আলতাফ শাহনেওয়াজের কবিতা


ভুঁতুম পেঁচার নকশা


কী লিখি! আগুন

পুড়ে যা হৃদয়,

আর যা লেখার

সব নিশ্চয়

তোমার মুখটি—

.

মুখটি তোমার

কান্না জাগানো,

ভেতরে দহন

তুমি কি তা জানো?

আমার এ কথা—

.

আমার কথাটি

শুনেছ কখনো?

না জেনে শুধুই

ক্রোধে তড়পানো

তুমি তো একাই—

.

তুমি তো তুমি তো

শোনোনি হে রাই,

জানতে চেয়েছ

আমার কি দায়?

সেদিন সেখানে—

.

সেদিন এসব

কেন ঘটেছিল?

কারা এসে তথা

ঝঞ্ঝা উঠাল?

ঝড়ের পূর্বে—

.

সে ঝড়ে কাহারা

আগেই দিয়েছে

হাওয়ার পাহারা!

এবং খেয়েছে

আমার হৃদয়—

.

হৃদয় পুড়েছে

হলো নাকি ক্ষয়!

মিথ্যা বিলিয়ে

এই পরাভয়;

কিছুই বলিনি—

.

বলিনি শব্দ

কতটা সরব,

সামাজিক মাঠে

হলো উৎসব;

কারা হেসেছিল—

.

ছিলাম একাই

কেউ তো আসেনি,

কী করেছি আমি

কখনো শোনেনি;

একফোঁটা কিছু—

.

একফোঁটা জল

চোখের নীচেই

গড়িয়ে পড়েছে

আমাকে নিয়েই;

কতটা বয়েছি—

.

বয়েছি যতটা

বেদনার ভার,

তোমাদের লেখা

মিথ্যা কথার;

সবই বলব—

.

কহিব সকলি

শীত শেষ হলে

ঝরাপাতা খুলে

বসন্ত এলে;

দিন শুরু হবে—

.

শুরু হোক দিন

আমিও সেদিন

সাপের মাথায়

লিখিব স্বাধীন

যা কিছু লেখার—

.

লেখার কথারা

আগুনের মতো,

পুড়ে যাওয়া আঁচে

ক্ষত বিক্ষত;

তবু তা লিখিব—

.

লিখিব ভুঁতুম

হুঁতুম পেঁচার

চোখের মধ্যে

রক্ত খেঁচার

ভাগবান কই!

ভগবান নেই?

লিখিব সবার

বীভৎস প্রীতি

মানুষের বেশে

বিশ্বাসঘাতী;

কে হন্তারক—

      কারা এসেছিল?

 


হে তীব্র অবিমৃশ্যকারী


এ দুপুর এই রাত কত তীব্র হচ্ছে!

দিনে দিনে ঝাঁঝাল উত্তাপ, বাড়ছে হাস্নুহানা,

পৃথিবীতে প্রতারণার ভেতর দিয়ে যতটুকু রোদ

আঁকতে পারে না ছায়া

              আমি সেই না থাকা ছায়ার মধ্যে 

চাপ চাপ ঘৃণা দেখি, দেখি তোমাদের অবিমৃশ্যকারীতা;

তোমরাও দেখো, বোঝো… কিন্তু গুলি ততক্ষণে হয়ে গেছে ছোঁড়া,

.

কার বুকে লাগবে?

দুপুরের আলো কার চোখ অন্ধকার করে আঁধারই লুটে নিল? মুখোমুখি হয়ে গেল ‘অ্যাপলিটিক্যাল’ একরত্তি আর্ট-কালচার…

গুলির মুখে শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদ দুই দুটি পক্ষ—

দুই বর্গে লেখা হয় তাঁদের ভুবন,

যেহেতু মানুষ প্রার্থনা করতে এবং মদ খেতেও ভালোবাসে,

ওদের তাই অহেতু সন্ত্রাসী ক্রোধ; কোন দিকে যাবে তারা?

কেন তারা অবিনাশী ক্রেধে নিজেকেই নিজে বলে ভালো মানুষ ও জানোয়ার!

কত যে প্রবল ক্রোধ আহা এ দুনিয়া ভেঙে ফেলে খান খান!

ভাঙতে ভাঙতে দুপুরও দ্বিখণ্ডিত, ছায়ারাও কি আমার চোখের ভেতরে দুই ভাগে এঁকে বেঁকে চলে!

যত চোখকে প্রভাবিত করো তুমি, হে রমণীবাদ,

তেমার স্বকণ্ঠ চিৎকারে আমি সরব অবশ্যই,

তবে নাম ব্যবহার করে তোমার

          কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়াও হয় নাকি?

এটা একটা সমস্যাই—পলিটিক্যাল ইনকারেক্ট কথা এসে গেল, নির্ঘাৎ এবার খসে পড়বে ইমেজ ও ইমেজারি,

এবং এ নিয়েও হতে পারে গভীর পলিটিক্স;

আর যখন পলিটিক্যাল দুপুরেরা কাউকে দাঁড়াতে দেয় না একাকী,

নির্ভয়ে প্রতিপক্ষ করে তোলো শামসুর রাহমান আর আল মাহমুদকে,

এই সিভিল ও ডেভিল সোসাইটিতে

সবার জন্যই এখন ন্যারেটিভ ওপেন

শুধু বটবাহিনী নামিয়ে একবার হামলে পড়…

এ দুপুর এই রাত আরও কত তীব্র হচ্ছে

হে অবিমৃশ্যকারী!

 


হে মহাবাষ্পশীলা, তব আমি কয়েদির আদলে


যখন তোমার জন্ম ক্রমাগত রক্তের মধ্যে কুণ্ডুলি হয়ে বেসুমার ফোটে, আমি সেখানে অবোধ, তুলতুলে শিশুমাত্র; দুূূধভাই আমি তোমাদেরই হে মহাবাষ্পশীলা আশরাফুল মাখলুকাত…

.

আমি অসহায় আকাশ দেখে অতিকায় চাঁদের নিচে… আমি মাটির সন্তান… চিররহস্যের তন্দ্রা ভেঙে আমিই তো সবটুকু ক্ষণকাল… আমায় ঘিরে আছে ষড়যন্ত্রের নিঠুর কাঁটাতারজাল… চাঁদের আলো হেথা ফকফকা…

 

আহারে তোমার গগনে মাবুদ আমার কোনো আলো নাই?

.

নাই আরও অনেক অনেক আদমহাওয়াপ্রাণ!

.

সব গান শেষে তুমি কি খেলছ আমায় নিয়ে? তাই আমিই বিনাদোষে উড়ে যাওয়া নিষ্পাপ গ্যাসবেলুন, ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে ফুঁটো করলে আমারই জঠর!

তুমি তবে কে?

.

নিজের ছয়াকুণ্ডুলি হাতে পথে নেমে এই যে মাখলুকাত আমি, ফুটে আছি তোমারই জখমে! আমার মধ্যে লীন, দিনহীন চেহারায় আরও আরও দীর্ঘ সিরাতুল মুস্তাকিম…

.

সেই পথ তোমাদের হাসির চেয়েও সরল, মানুষের বুকগুলো রক্তের মতন—গাঢ় লাল… ব্যথা নাই, কথা নাই…

.

এই সব যন্ত্রণা চোখের জলের নিচে তীব্র স্বরে নোনতা অওয়াজমাখা; মানে শূন্যস্থানে এমন অনেক ভাষা আছে যা কভু যায় না লেখা…

.

উন্মুক্ত এসব বাক্যে, এমন অনেক ভাব, যা কেবল এলোমেলো বাতাসের উন্মাদ ঘ্রাণে ভেসে ভেসে আসে, বসে দু-দণ্ড পথে—

কারা সেখানে সিরাতুল মুস্তাকিমের আশায় জাগ্রত? সেথা কারা মাবুদ?

.

আর আমার কান্না আর আমার রান্না করা ফোঁটা ফোঁটা গোটা গোটা অশ্রু… ঘরে ঘরে প্রতিদিন ঝলসে যায় যত চোখের পানি, রন্ধনশালায় প্রত্যহ গরম হয় উদ্বেগে ভরা এ আত্মা আমার! 

এবং নফস কোথায়?

.

যখন তোমার জন্ম ক্রমাগত কুণ্ডুলির মধ্যে রক্ত হয়ে ফোটে, কে আমি সেখানে—গাছপাখিলতাপাতা আর গাছের নিচে বেঁচে থাকা কেবল এক ইনসান?

.

মাতৃস্নেহে রাতগুলো দিয়েছিল শুশ্রূষা আমায়, পথ থেকে তুলে… ভঙ্গুর এ দেহখানি খুলে রেখেছিল মরমি তব জঠরদানিতে—

মা, আমার কান্না তথায় আজও তড়পায়!

.

নিঃসহায় মাখলুকাত কাঁদে, অশ্রুগুলো তার ভরা এ বর্ষার ভারে অঝোর বৃষ্টির তলে জখমের মতো জমাট…

 

সেই দৃশ্য যদি ভুলে যাই, তবে তুমি ক্রন্দনশীলা, এই খেলা অশেষ হোক তোমার শিরায়; অতঃপর রতিযামিনী যত গভীরতা মাগে, তোমার পথ যেন শিশুর মতো মহান—পাপ ও নিষ্পাপের মাঝখানে চোখের পানিতে লিখিত

.

অথচ এ রাত্রিকুল কতটা লিখিত, কতটা নিরাপদে ঘনঘোরে আজ সকলে ঘুমায়! ওপরে বাষ্প তোলা আকাশ, তার তলে ক্ষুদ্র আমি প্রভু, কেন জেগে আছি? ডুকরে কেঁদেই চলেছি আত্মার কয়েদখানায়?

 

আমি ও আমার সিরাতুল মুস্তাকিম তাই কোন পন্থে যেতে পারি ভাই!

.

ক্রমশ কয়েদির আদলে এ জন্ম ভেঙে পড়ে এবং…

.

আমি কি শুষ্ক পাতার মতন… থরথর কাঁপুনি জাগিয়ে খুচরো পয়সার আরেকটু ঝনঝন… জন্মে জন্মে রক্তপাত হয়ে জেগে উঠি তোমাতে!

 


এরপর ঝলসে যাওয়া চাঁদের আকারে


না ঘুমিয়ে ছয় মাস এরপর আমি যাব গভীর নিদ্রায়,

মানুষকে কীভাবে নিঃশব্দে হত্যা করা যায়, 

ঘুমের ভেতর ধীরে ধীরে শিখব 

                             সেই কারসাজি;

স্বপ্নে দেখা তোমার সমন 

দুচোখে আমার 

            বিছিয়ে রেখেছে একগুচ্ছ কাঁটা—

যাতে কোনো খুনখারাবি না দেখে আমিই 

                                          হতে পারি খুন;

.

হৃৎপিণ্ড ছুঁয়ে মন খুলে ডাকে কেউ—

            ভাইবন্ধু সেজে আসে ভোলাভালা হত্যাকারী, 

চারপাশে অসম্ভব প্রহেলিকা ঢেলে 

       ডেকে ডেকে বলে তারা :

হে দোসর, এ চক্রান্তজালে মুণ্ডু নাচাব রে এইবার, 

তোর রক্তে দু’নলা মাখিয়ে খাব ভাত, 

মর তবে, ফিরে যা পানিতে,

যেখানে হয় না ঘুম 

     রাত একা গলে গেলেও মোমের মতন

.

তবু এসো ঘুম, একটানা আমি ঘুমাব আগামী ছয় মাস—

তোমরাও যারা নিরুচ্চার, মানুষের বেশে

                    মানুষেরই নিশ্বাসের মতো ক্ষণস্থায়ী, 

তোমাদের অনুমতি নিয়ে তবেই ঘুমাব?

.

আহ বিক্ষত আমার নিদ্রা! আসো 

                                  দুদণ্ড চোখের পরে,

মমতায় ভাসিয়ে নাও, যেভাবে সুমিষ্ট জল 

আর জলের ধারনা

                চিরদিন নদীর ওপরে ভেসে থাকে;

মাঝে মাঝে ওই জলাধারে কুমিরের সুতীব্র আক্রোশে 

আমার কাছের কেউ একা হয়ে যায় নাকি খুব, 

মাছ ধরতে নদীতে পাঠিয়ে 

              যাকে ফাঁসিয়ে দিয়েছে তার ভাই!

প্রতারিত সেই যারা, মানুষের ক্লান্তিহীন অবিশ্বাসে

তাদের কেবল ডুবে যেতে যেতে

চাঁদের আকারে ঝলসে যাওয়া ঘুম, গেরিলার বেশে 

দুই চোখে জেগে আছে সারারাত…

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments