১
“ব্রজেশবাবু, আপনি ডার্ক ম্যাজিকে বিশ্বাস করেন?”
কথাটা বলে নীল সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া লিনেনের শার্টটার বুকপকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেটটা বের করলেন অরিজিৎ সোম।
যাকে উদ্দেশ্য করে কথাটা বললেন, তিনি শহরের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ব্রজেশ মজুমদার। সরকারি-বেসরকারি অফিসের অর্ডার সাপ্লাই দেওয়া তার কাজ। এই কাজে শহরে তার ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজের একচেটিয়া পসার।
অরিজিৎবাবু তার সামনে বসে আছেন তা প্রায় মিনিট চল্লিশেক হবে। কিছু ফার্নিচারের অর্ডার দেওয়ার জন্য সন্ধ্যার দিকে অরিজিৎবাবু এসেছিলেন। ঠিক তার পরপরই বৃষ্টি শুরু হয়। ছাতা সঙ্গে করে আনেননি, তাই বৃষ্টি কমার অপেক্ষা করছেন।
ব্রজেশবাবু সারাদিনের সাপ্লাইয়ের বিলগুলো প্রিন্ট করে ফাইলে সাজিয়ে রাখছিলেন, প্রশ্নটা শুনে ঘুরে তাকালেন।
অরিজিৎবাবু সিগারেটের প্যাকেটটা সামনে এগিয়ে ধরে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন ব্রজেশবাবুর দিকে। ডার্ক ম্যাজিক কেন, কোনোরকম ম্যাজিকেই যে ব্রজেশ মজুমদারের আস্থা নেই, বেশ বোঝা যাচ্ছে।
মাথা নেড়ে তিনি অসম্মতি জানালেন। সেই সঙ্গে এটাও জানালেন যে, তিনি ধূমপান করেন না। বললেন, “আপনি ধূমপান করতে পারেন, আমার আপত্তি নেই।”
অরিজিৎবাবু প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে ধরালেন।
ব্রজেশবাবু লক্ষ করলেন, অরিজিৎবাবুর ডান হাতের তর্জনীতে একটা নীল পাথর বসানো রুপোর আংটি। পাথরের উজ্জ্বল রংটা চোখে পড়ার মতো। কিন্তু তার চেয়েও যেটা বেশি নজর কাড়ছে, সেটা হলো পাথরের চারিদিকে করা রুপোর সূক্ষ্ম কারুকাজ। মনে মনে ভাবলেন, বেশ রুচিশীল লোক ইনি।
সকাল থেকেই আকাশটা মেঘলা। এখন বৃষ্টি ভালো জোরেই হচ্ছে। মনে হয় না ঘণ্টাখানেকের মধ্যে থামবে।
সিগারেট ধরিয়ে অরিজিৎবাবু বললেন, “আমিও আগে বিশ্বাস করতাম না।”
ব্রজেশবাবু একটা ফাইল ড্রয়ারে ঢুকিয়ে বললেন, “এই বিজ্ঞানের যুগে ওসব কেউ বিশ্বাস করে না।”
অরিজিৎবাবু একটু মুচকি হেসে বললেন, “আপনাকে একটা গল্প শোনাই তাহলে।”
গল্প শোনার মতো মানসিকতা এখন ব্রজেশবাবুর নেই। পরদিন একটা বড় টেন্ডার জমা করার কাজ আছে সরকারি ইনস্যুরেন্স অফিসে। প্রচুর টাকার কাজ।
এই এলাকাতে এত টাকার টেন্ডার আগে কখনও ডাকা হয়নি। অনেক সাপ্লায়ারের তাই নজর আছে ওই টেন্ডারে। তবে এটাও ঠিক যে, ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজকে টক্কর দেওয়ার মতো রেট কেউ ডাকতে পারবে না।
ব্রজেশবাবু যে গল্প শুনতে আগ্রহী নন, সেটা বুঝেও না বোঝার মতো ভাব করলেন অরিজিৎবাবু। সিগারেটে একটা সুখটান দিয়ে তিনি গল্প শুরু করলেন।
২
অরিজিৎবাবু যে গল্পটা শোনালেন, সেটা তারই পারিবারিক ঘটনা।
তাদের পৈত্রিক বাড়ি ছিল পূর্ববঙ্গে বগুড়ায়। সেখানে ধানিজমি, খামার, চটকলের মালিকানা—সবমিলিয়ে বেশ জোতদার পরিবার ছিল তাদের। অবশ্য এগুলো সব তার ঠাকুরদা সোমেশ্বর সোমের নিজের গড়ে তোলা।
দেশভাগের পর তারা এপার বাংলায় চলে আসে। সোমেশ্বরের বাবা ছিলেন জমিদারের একজন সাধারণ কর্মচারী। অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গেই তিনি কাজ করতেন। পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল।
একবার হলো কী, জমিদার বাড়ির অনেক মূল্যবান জিনিস চুরি গেল। সোমেশ্বরের বাবাকেই চোর সাব্যস্ত করে লেঠেল দিয়ে পিটিয়ে গ্রামছাড়া করে দিল জমিদার।
স্ত্রী আর একমাত্র ছেলের হাত ধরে পথে এসে দাঁড়ালেন তিনি। কী করবেন, কোথায় যাবেন, এই ভেবে দিশেহারা অবস্থা। তার থেকেও যেটা পীড়াদায়ক—চোরের অপবাদ নিয়ে বেঁচে থাকা।
স্ত্রী, পুত্রকে নিয়ে উঠলেন ভিন্ন গাঁয়ে বন্ধু রাধাকান্তের বাড়ি। সেখানে তাদের অনাদর ছিল না। কিন্তু যে মর্মপীড়ায় সোমেশ্বরের বাবা ভুগছিলেন তার নিরাময় বড় কঠিন। অসুস্থ হয়ে তিনি মারা গেলেন।
কিছুদিনের মধ্যে তার স্ত্রীও গত হলেন। সোমেশ্বরের তখন ছয়-সাত বছর বয়স। গ্রামের পাঠশালায় তাকে ভর্তি করে দিলেন রাধাকান্ত। কিন্তু সেখানে তার মন লাগে না।
সে পুকুরের মাছ ধরা দেখে, বটের ঝুরি ধরে দোল খায়, মহিষের পিঠে চড়ে ঘুরে বেড়ায়।
সে সময় একদিন গ্রামে ম্যাজিক শো-এর তাবু পড়ল। আশেপাশের গ্রাম থেকে কত মানুষ ভিড় করল!
বালক সোমেশ্বর গেল ম্যাজিক দেখতে। টিকিট না থাকায় তাকে কেউ ঢুকতে দিল না। তার মাথা গরম হয়ে গেল। একটা খান ইট তুলে ছুড়ে মারল সে।
সেই ইটের আঘাতে একজন মারাত্মক জখম হয়ে সেকি রক্তারক্তি ব্যাপার!
হইচই শুনে বেরিয়ে এলেন ম্যাজিশিয়ান ভূপেন্দ্রনাথ। সবাইকে শান্ত করে সোমেশ্বরকে নিয়ে গেলেন ভিতরে। সোমেশ্বরকে দেখে কেমন মায়া হল ভূপেন্দ্রনাথের। রেখে দিলেন নিজের সঙ্গে। গ্রামে খোঁজখবর করে পরদিন চলে গেলেন রাধাকান্তের কাছে। সব শুনলেন সোমেশ্বরের বৃত্তান্ত।
তারপর অনেক অনুরোধ করে এবং শেষে একপ্রকার জোর করেই রাধাকান্তের কাছ থেকে চেয়ে নিলেন সোমেশ্বরকে।
তারপর ম্যাজিশিয়ানের সঙ্গে এই গ্রাম সেই গ্রাম ঘুরে বেড়াতে লাগল সে। যেই গ্রামে তাবু পড়ে, সেখানে প্রায় এক মাস থাকে তারা। কত নতুন জায়গা দেখা হলো। এভাবে বেশ কিছু বছর কেটে গেল। একদিন সোমেশ্বর ভূপেন্দ্রনাথের কাছে আবদার করল, তাকে যেন ম্যাজিক শিখিয়ে দেয়—সেও ম্যাজিক দেখাবে।
শুনে ভূপেন্দ্রনাথ একটু হাসলেন। বললেন, “তোকে যে অন্য কাজ করতে হবে, সময় হলে আমি বলব।”
এরপরে আরও কিছু বছর কেটে গেল। ভূপেন্দ্রনাথ এখন আর ম্যাজিক দেখান না। তাঁর বয়স হয়ে গেছে। বগুড়ার কাছে এক গ্রামে একটা কালিমন্দির স্থাপন করেছেন তিনি। পুজো-আর্চা নিয়েই থাকেন।
একদিন সোমেশ্বরকে ডেকে বললেন, “আচ্ছা, তোর ছোটবেলার কথা কিছু মনে পড়ে?”
সোমেশ্বরের কিছুই আর তখন স্মৃতিতে নেই। সে মাথা নেড়ে ‘না’ বলল। ভূপেন্দ্রনাথ তাকে তার ছোটবেলার কথা, জমিদার কীভাবে তাদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেয়, তার বাবার মৃত্যু, রাধাকান্তের কাছ থেকে সোমেশ্বরকে চেয়ে নেওয়া—সব একে একে জানালেন। তারপর হাতে একটা আংটি দিয়ে বললেন, “তুই তোর গ্রামে ফিরে যা। সেখানে গিয়ে এই আংটি জমিদারকে দিবি। এই আংটি মন্ত্রপূত করা আছে। কার্য সমাধান করে আংটি আবার তোর কাছে ফেরত আসবে। এটার প্রভাবে তোর সকল কাজ সমাধান হবে। অনেক বিষয়-সম্পত্তি হবে।”
সোমেশ্বর সেই আংটি জমিদারকে উপহার দেয়। জমিদার খুশি হয়ে তাকে কর্মচারী পদে বহাল করে। সোমেশ্বরকে গ্রামের কেউ চিনতে পারেনি। তার বাবার কথা সবাই প্রায় ভুলেই গেছে। দু-একজন বৃদ্ধ কর্মচারীর মনে আছে, কিন্তু জমিদারের রোষের কথা ভেবে সামনাসামনি কেউ কিছু বলে না।
এর কিছুদিনের মধ্যে আশ্চর্যজনকভাবে জমিদারের আর্থিক ক্ষতি হতে শুরু করল। জমিদারের খাজনা আদায়ও কমে যায়। প্রজারা বিদ্রোহ করতে শুরু করে দিল। এদিকে জমিদার যে সব কোম্পানির শেয়ার কিনেছিল, সেগুলো সব বাজারে ডুবে যায়। এর কিছুদিন পরে এক রাতে মদ্যপ অবস্থায় জমিদার বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে মারা গেল।
৩
গল্প বলা শেষ করে অরিজিৎবাবু জিজ্ঞেস করলেন, “যা বললাম বিশ্বাস হলো কি আপনার?”
বাইরে বৃষ্টিটা এখন কমেছে। অনেক রাতও হলো। ব্রজেশবাবু সব জিনিস গোছাতে গোছাতে বললেন, “বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নই ওঠে না। জমিদারের সাথে যা যা হয়েছে, সেগুলো খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। একটা আংটি এত কিছু ঘটাবে—এটা মেনে নিলে অন্ধবিশ্বাসকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।”
অরিজিৎবাবু হাঁ করে তাকিয়ে আছেন ব্রজেশবাবুর দিকে। তার বলা গল্পটি যে একেবারেই বিশ্বাসযোগ্য হবে না, এতটাও তিনি আশা করেননি। বাইরে এখন আর বৃষ্টি নেই।
ব্রজেশবাবু দোকান বন্ধ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, এবার অরিজিৎবাবুকেও বেরোতে হবে।
ব্রজেশবাবু বললেন, “আপনার অর্ডার তো অনেক টাকার। কিছু অ্যাডভান্স করে যান, সামনের সপ্তাহের মধ্যে সব আনিয়ে রাখব।”
অরিজিৎবাবু একটু ইতস্তত করে বললেন, “দেখুন, অ্যাডভান্সের টাকা তো আনা হয়নি, আপনি বরং আমার এই আংটিটা রাখুন। সামনের সপ্তাহে আমি পুরো টাকাটা পেমেন্ট করে জিনিস আর আংটি একসাথে নিয়ে যাব।”
আংটিটা ব্রজেশবাবুর হাতে দিয়ে অরিজিৎবাবু বেরিয়ে গেলেন। আংটিটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে দেখলেন ব্রজেশবাবু। ভারি সুন্দর নকশা। মনে মনে ঠিক করলেন, এই নকশার অনুরূপ একটা আংটি তিনিও অর্ডার দেবেন। আংটিটি লকারে রেখে দোকান বন্ধ করে তিনিও বেরিয়ে এলেন।
৪
আজ ইনস্যুরেন্স অফিসে টেন্ডার খোলা হবে। যারা টেন্ডার জমা করেছে, সবাই এসে গেছে। যারা নিজে আসেনি, তারা রেপ্রেজেন্টেটিভ পাঠিয়েছে। যারা এসেছে, সবাই ব্রজেশবাবুর পরিচিত। এরা কেউ তাঁর রেটের সাথে টেক্কা দিতে পারবে না, সেটা তিনি ভালোমতো জানেন। একটি ছেলে বাইশ-তেইশ বছরের হবে। একে ব্রজেশবাবু চিনতে পারলেন না। কেউ হয়তো নিজে না এসে একে রেপ্রেজেন্টেটিভ করে পাঠিয়েছে।
অফিসার এসেই সকলকে নিজের ঘরে ডেকে পাঠালেন। টেন্ডার বক্স খোলা হলো। একে একে রেটগুলো পড়ছেন অফিসার নিজেই। কোনো রেট ব্রজেশবাবুর দেওয়া রেটের ধারেকাছেও নেই, অনেক বেশি। শেষে বাকি থাকল ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজ এবং এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেড। ব্রজেশবাবু বুঝতে পারলেন, সেই অচেনা ছেলেটি এই এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেড থেকেই এসেছে। তা যেখান থেকেই আসুক, ব্রজেশবাবু এমনভাবে রেট রেখেছেন, সেটা অন্যদের চিন্তা-ভাবনার বাইরে। সুতরাং এই টেন্ডার যে ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজই পাচ্ছে, সেটা এক প্রকার নিশ্চিত।
এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেড নতুন এসেছে। বছর দুই হলো নাম শোনা যাচ্ছে। তবে এরই মধ্যে অনেক কিছুতেই ইনভেস্টমেন্ট করছে। ভালো ব্যাবসা করেছে গত দুই বছরে। ব্রজেশবাবুর অনুমান ছিল যে, এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেড কোটেশন জমা করবেই। এমন একটা সুযোগ নিশ্চয় তারা হাতছাড়া করতে চাইবে না। তাই নিজে রেটগুলো আরও কমিয়েছিলেন। যাই হোক, এত ভালো সুযোগ হাতছাড়া করা যায় না।
এবার অফিসার এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেডের রেটগুলো পড়া শুরু করলেন। একি! ব্রজেশবাবু নিজের কানকেই যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। তাঁর পায়ের তলা থেকে যেন মাটি সরে যাচ্ছে। হুবহু তাঁর দেওয়া রেটগুলো। কী করে এটা সম্ভব! ব্রজেশবাবু শক্ত করে চেয়ারটা ধরে আছেন। বরাত পেল শেষমেশ এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেড। ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজের যে রেটগুলো অফিসার পড়ে শোনাল, সব রেট অনেক চড়া। চারিদিকে সবকিছু কেমন যেন ওলটপালট হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তে। ব্রজেশ এন্টারপ্রাইজকে কেউ টেক্কা দিতে পারবে, এটা যেন কারোরই বিশ্বাস হচ্ছে না। অথচ সেই অসম্ভবটাই আজ বাস্তব হলো।
সবাই এটাই চাপা আলোচনা করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলো। বাইরে এসে ব্রজেশবাবু সেই ছেলেটিকে ডাকলেন। ছেলেটি তখন সব সই-সাবুদ করে বাইরে এসেছে। ব্রজেশবাবু তাকে জিজ্ঞেস করে জানলেন, সে এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেডের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। জানতে চাইলেন তাদের মালিকের নাম। ছেলেটি জানালো যে, এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেডের মালিক হলেন অরিজিৎ সোম। নিজের ঠাকুরদার নামেই ফার্মের নাম রেখেছেন। এস. এস. প্রাইভেট লিমিটেডের এস. এস. অর্থাৎ সোমেশ্বর সোম।
ব্রজেশবাবু আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। একটা ট্যাক্সি ধরে কোনোমতে দোকানে এলেন তিনি। এসে সরাসরি লকারটা খুললেন। না, নেই! ভালো করে খুঁজে দেখলেন। হ্যাঁ, এখানেই তো সেদিন আংটিটা রাখলেন। আবারও খুঁজলেন তন্ন তন্ন করে। না, আংটিটা নেই। কোথাও নেই!