[২০ মে ২০০৫, যেদিন ওয়াফা আল-বিস গ্রেপ্তার হন, সেদিন তিনি একটি বিষ্ফোরক বেল্ট পরা ছিলেন। ২১ বছর বয়েসি এ তরুণী বেইত হানুন চেকপয়েন্টে অবস্থানরত ইসরায়েলি সেনাদের নিয়ে নিজেকে উড়িয়ে দেওয়ার মিশনে ছিলেন। ‘ইরেৎজ্’ নামে পরিচিত এ চেকপয়েন্টটি অধিকৃত গাজাকে ইসরায়েল থেকে পৃথক করেছে। তবে মিশন সফল হয়নি। তিনি ধরা পড়েন। বন্দী হন। পরে ১২ বছরের জেল হয়।
১৭ বছর বয়সে ওয়াফা গাজার শিশু মোহাম্মদ আল দুররার মৃত্যুর টেলিভিশন ফুটেজটি যখন দেখেন, তখন তার সামনে পুরো জীবন পড়ে ছিল। মোহাম্মদ আল দুররাকে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি করে হত্যা করেছিল। সে বাবা জামালকে আঁকড়ে ধরেছিল; বাবাও ছেলেকে গুলিবৃষ্টি থেকে বাঁচাতে ব্যর্থ চেষ্টা করছিলেন। এটি ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরের ঘটনা। মোহাম্মদ ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং তার বাবা গুরুতর আহত হন। প্রায় ৫ বছর ধরে চলা (২০০০-২০০৫) গণঅভ্যুত্থান—দ্বিতীয় ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার সময় ঘটনাটি ফিলিস্তিনিদের দেখা ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলোর প্রতীকী চরিত্র হয়ে ওঠে।
শহীদি হামলার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে শেষ ইচ্ছা ও বক্তব্য হিসেবে ওয়াফা একটি চিঠি লিখেছিলেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন, তিনি বুঝতে পেরেছেন, ঠান্ডা মাথায় ছোট শিশু হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার এটিই একমাত্র পথ। এটি হুট করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং ওয়াফা গাজার একটি দলের কাছে প্রায় নয় মাস কঠোর প্রশিক্ষণ নেন। তবে ওয়াফার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। তাঁকে গ্রেপ্তারের ৩ মাস পর সেই প্রশিক্ষকরাও ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে নিহত হন।
সাজা হিসেবে প্রায় সাড়ে ৬ বছর জেল খাটেন ওয়াফা। সেখানে তাঁকে নির্মম নির্যাতন করা হয় এবং ২ বছর নির্জন কারাবাসের সাজা দেওয়া হয়। ১৮ অক্টোবর ২০১১ হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে এক বন্দী বিনিময়ের অংশ হিসেবে শত শত ফিলিস্তিনির সঙ্গে ওয়াফা মুক্তি লাভ করেন। কয়েক মাস পরে, ওয়াফা এক শরণার্থী তরুণকে জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নেন। তাঁদের ফুটফুটে দুটি ছেলে আছে—হাসান ও বারা। পরিবার নিয়ে তিনি গাজার ‘প্রিজনারস সিটি’তে বসবাস করছেন। ওয়াফার যুদ্ধ শেষ হয় না; তিনি কারাগারের দিনগুলোর শারীরিক ও মানসিক ক্ষত, অবরুদ্ধ গাজার কঠিন জীবন ও সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অবিরাম ভয়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার সংগ্রাম করেন।
ওয়াফার বাবা-মা হামামেহ থেকে উদ্বাস্তু হয়েছিলেন। ফিলিস্তিনিদের কাছে নাকাবা বা বিপর্যয় নামে পরিচিত ১৯৪৭-৪৮ সালের জায়নবাদী গণহত্যার সময় ছোট গ্রামটি ধ্বংস হয়ে যায়। এখন তাঁরা অধীর আগ্রহে ইতিহাসসমৃদ্ধ স্বদেশে ফেরার অপেক্ষা করছেন এবং গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে অস্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।]
***
সে ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার। আমি তার নাম দিয়েছিলাম হানান, যার অর্থ মায়া। আমার বোনের নামে। কারণ আমি একা ছিলাম। মা-বাবা ভাইবোনের মমতার স্পর্শ পাই না—অনেক বছর হয়ে গেছে। রামলেহ কারাগারে আমার একাকী কারাবাসের সময়ে সে-ই ছিল আমার একমাত্র সঙ্গী।
হানানের মধ্যে আমি এক ধরনের মানবিকতা খুঁজে পাই; এই ভূগর্ভস্থ ইসরায়েলি অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর থেকে যা খুঁজে পাইনি। কারাগারের উঠোনে সে আনমনে ঘুরে বেড়াত। কারারক্ষীরা আমার দরজার নিচ দিয়ে যে নিম্নমানের খাবার ঠেলে দিত, তা থেকে কিছু রুটির টুকরো দিয়ে আমি তাকে ভোলানোর চেষ্টা করতাম। মমতার সবটুকু ঢেলে দিয়ে তার আস্থা কুঁড়াতে সক্ষম হই আমি। শীর্ণ-ছোট দেহ সত্ত্বেও সে আমাকে ২ বছরের সেই বিচ্ছিন্নতার নিরন্তর অন্ধকার থেকে বাঁচিয়েছিল।
ইসরায়েলের একটি সামরিক আদালত আমাকে ২ বছরের নির্জন কারাবাসের সাজা দেওয়ার পরই হানানের সঙ্গে আমার গল্পের সূচনা। ইসরায়েলি এক নারী কারারক্ষীকে ধারালো বস্তু দিয়ে আক্রমণের শাস্তি হিসেবে এ আদেশ এসেছিল। ওই কারারক্ষী আমাকে অনেক দিন ধরে নির্যাতন করছিল। উঠতে-বসতে উপহাস করত এবং ‘সন্ত্রাসী’ বলে ডাকত। একদিন হাসতে হাসতে বলল, ‘তোমাকে রিক্রুট করা সেই সন্ত্রাসীকে আমরা এইমাত্র হত্যা করেছি।’ তখন সে আমার প্রকোষ্ঠের বারের খুব কাছে ঝুঁকে পড়লে আমি বিনা দ্বিধায় লাফিয়ে উঠি এবং তার মুখ কেটে দিই।
নির্জন কারাবাসের আগে আমাকে সাধারণ অপরাধীদের সঙ্গে রাখা হয়েছিল। তারা সবাই ছিল ইসরায়েলি। তারাও আমার মনোবল ভাঙার চেষ্টা করেছিল। তবে যখন আমাকে আদালতের আদেশে অতিরিক্ত সাজা দেওয়া হয়, তখন আমাকে ‘সেল নম্বর-৯’-এ একা রাখা হয়। সেখানে আমার কষ্ট অনেক বেশি বেড়ে যায়। শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার বাড়তে থাকে। তবে আমি শক্ত থাকার সংকল্প করি। আল্লাহর প্রতি অটুট বিশ্বাস, অনবরত দোয়া এবং পবিত্র কোরআন তিলাওয়াতের কারণে আমার মনোবল শক্ত ছিল। মাঝেমধ্যে ছবি আঁকতাম। পেশাদার আঁকিয়ে নই; তবে অনুভূতিগুলোকে কাগজে তুলে আনলে ভয়-উৎকণ্ঠা দূর হয় বলেই আঁকতাম।
‘ফৌরা’য় তথা আমাকে যে অল্প সময়ের জন্য প্রকোষ্ট ছেড়ে কারাগারের উঠোনে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হত, ওই সময়েই হানানের সঙ্গে আমার দেখা। উঠোনটি ছিল উঁচু দেয়ালে ঘেরা ছোট পাকা জায়গা। অনেকটা খাঁচার মতো নকশা। হানানের সঙ্গে দেখা হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার এ ফাঁদের জীবন অসহ্য লাগত। তার পিঙ্গলরঙা চোখগুলো বেশ সুন্দর ও নিষ্পাপ ছিল। হতাশায় পূর্ণ সেই খাঁচায় আমি তার চোখে আশার আলো দেখতে পেয়েছিলাম।
আমার আদুরে হানান অনেক অনেক কিউট ছিল। তাকে আমি পালতে শুরু করি। যত্ন নিই, সাজাই-পরাই এবং খাবার ভাগাভাগি করি। কারা কর্তৃপক্ষ কখনো আমাকে শাস্তি হিসেবে খাবার কম দিলে পুরোটাই হানানকে দিয়ে দিতাম। কারণ যেটুক ভালোবাসা আমি তাকে দিতে পারতাম, তার কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও উষ্ণতা এর চেয়ে ঢের বেশি ছিল। তার সঙ্গে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অন্তরঙ্গ বন্ধুর মতো কথা বলতাম। আমি বুঝতে পারতাম, সে আমার দুর্দশা দেখে গভীর দুঃখবোধ করত এবং সত্যিই আমার যন্ত্রণা অনুভব করত। সে যখনই ঘাড় ঝাঁকাত, আমি বুঝতাম সে বলছে, ‘হ্যাঁ, তোমার কথা শুনেছি এবং তোমার যাতনা আমি অনুভব করি।’
আমার প্রকোষ্ঠ মাটির নিচে ছিল। প্রথমেই হানানের সঙ্গে উঠোনে যাই এবং পরিত্যাক্ত পিচবোর্ড দিয়ে তার জন্য একটি ছোট ঘর বানিয়ে দিই। ‘ফৌরা’-এর সময়ে যখন আমি বাইরে যেতাম, তখন তার জন্য প্রকোষ্ঠ থেকে খাবার নিয়ে যেতাম এবং সেই ছোট ঘরে রেখে দিতাম। এভাবেই তাকে নতুন ঘরে থাকতে অভ্যস্থ করে তুলি। আমাদের বন্ধুত্ব গাঢ় হওয়ার পর সেলে সে আমাকে খুঁজতে আসত। প্রতি শুক্রবারে খাবারের সঙ্গে আমাকে মুরগির একটি টুকরো দেওয়া হত। তা আমি হানানের জন্য রেখে দিতাম। কারণ আমার হানান মাংস খেতে ভালোবাসত। আমি সেলের দরজায় এলেই সে বুঝতে পারত এবং দৌড়ে আসত। সে কাছে এলে আমি সেলের দরজার ফাঁক দিয়ে সামান্য হাত বের করে আদর করতাম। দরজা দিয়ে উঁকি দিয়ে তার চোখগুলো দেখতাম এবং দীর্ঘক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলতাম। অনেক সময় তাকে বলতাম, আমি ভীষণ একা; সেলের দেয়ালগুলো আমার দম বন্ধ করে রেখেছে। বলতাম, বন্দীদশায় আমার অনেক কষ্ট হয়; অথচ কেউই আমার কষ্ট বোঝে না। বলতাম, আমার পরিবারের সাক্ষাৎ কত বেশি মিস করি; বছরের পর বছর আমার সঙ্গে তাদের দেখা করতে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রাখা হয়েছে। তাকে আরও বলতাম, আমার সঙ্গে অনেক অন্যায় আচরণ হয়েছে এবং পৃথিবীতে এটি আমার জায়গা নয়। হানান আমার দিকে অপলক তাকিয়ে থাকত এবং প্রতিটি শব্দে নিজেকে লেপ্টে নিত। যেন সে আমার সব যন্ত্রণা হৃদয় দিয়ে অনুভব করছে!
একদিন কারারক্ষীর কাছে আমি এককাপ চা চাইলাম। কারণ তখন আমার প্রকোষ্ঠে সব ধরনের খাবার বা পানীয় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। সে রাজি হলো দেখে আমি অবাক হলাম। চায়ের কাপ নেওয়ার জন্য সে আমাকে দরজার ছোট ফাঁক দিয়ে হাত বের করতে বললে আমি তা-ই করি। তখনই সে আমার হাতজুড়ে ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়। সেই থার্ড ডিগ্রির পোড়া এখনও আমাকে নিদারুণ যন্ত্রণা দিয়ে চলেছে। আমি এখনো আশাবাদী, কোনো একদিন কেউ এ ক্ষতের চিকিৎসা করাতে আমাকে সাহায্য করবে। সেদিন আমি দহনযন্ত্রণায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা চিৎকার করেছি; হানান ছাড়া কেউই আমাকে বাঁচাতে আসেনি। সে আমার দরজায় দৌড়ে আসে এবং কেঁদে ফেলে। আমরা একসঙ্গে অনেকক্ষণ কেঁদেছিলাম সেদিন।
কিছুদিন পরে বুঝতে পারি, হানান গর্ভবতী হয়েছে। তার পিচবোর্ডের ঘরটি শক্ত করে বেঁধে দিই এবং সেলে রাখতে দেওয়া দুটি কাপড়ের একটি সেই ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে দিই আমি। আমার প্রিয় সাদা কাপড়টি তাকে দিয়ে দিই। সেটিকে ছোট ছোট টুকরো করে কেটে মেঝেতে বিছাই। এরপর বাড়তি নিরাপত্তার জন্য পুরো বাক্সটি উঠোনের ভ্রাম্যমাণ টয়লেটের পেছনে সরিয়ে রাখি। যখন সে বাচ্চা প্রসব করে, তখন তার ও তার ছানাদের জন্য খাবারের পরিমাণ বাড়িয়ে দিই।
তবে কারারক্ষীরা বিষয়টি জেনে যায়। তারা বলে, ‘এটি অগ্রহণযোগ্য ও ঘৃণ্য কাজ।’ আমি তাদের সামনে কেঁদে ফেলি। চিৎকার করে বলি, ‘প্লিজ, আমার বন্ধুকে আমার কাছ থেকে দূরে নিয়ে যেয়ো না। প্লিজ, আমাদের বিচ্ছিন্ন করো না।’
বুঝতে পারলাম, তারা আমাকে এমন হতাশ দেখে আমোদ পাচ্ছিল। আমার যন্ত্রণা বাড়াতে তারা হানান ও তার বাচ্চাদের বিষপ্রয়োগ করে। আমার চোখের সামনেই, ছোট ছোট ছানাগুলো তাদের মায়ের কোল আঁকড়ে ধরছিল এবং ব্যথায় কাতরাচ্ছিল। আমি তাদের পাশে বসে কাঁদছিলাম এবং আল্লাহর দয়া প্রার্থনা করছিলাম। কারারক্ষীরা হাসছিল এবং লাথি দিচ্ছিল। বাচ্চাগুলো যন্ত্রণায় কাতর হয়ে সজোরে মেয়াঁও মেয়াঁও করছিল। এক দামড়া কারারক্ষী ভারী বুট হানানের মুখের ওপর রাখে এবং পিষে দেয়। আজও আমি তাদের বাঁচার আকুতি শুনতে পাই। আমি পাগলের মতো কারাগারের উঠোনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা আমার প্রিয় বন্ধু ও তার বাচ্চাগুলোর মৃতদেহ এবং রক্তবন্যার ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে থাকি। হানানই আমার একমাত্র আশার আলো ছিল। সে আমাকে শক্তি দিচ্ছিল। অথচ ইসরায়েলিরা নির্দয়ভাবে তাকে পিষে ফেলল।
হানান ও তার ছোট বাচ্চাগুলোর মৃত্যুর পর আমি প্রকাশ্য অনশন শুরু করি। আমার কোনো দাবি ছিল না। তাদের নির্মমতার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে আমি কেবল এই মানবিক কাজটি করারই ক্ষমতা রাখতাম। ঘৃণায় ডুব দেওয়া ইসরায়েলিরা এতই অন্ধ হয়ে গেছে যে চূড়ান্ত কাণ্ডজ্ঞানহীন হয়ে পড়েছে। কী অপরাধ ছিল আমার হানানের? কেন তাকে এত কষ্ট দেওয়া হলো? তার একমাত্র অপরাধ ছিল, মুক্তির জন্য লালায়িত এক নিঃসঙ্গ বন্দিনীকে সে আশার আলো দেখিয়েছিল।
যতদিন এ নিঃশ্বাস থাকবে, হৃদয়ের মণিকোটায় বেঁচে থাকবে আমার প্রিয় হানান।
[সূত্র : রামজি বারুদ, দিজ চেইনস উইল বি ব্রোকেন, পৃ ১১-১৮, ক্যারিটি প্রেস, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র, ২০২০।]