সানজিদার সংসার

গুলবদন্নেছা মহিলা মাদরাসার বড় আপা ফরিদা আফরিনের ফোনে কলটা এলো রাত ঠিক এগারোটায়। বড় আপার চোখটা কেবল লেগেছিল, এমন সময় ফোনের রিংটোন। ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সানজিদা কল করেছে। খানিক হতাশ আর খানিকটা ভয় নিয়ে কলটা রিসিভ করল ফরিদা। সে যেন জানতো, খুব শিগগির এমন একটা সিচুয়েশনে সানজিদা কল করবে।

‘হ্যালো…’

‘আস…সালামু আলাইকুম আপা।’

‘ওয়ালাইকুম সালাম। কেমন আছো সানজিদা? খবর-টবর ভালো?’

‘জি আলহামদুলিল্লাহ, ভালো।’

‘হঠাৎ এত রাতে ফোন দিলা কী মনে করে?’

‘দিলাম আর কি…’

সানজিদা কথা বলতে তোতলাচ্ছে। গলার আওয়াজটা যেন ভেজা ভেজা। কিছু একটা তো হয়েছে। মনে মনে আন্দাজ করে ফরিদা আফরিন। তবে তার মনে যেটা উঁকি দিচ্ছে সেটা যেন না হয়। আল্লাহ, হেফাজত করো!

‘এত রাত্রে কেউ এমনি এমনি ফোন দেয় নাকি? কী হইছে বলো? জামাইয়ের সঙ্গে ঝগড়া হইছে?’ ফরিদা কথা বলার পরিবেশটা সহজ করার চেষ্টা করে। সানজিদা তবু চুপ করে থাকে। হালকা ফুঁপানোর শব্দও কি পাওয়া যায়?

বড় আপার মনটা কু করে ওঠে। ‘চুপ কইরা থাইকো না, বলো। কোনো সমস্যা হইলে আমি তো আছি। বলো বলো…’

‘আপা, সে আমারে তালাক দিছে। তালাক দিয়া বাড়ি থেকে বাইর কইরা দিছে।’

মনের মধ্যে সন্দেহটা গুড়গুড় করছিল। কিন্তু সানজিদার মুখে কথাটা শুনে বুকটা ধড়াক করে উঠল। সে যখন ‘তালাক’ শব্দটা উচ্চারণ করল, কানে ধরা ফোনটা হাত থেকে খসে বিছানায় পড়ে গেল। এত সাধারণ এবং বহুলচর্চিত একটা শব্দ, শোনার জন্য মনের মধ্যে যেন প্রস্তুতিও ছিল। কিন্তু তারপরও শব্দটা যখন কোনো মেয়ের মুখ থেকে প্রায়োগিক অর্থে শোনা যায়, অন্য আরেকটা মেয়ের জন্য সেটা সহ্য করা কষ্ট হয়ে দাঁড়ায়।

ফরিদা আফরিন নিজেকে গুছিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, ‘তুমি এখন কোথায়?’

‘আপনের মাদরাসার গেটে।’

‘ইয়াল্লাহ! কখন আসছো তুমি? উপরে আসো নাই কেন? দারোয়ান আছে গেটে?’

‘জি আছে।’

‘উনার কাছে ফোনটা দাও, আমি বলে দিতেছি। তুমি মেহমানখানায় চলে আসো।’

ফরিদা আফরিন বিছানা ছেড়ে উঠল। তার স্বামী মুফতি আবুল হাসান জিহাদী জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ফরিদা তার দিকে তাকিয়ে শান্ত হওয়ার ইশারা করে বলল, ‘সানজিদা আসছে। তুমি শুয়া থাকো, আমি আইসা বলতেছি কী ঘটছে!’

পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের চারতলা মাদরাসা। পঞ্চম তলার একটা ফ্ল্যাটে ফরিদা আফরিন পরিবার নিয়ে থাকে। আর দুটো ফ্ল্যাটে মাদরাসার কয়েকজন শিক্ষিকা, বাবুর্চি, আয়ারা থাকে। শিক্ষিকাদের রুমে ছোট একটা রুম মেহমানদের জন্য বরাদ্দ। মেহমান কেউ এলে সেখানে থাকবার ব্যবস্থা। অনেক সময় ছাত্রীদের অভিভাবকরা চলে আসেন, ঢাকায় তাদের থাকবার কোনো ব্যবস্থা না থাকলে এখানে থাকেন। কোনো শিক্ষিকার স্বামী যদি চলে আসে তাহলে এই মেহমানখানা তাদের একান্তে সময় কাটানোর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়। উপরের ক্লাসের কিছু মেয়ে আছে বিবাহিত। উপরের ক্লাসে পড়াশোনার এত চাপ থাকে যে মাসে একবারের বেশি ছুটিতে যাওয়া সম্ভব হয় না। আর যাদের বাড়ি দূরের জেলায়, তারা তো নির্ধারিত উৎসবকালীন ছুটি ছাড়া বাড়িতে যেতে পারে না। অথচ তাদের নতুন বিয়ে। তারাও মাঝেমধ্যে স্বামীর সঙ্গে একান্তে সময় কাটানোর জন্য বড় আপার কাছে অনুনয় করে রুমের বরাদ্দ পায়।

আজ অবশ্য মেহমানখানা খালি। বড় আপা মেহমানখানার দরজায় দাঁড়িয়ে ছিল। সানজিদা আসতেই তাকে জড়িয়ে ধরল। বড় আপার ভরসামাখা বুকে মাথা রেখে সানজিদা অঝোরে কাঁদতে লাগল।

ঘটনা বেশি দিনের না। এই তো মাস ছয়েক আগের। সানজিদা তখন এই মাদরাসার শিক্ষিকা। এখানেই ছয়-সাত বছর পড়াশোনা করে আলেমা হয়েছে। আলেমা হয়ে সরাসরি শিক্ষকতা। ওর বাবা ছোটবেলায় মারা যান। ছোটবেলা মায়ের সঙ্গে কেটেছে মামাবাড়িতে। কিন্তু মামাদের কাছে বড় একটা আহ্লাদ পায়নি কখনো। এক প্রকার মাথার বোঝা হয়েই শৈশব কেটেছে। স্কুলে ক্লাস ফাইভ পর্যন্ত পড়ার পর তাই মা ওকে মাদরাসায় দিয়ে দেন।

ফরিদা আফরিন দাওরায়ে হাদিস শেষ করে তখন নতুন নতুন শিক্ষক হয়েছে। তার ওপর তখন তিনি কয়েক মাসের গর্ভবতী। মাদরাসার পড়াশোনা শেষ করার এক মাস আগেই কনসিভ করে। স্বামী মুফতি আবুল হাসানের সঙ্গে বিয়ে হয় দাওরা হাদিসে পড়াকালীন। কীভাবে কনসিভ করল দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারেনি। একে তো বয়স কম, কেবল পড়াশোনা শেষ করেছে, অন্যদিকে মুফতি সাহেব এই মহিলা মাদরাসা শুরু করেছেন মাত্র দুই বছর হলো। গর্ভবতী হওয়া সত্ত্বেও তাই মাদরাসার অনেক কাজ ফরিদাকে তদারক করতে হত।

নতুন শিক্ষকদের সঙ্গে ছাত্র-ছাত্রীদের সখ্যতা হয় খুব দ্রুত। ফরিদার সঙ্গেও তাই হলো। ছাত্রীরা তাকে নিজেদের মায়ের মতো করে আদর যত্নে রাখত। ঠিক এই সময়টাতে গুলবদন্নেছা মহিলা মাদরাসায় ভর্তি হয় সানজিদা। হ্যাংলা পাতলা, দেখতে শ্যামলা বরনের লম্বাটে সানজিদার চেহারায় সবসময় যেন একটা ভয়ের প্রলেপ লেপা থাকে। দেখে বড় মায়া হয় ফরিদার। আপনজনের অনাদরে বেড়ে ওঠা সানজিদাকে নিজের বোনের মতো আপন করে নেয়।

সেই থেকে সানজিদা ফরিদা আপার বোনের মতোই বড় হয়েছে। ওর পড়াশোনার যাবতীয় খরচ ফরিদা আপা দিত। এমনকি জামাকাপড় আর অন্যান্য প্রয়োজনও সে-ই দেখত। পড়াশোনায় অতটা ভালো না, তবে সাংসারিক কাজে সানজিদার জুড়ি মেলা ভার। মেয়েলী ঘরকন্নার প্রতিটি কাজ সে এত নিপুণ আর পরিপাটি করে করতে পারে, দেখলে অবাক না হয়ে পারা যায় না। ঘর গোছানো কিংবা রান্নাবান্না, বাজারসদাই হোক বা বাচ্চাদের দেখাশোনা, সানজিদা এককথায় অনন্য। ফরিদা আপা প্রায়ই ভাবত, এই মেয়ে যে সংসারে যাবে সে সংসার উজালা হয়ে উঠবে। কিন্তু কী থেকে কী হয়ে গেল!

দাওরায়ে হাদিস শেষ করার পর গুলবদন্নেছা মহিলা মাদরাসাতেই শিক্ষিকা হিসেবে রেখে দেয়া হয় সানজিদাকে। ভালোই চলছিল বছরখানেক। ফরিদা আপা আর বড় হুজুর মুফতি আবুল হাসান ওর জন্য পাত্রও দেখছিল এদিক-সেদিক।

হঠাৎ একদিন সানজিদা মাদরাসা থেকে উধাও। তার ফোন বন্ধ। বাড়িতে খোঁজ নেওয়া হলো। পরিচিত বান্ধবীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলো। কোনো হদিস নেই সানজিদার। দুই দিন খোঁজাখুঁজির পর থানায় জিডি করা হলো। ভয়ে অন্তরাত্মা শুকিয়ে গেল ফরিদা আফরিনের। এত সোজাশান্ত মেয়েটা হঠাৎ কোথায় গায়েব হয়ে গেল?

এক সপ্তাহ পর ফোন এলো সানজিদার। সে এক ছেলেকে বিয়ে করে কক্সবাজারে এসেছে হানিমুন করতে। ছেলে কোন একটা রেডিও’র আরজে। রেডিওতে ইসলামি অনুষ্ঠান করত। ফোনে রেডিও শুনতে শুনতে তার কণ্ঠের প্রেমে পড়ে যায় সানজিদা। সেখান থেকে কীভাবে কীভাবে যেন পরিচয়, ঘনিষ্ঠতা। তারপর যা হবার তা তো হয়েই গেছে। আজ ছয় মাস পর তার পরিণতি ফরিদার চোখের সামনে।

 

***

মেহমানখানার টিমটিমে হলদেটে আলোয় সানজিদাকে আজ বড় অচেনা লাগল ফরিদা আফরিনের। যে মেয়েটির হাতের রান্না ছাড়া একসময় ফরিদার মুখে অন্য খাবার রুচত না, যাকে তিনি নিজের ছোট বোনের মমতা দিয়ে আগলে রেখেছিলেন, সেই সানজিদা তার সামনে আজ ভোরের ঝরে যাওয়া শিউলি ফুলের মতো বাসি আর বিবর্ণ।

সানজিদা বলতে লাগল তার সেই আরজে স্বামীর গল্প। ‘আপা, রেডিওতে ওর গলার আওয়াজ শুনলে মনে হত মানুষটা ফেরেশতার মতো। অথচ বিয়ের পর জানলাম, তার আগের বউ আছে এবং একটা সন্তান আছে। সেই বউ তখন আবার দ্বিতীয়বার প্রেগন্যান্ট। জানেনই তো, ঘরের বউ প্রেগন্যান্ট থাকলে পুরুষ মানুষের মাথা ঠিক থাকে না। তাই সে আমাকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিয়ে করে। কিন্তু যখন আমি সবকিছু জেনে যাই তখন থেকেই শুরু হয় অকথ্য ব্যবহার। রেডিওতে শো করে রাত-বিরাতে যখন ফিরত, তার মুখ দিয়ে আর মধুর মধুর কথার খই ফুটত না, কেবল আগ্নেয়গিরির লাভা বের হত। তুচ্ছ কারণে গায়ে হাত তুলত। শেষমেশ যখন তালাক দিয়ে বের করে দিল, তখন বুঝলাম আমি কোনো মানুষ ছিলাম না ওর কাছে, ছিলাম কেবল শখের খেলনা।’

সানজিদাকে ঘুম পাড়িয়ে ফরিদা আফরিন যখন নিজের ঘরে ফিরল, তখন গভীর রাত। হিমেল বাতাস বইছে। জানলার গ্রিল ধরে ফরিদা বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল। পুরান ঢাকার এই ঘিঞ্জি গলিগুলোতে রাতের বেলা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা নামে। সারাদিনের ঘিঞ্জি গলিটা কেমন নেতিয়ে পড়ে থাকে। দূরে কোথাও একটা কুকুর ডেকে উঠল। ফরিদার মনে পড়ছিল সানজিদার সেই দিনগুলোর কথা, যখন সে মাদরাসার করিডোরে চঞ্চল পায়ে হেঁটে বেড়াত। যার ছোঁয়ায় অগোছালো ঘর মুহূর্তেই পরিপাটি হয়ে উঠত—সেই মেয়েটির কপালে বারবার এমন লাঞ্ছনা কেন?

ফরিদা আর কিছু ভাবতে পারল না। অজু করে তাহাজ্জুদে দাঁড়িয়ে গেল। মোনাজাতে আল্লাহর কাছে আকুল হয়ে বলল, হে আল্লাহ, এতিম অসহায় এই মেয়েটাকে তুমি ধৈর্যধারণের তৌফিক দান করো। তুমি তার জন্য আরও উত্তম কোনো প্রতিদানের ব্যবস্থা করো…।

 

***

পরদিন থেকে সানজিদা আবার মাদরাসার পুরনো রুটিনে ফিরে গেল। তবে তার আচরণে আগের সেই চপলতা আর নেই। এখন সে কথা বলে খুব মেপে, হাসে খুব কম। বড় আপার ছায়ার মতো সে থাকে। মাদরাসার রান্নাবান্না, ছোট ছাত্রীদের তদারকি, পরীক্ষার খাতা দেখা—এসব কিছুতেই সে নিজেকে ডুবিয়ে রাখল। ফরিদার চোখ এড়ায় না। সানজিদা যখন রান্নাঘরের মশলার ধোঁয়ায় বা বাচ্চাদের জামা সেলাইয়ের মাঝে ডুবে থাকে, তখন তার চোখে এক অদ্ভুত শূন্যতা খেলে যায়। সে যেন এক নিরন্তর তৃষ্ণা নিয়ে বাঁচে—এক টুকরো নিজের আকাশ, ছোট্ট একটা নিজের সংসার। সে যখন মাদরাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখত ছোট ছোট ছাত্রীরা তাদের বাবা-মায়ের হাত ধরে বাড়ি ফিরছে, তখন তার চোখের কোণ ভিজে উঠত। সে তো কেবল একটুখানি মাথা গোঁজার ঠাঁই আর একজন মানুষের মমতার আশ্রয় চেয়েছিল।

মুফতি আবুল হাসান একদিন স্ত্রীকে বলল, ‘সানজিদার জন্য আবার পাত্র দেখা দরকার। মেয়েটার তো একটা গতি হওয়া চাই।’

ফরিদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘ওর মনটা ভেঙে গেছে গো। আগে ওটা জোড়া লাগুক।’

এর মধ্যে একদিন মাদরাসায় এলেন খুরশিদা বেগম নামে এক মধ্যবয়স্ক মহিলা। তিনি নিজেকে সমাজসেবী হিসেবে পরিচয় দিতেন। মাঝেমধ্যেই এতিম মেয়েদের জন্য থ্রি-পিস বা খাবার নিয়ে আসতেন। ফরিদা আপাও তাকে আর দশজন শুভাকাঙ্ক্ষী নারীর মতোই দেখতেন। আশপাশের মহল্লার অনেক মহিলা এভাবে মাদরাসায় এসে ছাত্রীদের ভালোমন্দ খোঁজখবর নেয়।

খুরশিদা বেগম সানজিদার একাকিত্বের কথা জানতেন। একদিন দুপুরে মাদরাসার ছাদে কাপড় শুকাতে গিয়ে সানজিদা খুরশিদা বেগমের মুখোমুখি হলো।

খুরশিদা বেগম ফিসফিস করে বললেন, ‘মা, এভাবে আর কতদিন? এখানে তো তুমি শুধু পরের বোঝা হয়ে আছ। তোমারও তো একটা ডালপালা মেলা সংসার দরকার।’

মহিলার কথার উত্তরে কী বলবে, সানজিদা ভেবে পায় না। তার হাতে ধরা কাপড়গুলো সে আরও শক্ত করে ধরে।

সানজিদাকে চুপ থাকতে দেখে খুরশিদা বেগম যেন লাই পেয়ে যায়, ‘আমার পরিচিত একজন বড় ব্যবসায়ী আছেন। খুব দ্বীনদার মানুষ। তাঁর আগের এক বউ আছে বটে, কিন্তু সেই বউ চার-পাঁচ বছর ধরে অসুস্থ। স্বামীর সেবা-যত্ন, শখ আহ্লাদ কিছুই পূরণ করতে পারে না। কিন্তু বেচারা স্বামী অসুস্থ বউয়ের দিকে তাকিয়ে কিছু বলতেও পারে না।’

সানজিদা শংকিত হয়ে বলল, ‘এসব কথা আপনি আমাকে বলছেন কেন?’

খুরশিদা বেগম দমবার পাত্র নন, ‘দেখো মা, আমাদের জীবনটা তো আল্লাহর হাতে। আল্লাহর রেজামন্দির জন্যই তো তিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এই দুনিয়ায় সবাই বিয়ে করে আনন্দ-ফূর্তি করার জন্য। যেমন তোমার আগের যে স্বামী ছিল সে তোমার সঙ্গে আনন্দ করার জন্য বিয়ে করেছিল। কিন্তু তুমি যদি আবার একটা বিয়ে করো, যেই বিয়েটা হবে আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আল্লাহর রেজামন্দি হাসিলের জন্য, তাহলে সেটা অনেক বড় সোয়াবের কাজ হবে না? এর দ্বারা আল্লাহর সুন্নত জিন্দা হবে, আবার তোমারও একটা ভবিষ্যৎ হবে।’

সানজিদা কথাগুলো শুনতে চায় না, কিন্তু মহিলার থেকে দূরেও সরে যেতে পারছে না।

খুরশিদা বেগম সুযোগ পেয়ে বললেন, ‘ওই ব্যবসায়ী ভদ্রলোকের টাকার অভাব নাই। গার্মেন্টসের ব্যবসা করে। কেরাণীগঞ্জে তার ছয়তলা বিল্ডিং আছে, ভাড়া দেওয়া। চারতলার পুরো একটা ফ্লোর রেখে দিয়েছে শুধু দ্বিতীয় বউয়ের জন্য। তুমি যদি রাজি হও তাহলে রানির মতো থাকবে সেখানে।’

মহিলার কথা শুনে সানজিদার মাথা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগল। সে আর সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না, দৌড়ে নিচে নেমে এলো। কিন্তু সময় যত গড়াতে লাগল খুরশিদা বেগমের কথাগুলো নানাভাবে তার মনের মধ্যে গুঞ্জরিত হতে লাগল। বিশেষ করে ‘চারতলার পুরো ফ্ল্যাট’ কিছুতেই তার মন থেকে সরছিল না। তার কল্পনাজুড়ে ভাসতে লাগল সাজানো গোছানো বিরাট বড় এক ফ্ল্যাটের ছবি।

মানুষের মন বোঝা বড় দায়। কী আশ্চর্য প্রকৌশল যে সেখানে চলে, কীভাবে মনের গোপন শাখা-প্রশাখায় বেড়ে ওঠে চিন্তার চৌহদ্দি, আল্লাহ ছাড়া কেউ সেটা নির্ণয় করতে পারে না। সাত মাস পর সানজিদা আবার একদিন মাদরাসা থেকে নিরুদ্দেশ হয়ে গেল। তার আর কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না।

 

***

এক বছর পর। ফরিদা আফরিন আর তার স্বামী মুফতি আবুল হাসান জিহাদী মুন্সীগঞ্জ থেকে ফিরছিলেন কেরানীগঞ্জ হয়ে। বছিলা ব্রিজের কাছাকাছি এসে মুফতি সাহেব হঠাৎ গাড়ির জানালা দিয়ে রাস্তার পাশে একটি গলির দিকে ইশারা করে বলল, ‘ফরিদা, রাস্তার পাশের এই মহল্লাতেই কোথায় যেন সেই ‘মাসনা কলোনী’।

ফরিদা খুব কৌতূহল নিয়ে তাকাল বাইরে। ‘এখানেই তাহলে আব্দুর রশীদ কাসেমীর সেই মাসনা কলোনী!’

মুফতি সাহেব কৌতুক করে বলল, ‘চলো দেখে আসি এখানকার মাসনা করার তরিকা কী!’

ফরিদা হেসে হেসেই বলল, ‘ভবিষ্যতে কোনোদিন যদি খালি কেরাণীগঞ্জ আসার কথা বলছো, পা ভেঙে দিব তোমার!’

মুফতি সাহেব হাসতে হাসতে বলল, ‘কি যে বলো, আমাকে কি ভূতে কামড়ায় নাকি! এক বউ ম্যানেজ করতেই জান বেরিয়ে যায় আবার মাসনা! আমাদের মাদরাসায় যে খুরশিদা নামের এক মহিলা আসত না, উনি আমাকে বলছিলেন এই মহল্লার কথা।’

খুরশিদা বেগমের নামটা শুনতেই ফরিদার বুকটা ধক করে উঠল। কিছু একটা যেন মিলে গেছে মনের মধ্যে। এক মুহূর্ত চিন্তা করে সে জলদি বলল, ‘এই ড্রাইভার, গাড়ি থামাও গাড়ি থামাও!’

মুফতি সাহেব কিছুই বুঝতে পারল না। ‘কী হয়েছে? গাড়ি থামাতে বললে কেন?’

ফরিদা গাড়ি থেকে নামতে নামতে বলল, ‘আছে, কারণ আছে। গাড়ি থেকে নামো।’

মুফতি সাহেব গাড়ি থেকে নামার পর ফরিদা গলির সামনে দাঁড়িয়ে বলল, ‘ওই খুরশিদা বেগমের সঙ্গে আমি অনেকবার সানজিদাকে চুপিচুপি কথা বলতে দেখেছি। আমি কিছু মনে করি নাই। তখন মনে হয়েছে, বেচারী একা একা থাকে, ওই মহিলার সঙ্গে কথা বললে হয়তো ওর ভালো লাগবে। তাই তখন কিছু আঁচ করতে পারিনি। আর আশ্চর্যের বিষয় কী, জানো? সানজিদা নিরুদ্দেশ হওয়ার পর থেকে ওই মহিলাকে আর কখনো আমি মাদরাসায় আসতে দেখিনি। এখন বুঝতে পারছো ঘটনা? তোমার কথা শুনে এখন আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, সানজিদা এই মাসনা কলোনীর খপ্পড়ে পড়েছে। ওই মহিলা ছিল মাসনা কলোনীর এজেন্ট।’

মুফতি সাহেব হতভম্ব হয়ে বললেন, ‘এই কথা এতদিন আমার মাথায় কেন আসেনি?’

‘তুমি তো আস্ত একটা গাধা! চলো, ওই মাসনা কলোনীতে যাব।’

মাসনা কলোনীর ঠিকানা বের করতে বেশি সময় লাগল না। গলির মুখে দু-একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তারা মাওলানা আব্দুর রশীদ কাসেমীর ছয়তলা বিল্ডিং দেখিয়ে দিল। ছোট একটা গলির ভেতর ছয়তলা বিল্ডিং। বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই এর ভেতরে কী এক অদ্ভুত জীবনধারা বয়ে চলেছে। গেটের দারোয়ান মুফতি সাহেবকে দেখে বলল, ‘হুজুর তো মাদরাসায় নাই।’

ফরিদা চালাকি করে বলল, ‘হুজুরের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে, অফিসে বসতে বলেছেন। অফিসটা কয় তলায়?’

দারোয়ান বলল, ‘দুই তলায় যান!’

ফরিদা মুফতি সাহেবকে দোতলার অফিসে যেতে বলে সে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় ফরিদার দম বন্ধ হয়ে আসছিল। সিঁড়িতে এক অল্পবয়সি মেয়ের সাথে দেখা হলো। কোলে একটা ছোট বাচ্চা। ফরিদা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘এখানে সানজিদা নামে কেউ থাকে?’

মেয়েটি কোলের বাচ্চার কান্না থামাতে থামাতে বলল, ‘এখানে সবাই সানজিদা, আপা। নাম আলাদা হলেও কপাল সবার এক। চারতলায় যান। তিন নম্বর ফ্ল্যাট।’ বলেই গট গট করে নিচে নেমে গেল সে।

চারতলার তিন নম্বর ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ফরিদা বুক ভরে শ্বাস নিল। তারপর কলিংবেলে আঙুল ছোঁয়াল। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলল। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে চিনতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল ফরিদার। এ কি সেই সানজিদা? যে মেয়েটির চোখের উজ্জ্বলতা মাদরাসার ক্লাসরুম মাতিয়ে রাখত, আজ সেখানে কেবল শ্রান্তির ছায়া। যদিও শরীর স্বাস্থ্য কিছুটা ভরাট হয়েছে, কিন্তু ফরিদার চোখে যেন ধরা পড়ল ওর চোখের কোণে জমে থাকা এক চিলতে বিষাদের।

‘আপা!’ সানজিদার কণ্ঠে বিস্ময় আর এক চিলতে আতঙ্ক।

‘ভেতরে আসতে দিবি না?’ ফরিদা আফরিন নিজেই পথ করে ভেতরে ঢুকলেন। তার ভেতরে পাওয়ার আনন্দ যেমন আছে, তেমনি আছে ভালোবাসার অধিকার হারানোর ক্ষোভ।

ড্রয়িংরুমটা ছোট, কিন্তু সানজিদার চিরচেনা সেই পরিপাটি ছোঁয়া সেখানেও আছে। ছোট একটা ড্রেসিং টেবিল, একটা কাঠের আলমারি, কোণায় ছোট্ট একটা র‌্যাকে সাজানো কয়েকটা কিতাব। ফরিদা সোফায় বসে চারপাশটা একবার দেখে নিল। দেয়ালের এক কোণায় বড় করে লেখা—‘হে আল্লাহ, এই ঘরে বরকত দাও’।

সানজিদা তড়িঘড়ি করে রান্নাঘরে গেল। একটু পরই ট্রেতে করে শরবত আর বিস্কুট নিয়ে হাজির হলো। ফরিদা শরবতের গ্লাসে হাত না দিয়ে সরাসরি সানজিদার চোখের দিকে তাকালেন। ‘বল, এবার কী করে এখানে এলি? কার সাথে?’

সানজিদা মাথা নিচু করে নখের কোণা খুঁটতে খুঁটতে বলল, ‘উনার নাম হাজি মোবারক হোসেন। চকবাজারে উনার কসমেটিকসের হোলসেল ব্যবসা আছে। দ্বীনদার মানুষ আপা। আমাকে অনেক ভালোবাসেন।’

‘দ্বীনদার মানুষ? অথচ তোকে এভাবে লুকিয়ে রেখেছে?’ ফরিদা আফরিনের কণ্ঠে তিক্ততা।

‘লুকিয়ে রাখা মানে… উনার আগের স্ত্রী অসুস্থ আর একটু বদমেজাজী। উনার দুই ছেলেমেয়ে আছে। তারা জেনে গেলে নাকি রক্তারক্তি হবে। তাই আমাকে এখানে রেখেছেন।’

ফরিদা আফরিন ওর হাতটা শক্ত করে ধরলেন। ‘সানজিদা, তুই তো আলেমা! তুই কি জানিস না, বিয়ে মানে একটা সামাজিক ঘোষণা? এই যে তুই এই ফ্ল্যাটে বন্দি হয়ে আছিস, তোর কোনো আত্মীয় জানে না, তোর শ্বশুরবাড়ির কেউ তোকে চেনে না, আমি তোর বড় বোন হিসেবে আমিও জানি না—এটা কি বিয়ে নাকি কেবল ভোগের কারখানা?’

সানজিদা চোখের পানি মুছল। ‘আপা, ঘর কী জিনিস সেটা আমি কোনোদিন বুঝি নাই। মামার বাড়িতে বোঝা হয়ে ছিলাম, মাদরাসায় ছাত্রীর জীবন কাটিয়েছি আপনার ছায়ায় ছায়ায়। আমার খুব শখ ছিল নিজের একটা ঘর হবে। উনি আমাকে সেই ঘর দিয়েছেন। আমার ঘরে সব আছে। ফ্রিজ আছে, ওভেন আছে, আলমারি ভর্তি দামি কাপড়চোড় আছে। এর চেয়ে বেশি কী চাইব?’

‘এগুলোই কি একজন মানুষের একমাত্র চাওয়া? তুই যখন অসুস্থ হবি, তখন কি এই মোবারক হোসেন তোকে হাসপাতালে নিয়ে সমাজের সামনে নিজের স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিতে পারবে? ঈদের দিন কি তুই উনার সাথে উনার আত্মীয়দের বাড়িতে গিয়ে দাঁড়াতে পারবি? তোকে তো উনি শুধু সপ্তাহের দু-চার দিন ভোগ করতে আসেন। বাকি সময় তুই কার? এই ঘরের দেয়ালগুলোর?’

ঠিক এই সময় ঘরে ঢুকলেন এক মাঝবয়েসী স্থূলকায় লোক। পরনে সিল্কের পাঞ্জাবি, চোখে সুরমা। দেখেই বোঝা যায় প্রাচুর্য আছে। মুফতি আবুল হাসান উনার পেছনে পেছনে বিষণ্ন মুখে ঘরে এলেন।

মোবারক সাহেব হাসিমুখে বললেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ফরিদা আপা। আপনার কথা সানজিদার মুখে অনেক শুনেছি। আপনি তো ওর বড় বোনের মতো। খুব ভালো কাজ করলেন এসে। ও একা একা বোর ফিল করে।’

ফরিদা আফরিন সালামের উত্তর দিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করলেন, ‘মোবারক সাহেব, আপনার পরিবার কি এই বিয়ের কথা জানে?’

মোবারক সাহেবের মুখের হাসিটা একটু ফিকে হয়ে গেল। তিনি গলা পরিষ্কার করে বললেন, ‘দেখুন আপা, সমাজ বড় কঠিন। দ্বীন রক্ষা করতে গেলে অনেক সময় একটু কৌশলী হতে হয়। সুন্নত জিন্দা করার জন্য আমি সানজিদাকে আশ্রয় দিয়েছি। ও তো এতিম মেয়ে। আমি ছাড়া ওর কে আছে?’

মুফতি সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, ‘আশ্রয় দিয়েছেন নাকি বন্দি করেছেন মোবারক সাহেব? ইসলামে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে সমবণ্টন এবং সামাজিক স্বীকৃতির কথা বলা হয়েছে। আপনি ওকেও সম্মান দিতে পারছেন না, আবার আপনার প্রথম স্ত্রীকেও অন্ধকারে রাখছেন। এটা কি প্রতারণা না?’

মোবারক সাহেব একটু বিরক্ত হলেন। ‘হুজুর, আপনি তো জানেন বর্তমান জমানায় কত ফিতনা। সেই ফিতনা থেকে বাঁচতে এই ‘মাসনা কলোনী’র সিস্টেমটা আমাদের জন্য কত বড় নেয়ামত। আমরা এখানে আমাদের স্ত্রীদের সব ধরনের সুখ-সুবিধা দিই। শুধু পরিচয়টা একটু গোপন রাখি—এই যা!’

সানজিদা চুপ করে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল। তার চোখে এখন কোনো প্রতিবাদ নেই, আছে শুধু এক অদ্ভুত আত্মসমর্পণ। ফরিদা খেয়াল করলেন, রান্নাঘরে কিছু একটা ফুটছে। সানজিদা উঠে গেল রান্নাঘরে। ফরিদা পিছু পিছু ভেতরে ঢুকলেন।

ছোট্ট রান্নাঘরটা ধোঁয়ায় ভরে আছে। সানজিদা গরুর মাংস কষাচ্ছে।

‘গরুর কালাভুনা উনি খুব পছন্দ করেন, তাই রান্না করছি। আপনারাও কিন্তু খেয়ে যাবেন আপা!’ সানজিদা যন্ত্রের মতো বলল।

ফরিদা তার পাশে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে বলল, ‘সানজিদা, এই যে তুই এত ঘাম ঝরিয়ে রান্না করছিস, একটু পরেই সে আসবে, তৃপ্তি করে খাবে, তারপর রাত শেষে চলে যাবে। সকালে তুই আবার একা। বুঝতে পারছিস? এই ঘরটা তোর নয়, এটা একটা ভাড়া করা হোটেল মাত্র। কোনোদিন তোর কপালে যদি কোনো বড় মুসিবত আসে, দেখবি এই লোকটা সবার আগে সরে দাঁড়াবে। কারণ সমাজ তাকে চেনে, তোকে নয়।’

চুলার কড়াইয়ে নড়তে থাকা সানজিদার হাতের খুন্তিটা থেমে গেল। সে মেঝের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বলল, ‘আমি জানি আপা। আমি জানি আমি উনার ঘরের লক্ষ্মী নই, আমি উনার ক্ষণকালের সুখের সাথী। কিন্তু আমার আর যাওয়ার জায়গা কোথায়? মাদরাসায় ফিরে গিয়ে কি আবার বড় আপার অনুগ্রহ নিয়ে বাঁচব? একটা মেয়ের জীবনে একটা তালাকই তো অপয়া, আর দুইটা তালাক হলে তো তার এই সমাজে মুখ দেখানোর উপায় নেই। তার চেয়ে এই তো ভালো, অন্তত কেউ আমাকে ‘আমার বউ’ বলে তো ডাকে, যদিও সেটা চার দেয়ালের মাঝখানে।’

ফরিদা আফরিন বুঝলেন, সানজিদা আসলে এক মরীচিকার পেছনে ছুটতে গিয়ে চোরাবালিতে আটকে গেছে। যে মেয়েটি সারাজীবন নিজের একান্ত এক চিলতে আকাশের স্বপ্ন দেখেছিল, সে আজ এক জানালাবিহীন ফ্ল্যাটে বন্দি হয়ে আকাশের স্বপ্ন বুকে নিয়ে বেঁচে আছে।

ফরিদার কথারা শেষ হয়ে আসে। সানজিদার সঙ্গে তার সকল কথা মুখ থুবড়ে মনের ভেতর গুমরে মরে যায়। সানজিদাকে দেখে তার আনন্দ আর ক্ষোভ একই সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে যায়। মুফতি সাহেবকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে আসে মাসনা কলোনী নামের এই অচিনপুর থেকে। 

ফরিদা আফরিন যখন সেই বাড়ি থেকে বের হচ্ছিল, তখন দেখল আরও একটি নতুন গাড়ি এসে গেটে থামল। সেখান থেকে বোরকাপরা একটি মেয়ে নামছে, যার চোখে নতুন এক সংসারের রঙিন স্বপ্ন। ফরিদা আপার মনে হলো, আরও একজন সানজিদা যেন এই চোরাবালিতে পা রাখতে যাচ্ছে।

ফরিদা আফরিন পুরান ঢাকায় নিজের মাদরাসায় ফিলে এলো। তার মনের মধ্যে বেজে চলেছে—ধর্ম তো মানুষকে মুক্তি দিতে এসেছিল, কিন্তু মানুষ নিজের স্বার্থে তাকে এক অদৃশ্য শিকল বানিয়ে ফেলেছে। সানজিদারা কেবল সেই শিকলের নিচে পিষ্ট হওয়া একেকটি নামহীন অস্তিত্ব। তাদের একান্ত নিজস্ব একটা সংসার হয়তো এই জীবনে আর কোনোদিনই হবে না।

রাত বাড়ছে। কেরাণীগঞ্জের সেই ছয়তলা ভবনটি অন্ধকারে ঢাকা পড়ছে। সেখানে সানজিদার মতো আরও কত ‘গোপন স্ত্রী’ এখন তাদের ‘খন্ডকালীন স্বামীদের’ জন্য পরম মমতায় গরুর কালাভুনা রান্না করছে, আর নিজেদের অজান্তেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে এক অস্তিত্বহীন ইতিহাসে।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Ashik
Ashik
6 months ago

ভালো লাগলো। যদিও এন্ডিংটা মনে ধরে নাই এবং কিছু কিছু সংলাপ বড় বেশি যান্ত্রিক মনে হয়েছে। লেখক ইচ্ছে করলেই ভাষার আঁচড়ে গল্পটাকে আরেকটু ক্রেতা দুরস্ত এবং জীবন্ত করে তুলতে পারবেন। সর্বোপরি, ভালোই ছিল।