জান,
আজকের সকালটা কী চমৎকার দেখছ, সকাল সকাল রোদ উঠে গেছে। আমার বারান্দার ছোট্ট বাগানবিলাসটা কালকে সকালে দেখি টুকটুকে ছয়টা ফুল ফুটায়ে বসে আছে। কী সুন্দর তিনটা পাতা, হাত দিলে মনে হয় পেলব একটা ছোঁয়া পাইলাম যেন। যেনবা আদুরে বিড়াল, এমন কোমল ছয়টা ফুল। আমি সারাটা সকাল সেই ফুলগুলার দিকে তাকায়ে ছিলাম। বাতাসে দুলতেছে ছয়টা পুষ্প, একটা চড়ুই এসে ঘাড় বাঁকায়ে কীসব যেন বলে গেল, বোধহয় জিজ্ঞাসা করতেছে আমার মন খারাপ কেন। খানিক বাদে ওরা সব দলবল নিয়ে ফিরে আসল। দুটা বসল বারান্দার গ্রিলে, একটা সাহস করে জানলা অবদি চলে আসল। সবার সমস্বরে কিচিরমিচির শব্দে আমাদের বারান্দাটা ভরে উঠল যেন।
আজকের এই সোনালি সকালবেলায় আমার মনে পড়তেছে বিয়ের প্রথম দিনগুলার কথা। লক্ষ্মীপুরের গ্রাম থেকে যাত্রাবাড়ির এই ছোট্ট দেড় রুমের বাসায় এসে সদ্য উঠছি, সারাদিন গ্রামের পেয়ারা গাছ আর আদুরির ছানাগুলার জন্য মন পোড়ে। দিনে দশবার ভিডিয়ো কল দেই, আম্মার কত কাজ, সব ফেলে তিনি আমার সদ্য পাতা সংসার খুঁটায়ে খুঁটায়ে দেখেন। নিউমার্কেট থেকে কেনা প্লাস্টিকের আলমারিটা, চেয়ার দুইটা, নিজের হাতে কেনা কাপপিরিচ সবকিছুই খুঁটায়ে খুঁটায়ে দেখেন। মনে আছে, একদিন বিকালে কাজ থেকে আসার সময় তুমি কলার থোড় নিয়ে আসলা, আমি ওই বস্তু জীবনে দেখি নাই, সেইদিন সারা সন্ধ্যা বসে বসে সেইসব কুটে-বেছে তুমি রাতে একটা ভাজি করলা, অমৃত। আমি রাতে তোমার হাতে চুমু খেয়ে বললাম, তোমার হাতে জাদু আছে, জান।
বারান্দার পাখিগুলা চলে গেছে। শূন্য বারান্দায় দোল খাইতেছে ছয়টা লাল ফুল, আমাদের প্রেমের ছয় মাসের প্রতীক নাকি? এই একশ আশি দিনের প্রেম যেন একটা জাদুর বাকসো। যত ইচ্ছা লম্বা করা যায়, আবার মনে হয় এই তো সেইদিন আমাদের বিয়ে হইল, সপ্তাহখানেক গেছে বোধহয়। বাড়িভর্তি মানুষ। পেছনের ঘরটায় আমি গুটিশুটি মেরে বসে আছি। বান্ধবীরা সব ঘিরে ধরে সাজিয়ে দিতেছে একসাথে। বরযাত্রী আসবে যেকোনো সময়, বাড়িভর্তি সবার মনে যেন বাড়তি একটা উন্মাদনা। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা উঁকি মেরে নতুন বউ দেখতেছে, প্রতিবেশীরা বসে বসে নানান অযথা বাতচিত করতেছে। কিন্তু আমার মাথায় সেসবের কিছুই ঢুকতেছে না। নতুন জীবনের অজানা আশঙ্কায় আমি রীতিমতো বিহ্বল, কেমন হবে আমার সংসার, সেই মানুষটা, যাকে আমি জীবনে মাত্র একবার কয়েক মিনিটের জন্য দেখছি, সে আমাকে ভালবাসবে তো। আমার বন্ধু তন্বির কথা বারবার মনে পড়তেছিল, ওর বিয়ে হয়েছিল গত বছর, ক্লাস টেনের পরীক্ষায় বসায় মাত্র দুইমাস আগে। মেয়েটা যাওয়ার সময় বুক ভাসায়ে কানতেছিল। নাহ, ওর কথা আর মনে করতে চাই না, আজকের এই সোনালি সকালবেলায় হবে শুধু আনন্দের কথা, বেদনার কথা আজকে থাক।
বিয়ের প্রথম দিনগুলার কথা আমরা কিছুতেই ভুলতে পারতাম না। বারবার ঘুরেফিরে একটা দুইটা দিনের স্মৃতি আমরা কতবার মনে করছি বলো তো। কত রাত কেটে গেছে বিয়ের আগে-পরের গল্প করতে করতে। এখন এসে ভাবি কী এমন গল্প করতাম, কিছু এলোমেলো কথা। আসলে আমি তোমার সঙ্গ ভালোবাসতাম। তোমার পুরুষালি কণ্ঠস্বর, গল্প করতে করতে তুমি মনে হইত কোথায় হারায়ে গেছ, ছোটবেলার কথা বলতে বলতে মনে হইত তুমি যেন ফিরে গেছ সেই জাদুকাটা নদীর পাশে। হাওড়ের ঘ্রাণ এসে আমার নাক ছুঁয়ে যাইত তখন। কখনও আমি কথা বলতাম, তুমি খানিকবাদে বলতা আবার বলো, আমি শুনি নাই কিছু। মাঝেমধ্যে কেবল চুপচাপ, দুইজনে ফ্যানের দিকে অনিমেষ তাকায়ে আছি, সময় চলে যাইতেছে নিজের গতিতে। যাত্রাবাড়ীর সেই ঘিঞ্জি দেড় রুমের বাসাটাকেই তখন আমার মনে হইত যেন বেহেশতের একটা টুকরা। তোমার বুকে মাথা রেখে আমি নির্ভার চিত্তে চোখ মুদতাম, এই আমার পৃথিবী। আমার জানলা, আমার ঘর, আমার বাহির। জিসান, তোমার সেই নরোম আলিঙ্গন আমি খুব মিস করতেছি, জান।
প্রথম যখন এই বাসাটায় আসছিলাম, আমার মনে হইতেছিল একটা গর্তের মধ্যে এসে পড়লাম নাকি। একফালি ছোট্ট একটা বারান্দা, একটা চেয়ারও আটে না সেইখানে। কেবলই দম বন্ধ হয়ে আসত আমার। তখন আমরা মাঝেমধ্যেই রাতে বাইরে খেতে যাইতাম, রান্নাবান্নায় আমি ততটা পাকা ছিলাম না কোনোকালেই, তুমি ছিলা বাইরের খাবারের পাগল। আমি অবশ্য সেজেগুজে বাইরে ঘুরতে যাইতে ভালোবাসতাম। কিন্তু এত মানুষ আর জ্যাম, কী আর করা যাবে, রাজধানী ঢাকা বলে কথা। তুমি আর আমি, একটা পায়েচলা রিকশা, ধীরে ধীরে এমন একটা রাস্তায় চলতেছে, যার চারপাশে বড় বড় গাছ, কোনো মানুষজন নাই আশেপাশে, এমন একটা স্বপ্ন আমি কতবার দেখছি। তুমি বলছিলা একদিন রমনায় নিয়ে যাবা, ওইখানে নাকি এইরকম আছে। এখনও আমাদের একসঙ্গে রমনায় যাওয়ায় হইল না। তোমার স্বপ্ন ছিল একসঙ্গে কুয়াকাটা যাব, সুনামগঞ্জে গিয়ে হাওড়ে ভাসব। তুমি বলছিলা নৌকার সংসারের কথা, দুই দিনের জন্য নৌকার বাসিন্দা হয়ে যাব। আমি বলছিলাম, দুইদিন মানুষ একটা নৌকায় বসে থাকবে! পাগলামি আরকি। আমাদের কত কত জায়গায় ঘুরতে যাওয়া বাকি, তুমি আসতেছ না কেন, জান।
তুমি বলতা আমাকে ময়নাপাখি, আমি বলতাম শালিক। তুমি ডাকতা হরিণী, আমি বলতাম হালুম-বাঘ। আমাদের সেইসব মিষ্টি প্রেমের দিনগুলা কোথায় হারায়ে গেল। সেইসব সন্ধ্যা, আমি একমনে মেহেদি পরতেছি পায়ে, তুমি গালে হাত দিয়ে বসে বসে কারুকাজ দেখতেছ। পায়ে-হাতে ফুটে উঠতেছে লাল ফুল, নকশাকাটা পাতা। তুমি বলতেছ কী করে সম্ভব এমন নিখুঁত করে আঁকা। দেখতে দেখতে তুমি একসময় ঘুমায়ে গেলা, আমি তোমার হাতের পাতায় লিখে দিলাম—ভালোবাসি। ঘুম থেকে উঠে তোমার কী লজ্জা! পরদিন অফিসে গেলা হাতে রুমাল পেঁচায়ে, পেয়াজ কাটতে যেয়ে নাকি হাত কেটে গেছে। তুমি এমন লাজুক ছিলা কেন বলো তো, বাইরে গেলে এমন দূরে দূরে থাকতা, যেন আমাকে চিনোই না। এইসব নিয়ে অভিযোগ করলে তুমি বলতা, মেয়েমানুষ নিয়ে বাইরে যেতে তোমার নাকি লজ্জা করে। আমি রেগেমেগে গাল ফুলায়ে বলতাম আর সব মেয়েমানুষ আর আমি এক হইলাম! ধীরে ধীরে তুমি সহজ হয়ে আসতেছিলা, আমিও তোমার অস্তিত্বে অভ্যস্ত হয়ে উঠতেছিলাম। প্রতিদিন সন্ধ্যা সাতটা, দরজায় দুইটা টোকা, ব্যাগটা হাত থেকে নেওয়া, বাথরুমে কল ছাড়ার শব্দ, তারপর তারপর… কেন এইসব সুখের দিনগুলা এমন চট করে হারায়ে গেল।
আমি যেমন ছিলাম রান্নায় কাঁচা, তোমার ছিল চমৎকার রান্নার হাত। বলেছিলা, তাবলিগে যেয়ে নাকি এই এলেম হাসিল হয়েছে। ছুটির দিনগুলা সকালবেলা তুমি ঝটপট উঠে পড়তা। দুপুরের রান্নার ভার তোমার। তুমি বলতা সারা সপ্তাহ তুমি, একদিন আমি। দরজায় বসে চা খেতে খেতে দেখতাম তুমি কেমন দক্ষ হাতে পেয়াজ ছুলতেছ, মাংস কাটতেছ। আমি কিছু ধরতে গেলেই হা হা করে বলতেছ, আজকে তোমার ছুটি। জুমার আগে আগে সারাটা বাসা চমৎকার গন্ধে ম ম করে উঠত। তোমার হাতের মোরগপোলাও খেয়ে আমি ফিদা হয়ে গেছিলাম। গ্রামের মেয়ে আমি, পোলাও কী করে রাঁধে তা-ই জানি না। সেই আমার ভাগ্যে পড়ল এমন একজন যে কেবল জানেই না, রাঁধতে ভালোবাসে। তোমার হাত থেকে সেইসব রান্নার তালিম নিব ভেবে রাখছি, একটা মোটা খাতায় সবকিছুর তালিকা করব, প্রণালী লেখব। তুমি বলবা লবন পরিমাণমতো, আমি বলব ধুর, পরিমাণটা কত। তুমি বলবা কাচ্চি-বিরিয়ানি, আমি বলব শুঁটকিভর্তা ভাত। এমন মিষ্টি মিষ্টি সময় আমাদের, আবার কবে ফিরবে, জান।
ধীরে ধীরে সকালের সূর্যটা উপরে উঠে যাইতেছে, বাড়তেছে রোদের তেজ। চড়ুই পাখিগুলা ফিরে গেছে তাদের বাসায় কিংবা খাবারের খোঁজে। সকালের ফুরফুরা রোদটা এখন কেমন বিদঘুটে লাগতেছে, পর্দা টেনে দিয়ে ঘরটাকে অন্ধকার করে দিলাম। ঘরটা এলোমেলো হয়ে আছে, বিছানায় তোমার শার্টপ্যান্ট। তোমার প্রিয় ফোনটা পাশেই পড়ে আছে। থেকে থেকে একটা নোটিফিকেশন আসে আর বাতিটা জ্বলে ওঠে। একসময় বিরক্ত হয়ে আমি উলটায়ে রাখছি, আমাদের ওই হাসিহাসি ছবি আমার আর দেখতে ভালো লাগে না। প্রথম যেদিন মিছিলে গেলা, সেদিনের কাদামাখা শার্টটা এখনও বাথরুমে ঝুলতেছে, ধোয়া হয় নাই। তুমি রাগ করতে পারো দেখলে, তবু এলোমেলো করে রাখছি। তুমি আসবা, ঘর অগোছালো দেখে বলবা, ইশ, কী বানায়ে রাখছ, তারপর আমি ঘর গোছাব। বলবা, তোমাকে কেমন মলিন দেখাইতেছে, তখন আমি সাজব। দরজায় তোমার টোকা পড়লে দৌড়ায়ে যেয়ে খুলে দেওয়ার অপেক্ষায় আছি আমি, তুমি আসবা, আসবাই, তোমাকে আসতেই হবে।
বাইরে মিছিলের শব্দ, ছোট ছোট দল গলি থেকে বের হইতেছে। একসময় দৌড়ে যাইতাম মিছিল দেখতে। তুমি এসে বললা, বারান্দায় যাইয়ো না কিন্তু। মানুষ গলা ফাটায়ে স্লোগান দিতেছে, এইটা দেখতে আমার এত ভালো লাগে, কিন্তু তুমি না করছ, তাই আর যাই নাই। সেইদিন বিকালে হেলিকপ্টার উড়ে গেল খুব নিচু দিয়ে, ততদিনে জানি, এই হেলিকপ্টার থেকে গুলি করে, তাই পর্দার আড়াল থেকে চোখ বের করে দেখলাম। ফড়ফড় শব্দ করতেছিল, মানুষজন ছুটে পালাইতেছিল। আমি এখন আর ভয় পাই না, আবার যদি হেলিকপ্টার আসে, আমি সাহস নিয়ে বারান্দায় যাব, দুই হাত মেলে দাঁড়ায়ে চিৎকার করে বলব, আমাকেও গুলি করেন।
মিছিলের শব্দ ধীরে ধীরে বাড়তেছে। ধীরে ধীরে সকালের শান্ত আবহাওয়াটা আর শান্ত থাকতেছে না। মানুষ দলে দলে নেমে আসতেছে রাস্তায়, বাসার সামনের গলিতে মানুষের ভিড়। দাঁড়াও, আমি একটু উঁকি দিয়ে দেখে আসি। লোকজন ভিড় করে আছে, আজকেও কি আবার গুলি চলবে সেইদিনের মতো, আমি তোমার নাম ধরে আবার চিৎকার দিয়ে উঠতে চাই। তোমার বুকে দাগ কেটে লেখতে চাই তুমি আমার। কিন্তু দেখো, ঘরে তোমার জামা-জুতা সব রাখা আছে শুধু তুমি নাই। তোমার শার্টে এখনও তুমি তুমি গন্ধ, আমার বালিশের নিচে ভাঁজ করে রাখছি, বালিশে মাথা দিয়ে চোখ বন্ধ করলেই এখন মনে হয় তুমি পাশেই আছ। এই নীল শার্টটা পরে আমরা বাইরে ঘুরতে গেছি কতবার, শেষবার তুমি গেলা মিছিলে। আমি বললাম ভালো জামাটা খুলে রেখে যাও, তুমি শুনলা না। দেখো, এইখানে একটা ছোট্ট ছিদ্র, একটা গুলির দাগ। তুমি নাই হয়ে গেছ এই ছোট্ট ছিদ্র দিয়ে। একটা আঙ্গুলের সমানও না, কিন্তু এই গর্তে হারায়ে গেছে আমার বিগত ছয় মাসের সব প্রেম। আমি তোমার প্রেমের গন্ধ বুকে নিয়ে বসে আছি, জান, আমি চোখে পানি নিয়ে বসে আছি। তুমি এসে মুছে দিবা, মাথার চুল এলোমেলো করে দিবা। তুমি কি আর আসবা না!
আমি দরজায় তোমার আওয়াজ পাইতেছি, শুনতেছি তুমি বলতেছ—মিষ্টি, দরজা খুলো। আমি কি এখন একটু সাজব, চোখে একটু কাজল দেই, ঠোঁটে লিপিস্টিক। কোনটা দিব, লালটা না খয়েরিটা। তুমি দরজা ধাক্কা দিতেছ, কিন্তু আমি উঠতে পারতেছি না, জান।
(গত ২০ জুলাই রাজধানীর শনির আখড়ার রায়েরবাগ এলাকায় কোটা সংস্কার আন্দোলনে সংঘর্ষের সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান মতিউরের মেয়ের জামাই জিসান আহমেদ। স্বামীর মৃত্যুশোকে উন্মাদপ্রায় মিষ্টি বেগম নাওয়াখাওয়া ছেড়ে দেন। দিনরাত কাঁদতেন। জিসানের মৃত্যুর ৯ দিনের মাথায় গত সোমবার দুপুরে আত্মহত্যা করেন মিষ্টি। —কালেরকণ্ঠ)
বাহ্, কী লিখলেন! যেন সংসারটা আপনার!
ওঙ্কার বইটার কথা মনে পরলো
বাকরুদ্ধ!