শৃঙ্খলা, সমাজের ভারসাম্য, মানুষের পারস্পরিক পাওনা রক্ষার নাম।
দ্বীন নামক মহাগ্রন্থের অনেক অধ্যায়। সে শুধু আধ্যাত্মিক নয়। তার পাতায় পাতায় জ্ঞান, নীতি, সমাজ, সংস্কৃতি ও সভ্যতার মুখ। ফিকহ, কালাম, তাসাওউফ প্রতিদিন আমার সাথে কথা বলে। তারা ঝগড়া করে না। তারা দ্বীনের বিভিন্ন অভিব্যক্তি। তারা আমাকে কানে কানে বলেআমাদের বিরোধ মানে দ্বীনের ভঙ্গুরতা। আমরা পরস্পরের বিপরীতে দাঁড়ালে দ্বীনের মূল উদ্দেশ্য অদৃশ্য হয়। মানুষের জীবন ও সমাজের ভারসাম্য নষ্ট হয়। তারা যা বলে, আমি কেন তা লিখবো না? ফলে আমার লেখা মধ্যপথের চেষ্টা। সে বিভাজনের বিপরীতে, সংহতির পক্ষে। সে দ্বীনের জ্ঞানকে জীবন ও সমাজের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রয়াস।
যে নেযাম জীবন ও জগতের বিকাশধারা বোঝে না, সে বাস্তবতায় অকার্যকর হয়ে পড়ে।
উম্মাহর বিভাজন শুরু হয় জ্ঞানের বিচ্ছিন্নতায়।
আমি লিখি ঝগড়ার বিপরীতে।
কারণ সত্য পরস্পরবিরোধী নয়। বুদ্ধির পথ ধরে সত্য যা প্রমাণ করে, ওহি তাকে অস্বীকার করে না।
যদি উভয়ে বিরোধ দেখা দেয়, তা সত্যের নয়, ব্যাখ্যার। লেখা তাই ব্যাখ্যার পরিশুদ্ধি।
আমি লিখি—
কারণ আকল রুগ্ণ বা বোবা হলে শরিয়াহকে ভুল বোঝা হয়। আর শরিয়াহ বিচ্ছিন্ন হলে আকল দিশাহারা হয়।
ফিকর তার কাজ না করলে তৈরি হয় স্থবিরতা। স্থবির চিন্তা দ্বীনের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করে।
ইতিহাস কেবল অতীত নয়; ইতিহাস হলো সামাজিক সুন্নাহ। যে জাতি আল্লাহর সুন্নাহ বোঝে না, সে একই ভুল বারবার করে।
ইতিহাস হলো ইবরত বা নিদর্শন থেকে প্রজ্ঞা লাভের বিজ্ঞান। আমি লিখি, যেন ইবরতের চোখ খুলে।
আমি লিখি—
কারণ সমাজ ও রাষ্ট্রে সবাই ন্যায়ের ভাষায় কথা বলতে পারে না।
রাষ্ট্র টিকে থাকে আদল (ন্যায়) দিয়ে। আর আদল জন্ম নেয় নৈতিক শুদ্ধতা থেকে। একুশ শতকে, যেখানে উন্নয়ন আছে, কিন্তু ন্যায় নেই, সেখানে লেখা হয়ে ওঠে সতর্কবার্তা।
আমি লিখি—
কারণ সমাজ নিজে নিজে কথা বলে না; সমাজের কথা বলে তার আসবিয়্যা, তার ক্ষমতার বিন্যাস, তার উৎপাদন-পদ্ধতি, তার স্মৃতির রাজনীতি।
ইবনে খালদুন যেভাবে দেখিয়েছিলেনইতিহাস কোনো নিরপেক্ষ বর্ণনা নয়; বরং এটি সামাজিক শক্তির ফল।
একুশ শতকে এসে এই শক্তি আর কেবল গোত্র, রাজ্য বা সালতানাতে সীমাবদ্ধ নয়।
এখন শক্তি আছে অ্যালগরিদমে, মিডিয়ায়, কর্পোরেট ন্যারেটিভে, রাষ্ট্রীয় ভাষ্যে।
আমি লিখি—
কারণ অলিখিত সমাজ টিকে থাকে না, আর অলিখিত সত্য ক্ষমতার হাতে বিকৃত হয়।
মানুষ যা বলে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণসে যে অবস্থান থেকে বলে।
আজ সেই অবস্থান তৈরি হয় ডেটা, পুঁজি, প্ল্যাটফর্ম ও রাষ্ট্রীয় অনুমোদনের মধ্য দিয়ে।
লেখা তাই এখন কেবল জ্ঞান নয়, লেখা হলো অবস্থান উন্মোচনের বিজ্ঞান।
আমি লিখি—
কারণ সভ্যতার উত্থান-পতন ঘটছে এখন দ্রুত।
গ্রামনগররাষ্ট্রের চক্র জায়গা হারাচ্ছে।
সে জায়গা দখল করছে প্রান্তমহানগরডিজিটাল সাম্রাজ্য।
লেখা না হলে এই নতুন ব্যবস্থার শূন্যতা ও জটিলতা অব্যক্ত থাকে।
আমি লিখি—
কারণ ক্ষমতা সবসময় নিজের ইতিহাস নিজে লেখে।
বিজয়ীর বর্ণনা কখনো সম্পূর্ণ সত্য নয়।
একুশ শতকে বিজয়ী হলো ভাষা-নিয়ন্ত্রণকারী, অর্থ-নিয়ন্ত্রক, তথ্য-কারখানা।
আমি লিখি, যেন পরাজিত বাস্তবতা পুরোপুরি নীরব না হয়ে যায়।
আমি লিখি—
কারণ সামাজিক অবক্ষয় আগে আসে নৈতিকতায়,
পরে আসে রাষ্ট্রে।
যখন বিলাসিতা নৈতিক শৃঙ্খলা ভেঙে দেয়,
রাষ্ট্র তখন নিজের ভেতরেই পচতে শুরু করে।
আজ সেই বিলাসিতা শুধু ভোগে নয়। সে আছে ভাষার অলসতায়, চিন্তার পৃষ্ঠতলে, তত্ত্বের বাজারীকরণে। লেখা তাই এখন নৈতিক প্রতিরোধের ব্যূহ।
আমি লিখি—
কারণ ইতিহাস কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নয়; ইতিহাস একটি চলমান দায়িত্ব। সে হচ্ছে কারণ-অন্বেষণের শাস্ত্র।
একুশ শতকে এসে লেখার দায় হলো কারণ অনুসন্ধানে, ক্ষমতা বিশ্লেষণে, সভ্যতার আত্মসমালোচনায়।
আমি লিখি—
কারণ আলিমের নীরবতা কখনো কখনো
জালিমের পক্ষে ফতোয়া হয়ে যায়।
আমি লিখি—
কারণ অধিকাংশ মানুষ সত্য চায় না, তারা চায় নিরাপদ মিথ্যা।
আমি লিখি—
কারণ ভিন্নতা মিথ্যা নয়, ভিন্নতা তথ্য।
অপরকে বোঝা মানে তাকে খণ্ডন করা নয়।
লেখা তাই আমার কাছে
বিচার এবং বর্ণনা।
আমি লিখি—
কারণ সংখ্যাও সাক্ষ্য দেয়।
মিথ্যা অনুভ‚তিতে থাকে,
সত্য অনেক সময় পরিমাপে ধরা পড়ে।
এই যুগে যখন আবেগ দিয়ে ইতিহাস লেখা হয়,
লেখা তখন হয়ে ওঠে পরিমিতির অনুশীলন।
আমি লিখি—
কারণ সমাজের মধ্যেই মানুষ শিখে।
লেখা সেই সামাজিক আয়নার মতো,
যেখানে আমরা আমাদের অবস্থান দেখতে পাই,
যেখানে আমরা বাঁচার অর্থ অনুধাবন করি।
আমি লিখি—
কারণ যারা ক্ষমতায়, তারা মিথ্যা সাফল্যের গল্প বলেন,
আর যারা সাধারণ, তারা অজান্তে তা বিশ্বাস করেন।
লেখা মানে এক ধরনের ন্যায্যতার যন্ত্রণার শ্লেষ।
যেখানে ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ সমালোচনা, আর বাস্তবতা একসাথে বসবাস করে।
আমি লিখি—
কারণ রাষ্ট্রের নিয়মগুলো হাস্যকর।
তাদের প্রশ্নহীনভাবে মানা মানে আত্মাকে শৃঙ্খলিত করা।
লেখা হলো সেই শৃঙ্খল ভাঙার চিৎকার। শব্দ হচ্ছে একজন নিঃসঙ্গ, স্বাধীন পথিকের কণ্ঠ।
আমি লিখি—
কারণ যারা সত্য বলেন, তারা নির্যাতিত হন।
আর যারা শক্তি চায়, তারা মিথ্যা ও ভয় বিস্তার করে।
লেখা হলো সেই প্রতিবাদ,
যা কেবল শব্দে নয়, নীরব বিদ্রুপেও কাজ করে।
০৭.১০ ২০০৬
কেন লিখি, ব্যাপারটা খোলাসা হয়েছে? হয়নি এখনো। প্রকৃতি তার রূপ, রং, ছন্দ, গতি এবং পরিবর্তন দিয়ে কি আমাকে স্পন্দিত করেনি? নদীর প্রবাহ, মাছের সংসার, হাওড়ের হাসি, পাতার নরম কম্পন , পাখির উড়াল কি আমাকে শব্দ ও চিত্র দেয়নি? নিসর্গের আচরণ কি আমার অন্তর্নিহিত অনুভ‚তিকে লেখক হতে বলেনি? আমি ঋণ স্বীকার করছি আকাশের বর্ণিলতার কাছে, সাগরের তটরেখার কাছে, পাহাড়ের ঢালের কাছে। ধন্যবাদ হে রোদ ও হাওয়া, যারা আমার ভাবনাকে বহির্মুখী করেছো। আমার লেখক আহার করেছে বৃষ্টি, নদীর স্রোত, পাখির কথাবার্তা। বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়া ছাড়া আমার কৈশোর তীব্র হতো না। পাগলাটে খেলার মাঠ, সোনালি ধান, ঘন ঝোপঝাড়, শস্যভরা দিগন্ত ছাড়া আমার কৈশোরের দুরন্তটা কোথায় যেত? প্রজাপতির পাখা, পানির সরলতা, মাটির গন্ধ, বাতাসের ছোঁয়া ছিল বহু কল্পনার উৎস, রূপকথার ক্ষেত্র। প্রকৃতির এই আবহমানতা আমাকে বলেছেলেখো। দিনের আলো থেকে রাতের আঁধার, ঋতুর পরিবর্তন, পাতা ঝরার করতালি আমাকে বলেছে লেখো। প্রাকৃতিক চক্র জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, ইশারা, মায়া ও মুগ্ধতাকে স্মরণ করে, জারি রাখে। রচনা সেইসব ভাব ও অনুভ‚তির নথি।
১.
বাংলা ভাষা নিজেই একটি জাদুকরী শক্তি বহন করে। শব্দের মাধুর্য, ছন্দের শৃঙ্খলা, ধ্বনির কোমলতা আমাকে বলেছে—লেখো। বাংলা ভাষার শব্দশক্তি আমার অন্তরের আবহকে ভাষায় রূপ দিতে বারবার আহ্বান করছে।
২.
আমাকে লিখতে বলে ইতিহাস। সে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। সে আমাকে দেখায় আনন্দ, বেদনা, রহস্য, ভাঙন, বিজয়। না, কম বলা হলো। সে আমাকে দেখায় মানুষের সম্প্রসারিত ব্যাখ্যা।
৩.
আমি লিখি—
কারণ বুদ্ধি সওয়াল করলে ফিতরাত বা প্রকৃতি জবাব দেয়।
এই যুগে প্রকৃতি চাপা পড়ে আছে সেলুলয়েড, শব্দ আর বস্তুর তলায়।
লেখা তাই প্রকৃতির সাথে আমার সংযোগরেখা। লেখা হচ্ছে আসমান, পানি আর নীরবতার কাছে
আবার ফিরে যাওয়া।
আমি লিখি, যেন পাঠক উত্তর না পেয়ে
চিন্তা করতে বাধ্য হয়। কারণ জ্ঞান দুই রকম—
একটি বলা যায়, আরেকটি কেবল অনুভব করা যায়।
এই যুগে বলার জ্ঞান অজস্র। কিন্তু অনুভবের জ্ঞান দুষ্প্রাপ্য।
লেখা তাই আমার কাছে আলোর ইশারা।
৪.
যদি আমি লিখে নিজেকে না জাগাই,
তাহলে জাগ্রত থেকেও আমি ঘুমন্ত থাকব।
আমি লিখি—
কারণ আমার ভেতরে পাখিরা কথা বলে।
কেউ ভয় পায়,
কেউ যুক্তি খোঁজে,
কেউ ক্ষমতা চায়,
কেউ মুক্তি।
সি-মোরগ ডাকে,
কিন্তু সব পাখি সেই ডাক সহ্য করতে পারে না।
লেখা হলো তাদের প্রত্যেকের
স্বীকারোক্তি।
৫.
কিন্তু একই সাথে লেখালেখি আমার কাছে
নিজের পূর্বধারণাকে স্থগিত করার পদ্ধতি।
আমি লিখি—
কারণ চুপ থাকলে কথাগুলো
আমাকে লিখে ফেলে।
নীরবতা বড়ই বদনাম। সব দোষ তার ঘাড়েই চাপানো হয়।
আমি লিখি—
কারণ আমি যা বুঝি,
তা বোঝানোর মতো ভাষা আমার নেই।
আর যে ভাষা আমার আছে,
সে আমার বোঝার কথা বোঝে না।
এই ভুল বোঝাবুঝির নামই লেখা।
৬.
আমি লিখি—
কারণ আমি দুনিয়াকে মানিয়ে নিতে পারিনি,
আর দুনিয়াও আমাকে নিতে চায়নি।
সমঝোতার শেষ জায়গা হলো প্রতীক ও রূপকে আত্মপ্রকাশ। আমি তাই করি।
আমি লিখি—
কারণ প্রেম বড়ই বেয়াদব—
সে আসে, থাকে না;
থাকে, কথা বলে না।
লেখা তার রেখে যাওয়া
অস্পষ্ট চিঠি।
৭.
লিখা আমার অন্তরের ডায়েরি,
যেখানে কেবল আমি এবং আমার ব্যথা।
আমি লিখি—
কারণ জীবন খুব ছোট,
কিন্তু ভুল বোঝাবুঝি ও যন্ত্রণার পাহাড় বড়।
লেখা সেই সেতু,
যা আমাকে দাঁড় করায়,
আমার অস্তিত্বকে দৃঢ় রাখে।
৮.
আমি লিখি—
কারণ কোনো ভাবনা সম্পূর্ণ নয়,
যদি তা প্রকাশিত না হয়।
লিখা মানে চিন্তার বিন্যাস—
যথাযথ কারণ, যথাযথ প্রমাণ,
যথাযথ যুক্তি।
লেখা ছাড়া আমি নিশ্চিত হতে পারি না।
আমি লিখি—
কারণ আমি জানতে চাই,
কী জ্ঞান নির্ভরযোগ্য,
কী অনুমান,
কী কল্পনা।
লেখা আমার পরীক্ষা,
যেখানে ধারণা পরীক্ষা হয়,
যেখানে ভুল প্রকাশ পায়,
যেখানে সত্য নিশ্চিত হয়।
৯.
আমি লিখি—
কারণ শহরের শব্দে, কোলাহলে
হৃদয় হারিয়ে যায়।
লেখা সেই নিঃশব্দ,
যেখানে আমি নিজের পথ খুঁজে পাই,
যেখানে সময় থেমে যায়,
আর শূন্যও কথা বলে।
আমি লিখি—
কারণ যদি না লিখি,
আমার রাতের নীরবতা,
আমার দুপুরের ব্যথা,
আমার স্বপ্নের নদী
চুপচাপ নিঃশেষ হয়ে যাবে।
০৮.১০. ২০০৬
আমি মায়ের জন্য লিখি—কারণ কিছু অনুভ‚তি শব্দ ছাড়া সহ্য করা যায় না।
মা মানে সম্পর্ক। মা মানে অস্তিত্বের প্রথম আশ্রয়, জীবনের প্রথম নৈতিক ব্যাকরণ। আমি তাকে খুঁজি—শব্দে, স্মৃতিতে, শূন্যতার ভেতরে। মায়ের সত্তা থেকেই আমি প্রথম পৃথিবীকে নিরাপদ জেনেছিলাম। আমি তার অকাল বার্ধক্য অনুভব করতে চাই, কিন্তু তাকে সেই ক্লান্ত রূপে দেখতে চাই না। কারণ আমার ভেতরে তিনি এখনো সেই শিশুকালের মা, সুগন্ধে ভরা, আশ্বাসে মোড়া।
তার ধূসর চুল সীমাহীন কষ্টের সাক্ষ্য। অথচ আমার কাছে তা এখনো সৌন্দর্যের এক নৈতিক রূপ। আমি তাকে ভালোবাসি—এই ভালোবাসা অতীত হয় না, বর্তমানের সীমা বোঝে না। সে আমার প্রাণ—শ্বাসের মতো অবধারিত। তাকে ছাড়া পৃথিবী কল্পনাতীত। তিনি কখনো নেই, এই কল্পনা আমার নিশ্বাসকে ভারী করে তোলে।
এই পৃথিবী ভালো লাগার প্রথম কারণ তো মা-ই। অসীম কষ্ট আর ধৈর্যের ভেতর দিয়ে তিনি আমার জীবনে আলো এনেছেন। সেই ঋণ কোনোদিন শোধ হয় না। কারণ মায়ের ত্যাগ অর্থনীতির বাইরে। আমি শুধু জানতে চাই—মা ছাড়া মানুষ বাঁচে কীভাবে? নীরবে এই প্রশ্নটা আমাকে ডুবায়।
মা—আর মায়েরা একেকজন জীবন্ত শহিদ। তারা ফিরে আসুন প্রত্যেকের প্রতিদিনে। তবে যারা যোগ্য নয়, তাদের অত্যাচার থেকে তারা নিজেদের মুক্ত করুক—তখনো ঠোঁটে থাকুক ভেজা হাসি।
মাতৃত্ব মাথা তুলুক।
সে সকল জীবনের শক্তি। সে সেই বাগানের ফুল, যেখানে হাসি ফোটে, যেখানে বিদ্বেষের কারাগার ভেঙে স্বাধীনতা শ্বাস নেয়। মা মহান, অনন্য, পবিত্র—সে শান্তিতে বাস করার এক রূপক।
কিন্তু এই পৃথিবী শুধু মা দিয়ে গড়া নয়—এখানে ক্ষুধাও আছে।
একটু ডাল-ভাত, একটি রুটির টুকরা এখানে জীবন ঝরায়। দিন আর রাতের ক্ষুধার রাজ্যে হায়াতকে দৌড়ায়। মানুষ দুঃখ হয়ে উঠে। চিৎকার করে, খোঁজে, ব্যর্থ হয়। বলে নিষ্ঠুর ভাগ্য নিয়ে জন্মানোর কী দোষ? নিজেকেই কি দোষ দেব? আমি কি অবাঞ্ছিত ছিলাম? ভুল জগতে ঢুকে পড়েছি? মানুষের অবহেলার জঙ্গলে গভীর—সুখ আর আনন্দ হয় উধাও।
আমি মেঘে বাস করতে চাই, বাতাসে নিজেকে পূর্ণ করতে চাই। কিন্তু—ভাই-বোনের জমাট রক্ত, বিবর্ণ হৃৎস্পন্দন গলানোর জন্য সূর্যের তাপ এখনো যথেষ্ট নয়। এখানে আমার সম্পদ বলতে এই হৃৎস্পন্দন। তাকে নিয়ে আমি কতদূর লড়তে পারি? আমি যখন পারছি না, পা ব্যর্থ, চোখ দেখছে না, হাত অনড়, তখনই বাবা। তিনি পা হন, হাত হন, চোখ হন এবং আমি আমি হই। কিন্তু আমি কখনো কিছু হতে পারি না, যখন এর মধ্যে বাবা নেই।
সমস্ত বাবা আমার মর্মমূলে কাজ করছেন। সমস্ত মা আমার অস্তিত্বজুড়ে স্নেহ বিলাচ্ছেন। সেই কাজে ও স্নেহে সংসার। সেই কাজে ও স্নেহে আত্মীয়তা। কোনো আমিই নিজেকে খুঁজে পায় না আমরা ছাড়া। অতএব আমরা সমাজ হয়ে উঠছি। গড়ছি রাষ্ট্র। তাদের গড়তে লাগে অজস্র উপাদান। কিন্তু ভাঙতে? ভাঙতে হলে একটা জিনিসই যথেষ্ট; ন্যায়ের নির্বাসন।
চারপাশের পৃথিবী গড়ার আয়োজনে মগ্ন। ব্যস্ত, ব্যস্ত, ব্যস্ত। ওপর থেকে সব ঠিকঠাক মনে হচ্ছে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস। দর্শন, থিসিস, আবিষ্কার। স্যাটেলাইট, প্রযুক্তি, সামাজিক মাধ্যম। বাণী, বক্তব্য, টেন্ডার, গণসংগীত, বিলবোর্ড, সন্ধ্যার খবর। নেতাদের হাসি, সাক্ষাৎকার, আস্থা জাগানো ভাষণ। ভ্রমণ, ভোগ, পুঁজি ও উন্নয়নের তীব্র ছন্দে—সব ছন্দময়।
কিন্তু আমি দেখছি সবকিছুর ভিত্তিমূলে গজিয়েছে কালো ক্যানসার। দ্রæত ছড়াচ্ছে। সবাই নিজেদের গতি ও গীতিতে মত্ত। এই ক্যানসারের সবটুকু যন্ত্রণা ও বিস্তারের বিরুদ্ধে লড়ছেন মা, বাবা, পরিবার, বিশ্বাস, আখলাক ও ঐতিহ্য। তাদের পায়ের মাটির নাম ইনসাফ। কিন্তু সেই মাটির সওদা না করলে আমাদের গ্রগতি ও ইন্ড্রাস্টি বাড়বে না। প্রগতি ও প্রযুক্তির আলো থইথই করছে। আলো ঝলমল চারধারে তারা ক্রমেই অদৃশ্য হচ্ছেন। তাদের অনুপস্থিতির বিপরীত মাত্রায় আলোটাই হয়ে উঠছে ক্যানসার।
আমি লিখছি, কারণ এই মৃত্যুযাত্রাকে মানতে পারছি না।