পাঁচটি অনূদিত কবিতা

শাদাব হাসিন

বেঁচে থাকা

মূল : নাজিম হিকমত


 

[১]

বেঁচে থাকাটা কোনো তামাশার বিষয় না,

বেঁচে থাকতে হলে তোমাকে বাঁচার মতোই বাঁচতে হবে

উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, একটা কাঠবিড়ালির মতোন—

মানে বাঁচার চিন্তা ছাড়া তুমি আর অন্য কিছুই ভাবতে পারবা না,

বেঁচে থাকাটাই হতে হবে তোমার একমাত্র পেশা, ধ্যান-জ্ঞান।

বেঁচে থাকা কিন্তু কোনো মশকারি না।

সমস্ত ব্যাপারটাকে তোমার যথেষ্ট গুরুত্ব দিতে হবে,

বাঁচতে হবে আমলের সহিত।

একটু বিস্তারিত বলি,

মনে করো তোমার হাত দুইটা পিছমোড়া করে বাঁধা,

দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তোমার,

অথবা ধরো কোনো একটা গবেষণাগারে

শাদা এপ্রোন আর নিরাপত্তা চশমা পরে তুমি দাঁড়ায়ে আছো,

মানুষের জন্য তুমি মরতে পারো—

এমনকি যেসব মানুষকে তুমি জীবনেও দেখো নাই তাদের জন্যও,

যদিও তুমি জানো যে বেঁচে থাকাটাই একমাত্র বাস্তব আর আশল কথা।

বোঝাতে চাইতেছি, বেঁচে থাকা ব্যাপারটাকে তোমার যথেষ্ট গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে।

এমনকি তোমার বয়স যদি সত্তুরও হয়, তবুও তুমি জলপাইয়ের গাছ লাগাবা—

তোমার ছেলেমেয়েদের জন্য না মূলত,

তুমি যদিও মরণরে ডরাও, কিন্তু মরণে বিশ্বাস রাখো না আসলে,

কারণ বেঁচে থাকাটা, আমি বলতে চাইতেছি, অনেক বেশি কঠিন।

 

[২]

ধরা যাক, আমরা খুবই অসুস্থ, অপারেশন লাগবো এমন অবস্থা,

মানে, অপারেশন টেবিল থেকে যে বেঁচে ফিরে আসব এই সম্ভবনা খুবই কম।

একটু পরেই মরে যাব এটা ভেবে একটুও দুঃখবোধ না করাটা তখন একটা অবাস্তব ব্যাপার হবে যদিও,

এই অবস্থাতেও জোকস শুনে আমরা হাহা করে হাসব,

জানালা দিয়ে উঁকি দিয়া দেখব বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে কিনা,

অথবা একটু অধৈর্য নিয়া অপেক্ষা করতে থাকব ব্রেকিং নিউজগুলা শোনার জন্য।

 

ধরা যাক, আমরা আছি যুদ্ধের ময়দানে—

লড়াই করেই জিতে নিতে হয় এমন কিছুর জন্য,

ময়দানে প্রথম আক্রমণেই আমরা পড়ে যেতে পারি মুখ থুবড়ায়ে 

মরে গিয়ে মিশে যেতে পারি মাটিতে।

অদ্ভুত একটা ক্ষোভের সাথেই আমরা এই ব‌্যাপারটা উপলব্ধি করব,

কিন্তু তখনও আমরা যুদ্ধের ফলাফলের কথা ভেবে

উদ্বিগ্ন হব নিজেদের মৃত্যু নিয়ে,

এই যুদ্ধও চলতে পারে বছরের পর বছর ধরে।

 

ধরা যাক, আমরা সবাই জেলে বন্দি,

বয়স প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি,

মনে করো, জেল থেকে ছাড়া পেতে আরো বাকি আছে আঠারো বছর।

তখনও আমরা বাইরের দুনিয়াটাকে সাথে নিয়েই বাঁচতে থাকব,

বাইরের মানুষ, জীবজন্তু, সংগ্রাম আর বাতাস—

মানে, জেলের দেয়ালের বাইরে যে দুনিয়াটা আছে ওইটারে সাথে নিয়া।

 

আসলে বলতে চাইতেছি, যেখানে যেমনেই থাকি আমরা

এমনভাবে বাঁচতে হবে যেন দুনিয়াতে মরণ বলে কিছু নাই। 

 

[৩]

দুনিয়াটা শান্ত হবে,

হাজার হাজার তারার মাঝখান থেকে একটা তারা,

সবচেয়ে ছোট্ট যে তারাটা,

নীল মখমলের মধ্যে চকচক করতে থাকা একটা দানার মতোন,

এটাই আমাদের পুরা দুনিয়া।

 

দুনিয়াটা একদিন শান্ত হবে,

এক টুকরা বরফের মতোও না,

আবার মৃত কোনো মেঘের মতোও না,

অবিরাম পবিত্র অন্ধকারে দুনিয়াটা তখন

গড়াগড়ি খাবে একটা নষ্ট আখরোটের মতোন…

তোমাকে এখনই এর জন্য দুঃখ করতে হবে,

এই মুহূর্তেই অনুভব করতে হবে কষ্টটাকে।

দুনিয়াটাকে এমনভাবে ভালোবাসতে হবে

যেন তুমি নির্দ্বিধায় বলতে পারো ‘আমি বেঁচে ছিলাম’।

 


একটি কুকুরের মৃত্যু

মূল : পাবলো নেরুদা


 

আমার কুকুরটা মরে গেছে।

বাগানে পড়ে থাকা অকেজো মেশিনটার পাশে তারে গোর দিয়া আসলাম।

 

কোনো একদিন আমিও তার মোলাকাতে যাব সেখানে,

কিন্তু এখন সে আর নাই,

চলে গেছে চিরতরে তার বয়েসী চামড়ার ভাঁজ, বদমেজাজ 

আর ঠান্ডা নাকটা সাথে নিয়া,

আর আমি, ঘোর নাস্তিক এক, কোনোদিন ঐশ্বরিক কোনো বেহেশতেই বিশ্বাস রাখি নাই,

তবুও আলাদা এক জান্নাতে বিশ্বাস আমার আছে যেখানে কোনোদিন আমি যাইতেই পারব না।

হ‌্যাঁ ভাইসব, আমি বিশ্বাস রাখি এক এমন বেহেশতে

যেখানে আমার যাওয়ার কথা ভেবে দাঁড়ায়ে লেজ নাড়াইতেছে আমার প্রিয় কুকুরটা অপেক্ষার আনন্দে।

 

না ভাই, কোনো দুঃখের কথাই আমি আর বলব না এই দুনিয়াতে,

এমন এক বন্ধু হারানোর কথা যে কখনো আমার অনুগতই ছিল না,

বলব না।

তার বন্ধুত্ব আমার কাছে ছিল একটা শুশুকের মতো যে তার অধিকার লুকায়ে রেখে ভালোবাসে,

তার বন্ধুত্ব ছিল আসমানের তারাদের মতো, দূরে থেকেও যেন সে আছে,

বেহুদা কোনো ঘনিষ্ঠতাই আমরা দেখাই নাই কোনোদিন কাউরে,

কোনোদিন কোনো আদিখ‌্যেতাও করি নাই বন্ধুত্ব নিয়া।

আমার শরীরে ঝাঁপায়ে পড়ে পশম দিয়ে ভরায়ে ফেলার মতো ন‌্যাকামিও কোনোদিন করে নাই সে,

অন‌্য লুতুপুতু-মার্কা কুত্তাগুলার মতো আমার পায়ে এসে ঘষাঘষিও করে নাই কোনোদিন।

 

খারাপ কিছু ভাববেন না, আমার ‍কুকুরটা ভালো ছিল,

প্রায় সময়ই আমার দিকে ফ‌্যালফ‌্যাল করে তাকায়ে থাকত,

যথেষ্ট ভক্তি আমারে দেখায়তো সে,

যতটুকু ভক্তি দেখাইলে পরে আমার মতো এক বেকুব ভাবে যে

কুকুর হয়ে জন্মানোটা আসলে দুনিয়াতে সময় নষ্ট করতে আসা মাত্র।

কিন্তু ওর ঐ চোখগুলা আমার গুলার থেকেও ছিল বেশি পবিত্র।

ওর চাহনির দিকে তাকাইলে মনে হইত

ওর এই লাত্থি-উষ্ঠা খাওয়া জীবনে কেবল আমারে দেখার জন‌্যই এই চোখগুলা সে নিয়া আসছে।

ওর চোখগুলা সবসময় আমার চারপাশে ঘুরঘুর করত,

ওর এই নিঃস্বার্থ চোখগুলা আমারে অস্বস্তিতে ফেলে দিত খুব।

 

হায়! সমুদ্র পাড় ধরে হাঁটার সময় কত কতবার যে 

আমার ওর লেজটা ছুঁয়ে দেখার লোভ হইছে ইসলা নেগ্রার একাকী শীতে,

সেখানে আকাশ দখলে রাখে শীতকালের পাখিরা,

আর আমার কুকুর,

সমুদ্রের মতোই উন্মাদ-দম নিয়া সে লাফায়া বেড়াত তার পশমী শরীরে,

হায়! আমার ঘুরাঘুরি-পাগলা কুকুর,

তার নবাবী লেজটা উঁচা করে,

সমুদ্রের দিকে মুখ করে দাঁড়ায়ে ঘ্রাণ নিত ঢেউয়ের।

 

এই জিনিসের আনন্দ অন‌্যরকম,

খালি কুকুরেরাই জানে কেমনে নিজেরে নিজে রাজা ভেবে সুখ পাইতে হয়

বেশরম উন্মাদনা নিয়ে।

 

শুধু মরে গেছে বলে আমি কখনোই বিদায় জানাব না আমার কুকুরটাকে,

কোনোদিন আমরা কেউ কাউরে মিথ‌্যা বলি নাই একবারের জন‌্যও জীবনে।

 

আমার কুকুরটা মরে গেছে,

আমি তারে গোর দিয়া আসলাম,

সবকিছু শেষ, এইতো!

 


আমি তো আমি না

মূল : হুয়ান রামোন হিমেনেথ


 

আমি তো আমি না।

আমি হইলাম সে

যে হাঁটে আমার পাশে

আমি দেখি না তারে,

কখনো কখনো আমি যারে খুঁজে পাই,

আর আর সময়ে তারে ভুলে যাই;

সে থাকে নিরব

যখন আমি থাকি কথাতে সরব,

যে মাফ করে, হাসে মিষ্টি,

যখন আমি ঘৃণা করি,

আমি যখন থাকি ঘরে

হাঁটতে বেরুয় সে বাইরে,

যখন আমি মরে যাব

তখনও সে থাকবে দাঁড়ায়ে

আমার পাশে।

 


শর ও সঙ্গীত

মূল : হেনরি ওয়াডসওয়ার্থ লংফেলো


 

একটা তীর ছুঁড়ে দিলাম বাতাসে

তীরটা মাটিতে ফিরা আসল, কোথায় পড়ল কে জানে;

চোখের পলকে তীরটা এত দ্রুত ছুটে গেল যে দেখতেও পারলাম না ভালো করে।

 

একটা গান আমি ভাসায়ে দিলাম হাওয়ায়,

গানটা ফিরা আসল মাটিতে, জানলামও না কোথায় এসে পড়ল;

যার দৃষ্টি খুব প্রখর আর তীব্র

সে কি দেখতে পারবে উড়াল দিয়া গানটা কই গেল?

 

বহু, আরো বহু বছর পরে,

একদিন একটা ওকগাছে পাইলাম তীরটারে, এখনো ভাঙে নাই;

আর গানটা, তারে পাইলাম এক বন্ধুর হৃদয়ে,

এখনো বাজতেছে প্রথম থেকে শেষ আগাগোড়া সবটাই।

 


প্রতিবার প্রথমবারের মতো

মূল : আন্দ্রে ব্রেটন


 

রেশমি একটা সিঁড়ি জড়ায়ে আছে

সবুজ সবুজ লতাদের ঝোঁপে

ঝুঁকে আছে সিঁড়িটি 

তোমার থাকা ও না-থাকার

মিশ্রিত আশাহীন ঢালু খাঁদের দিকে ঝুঁকে

 

আমি আবিষ্কার করেছি এক গোপন সত‌্য–

তোমাকে ভালোবাসার,

প্রতিবার প্রথমবারের মতো।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments