মহান আল্লাহর লাখো লাখো নিয়ামতের কত বিচিত্র সমারোহে ভরপুর এ বিশ্ব জাহান। ফল-ফুল, পশু-পাখি, মানুষ… ইত্যাদি প্রতিটি সৃষ্টিই নিজ নিজ বৈশিষ্ট্যে স্বতন্ত্র। হাজার হাজার প্রজাতির পশু, হাজার হাজার প্রজাতির পাখি পৃথিবীতে বসবাস করছে—এদের প্রত্যেকেরই নিজ নিজ ভাষা রয়েছে যা দিয়ে এরা স্বজাতির সাথে মনের চাহিদা, ভাব আদান-প্রদান করে, সুখ-দুঃখ, বিপদাপদ, অভাব-অভিযোগের কথা জানিয়ে থাকে। মানুষ বুদ্ধিমান জীব হিসেবে তাদেরও রয়েছে মাতৃভাষা, আঞ্চলিক, দেশীয় এবং রাষ্ট্রীয় ভাষা, যার মাধ্যমে এরা নিজ লোকদের সাথে কথা বলে থাকে, সমাজে বিচরণ করে, কাজকর্ম করে। এ ছাড়াও মানুষ নিজেদের বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে কিছু কিছু ভাষাকে আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ব্যবহার করছে। ফলে বিশ্বের সকল মানুষের শিক্ষা, সংস্কৃতি, ধর্মকর্ম, জ্ঞান-বিজ্ঞান বোঝার, জানার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু তবু সকল মানুষের পক্ষেই নিজ ভাষা তথা মাতৃভাষা ব্যতীত অন্য দেশ, অন্য জাতির ভাষা জানা, বোঝা, পড়ার সুযোগ হয় না বা হওয়া সম্ভবপরও নয়। এক জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে চারশ’ ভাষা ব্যবহৃত হচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বের নানা দেশ ও অঞ্চলের মানুষেরা সাড়ে চারশ’ ভাষায় কথা বলে মনের ভাব প্রকাশ করছে। ছয়শ’ কোটি লোক সকলেই নিজের মাতৃভাষায় কথা বলতে, শুনতে ও কাজ করতে পছন্দ করে। মাতৃভাষায় সুখ-দুঃখ, আবেগ-অনুভূতি, প্রকাশ-বিকাশে, মননে-মানসে অভ্যস্ত এবং সহজ-স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মাতৃজঠর থেকে ভূমিষ্ট হয়ে যে ভাষা মায়ের মুখে শোনে-শিক্ষা, সভ্যতা, আচার-আচরণ মানুষ দেখে তা-ই তার কাছে আপন, সহজ, স্বাভাবিক ও গ্রহণীয়-বরণীয় হয়। যার যার মাতৃভাষাই তার কাছে জীবনের স্বাভাবিক অংশ। আর মানুষ সহজ-স্বাভাবিকের মধ্যেই বিচরণ করতে ভালবাসে। ইসলাম মানবজীবনে সরল, সহজ, স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক পথ অনুসরণেই মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, শিক্ষা দেয়। জীবনে জটিলতা মুক্ত হয়ে চলতে মানুষকে আদেশ-নির্দেশ করে। সরল পথের সন্ধান দেয়। আর সে কারণেই ইসলাম মাতৃভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দান করেছে। মাতৃভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে পবিত্র কুরআনে ঘোষিত হয়েছে :
“আমি তোমার ভাষায় কুরআনকে সহজ করে দিয়েছি, যাতে মানুষ উপদেশ গ্রহণ করে।”
পরম করুণাময় আল্লাহর এ ঘোষণাই প্রমাণ করে ইসলামে মাতৃভাষাকে কত মর্যাদার উচু আসনে স্থান দেয়া হয়েছে।
আমরা জানি, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা) আরব দেশে জন্মগ্রহণ করেন। আরবদেশের লোকদের মাতৃভাষা আরবী। মহানবীর (সা) উপর কুরআন আরবী ভাষায় নাযিল হয়েছে। সুতরাং উপরোক্ত আয়াতের সরল ব্যাখ্যা দাঁড়ায়—হে রসূল। নিশ্চয় আমিই এ পবিত্র কুরআন শুধু এ উদ্দেশ্যেই তোমার ভাষায় (তোমার মাতৃভাষায়) সহজ করে দিয়েছি যাতে আরবের অধিবাসীরা আমার আদেশ, নির্দেশ ও বাণীসমূহ সহজে বুঝতে পারে, হৃদয়ঙ্গম করতে পারে। এখানে তিনটি বিশেষ দিক স্পষ্টভাবে ঘোষিত হয়েছে—প্রথমত, মাতৃভাষার মর্যাদা দান। দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষায় মানুষের শিক্ষাদানের বিষয়, যা মানব জীবনকে সহজ-স্বাভাবিক করে। তৃতীয়ত, হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে ধর্ম প্রচারে সাহায্য দান করা, সহযোগিতা করা।
ইসলাম মাতৃভাষাকে মানুষের শিক্ষার প্রধান বাহন হিসেবে ঘোষণা করে মাতৃভাষাকে কতটা মর্যাদা ও গুরুত্ব দান করেছে তা বিশদ ব্যাখ্যার প্রয়োজন পড়ে না। আল্লাহর হুকুম-আহকাম তথা নির্দেশাবলী মানুষ যাতে সহজে বুঝতে পারে সে জন্য আরবদের মাতৃভাষা আরবীতেই কুরআন নাযিল হয়েছে। আরবদেশের লোকেরা তা সহজে বুঝতে পেরেছেন এবং নবীজীর (সা) সাহাবীগণ আল্লাহর এই বাণীসমূহ মুখস্থ করে সমাজে সমাজে, দেশে দেশে তা প্রচার করার জন্যে ছড়িয়ে পড়েছেন। দিকে দিকে তাঁরা ইসলামের বাণীকে পৌঁছে দিয়েছেন।
সূরা মায়িদাতে আল্লাহ্ তা’আলা ইরশাদ করেছেন, “হে মানব জাতি! তোমাদের কাছে আবির্ভূত হয়েছে এক নূর এবং একটি সুস্পষ্ট কিতাব।” সে নূর হচ্ছেন মহামানব হযরত মুহাম্মদ (সা) এবং সে কিতাব হল আল-ফুরকান বা আল-কুরআন। এ সুস্পষ্ট কিতাব পবিত্র কুরআন বা ফুরকানই হল আল্লাহ্ তা’আলার কালাম, যা মানব জাতির একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এ এক মহা জ্ঞানভাণ্ডার। সর্বযুগের সকল সমস্যা সমাধানের পথ এতে রয়েছে। সকল জিজ্ঞাসার সঠিক উত্তর এতে নিহিত। কুরআনের প্রতিটি আয়াত সর্বকালের সর্বাধুনিক জ্ঞানের দিক নির্দেশনা দেয়। একে জানা, পড়া, বুঝা ও মেনে চলার জন্য প্রকৃত উপলব্ধি শক্তি, আধ্যাত্মিক মানস ও সুদৃঢ় ঈমান থাকা একান্ত প্রয়োজন। আর তা অর্জন করতে হলে নিজ ভাষায় কুরআনের মানে বুঝতে হবে। কুরআনুল করীমের প্রতিটি ছত্র, হরফ, শব্দ, বাক্য, নোক্তা ও আয়াতের সঠিক অর্থ জানা ও সেভাবে তাজিম করা মানুষের কর্তব্য। মানব জীবনের সুষ্ঠু পরিচালনা তথা মানুষ হিসাবে সুস্থ সবল সতেজভাবে বেঁচে থাকা, নিজ সমাজ, দেশ ও রাষ্ট্রের মঙ্গল সাধন করা, মহান স্রষ্টার শুকরিয়া আদায় ও তাঁর গুণকীর্তন করা ইত্যাদি বিষয়ের গাইড লাইন হিসেবে কুরআনকে জানা ও সেভাবে নিজেকে তৈরী ও পরিচালিত করা মানুষের দায়িত্ব। সুতরাং মানুষ যাতে সহজে কুরআন মজীদকে বুঝতে পারে, হৃদয়ঙ্গম করতে পারে সে জন্য সকল মানুষকেই তার নিজ ভাষায়, মাতৃভাষায় তা জানা প্রয়োজন। তাই বিভিন্ন দেশের ভাষায় কুরআনের তফসীর করা প্রয়োজন। সঠিকভাবে কোন দায়িত্ব পালন করতে হলে মানুষকে জীবনের স্বাভাবিকত্ব বজায় রেখে তা করলে সহজ হয়। মাতৃভাষাই মানুষের জীবনে স্বাভাবিক কাজকর্মের প্রকৃষ্ট মাধ্যম। কেননা মাতৃভাষা হল স্বাভাবিক ভাষা। কথা বলা, মনের ভাব আদান-প্রদান করা মানুষের সহজাত কাজ। সে কর্মের মাধ্যম হল মাতৃভাষা। মাতৃভাষা তো সে ভাষা—যে ভাষা শিখতে, বলতে মানুষকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় না, কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয় না। জীবনের প্রথম প্রভাতে শিশু মাটিতে পড়ে সুতীব্র চিৎকারে তার আগমনী বার্তাকে প্রকাশ করে। তখন তাকে কোলে নিয়ে, আঁচলে তুলে মা যখন আদর জানান, ছোট নরম তুলতুলে গালে চুমু দিয়ে তাকে স্বীকৃতি দেন তখনই সে মাকে বুঝে নেয়, মায়ের ভাষাকে বুঝে নেয়। সুতরাং মাতৃভাষা শেখা ও কথা বলার জন্য মানুষকে আর কারো দ্বারস্থ হতে হয় না। জীবনের সহজাত গতি যা উৎসারিত ও স্পন্দিত সে মাতৃভাষাতেই কুরআন ও হাদীসকে জানার জন্য, আমল করার জন্য ইসলাম মানুষকে তাকীদ দিয়েছে।
ইসলাম মানবজীবনকে সহজ-সরল ও স্বাভাবিক পথে পরিচালিত করতে চায়। তাই কুরআন-হাদীস মাতৃভাষায় তরজমা করে ভালভাবে জানা, গভীরভাবে উপলব্ধি করা একান্ত বাঞ্ছনীয়। এমনকি জুমু’আর নামাজে খুৎবার মধ্যে আল্লাহ্ পাকের প্রশংসা, নবী করীম (সা)-এর প্রতি দরূদ পাঠ করা ও কালেমা… ইত্যাদি পাঠ ও মুসল্লীগণের ভাষায়, মাতৃভাষায় সাধারণ মানুষদের বোধগম্য করে তাদেরকে প্রয়োজনীয় ওয়াজ নসীহত করা ইসলামে জায়েয। এ বিষয়ে আল্লাহর ঘোষণা থেকেই উপলব্ধি করা যায় এবং নবীজীর (সা) হাদীসেও স্বর্ণিত আছে। তাছাড়া সূরা ইবরাহীমে আল্লাহ্ বলেছেন : “আমি প্রত্যেক রসূলকে তার দেশবাসীর ভাষায় পাঠিয়েছি যাতে তাদেরকে ভালভাবে বুঝাতে পারে।”
সূরা ফুরকানে আরো বলা হয়েছে। “তিনি পাক-পবিত্র, যিনি তাঁর খাস বান্দার (রসূলের) প্রতি কিতাব নাযিল করেছেন যাতে করে তিনি সমগ্র পৃথিবীর মানুষকে ভয় প্রদর্শন করতে পারেন।”
যেহেতু কুরআন বিশ্বগ্রন্থ এবং হযরত মুহাম্মদ (সা) বিশ্বনবী, সেহেতু বিশ্বের বিভিন্ন ভাষার ভাষাভাষী সকল মানুষের জন্য কুরআন ও হাদীসের উপদেশ বিভিন্ন ভাষায় বুঝিয়ে দেয়া একান্ত কাম্য ও কর্তব্য। এ সম্পর্কিত নিম্নোক্ত হাদীসটি বিশেষভাবে লক্ষণীয় :
হযরত জাবের ইবনে সামারাহ হতে বর্ণিত-রসূলে আকরাম (সা) জুম’আর দিনে দু’টি খুৎবা দিতেন এবং মাঝে মাঝে বসতেন। তিনি খুৎবায় কুরআন মজীদ পাঠ করতেন এবং মানুষকে ওয়াজ করতেন। (মুসলিম)
নবী করীম (সা) নিজ ভাষায় ওয়াজ করতেন। কাজেই পৃথিবীর অন্যান্য দেশে আপন আপন ভাষায় (মাতৃভাষায়) প্রচার কার্য চালানো কর্তব্য।
হানাফী ফতোয়ার কিতাব সিরাজিয়ায় এবং মাওলানা আবদুল হাই লক্ষ্ণৌভী (হানাফী) সাহেবের কিতাব মম্মুআ ফতওয়ার ১ম খন্ডের ২৪৫ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে, শ্রোতাদেরকে তাদের ভাষায় খুৎবার অর্থ বুঝিয়ে দেয়া যেতে পারে। কুরআন মজীদ, হাদীস শরীফ ও পণ্ডিত ব্যক্তিদের এসব উদ্ধৃতি থেকে সহজভাবেই উপলব্ধি করা যায় ইসলাম মাতৃভাষাকে কতটা মর্যাদাশালী করেছে। কবির ভাষায় :
“নানা দেশের নানান ভাষা
বিনা স্বদেশী ভাষা
মিটে কি আশা?”
মানব মনের এ চিরন্তন আর্তির প্রতি ইসলাম যথেষ্ট মর্যাদা দিয়েছে। নিজের ভাষায়, মাতৃভাষায় ইসলাম ধর্মকে পড়ার, জানার, বাস্তবায়িত করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করেছে, তাগিদ দিয়েছে। তাই তো নবীজীর (সা) ইসলাম প্রচারের সময় থেকে শুরু করে অদ্যাবধি বিশ্বের দিকে দিকে ইসলামের বিধান মহাগ্রন্থ কুরআন ও হাদীসসমূহ বিভিন্ন ভাষায় তরজমা, তফসীর করা হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছতে অসুবিধা হচ্ছে না। তাই তো পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ইসলামের তৌহিদ বাণী ছড়িয়ে পড়ছে।
এখন অত্যন্ত সঙ্গত কারণেই এই উপমহাদেশ তথা বাংলাদেশে মাতৃভাষায় ইসলাম প্রচার ও প্রসারের বিষয়ে কিছুটা আলোকপাত করতে হয়।
এই উপমহাদেশে ইসলামের আবির্ভাব বহু যুগ পূর্ব থেকেই। আর ঐতিহাসিকভাবে একথাও সত্য যে, বাংলাদেশের সাথে বহু শতাব্দী পূর্ব থেকেই আরবদের ব্যবসা-বাণিজ্য চলে আসছে। সে সুবাদে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারকগণ অতি সহজেই প্রবেশ করে ইসলামের প্রচার চালাতে সমর্থ হন। আলেম, সুফী, কামিল, সাধক যাঁরা এদেশে ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছেন তাঁরা এদেশের মানুষের ভাষা, জীবন ব্যবস্থা, সংস্কৃতিকে জেনে, গ্রহণ করে, তাদের সাথে একাত্ম হয়ে, তাদের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, বিপদাপদের বন্ধু, উদ্ধারকারী হিসেবেই নিজস্ব অমায়িক ব্যবহার, ইসলামের সাম্য-মৈত্রী ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মহিমা দ্বারা ও ন্যায়নীতি বোধের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দ্বারা এদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ, খৃস্টান, শিখসহ অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের জয় করে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছেন। আরব, ইরান, ইরাক, তুর্কিস্তান থেকে আগত অসংখ্য আলেম, সূফী, মুজাহিদ এদেশে তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ-তিতিক্ষা, কুরবানী দ্বারা ইসলাম প্রচার ও মুসলিম শাসনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ইসলাম প্রচারক সূফী, সাধক, কুতুব, আলেমগণ বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিত বিবেচনা করে বাংলাদেশকেই তাঁদের কর্মস্থল হিসেবে গণ্য করেন। ফলে এ ভূখণ্ডে ইসলাম প্রচারের এক স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। এদেশে ইসলাম প্রচারের সাথে যাঁদের নাম বিশেষভাবে পরিচিত তাঁরা হলেন—হযরত শাহজালাল (র), শাহ্ তুরকান শহীদ (র), শাহ্ তাকিউদ্দিন আরাবী (র), শরফুদ্দিন আবু তাওয়ামা (র), শাহ মখদুম (র), শেখ শরফুদ্দীন ইয়াহিয়া মুমিনী (র), সৈয়দ আহমদ কল্লা শহীদ (র), খান জাহান আলী (র), খাজা শরফুদ্দিন চিশতী (র), হযরত বায়েজিদ বোস্তামী (র), জালাল উদ্দীন তাবরিযী (র), আখি সিরাজ (র), আলাউল হক (র), হযরত নূর কুতুবুল আলম (র) প্রমুখ।
বাংলাদেশের লোকদের মাতৃভাষা বাংলা ছিল, কিন্তু মুসলমানরা এ দেশ জয় করে শাসন করার পূর্ব পর্যন্ত বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোন উন্নতি সাধিত হয়নি। হিন্দু, বৌদ্ধ, শিখদের ধর্মগ্রন্থ সংস্কৃত, পালি ইত্যাদি ভাষায় রচিত হয়। ফলে সাধারণ মানুষ তা জানতে পারত না। মুসলমানগণ এ দেশে আসার পূর্বে ভাষা হিসেবে বাংলা ছিল খুবই অবহেলিত। পরিচর্যা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে বাংলা ভাষা আপন সত্তা নিয়ে বিকশিত হতে পারেনি। সাধারণ মানুষের ভাষা হলেও বাংলায় কোন রাজকার্য পরিচালিত হত না। মুসসমান সুলতানগণই তাঁদের উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এ দেশবাসীর মাতৃভাষা বাংলার উৎকর্ষ সাধন ও বিকশিত করে শাহী দরবারে স্থান দেন। এদিকে বাংলা ভাষায় সাহিত্য ও কাব্য চর্চার শুরু থেকেই ইসলাম ধর্ম, ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে চর্চা আরম্ভ হয়। ফলে এ দেশের নানা ধর্মাবলম্বী লোকেরা ইসলাম ধর্ম ও নবী-রসূলদের সম্পর্কে জানার সুযোগ পায়। সাথে সাথে মুসলিম সূফী-সাধক, অলি-আল্লাহদের ও শাসকদের গুণ ইত্যাদি তৌহিদী আচরণে ভিন্ন ধর্মাবলম্বীগণ মুগ্ধ হয়ে দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকেন। আবার অনেক হিন্দু লেখক ইসলাম ধর্মের বিবিধ বিষয়াবলী ও হযরত মুহাম্মদ (সা)-কে নিয়ে পুথি কাব্য রচনা করেন। বাংলা কাব্যে ও পুঁথি সাহিত্যে ইসলামী ভাবধারা এক বিরাট স্থান জুড়ে আছে। মধ্যযুগের পুঁথি রচয়িতা, কবি-সাহিত্যিক থেকে শুরু করে আউল-বাউলসহ আজকের আধুনিক কবি-গায়ক পর্যন্ত প্রগাঢ়ভাবে ইসলামী চিন্তা-চেতনায় উদ্দীপ্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। মুসলমান সূফী, সাধক, চিন্তাবিদ, আলেম, কবি, সাহিত্যিক ও শাসকদের সংস্পর্শে এসে ভিন্ন সম্প্রদায় ও ধর্মাবলম্বীগণও ইসলামী চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে গান, কবিতা, সাহিত্য রচনা করেছেন। ভারতচন্দ্র রায় গুণাকর, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, নরেন্দ্রদেব, কবিশেখর, কালিদাস রায়, মোহিত লাল মজুমদার, মনমোহন বর্মণ, শংখঘোষ প্রমুখ বাঙালী হিন্দু কবি-সাহিত্যিক মুসলিম সভ্যতা, ব্যক্তিত্ব ও ধর্মের কল্যাণমূলক বিষয়ে কবিতা লিখে, সাহিত্য রচনা করে বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। এভাবেই মাতৃভাষা বাংলার মাধ্যমে এ দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও প্রাত্যহিক জীবনে ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে।
মুসলমান কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যে সৈয়দ আলাউল, সৈয়দ হামজা, শাহনূর, সৈয়দ সুলতান, দৌলত কাজী, হায়াত মাহমুদ, শাহ গরীবুল্লাহ, লালন শাহ্, শীতলং শাহ, জালালউদ্দীন, পাগলা কানাই, আরকুম শাহ্, দুর্বিন শাহ, মনসুর বয়াতী, দুদু শাহ্, হাসন রাজা, মৌলবী ইয়াসিন, মীর মশাররফ হোসেন, মুন্সী মেহেরউল্লাহ, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, ইসমাঈল হোসেন শিরাজী, কায়কোবাদ, গোলাম মোস্তফা, ফররুখ আহমদ, এমদাদ আলী, কাজী নজরুল ইসলাম, বেনজীর আহমদ, আবদুল কাদিরসহ আরো অনেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের প্রশংসা, নবী চরিত ইত্যাদি রচনা করে সর্বসাধারণের মধ্যে ইসলামের তৌহিদবাণী প্রচার করেছেন। এছাড়া আলেম সমাজ তো রয়েছেন যাঁরা মসজিদ, মক্তব, মাদ্রাসা ও ওয়াজ-নসিহতের মাধ্যমে কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা ও ধর্মের বিভিন্ন দিক বিস্তারিত তুলে ধরেছেন। তাই আজ আমরা আমাদের মাতৃভাষায় ইসলাম ধর্ম, কুরআন-হাদীস, নবী-রসুল সম্পর্কে বিস্তর জানার সুযোগ পাচ্ছি। সে সুযোগের পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা উচিত। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, আবদুল্লাহ হেল বাকী সাহেবের সংগঠনসহ বহু ইসলামী সংগঠন ধর্মীয় বিভিন্ন ভাষাভাষীর সাহিত্য বাংলায় অনুবাদ ও তরজমা করে আমাদের সাহিত্য-সংস্কৃতি ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার প্রয়াসে ব্যস্ত রয়েছে। পবিত্র কুরআনের জননী সূরা ফাতিহা অবলম্বনে রচিত কবি গোলাম মোস্তফার ‘মুনাজাত’ কবিতা সকল মানুষের মনেই স্রষ্টার প্রতি অবনত মস্তক ও শ্রদ্ধাপ্লুত হয় :
অনন্ত অসীম প্রেমময় তুমি
বিচার দিনের স্বামী,
যত গুণগান হে চির মহান
তোমারি অন্তর্যামী।
দ্যুলোকে ভূলোকে সবারে ছাড়িয়া
তোমারি চরণে পড়ি গো লুটাইয়া
তোমারি সকাশে যাচি হে শক্তি
তোমারি করুণাকামী।
সরল সঠিক পুণ্য পন্থা
মোদেরে দাও গো বলি
চালাও সে পথে যে পথে তোমার
প্রিয়জন গেছে চলি।
যে পথে তোমার চির অভিশাপ
যে পথে ভ্রান্তি চির পরিতাপ
হে মহাচালক, মোদেরে কখনো
করো না সে পথ গামী।
কাজী নজরুল ইসলামের বহু হামদ, না’ত ও ইসলামী কবিতা, গজল মানুষকে বিমোহিত করে, আল্লাহ্ ও রসূলের প্রতি অবনত করে :
আমার মুহম্মদের নামের ধেয়ান হৃদয়ে যার রয়।
খোদার সাথে হয়েছে তার গোপন পরিচয়।।
ঐ নামে যে ডুবে আছে, নাই দুঃখ শোক তাহার কাছে।
ঐ নামের প্রেমে দুনিয়াকে সে দেখে প্রেমময়।।
যে খোশ-নসীব পিয়াছে ঐ নামের স্রোতে ভেসে,
জেনে কুরআন হাদীস ফেকা এক নিমিষে।
মোর নবীজির বর—মালা
করেছে যার হৃদয় আলা,
বেহেস্তের সে আশা রাখে না (তার) নাই দোজখে ভয়।।
অবশেষে বলতে চাই, ইসলাম যেখানে মাতৃভাষাকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে মাতৃভাষায় ধর্ম চর্চা, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করার জন্য মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে, তাগিদ দিয়েছে সেখানে এক শ্রেণীর শাসক, শোষক বাংলার মানুষের মাতৃভাষার টুটি চেপে ধরার ষড়যন্ত্রকে, রক্ত চক্ষুকে চিরতরে নস্যাৎ করে দিয়েছে এ দেশের সাহসী সন্তানেরা। বাংলার সোনার ছেলেরা কুচক্রীদের সমুচিত জবাব দিয়েছে তাদের বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দিয়ে, নিজের মৃত্যুহীন প্রাণ ভাষার সম্মান রক্ষার্থে দান করে দিয়ে। মাতৃভাষা অমৃত সমান। সে ভাষায় কথা বলার অধিকার আদায়ের জন্য বাংলার তরুণেরা তাজা রক্তের আখরে বিশ্বের বুকে যে নজিরবিহীন ইতিহাস সৃষ্টি করেছে ১৯৫২ সনের ফাল্গুনে, তা অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। শহীদ বরকত, সালাম, জব্বারসহ অগণিত নাম-না-জানা শহীদ তোমরা লহো লাখো সালাম। আর যাঁরা ভাষার সংগ্রামে আত্মাহুতি না দিয়ে গাজী হয়ে বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন-তাঁদের প্রতি জানাই সশ্রদ্ধ কৃতজ্ঞতা ও সালাম।
ভাষা শহীদদের স্মৃতি চিরঅম্লান হয়ে থাক। তাঁদের আদর্শ আগামী দিনের অগণিত মানুষকে সত্য ও ন্যায়ের সংগ্রামে উদ্বুদ্ধ করুক, অনুপ্রাণিত করুক। তাঁদের মতো ত্যাগী বীর সন্তানদের জন্ম হোক বিশ্বের দিকে দিকে—বিশ্ববাসীকে সত্য ন্যায় সুন্দরের পথ দেখানোর প্রত্যাশায়।
[লেখকের প্রতি সম্মানার্থে বানান অপরিবর্তনীয় রাখা হলো।]