পশ্চিমা সামাজিক চুক্তি-তত্ত্বগুলো রাষ্ট্রকে দেখে এক কৃত্রিম ও প্রয়োজননির্ভর কাঠামো হিসেবে, যাকে তৈরি করে মানুষ। রাষ্ট্র হচ্ছে মানবসমাজের ভঙ্গুরতা, ভয়, সম্ভাবনা এবং পারস্পরিক নির্ভরতার সম্মিলিত সিদ্ধান্ত থেকে জন্ম নেওয়া এক কৃত্রিম বাস্তবতা। এই বাস্তবতার বৈধতা আসে জনগণের সম্মতি, চুক্তি, বা collective consent থেকে।
চুক্তিতত্ত্বের তিন স্থপতি হলেন—টমাস হবস, জন লক, জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো। তারা নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গির আলাদা নৈতিক মানচিত্র এঁকেছেন। তাদের বয়ানে রাষ্ট্রের জন্ম যেন তিনটি পৃথক দার্শনিক নাটক। একটিতে রাষ্ট্র নিরাপত্তাহীনতার গর্ভে জন্ম নেওয়া এক দৈত্যরাজ লেভিয়াথান; আরেকটিতে অধিকার সংরক্ষণের জন্য প্রতিষ্ঠিত সীমিত সরকার; তৃতীয়টিতে সাধারণ ইচ্ছার (General Will) সঙ্গীতে গঠিত জনগণের সার্বভৌমত্ব।
১৬৫১ সালে প্রকাশিত লেভিয়াথান—হবসের দার্শনিক রাজনীতির ভাষ্য। যা প্রকৃতিরাজ্যের এক ভয়ংকর অবস্থার চিত্র আঁকে। প্রকৃতিরাজ্যে মানুষের জীবনের কেন্দ্রে ছিলো এক বাস্তবতা—war of all against all―সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ। এই জগতে মানুষ একাকী, দারিদ্র্যপীড়িত, পাশবিক ও সংক্ষিপ্ত জীবনের অধিকারী। তার কোনো নৈতিকতা বা স্থিতি নেই; আছে কেবল নিরাপত্তার অতল শূন্যতা।
এই অবস্থার আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে মানুষ যুক্তির আশ্রয় নেয়। যুক্তি তাদেরকে পৌঁছায় একটি মৌলিক সিদ্ধান্তে। তারা স্থির করে, সকল প্রাকৃতিক অধিকার এক সার্বভৌম শক্তির কাছে সমর্পণ করবে। এই সার্বভৌম শক্তি লেভিয়াথান বা রাষ্ট্র। সে এই চুক্তির অংশীদার নয়, বরং সর্বশক্তিমান সুবিধাভোগী। হবসের চুক্তি একমুখী, অপরিবর্তনীয়। এখানে রাষ্ট্র হলো শান্তি ও নিরাপত্তার একমাত্র রক্ষক। হবসের দর্শন শেষ পর্যন্ত এক অবাধ রাষ্ট্রক্ষমতার নীতিকে বৈধতা দেয়।
এলেন জন লক। ১৬৮৯ সালে প্রকাশিত Two Treatises of Government গ্রন্থটি হবসের অন্ধকার প্রাকৃতিক অবস্থার বিপরীতে একটি ন্যায়সঙ্গত, যুক্তিবদ্ধ মানবস্বভাব প্রতিষ্ঠার কথা বলে। প্রকৃতিরাজ্য তার কাছে যুদ্ধক্ষেত্র নয়; বরং এমন একটি অবস্থা, যেখানে মানুষ প্রাকৃতিক আইন অনুসরণ করে। কিন্তু সেখানে তাদের জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তি—এই তিন মৌলিক প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষার জন্য কার্যকর কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। ফলে সবাই ছিলো অনিরাপদ।
মানুষ তাই চুক্তির আশ্রয় নেয়। তাদের উদ্দেশ্য কেবল একটাই—নিজেদের অধিকারগুলোকে আরও নিরাপদ করা। তারা সমবেত চুক্তির মাধ্যমে তৈরি করে রাষ্ট্র। তারা রাষ্ট্রকে দেয় বহু অধিকার, সাথে দেয় বহু শর্ত। প্রজারা যে অধিকার রাষ্ট্রকে দিয়েছে, রাষ্ট্র সেই শর্ত লঙ্ঘন করলে জনগণের রয়েছে বিদ্রোহ, প্রতিরোধ এবং সরকার পরিবর্তনের নৈতিক অধিকার। এই তত্ত্বই আধুনিক রিপ্রেজেন্টেটিভ গভর্নমেন্ট, সাংবিধানিকতা এবং অধিকার রক্ষাকারী রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তি।
তারপর এলেন জ্যাঁ জ্যাঁক রুশো। ১৭৬২ সালে প্রকাশিত তার The Social Contract গ্রন্থটি ইতিহাস ও সমাজের প্রতি এক বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে। মানুষ জন্মগতভাবে পবিত্র ও ভাল; noble savage। কিন্তু সমাজ তাকে কলুষিত করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তির উত্থানের পর থেকে বৈষম্য, প্রতিযোগিতা এবং বিভাজন মানবজীবনে প্রবেশ করে।
যখন সামাজিক অসমতা অসহনীয় হয়ে ওঠে, তখন মানুষ বুঝতে পারে, ব্যক্তিগত স্বার্থের লড়াই কোনো সমষ্টির স্থিতি আনতে পারে না। মানুষ তখন প্রশ্ন করতে শেখে : আমরা কেন একসাথে বাস করি? কোন নৈতিক আদর্শ আমাদের বেঁধে রাখবে? আমাদের নিয়ম, অধিকার, কর্তব্য—কোথা থেকে আসবে?
এই প্রশ্নগুলোই তাকে সামাজিক চুক্তির ধারণায় নিয়ে যায়। তারপর আসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত, যখন মানুষ সিদ্ধান্ত নেয়: আমি আমার ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে সাধারণ ইচ্ছার (General Will) কাছে সমর্পণ করছি। তখনই জন্ম নেয় রাষ্ট্র।
রুশোর চুক্তিতত্ত্ব কেবল নিরাপত্তা বা অধিকাররক্ষার জন্য নয়; বরং সমষ্টির নৈতিক পুনর্গঠনের জন্য। এখানে প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের পূর্ণ স্বাধীনতাকে সাধারণ ইচ্ছার কাছে সমর্পণ করেন।
সাধারণ ইচ্ছা হলো সমষ্টিগত কল্যাণের নৈতিক প্রতিচ্ছবি। এখানে ব্যক্তিগত লাভ মুখ্য নয়, মুখ্য হলো সাধারণ মঙ্গল। রুশোর দৃষ্টিতে—ক. সার্বভৌমত্ব জনগণের মধ্যে নিহিত, খ. আইন সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ। গ. রাষ্ট্র মানে জনগণের আত্ম-শাসন, এটি সরাসরি গণতন্ত্র।
রুশো তাই জনগণকে একই সাথে শাসক ও শাসিত হিসেবে নতুন রাজনৈতিক মর্যাদা দেন।
হবস, লক এবং রুশো—তিনজনের তিনটি পথ আলাদা হলেও, একটি মৌলিক মোহনায় তারা একত্রিত হন: রাষ্ট্র মানুষের দ্বারা নির্মিত; এটি চুক্তিবদ্ধ এক সভ্যতার কল্পনা।
হবস নিরাপত্তার জন্য স্বাধীনতার পূর্ণ সমর্পণের কথা বলেন, লক অধিকার সংরক্ষণে সীমিত সরকারের পক্ষে দাঁড়ান, রুশো সমষ্টির নৈতিক ঐক্যে জনগণের সার্বভৌমত্ব প্রস্তাব করেন।
এইসব তত্ত্বের মূল দাবিগুলো হচ্ছে :
কৃত্রিম সৃষ্টি : রাষ্ট্র কোনো ঐশ্বরিক বা প্রাকৃতিক সৃষ্টি নয়, বরং এটি মানুষের ইচ্ছাকৃত ও কৃত্রিম সৃষ্টি।
সম্মতিই বৈধতার ভিত্তি : সরকারের ক্ষমতা বলপ্রয়োগ থেকে আসে না, বরং জনগণের সম্মতি বা চুক্তির মাধ্যমে বৈধতা পায়।
উদ্দেশ্য : চুক্তির প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো প্রাকৃতিক রাজ্যে বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান করা, নিরাপত্তা, অধিকারের সুরক্ষা।
তিন দার্শনিকের তত্ত্বের তিন রূপ মানবসভ্যতার তিনটি চিরকালীন প্রশ্নকে জাগিয়ে তোলে :
১. রাষ্ট্র কি আমাদের ভয়ের ফসল?
২. রাষ্ট্র কি আমাদের স্বাধীনতার রক্ষক?
৩. রাষ্ট্র কি আমাদের সাধারণ ইচ্ছার নৈতিক প্রতিফলন?
এই প্রশ্নগুলো আধুনিক রাজনৈতিক দর্শনকে অনবরত অনুসন্ধানের পথে চালিত করে। কারণ রাষ্ট্রের জন্ম কেবল রাজনৈতিক নয়; এটি মানুষের নৈতিক কল্পনারও একটি গভীরতম অভিব্যক্তি।
তত্ত্বগুলোর আত্মা থেকে উঠে আসে একটি মৌলিক দার্শনিক প্রশ্ন—মানুষ কি সত্যিই এমন কোনো প্রাক-রাজনৈতিক ‘প্রাকৃতিক অবস্থায়’ বাস করেছিল, যেখান থেকে রাষ্ট্র গঠনের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিল? নাকি এটি সম্পূর্ণ একটি কল্পগাথা?
এই প্রশ্নের আলোকে তিন দার্শনিকের অবস্থান লক্ষ্য করা যাক। হবসের প্রাকৃতিক অবস্থার সারচিত্র হলো, সকলের বিরুদ্ধে সকলের যুদ্ধ।
হবস মূলত মানবস্বভাবের ভুল প্রতিকৃতি এঁকেছেন। তার বিচারে মানুষ জন্মগতভাবে স্বার্থপর, ভয়ানক, অসামাজিক। কিন্তু নৃতত্ত্ব, সমাজবিজ্ঞান, নৃবিজ্ঞান কী প্রমাণ করে? সেখানে এই প্রমাণ বিস্তর যে, প্রাগৈতিহাসিক সমাজগুলো সহযোগিতা ও সমবণ্টনের উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। মানুষের প্রাচীনতম জীবনকে অসামাজিক ও হিংস্র হিসেবে কল্পনা করাটা মানবস্বভাবের বিরুদ্ধে যায়। এটি মানবজগতের মানসিকতাবিরোধী এক আধুনিক অনুমান।
একটি অনুমান চিরায়ত মানবস্বভাবের সামগ্রিকতাকে মিথ্যা প্রমাণ করতে পারে না। এর মানে, হবসের ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ কখনোই বাস্তবে অস্তিত্বশীল ছিল না। তিনি একটি কাল্পনিক আতঙ্কের মঞ্চ বানালেন, যাতে মানুষের হাতে স্বাধীনতার পূর্ণ আত্মসমর্পণকে যুক্তিসঙ্গত বানানো যায়।
কিন্তু এই প্রশ্নও গুরুতর যে, সর্বাধিপত্যের অনিবার্যতা কি সত্যিই যুক্তিসঙ্গত? হবস চান জনগণ স্বাধীনতা ছেড়ে দিক নিরাপত্তার জন্য। কিন্তু নিরাপত্তা কি সত্যিই একমাত্র, সর্বোচ্চ রাজনৈতিক মঙ্গল? সর্বশক্তিমান রাষ্ট্র নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করে, নাকি নিজেই নিরাপত্তাহীনতার উৎস হয়ে ওঠে? হবসের তত্ত্ব স্বৈরতন্ত্রকে আমন্ত্রণ করে, এর যৌক্তিক পরিণতি—জুলুমশাহী তক বৈধতা দেওয়া। হবস যে চুক্তির কথা বলেন, সেটা একমুখী। চুক্তি একমুখী হলে চুক্তিটা থাকে কোথায়? তার চুক্তিতে—জনগণ সব দেয়। শাসক কিছুই দেয় না। জনগণ চুক্তি ভাঙতে পারে না। কিন্তু শাসক হতে পারে আইনের অধিক। এর মানে, এটি চুক্তি নয়, এ হচ্ছে একতরফা আনুগত্যের শর্তপত্র। ফলে এটি মূলত সোস্যাল কনট্রাক্ট নয়, সোস্যাল সারেন্ডার।
লক দিলেন অধিকার-রক্ষার রাষ্ট্রতত্ত্ব। কিন্তু অধিকার কার? লকের তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্রের ভিত্তি—এ কথা সত্য। কিন্তু তারও গভীরে আছে সমস্যা। তিনি দেখান—জীবন, স্বাধীনতা, সম্পত্তি হচ্ছে অপরিবর্তনীয় অধিকার।
কিন্তু লক দাসপ্রথাকে সমর্থন করেছিলেন। উপনিবেশবাদকে নৈতিকভাবে বৈধ মনে করতেন। এমনকি তিনি আমেরিকান উপনিবেশে দাসবাণিজ্যে বিনিয়োগ করেছিলেন। অতএব তার মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার—সকল মানুষের নয়; নির্দিষ্ট ইউরোপীয় সাদা প্রভুমহলের অধিকার।
লক মনে করেন সম্পত্তি সৃষ্টি হয় নিজের শ্রমকে প্রকৃতির সাথে মেলানোর মধ্য দিয়ে। কিন্তু—প্রকৃতি কার? পৃথিবী কি কখনো ownerless ছিল? ভূমিদখল কি শ্রমের বৈধ ফল? এ সব প্রশ্নের জবাব অনুপস্থিত। তার তত্ত্ব উপনিবেশবাদকে দার্শনিক বৈধতা দেয়। তার তত্ত্ব রাষ্ট্রকে সীমিত করতে গিয়ে সম্পত্তিকে প্রায় পবিত্র করে তোলে। ফলে রাষ্ট্র অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অসহায় হয়ে পড়ে।
লকের মতে, সরকারের উদ্দেশ্য হলো স্বাভাবিক অধিকার (natural rights)—জীবন, স্বাধীনতা, সম্পদ—রক্ষা করা। যদি সরকার এই অধিকার লঙ্ঘন করে, জনগণের সে সরকার উৎখাতের বৈধ অধিকার রয়েছে। এটি লকের রাজনৈতিক লিবারালিজমের ভিত্তি। কিন্তু অধিকার লঙ্ঘন কে নির্ধারণ করবে?
যদি জনগণই সিদ্ধান্ত নেয় যে সরকার অধিকার লঙ্ঘন করেছে, তবে প্রতিটি অসন্তোষই বিদ্রোহের কারণ হতে পারে। সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগে বা ভ্রান্ত তথ্যের ভিত্তিতে বিপজ্জনক অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে। অর্থাৎ পপুলার সভেরেন্টি কখনো কখনো মব সভেরেন্টিতে পরিণত হতে পারে।
যদি সরকারই নির্ধারণ করে যে, সে অধিকার লঙ্ঘন করছে কি না, তখন লকের তত্ত্ব নিজেই অর্থহীন হয়ে পড়ে। কারণ ক্ষমতা নিজেই নিজের অপরাধের বিচারক হয়ে যায়। যে বিচার সে নিজের বিরুদ্ধে কখনো করবে না। সব ইস্যুতে সে থাকতে চাইবে ন্যায়। যা স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি বাড়ায়। এটি শেষ বিচারে হবসের এবসোলুট সভেরিং–এর কাছে প্রত্যাবর্তন মাত্র।
লকের তত্ত্বে রাজ্যের বৈধতা নির্ণয়ের বিচারক কে? কে ঠিক করবে সরকার অধিকার লঙ্ঘন করেছে কি না?
এ প্রশ্নের উত্তর লকের কাঠামোয় স্পষ্ট নয়, এবং এই অস্পষ্টতাই, লিবারাল রাষ্ট্রের তাত্ত্বিক দুর্বলতা এবং আধুনিক সাংবিধানিক কাঠামোর প্রয়োজনীয়তার উৎস।
লক জনগণের ক্ষমতায়ন ও স্বৈরাচারবিরোধী চিন্তায় বিপ্লব ঘটালেও তার তত্ত্বে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো: government violates rights—এ কথা সত্য কি না তা নির্ধারণের জন্য তিনি কোনো নির্ভরযোগ্য জ্ঞানতত্ত্বীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক ফ্রেমওয়ার্ক দেননি। তার বিদ্রোহের অধিকার আদর্শিকভাবে আকর্ষণীয়। কিন্তু বাস্তবে—কে বিচারক?—এ প্রশ্নটি অনির্ধারিতই থেকে যায়।
রুশোর দৃষ্টিতে রাষ্ট্র নৈতিক পুনর্জন্ম। তিনি দেখান যে নাগরিকত্ব শুধু আইনি মর্যাদা নয়; বরং নৈতিক অংশগ্রহণ। যেখানে মানুষ নিজেকে সমষ্টির এক নৈতিক সত্তা হিসেবে আবিষ্কার করে। তিনি ব্যক্তিগত লাভের বদলে সমষ্টির কল্যাণে আনুগত্যের তত্ত্ব দেন। তার মতে, মানুষ তখনই মুক্ত, যখন সে নিজের বানানো আইনের অধীনে থাকে—এটি পরবর্তী যুগে কান্টের নৈতিক দর্শন থেকে শুরু করে রিপাবলিকানিজমেও গভীর প্রভাব ফেলেছে।
তার মতে, মানুষের জেনারেল উইল কখনো ভুল হতে পারে না। কিন্তু সমস্যা হলো জেনারেল উইল কে ব্যাখ্যা করবে? জনগণ কি সত্যিই সর্বদা সাধারণ ও সর্বজনীন ভালোকে বুঝতে পারে? না একটি দল নিজেদের ইচ্ছাকে জেনারেল উইল বলে চাপিয়ে দেবে?
ফরাসি বিপ্লবে রোবসপিয়ের (Robespierre) ও জ্যাকোবিনরা (Jacobins) দাবি করে—আমরাই জনগণের প্রকৃত ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করি। রোবসপিয়ের নিজেকে মনে করতেন—জনগণের নৈতিক কণ্ঠস্বর এবং জেনারেল উইলের রক্ষক। জনগণের নামে নিজেদেরকে তারা বিপ্লবী ন্যায়বিচারের প্রতীক সাব্যস্ত করে। তাদের নেতৃত্বে বিপ্লবী আদালত হাজার হাজার মানুষকে গিলোটিনে হত্যা করে।
জ্যাকোবিন শাসন ছিল সরাসরি জেনারেল উইলের নামে আত্মসিদ্ধ একনায়কতন্ত্র। রুশোর ভাষা ধার করে তারা বললো —
“জনগণ ভালো, তাই যদি কেউ গণবিপ্লবের বিরোধিতা করে—সে জনগণের শত্রু; তাকে শাস্তি দেওয়া ন্যায়।” এটাই হলো মুক্তির নামে অত্যাচারের সূচনা। জনগণের নামে জনগণের দমন এবং বিপ্লবী অনাচারের বৈধতা।
রুশো ব্যক্তিকে বলেন: স্বাধীন হতে হলে তোমাকে সাধারণ ইচ্ছার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। এটি আসলে এক প্যারাডক্স। হবস স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেন নিরাপত্তার নামে। রুশো স্বাধীনতা ছিনিয়ে নেন নৈতিকতার নামে। দুজনের পথ আলাদা হলেও—উভয়ে রাষ্ট্রকে মানুষের উপরে একটি নৈতিক-রাজনৈতিক দেবতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।
রুশোর মতে, মানুষ “ভালো”—কিন্তু সমাজ তাকে খারাপ করে। আসলেই কি তাই? এই বক্তব্য নৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হলেও দার্শনিকভাবে দুর্বল। কারণ—সমাজ মানুষকে যেমন তৈরি করে; তেমন মানুষও সমাজ গঠন করে। তাই উভয়কে অস্তিত্বগতভাবে বিচ্ছিন্ন করা যায় না। রুশো যে বিচ্ছিন্ন করলেন, তা এক ধরনের মানুষের আদিম নিষ্পাপতার রোমান্টিক মিথ।
এই আলাপে আমরা কী দেখছি? দেখছি, হবস, লক, রুশো—তিনজনই রাষ্ট্রের জন্মকে একটি কল্পিত ‘পূর্ব-রাষ্ট্রীয়’ অবস্থা থেকে উৎসারিত করেন। কিন্তু—এমন কোনো প্রাকৃতিক অবস্থা কখনোই ছিল না। রাষ্ট্র ধীরে ধীরে, অর্থনীতি-সমাজ-পরিবার-শক্তির জটিল বিকাশের মধ্যে জন্ম নেয়।
চুক্তির তত্ত্ব ফিলোসফারদের মানসিক কল্পনা, ইতিহাসের বয়ান নয়। তাদের তত্ত্ব ইউরোপকেন্দ্রিক এবং উপনিবেশবাদী। মানবতা বলতে তারা মূলত ইউরোপীয় মানুষকেই বোঝেন। তাদের তত্ত্বের সম্মতি মূলত এক রাজনৈতিক মায়া। বাস্তবে কোনো রাষ্ট্র কখনোই জনগণের পূর্ণ সম্মতি দ্বারা জন্মায়নি। রাষ্ট্র জন্মায়—সাধারণ প্রয়োজন থেকে, যুদ্ধ থেকে, জয়ের মাধ্যমে, কৃষির অগ্রগতি থেকে, অর্থনৈতিক কেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে এবং ধর্মীয়-রাজনৈতিক কর্তৃত্বের মিলনে।
সম্মতি হলো আধুনিক রাষ্ট্রের নিজস্ব বৈধতা নির্মাণের ভাষা। এটা রাষ্ট্র গঠনের প্রকৃত ভিত্তি নয়।
আমরা যদি চুক্তিতত্ত্বগুলোর দিকে তাকাই, দেখি—তিন ধরনের চুক্তি তিন ধরনের বিপদ তৈরি করে। হবসের তত্ত্বে আছে সর্বাধিপত্যের বৈধতার বিপদ। লকের তত্ত্বে আছে সম্পত্তি-কেন্দ্রিক অসমতার বৈধতা। রুশোর তত্ত্বে আছে সংখ্যাগরিষ্ঠের নৈতিক কর্তৃত্বের বৈধতা।
তাদের তত্ত্ব কয়েকটি গুরুতর প্রশ্নের সামনে আমাদের খাড়া করে। আমাদের ভাবতে হয়—
১. রাষ্ট্র কি আমাদের ভয়ের ফসল?
হবস দেখান রাষ্ট্র মানুষের ভয়ের সন্তান।
কিন্তু এটি আংশিক সত্য। রাষ্ট্র ভয়ের সন্তান, আশার সন্তান, সংঘর্ষের সন্তান, সহাবস্থানের সন্তান, নেতৃত্বের প্রয়োজনের সন্তান এবং ক্ষমতার সংগঠনের সন্তান।
২. রাষ্ট্র কি আমাদের স্বাধীনতার রক্ষক?
লক মনে করেন, রাষ্ট্র আমাদের স্বাধীনতার রক্ষাকবচ।
কিন্তু রাষ্ট্র একইসাথে স্বাধীনতার রক্ষক ও আবার স্বাধীনতা হরণকারীও, অন্তত স্বাধীনতাকে সে নিজস্ব প্রকরণে সীমাবদ্ধ তো করেই।
৩. রাষ্ট্র কি আমাদের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন?
রুশো দাবি করেন, রাষ্ট্র মানুষের সাধারণ ইচ্ছার প্রতিফলন।
কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে—সাধারণ ইচ্ছা ক্ষমতাশালী গোষ্ঠীর সুবিধার ভাষায় রূপান্তরিত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রে রূপান্তরিত হয়।
বস্তুত রাষ্ট্র কোনো একক অনুভূতি বা একক উদ্দেশ্যের জাতক নয়। সে মানবসমাজের জটিল, বহুস্তরীয়, ক্ষমতাভিত্তিক, অর্থনৈতিক, নৈতিক এবং প্রতীকী নির্মাণ।
সামাজিক চুক্তি-তত্ত্বগুলোর দুর্বলতা হলো—তারা রাষ্ট্রের জন্মকে অতিসরলীকৃত করে, কল্পনাপ্রসূত ‘প্রাকৃতিক অবস্থা’ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চায়।
রাষ্ট্রের প্রকৃতি বুঝতে হলে, আমাদের দেখতে হয়—ইতিহাসের শক্তি, অর্থনীতির গঠন, জ্ঞানের রাজনীতি, নৈতিকতার বিবর্তন, মানবসত্তার সমষ্টিগত ভয়, আশা ও স্বপ্ন। রাষ্ট্র একদিনে তৈরি হয়নি; এটি মানবসভ্যতার ক্রমাগত চাপ, সংঘর্ষ, ধ্বংস, পুনর্গঠন এবং অভিজ্ঞতার ফসল। গোত্র থেকে তৈরি হয়েছে নগররাষ্ট্র, রাজতন্ত্র থেকে গড়ে উঠেছে সাম্রাজ্য, সাম্রাজ্য থেকে তৈরী হয়েছে জাতিরাষ্ট্র, জাতিরাষ্ট্র থেকে এসেছে আধুনিক ডেমোক্রেটিক রাষ্ট্রের বাস্তবতায়। প্রতিটি ধাপ নির্মাণে ভূমিকা রেখেছে যুদ্ধ ও শান্তি, বিশ্বাস ও ধর্ম, প্রযুক্তিগত বিপ্লব, আইনগত উদ্ভাবন ও সভ্যতার পরিবর্তন। অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো ইতিহাসের বিরাট চাপের নিচে জন্ম নেয়া এক বিবর্তিত কাঠামো।
রাষ্ট্র সবসময়ই অর্থনীতির উপর নির্ভরশীল। অর্থনীতি নির্ধারণ করে—করব্যবস্থা, সামরিক শক্তি, প্রশাসনিক আকার, জনগণের শ্রেণিগত সম্পর্ক এবং রাষ্ট্রের কল্যাণ বনাম দমন । রাষ্ট্র যতোটা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, ততোটাই অর্থনৈতিক বাস্তবতার সংগঠিত রূপ।
রাষ্ট্র টিকে থাকে “জ্ঞান” নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে। জ্ঞান মানে—আইন, ইতিহাস, শিক্ষা, বিজ্ঞান, ধর্মীয় ব্যাখ্যা, মিডিয়া ডিসকোর্স ইত্যাদি।
প্রতিটি রাষ্ট্র রাষ্ট্রক্ষমতার জালে জ্ঞান তৈরি করে, এবং জ্ঞান দিয়ে ক্ষমতা বজায় রাখে। রাষ্ট্রের ভেতরে রয়েছে জ্ঞানতত্ত্বীয় পাওয়ার; জ্ঞান উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা। রাষ্ট্র তাই ঠিক করতে চায় কোন জ্ঞান বৈধ আর কোনটা অবৈধ। এর মধ্য দিয়ে সে নিজের বৈধতা তৈরি করতে সচেষ্ট হয়।
রাষ্ট্রকে বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হয় মানুষের নৈতিকতা সময়ের সাথে কীভাবে বিবর্তিত ও বিকশিত হয়েছে। একসময় রাজাকে ঈশ্বরপ্রদত্ত শাসক মনে করা হতো। তারপর সেই সময় এলো, যখন রাজাকে জনগণের সেবক ভাবা হতো বা হয়।
এই নৈতিক পরিবর্তন রাষ্ট্রের প্রকৃতি বদলে দিয়েছে। স্বৈরাচারী ব্যবস্থা থেকে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রে, পশ্চিমা সামন্ততন্ত্র থেকে পশ্চিমা গণতন্ত্রে, গীর্জার কর্তৃত্ব থেকে অধিকারের রাজনীতিতে, দমনমূলক আইন থেকে অধিকারভিত্তিক আইনে বিবর্তিত করেছে। রাষ্ট্র তাই নৈতিকতার পরিবর্তিত মানদণ্ডের সঙ্গে চলমান এক নৈতিক বিবর্তন।
রাষ্ট্রের কাঠামোগত রূপদর্শনের পাশাপাশি এটাও দেখতে হবে যে, রাষ্ট্র শুধু কাঠামো নয়। রাষ্ট্র মানুষের গভীরতম মানসিক অভিজ্ঞতার প্রতিফলন। মানুষ সবসময় ভয় পায়। মৃত্যুকে, বিশৃঙ্খলাকে, নিরাপত্তাহীনতাকে, বাহ্যিক শত্রুকে, অর্থনৈতিক অভাবকে ভয় পায় মানুষ। এ জন্য মানুষ রাষ্ট্রকে চায়—নিরাপত্তার জন্য, শৃঙ্খলার জন্য, ন্যায়প্রতিষ্ঠার জন্য, সুরক্ষার জন্য এবং বিশেষ পরিচয়ের জন্য।
মানুষ একদিকে ভয় পায়, অপরদিকে আশায় চালিত হয়। মানুষ আশা করে—স্বাধীনতা, মর্যাদা, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি। রাষ্ট্র এই ভয় ও আশার দ্বন্দ্বের ওপর গড়ে ওঠে। এটি মানুষের সমষ্টিগত মনের প্রতিরক্ষা-ব্যবস্থা। অর্থাৎ রাষ্ট্র হলো মানুষের—সামাজিক অবচেতন এবং সমষ্টিগত কল্পনার বাস্তব রূপ।
রাষ্ট্র শুধু চুক্তি নয়—এটি মানুষের ক্ষমতা, কল্পনা এবং সংঘর্ষের দীর্ঘ বিবর্তনধর্মী পরিণতি। কারণ—রাষ্ট্র টিকে আছে ক্ষমতার সমঝোতায়। শাসক, আমলা, জনগণ, শক্তিশালী শ্রেণি, আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে দীর্ঘ ঐতিহাসিক সমতার উপর রাষ্ট্র দাঁড়িয়ে থাকে। রাষ্ট্র টিকে আছে মানুষের মনে, কল্পনায়। জাতি, পতাকা, সংবিধান, পরিচয়—এগুলো বস্তু নয়; মানুষের মনেই এগুলোর জন্ম। রাষ্ট্র টিকে আছে সংঘর্ষের ফল হিসেবে। যুদ্ধ, বিপ্লব, বিদ্রোহ, আন্দোলন, সংস্কার—সব একত্রিত হয়ে রাষ্ট্রের রূপ নির্ধারণ করেছে।
রাষ্ট্রকে অধ্যয়ন মানে কেবল রাজনৈতিক তত্ত্ব অধ্যয়ন নয়। বরং রাষ্ট্র হলো মানবসভ্যতার ইতিহাস, অর্থনীতি, জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিক ভয় এবং সমষ্টিগত আশার সম্মিলিত প্রকাশ।
যে রাষ্ট্র নিজেকে জনগণের বলে দাবি করে, তাকে সবচেয়ে জোরালোভাবে জনগণকেই জিজ্ঞাসা করতে হবে—আমি কি সত্যিই আপনাদের হতে পেরেছি?