বাহাদুর শাহ জাফর—শেষ মোঘল সম্রাট, কবি ও দরবেশ। পূর্ণ নাম আবুল মোজাফফর সিরাজুদ্দিন মুহাম্মদ বাহাদুর শাহ গাজী—২৪ অক্টোবর ১৭৭৫-৭ নভেম্বর ১৮৬২। ভারতবর্ষের যুগসন্ধিক্ষণে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেন। চারদিকে তখন ভাঙনের দিন। বিরাট সাম্রাজ্য ভাঙতে ভাঙতে এসে ঠেকেছে লালকেল্লার দেওয়ালে। সামনে ঐতিহাসিক লাহোর গেট আর পেছনে যমুনা নদী।
এমতাবস্থায় ঢাল-তলোয়ারহীন, কেবল মুকুট পরা বাদশাহ তার চারপাশের সমস্ত কিছুর প্রতি নিরাশ হয়ে নিজের জন্য বেছে নিলেন শের-শায়েরি, মুশায়রা-মেহফিল। এর মাধ্যমে তিনি ভুলে থাকতেন রাজ্য হারানোর বেদনা। রাজারা তাদের দরবারে ডাকেন সেনাপতি-সিপাহিদের, তিনি ডাকলেন দিল্লির কবি, শিল্পী ও সংগীতজ্ঞদের। তাঁর কোনো ওজির নেই, কিন্তু আছে কবিগুরু, সভাকবি—প্রথমে শেখ ইবরাহিম যওক, তারপর মির্জা গালিব। তাঁর দরবারে আসর বসত হিন্দুস্তানের সবচেয়ে বড়ো মুশায়রার। তাই বলা যায়, বাহাদুর শাহ জাফর যতটা না শাসক ছিলেন, তার অধিক ছিলেন একজন কবি এবং পরিপূর্ণ শিল্পে উন্মোচিত সাধক। ছিলেন একজন দরবেশ।
মির্জা গালিব তাঁকে নিজামুদ্দিন আউলিয়ার সঙ্গে উপমা দিয়ে বলেন—
মিলে দো মুরশিদোঁ কো কুদরতে হক্ সে দো তালিব
নিজামউদ্দিন কো খুসরু, সিরাজউদ্দিন কো গালিব
কুদরতের তরফে দুই মুরশিদের ভাগ্যে জুটেছিল দুজন শিষ্য
নিজামউদ্দিনের ভাগ্যে খুসরু আর সিরাজউদ্দিনের গালিব।
বাহাদুর শাহ জাফর বাদশাহ ছিলেন নামেমাত্র। হিন্দুস্তান তখন জালের মতো ছড়িয়ে পড়েছে ইংরেজ আধিপত্যে। মোগলীয় হুকুমাতের সূর্যটি লালিমা ছড়িয়ে অস্ত যাচ্ছে ভারতবর্ষের দিগন্তে। দিল্লিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে কলকাতা হলো ব্রিটিশ ভারতের নতুন রাজধানী। সর্বত্র আইন-আদালত ও প্রশাসন চলছে ব্রিটিশ নিয়মে। মোগল বাদশাহ কেল্লার ভেতর যাপন করছেন একপ্রকার পেনশনের জীবন।
শাসক হিসেবে না হলেও দিল্লির শিল্প-সংস্কৃতির তিনি প্রতিভূ হয়েছিলেন। তাঁর দরবারে ছিল কবিতা, সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পের চর্চাকেন্দ্র, যা তখন সমৃদ্ধ করেছিল উর্দু সাহিত্যের স্বর্ণযুগকে। রাজকার্যের ব্যস্ততা যখন নেই, তখন দিল্লির সাহিত্যিক মহলে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন সমকালের একজন পরিশীলিত উর্দু ও ফারসি কবি হিসেবে। জাফরের যুগে উর্দু কবিতার মূল সুর ছিল ব্যক্তিগত বিরহ ও বেদনার উদযাপন।
আঠারো শতকে মীর তাকি মীর, মির্জা রফি সওদা ও খাজা দেহলভি এবং উনিশ শতকে মির্জা গালিব, বাহাদুর শাহ জাফর, শেখ ইবরাহিম যওক, ফজলে হক খায়রাবাদি, মোমিন খাঁ মোমিন ও আলতাফ হোসেন হালি প্রমুখ কিংবদন্তি কবি সকলেই প্রেম ও হৃদয়ঘটিত বেদনার চর্চা করেছেন তাঁদের শের ও গজলে। এর মধ্যে বাহাদুর শাহ জাফর ছিলেন খানিক ব্যতিক্রম। তাঁর কবিতায় যে বিরহ-বিষণ্ণতার করুণ সুর, তা ছিল না কেবল ব্যক্তিগত উৎস থেকে—বরং কয়েকশো বছরের সাম্রাজ্যের পতন এবং একটি শহরের ভেঙে পড়ার আওয়াজ তাঁর কবিতায় ধ্বনিত হয়েছে প্রকটভাবে।
আঠারোশো সাতান্নর স্বাধীনতা যুদ্ধের ব্যর্থতার পর জাফর যখন দিল্লির যমুনা গেট দিয়ে পালিয়ে যান, সেদিন তাঁর সঙ্গে পালিয়েছিল তিনশো বছরেরও অধিক একটি সাম্রাজ্যের সমস্ত অহম ও প্রতাপ। প্রথমে দরগায়, তারপর হুমায়ুনের সমাধিতে আশ্রয় নিলেন। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। গোরা সৈন্যরা তাঁকে আলোহীন সমাধি থেকে গ্রেফতার করে আনে। কেল্লায় বন্দী করে।
দুই পুত্র মির্জা মুঘল ও মির্জা খিজির সুলতানের কর্তিত মস্তক একটি তশতরিতে করে বাদশাহর কাছে উপহার পাঠায় নৃশংস ইংরেজ অফিসার। গোটা দিল্লি শহর তখন বাবুই পাখির বাসার মতো ফাঁসির রশিতে ঝুলছিল। আরও যে কত নির্মমতার ইতিহাস। শেষে বাদশাহর নামে মামলা হলো। আগে যেখানে দিওয়ানে আমের সিংহাসনে বসে খোদ বাদশাহ বিচার করতেন অন্যদের, সেখানে তাঁর বিরুদ্ধেই বসানো হলো ইজলাস। চার মাস বিচার চলার পর নির্বাসনের রায় হলো। বিদ্রোহের পরের বছর আঠান্ন সালে দিল্লি থেকে জাহাজে করে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে নির্বাসিত জীবনে প্রায়ান্ধকার একটি কক্ষে বসে লিখেছেন এইসব কালজয়ী শের-গজল। আঠারোশো বাষট্টি সনে তিরাশি বছর বয়সে পক্ষাঘাতে মৃত্যুবরণ করেন।
একশো বছরেরও বেশি সময় তাঁর কবরের খোঁজ মেলেনি। ব্রিটিশরা কোনো নামচিহ্ন রেখে যায়নি। অতঃপর বিশ শতকের শেষের দিকে একটি নির্জন ও ছায়াসুনিবিড় জংলায় সন্ধান হয় কবরের। শতাব্দীর কালি ও ধূলি সরিয়ে আবার তিনি জাগলেন। এখন বাহাদুর শাহ জাফরের হয়ে কথা বলছে কেবলই ইতিহাস, আর তাঁর লেখা শের ও গজল।
১.
না কিসি কি আঁখ কা নূর হুঁ
না কিসি কে দিল কা কারার হুঁ
জো কিসি কে কাম না আ সকে
ম্যায় ও এক মুশ্তে-গুবার হুঁ
কারো চোখের আলো নই আমি
নই কারো চোখের মণি
কোনো উপকারেই যে আসে না
আমি সেই একমুঠো ধুলো।
না তো ম্যায় কিসি কা হাবীব হুঁ
না তো ম্যায় কিসি কা রকীব হুঁ
জো বিগড় গয়া ও নসীব হুঁ
জো উঝড় গয়া ও দয়ার হুঁ
আমি কারো প্রেমিক নই
কারো শত্রু নই
আমি এক ভেঙে পড়া নিয়তির প্রতীক
আমি সেই শহর যা উজাড় হয়ে গেছে।
মেরা রঙ-রূপ বিগড় গয়া
মেরা ইয়ার মুঝসে বিচড় গয়া
জো চমন খিযাঁ মে উঝড় গয়া
ম্যায় উসিকা এক বহার হুঁ
আমার সৌন্দযে কালি পড়ে গেছে
বন্ধুরা ছেড়ে গেছে
হেমন্তের খরায় বিরান হয়ে গেছে যে বাগান
আমি সেই বাগানের ফুল।
না মাজার হ্যায় না কাফন মিলা়
না কিসি কা ছাঁয়া-এ-তন মিলা়
জো গিরা থা রাস্তে মে জ়ফর
ম্যায় ওহি লাওয়ারিস মাজার হুঁ
না কবর হয়েছে না কাফন
না পেয়েছি প্রিয়জনের ছায়া
যে পড়ে ছিল পথের পাশে জাফর
আমি সেই লা-ওয়ারিশ মাজার।
পঢ়কে ফাতেহা কোঈ আয়ে কিউ
কোঈ চারে ফাল ছড়ায়ে কিউ
কোঈ শমা জ্বালায়ে কিউ
ম্যায় ওহ বেকসী কা মাজার হুঁ
কেন ফাতেহা পড়তে আসবে কেউ
কেন আসবে ফুল দিতে
কেন এসে জ্বালাবে দিয়া
আমি যে এক অসহায় সমাধি।
২.
বুলবুল কো বাগবাঁ সে না সাইয়্যাদ সে গিলা
কিসমত মেঁ কায়েদ লিখি থি ফসল-এ-বাহার মেঁ
বুলবুলের অভিমান নেই মালী ও শিকারির প্রতি
বসন্তের ফুলবাগানেই ছিল বন্দী তার নিয়তি।
লাগতা নাহিঁ হ্যায় দিল মেরা উজড়ে দয়ার মেঁ,
কিসকি বনী হ্যায় আলমে-না-পায়েদার মেঁ?
উজাড় হয়ে যাওয়া এ দুনিয়ায় আমার মন বসে না
কে-ই-বা চিরস্থায়ী হয়েছে এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ায়?
৩.
জিগর পর দাগ, লব পর দোদ-এ-দিল, ঔর আশ্ক দামান মে
তেরি মহফিল সে হাম মানিন্দ-এ-শমা সুবহ-দম নিখলে
হৃদয়ে ক্ষত, ঠোঁটে বেদনার ধোঁয়া আর আঁচলভরা অশ্রু নিয়ে যখন তোমার
আসর থেকে বেরোলাম, নিজেকে আমার মনে হলো ভোরের নিভে যাওয়া প্রদীপ।
৪.
সুফিয়োঁ কে জো ন থা লায়েক-এ সোহবৎ
তো মুঝে কাবিল-এ জলসা-এ রিন্দানা বনায়া হোতা
সুফিদের মজলিসে বসার যোগ্য বানালে না যখন
পানশালার আসরে মাতালদের সঙ্গী বানাতে!
৫.
শুমার ইক শব কিয়া হামনে যা আপনে দিল কে দাগোঁ সে
তো আঞ্জুম চরখ-এ-হাশ্তম কে বহুৎ সে উন সে কম নিখলে
এক রাতে আমার হৃদয়ের ক্ষতগুলি গুণে দেখেছি
আসমানের সবকটি তারাও ছিল এর অনেক কম।
৬.
উমর-এ দরাজ মাঙ্গ কার লায়ে থে চার দিন
দো আরজু মে কাট গায়ে দু ইনতেজার মে
চেয়ে এনেছি তোমার কাছে চারদিনের আয়ু
দুদিন কেটে গেছে আশায় আর দুদিন অপেক্ষায়।
৭.
ইয়ার থা গুলজার থা বাদ-এ-সবা থি মেঁ না থা
লায়েক-এ-পাবোস-এ-জানাঁ কেয়া হিনা থি মেঁ না থা
বন্ধু ছিল, ফুলবাগান ছিল, ভোরের বাতাস ছিল শুধু আমিই ছিলাম না
মেহেদি পাতার মতো কি আমি যোগ্য ছিলাম প্রিয়ার পা ছোঁয়ার?
৮.
তুম নে কিয়া না ইয়াদ কবি ভুল কর হমেঁ
হম নে তুমহারি ইয়াদ মেঁ সব কিছু ভুলা দিয়া
তুমি ভুলেও আমাকে একবার মনে করলে না
আর আমি তোমাকে মনে করতে করতে সব ভুলে গেছি।
মঙ্গা-ঈ থী তেরী তসবীর দিল কী তসকাঁ কো
মুঝে তো দেখতে হী অউর ইজতিরাব হুয়া
মনের শান্তির জন্য চেয়ে এনেছিলাম তোমার একটি ছবি
এখন তোমাকে দেখে আমার মন হয়েছে আরো বেচাইন।
৯.
হ্যায় বহুত দুশওয়ার মরনা যে সুনা করতে থে হাম
পর জুদাই মেঁ তিরি হাম নে যা দেখা সহ্ল হ্যায়
আগে জানতাম মরে যাওয়াটা ভীষণ কষ্টের
তোমার চলে যাওয়ার পর মনে হলো এ খুবই সহজ!
শামা নে জল কর জলায়া বজ্ম মেঁ পরওয়ানে কো
বিন জলে আপনে জলানা কেয়া কিসি কা সহ্ল হ্যায়
শামা রাতভর জ্বলতে জ্বলতে প্রজাপতিকে জ্বালায়
নিজে না পুড়ে অন্যকে পোড়ানো বড্ড কঠিন
১০.
কিতনা বদনসিব জাফর দাফন কে লিয়ে
দো গজ জামিন ভি না মিলি কুয়ে ইয়ার মে
কতোই না হতভাগা জাফর
সমাধির জন্য দুই গজ মাটিও পেল না প্রিয়ার গলিতে।