শালিক পাখির হৃদয় হতে
নিরবতার জিকির করতে করতে জেনেছি—
আমি বরং কোলাহলপ্রিয়
আমি পাহাড়ের অনড় গাম্ভীর্যের পৈথানে পৌঁছে
ছলছলাৎ ঝরনা কামনা করি
বনভূমির নির্জনতার কাছে গিয়ে
কামনা করি পাখির কোলাহল
হারিয়ে যাওয়ার পর খুব করে চাই—
পথপাশ থেকে আমার ঠিকানা জিজ্ঞেস করুক
একটা বৃক্ষ, একটা শালিক, তোমার চোখের অশ্রুজল
নিঃসঙ্গতা কামনা করে চেয়েছি জনপ্রিয়তা
লিখতে চেয়েছি নৈঃশব্দ্য, পেয়েছি হাততালি
আকাশের কাছে উদারতা কামনা করে পেয়েছি বৃষ্টি
স্বৈরশাসন গলায় ঝুলিয়ে বলেছি জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ
নিরবতার খোঁজে মুর্শিদের আস্তানায় বায়াত হয়ে
কামনা করেছি তাবাররুক, কারামত, তাজাল্লি, আনাল হক
ধ্যানের মধ্যে সকল মন্ত্র ভুলে জপেছি শুধু—
খানকা-আশ্রম মুখর করে বেজে উঠুক তোমার ফোনকল
বহুকাল পুণ্যযাত্রা শেষে ক্লান্ত পথিক শুধাল,
‘পথের আর কত বাকি, মুসাফির?’
পথ বলল, ‘তোমার কাজ হাঁটতে থাকা, প্রশ্ন নয়!’
এরপর সে যখন স্পর্শ করল জল, হয়ে গেল জমজম
সে উত্তোলন করল হাত, ধরা দিল কাউসার জলাধার
সে তাকাল আকাশের দিকে, খুলে গেল বেহেশতদ্বার
পথিক আনমনে হাসতে হাসতে হাতে তুলে নিল তসবিহ
আবার হাঁটতে লাগল পৃথিবীর ধুলোমাখা পথে
যে কথা বলতে চাই
উঁচুয় উঠতে হলে নিচে নামতে হবে
আমি পারি নাই
ব্ল্যাক কফির তেতো গিলে বলতে হবে ‘এক্সিলেন্ট’
আমি পারি নাই
ফলোয়ার বাড়াতে নামের আগে বা পিছে
লাগাতে হবে ‘বিশিষ্ট ইসলামি চিন্তাবিদ’
আমি পারি নাই
আমার ভেতরে যখন চিন্তার ডালপালা, সংসারের চাল-ডাল
মেসেঞ্জারে অপরিচিত লোকদের সালামের উত্তর দিতে
আমি পারি নাই
আমি ভাবনার পুকুর থেকে মাছের মতো লাফ দিয়ে
পাখনা মেলে উড়তে চেয়েছি আকাশে
নিজের অথর্বতার মধ্যে আছড়ে পড়ে
হারিয়ে গেছি শনি-মঙ্গলবারের হাটে
হাটুরে মানুষের ভীড় ঠেলে দৌড়াতে চেয়েও
আমি পারি নাই
আমার গায়ে দেয়াশলাই কাঠি ঘষা দিলে আগুন নয়
বাতাসে আলোড়ন তুলে আমন ধানের ঘ্রাণ
মাটির বুকে হাত দিয়ে বানাতে চেয়েছি ভাস্কর্য
ভাস্কর্যের গা ফুঁড়ে গজিয়েছে কুমড়োর চারা
মুখ থেকে মুছতে চেয়েছি পূর্বপুরুষের দ্রাবিড় তামাটে রং
আমি পারি নাই
আমি বলতে চেয়েছি—তোমরা যে কথা বলো
তোমরা যে স্বপ্ন দেখো, তোমরা যে রকম ভালোবাসো
সব মিথ্যা, সব বানোয়াট, সকলই কথার কথা
আমি পারি নাই
আমি মানুষের কাছে বসে শুনতে চেয়েছি তার মানবজন্ম
তারা কীভাবে আরেকবার জন্ম নেবে—সেই অলৌকিক বিজ্ঞান
তারা কথা বলেছে সাদা ভাত আর ধবধবে ফরসা নারী
তবু তাদের পাশে চুপচাপ বসে থেকে শ্রোতা হতে চেয়েছি
আমি পারি নাই
আমাকেও তাদের মতো চিৎকার করে বলতে হয়েছে
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, দুঃশাসন, ধর্মীয় অনাচার
তবু আমি তাদের মতো হতে পারি নাই
নির্বাসন
শিরস্ত্রাণ ছিনিয়ে নিয়েছে যুদ্ধ-বিজয়ী চিল
অশ্বারোহী মেঘ হয়ে পালিয়ে যাচ্ছি দূরে
বুকের বর্মে খোদাই করা তোমার ঠিকানা
রক্তের স্রোতে মুছে গেছে রানির সিলমোহর
হারিয়েছি তলোয়ার, তিরের আঘাত পিঠে
আমার সিপাহিরা খুইয়ে এসেছে স্মৃতির সম্ভ্রম
পরাজিত মেঘ হয়ে সীমান্তে, ফিরব না আর রাজধানী
সেনাপতির জীবন কাটবে এখন মাতাল নির্বাসনে
আত্মপরিচয়
ওরা জিজ্ঞেস করল, তোমার নাম কী?
আমি আমার নাম বললাম
ওরা জিজ্ঞেস করল, তোমার ঠিকানা?
আমি আমার ঠিকানা জানালাম
ওরা জিজ্ঞেস করল, তুমি পড়তে জানো?
আমি ওদের পড়ে শোনালাম সুরা আলাক
ওরা কানে আঙুল চেপে বলল, এ আমাদের ভাষা নয়
এই সুর আমাদের সংস্কৃতি নয়, তুমি আগন্তুক এখানে
আমি মাথায় সফেদ পাগড়ি পেঁচিয়ে বললাম—
এ-ই আমার জন্মভূমি, এখানে আমার পিতারা ঘুমায়
কাবিননামা
কিছু কথা বাকি থাক তবে
মেঘভেজা সন্ধ্যার তারা
শুধু আলো থাক তার,
বাকি কথা হবে কড়া ভাজা পরোটায়
যদি সব কথা বলে দাও হৃদয়ের কাছে
আমি ওর আশপাশে থাকি,
কফির সঙ্গে মেশাও ঘন গরু-দুধ
চুমুক দিতে দিতে শুনে নেব বেদনার সিক্রেট
আইডি কার্ডে তোমার নামের বানান
সাবমিট করার আগে পড়ে নাও মেয়ে,
ভালোবাসা একবার হারিয়ে গেলে এই স্বৈরাচারের দেশে
বেনামী অন্য কেউ তুলে নেবে প্রেমের কাবিননামা
অনশন
তোমাকে দেখি না এ আলোয়, এ বাতাসের নিঃশ্বাসে
এ দুপুরের রোদ থেকে নিয়ে সন্ধ্যার হাসনাহেনা
তোমাকে দেখে না সাইকেল চালিয়ে ফেরা বিষণ্ন কিশোর
এ চোখ অনশনে গেছে কবে, বিপ্লব হয়ে আছে তোমার মুখ
তোমার মুখ দেখি না স্কুলঘরে, ও পাড়ায় বেজে উঠে শঙ্খধ্বনি
পুরোনো খাতার ভাঁজে রাখা আহত গোলাপ
মাটিগন্ধী ঘাসের চাদর থেকে কেঁদে উঠা মন
তোমাকে দেখি না এ রাত্রে, এ নিঃসঙ্গ বাংলাদেশে