যখন তোমারে ভালোবাসি
মূল: নিজার কিব্বানি
তোমারে যখন ভালোবাসি
একটা নতুন ভাষা জন্ম লয়,
নতুন নতুন শহর,
নতুন নতুন দেশ আবিষ্কৃত হয়।
সময়ের ঘন্টাগুলা শ্বাস নেয় কুকুরের ফুটফুটা বাচ্চার মতো,
বইয়ের পাতার ফাঁকে ফাঁকে গজে উঠে গম।
তোমার চোখ থেকে উড়ে যায় পাখি
মধুর সংবাদ নিয়ে,
তোমার স্তন থেকে যাত্রা করে কাফেলা
নিয়ে যায় ভারতীয় মশলা,
সবদিকে ঝড়ে পড়ে আম,
বনে বনে ছড়ায়ে যায় আগুন
আর বেজে উঠে নুবিয়ান ঢোল।
যখন তোমাকে ভালোবাসি
তোমার স্তন থেকে ঝড়ে পড়ে সমস্ত হায়া,
বিজলি-তুফান, চকচকা তলোয়ার আর তুমুল বালুঝড়ে বদলে যায় তারা।
তোমাকে যখন ভালোবাসি
আরব শহরগুলা জেগে উঠে,
বিদ্রোহে ফুঁসে উঠে শতাব্দীর দমন-পীড়ন
আর গোত্র-হিংসার বিরুদ্ধে।
আর আমি, আমি যখন তোমারে ভালোবাসি
মিছিল করি জগতের কুৎসিত রূপের বিরুদ্ধে,
লবণের রাজাদের বিরুদ্ধে,
মরুভূমি দখলের বিরুদ্ধে।
আর আমি তোমাকে ভালোবেসে যাব
যতদিন না মহাপ্লাবনে ডুবে যায় দুনিয়া;
তোমাকে ভালোবেসে যাব
যতদিন না নূহের প্লাবনে ডুবে যায় দুনিয়া।
কোনো কিছুই আমারে আর বিমোহিত করে না
মূল: মাহমুদ দারবিশ
কোনো কিছুই আমারে আর বিমোহিত করে না,
বাসের এক যাত্রী বলে উঠলেন।
রেডিও না, খবরের কাগজ না,
এমনকি পাহাড়ের উপরে থাকা দূর্গগুলাও না।
আমি একটু কাঁদতে চাই।
বাস-চালক বললেন,
দয়া করে গন্তব্যে পৌঁছানো পর্যন্ত অপেক্ষা করুন,
আপনার যত ইচ্ছা কাঁদতে পারবেন তখন।
এক ভদ্রমহিলা বললেন, আমিও না।
কোনো কিছুতেই এখন আর আনন্দ পাই না।
আমি আমার নিজের কবরে ছেলেরে শোয়ায়ে আসলাম,
সে খুশি মনে কবরে ঘুমায়ে গেল
আমারে একবার বিদায়টাও জানাল না।
ভার্সিটির এক ছাত্র বললেন, আমারেও না।
কোনো কিছুই আমারে আর তেমন টানে না।
প্রত্নতত্ত্ব নিয়া পড়তেছি
অথচ আজ অব্দি কোনো পাথরে ইতিহাসের একটা আঁচড়ও খুঁজে পাইলাম না।
এই আমিটা কী আসলেই আমি?
একজন সৈনিক বললেন, আমারও একই ব্যাপার।
কোনো কিছুই এখন আর আমার রক্তে আগুন ধরাইতে পারে না।
যে ভয় আমারে তাড়া করে বেড়ায়তেছে
সেই ভয়রেই আমি পাহারা দিতেছি জীবনভর।
বাস-চালক রেগে গেলেন,
বললেন, আমরা আমাদের গন্তব্যের অতি নিকটে আছি,
সবাই নামার জন্য প্রস্তুত হোন।
যাত্রীগণ চিৎকার করে বলে উঠলেন,
এই স্টেশনের পরে কী কী আছে আমরা সেই দৃশ্যগুলাও দেখতে চাই,
আরেকটু সামনে নিয়া যান।
শুধু আমি একলা বললাম, আমারে নামায়ে দেন।
আমিও তাদের মতোই একজন,
আমারেও কোনো কিছু বিমোহিত করে না আর।
কিন্তু ঘুরাঘুরি করতে করতে আমি এখন ক্লান্ত।
ফিউচার
মূল: জুলিও কর্টাজার
আমি খুব ভালো করেই জানি তুমি থাকবা না।
থাকবা না তুমি রাস্তায়, মোড়ে, গলিতে,
থাকবা না বাতাসের মিহি গুঞ্জরনে,
আসবা না তুমি রাতের তৈয়ারি আলোয়,
না মেন্যু নিয়া বলা আমাদের ইশারা কথাবার্তায়,
পাতাল-রেলে যে হাসি বস্তাবন্দি মানুষরে একটু হালকা করে
আসবা না তুমি তাতেও।
তুমি কখনো থাকবা না আমার ধার করা বইগুলার স্মৃতিতে,
কখনো থাকবা না আমার বলা দেখা-হবে-কালকে,
থাকবা না আমার কোনো খোয়াবেও,
থাকবা না আর আমার বলা শব্দগুলার প্রথম গন্তব্যেও,
আর কখনো পাব না তোমারে কোনো মোবাইল নম্বরে,
কখনো দেখব না তোমায় কোনো দস্তানা
অথবা জড়ায়া রাখা তোমার কোনো ব্লাউজের রঙে।
তোমার দেখা না পেয়ে আমি পুড়তে থাকব প্রেমে আর রাগে,
তোমাকে না ভেবেই কিনব চকোলেট,
জনমেও তুমি আসবা না এমন এমন স্থানে থাকব আমি একলা দাঁড়ায়ে,
আর–
বলব আমাদের বলে ফেলা কথাগুলা,
খাবো আমাদের স্বাদ নেয়া খাবারগুলা,
আবার দেখব আমাদের দেখা স্বপ্নগুলা,
যদিও আমি ভালো করেই জানি তুমি থাকবা না সেখানেও,
বানানো যে কারাগারে আটকায়ে রাখছিলাম তোমারে, তার ভেতরে,
না থাকবা তার বাইরেও,
রাস্তা নদী ও ব্রীজগুলার ওপারেও।
আমি জানি তুমি থাকবা না,
থাকবা না তুমি এমনকি আমার স্মৃতিতে,
থাকবা না তোমারে স্মরণ করতে চাওয়া আমার ব্যর্থ প্রয়াসেও।
জুলাই
মূল: এমিলি ডিকসন
আমাকে বলো, জুলাই
উত্তর দাও–
কোথায় আছে মৌমাছি
আছে কোথায় নীলিমা
কোথায় সোনালী খড়ের গাদা?
হায়, বললো জুলাই–
কোথায় আছে বীজ
কুঁড়ি–কোথায় সে
আছে কোথায় মে?
জবাব দাও–
বলো আমাকে
নাই নাই, বলল মে
দেখাও আমায় তুষারপাত
শোনাও সেই ঘণ্টাধ্বনি
কোথায় আছে–
আমার পোষা পাখি!
পাখি বলল রেগে–
কোথায় আমার ভুট্টাখেত
কোথায় আছে কুয়াশা
কোথায় আমার প্রিয় ফল–
আছে কোথায় সে?
এখানে এখানে–
বলল বছর ধীরে–
বই পোড়ানো
মূল: বার্টোল্ট ব্রেখট
রেজিম থেকে যখন হুকুম এলো বিপদজ্জনক জ্ঞানে পূর্ণ বইগুলা জনসম্মুখে পোড়ায়ে ফেলতে হবে
গরুর গাড়ি বোঝাই করে বইগুলা নিয়ে ফেলা হলো অগ্নিকুণ্ডে
সেরা একজন লেখক, যারে নির্বাসিত করা হইছে,
পোড়ায়ে ফেলা বইগুলার তালিকা খুঁজে দেখলেন তার কোনো বই পোড়ানো হয় নাই।
রাগে-গোস্বায় তিনি তার লেখার টেবিলে ফিরা গেলেন,
ক্ষমতাসীনদের প্রতি একটা চিঠি লিখলেন।
আমারে পুড়ায়ে ফেল!
ক্ষিপ্ত হয়ে তিনি লিখলেন, পুড়ায়ে ফেল আমারে।
আমার বই কি সব সময় সত্য কথাটাই বলে নাই?
আর তোরা আমারে মিথ্যাবাদী সাজায়তেছোস!
আমি বলতেছি: পুড়ায়ে ফেল আমারে!