‘এ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়েছে বলে আমার জানা নাই’—প্রিন্সিপাল আবুল কাশেম

সাক্ষাৎকার নিয়েছে : মুকুল চৌধুরী

যোগাযোগ ডেস্ক

প্রিন্সিপাল মোহাম্মদ আবুল কাসেম (১৯২০–১৯৯১) ছিলেন বাংলাদেশের প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, লেখক, রাজনীতিবিদ ও সমাজসংস্কারক। চট্টগ্রামে জন্ম নেওয়া আবুল কাসেম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুর অধীনে গবেষণা করেন। ১৯৪৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করে বাংলায় পাঠদানের পথিকৃৎ হন। তিনি তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠা এবং ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বাংলা ভাষায় উচ্চশিক্ষার প্রসারে ১৯৬২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাঙলা কলেজ। পদার্থবিজ্ঞান, ইসলাম, শিক্ষা, অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে তার বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে। বাংলা একাডেমি পুরস্কার, একুশে পদকসহ নানা সম্মাননায় ভূষিত এই মনীষী ১৯৯১ সালের ১১ মার্চ ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।

যোগাযোগ এর পাঠকদের জন্য তার ভাষা বিষয়ক একটি সাক্ষাৎকার পুনরায় পাবলিশ হচ্ছে। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন মুকুল চৌধুরী।


প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলন কিভাবে শুরু হয়?

উত্তর: অনেকে হয়ত মনে করেন ভাষা আন্দোলন আপনা আপনি হয়েছে। দুনিয়ায় কোন কিছুই আপনা আপনি হয় না। ভাষা আন্দোলনের উৎপত্তি হয়েছে একটি প্রতিষ্ঠানের প্রচেষ্ঠায় ও সংঘঠনে। প্রতিষ্ঠানটির নাম তমদ্দুন মজলিস। তখন এটার পুরা নাম ছিল পাকিস্তান তমদ্দুন মজলিস। কারণ তখনও পাকিস্তান থেকে আমাদের দেশ পৃথক হয় নাই। বিপ্লবী ইসলামী আদর্শের প্রতিষ্ঠা ছিল এই প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। আমরা বৃটিশ সাম্রাজ্যের কবল থেকে প্রথম স্বাধীনতা পেয়েছিলাম ১৯৪৭সনের আগষ্ট মাসে, আর এর পর পরই মজলিসের প্রতিষ্ঠা করেছিলাম ১লা সেপ্টেম্বর-এ ১৯ নং আজিমপুর রোডে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের অধ্যাপক এবং থাকতাম আজিমপুরের ১৯ নম্বরের বাসাতেই। এখন দেখা যাচ্ছে ইসলামী আদর্শকে প্রতিষ্ঠার জন্য চারদিকে কথা উঠেছে। দাবী উঠেছে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। আমাদের রাষ্ট্রের মন্ত্রীগণ এবং রাষ্ট্রপতিও ইসলামকে সর্বত্র কায়েম করার কথা বলছেন বেশ জোরেশোরে। এমনিভাবে বৃটিশ আমলেও দাবী উঠেছিল সাম্যবাদী ও ভ্রাতৃত্বমূলক ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার। প্রস্তাবিত সেই রাষ্ট্রের নাম দেয়া হয়েছিল পাকিস্তান। পাকিস্তান সংগ্রামে বাংলাদেশের মুসলমানেরা কারো থেকে পিছিয়ে ছিল না; বরং পাকিস্তানের জন্য যখন ভোটের প্রস্তাব উঠল তখন সব চাইতে বেশী ভোট দিয়েছিল বাংলাদেশের মুসলমানরা। এর ফলে লাভ হল পাকিস্তান। পাকিস্তানের আমাদের এই অংশের নাম ছিল পূর্ববংগ। তারপর তার নাম হল পূর্ব পাকিস্তান। আগেই বলেছি, পাকিস্তান লাভ করতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছিল, দিতে হয়েছিল অনেক জান, অনেক খুন। মুসলমান জনগণকে নেতারা মহান ইসলামের নাম এবং খেলাফতি শাসনের নাম করেই উদ্বুদ্ধ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। সমর্থ হয়েছিলেন তখনকার হিন্দু জমিদার, মহাজন ও অন্যান্য অত্যাচারীদের অমানুষিক শোষণ ও অত্যাচার থেকে মুক্ত করে শান্তিময় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আশা দিয়ে। এই বড় আশা ও রঙ্গিন স্বপ্ন দেখিয়েই জনগণকে মুসলিম লীগে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল।

পাকিস্তান আন্দোলনের ডাক দিয়েছিল মুসলিম লীগ। এটা ছিল সমস্ত ভারতের মুসলমানদের জাতীয় প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পাকিস্তান লাভের পর দেখা গেল মুসলিম লীগের নেতারা সব ভুলে গিয়ে পদ ও হীনস্বার্থের লোভে আত্মপ্রতিষ্ঠায় মশগুল। পরিষ্কার আদর্শ ও ধারণার অভাবে দেশ তখন চালকবিহীন তরণীর মত উদ্দেশ্যহীনভাবে ধ্বংসের পথে এগিয়ে চলেছে। এই অন্ধকারময় লক্ষ্যহীন পরিবেশে আশার উজ্জ্বল আলো নিয়ে এগিয়ে এল তমদ্দুন মজলিস। বিপ্লবী ইসলামী আদর্শের প্রকৃত রূপ কি হবে, পাকিস্তানের তথা ইসলামী রাষ্ট্রের রূপ কি হবে, তার অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি আর কি হবে তার শিক্ষা ব্যবস্থা—এসবের কোন পরিষ্কার ধারণাই ছিল না মুসলিম নেতৃত্বের। দু’শ বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদী বিদেশী শাসনের যাঁতাকলে নিষ্পেষিত ও তাদের আদর্শহীন শিক্ষায়-দীক্ষায় পথভ্রষ্ট নেতৃত্বের সে ধারণা থাকার কথাও ছিল না। অচিরেই আমরা মজলিসের মাধ্যমে আত্মনিয়োগ করলাম গবেষণায় ও সংগঠনে। দেশের সব জেলায় সংগঠন ছড়িয়ে পড়লে দলে দলে বিপ্লবী ও আদর্শ-পাগল কর্মীরা মজলিসে যোগ দিল, যোগ দিলেন অনেক বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্যিক। মজলিসের মাধ্যমে প্রকাশিত হল অনেক পুস্তিকা, অনেক বই, প্রকাশিত হল সাপ্তাহিক ‘সৈনিক’ ও মাসিক ‘দ্যুতি’র মত দু’টি বিপ্লবী পত্রিকা। এর আগেই আমার চিন্তা হয়েছিল: স্বাধীন পাকিস্তানে আমাদের রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম কি হবে? তখন ছিল ইংরেজী ভাষার রাজত্ব। তাছাড়া উর্দুকে ভবিষ্যতে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে মেনে নিয়েছিল সরকারী নেতারা। এই বিদেশী দু’ভাষার মাধ্যমে জনগণের মধ্যে আমাদের আদর্শ রূপায়ণ যে সম্ভব নয় তা আমি ভাল করেই বুঝেছিলাম। কারণ মাতৃভাষার মাধ্যমে ছাড়া কোন আদর্শ সুষ্ঠুভাবে প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব নয়। আর এই কারণেই আমরা একটি ব্যাপক আন্দোলন সৃষ্টির কাজে আত্মনিয়োগ করি।

 

প্রশ্ন: আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আপনি শুরুতে কি কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন?

উত্তর: এ সময় আমার আর একটি চিন্তা হল মাতৃভাষার মাধ্যম ছাড়া দেশের জনসাধারণকে অশিক্ষার ও নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করা যাবে না। শুধু মাতৃভাষার মাধ্যমেই অতি সহজে ও অতি তাড়াতাড়ি অন্যান্য উন্নত দেশের মত দেশের কম-বেশী শতকরা একশত জনকে শিক্ষিত করে তোলা সম্ভব। এটা যে পর্যন্ত সম্ভব না হবে ততদিন দেশের উন্নতিও বাধাগ্রস্ত হবে পদে পদে। ফলে না হবে আদর্শের সুষ্ঠু প্রতিষ্ঠা-আর না হবে দেশের আর্থিক, নৈতিক তথা সার্বিক অগ্রগতি।

অন্যদিকে উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যমরূপে প্রতিষ্ঠিত করার তোড়জোড় শুরু হয়েছিল প্রথম থেকেই। তাই মজলিস গঠনের পর পরই আমি বাংলা ভাষার স্বীকৃতি লাভের উদ্দেশ্যে আন্দোলন করব বলে মনস্থ করলাম। তখন ১৯নং আজিমপুরের বাসায় আমার সাথে আমার ক্লাস ফ্রেন্ড আহসান সাহেবও থাকতেন।

আহসান সাহেব প্রথমদিকে ঢাকা কলেজের ইংরেজীর অধ্যাপক ও পরে সরকারী অফিসের বড় অফিসার হয়েছিলেন। ভাষা আন্দোলন শুরু করার আমার সিদ্ধান্তটি আমি তাঁকেই জানালাম। তিনি তখন আমাকে খুবই উৎসাহ দিলেন।

আমি ভাষা আন্দোলনের রূপরেখা এবং এ সম্বন্ধে আমাদের প্রস্তাব কি হবে তা লিখে একটা লেখা তৈরী করলাম। এই লেখাকে ভিত্তি করে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য আমি আরও দু’-একটি লেখা নিয়ে একটি বই প্রকাশে এগিয়ে গেলাম। বইটির নাম দেয়া হল ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’। আমার প্রবন্ধ ছাড়া আরও যে দু’জন লেখকের প্রবন্ধ এই বইতে দেয়া হল তাঁরা হলেন সু-সাহিত্যিক আবুল মনসুর আহমদ ও ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন। আবুল মনসুর আহমদ তখন মুসলিম লীগের বামপন্থী তথা শহীদ সোহরাওয়ার্দী গ্রুপের অন্যতম নেতা। তাঁর সংগে দেখা করে অনুরোধ করলাম প্রস্তাবিত বইটিতে একটা লিখা দিতে। তিনি অনেক অকাট্য যুক্তিসহ বাংলা ভাষার উপযুক্ততা বর্ণনা করে একটি প্রবন্ধ লিখে দিলেন। ডক্টর কাজী মোতাহার হোসেন ও আমি ছিলাম তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্সের অধ্যাপক। সেই সূত্রে কাজী সাহেব ছিলেন আমার সম্মানিত কলিক। তাঁর বাসা ছিল সেগুন বাগিচায়। তাঁর বাসা খোঁজ করে তাঁকেও একটি প্রবন্ধ লিখে দিতে অনুরোধ করলাম। তিনি তাতে রাজী হলেন। তাঁর বাসায় বারবার গিয়ে সে লেখাটিও উদ্ধার করে তিনটি প্রবন্ধের সমন্বয়ে বইটি বংশালের বলিয়াদী প্রিন্টিং প্রেসে ছাপতে দিলাম। তমদ্দুন মজলিসের পক্ষ থেকে আমি বইটি ১৫ই সেপ্টেম্বর ১৯ নং আজিমপুর রোড থেকে প্রকাশ করলাম। এই বইতে সর্বপ্রথম আমি প্রস্তাবাকারে দাবী করেছিলাম: বাংলাই হবে—

১. পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা (অন্যতম);

২. সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম এবং

৩. সর্বস্তরে অফিস আদালতের ভাষা।

এই প্রস্তাব কার্যকরীর উদ্দেশ্যে ব্যাপক ভাষা আন্দোলন সংগঠনের একটা রূপরেখাও তাতে দিলাম। এর পরই জনাকয়েক বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীর সাহায্যে আমি দেশের সর্বত্র তমদ্দুন মজলিসের শাখা গঠন করতে এবং একই সাথে ভাষা আন্দোলন গড়ে তুলতে এগিয়ে গেলাম। এভাবে প্রথমে ঢাকায় ও পরে বিভিন্ন জেলায় মজলিসের শাখা এবং ভাষা আন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিবেশ গড়ে উঠতে লাগল।

 

প্রশ্ন: আন্দোলনের শুরুতে আপনারা কি ধরনের বাধার সম্মুখীন হয়েছিলেন? কিভাবে এ বাধা অতিক্রম করে একে একটি জনপ্রিয় আন্দোলন হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন?

উত্তর: সত্য কথা বলতে কি, উপরে উল্লিখিত পুস্তিকা আর তাতে উল্লিখিত প্রভাবই ছিল ভাষা আন্দোলন সৃষ্টির প্রধান অবলম্বন। তখনকার সময়ে দেশের জনসাধারণ এবং ছাত্র-শিক্ষকসহ শিক্ষিত সমাজ বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার কথা শুনতেই পারতেন না। তখন মুসলিম লীগের যুগ। শতকরা ৯০ জন শিক্ষিত লোক ছিলেন মুসলিম লীগ ও উর্দুর সমর্থক। তারা মনে করতেন, সংগতভাবে উর্দুই হবে এদেশের রাষ্ট্রভাষা। আর ঢাকার জনসাধারণ তো ছিলেন উর্দুর ঘোরতর সমর্থক। তখন উর্দুই ছিল পুরানা ঢাকাবাসীর মাতৃভাষা। এসব কারণে বাংলার পক্ষে কথা বলতে গিয়ে আমাদেরকে সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে শুরু করে সর্বত্র বিরূপ সমালোচনা ও প্রতিবাদের সম্মুখীন হতে হত। তবুও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসাবে আমাকে প্রতিবছর পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব মফস্বল কলেজে এক্সটার্নাল পরীক্ষক হিসাবে যেতে হত। এই সুযোগে আমি মফস্বলে মজলিসের শাখা গঠন এবং ছাত্রসভা ও সাংস্কৃতিক সভার ব্যবস্থা করে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে জনমত সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালাতাম। এ জন্য বিভিন্ন হলে ও ঢাকার অলিগলিতে বিভিন্ন বাসায় গিয়ে বৈঠক করে সকলকে সন্তর্পণে বাংলার কথা বলতে হত। তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত লনে ও ফজলুল হক মুসলিম হলের মিলনায়তনে সাধারণ সভার ও সাহিত্য সভার আয়োজন করতে হয়েছিল বহুবার; তাছাড়া জনমত সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কয়েকটা বিবৃতি, হ্যাণ্ডবিল ও মেমোরেন্ডামের ব্যবস্থা করতে হয়েছিল উর্দু সমর্থকদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে। এ কাজে মজলিস কর্মীদের উপর নানারূপ বিপদও আবর্তিত হয়েছিল। কর্মীদের উপর ও মজলিস অফিসে হামলা হয়েছিল কয়েকবার। আগেই বলেছি, আন্দোলনকে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য আমাকে বিভিন্ন স্থানে বৈঠক ও মিটিং করতে হয়েছিল। ১৯৪৮ সনের প্রথম দিকে এই উদ্দেশ্যে-আমি তমদ্দুন মজলিসের পক্ষে ফজলুল হক মুসলিম হল মিলনায়তনে একটি সাহিত্য সভা ডাকি। এতে মন্ত্রী হাবিবুল্লাহ্ বাহারকে সভাপতিত্ব করতে রাজী করাই। কেন্দ্রীয় সরকারের ভয়ে এ সময় আমাদের আন্দোলনের কোন কাজে মন্ত্রী ও সরকারী কর্মচারীরা অংশ নিতে ভয় পেতেন। সে যা-ই হোক, বহু অনুরোধের পর কয়েকজন ‘মন্ত্রী ও কয়েকজন সরকারী কর্মচারী এতে যোগ দিয়েছিলেন। এই সভায় কাজী মোতাহার হোসেন এবং কবি জসীমউদ্‌দীনও বক্তৃতা করেছিলেন।

এভাবে আন্দোলন যখন গড়ে উঠতে শুরু করেছিল তখন দেখা গেল পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকার উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা ও সর্বত্র শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে চালু করার উদ্দেশ্যে তোড়জোর আরম্ভ করে দিয়েছেন। টাকা ও মনি অর্ডার ফরম থেকে বাংলাকে বাদ দেয়া হয়েছে এবং কেন্দ্রীয় সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার বিষয়গুলিতেও বাংলা বাদ যাবে বলে খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংগে সংগে কয়েকজন কর্মীসহ আমি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সংগে দেখা করে তীব্র প্রতিবাদ জানাই। তাছাড়া কয়েকজন অধ্যাপক ও বিশিষ্ট ব্যক্তির দস্তখত নিয়ে একটা বিবৃতি দিয়ে সরকারকে এই অপচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক করে দেই।

আন্দোলনের ফলে কিরূপ পরিস্থিতির উদ্ভব হবে—সে সম্বন্ধে পরিষ্কার ধারণা না থাকলেও কয়েকটি ঘটনার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলাম এটা সহজ ও বিপদমুক্ত হবে না। ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’ পুস্তিকা ও আন্দোলন সংক্রান্ত অন্যান্য হ্যাণ্ডবিল বংশালের বলিয়াদী প্রিন্টিং প্রেসে ছাপাতে দিয়ে আমি ঐগুলির প্রুফ আনার জন্য মজলিস কর্মীদের সেখানে পাঠাতাম। এই সময় মজলিসের বিশিষ্ট কর্মী মোহাম্মদ ছিদ্দিকুল্লাহ্ সলিমুল্লাহ্ মুসলিম হলে থাকতেন। তিনি ছিলেন ঐ হলের নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক। একবার তিনি ঐ বইয়ের ফর্মা আনতে গেলে তাঁকে কিছু লোক পথে পাকড়াও করে কাইতটুলিতে নিয়ে যায় এবং উর্দুর প্রতিদ্বন্দ্বীরূপে বাংলার জন্য কাজ করার অপরাধে তাকে গরু জবেহের অস্ত্র দিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ সময় জনৈক দয়াশীল ব্যক্তির প্রচেষ্টায় তিনি সেই মহাবিপদ থেকে রক্ষা পেয়ে হলে ফিরে আসতে সমর্থ হন। আন্দোলন শুরু হলে ঢাকা মহল্লাবাসীদের সাহায্য নিয়ে উর্দু সমর্থক কিছু লোক তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে অবস্থিত রশিদ বিল্ডিং-এর মজলিস অফিসে হানা দিয়ে অফিসের জিনিসপত্র তছনছ করে নানারূপ ভীতি প্রদর্শন করে ওখানকার অফিস বন্ধ করে দেয়। বলা দরকার যে, তখন পর্যন্ত ঢাকাবাসীদের মাতৃভাষা ছিল উর্দু এবং ঢাকার নবাব বাহাদুরের নেতৃত্বে তারা পাকিস্তান সরকারের মত উর্দুই রাষ্ট্রভাষা হোক তা মনে প্রাণে সমর্থন করতেন। এ জন্য ঢাকার মহল্লায় চলার সময় বহু মজলিস কর্মীকে বহুবার অপদস্থ হতে হয়েছিল।

এ জন্য আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যাতে এইরূপ বাধার সম্মুখীন হতে না হয় সে জন্যে ঢাকা শহরে আমি ‘ঢাকা মজলিস’ নামে একটি সামাজিক, সেবা ও শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠান গঠন করি, এর সেক্রেটারী হয়েছিলেন আমার বন্ধু মজলিস কর্মী জনাব আবদুল মান্নান এম, এসসি (বর্তমানে শহীদুল্লাহ কলেজের প্রিন্সিপাল) এবং ট্রেজারাররূপে নিয়েছিলাম ঢাকার বিশিষ্ট নাগরিক জনাব এস, এম, তাইফুরকে। সেবার মাধ্যমে মহল্লাবাসীর শুভেচ্ছা লাভ ও বাংলার প্রতি বিরূপতা লাঘবের এই প্রচেষ্টায় আমাকে ঢাকা মজলিসের কর্মকর্তা ও কর্মীদের নিয়ে বহুদিন অলিতে গলিতে ও মহল্লায় মহল্লায় ব্যস্ত থাকতে হয়েছিল।

এইভাবে সদ্য শুরু করা ভাষা আন্দোলনকে বেশ বিপদাকীর্ণ কাজ মনে হলেও আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল আমাদের যৌক্তিক ও জনকল্যাণমূলক এই আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম একদিন সফল হবেই।

 

প্রশ্ন: প্রথম রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের পটভূমি এবং পরিষদের সাথে সরকারের ৮ দফা চুক্তি সম্পর্কে কিছু বলবেন কি?

উত্তর: প্রথম দিকে মজলিস ও ভাষা আন্দোলনের কাজে আমি আমার বাসা ১১নং আজিমপুর রোড ও তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত রশিদ বিন্ডিং-এর নীচতলাকে মজলিসের প্রধান অফিসরূপে ব্যবহার করতাম। পরে রশিদ বিল্ডিং-এর দোতলার একটা ঘর ভাড়া করে মজলিসের শাখা অফিস করি। মজলিসের এই অফিস থেকেই এই সময়ে ভাষা আন্দোলনের যাবতীয় কাজ পরিকল্পিত, বিবেচিত ও পরিচালিত হত।

এই আন্দোলন এগিয়ে গেলে মজলিস অফিসে মজলিসের মিটিং ডেকে আমরা ভাষা আন্দোলনের প্রথম সংগ্রাম কমিটি গঠন করি। মজলিসের কর্মী ও আমার ক্লাসফ্রেন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক এ,এস,এম, নূরুল হক ভূঁইয়াকে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত করা হয়। তখন আমারই চেষ্টায় মুসলিম লীগের বামপন্থী গ্রুপের সমর্থক পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগের বিশিষ্ট কর্মীরা তমদ্দুন মজলিসে ও সংগ্রাম কমিটিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।

এর পরে আমরা ১৯৪৮ সনের প্রথম ভাগে ইউনিভার্সিটি লনে উর্দু প্রচলন করার অপচেষ্টার প্রতিবাদের আর একটা সভার আয়োজন করি। তাতে আমরা ১১ই মার্চ তারিখে ধর্মঘট ও মিছিলের প্রোগ্রাম নিই।

ইতিমধ্যে আমি জনাব আতাউর রহমানের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় কর্মচারী ইউনিয়ন, আর মাহবুবুল হক, শামসুল হক ও আবদুল হাই প্রমুখের নেতৃত্বে পরিচালিত রেলওয়ে কর্মচারী লীগের সঙ্গে যোগাযোগ করি। বহু আলোচনার পর সেই দুই সংগঠন ১১ই মার্চের আন্দোলন ও ধর্মঘটে যোগ দিতে সম্মত হয়।

ফজলুল হক মুসলিম হলে ভাষাকর্মীদের আর একটা বৈঠক ডেকে আমরা সংগ্রাম কমিটিকে সম্প্রসারিত করি এবং তাতে মজলিসের আর এক কর্মী সলিমুল্লাহ হলের ছাত্র শামসুল আলমকে এর আহ্বায়ক নির্বাচিত করি। উল্লেখ্য যে, অধ্যাপক নূরুল হক সাহেব ও শামসুল আলম সাহেব ব্যস্ত থাকায় আমাকেই আন্দোলন সংগঠনের প্রায় সব কাজ চালিয়ে নিতে হত। এছাড়া সংগ্রাম কমিটিতে ট্রেজারার হিসাবে আমাকে আন্দোলনের যাবতীয় খরচের আঞ্জামও করতে হত।

পরের ইতিহাস হল কয়েকদিন ধরে বিরাট বিক্ষোভ মিছিল, ধর্মঘট, টিয়ার গ্যাস, এ্যারেস্ট, অবশেষে আমার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নাজিমুদ্দীনের সাথে সংগ্রাম কমিটির একাধিক বৈঠক ও ৮ দফা চুক্তি। এই সকল আন্দেলনের ফলে বাংলা সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম, পূর্ববংগের সরকারী ভাষা ও আইন-আদালতের ভাষারূপে স্বীকৃতি, বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে গ্রহণ করার জন্য পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের গৃহীত প্রস্তাব কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানোর জন্যও সরকার চুক্তিবদ্ধ হন।

 

প্রশ্নঃ আপনি কি মনে করেন সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালু হয়েছে?

উত্তরঃ আমার সুচিন্তিত অভিমত হল, এত আন্দোলন ও রক্তপাতের এবং স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরও ভাষা আন্দোলনের প্রধান উদ্দেশ্য বাংলা ভাষা সর্বস্তরে চালু হয় নাই। না হয়েছে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে, আর না হয়েছে সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যমরূপে। আমাদের মহান আদর্শের ঐতিহ্যের সহজ বাহন কিংবা সার্বজনীন শিক্ষার মাধ্যম হিসাবেও একে আমরা উন্নত ও জটিলতামুক্ত করে বাস্তব রূপ দিতে পারি নাই। এই কারণে দু’-দু’বার স্বাধীনতা লাভের সুদীর্ঘ সময়ের পরেও আমাদের দেশের শতকরা প্রায় ১০ জন লোক প্রকৃতই অশিক্ষিত রয়ে গেছে। এ লজ্জা ও কলঙ্ক ঢাকার মত কোন কৈফিয়ত আমাদের নাই। তাছাড়া ১৯৬২ সনে আমি বাঙলা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে সহজ বাংলার মাধ্যমে উচ্চতর ক্লাস পর্যন্ত বিজ্ঞানসহ বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিয়ে এবং অফিসের যাবতীয় কাজকর্ম চালিয়ে দেখিয়েছি বাংলা সহজেই চালু করা যায়। এরপরও বাংলা প্রচলন না করার কোন যুক্তি আছে বলে আমি মনে করি না।

 

প্রশ্ন: এর অন্তরায় কি কি? কিভাবে চালু করা যায় বলে আপনি মনে করেন?

উত্তর: কিভাবে বাংলাকে সহজে ও স্বল্প সময়ে চালু করা যায়—তা আমি অনেক চিন্তা-ভাবনা করেছি। এ জন্য বহু গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। আমার এরূপ একটি প্রবন্ধের নাম হলঃ ‘বাঙলা চালু হয় না কেন’? অপর দু’টি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল দৈনিক ইত্তেফাকে ১৯৮২ সনের শহীদ দিবস সংখ্যায় ও দৈনিক দেশের ১৯৮৪ সনের ২১শে ফেব্রুয়ারী সংখ্যায়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, প্রতিবেদনগুলিতে বর্ণিত পন্থা অবলম্বনে ১৯৪৯ সনেই রাষ্ট্রভাষা ও শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে আমরা বাংলা চালুর গৌরবময় বাস্তবায়ন অবলোকন করতে পারতাম।

ভাষা সম্বন্ধে বর্তমান লজ্জাজনক পরিণতির কারণ হিসাবে সরকারের গাফলতি, আমাদের অবহেলা, নেতাদের মুনাফিকী এবং আরো অনেক কিছু বলা যায়, বলাও হয়েছে। কিন্তু তাতে কোন ফল লাভ হয় নাই।

 

প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে কি প্রভাব ফেলেছে? ভাষার শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য বর্তমানে যে সব প্রথা চালু হয়েছে এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি?

উত্তর: অনেক চিন্তাশীল বুদ্ধিজীবীর মতে, ভাষা আন্দোলনকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে অপব্যবহার করার ফলে আমাদের জাতীয় সংস্কৃতি ও রাজনীতিতে সেটা অপপ্রভাব ফেলেছে। এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ঐতিহ্যের পরিপন্থী বহু অযৌক্তিক প্রথা যেমন ফুল-চন্দন দিয়ে মিনার বা বেদী-পূজার মতো অন্ধকার যুগের কুসংস্কার এতে সম্মানজনক রীতি হিসাবে স্থান করে নিচ্ছে। শহীদদের প্রতি কর্তব্য সম্পাদনের মহত্তম ও কুসংস্কারবর্জিত প্রথা হল কবর জিয়ারত করে তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা এবং যে উদ্দেশ্যে তাঁরা শহীদ হয়েছেন সে উদ্দেশ্য সাধনে কার্যসম্পাদন। আমাদের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা ও সর্বস্তরে শিক্ষার মাধ্যম করার ও এই ভাষাকে সম্ভাব্য সব দিকে উন্নত করার প্রচেষ্টাকে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের প্রকৃষ্ট উপায় বলে আমি মনে করি।

 

প্রশ্ন: ভাষা আন্দোলনের কি কোন পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়েছে? কেন হয়নি? এসব ইতিহাসে একেকজনের একেক দৃষ্টিভংগি লক্ষণীয়। এর কারণ কি?

উত্তর: এ পর্যন্ত ভাষা আন্দোলনের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস রচিত হয়েছে বলে আমার জানা নাই। ভাষা আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যারা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত তাদের ইতিহাস রচনায় যুক্ত করা হয় নাই। যারা ইতিহাস রচনা করেছেন তারা ইতিহাস প্রণয়নের বস্তুনিষ্ঠ নীতি অনুসরণ না করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত হয়ে পক্ষপাতিত্বে প্রভাবিত হয়েছেন বলে মনে হয়। তাছাড়া ভাষা আন্দোলনের সময়ে পাকিস্তান সরকারের স্বরাষ্ট্র বিভাগের ও গোয়েন্দা বিভাগের ভাষা সম্বন্ধীয় ফাইল ও নোট গবেষণা করে এবং ১৯৪৭ সন থেকে ১৯৫২ সন পর্যন্ত প্রকাশিত বাংলাদেশের সব দৈনিক ও সাময়িক পত্রিকা এবং ‘৪৭-‘৪৮ সালে কলিকাতার ‘ইত্তেহাদ’ পত্রিকায় প্রকাশিত ভাষা আন্দোলন সম্বন্ধীয় লেখাগুলোও ইতিহাস তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে বলে আমার ধারণা। ১৯৪৭ সন থেকে ভাষা আন্দোলনের সংগে সম্পর্কিত সমস্ত বিবৃতি, চিঠিপত্র, মেমোরেন্ডাম, বিবরণী, ফটো ইত্যাদি সংরক্ষিত করে আমি ভাষা আন্দোলনের উপর একটি ফাইল দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে তুলেছিলাম। ১৯৫২ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে আমার ও সৈনিক সম্পাদক আবদুল গফুর সাহেবের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরওয়ানা জারী করে রাত্রি তিনটার সময় ১৯ নং আজিমপুর রোডের আমার বাসা পুলিশ ঘেরাও করলে আমি ঐ রাত্রেই বাড়ীর পেছন দিকে জঙ্গলের মধ্য দিয়ে আত্মগোপন করতে বাধ্য হই। কয়েকদিন ঢাকায় লুকিয়ে থাকার পর নিরাপত্তার উদ্দেশ্যে আমরা ময়মনসিংহ রওয়ানা হওয়ার সময় ভাষা আন্দোলন সম্পর্কিত এই ফাইলটি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমানের কাছে নিরাপদে রাখার জন্য দিয়ে যাই। দু’মাস আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকার পর ফাইলটি ফেরত চাইলে মতিউর রহমান বলেন, সেটা ১৫০ নং মোগলটুলির বামপন্থী মুসলিম লীগের সংগ্রামী কর্মী শওকত আলীর কাছে রেখে দিয়েছেন। বহুবার বলেও সে ফাইলটি উদ্ধার করতে পারি নাই। ভাষা আন্দোলনের এই ফাইল ও অন্যান্য কাগজপত্র যাতে পাওয়া যায় তজ্জন্য পত্রিকায় বিজ্ঞাপনসহ অন্যান্য কার্যকরী ব্যবস্থা নিলে এই আন্দোলনের অনেক কাগজপত্র পাওয়া যাবে বলে আমার বিশ্বাস। তাছাড়া ‘৬০-এর দশকে সাপ্তাহিক সৈনিকের কয়েক বছরের বাছাই করা ফাইলটি ভবিষ্যতে গবেষক ও ভাষাকর্মীদের ব্যবহারের উদ্দেশ্যে আমি বাংলা একাডেমীর লাইব্রেরীতে জমা দেই।

পরবর্তীকালে অনেকে না-কি সেখানে গিয়ে সেই ফাইল দেখার সুযোগ পান নাই। এই সমস্ত বিষয়ে সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করলে ভাষা আন্দোলনের বহু মূল্যবান তথ্য বের হয়ে আসবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

ভাষা আন্দোলন সম্বন্ধে পরষ্পর-বিরোধী বক্তব্যের কারণ হল পক্ষপাত-দুষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রকৃত তথ্য উদ্ধারের জন্য গবেষণার মাধ্যমে সত্য উদ্ধারে অনীহা ও অপারগতা।

 

প্রশ্ন: আপনার জীবনে নিশ্চয়ই ভাষা আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ সম্পর্কে প্রামাণিক ইতিহাসের মূল্যবান উপাদান হিসেবে আপনার কি কিছুই লিখতে ইচ্ছে করে না? আপনি কি লিখবেন ভেবেছেন? কবে নাগাদ তা প্রকাশিত হচ্ছে?

উত্তর: ভাষা আন্দোলন সম্বন্ধে প্রকৃত ইতিহাস লেখার জন্য আমি একটা পরিকল্পনা নিয়েছিলাম। এ জন্য মাসিক ২০০০ টাকা ভাতা দিয়ে এরূপ একটা ইতিহাস লেখার জন্য একজন লেখককে অনুরোধ করেছিলাম। বলা দরকার যে, অতি উচ্চ রক্তচাপের জন্য আমি মারাত্মক অসুখে মেডিকেল হাসপাতালে কয়েকবার শয্যাশায়ী ছিলাম বলে নিজে সে ইতিহাস লেখায় হাত দিতে সাহসী হই নাই। নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় উনিও এ বিষয়ে এগিয়ে আসতে পারেননি। তাঁকে ইতিহাস লেখার প্রস্তাব দেবার সময় আমি এও বলেছিলাম, ইতিহাসটি লেখা হলে আমি তা ছাপার ব্যবস্থা করব। উল্লেখযোগ্য যে, তখন আমার আর্থিক অবস্থাও মোটামুটি ভাল ছিল বলে আমি সাহস করেছিলাম। এখানে উল্লেখ্য যে, ‘৫০-এর দশকে আমি ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ নামক একটি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখেছিলাম। তার কয়েকটি সংস্করণও বের হয়েছিল। আমার শারীরিক অসুস্থতা লাঘব হলে আর উপযুক্ত সহকারী পাওয়া গেলে এবং আগে বর্ণিত ব্যবস্থাদি গ্রহণ করে তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেই ইতিহাস লেখায় আমিও কিছু সাহায্য করতে পারব বলে আশা করি। তাছাড়া আমি একটি আত্মজীবনী লিখার পরিকল্পনা নিয়ে কিছুটা লিখেও ছিলাম। অসুস্থতার কারণে তা আপাতত বন্ধ থাকলেও আশা করি ভবিষ্যতে তাতে হাত দিতে পারব। এই লেখায়ও ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের কিছু বিচ্ছিন্ন তথ্য সন্নিবেশিত হবে বলে ধারণা করা যায়।

 

প্রশ্ন: বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা, তাই বলে কি আমরা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাগুলো উপেক্ষা করবো?

উত্তর: বাংলা রাষ্ট্রভাষা বলে আমার মতে অন্যান্য আন্তর্জাতিক ভাষাগুলিকে উপেক্ষা করা সমীচীন হবে না। কারণ জ্ঞান-বিজ্ঞানের সহজ প্রসারের ক্ষেত্রে অন্যান্য উন্নত আন্তর্জাতিক ভাষাগুলিও আমাদের জ্ঞানের প্রসারে ও উন্নয়নে অনেক সাহায্য করতে পারে। এ জন্য ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু’—এই বইটিতে আমি যে প্রস্তাব দিয়েছিলাম—তাতেও বলেছিলাম ইংরেজী এবং অন্যান্য উন্নত বিদেশী ভাষাগুলিকেও আমাদেরকে বাধ্যতামূলকভাবে নয়—ঐচ্ছিক ভাষা হিসাবে শিখতে হবে। পৃথিবীর অন্যান্য উন্নত দেশেও তাদের মাতৃভাষা শিক্ষার মাধ্যম ও রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চালু থাকলেও বিদেশী একাধিক উন্নত ভাষা ঐচ্ছিকভাবে শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরাও তাই করব। আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের যুগে একক ভাষার উপর একান্ত নির্ভরশীলতা কোনমতেই উচিত নয়। তবে মনে রাখতে হবে, মাতৃভাষা ছাড়া কোন উন্নত বিদেশী ভাষাকেও বাধ্যতামূলক বিষয় হিসাবে পড়বার বিলাসিতা সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। কোন উন্নত দেশেই মাতৃভাষা ছাড়া বিদেশী কোন ভাষাকে বাধ্যতামূলক ভাবে পড়াবার নজির নেই।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments