ইসলামী আধুনিকতা, গণতন্ত্র, জিন্নাহ ও ভারতের মুসলমানদের বঞ্চনা

মূল : শারজীল ইমাম

আমাদের কখনোই কারো সম্পর্কে শুধু সেই ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয় যেভাবে তার প্রতিপক্ষরা তাকে উপস্থাপন করে—বিশেষত যখন তিনি আমাদের মতাদর্শিক সহযাত্রী হন। আমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই ঘটেছে। দিল্লির শাহিনবাগ ও জামিয়ায় ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনবিরোধী আন্দোলনের সময় এক মাস ধরে মাঠে নেমে কাজ করা ও বক্তৃতা করা, আর এক দশকের ধারাবাহিক গবেষণা ও লেখালেখি—সবকিছুই উপেক্ষিত হয়েছে একটি ক্লিপের কারণে, যা ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও তাদের সমর্থকেরা কৌশলে ছড়িয়ে দিয়েছিল। আরও একটি বড় কারণ হলো—আমি ‘কংগ্রেসীয় জাতীয়তাবাদের’ ভুক্তভোগী হিসেবে, মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর চিন্তাভাবনা নিয়ে গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা করি।

১৯৪৬ সালের ক্যাবিনেট মিশন পরিকল্পনাকে ভণ্ডুল করেছিলেন জিন্নাহ নন—বরং জওহরলাল নেহরু। সব পক্ষ পরিকল্পনাটিকে মেনে নেওয়ার পরও নেহরুই তা বিপর্যস্ত করেন (দেখুন মৌলানা আজাদের India Wins Freedom; এছাড়া আকার প্যাটেলের The Constitution that wasn’t—or, a Muslim man’s vision of Independent India, ন্যাশনাল হেরাল্ড, ২৬ জানুয়ারি ২০২৫)। ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, সংখ্যালঘু ও সম্প্রদায়ের অধিকার—এসবের আলোচনার ক্ষেত্রে জিন্নাহ আজ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমি যখন তার কথা উল্লেখ করি, সেটি এই প্রেক্ষিতেই বোঝা উচিত। পার্থসারথি গুপ্তের ভাষায়, আমার আবেদন হলো ‘দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এক ধরনের সংঘীয় রাজনীতি ও কনফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করার জন্য’। (দেখুন গুপ্তের Identity Formation and Nation States, ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি কংগ্রেস, পটিয়ালা, ১৯৯৮)। তিনি আরও লিখেছেন, আমাদের নিজেদের দেশেই যদি আমরা ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের কেন্দ্রীয়তাবাদী বৈশিষ্ট্যগুলো দূর করে ভারতকে সত্যিকারের একটি ফেডারেশনঅর্থাৎ রাষ্ট্রসমূহের সংঘরূপে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারব এবং সেক্ষেত্রে সার্কভুক্ত রাষ্ট্রগুলোকে জনগণের একটি প্রকৃত কনফেডারেশনে রূপান্তরিত করা সম্ভব হবে…”

আপনি আমার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু যে রূপটি ট্রল বাহিনী আমার সম্পর্কে মানুষের মনে তৈরি করতে চায় তার ভিত্তিতে বিচার করা সমস্যাজনক। একইরকম সমস্যাজনক আমাকে ‘উন্মাদ’ বলা বা ‘বিজেপির এজেন্ট’ বলা শুধু এই কারণে যে, আমার বিরোধীরা আমার অবস্থানকে হজম করতে পারে না। ‘প্রগতিশীল’ বলে পরিচিত কিছু মিডিয়া ও মতামতপ্রকাশকারীরা (মুসলিম ও অ-মুসলিম উভয়ই) যেভাবে আমাকে চুপ করিয়ে দিতে চেয়েছে এবং শাহিনবাগ আন্দোলনে প্রথম দিন থেকে অষ্টাদশ দিন পর্যন্ত আমাদের নিরলস ও সিদ্ধান্তমূলক ভূমিকা মুছে দিতে চেয়েছে তার প্রমাণ হলো: শাহিনবাগ নিয়ে লেখা বহু বইয়ে আমাকে, আসিফ মুজতবা, আফরিন ফাতিমা বা অন্যদের নাম পর্যন্ত উল্লেখ করা হয়নি। এতে বোঝা যায় এই অংশ হয় অসৎ, নয়তো বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া। তবে আলহামদুলিল্লাহ, এই যুগে সত্য চিরদিন চাপা থাকে না। আমার কোনো অভিযোগ নেই; শুধু বিষয়টি ইঙ্গিত করছি। আল্লাহর প্রতি ঈমান এবং আমার জনগণের ভালোবাসাই আমার জন্য যথেষ্ট।

 

ঈমান সম্পর্কে 

“আমার বুদ্ধিবৃত্তির কারণে আমি নৈরাশ্যবাদী আর আমার ইচ্ছাশক্তির কারণে আশাবাদী” গ্রামশি এ কথাটি বলেছেন বলে মনে করা হয়। আমার ক্ষেত্রেও একই সত্য প্রযোজ্য, যদিও আমি একটু পরিবর্তিত রূপটি পছন্দ করি: আমার বুদ্ধির কারণে আমি নৈরাশ্যবাদী, আর আমার ঈমানের কারণে আমি আশাবাদী। কেউ কেউ হয়তো “ইচ্ছা” এবং “ঈমান”–কে একই বলে মনে করতে পারে, কিন্তু আমার জন্য এবং আমার মতো ইসলামী বিশ্বাসে বেড়ে ওঠা মানুষের জন্য আল্লাহর প্রতি ঈমান ছাড়া “ইচ্ছাশক্তি” আসলে অর্থহীন। আল্লাহর একটি মহান “ইচ্ছা” বা “ইরাদা” আছে আর আমাদের ছোট ছোট ব্যক্তিগত ইচ্ছাগুলো সেই মহান ইচ্ছার প্রতি ঈমান রাখলে তবেই অর্থপূর্ণ ও আশাব্যঞ্জক হয়। সেই “ইচ্ছা” এমন কিছু, যার গভীরতা আমরা কখনোই অনুধাবন করতে পারি না, শুধু ঈমান রেখেই এগোতে হয়।

অন্যভাবে বলতে গেলে ইতিহাস ‘অজানাযোগ্য’, বর্তমানও ‘অজানাযোগ্য’, আর ভবিষ্যতের গতিপথও ঠিক তেমনই ‘অজানাযোগ্য’। আমাদের হাতে যা আছে, তা কেবলই অসম্পূর্ণ অনুমান, কখনো স্রেফ ভুল ধারণা ও ভুল কল্পনা। কোনো মানুষ নিজের অবদান বা সমগ্র সৃষ্টির পরিকাঠামোর মধ্যে নিজের অবস্থানকে বুঝতে চাইলে ঈমান ছাড়া তা অসম্ভব। অনেকে আছেন যাঁরা নিজেদের জীবনে দ্রুত পরিবর্তন দেখতে ব্যাকুল, যেন বিপ্লব ঠিক কোলের কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই মানসিকতার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মৌলিক পরিবর্তনের যে ধৈর্য প্রয়োজন, তা তাদের নেই। এই ধৈর্য, নিজেকে আড়াল করে রাখার ধৈর্য কেবল ঈমান থেকেই আসে। আল্লাহর প্রতি ঈমানই আমাকে ইতিহাসবিদ্যার দিকে টেনেছে; ঈমানই আমাকে কারাগারে টিকে থাকতে শক্তি দেয়; আর ঈমানই আমাকে আমার জীবন ও জীবনের কাজকে দশকের নয় শতাব্দীর পরিসরে বুঝতে সাহায্য করে। 

আমি এখন পর্যন্ত পাঁচ বছর কারাবন্দি জীবন কাটিয়েছি। আবারও বলতে চাই এই বছরগুলোই আমার জীবনের সবচেয়ে ফলপ্রসূ সময়। শুধু যে অসংখ্য বই পড়তে পেরেছি তা-ই নয়; বরং এই সময়ে বহু রাজনৈতিক বন্দীর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আসামের মানুষদের সঙ্গে ছয় মাস একসাথে থেকেছি, আর দিল্লি ও হরিয়ানার মানুষদের সঙ্গে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে বাস করছি। এসবই ছিল এক গভীর শিক্ষণীয় অভিজ্ঞতা।

আমি ইসলামী আধুনিকতাবাদের একজন ছাত্র এবং এর প্রাথমিক উস্তাযদের যেমন জামালুদ্দিন আফগানী ও মিশরের মুহাম্মদ আব্দুহু সম্পর্কে অধ্যয়ন করি। আমাদের আকবর এলাহাবাদী, আল্লামা ইকবাল, মৌলানা আজাদ এবং ইরানের বিপ্লবী আলী শারিয়াতীও আমার রাজনৈতিক ও ইসলামী উপলব্ধি গড়ে তুলেছে। এই মানুষগুলোই আমাকে অনুপ্রাণিত করেছে যে, একজন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রাজুয়েট হিসেবে আমি ইসলাম ও ইতিহাসের অধ্যয়নে মনোনিবেশ করি।

আমি বিহারের পাটনা ও জেহানাবাদে একটি প্রচলিত মধ্যবিত্ত পরিবারে বড় হয়েছি। আমার বাবা একজন স্থানীয় রাজনীতিবিদ ছিলেন এবং ২০০০ সালে কুর্থা থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ২০০৫ সালে, তিনি জেহানাবাদ আসন থেকে রাজ্য বিধানসভায় জনতা দল (ইউনাইটেড) বা JDU এর প্রতীক পান। তিনি উভয় আসনে হেরে যান, কুর্থায় তৃতীয় স্থানে এবং জেহানাবাদে দ্বিতীয় স্থানে। তবু তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন এমন একজন হিসেবে, যার পেছনে একাধিক বিধানসভা আসনে প্রায় দশ শতাংশ ভোট ছিল, যেখানে মুসলিম জনসংখ্যা মাত্র ১০–১২ শতাংশ। এটি তাকে JDU–তে কিছু প্রভাব প্রদান করেছিল, যেটি ২০০৫ সাল থেকে বিহারে ক্ষমতায় রয়েছে। আমার বাবার এই বিতরণকৃত ভোটব্যাংকই প্রথম আমাকে সচেতন করেছিল যে, ফার্স্ট-পোস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP) ব্যবস্থা কতটা ত্রুটিপূর্ণ, বিশেষ করে সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের (proportional representation) তুলনায়।

যেমন আমি আগেও লিখেছি, FPTP (ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট) ব্যবস্থায় একটি অঞ্চলকে আঞ্চলিক নির্বাচনী এলাকায় ভাগ করা হয়, প্রতিটি এলাকা এক জন প্রতিনিধিকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে পাঠায়। যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পায়, তিনি নির্বাচিত হিসেবে গণ্য হন, যদিও তাঁর প্রাপ্ত ভোটের হার হয়তো মাত্র ২০ শতাংশের কম। এই ব্যবস্থাই এমন পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মোট ভোটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ ভোট প্রাপ্ত দলও বিধানসভায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারে। ভারতের সংবিধান রচনাকালীন সভাতেও এই বিষয় নিয়ে বিতর্ক হয়েছিল, যখন কংগ্রেস পার্টি পৃথক নির্বাচনী এলাকা (separate electorates) বাতিল করে দেয়। কিছু মুসলিম নেতা সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (proportional representation) দাবি করেছিলেন, তবে এটি লক্ষণীয় যে, পৃথক নির্বাচনী এলাকা ব্যবস্থারও একটি বড় ত্রুটি ছিল: হিন্দুরা মুসলিমদের জন্য ভোট দিতে পারত না এবং মুসলিমরা হিন্দুদের জন্য ভোট দিতে পারত না। হাসরাত মোহানী, যিনি কবি, স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং FPTP এর অন্যতম সক্রিয় সমালোচক—দৃঢ়ভাবে মত প্রকাশ করেছিলেন যে, যৌথ নির্বাচনী এলাকা থাকলে মুসলিম প্রতিনিধিত্ব বিলীন হয়ে যাবে। বিকল্প হিসেবে প্রস্তাবিত ছিল সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব, যেখানে আসনের সংখ্যা নির্ধারিত হত দলের প্রাপ্ত ভোটের শতাংশ অনুসারে। এতে হিন্দু ও মুসলিম উভয়ই একে অপরের জন্য ভোট দিতে পারতেন, কিন্তু সংখ্যালঘুদের কণ্ঠরোধ করা যেত না।

 

IIT (Indian Institutes of Technology)–এর দিনগুলো 

২০০৬ সালে, ১৮ বছর বয়সে, আমি জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামিনেশনে (JEE) উত্তীর্ণ হই এবং কম্পিউটার সায়েন্স পড়ার জন্য ভর্তি হই ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (IIT), বোম্বেতে। পড়াশোনার পাশাপাশি আরবী ও ফার্সী ধর্মীয় সাহিত্যেও আমার ঝোঁক ছিল। ইসলামী আধুনিকতাবাদ তখনও আমার সামনে আসেনি, কিন্তু ইসলামী ইতিহাস পড়তাম নিয়মিত। দ্বিতীয় বর্ষে সাহিত্য ক্লাসে একদিন অধ্যাপক বিবর্তন (evolution) নিয়ে আলোচনা শুরু করলে আমি আপত্তি জানাই—বিবর্তন তো “শুধু একটি তত্ত্ব”, কোনো “বৈজ্ঞানিক সত্য” নয়। IIT-এর অধ্যাপকরা যেভাবে JNU-এর মতো উদার ছিলেন, তিনি আমাকে থামিয়ে দেননি। বরং আমাকে বিষয়টি নিয়ে একটি উপস্থাপনা (presentation) করতে বলেন। পরের সপ্তাহে ‘Literature 101’–এর ২০০ জন ছাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আধাঘণ্টার একটি প্রেজেন্টেশন দিই, যেখানে বিবর্তনকে অস্বীকারকারী কিছু খ্রিস্টান ভুয়োবিজ্ঞানীর উদ্ধৃতি ব্যবহার করেছিলাম—এসব পেয়েছিলাম কিছু ইসলামী বই থেকে।

অধ্যাপক মনোযোগ দিয়ে শুনে আমার পরিশ্রমের প্রশংসা করলেন, তবে কয়েকটি বই পড়তে বললেন। কিন্তু সত্যি বলতে, বিবর্তনকে বুঝতে আমাকে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছিলেন ২০শ শতকের কবি-দার্শনিক আল্লামা ইকবাল। উপমহাদেশের মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় হলেও, সাধারণ মানুষ তাঁকে শুধু সারে জাহাঁ সে আচ্ছা–এর কবি হিসেবেই চেনে। দার্শনিক ইকবালকে প্রায় ভুলে যাওয়া হয়েছে।

ইকবালই আমাকে পৌঁছে দিলেন হেনরি বার্গসন–এর Creative Evolution–এর কাছে। ইকবালই আমাকে নিয়ে গেলেন কার্ল মার্ক্স–এর Capital–এর কাছে। ইকবালের উভয়েরই সমালোচনা ছিল, কিন্তু গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে।

আমার বক্তব্য হলো: পুঁজিবাদ নিয়ে যিনি আমার চোখ খুলে দিয়েছিলেন তিনি মার্ক্স নন, বিবর্তনকে যিনি সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন তিনি ডারউইন নন—আমাকে এসব বোঝালেন ইকবাল। কারণটা সহজ—২০শ শতকের অধিকাংশ চিন্তাবিদের বস্তুবাদী (materialist) ব্যাখ্যা আমাকে, একজন কৌতূহলী কিন্তু ঈমানদার মুসলিম তরুণকে, আকর্ষণ করার বদলে দূরে ঠেলে দিত। (আমি কমিউনিজম–বিরোধী নই। শ্রেণিসংগ্রাম, কুসংস্কারের বিরুদ্ধে অবস্থান, পুঁজিবাদের বিশ্রী ধারণাগুলোর সমালোচনা, মানবচিন্তার ভবিষ্যৎ বিকাশে এসব অবদান অস্বীকার করা যায় না। সমস্যা একটাই—অনেক কমিউনিস্ট দাবি করেন যে, দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ (dialectical materialism) নাকি এক বিজ্ঞান, যদিও পদার্থবাদী অস্তিত্বতত্ত্ব (materialistic ontology) পদার্থবিজ্ঞান এক শতাব্দী আগেই পরিত্যাগ করেছে। (দীর্ঘ আলোচনার জন্য দেখুন: Worldview in a Cell: a Muslim political prisoner’s insight.) 

২০শ শতকের শুরুতেই বিজ্ঞান নির্ধারণবাদী বস্তুবাদকে পরিত্যাগ করেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক মতাদর্শ এখনো নিউটনীয় যুগের পুরোনো শব্দভাণ্ডারই অনুসরণ করে। এখানেই ইকবালের মতো একজন চিন্তক নতুন দিগন্ত খুলে দেন এমন ধারণা সৃষ্টি না করেই যে আমরা সবকিছু জেনে ফেলেছি, অথবা সব জানার পথে আছি। এখানেই ঈমান ব্যক্তি ও সমাজ গঠনের মৌলিক ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ইকবাল ছিলেন অল্প কয়েকজন দার্শনিকের একজন, যিনি নিউটন-পরবর্তী বৈজ্ঞানিক জ্ঞানকে ঈমানের প্রশ্নের সঙ্গে সমন্বিত করার চেষ্টা করেছিলেন। আমি এখানে বিশেষ করে ২০শ শতকের পদার্থবিজ্ঞানের দুই বিপ্লব আপেক্ষিকতা ও কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা—যে অস্তিত্বগত (ontological) ও জ্ঞানতাত্ত্বিক (epistemological) প্রশ্ন তুলেছিল এবং যেভাবে এগুলো বস্তুবাদী দর্শনের পাশাপাশি বেশিরভাগ ধর্মীয় চিন্তাধারার মেটাফিজিক্যাল ভিত্তিকে ভেঙে দিয়েছিল, তার কথাই উল্লেখ করছি।

কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের কথা বললে বস্তুবাদ ও নির্ধারণবাদের সমালোচনার জন্য অবশ্যই পড়া উচিত কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ভেরনার হাইজেনবার্গ এর Physics and Philosophy: The Revolution in Modern Science। মরমী বা আধ্যাত্মিক চিন্তাকে সমর্থনকারী যুক্তির জন্য পড়তে হবে এরউইন শ্রোডিঙ্গার–এর What Is Life? The Physical Aspect of the Living Cell এবং Mind and Matter. তিনি ছিলেন কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যার আরেকজন প্রতিষ্ঠাতা। এছাড়া আমি আপনাকে উৎসাহ দেব ম্যাক্স জ্যামার এর The Conceptual Development of Quantum Mechanics পড়তে, বিশেষ করে এর অধ্যায় “The Philosophical Background of Nonclassical Interpretations” যেখানে দেখা যায় ১৯শ শতকের খ্রিস্টান দার্শনিক সোরেন কিয়ের্কেগার্ড, যিনি ড্যানিশ অস্তিত্ববাদ ও নব্য-অর্থোডক্স ধর্মতত্ত্বের অগ্রদূত, কীভাবে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের আরেক পথিকৃৎ নীলস বোর এর চিন্তায় প্রভাব ফেলেছিলেন।

কুর্ট গ্যোডেলের, যিনি ২০শ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গণিতবিদ ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৬ সালের মধ্যকার চিঠিপত্রগুলো পড়লে তাঁর খ্রিস্টীয়, একেশ্বরবাদী বিশ্বাসের একটি স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। এর একটি সারসংক্ষেপ পাওয়া যাবে হাও ওয়াং রচিত ১৯৯৬ সালের প্রবন্ধ A Logical Journey: From Godel to Philosophy-এ। গ্যোডেলের সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততা জানতে হলে পড়তে হবে Godel Meets Einstein: Time Travel in the Godel Universe। আর আপেক্ষিকতা ও বিবর্তনতত্ত্ব নিয়ে প্রাথমিক ইসলামী প্রতিক্রিয়া জানতে হলে অবশ্যই পড়তে হবে ইকবালের Reconstruction of Religious Thought in Islam (1930), Javid Nama (বা The Book of Eternity, 1932) এবং Saqi Nama (বা The Book of the Winebringer, 1935)। 

আমি ইচ্ছাকৃতভাবেই এই পাতাগুলোকে উল্লেখসূত্রে ভরিয়ে দিচ্ছি, যাতে আপনারা আমার ধারণাগুলোকে নিজেরাই অনুসন্ধান করেন এবং তা নিয়ে চিন্তা করেন। আমার কথা কোনো অবান্তর বর্ণনা নয়; বরং বিজ্ঞান, ধর্মতত্ত্ব ও ইতিহাস-পাঠ থেকে জন্ম নেওয়া দার্শনিক ও ঐতিহাসিক প্রশ্ন। এসব তত্ত্ব নিয়ে বলার মতো আরও অনেক কিছু আছে, যা এখন বলা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে আরও বিস্তারিতভাবে লেখার চেষ্টা করব।

আইআইটি বোম্বে থেকে স্নাতক শেষ করার সময়ের মধ্যেই আমি দর্শন পড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলাম। ২০০৯ সালে কোপেনহেগেনে আমার গ্রীষ্মকালীন ইন্টার্নশিপ আমাকে পাশ্চাত্য বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান কল্যাণ রাষ্ট্র মডেলের সঙ্গে কিছুটা পরিচয় করিয়ে দেয়। এই বিষয়ে আমার প্রিয় প্রফেসর ও প্রকল্প–গাইড অমিতাভ সান্যালের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছিল। তিনি আমাকে দর্শন পড়তে উৎসাহ দিয়েছিলেন এবং উপহার দিয়েছিলেন আর্থার কোয়েস্টলারের The Sleepwalkers বইটি।

 

ইতিহাসের দিকে মোড় নেওয়া 

আমি আমেরিকার বহু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডির জন্য আবেদন করেছিলাম, কিন্তু সবাই জানাল যে দর্শনে মাস্টার্স ডিগ্রি থাকা বাধ্যতামূলক। আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মিসরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী আকীদা ও আরবী ভাষা পড়ব। কিন্তু ২০১১ সালের আরব বসন্ত পুরো পরিকল্পনাটাই থামিয়ে দিল। তাই আমি বেঙ্গালুরুতে একটি চাকরির অফার গ্রহণ করি এবং কর্পোরেট চাকরি শুরু করি আর সঙ্গে চালিয়ে যেতে থাকি দর্শন ও ইসলামী ধর্মতত্ত্বের অধ্যয়ন। ২০১২ সালে আমি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) দর্শন বিভাগের এমফিল/পিএইচডি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিলাম। আমি ভাইভা পর্যন্ত যোগ্যতা অর্জন করেছিলাম এবং শিক্ষকরা আমার প্রচেষ্টার প্রশংসাও করেছিলেন। তবে তারা বললেন আমার কোনো প্রস্তাবনা (Research proposal) নেই, তাই পরের বছর আবার আসতে। কিন্তু এরই মধ্যে আমার ভেতরে কিছু পরিবর্তন আসে আর আমি ইতিহাসের দিকে ফিরে যাই।

আমার মন সবসময় দ্বিধায় ভরা ছিল, কারণ আমি বৈজ্ঞানিক পটভূমি থেকে এসেছি। উপরোক্ত আলোচনায় বলা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিদ্যা ধর্মবিশ্বাসী ও অধর্মবিশ্বাসী উভয়ের জন্যই এক ধরনের দার্শনিক অগ্নিকুণ্ড। কিন্তু বিভাজন (Partition) এবং সংখ্যাগরিষ্ঠতান্ত্রিক রাজনীতির শিকার হওয়া একটি সম্প্রদায়ের মানুষ হিসেবে এবং এমন এক রাজনীতিবিদের সন্তান হিসেবে যিনি এসব শক্তির বিরুদ্ধে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন—দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস ও তার ফাটলরেখাগুলো আমার দৈনন্দিন জীবনের গভীর সচেতন অংশ ছিল। ২০১১ সালে আমি জার্মান ভাষা শেখা শুরু করি। ২০১৩ নাগাদ আমি ২০শ শতাব্দীর জার্মানি এবং ফ্যাসিবাদের ইতিহাসে গভীরভাবে নিমগ্ন হয়ে পড়ি। এতে আমার ঝোঁক ইতিহাসের দিকে আরও বেড়ে যায়। আমি উপলব্ধি করি মানব অস্তিত্বের প্রকৃতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, ভারতের বর্ণব্যবস্থা, জাতীয়তাবাদের উত্থান, সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, বিভাজন এবং সংখ্যালঘু অধিকার এসব দার্শনিক ও সামাজিক-রাজনৈতিক প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর খুঁজছিলাম সবচেয়ে বেশি, এগুলো মূলত ঐতিহাসিক প্রশ্ন।

কর্পোরেট জগৎ ছেড়ে আমি জেএনইউ-তে আধুনিক ইতিহাসে মাস্টার্স করতে যোগ দিই। পার্ট-টাইম চাকরিতে মাসে মাত্র ২৫,০০০ রুপি পেতাম। আগে যা উপার্জন করতাম, তার ক্ষুদ্র এক অংশ। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গেই বিপর্যয় নেমে এলো। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে আমার বাবার পাকস্থলীর ক্যান্সার ধরা পড়ল এবং আমার দ্বিতীয় ও তৃতীয় সেমিস্টার কেটে গেল দিল্লির রাজীব গান্ধী ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমার কি জেএনইউ ছেড়ে আবার কর্পোরেট চাকরিতে ফিরে যাওয়া উচিত? তিনি কঠোরভাবে নিষেধ করে বলেছিলেন, “তোমার টাকা আমাকে বাঁচাতে পারবে না।” আমার মামাই (মায়ের ভাই) সব খরচের ভার নিয়েছিলেন, কারণ বাবা ক্ষমতাবান ব্যক্তি হওয়া সত্ত্বেও গৃহস্থালি চালানোর মতো আয়ই করতেন। তাঁর সম্পত্তি বলতে মোট দু’টি গাড়ি, দু’টি রাইফেল আর একটি দোকান। নিজের বাড়িও ছিল না। মামা না থাকলে আমাকে পড়াশোনা ছেড়ে চাকরি খুঁজতে হতো। আমি কখনোই তাঁর ঋণ শোধ করতে পারব না (তিনি তখন রাজ্য সরকারের ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত)।

আমার মা সর্বদা ধৈর্যশীল এবং ত্যাগী সঙ্গী ছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন আমি আগের ক্যারিয়ারে ফিরে যাই। তিনি বাবাকে বলেছিলেন আমাকে ফিরে যেতে বলার জন্য। কিন্তু বাবা বললেন, “ওকে থাকতে দাও। ও আমাদের সংগ্রামের ইতিহাস লিখবে।” ২০১৪ সালের মে মাসে বাবা হাসপাতালে টিভিতে দেখছিলেন নরেন্দ্র মোদী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিচ্ছেন। বাবা বললেন, “শারজিল, তোমার ভারত ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত। আমেরিকায় যাও, সেখানে পড়াশোনা করো। এখানে থাকলে তুমি রাজনীতিতে নামবে, সংগ্রাম করতে হবে আর ওরা তোমাকে জেলে দেবে।” আমি ভেবেছিলাম এটা শুধু তাঁর পিতৃসুলভ ভয়, কারণ তিনি আর আমার পাশে থাকবেন না। কিন্তু আমি কতটাই না সরল ছিলাম। তিনি পৃথিবীকে আমার চেয়ে ভালো চিনতেন। এমনকি তিনিই আমাকে আমার চেয়ে ভালো চিনতেন। জানতেন, আমি যথেষ্ট একগুঁয়ে এবং মতবাদে দৃঢ়। এই উত্থানশীল ফ্যাসিবাদী পরিবেশের সঙ্গে সংঘাতে লিপ্ত হবোই। তিনি আমাকে থামাতেন না, কিন্তু তিনি আগেই দেখে ফেলেছিলেন কী আসছে।

সেই বছর আমি খুব কমই ক্লাসে উপস্থিত ছিলাম। টিউটোরিয়াল লিখতাম, সফটওয়্যার বানাতাম (অল্প বেতনের পরেও তা তখন অনেক মনে হতো), আর হাসপাতালে বাবাকে বই পড়ে শোনাতাম। ইরানী বিপ্লব নিয়ে একটি বই পড়ছিলাম মনে আছে। আর বাবা তার যুবক বয়সের স্মৃতি জুড়ে মন্তব্য করছিলেন। নভেম্বরেই তিনি মারা যান।

পরের সেমিস্টার, চতুর্থটি আমি কাটালাম শোকের নিস্তব্ধতায়। সেটি ছিল আমার JNU জীবনের সবচেয়ে খারাপ সেমিস্টার। (আমি বিশেষভাবে দুঃখিত প্রফেসর জানকি নায়ারের কাছে। তাঁর একটি কোর্স এবং সেমিনারে ভর্তি হয়েছিলাম, কিন্তু কিছুই করতে পারিনি। শুধু টিপু সুলতানের ফার্সি ডায়েরি পুরোটা পড়েছিলাম।)

 

একজন বাবার শিক্ষা

আমার বাবার কাছে ফিরে আসতে গেলে, আমি তাঁর কাছ থেকে দুটি জিনিস শিখেছি। এক, দেশভাগ ভারতীয় রাজনীতিতে মুসলমানদের পদ্ধতিগত বঞ্চনার দিকে নিয়ে গেছে এবং কেন্দ্রীয়করণের বিরুদ্ধে এবং প্রকৃত ফেডারেল কাঠামো ও সংখ্যালঘু অধিকারের পক্ষে জিন্নাহ যে দাবি করেছিলেন, তা সঠিক ছিল। আর দুই, যদি আমাদের ভোট দেওয়ার জন্য প্রকৃতপক্ষে একটাই পক্ষ থাকে, তবে সেটা গণতন্ত্র নয়। এজন্যই তিনি বলতেন যে জেডিইউ (JDU) এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দল (আরজেডি) দুটোই শক্তিশালী এবং প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি হওয়া উচিত। অন্যথায়, যদি এক দিক বিজেপির জন্য খোলা পড়ে থাকে এবং তাদের থামানোর মতো শক্তিশালী নেতা ও দল না থাকে, তাহলে আরজেডি জোট যতই ভালো হোক না কেন, মুসলমানরা তাদের ভোটার হবে না, বরং তাদের “দাস” হয়ে যাবে।

দেশভাগ ও জিন্নাহ সম্পর্কিত প্রথম শিক্ষাটি আমাকে নিয়ে এসেছে সেই তাত্ত্বিক অনুসন্ধানের পথে যা আমি বর্তমানে অনুসরণ করছি। নির্বাচনী রাজনীতি সম্পর্কিত দ্বিতীয় এবং অধিকতর বাস্তব শিক্ষা গত দশকে আরও বেশি স্পষ্ট ও জরুরি হয়ে উঠেছে, কারণ ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত জায়গায় মুসলমানরা রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়েছে, সম্ভবত তামিলনাড়ু ও কেরালা ছাড়া, এবং কিছুটা অন্ধ্র ও বিহারে। এমনকি বাংলাতেও বিজেপির উত্থান মানে আমরা আর বেছে বেছে চলতে পারি না। 

বাবার এই দুই শিক্ষার ভিত্তিতেই আমি পড়ছি ও গবেষণা করছি এবং একই বিষয়ে আগ্রহী মানুষদের খুঁজে পাচ্ছি। আমার এমফিল ও পিএইচডি দুটোই ভারতীয় মুসলমানদের উপর সংঘটিত সহিংসতা সম্পর্কিত। কেন এই অনুসন্ধান আজ অত্যন্ত জরুরি তা আমাদের চারপাশে স্পষ্ট—মুসলমানদের রাজনৈতিক ক্ষমতা হারানো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি পদ্ধতিগত ও ঐতিহাসিক, শুধু এর সবচেয়ে ক্ষতিকারক প্রকাশটি ১৯৯০-এর দশকের পরে দেখা দিয়েছে, যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বহু বৈশ্বিক ও স্থানীয় উপাদান এসে মিলিত হয়েছে।

সমতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা মুখে বলা যথেষ্ট নয়। সবকিছু শ্রেণি দিয়ে ব্যাখ্যা করাও সমস্যাজনক। একমাত্র এগিয়ে যাওয়ার পথ হলো এই উপলব্ধি যে পদ্ধতিগত পরিবর্তন অপরিহার্য, যাতে ভারতের মুসলমান ও অন্যান্য সংখ্যালঘুরা পুনরায় রাজনৈতিক ক্ষমতা ফিরে পায়। আর এই কারণেই জিন্নাহ আজ আরও বেশি প্রাসঙ্গিক। ১৯৪৭ সালের চেয়েও, যখন তিনি ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তির পরস্পরবিরোধী প্রবণতা এবং “ধর্মনিরপেক্ষ” গান্ধীয় জাতীয়তাবাদের বর্ণনায় মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। যা জিন্নাহ ও ইকবালের মতে মূলত ব্রাহ্মণ্যবাদী পুনর্জাগরণের থেকে ভিন্ন ছিল না। এর কল্পিত জাতীয়তাবাদী ইতিহাস, কেন্দ্রীকরণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের প্রবণতা এবং বৃহৎ অংশের পুঁজিপতিদের দ্বারা সহায়তা এই সব মিলেই। (এ বিষয়ে আরো জানতে পড়ুন আকার প্যাটেলের লেখা, যেখানে তিনি কংগ্রেসের কেন্দ্রীকরণের প্রবণতা ও প্রকৃত ফেডারেল ব্যবস্থা গৃহীত হলে আরও ভালো ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছেন যে, ফেডারেল ব্যবস্থা মুসলিম নেতারা যেমন জিন্নাহ আশা করেছিলেন।) জিন্নাহর রাজনৈতিক বক্তব্যের একমাত্র ঘাটতি মনে হয় মুসলমানদের মধ্যে জাতপাতের বিষয়ে তাঁর নীরবতা। সম্ভবত কারণ, উপনিবেশমুক্তি ও কংগ্রেসে হিন্দু একীকরণের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে জরুরি কাজ ছিল কেন্দ্রীকরণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদকে প্রতিরোধ করা, যার জন্য মুসলমানদের কোনো না কোনো রকমের ঐক্য প্রয়োজন ছিল।

 

প্রতিনিধিত্ব এবং মুসলিম লীগ

যা পূর্বানুমান ছিল, তা আজ স্পষ্ট বাস্তবতা হয়ে গিয়েছে। জিন্নাহর মতে, কংগ্রেস দলের ধর্মনিরপেক্ষতা মূলত মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের নীরব ও বাদ দেওয়ার একটি হাতিয়ার ছিল। তাঁর সেক্যুলার সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ এবং অন্যান্য পরিচয় মুছে ফেলার প্রচেষ্টার কথা মনে করুন: “গণতন্ত্র এক সম্প্রদায়কে অন্য সম্প্রদায়ের উপর ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে শাসন করার অধিকার দেয় না।” জিন্নাহর বিষয়ে, ইতিহাসবিদ জয়া চ্যাটার্জী Shadows at Noon (পৃষ্ঠা ৬৭)–এ লিখেছেন: “১৯০৬ … থেকে যতক্ষণ তিনি বেঁচে ছিলেন … জিন্নাহ একজন লিবারাল সংবিধানবাদী হিসেবে রয়ে গেলেন, যার বিরল কূটনৈতিক দক্ষতা ছিল। … ১৯৩০ ও ৪০–এর দশকে যা বদলায়নি তা জিন্নাহ নয় বরং কংগ্রেস, যার নেতৃত্ব ক্রমশ বেশি জোর দিতে শুরু করেছিল যে তারা পুরো জাতিকে প্রতিনিধিত্ব করে। … তাদের নেতৃত্বের কাছে যাদের সেই দাবী অস্বীকার করেছিল, তাদের সঙ্গে সমঝোতার কোনো কারণ দেখা যায়নি। এই অধিকতর হেজেমনিয়াল মনোভাব তাদের, যার মধ্যে জিন্নাহও ছিলেন, যাঁরা ভারতীয় প্রেক্ষাপটে সংখ্যালঘুদের জন্য সংবিধানগত সুরক্ষা প্রয়োজনীয় মনে করতেন এবং যাঁদের মতে “ভারতীয়” ছাড়া অন্যান্য পরিচয়ও স্থান, স্বীকৃতি ও সম্মানের দাবিদার—তাদের বিতাড়িত করেছিল। শেষ পর্যন্ত প্রধান কূটনীতিকও সেই পার্টির (কংগ্রেস) সঙ্গে সমঝোতা করতে পারলেন না, যা নতিহীন হতে চায়নি।”

আপনি আরও পড়তে পারেন ইকবালের ১৯৩২ সালের অল-ইন্ডিয়া মুসলিম কনফারেন্সে প্রেসিডেনশিয়াল অ্যাড্রেসটি: “কংগ্রেস নেতারা দাবি করেন যে তারা ভারতের জনগণের একমাত্র প্রতিনিধি। শেষ রাউন্ড-টেবিল কনফারেন্স স্পষ্টভাবে দেখিয়েছে যে তারা তা নয়। কংগ্রেস স্বাভাবিকভাবেই এতে ক্ষেপেছে। … তারা তাই বর্তমান অভিযান শুরু করেছে … এমন একটি চুক্তি ব্যর্থ করতে যা তারা ভয় পাচ্ছে আগামী সংবিধানে স্থান পেতে পারে, এবং সরকারকে শুধুমাত্র কংগ্রেসের সঙ্গে সংখ্যালঘু বিষয় সমাধান করতে বাধ্য করতে। কংগ্রেস রেজোলিউশন … স্পষ্টভাবে বলেছিল যে সরকার মহাত্মা গান্ধীকে দেশের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে মানতে অস্বীকার করায়, কংগ্রেস সিভিল ডিসঅবিডিয়েন্সের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাহলে সংখ্যালঘু কীভাবে সেই ক্যাম্পেইনে যোগ দিতে পারে যা নিজেই এবং সরকারের উভয়ের বিরুদ্ধে পরিচালিত হচ্ছে?”

১৯৪৬ সালের নির্বাচন প্রমাণ করল যে ব্রিটিশ ভারতের প্রায় সমস্ত প্রদেশের মুসলিম ভোটারদের অধিকাংশ একইভাবে অনুভব করেছিল। মুসলিম ভোটের মধ্যে, মুসলিম লীগ (এমএল) প্রদেশ জুড়ে ভোটগ্রহণের ৭৫ শতাংশ এবং অ্যাসেম্বলি আসনের ৮৭ শতাংশ জয়ী হয়েছিল। পরে প্রচারিত মিথের বিপরীতে, এটি কেবল একটি এলিট ভোট ছিল না। সমস্ত পুরুষদের মধ্যে ৩৫ শতাংশের বেশি নিবন্ধিত ছিল, কিন্তু নারীদের মাত্র প্রায় ৬–৭ শতাংশ, যার ফলে মোট নিবন্ধিত সংখ্যা মাত্র ২০ শতাংশের কিছু বেশি (দেখুন Kuwajima Sho, Muslims, nationalism, and the Partition)। মুসলিম লীগ বিশেষভাবে ভালো ফল করেছে বাঙালের কৃষক এবং মাদ্রাজ ও বোম্বে প্রেসিডেন্সির মধ্যবিত্তদের মধ্যে।

(আমার গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ব্রিটিশ ভারতের ৪২ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৬ মিলিয়ন ভোট পড়ে, যার মধ্যে ৪.৫ মিলিয়ন এমএলে যায়। এমএল ৪০টি আসন প্রতিদ্বন্দ্বী ছাড়া জিতে নেয়। গড় ভোটদান প্রায় ৬৫ শতাংশ ছিল পাঞ্জাবের তথ্য অনুযায়ী, যেখানে ১.৬ মিলিয়ন নিবন্ধিত মুসলিম ভোটারের মধ্যে এক মিলিয়ন ভোট দিয়েছে)। এর অর্থ মোট নিবন্ধিত মুসলিম ভোটার ৯ মিলিয়নের বেশি, যার মধ্যে ৭.৫ মিলিয়নের বেশি পুরুষ এবং প্রায় ১.৫ মিলিয়ন নারী। সুতরাং মুসলিম পুরুষদের ৩৫ শতাংশের বেশি ভোটের জন্য নিবন্ধিত ছিল এবং সমস্ত মুসলিম পুরুষের ২৫ শতাংশের বেশি ভোট দিয়েছে।) (এছাড়াও দেখুন Anwesha Roy, ২০১৮, Making Peace, Making Riots.)

 

ইসলামে আধুনিকতা

যেমন আমি আগে বলেছি, আইআইটি, জেএনইউ এবং এখন তিহারে আমার শিক্ষার অন্য একটি দিক হলো ইসলামে আধুনিকতার ধারা বোঝা যা সার্বভৌমত্বের ক্ষয় এবং আধুনিক বিজ্ঞানের ক্ষমতার প্রতি প্রতিক্রিয়া হিসেবে উদ্ভূত। জেলায় আসার আগে আমি মৌলবাদের বিষয় লিখেছি, কিন্তু জেলায় আমি আধুনিকতার প্রতি যা বলা যায় “প্যাথলজিক্যাল” প্রতিক্রিয়া তা আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি (এখানে “প্যাথলজিক্যাল” শব্দের ব্যবহার সম্পর্কে দেখতে পারেন SherAli Tareen-এর Perilous Intimacies: Debating Hindu-Muslim Friendship After Empire, ২০২৩-এর “Epilogue”)। শুধুমাত্র আধুনিক শিক্ষা দিয়ে নয়, মুসলিম জনগণের রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমেই আধুনিকতার প্রতি মৌলবাদী ও অগণতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াকে রোধ করা সম্ভব। দু’টি উপায়ই সমানভাবে প্রয়োজনীয়।

ইসলামী বিশ্বে রাজতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক শক্তিগুলো বিশেষ করে যেগুলো পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে যুক্ত—ধারাবাহিকভাবে ইসলামকে গণতন্ত্রবিরোধী, সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল ব্যাখ্যার দিকে ঠেলে দেবে। আর এগুলোকে মোকাবিলার একমাত্র পথ হলো একটি গণতান্ত্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বিপ্লবী ইসলামের বিকাশ—যা আধুনিক চিন্তাবিদদের, বিশেষত ইকবাল ও আলী শারিয়াতীর ভাবধারায় স্পষ্টভাবে উপস্থিত। তারা যথাক্রমে দক্ষিণ এশীয় ও ইরানী মুসলমানদের সবচেয়ে গণতান্ত্রিক কণ্ঠস্বর। এলাহাবাদী (মৃত্যু ১৯২১) সেই সময়ে বেঁচে ছিলেন যা ঔপনিবেশিকতার সর্বোচ্চ সময় বলা যেতে পারে। ঔপনিবেশিকদের রাজনৈতিক বা বৈজ্ঞানিক কৃতিত্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো তার কাছে কিছুই ছিল না। তিনি আলীগড়ের সমালোচনা করেছিলেন ঔপনিবেশিক শিক্ষকদের নকল করার জন্য, কিন্তু একইসাথে উলামাদেরও সমালোচনা করেছিলেন যারা আধুনিকতা ও আধুনিক চিন্তাভাবনার প্রতি বিমুখ ছিলেন।

কুরআনের বারবার আহ্বানের পরও যা প্রমাণ-ভিত্তিক চিন্তা, পর্যবেক্ষণ এবং মহাজাগতিক ক্রমের ব্যাখ্যার প্রতি নির্দেশ করে। উলামারা আধুনিক বৈজ্ঞানিক উন্নয়নের গুরুত্ব বোঝার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছিল (দেখুন কুরআন, সূরা ৮৮, আয়াত ১৭-২৬; সূরা ৩৬, আয়াত ৩৩-৪২; এবং অন্যান্য অনুরূপ বহু অংশ; দেখুন এছাড়াও ইকবালের Knowledge and Religious Experience, ১৯৩০)। কিন্তু এলাহাবাদী নিজেই চেষ্টা করেছিলেন, বৃথা হলেও, এই দুই চরমের মধ্যে সমন্বয় করার। এতে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার মুসলিম চিন্তার ১৯ শতকের শেষ এবং ২০ শতকের প্রারম্ভিক সময়ের সেরা উদাহরণ হয়ে ওঠেন। পশ্চিমা বিজ্ঞান ও দর্শন এবং ইসলামী শিক্ষায় সুপরিচিত, তিনি একজন অনন্য ও প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি বিশ্বাসী হলেও পূর্ণাঙ্গ সাফল্য অর্জন করতে পারেননি।

অগ্রগতির প্রকৃত সাফল্যটি এসেছিল পরবর্তী প্রজন্মে। একদিকে ইসলামের সঙ্গে আধুনিকতার ঘনিষ্ঠ সংমিশ্রণ এবং অন্যদিকে পদার্থবিজ্ঞানে অভূতপূর্ব উন্নয়ন এমন ব্যক্তিত্ব সৃষ্টি করল যেমন ইকবাল, যিনি নিউটনীয় পদার্থবিজ্ঞান ধ্বংস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বস্তুবাদ (materialism)–এর বিরুদ্ধে আরও স্বাধীনভাবে বিতর্ক করতে সক্ষম ছিলেন এবং যিনি সেই উলামাদেরও সমালোচনা করতে পারতেন যারা সন্দেহজনক ঐতিহাসিক দলিলকে পবিত্র মনে করে ভেদাভেদমূলক বিবাদে লিপ্ত ছিলেন, কিন্তু কুরআনের ঐশ্বরিক প্রকাশ এবং ইসলামী সমাজের একত্ববাদের ভিত্তি উপেক্ষা করতেন। ইকবালের মতামত ছিল যে, মুসলমানদের গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব এমন প্রতিষ্ঠান গঠন করতে পারবে যা ইসলামী উম্মাহর জীবনের পরবর্তী অধ্যায়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। দুঃখজনকভাবে, দেশভাগ তার স্বপ্নের পথে এক ধরনের বিরতি টেনে দিল। আশা করি, তা কেবল সাময়িকই ছিল।

তবে, আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নিন্দা হিসেবে ভুলভাবে বোঝা উচিত নয়। আমার বিশ্বাস যুক্তিবাদ ও সহানুভূতির উপর নির্ভর করে। এগুলোর মধ্যে অন্যান্য ধর্মীয় ঐতিহ্যে একেশ্বরবাদী এবং জাতিভেদবিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থনও অন্তর্ভুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, গৌতম বুদ্ধ সম্পর্কে ইকবালের লেখা পড়ুন:

Qaum ne paigham-e Gautam ki zara parwah na ki

Qadr pehchani na apne gauhar-e-yaqdana ki

অর্থাৎ:

কওম বুদ্ধের বার্তার প্রতি একটুও মনোযোগ দেয়নি

অমূল্য মুক্তোমণি (অমূল্য রত্ন) এর মূল্যও তারা বোঝেনি।

 

গুরু নানক সম্পর্কে তাঁর (ইকবালের) কথাগুলো দেখুন:

Phir uthi tauheed ki sadaa Punjab se

Hind ko ik mard-e kamil ne jagaya khwab se

অর্থাৎ:

পাঞ্জাব থেকে আবার উঠল তাওহীদের ডাক

ভারতকে এক পরিপূর্ণ মানব ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলল

আমি আবারও স্পষ্ট করে বলছি যে, আমি কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়কে মৌলিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে সংজ্ঞায়িত করছি না, বা কোনো ব্যক্তির উপর বিচার আরোপও করছি না। আমি শুধু ধারণাগত শ্রেণিসমূহ (conceptual categories) নিয়েই আলোচনা করছি। আমি ইকবালের সেই সূক্ষ্ম ভাবনার ব্যাখ্যার সঙ্গে একমত:

Kafir-e bedar dil pish-e sanam

Beh zi dindari ki khuft andar haram

অর্থাৎ:

জাগ্রত হৃদয়ের মূর্তিপূজক কাফির

হারামের ভেতর ঘুমিয়ে থাকা ধর্মপ্রাণ মানুষের চেয়েও উত্তম।

যদি তুমি সন্তুষ্ট হও যে তুমি সত্যকে জেনে গেছো, যদি তুমি তোমার হৃদয়কে ঘুম পাড়িয়ে দাও, তবে তুমি তাওহীদকে পরিত্যাগ করেছো। কোরআন বহু স্থানে পুনরাবৃত্তি করে বলে যে তাওহীদ কোনো নতুন ধারণা নয় যা নবী মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এনেছেন; এটি মানবজাতির মতোই প্রাচীন। আমার কাছে এটাই সেই সাফল্য যা জীবন ও বিদ্যাকে এক সূত্রে বেঁধে দেয়। আমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই, যে সবচেয়ে ধার্মিক (যার মধ্যে তাকওয়া আছে), কোনো বিশেষ গোত্র, ধর্ম বা জাতির কেউ নয়। এটাই তাওহীদের বিশ্বদৃষ্টি। এই মাত্রাটি উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হওয়া সেই বিপজ্জনক ধারণায় পৌঁছে দেয় যে অন্যরা আমাদের চেয়ে কম গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়গুলোই আমাকে জেলেও ব্যস্ত রাখে; আমি এগুলো না লিখে থাকতে পারি না।

 

এক কাপ চা

আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন বছর ছিল বাবার মৃত্যুর পরের দুই বছর ২০১৫ এবং ২০১৬। আমি মাসে ৩০,০০০ রুপিরও কম উপার্জন করতাম, আমার মা ও ছোট ভাইকে নিয়েও ভাবতে হতো। যদিও আমার মামা নিঃশর্ত সহায়তা দিয়েছিলেন, আমি মনে করি এমন দিনও ছিল যখন আমার কাছে পাঁচ টাকা পর্যন্ত ছিল না এক কাপ চায়ের জন্য। জেএনইউ-র মেস আর বন্ধুরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছিল। বিশেষভাবে ঋণী শাফকাত-এর কাছে, আমার প্রিয় বন্ধু, যে আমাকে তার সঙ্গে থাকতে দিয়েছিল, কারণ আমি দু’বার হোস্টেলের ওয়েটিং লিস্টে ছিলাম। আমি এখনো মনে করি, বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ার সময় আমি তার সাথেই থাকতাম। পরে এমফিলে ভর্তি হলে যখন থাকার কোনো ঠিকানা ছিল না, তখনও সে-ই ছিল আমার আশ্রয়।

পরের বছর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করল। এমফিলের দ্বিতীয় বছরে আমি ২০১৬-২০২১ মেয়াদের মাওলানা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপ পেলাম। আর ২০১৭ সালে রেখতা-তে ভালো একটি ফ্রিল্যান্স চাকরি পেলাম। উর্দুর বৃহত্তম ডেটাবেসের জন্য অ্যালগরিদম ডিজাইন, ট্রান্সলিটারেশন, উর্দু কবিতার স্বয়ংক্রিয় সিনট্যাকটিক বিশ্লেষণ, এ যেন স্বপ্নের এক কাজ। কোডিং, উর্দু, কবিতা, ইতিহাস আমার সব ভালোবাসা এক জায়গায় এসে মিলেছিল। পারিশ্রমিকও আগের চেয়ে ভালো ছিল, আর এই সুযোগ দেওয়ার জন্য পরিচালক সঞ্জীব সরাফের কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ। সপ্তাহে মাত্র একদিন অফিসে যেতে হতো, বাকিটা দূর থেকেই কাজ করতাম। মোট কথা, ২০১৭ সালে আমার আয় স্থির হলো, আমি পরিবারকে যথেষ্ট অর্থ পাঠাতে পারতাম এবং গবেষণাও চালিয়ে যেতে পারতাম। ফেলোশিপ আর রেখতা এই দু’টিই আমাকে ভরসা দিয়ে রেখেছিল।

২০১৮ ও ২০১৯-এর বেশিরভাগ সময় আমি উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে যেমন চণ্ডীগড়, পাটনা, কলকাতা আর দিল্লিতে আর্কাইভ ঘুরে কাটিয়েছি। জেএনইউ এবং সেখানে পাওয়া বন্ধুরা আমার চিন্তাজগতের গঠনে অপরিহার্য ভূমিকা রেখেছে। বাম সংগঠনগুলোর কাঠামো নিয়ে আমি সমালোচনা করেছি কখনো কখনো, কিন্তু তাতে বন্ধুত্ব বা সম্পর্কের কোনো ঘাটতি আসেনি। প্রতিটি সংগঠনেই আমার আছে বন্ধু, সহযোদ্ধা, প্রিয়জন যারা পরিবারের মতো।

 

জনসমাবেশ, কারাবাস এবং গণতন্ত্র

শাহীনবাগ আন্দোলনের প্রথম দুই সপ্তাহে, আসিফ মুজতাবা ছাড়া বাকি বক্তা বেশিরভাগই ছিলেন জেএনইউ-এর বন্ধু ও সহযোদ্ধারা। দ্য মুসলিম স্টুডেন্টস অব জেএনইউ—যে সংগঠনটি গঠিত হয়েছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী বিলের বিরুদ্ধে কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো যায় তা নিয়ে জেএনইউ-এ অনুষ্ঠিত সর্বদলীয় বৈঠকে কেবল মুসলিম শিক্ষার্থীরাই উপস্থিত হওয়ার পর শুরু থেকেই সেখানে ছিল। তবে আরও বক্তার প্রয়োজন হওয়ায় প্রথম যে সংগঠনটি সাড়া দিয়েছিল, তা ছিল বিরসা আম্বেদকার ফুলে স্টুডেন্টস’ অ্যাসোসিয়েশন (বাপসা)। এরপর ছিল একটি বামপন্থী দল, মার্তান্ড দা-র নেতৃত্বে, যারা নিঃশর্ত সমর্থনও দেয়। আমি মার্তান্ড দা-কে ২০১৩ সালে জেএনইউ-এ দেখেছিলাম এবং বহু বছর তাকে দেখিনি; কিন্তু তিনি আমাকে খুঁজে বের করেছিলেন। মনে আছে, পঞ্চম দিনে আমার গলা এতটাই ব্যথা ছিল যে আমি কথা বলতে পারছিলাম না, তবুও আমাকে কিছু গরম পানি খেয়ে কথা বলতে হয়েছিল। শাহীনবাগ আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে জেএনইউ কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তা যথেষ্টভাবে উপলব্ধি করা হয় না। অনেক আইআইটিয়ানও ছিল, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসিফ মুজতাবা, এবং আমি একরকমভাবে আইআইটি, জেএনইউ এবং জামিয়ার (আমি জামিয়া থেকে আরবি কোর্সও করেছিলাম) মধ্যে একটি সংযোগ ছিলাম। সুতরাং এক অর্থে, আমার প্রতিটি ক্যাম্পাসে কাটানো সময়ই জীবনের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা—শাহিনবাগ রোডব্লকে ভূমিকা রেখেছে।

এখন, আমরা জেলে কেন? এবং কী অর্জিত হয়েছে? ফ্যাসিবাদী শাসন আমাদের মতো মানুষদের দমন করার চেষ্টা করবে। সবশেষে, যখন ভারতের মুসলমান এবং অন্যান্য সংখ্যালঘুদের জন্য সব সাংবিধানিক, গণতান্ত্রিক এবং প্রক্রিয়াগত দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, তখন একমাত্র পথ হলো জনগণের নিজেদের উপস্থিতি অনুভব করানো। জনগণ, লক্ষ লক্ষ মানুষ, প্রকৃত গণতান্ত্রিক শক্তি। এটা গুরুত্বপূর্ণ নয় যে তারা FPTP নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ক্ষমতার অতিরিক্ত কেন্দ্রীকরণের কারণে নীরব হয়ে আছে। যদি এই ব্যবস্থাগুলো জনগণের উদ্দেশ্য পরিবেশন না করে, তাহলে জনগণকে অন্য উপায়ে তাদের উপস্থিতি জানাতে হবে এবং এটাই শাহীনবাগ এবং পরবর্তী সময়ে আমার শত শত বক্তৃতার মর্ম ছিল। জনগণের গণমোবিলাইজেশন গণতন্ত্রের বিরোধিতা নয় বরং এটি তার সততার পরীক্ষা। একটি দেশ জনগণের এবং যদি বিদ্যমান ব্যবস্থা ও ক্ষমতাসীনরা তার বহুবিধ সম্প্রদায়ের মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত না করে, তাহলে জনগণের গণতান্ত্রিক কর্তব্য হলো উঠে দাঁড়ানো।

বিক্ষোভই হলো মূল শব্দ; জনসমুদ্রই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে পারে এবং বিক্ষোভের মাধ্যমে প্রভাব তৈরি করতে পারে। আমার কাছে এটা স্পষ্ট যে আমি, অন্যদের সঙ্গে মিলিত হয়ে, কার্যকর প্রতিরোধের একটি ফলপ্রসূ পথের দিকে ইঙ্গিত করেছি। এটি আমাকে অসীম আনন্দ দেয় যে মানুষ এই আহ্বানে সাড়া দিয়েছে। জেলে বসে যখন আমি জানতে পারলাম যে আমার বক্তৃতা এবং লেখা বাংলা, তামিল এবং মালায়ালামসহ অনেক ভাষায় মুসলিম একটিভিস্টরা অনুবাদ করেছে, আমি বিস্মিত হয়েছিলাম। জেলেই আমি কতটা অবাক হয়েছিলাম তা কল্পনা করুন, যখন আমি একটি চিঠি পেলাম শ্রীলঙ্কান তামিল মুসলিম এক নারী থেকে। চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন যে, তার সহকর্মীর কাছ থেকে আমার বক্তৃতাগুলোর তামিল অনুবাদ উপহার হিসেবে পেয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু হিসেবে, আমার বক্তৃতায় মূলধারার সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অনেক বিষয় তার কাছে বিশেষভাবে প্রভাববিস্তারকারী মনে হয়েছে। আমি আরও অনেক এমন চিঠি পেয়েছি মুসলিম ও অমুসলিমদের কাছ থেকে, যারা আমার বক্তৃতা (বিশেষ করে আলীগড়ের বক্তৃতা) বা আমার লেখা পড়ে আমাকে মন্তব্য বা প্রশংসা করতে লিখেছেন। এটি দেখায় যে আমাদের বার্তা সংখ্যালঘুদের—মুসলিম, হিন্দু, শিখ, খ্রিস্টান বা অন্যান্য, যারা নিজেদের দেশে সংখ্যাগুরুবাদ (Majoritarianism)-এর শিকার—দক্ষিণ এশিয়া এবং তার বাইরেও প্রতিধ্বনি তুলেছে।

এটুকুই আমাকে টিকিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট। এটি আমাকে এক ধরনের তৃপ্তিও দেয় যে আমি আমার পেছনে কিছু অর্থপূর্ণ শব্দ রেখে যেতে পেরেছি। যে শব্দগুলো ভারতের মুসলমানদের সামনে থাকা সবচেয়ে জরুরি ও মৌলিক প্রশ্নগুলোর ওপর আলো ফেলতে চায়। এমন প্রচার বা পরিচিতি ২০ বছর আগেও সম্ভব ছিল না, কারণ ইন্টারনেট জ্ঞান সৃষ্টি ও বিনিময়ের ক্ষেত্রকে অল্প হলেও গণতান্ত্রিকীকরণ ঘটিয়েছে। আমার কথা এখন রয়ে যাবে, এমনকি ফ্যাসিস্টরা চাইলে সেগুলো মুছেও ফেলতে পারবে না। আহমাদ ফারাজ যেমন বলেছেন— 

Main kat girun ki salamat rahun yaqin hai mujhe

Ki ye hisaar-e-sitam koi to girayega

Tamam umr ki iza-nasibiyon ki qasam

Mere qalam ka safar rayegan na jayega

অর্থাৎ:

আমার হাত কাটা যাক কিংবা আমি নিরাপদে থাকি—আমি নিশ্চিত,

এই অত্যাচারের দেয়াল একদিন না একদিন কেউ ভেঙে দেবেই।

সারা জীবনের সব অপমান—বঞ্চনার শপথ করে বলছি,

আমার কলমের এই পথচলা কখনোই বিফল যাবে না।

লেখার মতো আরও অনেক কিছু আছে। তবে, এখনকার মতো এই পর্যন্তই যথেষ্ট।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments