সকাল থেকে অবিরাম বৃষ্টি পড়ছে। তুমুল বর্ষণে ভেসে যাচ্ছে মসজিদ-সংলগ্ন মাঠ। ডুবে গেছে সবুজ ঘাসের কার্পেট। আসরভাঙা বারান্দায় আমি বসে একা। জুহরের আজান হবে এখনই। বারান্দা ঝাড়ুপোছার প্রয়োজনে আসর ভেঙে দেওয়া হয়েছে। আর জমেনি। এভাবেই হয়তো আজ সন্ধ্যায় আমাদের নয়দিনের আসরটাও ভেঙে যাবে। ছাত্রজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটিয়ে রমজানের পর থেকে শিক্ষকজীবন শুরু করব। লুতফুর ভাই পরামর্শ দিয়েছেন, এ সময় রুজু ইলাল্লাহ থাকাটা খুব জরুরি। তাই যেন ইতেকাফে বসে যাই। মালিবাগ বাগানবাড়ি মুফতি হাফীজুদ্দীন সাহেবের মসজিদের জমজমাট ইতেকাফের আয়োজন বন্ধ হয়ে গেছে কমিটির অপছন্দে। এত মানুষের সমাগম তাদের পছন্দ না। বিকল্প স্থান কী হতে পারে ভাবতেই লুতফুর ভাই দেওনার প্রস্তাব দিলেন। এতে এক ঢিলে দুই পাখি শিকার হবে। ইতেকাফও হবে আবার আব্বাকেও খুশি করা যাবে।
আমার আব্বা মাওলানা আব্দুর রহমান ফরায়েজি রহ. ছিলেন শায়েখে দেওনা অধ্যক্ষ মিজানুর রহমান সাহেবের প্রেমভক্ত মুরিদ ও খলিফা। একজন আলেম হয়েও তিনি কেন দেওনার দেওয়ানা হলেন এ নিয়ে বহু প্রশ্ন, বহু কৌতূহল আছে অনেকের। আব্বার ইন্তেকালের পর জনপ্রিয় আলোচক মাওলানা খালিদ সাইফুল্লাহ আইয়ুবি আমাদের বাড়ির প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক মাহফিলে একবার বলেছিলেন, আমি ফরায়োজি সাহেবকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি জবাব দিয়েছেন, সুন্নতের প্রতি শায়েখে দেওনার যে অগাধ ভালোবাসা এটিই আমাকে তার দরবারে টেনে নিয়েছে। আমি তাকে মহব্বত করি সুন্নতের প্রতি তার ভালোবাসার কারণে।
প্রথম উদ্দেশ্যটি খুব সফলভাবে সম্পন্ন হয়ে যায়। আব্বা শুধু খুশিই হননি, নিজে এসে আমাকে দিয়ে গেছেন। যেন আমি এই ছোট্টটি, একা পথ হারিয়ে ফেলব। এক-দুইবার মিনমিনে কণ্ঠে প্রতিবাদ জানানোর চেষ্টা করেও আব্বার ধমক খেয়ে থেমে গেছি। ২০ রমজান আসরের একটু আগে আমরা দেওনা এসে পৌঁছাই। আসর থেকে মাগরিব শায়েখের বয়ান। বাদ মাগরিব আব্বা চলে যান। আমি রয়ে যাই মসজিদে। সত্যি, প্রচন্ড একাকিত্ব বোধ হচ্ছিল। ছোটবেলায় নতুন মাদরাসায় ভর্তি হলে যেমন লাগত, তেমনি। মসজিদ গমগম করছে নানা বয়সি মানুষে। মাদরাসার ছাত্র আছে কয়েকজন, সদ্য শিক্ষা সমাপনকারীও আছে। তরুণ শিক্ষক আছেন। প্রবীন, মধ্যবয়সি ও বয়স্ক লোকের তো অভাবই নেই। কিন্তু সবার মাঝেও আমি যেন প্রচন্ড একা! কাউকে চিনি না। কে আমার ব্যাপারে কী ভাবছে তাও জানি না। কিংবা আদৌ কিছু ভাবছে কি না তারই বা কে খবর রাখে!
খাবার শেষে ঘুমুতে যাওয়ার আগে শায়েখের এক খলিফা এসে বললেন, সেহরি থেকে তুমি আমাদের সঙ্গে খাবে। মসজিদের উত্তর-পূর্ব কোণে শায়েখের কয়েকজন খলিফা একসঙ্গে খাবার খান। তাদের জন্য স্পেশাল ব্যবস্থা থাকে। আব্বার পরিচয়ের কারণেই আমি সেখানে বসার টিকিট পেয়ে গেলাম। প্রথম রাতটা খুবই সংকোচ, অস্বস্তি ও একাকিত্বে কাটল। দশটা দিন কীভাবে কাটাব এটিই এখন মূল চিন্তা। কিন্তু সব চিন্তার অবসান ঘটে গেল পরদিন দুপুরের মধ্যেই। তরুণ ছাত্র ও সদ্য ফারেগীন কয়েকজন যেচে আমার সঙ্গে এসে পরিচিত হলো। এদের মাঝে আমার দুটি পরিচয় ইতিমধ্যেই রটে গেছে। আমি ‘মুফতি সাহেব’ এবং দেওবন্দে পড়েছি। ফলে আমার ব্যাপারে তাদের মধ্যে খেলা করছে এক অপার কৌতূহল। হয়তো ভেবেছিল এতসব ভারি লকবের ভার মাথায় নেওয়া আমি বেশ রাশভারি ব্যক্তি হব। কিন্তু আদতে দেখা গেল তার উল্টোটা। আমিও কথা বলার মানুষ পেয়ে হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। মিশে গেলাম ওদের সঙ্গে।
এই পরিচয়-পর্ব আমার জন্য লাভজনক হয়েছে না ক্ষতিকর—এ নিয়ে এখন প্রশ্ন তোলাই যায়। কারণ ডাইরি ঘেঁটে দেখলাম, প্রথম দুই/তিনদিন আমি খুবই গুরুত্ব সহকারে ডাইরি লিখেছি। কিন্তু পরিচয় যত গভীর হয়েছে আমি ডাইরি থেকে সরে এসেছি। কথা বলার জন্য রক্ত-মাংসের মানুষ থাকতে নিজের সঙ্গে কথা বলার সময় কোথায়? তাছাড়া সম ও কাছাকাছি বয়সি বেশ কয়েকজন একসঙ্গে হয়ে যাওয়ার কারণে আড্ডা-গল্পই বেশি হত। যা ইতিকাফ অবস্থায় কখনো কাম্য নয়। তবে ভালো কিছুই যে হয়নি তাও নয়। সদ্য ফারেগ হওয়া একটা ছেলে আমার কাছে হেদায়া-৩ ও নুরুল আনওয়ার পড়ত। রোজার পর ইফতায় ভর্তি হবে, তারই প্রস্তুতি। আরেকজন তো আমাকে তার তালিমি মুরুব্বিই বানিয়ে ফেলল। ওখান থেকে চলে আসার পরও দীর্ঘদিন যোযোযোগ ছিল। যেকোনো সমস্যায় পরামর্শের জন্য ফোন করত। সে ছিল ওয়াজের ভক্ত। দেশের নামি সব বক্তা ও তাদের ওয়াজ তার মুখস্থ। যে কোনো ইস্যুতে কথা এলেই সে কোনো না কোনো বক্তার উদ্বৃতিতে কিছু কথা শুনিয়ে দিতে পারবে। তার কাছে এই ছিল জ্ঞান আহরণের উৎস। আমি ঠিক তার উল্টো। ভাইরাল বক্তা ছাড়া কাউকে তেমন চিনি না। ওয়াজও তেমন শোনা হয় না। আমি চিনি বই আর লেখক। নিজের স্বভাব তার মধ্যে স্থানান্তরের খানিকটা চেষ্টা করেছিলাম। ওয়াজকে জ্ঞান আহরণের বিশ্বস্ত মাধ্যম না বানিয়ে বইয়ের দ্বারস্থ হতে বলেছিলাম। খুব বেশি সফল হয়েছি বলে মনে হয়নি।
শায়েখ প্রতিদিন দুইবেলা বয়ান করেন। বাদ আসর কিছুক্ষণ কোরআন মশক চলে। দুজন দুজন বসে পরস্পরকে ছোট্ট কোনো সুরা শোনায়। ভুলত্রুটি থাকলে ধরিয়ে দেয়। এরপর ইফতারের পূর্ব পর্যন্ত শায়েখের বয়ান। বাদ ইশা তালিমের পর আরেক দফা বয়ান করেন। বয়ানে আখলাক ও চরিত্র গঠনের আলোচনা প্রধান থাকে—যা থানবি সিলিসিলার অনন্য বৈশিষ্ট। কখনো বিষয়ের ডালপালা ছড়িয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়েও চলে যায়। মুসলিমবিশ্বের জন্য, বিশেষ করে নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য তার হৃদয়ের ব্যথা টের পাওয়া যায় তখন। সকাল দশটার দিকে দুজন দুজন গ্রুপ করে তেলাওয়াতের মশক হয়। আমার সঙ্গে যে ছেলেটি জুটেছে সে কলেজে পড়ে। আগেও এসেছে। তেলাওয়াত ঠিক করার জন্য আলাদা সময় দিয়েছে। তেলাওয়াতও মাশাআল্লাহ শুদ্ধ।
বাদ জুহর নির্দিষ্ট কোনো বয়ানের শিডিউল নেই। শায়েখের বিশেষ কোনো খলিফা এলে তাকে বয়ান করতে দেওয়া হয়। আমরা যেদিন বসেছি তার পরের দিনই খ্যাতনামা আলোচক মাওলানা আব্দুল বাসেত খান এসেছিলেন। বয়ানে বসেই তিনি একটি প্রশ্নের উত্তর দেন, কেন তিনি একজন যোগ্য আলেম হয়েও নন-আলেম ব্যক্তির কাছে মুরিদ হয়েছেন। তিনি জবাব দেন দুইভাবে—কেতাবি পরিভাষায় আমরা যাকে ইলযামি জবাব এবং তাসলিমি জবাব বলি। তার ইলযামি জবাব ছিল এ রকম: যে কারণে মুফতি শফি রহ. তার দুই যোগ্য আলেম সন্তান মুফতি রফি উসমানি ও মুফতি তকি উসমানিকে নন-আলেম আবদুল হাই আরেফি রহ.-এর কাছে বায়াত হতে পাঠিয়েছিলেন একই কারণে আমিও শায়েখে দেওনার হাতে বায়াত হয়েছি। আর তাসলিমি জবাব হলো, হযরত আবরারুল হক হারদুয়ি রহ.-এর যত খলিফা আছেন প্রত্যেকেই বড় আলেম, মুফতি, মুহাদ্দিস ও শাইখুল হাদিস ইত্যাদি। এগুলো তাদের প্লাস পয়েন্ট ছিল। কিন্তু আমার শায়েখের কোনো প্লাস পয়েন্ট ছিল না। তিনি শূন্য পাত্র নিয়ে শায়েখের কাছে গিয়েছেন। শায়েখের ছায়ায় নিজেকে গড়েছেন। আত্মশুদ্ধির মাপকাঠিতে শতভাগ উত্তীর্ণ হয়ে স্বীকৃতিস্বরূপ খেলাফত লাভ করেছেন।
দেওনা মাদরাসা-মসজিদে ২৫ শাবান থেকেই কেরাতের মশক হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের কেরাত বিভাগের সাবেক প্রধান এবং কেরাত শাস্ত্রের মহিরুহ ব্যক্তিত্ব মাওলানা আবুল হাসান আজমি এবং দারুল উলুমের আরেকজন শিক্ষক কারি ইরশাদ সাহেব মশকের ক্লাস করান। ২২ রমজান ছিল কারি ইরশাদ সাহেবের শেষ দরস। মানুষটিকে দেখে আমি একটু অবাক হই। দেওবন্দে তাকে কতবার দেখেছি। হয়ত এক-দুবার সালামও দিয়েছি। কিন্তু বিশেষ কোনো অনুভূতি হয়নি। অথচ আজ তিনি আমাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে গেলেন। পরদিন বিদায় নেন কারি আবুল হাসান আজমি সাহেব। এদিন তিনি ফজরের জামাতে ইমামতি করেন। এই প্রথম তাকে সামনাসামনি দেখি। দেওবন্দের এক মাকতাবায় একদিন তার রসমুল খত বিষয়ক একটি পুস্তিকা দেখে সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেলেছিলাম। পরে বইটির ব্যাকপেইজে তার কেরাত বিষয়ক অন্যান্য রচনার তালিকা দেখে আমার ভিরমি খাওয়ার জোগাড়। কেরাত বিষয়ক কোনো দিকই তিনি বাদ রাখেননি। দারুল উলুমের কেরাত বিভাগে তিনি ‘সাবেক’ দেখে সেদিন দারুন আফসোস হয়েছিল। সাক্ষাতের সাহস না হলেও অন্তত চোখের দেখাটা তো দেখতে পেতাম! আজ দুই বছর পর সেই আফসোস দূর হলো।
নামাজে আজমি সাহেবের মায়াবি তেলাওয়াতে হারিয়ে গিয়েছিলাম। কৃত্তিমতা বিবর্জিত অসাধারণ যত তেলাওয়াত জীবনে শুনেছি আজমি সাহেবের তেলাওয়াত তার মাঝে অনন্য হয়ে থাকবে। নামাজ শেষ হয়ে যায়, তেলাওয়াতের রেশ কাটে না। পরে শায়েখ এর খোলাসা করেন। বলেন, হযরত হারদুয়ি এভাবে তেলাওয়াত করতেন। আর তিনি নকল করতেন হযরত থানবিকে। এই এত বছর পর হতভাগা আমি দেওনার মসজিদে দাঁড়িয়ে থানবি-তেলাওয়াতের প্রতিধ্বনিতে অবগাহন করলাম, এই সৌভাগ্য আমি কোন শব্দে ধারণ করব?
এভাবেই ঘটনাবহুল নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে দিনগুলো একে একে শেষ হয়ে এসেছে। সকাল-দুপুর কেটে গড়িয়েছে পড়ন্ত বিকেলে। এবার বিদায়ঘণ্টা বাজতে শুরু করেছে বরকতময় মাহিনার, সঙ্গে আমাদেরও। দুইদিন ধরে এলাকায় ঈদ-সামগ্রী বিতরণ হচ্ছে। শায়েখে দেওনা নিজ তত্ত্বাবধানে প্রতি বছর এলাকাবাসীর জন্য ঈদ-সামগ্রী বিলি করেন। দেখেই মনে হয়, প্রকৃতিতে ঈদের আমেজ শুরু হয়ে গেছে। যদিও আমরা চার দেয়ালের ভেতর বন্দী পাখি। মসজিদের দক্ষিণ পাশে উঁচু দেয়ালের ওপাড়ে রাস্তা। উত্তর ও পুবে মাদরাসার মাঠ ও ভবন, পশ্চিমে কবরস্থান। বাইরের পৃথিবী থেকে মোটামুটি বিচ্ছিন্ন জীবন। এবং অনুভব করলাম, নিজেকে সত্যিকার অর্থেই বন্দী লাগছে। মনে হচ্ছে, বাইরের পৃথিবীতে কত কী ঘটে যাচ্ছে। আমরা ভেতরে বসে সবকিছু মিস করছি। অথচ আমি নিশ্চিত, যদি আমাকে বের হওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয় আমি একবারের জন্য দেয়ালের বাইরে উঁকি দিয়ে দেখব না। এমনই ঘরকুনো আমি। তবে কেন বাধ্যতামূলক বন্দীজীবনে এই অস্থিরতা! বন্দী হলে উড়তে ইচ্ছে করে, অথচ উড়ার স্বাধীনতা পেলে শরীর কুঁকড়ে যায়। এই দ্বিচারিতার রহস্য কী?
বিকেল থেকেই বাঁধাছাদা শুরু হয়ে গেল। চাঁদ উঠে যাবে, একথা অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়। কারণ গতকাল সৌদি আরবে চাঁদ দেখা গেছে। সৌদিতে চাঁদ উঠলেই বাংলাদেশেও উঠবে—এমন কোনো কথা শরিয়ত নির্ধারণ করে না দিলেও বাস্তবে তাই হয়ে আসছে। সবাই তাই সৌদির দিকে তাকিয়ে থাকে। পরীক্ষার আগে প্রশ্নফাঁসের মতোই সৌদির চাঁদের হিসেবে আমাদের চাঁদের সংবাদ ফাঁস হয়ে যায়। সে মতে সন্ধ্যায় আব্বা চলে এলেন সিএনজি নিয়ে। ইফতার শেষে আমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। কিন্তু চাঁদ কোথায়! ইফতার পেরিয়ে গেল। ইশার সময় হয়ে এলো। অথচ কর্তৃপক্ষ চাঁদের কোনো সংবাদ দিতে পারলেন না। জামাতের সময় হয়ে গেছে। যেহেতু চাঁদ উঠার সংবাদ আসেনি, সবাই মিলে তারাবিহ আদায় করলাম। আব্বা হতাশ চেহারায় বিদায় নিলেন। বরকতময় মাসের আরও একটি দিন পাওয়া যাচ্ছে। উচিত ছিল রাতটিকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করা। কিন্তু ভাঙা আসর জমানো বেশ মুশকিল। আমাদের ইবাদতের আসরও তেমন জমল না। সবার ভেতরেই অস্থিরতা। এর মধ্যে আবার এক ছাত্রের মাধ্যমে মাদরাসার ওয়াইফাইয়ের পাসওয়ার্ড পেয়ে গেছি। এতদিন ব্যবহার করিনি। মোবাইলই বন্ধ করে রেখেছিলাম। আজ চাঁদ উঠার সংবাদ জানতে খুলেছি, আর বন্ধ করা হয়নি। কারণও আছে। ফেসবুকজুড়ে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। ব্যতিক্রম কিছু ঘটে যেতে পারে, এরকম আভাস। এই উত্তেজনা রেখে সরে আসি কীভাবে!
অবশেষে সংবাদ এলো। রাত প্রায় এগারোটার দিকে সংবাদ এলো—চাঁদ উঠেছে! অনেকেই রসিকতা করে বলল, রাতের ভোটের সরকারের চাঁদ তো মধ্যরাতেই উঠবে। কিন্তু সকল রসিকতা ছাপিয়ে আমার ভেতরে শুরু হলো চরম অস্থিরতা। দশ দিনের ইতেকাফে সব কাপড় ময়লা হয়ে গেছে। বাড়িতে ইস্ত্রি করা কাপড় আছে। কিন্তু ঈদ যদি এখানে করতে হয় তবে কী করব? এই ময়লা কাপড়ে ঈদ উদযাপন করব? এই গভীর রাতে বাড়িই বা ফিরব কীভাবে? দেওনা থেকে মনোহরদী যাওয়ার সোজা কোনো পথ নেই। সরাসরি কোনো যান-যোগাযোগ নেই। অঞ্চলটাও খানিক জংলা মতো। এবং গহীন। এত রাতে একা এখান থেকে রওনা হওয়ার প্রশ্নই উঠে না। ভেবে ভেবে সারা হচ্ছি, তখনই সংবাদ পেলাম, নরসিংদী থেকে যে বহরটি এসেছে তাদের জন্য গাড়ি আসছে। এসেছিল আগেও, কিন্তু সন্ধ্যার পর চাঁদ উঠেনি জেনে ফিরে গেছে। এখন নতুন গাড়ি আসছে। চাইলে কিছু অর্থ খরচ করে তাদের সঙ্গে জুটে যেতে পারি।
আমি এক কথায় রাজি হয়ে গেলাম। বাড়ি যখন ফিরেছি ঘড়িতে সময় তখন প্রায় তিনটা। গিয়েছিলাম অপরিচিতের মতো, দুরুদুরু বুকে। আজ ফেরার সময় মনে হলো, সব আপনজনদের ফেলে আমি যেন কোথায় চলে যাচ্ছি। হুমায়ূন আহমেদ যথার্থই বলেছেন—মানুষ বৃক্ষের মতো; এক জায়গায় কিছুদিন থাকলেও শেকড় গজিয়ে যায়!