খালেদ বাঙালি (১৮৯১-১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দ)। বাঙালি ‘তকমা’ নিয়ে তিনি কীভাবে নিজ সময়ের হিন্দুস্তানজোড়া কবি পরিচিতি পেলেন; সেই গল্প বিস্ময়ের। উর্দু সাহিত্যের প্রথিতযশা এই কবির কিছু কবিতা, প্রবন্ধ, সম্পাদিত পত্রিকার ইস্যু ও ব্যক্তিগত চিঠিপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। যোগাযোগের পাঠকের জন্য তার কয়েকটা কবিতা বাংলায় রূপান্তর করে দেওয়া হলো। রূপান্তর করেছেন লেখক ও গবেষক আহমেদ দীন রুমি।
বসন্ত-ভূমি, ঢাকা
পূর্বজদের আলোয় তোমার ললাট শোভিত, ঢাকা
ধন্য নগরী! মানুষ তোমাতে তারা হয়ে জ্বলে, ঢাকা
অপরূপ রূপে প্রতিটি পলকে মুগ্ধ-মোহিত চোখ,
আহা! অপূর্ব হৃদয় জুড়ানো আবহ তোমার, ঢাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।।
প্রতিটি প্রকাশ হৃদয়গ্রাহী, প্রতি পলে ভরে মন
মোগল যুগের নগরী গো, করো জীবন সঞ্চরণ,
পরিপাটি ওই পোশাকে বসানো আভিজাত্যের জরি
আচারে লুকানো এশীয় জাতির জমাট আখ্যায়িকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।।
শত্রু সমুখে এখনো তোমার তেজ ভরা প্রতিরোধ,
তোমারে জড়িয়ে জ্ঞানীদের মনে অবাধ গর্ববোধ
প্রাচ্যের শত নগরীর ভিড়ে তুমি এক, অতুলন,
বাংলা শরীর; তার মাঝে এক উষ্ণ প্রাণের রেখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।।
কপালে তোমার মিটমিট করে কত না প্রদীপ জ্বলে
উন্নত শির কত মানুষেরা ঠাঁই করে নিছে কোলে
সাকি গো! তোমার প্রেমে বিহ্বল অন্তর শত শত,
কানায় কানায় পূর্ণ পেয়ালা, যাচ্ছে না ধরে রাখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
স্বদেশের প্রেম উদ্বেল প্রাণ তোমারে স্বর্গ মানে
বুঝে এখানেই অনন্ত সুখ, চির প্রাচুর্য জানে
যেভাবে ভোরের মিষ্টি বাতাস চেনে তাজা ফুল-ঘ্রাণ
বিশুদ্ধ মন সেভাবে তোমার রুহের চেতনা মাখা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
আমাদের সব ভালো ও মন্দে যাদের স্মরণ করি
এ মাটির বুকে এখনো তাদের চিহ্নের ছড়াছড়ি,
প্রতি ফুল আর কুড়ি চমকায় তাদের খোশবু মেখে
আত্মা তাদের আজও ছুটে ফেরে এই অলিগলি ধরি।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
বিদেশী পথিক ব্যথিত হৃদয় জুড়াক এখানে এসে
দুয়েক পেয়ালা শরাব গিলুক বুড়িগঙ্গায় বসে,
চোখেরা এখানে স্বপ্নালু আর দিগন্ত জোড়া রঙ
মেহেদি-রঙিন হাতের ছোঁয়ায় নীল শাড়ি উঠে হেসে।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
যে জানে তোমার অবিনশ্বর মর্যাদা একবার
তোমার পথের এক মুঠো ধুলা পরশ পাথর তার
সে দেখে তোমায়, যেন তুমি কোনো ভূবনমোহিনী ছবি
অথবা মিঠেল স্বপ্নের শেষে মধুর ব্যাখ্যা-সার।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
এইখানে প্রতি সাঁঝের মায়ায় অযোধ্যা দেয় ধরা,
যেন বিধাতার তুলি দিয়ে আঁকা জান্নাত মনোহরা
কিসসা তোমার শুনে দূর থেকে ছুটে আসে সব প্রাণ
সে গাঁথায় তুমি মাধুর্য আর কমনীয়তায় আঁকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
এ বাগে বাতাস এনেছে মানুষ দূর দেশ থেকে টেনে
কূপির আলোয় সেই অনুরাগ বেড়ে গেছে কয় গুণে
কোনো কোণে বসে সুর ধরলেও হয়ে উঠে উৎসব,
এ শুধু তোমার অনন্যতার আখ্যান, সবে জানে।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
লালচে মাটির পথগুলো সেকি হোলি খেলবার দাগ?
নাকি বিকেলের লালচে আকাশ, না রঙধনুর রাগ?
নিষ্পাপ সব মুখগুলো যেন ফুটে আছে ফুল হয়ে
সত্যিই ঢাকা নগরী কি? নাকি মালির ফুলের ঝাঁকা?
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
ভোরের বাতাস যে চাদরে মোড়া, তা যেন না যায় সরে,
ক্লান্ত না হোক, যারা ঘুম যায় ফুল সাথে নদী তীরে
পথ না হারাক ওয়াজকারীরা মাতালের উচ্ছ্বাসে
যে ঢেউ বইছে বুড়িগঙ্গায়, যেন না উপচে পড়ে।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
রমনার রূপ যেন কাঁচে ভাসা স্বচ্ছ পানির দ্যুতি,
কিংবা প্রাচীন গাছ ভেদ করে উঠা অঙ্কুর দুটি,
সত্যি এ নগরী অপ্রতিরোধ্য, আগামী যুগের তাজ
এখানে শিল্পী প্রতিটি কর্মে আগের চেয়েও পাকা।
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
বন্ধুর ভিড়ে থাকব হাজির যত ভাবে, যত বার—
উঠবই ফুঁসে ঢাকাকে সেখানে করা হলে অস্বীকার,
কেন উঠব না? সত্য কথাকে গোপনে রাখব কত?
বরং বলব লাখো-কোটি বার চিৎকার করে একা—
প্রাচ্যের প্রাণ তুমি হে মহান বসন্ত-ভূমি, ঢাকা।
ঈদ মোবারক
শুনছো বন্ধু সেই সুখবর? শুভ মুহূর্ত এসেছে ফের
আড়মোড়া ভেঙে দূরের আকাশে ঈদের হেলাল হয়েছে বের,
পৃথিবী নামের মহা-উদ্যানে বইছে আবার ফাগুন বায়,
প্রকৃতি আজ আরো মনোহর নয়া রঙ নয়া কারিশমায়।
বাগানে বাগানে ভোরের বাতাস তুলছে গান ও খুশির রোল
কলি ফুটবার সুর শুনে যেন ফুলেদের দল নাচে বিভোল,
ঈদের সকাল ভালোবাসা ভরা, মাখা পবিত্র প্রার্থনায়—
দুঃখী সন্ধ্যার নিঃসঙ্গতা দু’জাহান থেকে নিছে বিদায়।
প্রতীক্ষাদের হলো অবসান, এসেছে সময় কোলাকুলির,
ছোট বড় শত ইচ্ছেরা এসে মন মসনদে করেছে ভিড়,
সুন্দরীদের বলে দাও কেউ আজকে নিকাব সরিয়ে দিক
বুক চেপে থাকা প্রেমিকেরা সেই সুযোগে দু’চোখ জুড়িয়ে নিক।
বৃদ্ধেরা চুলে কলপ লাগিয়ে হারা যৌবনে ফিরতে চায়
সুরমা মাখিয়ে চোখের দু’পাশে তরুণেরা নিজ রঙ দেখায়,
প্রতি সাজে আজ ভিন্ন আবেশ, প্রতিটি পোশাকে নতুন ঘ্রাণ
রূপ-রসিকের চলার ছন্দ আবার হঠাৎ পেয়েছে প্রাণ।
প্রতিটি কদম চেচিয়ে জানায়, আজ নেই কোনো হিশাব, ডর—
বলে উঠে গ্লাস, পান করে নাও পরিমাপহীন, রাত্রিভর,
যত উন্মাদ প্রেমিকেরা আছে, নেশা আর জোশে তুলছে সুর,
প্রিয়ের নিটোল চাঁদমুখ থেকে নিয়ত ঠিকরে পড়ছে নুর।
আকাশে ঈদের বাঁকা চাঁদ হাসে, হৃদয় মুগ্ধ, মগ্ন চোখ,
সরাইখানার হারানো চাবিটা পাওয়া গেছে ফের, —‘আমোদ হোক’।।
বাংলার বর্ষা
বাংলার ভূমি জুড়ে মেখে রাখা অসীম আবেগ
যেনবা লুকিয়ে তাতে বিচিত্র ও মায়াবী জগৎ;
অদূরে মেঘের নিচে হাসে ঘোর কালোরাত্রি এক
ভীত বসে মুখোমুখি বরষা ও আমি যুগপৎ।
আকাশে মেঘের খেলা, অন্যদিকে মন উচাটন
শীতল হাওয়ার সাথে বাড়ে বোধ সঙ্গহীনতার,
ক’ফোঁটা বৃষ্টির ঘ্রাণ ঘিরে রাখে নেশার মতন
প্রতিটি পানির কণা শরাবের ফোয়ারা আমার।
বিদ্যুৎ চমক আসে, চোখে লাগে আলোর আবেশ
মেঘ ডাকে, তার সঙ্গে ডাকে বৃষ্টি রিমঝিম স্বরে,
যতদূর দৃষ্টি যায় ঢেকে থাকে মেঘ অনিঃশেষ
পিপাসার্ত চাতকের আর্তনাদ শোনা যায় দূরে।
অকূল নদীর বুকে ছোট ছোট নৌকা ছুটে চলে
সামুদ্রিক গাছ যেন, আচমকা হয় দৃষ্টিভ্রম
রূপসী নারীর চেয়ে অস্থিরতা বেশি জমা পালে
আগে-পিছে লাখো ঢেউ সঙ্গী হতে ছুটে হরদম।
তীর জুড়ে ফুটে আছে বনফুল, সুস্নিগ্ধ সুবাস
যেনবা বসন্ত ঋতু মিশে গেছে ঘন বরষায়,
নদীও উত্তাল খুব, ঢেউ চায় ধরতে আকাশ
শীতল বায়ুর স্পর্শে উষ্ম গ্রীষ্ম নিয়েছে বিদায়।
যৌবন ফিরেছে বাগে, পূর্ণ তাই কানায় কানায়
কুড়ি ও ফুলেরা যেন স্নান করে হয়েছে নির্মল,
বজ্রের চমক চলে, চারদিকে মেঘ ছেয়ে যায়
নারীর চুলের মতো দোল খায় তটিনীর জল।
তারপর রাত নামে উঁকি দেয় চাঁদ হাসিমুখে
আসমান স্বচ্ছ হয়, ফেরে বরষা সত্যিকার রূপে,
যেন নদীতীরে কেউ ফুলের পালঙ্ক পেতে রাখে,
যেনো চুলখোলা নারী গোসলে যাবার পথ মাপে।
কিষাণ-কন্যারা ওই ঝিলের পানিতে করে স্নান
এলো চুল মেলে ধরে ডুব দেয় বারবার করে,
পানিতে দাঁড়িয়ে থেকে তীরে চেয়ে হাসছে অম্লান,
ঝিলকে করেছে যেন পরিণত এক আয়নাঘরে।
নীলপদ্ম ফুটে আছে, যেন ফোটা জলের মুকুল
অথবা নকশা কোনো, এঁকে রাখা চাঁদের চাদরে
অপূর্ব জগত যেন ঝিলের পানিতে খাচ্ছে দোল
সত্য নাকি স্বপ্ন সব? মনে এসে দ্বিধা ঘিরে ধরে।
দুনিয়ার সব রূপ আচমকা অনাবৃত আজ
অর্ধেক পানির নিচে বাকিটুকু পানির ওপর
গোলাপী চেহরা ঘিরে ভেজা দীর্ঘ নিকাবের ভাজ
চিমনিতে বাতি যেন, কিংবা চাঁদ আলোয় মুখর।
ব্যাকুল দরিয়া যেন স্বপ্নে পূর্ণ প্রেমিক হৃদয়
মরুভূমি হয়ে মনে কারো আঁচলের কথা বাজে,
চারদিকে বরষার ব্যস্ত আয়োজন লেগে রয়
স্থলে পানি, জলে মাছ—খোদার মহিমা ধরা মাঝে।
আঁচলে জড়িয়ে ফুল মাতামাতি করো না বাতাস
বুকের ভেতরে আজ বিষাদের তপ্ত সাইমুম,
ভরা বরষার ভিড়ে মনে পূর্ণ দুঃখ হাহুতাশ
বন্ধু সব হিন্দুস্তানে, বাংলা জুড়ে শ্রাবণ মৌসুম।
প্রথম দেখা
সেদিন বন্ধু জানতে চাইলো, বলো তো খালেদ একটা বার—
অন্তর যারে দিয়েছিলে সঁপে, দেখেছো কখনো মুখটা তার?
ভার বুক নিয়ে বলেছি তখন,
কারো তকদির না হোক এমন,
কোন অসময় দেখলাম তারে সে বড় করুণ কিসসা, হায়,
শুনতে চাইলে স্থির হয়ে বসো, মনোযোগ দাও সেই কথায়।
সর্বনাশিনী এক সন্ধ্যায় পড়েছিল তার চোখেতে চোখ
যেন বাগিচায় ফুটে থাকা ফুল, যেন ফের দেখা হারানো মুখ।
সে তখন এক উঠতি কিশোরী
ঘরে মোর চলে সদা ঘুরাঘুরি
সাদাসিধে তার স্বাভাবিক রূপে হার মানে শত অলঙ্কার
চোখে প্রস্তুত সব আয়োজন প্রেমের আগুনে পুড়ে মারার।
ভ্রুজোড়ার মাঝে সামান্য বাঁক, যেন খাপহীন ধারালো ছুরি
গালের নিপুণ টোলের গভীরে রূপ আর জ্ঞান রেখেছে ধরি।
কপাল রূপের উদয়ন-স্থান
প্রেম পাঠশালে স্পষ্ট কোরান
শিশুর বুলির মতো কথাগুলো সহজ অথচ চমৎকার
বড়দের প্রতি সম্মান, সাথে নিজেরে প্রকাশে দ্বিধার ভার।
এত রূপ খোদা, চোখ পড়লেই তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে
চরিত্র এই! স্তুতিগান গাওয়া ওয়াজিব হয় দেখলে তারে
মুখটাই তার রূপের দলিল
রূপেতে মুগ্ধ দুনিয়া নিখিল
যেই সময়ে দেখেছি তাহারে, শুনে রেখো ওগো বন্ধুবর
পৃথিবীর রূপ বলতে মানেই বুঝেছি কেবল এমনতর।
ব্যথার প্রলাপ
প্রিয়ের দিদার হবে—এ আশায় কেটে গেল তামাম জীবন
হয়তো অপেক্ষা বুকে নিতে হবে একদিন সমাপ্তির শ্বাস
আত্মবিস্মৃতির ঘোর আমার জন্য তো এক স্বপন উদাস
অথচ এ বিহ্বলতা হয়তো তোমার কাছে সুখের কারণ।
নিয়ত ‘লান তারানি’ ধ্বনি যেন করে আছে আচ্ছন্ন হৃদয়
তবুও অস্থির বুক ‘আরানি’ শব্দের সাথে যেতে চায় মিশে,
আমার এ কষ্ট গাঁথা—কেউ নেই এ ভূবনে শুনে পাশে বসে
মৃত্যুর মুহূর্তে তবু শিয়রে গোপনে কেউ রবে মনে হয়।
আয়না সামনে রাখো, দেখবে রবে না আর কিছু অগোচরে
দুঃখের বর্ণনা শোনা হয়তো তোমার জন্য প্রীতিকর নয়,
বিরহের রাত দীর্ঘ, প্রতিটি মুহূর্ত কাটে বিভীষিকাময়
উপশম নেই জানি, অন্তত এ ব্যথা যেন না যায় কবরে।
আমার মৃত্যুর পর বিষাদে তোমার চুল হবে প্রতিবাদী
হঠাৎ দেখতে পাবে তামাম দুনিয়া যেন শোকে মুহ্যমান,
তোমার আঁচল ভাঁজে মিশে যাবে এ আমার অস্তিত্বের ঘ্রাণ
কে জানে হয়তো হবে তোমার দরজা পাশে আমার সমাধি।
অস্তিত্ব বলতে শুধু আনুগত্য টিকে আছে ভেতরে আমার
এতটা নিষ্ঠার সঙ্গে আর কেউ কোনোদিন প্রেমিক হবে না,
কোনো পূর্ণিমায় এসে আমার ফাতেহা পড়ে যাবে প্রিয়তমা—
কোথাও কখনো যদি তৈরি হয় এ হারানো মনের মাজার।
মুসাকে খিজিরের উপদেশ
নশ্বর দুনিয়া নিয়ে চিন্তায় নিমগ্ন থাকা পণ্ডশ্রম খালি
এ কেবল বুদবুদ, সামান্য বাতাস ছাড়া কিছু নেই বুকে,
যেমন সমুদ্র ঢেউ মুছে দেয় তীর ধরে আঁকা চিত্রাবলি
পৃথিবীর আয়োজন সেভাবে বিলীন হয় দ্রুত একে একে।
সুতরাং যা সামর্থ্য, ব্যয় করো পরকাল জীবন গঠনে
যতদিন শ্বাস আছে, প্রতিটি মুহূর্ত ধরে নাও গনিমত,
কখন যে ডাক আসে সব ছেড়ে পাড়ি দিতে হয় আসমানে
জানো না এ কোলাহলে আর ঠিক কতদিন তোমার মেয়াদ।
অপ্রাপ্তির খেদ নিয়ে হারিয়ো না বর্তমান সময়-সুযোগ
জেনো দুনিয়ার মোহ পরম সুখের পথে বাঁধার সিরিজ,
এমন অজস্র শত্রু চার দিকে বসে আছে খোলা রেখে চোখ
যদিও মন্দের সঙ্গে মাঝে মাঝে মিশে থাকে কল্যাণের বীজ।
ফিতনার ব্যাপারে যেন প্রতিটি মুহূর্তে থাকে সতর্ক হৃদয়
দিনশেষে শৃঙ্খলাই মানুষের একমাত্র নিরাপদ ঘর,
বিপদে ছেড়ো না হাল, অতিরিক্ত চিন্তা কোনো সমাধান নয়
পতনে উন্নতি থাকে, উন্নতির মাঝে থাকে পতনের ডর।
অভাবে হয়ো না ভীত, তার চেয়ে মোকাবিলা করো শান্ত মনে
জানো তো খোদার বাণী, ‘তার রহমত থেকে হয়ো না নিরাশ,
মস্তিষ্ক সমস্ত দিয়ে করতে থাকবে কাজ নিয়ত গোপনে
অন্যের শক্তির দিকে ভরসা করার কোনো নেই অবকাশ।
আলস্য কখনো যেন বঞ্চিত না করে ফেলে পরকাল থেকে
দায়িত্ব পালন করো, নিজেই প্রত্যহ রাখো নিজ খতিয়ান
জাগতিক প্রয়োজনে যদিও মোহের নানা পর্দা জুড়ে থাকে
যাপিত জীবনে তবু ধনী আর গরিবের মর্যাদা সমান।
দুজাহানে উন্নতির সমস্ত রহস্য রাখা লুকানো এ দিক—
ফলে প্রয়োজন ছাড়া ভুলেও করো না ত্যাগ নিজ নির্জনতা,
যদিও তামাশা-ঠাট্টা হৃদয়কে মুগ্ধ করে রাখে সাময়িক;
অতি ফুর্তি দিনশেষে নিয়ে আসে বিপদের ভয়াল বার্তা।
হাসি-সদালাপে মেলে মানুষের প্রিয় হয়ে উঠবার স্বাদ
যদিও মামুলি কাণ্ডে হাসাহাসি দিনশেষে আনে বিপর্যয়;
এ সত্যকে অস্বীকারে হায়াহীনতাই হয় স্পষ্ট প্রতিভাত,
অবশ্য তওবাকারী খোদার চৌকাঠে পায় ক্ষমার বিস্ময়।
যে মানুষ ক্ষমাশীল, তার মাঝে দয়ালের প্রতিচ্ছবি ভাসে
ক্ষমা করে দিও মুসা, যদি কোনো অধীনস্ত ভুল করে বসে।