কবিতা : হৃদয়ের সুন্দরতম প্রকাশ

জুবায়ের রশীদ

‘বালাগাল উলা বি-কামালিহি

কাশাফাদ্দুজা বি-জামালিহি

হাসুনাত জামি-উ খিসালিহি

সাল্লু আলায়হি ওয়া আলিহি’

কবিতা ভালোবাসতেন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অনুরাগ ছিল তাঁর কবি ও কবিতার প্রতি। বস্তুত এমন একটি সময়ে তিনি জন্মেছেন যখন আরবের বালুকনায় শনৈ শনৈ বেজে উঠছিল কাব্য ও সাহিত্যের অনুরণন। শিল্পচর্চার সে এক সময় ছিল আরবে। সেকালের অনেক কবি হাজার বছর পেরিয়ে আজও ভাস্বর হয়ে আছে স্বমহিমায়। বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে তারা চিরায়ত ও অবিস্মরণীয়। 

তিনি কবি নন নবি হয়ে এসেছিলেন। তাঁর এক হাতে ছিল সত্য ও সুন্দরের পুষ্পস্তবক, আরেক হাতে ছিল মিথ্যা ও কলুষ মূলোৎপাটনের শানিত তরবারি। স্বভাবতই কবিতার বাতাস তখন গায়ে মেখেছে রাসুলের। কিন্তু কবিতা রচনায় মনোনিবেশ করেননি আর এটা সংগতও ছিল না তাঁর জন্য। কবুয়ত দূরে ঠেলে আঁকড়ে ধরেছেন নবুয়ত। কারণ তিনি যদি কবিতাচর্চা করতেন তাহলে সে সময় ওহি মারফত যে পাক কুরআন অবতীর্ণ হচ্ছিল তাঁর ওপর, দুটির মাঝে লোকে পার্থক্য করতে পারত না। উপরন্তু কুরআনের প্রাথমিক কিছু আয়াত শুনে মক্কার কাফেররা তাঁকে কবি বলে আখ্যায়িত করতে শুরু করেছিল এবং কুরআনকে বলতে শুরু করেছিল কবিতা। তখন পুনরায় ওহি অবতীর্ণ করে আল্লাহ শুনিয়ে দিলেন, ‘আমি রাসুলকে কবিতা শিক্ষা দিইনি, এবং এটা তাঁর জন্য শোভনীয়ও নয়।’[1]সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৬৯ 

তবে রাসুল কবিতাচর্চা না করলেও কবিতার অনুরাগী ছিলেন এবং কবিদের ছিলেন পৃষ্ঠপোষক। কবিতার সমালোচনা করেছেন। ভালো কবিতার প্রশংসা করেছেন। মন্দ কবিতার নিন্দা করেছেন।

রাসুলের প্রিয় কবি ছিলেন লাবিদ। এই আরব কবির কবিতার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, ‘কবিরা যেসব কথা বলেছেন, তার মধ্যে কবি লাবিদের কথাটিই সর্বাধিক সত্য। (সে বলেছে) শোনো! আল্লাহ ছাড়া সবকিছুই বাতিল।’[2]সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৪৭

মহান আল্লাহ রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যে সত্য ও নীতি-আদর্শ দিয়ে প্রেরণ করেছেন সে আলোকে তিনি কবিতার চূড়ান্ত মানদণ্ড নিরূপণ করে দিয়েছেন এবং কবিদের দিয়েছেন মৌলিক নির্দেশনা। ইসলাম সমস্ত সত্য-সুন্দরকে স্বীকৃতি দিয়েছে। অনুরূপ কবিতাকেও। বলেছেন, ‘কবিতা কথারই মতো। রুচিসম্মত কবিতা উত্তম কথাতুল্য এবং কুরুচিপূর্ণ কবিতা অমার্জিত কথাতুল্য।’[3]আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৮৭৩ 

মন্দ কবিতা প্রত্যাখ্যান করে রাসুল বলেছেন, ‘তোমাদের কারও পেট কবিতা দিয়ে ভরার চেয়ে পুঁজে ভরা অনেক ভালো।’[4]সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৫৪ অনুরূপভাবে সুন্দর ও জ্ঞানগর্ভ কবিতার স্বীকৃতি দিয়ে বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই কোনো কোনো কবিতায় রয়েছে জ্ঞানের কথা।’[5]সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৪৫

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ শুআরা (যার অর্থ হলো কবিগণ) নামে একটি সুরা অবতীর্ণ করেছেন। সেখানে কবিদের সমালোচনা করা হয়েছে। পরবর্তীতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্পষ্ট করে দিলেন যে, কুরআনের এই সমালোচনা তাদের জন্য যারা কবিতার নামে মন্দচর্চা করে। ইবনে ইসহাক বর্ণনা করেন, সুরা শুআরার ২২৪-২২৬ নং আয়াত যখন অবতীর্ণ হলো, যেখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে। তুমি কি দেখো না, তারা প্রতি ময়দানেই উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে ঘুরে ফেরে এবং এমনসব কথাবার্তা বলে যা তারা করে না?’ তখন প্রসিদ্ধ তিন সাহাবি কবি হাসসান ইবনে সাবেত (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ও কাব ইবনে মালেক (রা.) কাঁদতে কাঁদতে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট উপস্থিত হলেন। উৎকণ্ঠিত স্বরে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আল্লাহ যখন এ আয়াত অবতীর্ণ করেছেন তখন তো অবশ্যই তিনি জেনেছেন যে, আমরা কবি। তখন রাসুল আয়াতের পরবর্তী ও ব্যতিক্রমী অংশটি তাদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যেখানে আল্লাহ বলেছেন, ‘তবে তাদের কথা ভিন্ন যারা ইমান আনে ও নেক আমল করে এবং আল্লাহকে খুব স্মরণ করে।’ রাসুল বললেন, এই হচ্ছ তোমরা।[6]তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/৩৫৪ 

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কবিতার চর্চা করেননি সত্য, কিন্তু সময়টি যেহেতু কবিতার ছিল তাই তুমুল কোনো অনুভূতির সময় তিনিও ছন্দবদ্ধ কবিতা বলে উঠতেন। কবিতা হলো হৃদয়ের সুন্দরতম প্রকাশ। রাসুলও তা কখনো প্রকাশ করেছেন। উহুদ যুদ্ধের রক্তঝরা উত্তাল সময়ে এক পাথরের আঘাতে রাসুলের আঙুল মুবারক থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে পড়ে রক্ত। তখন সে রক্তের দিকে চেয়ে তিনি বলেছেন স্বরচিত এই পঙ্‌ক্তি ‘হাল আনতি ইল্লা ইসবাউন দামিতি/ওয়া ফি সাবিলিল্লাহি মা লাকিতি।’ (হে আঙুল! তুমি তো একটি আঙুলমাত্র। আল্লাহর পথে রক্তপ্রবাহে দুঃখ ও অনুশোচনা কীসের!)

হুনাইন যুদ্ধে শত্রুরা যখন রাসুলের দিকে ধেয়ে আসছিল তখন তাদের প্রতিরোধে দাঁড়িয়ে প্রবল সাহসে তিনি বললেন, ‘আনান নাবিয়ু লা কাযিব/আনাবনু আবদিল মুত্তালিব।’ (আমি নবি, মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।)[7]সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৪৬৪

রাসুল কাজ ও কর্মব্যস্ততার ফাঁকে কবিতা শুনতে পছন্দ করতেন। এমনকি মসজিদে নববিতে বসেও সাহাবিদের মুখে কবিতা শুনেছেন। জাবির ইবনে সামুরা (রা.) বলেন, ‘আমি শতাধিকবার নবিজির সঙ্গে মসজিদে সাক্ষাৎ করেছি। তাঁর সাহাবিরা কবিতা আবৃত্তি করতেন এবং জাহেলি যুগের কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতেন। তখন কখনো কখনো রাসুল তাঁদের সঙ্গে মুচকি হাসতেন।’[8]সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৫০

সফরে বের হলে চলার সময় পথের ক্লান্তি দূর করার জন্য রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁর সঙ্গীদের কবিতা আবৃত্তি করতে বলতেন। আমর ইবনে শারিদ (রা.) বলেন, ‘একদিন আমি নবিজির বাহনে সফরসঙ্গী হলাম। তিনি বললেন, তোমার স্মৃতিতে (কবি) উমাইয়া ইবনে আবু সালতের কোনো কবিতা আছে? আমি বললাম, হ্যাঁ আছে। তিনি বললেন, পড়ো। আমি একটি পঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করে শোনালাম। তিনি বললেন, বলতে থাকো, তখন আমি তাঁকে আরও একটি পঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করে শোনালাম। তিনি পুনরায় বললেন, বলতে থাকো। শেষ অবধি আমি তাঁকে একশ পঙ্‌ক্তি আবৃত্তি করে শুনিয়েছি।’[9]সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৭৭৮

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয়তমা স্ত্রী আয়েশা (রা.) ভীষণ কবিতাপ্রেমী ছিলেন। অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল তাঁর। তিনি নিজেই একবার বলেছেন, ‘আল্লাহ (কবি) লাবিদের ওপর রহম করুন! আমি তার এক হাজার কবিতা মুখস্থ করেছি। হায়, সে যদি আমাদের সময়ে বেঁচে থাকত!’[10]আস সায়্যিদাতু আয়েশা উম্মুল মুমিনিন ওয়া আলিমাতু নিসায়িল ইসলাম : ২২৬ রাসুল আয়েশা (রা.) এর মুখে কবিতা শুনে আনন্দিত হতেন এবং বেশি বেশি তাঁর মুখ থেকে কবিতা শুনতে চাইতেন।[11]ইজলাউল হাকিকাতি ফি সিরাতি আয়েশা সিদ্দিকা : ৬৩ এমনই একটি মুহূর্তের কথা আয়েশা (রা.) স্বয়ং বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘একদিন আমি বসে সুতা কাটছিলাম। রাসুল জুতা সেলাই করছিলেন। গরমে তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছিল। দূর থেকে তা আলোর ন্যায় চিকচিক করছিল। আমি অপলক রাসুলের কপালের দিকে চেয়ে থাকি, আর তাঁর সৌন্দর্যে অভিভূত হই। অতঃপর বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! (কবি) আবু বকর হাজালি যদি আজ আপনাকে দেখত, তাহলে অবশ্যই সে বলত, আপনিই তাঁর কবিতায় ব্যবহৃত শব্দরাজির একমাত্র উপযুক্ত ব্যক্তি। কী মোহন তাঁর কবিতা—

ومبرأ من كل غبر حيضة و فساد ومرضعة وداء مغيل

واذا نظرت الى أسرة وجهه برقت بروق العارض المتهلل

‘মাতৃজঠরের দুর্গন্ধ ও দুগ্ধদানকারিণী জননীর সমস্ত রোগব্যাধি থেকে সে নির্মল-পবিত্র। যখন তুমি তার মুখাবয়বের দিকে প্রেমময় দৃষ্টিতে তাকাবে মনে হবে তা যেন (শ্রাবণের) ঘন মেঘের আড়ালে গাঢ় বিদ্যুতের চমক।’[12]হিলয়াতুল আউলিয়া : ২/৪০

কবিতা শুনে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেমন মুগ্ধ হতেন, মুচকি হাসতেন, তেমনই কবিতায় ভুল ও অন্যায্য কিছু থাকলে সংশোধন করে দিতেন। সাহাবি রুবাই বিনতে মুআব্বিজ (রা.) বলেন, ‘আমার বিয়ের সময় রাসুল আমার কাছে এলেন। তখন দুটি বালিকা বদর যুদ্ধে নিহত আমার পিতৃপুরুষের কীর্তিগাথা গাইছিল। গাইতে গাইতে একপর্যায়ে তারা বলল, আমাদের মধ্যে এমন একজন নবি আছেন, যিনি আগামীকালের খবরও জানেন। তা শুনে রাসুল বলেন, তোমরা এমন কথা বোলো না।’[13]সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৯৭

রাসুল কবিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন। সাহাবিদের মধ্যে সবচেয়ে বড় কবি ছিলেন হাসসান ইবনে সাবেত (রা.)। তিনি মুখাযরামি (জাহেলি ও ইসলাম উভয় যুগের) কবি ছিলেন। রাসুল তাঁর জন্য মসজিদে নববিতে একটি মিম্বর তৈরি করে দিয়েছিলেন যার ওপর দাঁড়িয়ে তিনি কবিতা পড়তেন। কবিতার মাধ্যমে তিনি কাফেরদের কবিতার জবাব দিতেন। হাসসান ইবনে সাবিত (রা.) রাসুলের প্রশংসায় অনেক কবিতা লিখেছেন। সে কবিতাগুলো এতই সমৃদ্ধ ছিল যে, আয়েশা (রা.) একবার রাসুলের পরিচয় দিতে গিয়ে বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ তেমনই ছিলেন যেমনটি হাসসান ইবনে সাবেত বলেছেন।’[14]উসদুল গাবাহ : ২/৪

হাসসান ইবনে সাবেত (রা.)-এর কাব্যশক্তি এবং ইসলামের জন্য তাঁর কবিতার সুষম ব্যবহার কী গভীর ও উচ্চাঙ্গের ছিল তা একটি ঘটনা থেকে প্রতীয়মান হয়। নবম হিজরিতে আরবের বিখ্যাত গোত্র বনু তামিমের ৭০ বা ৮০ জনের একটি প্রতিনিধিদল মদিনায় আসে। তাদের মধ্যে বনু তামিমের যিবিরকান ইবনে বদরের মতো বিখ্যাত কবি এবং উতারিদ ইবনে হাজিবের ন্যায় তুখোড় বক্তাও ছিল। ইতোমধ্যে গোটা আরবে ছড়িয়ে পড়েছে ইসলামের জ্যোতি। এর আগের বছর বিজিত হয়েছে মক্কা। মুসলমানদের প্রভাব ও প্রতিপত্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপরদিকে জনসংখ্যা, শক্তি ও মর্যাদায় আরবে তখন বনু তামিমের শক্তি ও দাপট তুঙ্গে। তারা ভয় পায় না কাউকে। চোখে চোখ রেখে কথা বলতে কুণ্ঠিত হয় না। মদিনায় এসে তারা আরবের প্রথানুযায়ী রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলল, হে মুহাম্মদ! আমরা এসেছি আপনার সাথে গর্ব ও গৌরব প্রকাশের প্রতিযোগিতা করতে। আপনি আমাদের কবি ও বক্তাদের বলার অনুমতি দিন। রাসুল অনুমতি দিলেন। বনু তামিমের পক্ষ থেকে তাদের শ্রেষ্ঠ বক্তা উতারিদ ইবনে হাজিব শানিত ভাষায় তেজস্বী বাগ্মিতা এবং শ্রেষ্ঠ কবি যিবিরকান ইবনে বদর স্বরচিত কাসিদা পাঠ করে বনু তামিমের গৌরব ও কীর্তি তুলে ধরল। তারপর আসল মদিনার মুসলমানদের পালা। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবিদের মধ্যে প্রখ্যাত বক্তা সাবেত ইবনে কায়েস (রা.) এবং কিংবদন্তি কবি হাসসান ইবনে সাবেত (রা.)-কে দাঁড় করিয়ে দিলেন। সাবেত ইবনে কায়েস (রা.) অসাধারণ নিপুণতায়, শব্দ ও বাক্যের ফুলঝুড়ি ছড়িয়ে বনু তামিমের জবাব দিলেন। আর বরাবরের ন্যায় কবি হাসসান ইবনে সাবেত (রা.) পাঠ করলেন তাঁর স্বরচিত দীর্ঘ কবিতা, যা পক্ষ ও বিপক্ষের সকলকে দারুণ মুগ্ধ করল। বনু তামিমের শ্রোতারা তখন সমস্বরে বলে উঠল, মুহাম্মদের বক্তা ও কবি আমাদের বক্তা ও কবির চেয়ে শ্রেষ্ঠ।[15]আল ইসতিয়াব: ১/১৩১, আসহাবে রসুলের কাব্যপ্রতিভা : ৫৩

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দেখাদেখি তাঁর সাহাবিরাও কবিতার অনুরাগী হয়ে উঠেছেন। তাঁদের কেউ কেউ ইসলামপূর্ব যুগ থেকেই কবিতাচর্চা করতেন। ইসলামের পরও তা অব্যাহত রাখেন। তবে বিষয় ও আঙ্গিকে খানিক পরিবর্তন আনেন। ইসলামের চিন্তা ও ভাবধারার সাংঘর্ষিক বিষয়গুলো কবিতা থেকে ছেঁটে ফেলেন। সমালোচকরা বলেছেন, সহসা কবিতার বিষয় ও আঙ্গিকে পরিবর্তন আনার কারণে সাহাবিদের কবিতার শিল্পমান ঈষৎ ক্ষুণ্ণ হয়েছে।

শীর্ষস্থানীয় সাহাবিদের মধ্যে কবিতার সবচেয়ে সমঝদার ছিলেন আমিরুল মুমিনিন উমর (রা.)। কবিতার একজন নিপুণ সমালোচক ছিলেন তিনি। কবিতা নিয়ে এমনই অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর যে, লোকে বলত আরবে উমর (রা)-এর চেয়ে বড় কাব্য-সমালোচক আর কেউ নেই। ইবনে রশিক আল-কায়রাওয়ানি কিতাবুল উমদায় লিখেছেন, ‘উমর (রা.) ছিলেন তাঁর যুগের সবচেয়ে বড় কাব্য-সমালোচক।’[16]কিতাবুল উমদা : ১/১২ ইমাম জাহিয কিতাবুল বয়ান ওয়াত তাবয়িনে লেখেন, ‘উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) ছিলেন কবিতার বিষয়ে সময়ের সবচেয়ে বড় পণ্ডিত।’[17]কিতাবুল বয়ান ওয়াত তাবয়িন : ১/৯৭

একটি ঘটনা থেকে উমর (রা.)-এর পাণ্ডিত্যের কথা জানা যায়। হাতিয়া নামে এক কবি ছিল আরবে যে কবিতার মাধ্যমে লোকদের নিন্দা ও ট্রল করত। একদিন উমর (রা.) এই অপরাধে তাকে গ্রেফতার করলেন। মুক্তি দেওয়ার সময় শর্ত দিয়ে বললেন, মুকাযযা (নিন্দামূলক) কবিতা রচনা করতে পারবে না। হাতিয়া জিজ্ঞেস করল, আমিরুল মুমিনিন! মুকাযযা কবিতা কী? তিনি বললেন, ‘একজনের ওপর অন্যজনকে প্রাধান্য দিয়ে অথবা একজনের প্রশংসা করে অন্যজনের নিন্দা করে কবিতা রচনা করা।’ তখন হাতিয়া বলল, ‘আমিরুল মুমিনিন! আপনি দেখি কবিতায় আমার চেয়েও বেশি প্রাজ্ঞ।’[18]কিতাবুল উমদা : ২/২৩৮

উমর (রা.) সে যুগের বিখ্যাত কবিদের মধ্যে তিনজনকে শ্রেষ্ঠ কবি তকমা দিয়েছেন। তারা হলেন, যুহাইর, নাবিগা যুরয়ানি ও ইমরুল কায়েস। এদের মধ্যে তিনি যুহাইরের কবিতা অধিক পছন্দ করতেন এবং তাঁকে তিনি কবিগুরু স্বীকৃতি দিয়েছেন। একদিন আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) উমর (রা.)-এর সঙ্গে কোথাও যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে উমর (রা.) বললেন, ‘শ্রেষ্ঠ কবির কবিতা আবৃত্তি করো।’ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) শ্রেষ্ঠ কবির নাম জানতে চাইলেন। তিনি বললেন, ‘আরবের শ্রেষ্ঠ কবি হলো যুহাইর।’ এবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) যুহাইরের শ্রেষ্ঠত্বের কারণ জানতে চাইলেন। উমর (রা.) বললেন, ‘যুহাইর তাঁর কবিতায় দুর্বোধ্য ও অচেনা শব্দ ব্যবহার করে না। তাঁর কাব্যে জটিলতা নেই। আর যুহাইর যখন কবিতায় কারও প্রশংসা করে তখন সেসব বৈশিষ্ট্য ও গুণাবলি তুলে ধরে যা প্রকৃতার্থেই মামদুহের (প্রশংসিত ব্যক্তির) মাঝে রয়েছে।’[19]কিতাবুল উমদা : ২/২৬২

যুহাইরের পর তিনি শ্রেষ্ঠ কবি বলতেন নাবিগা যুরয়ানিকে। নাবিগার অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল তাঁর। একদিন লোকদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা বলো তো আরবের শ্রেষ্ঠ কবি কে? তাঁরা বলল, এ ব্যাপারে আপনার চেয়ে বেশি আর কে জানে? তখন তিনি একটি কবিতা পাঠ করে জিজ্ঞেস করলেন এটি কার কবিতা? তাঁরা বলল, নাবিগার কবিতা। পুনরায় আরেকটি কবিতা পাঠ করে জিজ্ঞেস করলেন। তাঁরা বলল, এটিও নাবিগার কথা। তখন উমর (রা.) বললেন, ‘হ্যাঁ, এ ব্যক্তিই আরবের শ্রেষ্ঠ কবি।’[20]কিতাবুল আগানি : ৯/১৫৫

উমর (রা.) যুহাইর ও নাবিগা যুরয়ানিকে এগিয়ে রাখলেও ইমরুল কায়েসকে তাদের অগ্রজ বলে স্বীকৃতি দিয়েছেন। একবার আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কবিদের ব্যাপারে তাঁর মতামত জানতে চাইলেন। তখন ইমরুল কায়েস সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘ইমরুল কায়েস সকলের অগ্রজ। সে-ই প্রথম কবিতার ঝরনা প্রবাহিত করেছে এবং কবিতার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।’[21]কিতাবুল উমদা : ১/৫৯

আবু বকর সিদ্দিক (রা.), আলি (রা.), বিলাল (রা.) আবু হুরায়রা (রা.)-সহ অন্যান্য সাহাবিরও কবিতাপ্রীতি ছিল। আনন্দ ও বেদনার তীব্র অনুভূতির সম্মুখীন হলে তাঁরা কবিতা পড়তেন। মক্কা ছেড়ে যখন সাহাবিরা মদিনায় হিজরত করেন তখন আশৈশব-কৈশোর বেড়ে ওঠা জন্মভূমির বিচ্ছেদ বেদনায় ব্যথিত হয়ে আবু বকর সিদ্দিক (রা.) পাঠ করেন কবিতার এই পঙ্‌ক্তি—

كُلُّ امْرِئٍ مُصَبَّحٌ فِي أَهْلِـــهِ وَالْمَوْتُ أَدْنَى مِنْ شِرَاكِ نَعْلِــهِ

‘প্রত্যেকে নিজ পরিবারে দিনযাপন করছে। অথচ মৃত্যু তার জুতার ফিতার চেয়েও ঢের কাছে।’

বিলাল (রা.) মক্কার পাহাড়, উপত্যকা ও ঝরনার স্মৃতিমন্থন করে এই কবিতা পড়েন—

أَلاَ لَيْتَ شِعْرِي هَلْ أَبِيتَنَّ لَيْلَةً بِوَادٍ وَحَوْلِي إِذْخِـرٌ وَجَلِيـلُ

وَهَلْ أَرِدَنْ يَوْمًا مِيَاهَ مَجَنّـَةٍ وَهَلْ يَبْدُوَنْ لِي شَامَةٌ وَطَفِيلُ

‘হায়, আমি যদি কবিতা বলতে বলতে মক্কার প্রান্তরে একটি রাত কাটাতে পারতাম। আর আমার চারদিকে ছড়িয়ে থাকত ইযখির ও জালিল ঘাস। মাজান্না ঝরনার পানি পানের সুযোগ আর কখনো হবে কি? আবার কখনো গিয়ে দাঁড়াতে পারব কি শামা ও তফিল পাহাড়ের কোলে?’[22]সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮৯

আবু হুরায়রা (রা.) যখন তাঁর স্বদেশ ইয়ামান থেকে হিজরত করে মদিনায় যাচ্ছিলেন তখন পথে পথে এ কবিতা পাঠ করছিলেন—

يا ليت من طولهاء عنائها على انها من داره الكفرنجت

‘কী দিঘল ও কষ্টাকীর্ণ এ রাত! তবুও সান্ত্বনার পরশ হলো সে আমাকে কুফরের ভূমি থেকে মুক্তি দিয়েছে।’[23]সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৯৩

সাহাবিদের মধ্যে প্রথমসারির আলেম আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর ভীষণ আগ্রহ ছিল কবিতার প্রতি। অনেক কবিতা মুখস্থ ছিল তাঁর। কেউ আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-কে কুরআনের কোনো শব্দের তাহকিক ও বিশ্লেষণ জিজ্ঞেস করলে তা বুঝাতে গিয়ে তিনি উদাহরণস্বরূপ কবিতা বলতেন। এর ফলে প্রশ্নকারী শব্দটির বিশ্লেষণ যথাযথ বুঝতে পারত।[24]আল-ইতকান: ১/৩৪৭, ফাযায়িলুল কুরআন লি ইবনি কাসির : ১/৫৪ আবু উবাইদ বর্ণনা করেন, আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) কুরআনের তাফসির করার সময় উদাহরণ দিতে গিয়ে কবিতা বলতেন।[25]আল-ইতকান: ১/৩৪৭, ফাযায়িলুল কুরআন লি আবি উবাইদ : ৬১১ আমর ইবনে দিনার (রহ.) বলেন, ‘আমি আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মজলিসের চেয়ে বড় কোনো মজলিস দেখিনি। তিনি একইসঙ্গে হালাল-হারামের বিধিবিধান, কুরআনের তাফসির, আরবি ভাষা ও কবিতার আলোচনা করতেন।’[26]আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৮/৩০২, মুখতাসার তারিখে দিমাশক : ১২/৩১০

প্রথমসারির সাহাবিগণের মধ্যে অধিক কবিতা লিখেছেন আলি (রা.)। একে তো তিনি সাহাবিগণের মধ্যে বড় জ্ঞানী ছিলেন। রাসুল তাঁকে মদিনার জ্ঞানরাজ্যের দুয়ার বলে মন্তব্য করেছেন। উপরন্তু তিনি ছিলেন একজন অসামান্য সাহিত্যিক ও কবি। সমস্তকিছুর পাশাপাশি তিনি ফুরসত পেলে কবিতা লিখতেন। পরবর্তীতে তাঁর লেখা কবিতাগুলোর একটি সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। দিওয়ানে আলি নামে সে কবিতার গ্রন্থটি আজও রয়েছে এবং বাংলা ভাষায় এর অনুবাদ হয়েছে।

সাহাবিদের মধ্যে কবি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন চারজন। তাঁরা হলেন, হাসসান ইবনে সাবেত (রা.), কা’ব ইবনে মালেক (রা.), আবদুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা (রা.) ও কাব ইবনে যুহাইর (রা.)। তাঁদের মধ্যে হাসসান ইবনে সাবেত (রা.) ছিলেন সকলের অগ্রগামী। ইসলাম ও ইসলামপূর্ব উভয় যুগে তিনি কবি হিসেবে প্রসিদ্ধ ছিলেন। খলিফা আবদুল মালেক ইবনে মারওয়ান বলেছেন, ‘আরবরা প্রশংসামূলক যে-সমস্ত কবিতা বলে সেগুলোর মধ্যে হাসসান ইবনে সাবেতের কবিতা শ্রেষ্ঠ।’[27]উসওয়ায়ে সাহাবাহ (সিয়ারুস সাহাবাহ নবম খণ্ড) : ৫৭৫ আবু উবাইদা বলেছেন, ‘নগরবাসীর মধ্যে সবচেয়ে বড় কবি ছিল ইয়াসরিবে। তারপর আবদুল কায়েস গোত্রে। তারপর বনু সাকিফ গোত্রে। আর তাঁদের সকলের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ছিলেন হাসসান ইবনে সাবেত (রা.)। তিনি রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় কবি ছিলেন। সাহাবিদের মধ্যে এটিকে তাঁর অন্যতম বৈশিষ্ট্য মনে করা হতো। তাঁর শ্রেষ্ঠ কবি হওয়ার তিনটি কারণ ছিল। এক. জাহেলি যুগে আনসারদের কবি ছিলেন। দুই. রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কবি ছিলেন। তিন. ইসলামের যুগে ইয়েমেনের কবি হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।’[28]উসওয়ায়ে সাহাবাহ (সিয়ারুস সাহাবাহ নবম খণ্ড) : ৫৭৫

রাসুল ও তাঁর সাহাবিগণের কবিতাবিষয়ক আলোচনা বেশ দীর্ঘ। বিভিন্ন ভাষায় এ নিয়ে বিশাল কলেবরের গ্রন্থাদি রচিত হয়েছে। এখানে নাতিদীর্ঘ পরিসরে মৌলিক কিছু বলেছি মাত্র, যা থেকে আস্ত বিষয়টি অনুমান করা যেতে পারে।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 সুরা ইয়াসিন, আয়াত : ৬৯
2 সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৪৭
3 আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস : ৮৭৩
4 সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৫৪
5 সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬১৪৫
6 তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/৩৫৪
7 সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৪৪৬৪
8 সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ২৮৫০
9 সহিহ মুসলিম, হাদিস : ৫৭৭৮
10 আস সায়্যিদাতু আয়েশা উম্মুল মুমিনিন ওয়া আলিমাতু নিসায়িল ইসলাম : ২২৬
11 ইজলাউল হাকিকাতি ফি সিরাতি আয়েশা সিদ্দিকা : ৬৩
12 হিলয়াতুল আউলিয়া : ২/৪০
13 সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৮৯৭
14 উসদুল গাবাহ : ২/৪
15 আল ইসতিয়াব: ১/১৩১, আসহাবে রসুলের কাব্যপ্রতিভা : ৫৩
16 কিতাবুল উমদা : ১/১২
17 কিতাবুল বয়ান ওয়াত তাবয়িন : ১/৯৭
18 কিতাবুল উমদা : ২/২৩৮
19 কিতাবুল উমদা : ২/২৬২
20 কিতাবুল আগানি : ৯/১৫৫
21 কিতাবুল উমদা : ১/৫৯
22 সহিহ বুখারি, হাদিস : ১৮৮৯
23 সহিহ বুখারি, হাদিস : ২৩৯৩
24 আল-ইতকান: ১/৩৪৭, ফাযায়িলুল কুরআন লি ইবনি কাসির : ১/৫৪
25 আল-ইতকান: ১/৩৪৭, ফাযায়িলুল কুরআন লি আবি উবাইদ : ৬১১
26 আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৮/৩০২, মুখতাসার তারিখে দিমাশক : ১২/৩১০
27, 28 উসওয়ায়ে সাহাবাহ (সিয়ারুস সাহাবাহ নবম খণ্ড) : ৫৭৫

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
মাহফুজ তাসনিম
মাহফুজ তাসনিম
1 year ago

‘কবিতা হলো হৃদয়ের সুন্দরতম প্রকাশ’—এই লাইনটা এতো ভালো লেগেছে যে, অনুভূতি প্রকাশে ভাষারাও নিশ্চল হয়ে পড়বে।