আলতাফ শাহনেওয়াজের কয়েকটি কবিতা

আলতাফ শাহনেওয়াজ

প্রকাশ্য


জলজ পাপড়ি কী আগুন দেখাল মেলে!

উন্মাদিনী, এখানে উত্তর ভাদ্রপদ নক্ষত্রের ক্ষত্রিয়-পোশাকে 

আকাশে অজস্র শনি—শনিযোগ শুরু হলো খুব?

ফটাফট ইলাহা ইলাহা তারা—ফোঁটো দেবদূত! এই আকাশ ও মাটি তো তোমারই, 

তোমার নামের শেষে মাছের মতন আমার জীবন 

পানির গভীরে, পানিতেও লেলিহান—

.

সবৈব মিধ্যার পানি ভাগ হোক

আকাশ টুকরো হোক

.

যেখানে কেবল শ্বাস ছাড়া আর শব্দ নেই, 

সেখানে দোসর, রব আমরা দাঁড়িয়ে কেনো গোপন শত্রুর মতো 

কাঁটা বেঁধা চোখে একান্ত তোমার জন্য; উম্মাদিনী, পবিত্র বন্ধুর বেশে 

তোমার অনেক প্রতারণা আমার সুরার পাত্রে লাফিয়ে লাফিয়ে বলে:

হও সত্য, প্রকাশিত হও…

 

২৫ জুন ২০২৬, ধানমন্ডি, ঢাকা।

 


তোমাদের কাছে


আমরা মুখর ছিলাম

রক্তের পানিতে সাঁতরে সাঁতরে আমরাই এসেছিলাম;

বিক্ষুব্ধ বুকের মধ্যে ঝাঁঝালো ঝড়ের বেগে মাইন ছুটছে,

ঝমঝমাঝম বৃষ্টি আমাদের চোখ ধুয়ে দিয়েছিল,

আগুনের মতো চোখগুলো, পুড়ে যাচ্ছিল দেহের ভেতর জমে থাকা সমস্ত জ্যোৎস্না—

আহা রক্তজ্যোৎস্না! কী দারুণ সেই আগুন ফুটেছিল আমাদের টগবগ করা সমস্ত ধমনীতে,

এবং আমরা মরতে প্রস্তুত ছিলাম

.

খুঁজতে গিয়েছিলাম পূর্বপুরুষের বিধ্বস্ত প্রতিটি কবর,

অনেক বছর আগে এই মাটির জন্য লড়তে লড়তে  যাঁরা রক্তজবার দুনিয়ায় খুব গভীর 

খুব জমাট লাল!

.

কাফনের মতো পবিত্র আমরা সেদিন

খুঁজতে গিয়েছিলাম হতাশ সেই পিতার মুখ,

যাঁদের আমরা আকাশের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে দেখেছি অনন্ত অনন্তকাল

.

আমরা তাঁদের কবর খুঁজে পাইনি,

করব থেকে তাঁরা বেরিয়ে এসেছিলেন;

নিঃসহায় জনতা জেগেছে বলে আবার—

আবারও আকাশে জলের তুমুল উৎরোল,

শ্লোগানে প্রকম্পিত হলো চরাচর, ক্ষমতা না জনতা? 

জনতার আগুনপানিতে পুড়ে যাচ্ছিল পুঁজিবাজার,  ব্যাংকগুলোর আর হলাহল করার সাধ্য ছিল না;

আর মাটিতে ছিল মুর্হুমুহু গুলির বৃষ্টি, তারা মারছিল

আমরা নতুন করে মরতে শিখেছিলাম;

রামপুরা, বাড্ডা, যাত্রাবাড়ী, মিরপুর—রক্তকে সত্য জেনে হাসিমুখে বয়ে গিয়েছি আমরা,

রংপুর থেকে চট্টগ্রাম—তিস্তা কতবার মিলল হালদার ঘোলা জঙ্গমে? তৃষিত ইলিশের চোখ কতকাল লাল?

কতকাল ধরে বয়ে যাওয়া আমাদের শিরায় শিরায়—

রক্ত উঁচু উঁচু, উম্মাদ হয়ে নামল বরিষধারায়;

জানতাম না, সামনে কী?

মানুষ জানে না, প্রকৃত মুক্তি কোথায়?

তবু জেগে ওঠা—ঝলসে যাওয়া আত্মার গভীর থেকে ফুঁসে উঠেছিলাম,

জেগে ছিলাম ঝাঁকে ঝাঁকে পাখির স্বভাবে—আবাবিল পাখির সাথে দোয়েল আর প্যাঁচা সহদোরের মতো ঝুমুর নেচেছিল বলে,

রক্ত আর সঘন আষাঢ় নেমেছিল গুমোট আকাশের সবগুলো পর্দা ফুঁটো করে;

সেই ক্ষতজাগা রক্তবর্ষায় কোথাও কোনো বিভক্তি ছিল না,

জনতার নাম ধরে তুমি কেন তবে ভাগ করলে আমাদের!

আমরা মুখর ছিলাম, বাঁচার জন্য মরেছিলাম,

তোমরা কি আমাদের মনে রেখেছিলে?

 

১ জুলাই ২০২৬, ধানমন্ডি, ঢাকা।

 


দুই বছর পর


স্বপ্ন ভেঙে নিঃস্ব হতে হতে আমরা আবার ফিরে ছিলাম নিজের ঘরে;

.

আঁটসাঁটো অলঙ্ঘনীয় এই জীবনে

তামাটে পাতার মতো বয়ে যাওয়া ধূসর সময়

কেন একই চেহারায় বারবার ফেরে?

ছড়ানো বাসন, ছোট্ট মেয়ের চুলের ক্লিপ,

লালনের আধ্যাত্মর সঙ্গে লাল পতাকার পাশে

বাবার জায়নামাজ—সব ছিনতাই হয়ে যায়

যে রাস্তায়—এসব ফেলে এক মুহূর্তের জীবন

কতবার আর রক্তে ডুব দিয়ে লিখবে:

এবার ভাইয়ের চাকরি হোক, শস্যগুলো দাম পাক,

একটা কাজ না পাওয়ায় বোনটা আমার না মারা যায় যেন;

.

চাওয়া এত ছোট ছোট, শিশুদের ফুলের মতন—!

.

ফুলগুলো পানির অভাবে মরে যায়

.

বাড়িতে অসুস্থ মা রোগশয্যায়

দুচোখে অন্ধকার নিয়ে ঘন কালো চাঁদ দেখে রোজ,

কত শত তারা আকাশের!

একেকটা উন্মাদ ভিখিরি মনে হয় সাত আসমানে

অনেক না পাওয়ার সাথে ফুটি ফুটি নক্ষত্রের আলো,

তবু মন ছোট হয়ে

দুনিয়াজুড়ে ফুটে আছেন অনাহারী আল্লার নামে…

 

২ জুলাই ২০২৬, ধানমন্ডি, ঢাকা।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments