মরিয়ম ফুলের রেণুরা ও আরও কিছু কবিতা

রাবিয়া সাহিন ফুল্লরা

মরিয়ম ফুলের রেণুরা


মা হইলাম, অথচ আমি কেন মরিয়ম হইলাম না, খোদা?

বায়তুল মোকাদ্দাসের ঝাড়ুদার মরিয়ম হইলাম না!

এমনকি কোন মসজিদে গিয়ে নামাজেই দাঁড়াইলাম না!

অথচ ঠিকই বাচ্চা পেটে আসলো।

দুই বছর হয়ে গেলো

এখনো দলা পাকায়ে

এমনভাবে ঘুমায় সে

যেন আমার পেটেই আছে।

খালি হাত পাগুলা

আরো বিস্তৃত হয়ে ছড়ায়ে পড়ছে।

যেন দখল হওয়া ভূমি ফেরত চাইতেছে!

 

ফিলিস্তিনে জান নিয়ে ছুটতে থাকা বাচ্চাগুলার মা কেন হইলাম না আমি?

তাদেরকে কোলে আগলায়ে রাখতাম এমন।

নেতানি~য়াহুর মত জালিমের হাত থেকে বাঁচাইতে

তাদেরকে নিয়ে ছুটতাম পূর্বদিকে

যেমন ছুটছিল হারুনের বইন মরিয়ম।

 

বোঁচকা কান্ধে পিঁপড়ার মত সারিবান্ধা ফিলিস্তিনিদের ভিড়ে আমিও থাকতাম জর্ডান নদীর তীরে।

অথচ, আমি কি জানি তোমার আরশে পৌঁছার রাস্তা কোনদিকে?

 

ফিলিস্তিনিদের জায়নামাজ হয়েই

আমি পড়ি থাকতাম চাই তাদের পায়ের নিচে।

তাদের কান্নায় ভিজি উঠতাম চাই

ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়া ফিলিস্তিনের মাটি হয়ে।

 

ধূ ধূ গাজার আকাশে মেঘ দেখলাম, দলাপাকানো সাদা

যেন উড়তেছে ফিলিস্তিনি শিশুরা।

যেন জালিমের চোখে ধূলা মারি

বাতাসে উড়তেছে ফুলের রেণুরা।

 

তোমার রহমতের বিষ্টি যদি নামে

সেদিন বারুদ হয়েই ফুটবে ওরা ফিলিস্তিনের লুদ্দ গেইটে।

 


মুড়ি


এমন এমন সব ছবি শেয়ার দিতে চাই

হয়ত মাটির চুলায় বসে মুড়ি ভাঙতেছি

পাশে আদরের বইন

একবার দেখা হয় যদি, হইলে

তিনবছর আর হয় না আমাদের।

আমরা একচুলায় মুড়ির চাল নাড়তেছি

আরেক চুলায় ডিপকলে তোলা বালু

খুবই মিহি আর কালো।

চুলার ভিতরে ঠাসা মোটা মোটা লাকড়ি

দমদমায়ে জ্বলতেছে তো জ্বলতেছে

আর আমরা দুই বইন ঘামতে আছি সমান তালে।

তার নাকে বিন্দু বিন্দু কণা, আগুনে চকচকায়

লালগোড়া চামড়া কয়লার মতন লাল হয়

যদি বলি নাকে ঘাম মেয়েটার

আরো লাল হয় গোস্সায়!

 

তার গোস্সারে চিনি আমি

তারপরও যখন গ্যাসের চুলা

যখন ছানা আর সন্দেশ

যখন নিতান্তই মেহমান আমি

যখন কোলে ঈদের চান আমার

তখনও একটা গোস্সা গোস্সা মুখ

নাকে ঘাম লই দরজা লাগায়ে ঘুমায়।

আর আমার ভিতরে

একচুলায় মুড়ির চাল

আরেক চুলায় বালু

এক করি না যদি মুড়ি ফুটে যায়!

 


খোলশ


বোরকা হাউজে পছন্দের বোরকা চাইতেছিলাম

একেকটা রঙ আর ডিজাইন কী সুন্দর!

কোন্ ডিজাইনে যে আমারে মানাবে

কোন্ রঙে যে বেশি ফুটবে আর শালীনও লাগবে

উল্টায়ে পাল্টায়ে দেখতেছিলাম

মিররে দাঁড়ায়ে আমি নিজেরেও কি মাপতেছিলাম!

আরো মেয়েদের লগে মিলায়ে

কেউ আসি যেইটা ধরে ওইটারে

একেকবার মনে মনে পরেও দেখলাম

শেষে সাদা আর আসমানি রঙের মিশেলে

এক বোরকা মনে ধরলো

মুকুটের মত লেইস বসানো হিজাবটাই বেশি ইউনিক লাগলো

এবার পরতেও নিলাম ট্রায়াল রুমে

কিন্তু বদ্ধ রুমে গা ঘেঁষে কার আঠালো শরীর

পিছন থেকে ঝাপটায়ে ধরে

আর ডেউয়ার ভর্তার মত কচলায়ে খাবে

এমন লালসায় আঁচড়াইতে থাকে

বুকে, পিঠে, শিনায়

আর আমি বেজির কলের ভিতর

আটকে পরা ইঁদুরের মত পথ খুঁজি পালানোর

একেকটা বোরকার পিছনে, গাদা গাদা কাপড়ের ভিতরে

কী অসম্ভব বিদঘুটে এই ছুটতে থাকা!

দেখি, পিছনে আসতেছে আরো আরো

অজস্র আঙুল আর লকলকে জিব্বা

আর তাদেরই ভিতরে আমার চেনা

রইদের মত পরিচিত মুখগুলার নির্লিপ্ত চাউনি

আর ঠোঁটে থাকা তেল চিটচিটা হাসি

ভিতরে এমনভাবে গাঁথি যায়

যেন অগণিত সুুঁই আমারে ফুঁড়তেছে শিরায় শিরায়..

 


নতুন ভঙিমা


নিজেরে তখনই চোখে পড়ে, যখন দেখি

আমার ভঙ্গিমা আর আমার নাই

তোমার চলনে রপ্ত হয়ে গেছে

তোমার কথার ভিতরে মিশে গেছে

বুঝিবা মেয়োনিজ

পাস্তার লগে মিশায়ে এত খাইছো তুমি

খেয়ে উগড়াইতে শুরু করছো

বিশ্রী গন্ধ তখন আমারই নাকে হয়ত

আমি পাই তোমার কথায়

তোমারে আরো সহজ করে দিই উগড়ানো

আরো নরম ভঙ্গিমায় রাখি

আরো মিটবল

তোমার প্লেটে

আরে খাও তো, খাও, আরেকটু দিই,  আরো

যতক্ষণ না তোমার উগড়ানি ঘটে

ঠাসি খাওয়ায়ে তোমারে

সে খাবার পরে তেলাপোকারেই দিব

দিব ইঁদুর-চিগা আর কাউয়া-কুত্তারে

যারা বাসি খাইতেই ভালোবাসে

বাসি খাবারের সুবাস এত কড়া হয়

তারা শত দূর থেকেও দৌড়ায়ে আসতে পারে

তোমার জন্যেই কেবল নতুন নতুন খাবার

নতুন ভঙিমা আরো

এ আইয়ের ধারণার বাইরে

দূর থেকে দূর আরো

নদীর সীমানা ধরে

গ্রাম থেকে গ্রাম পার হয়ে

কোন অচীন ফেরীঘাটে তব্ধা খেয়ে বসে থাকি

জ্যামে পড়া গাড়িগুলার মতন

কখন আসবে ফেরী?

 


ঝিলের পানিতে


আমি তো হাঁটতেই যাই

হাঁটতে হাঁটতে যদি ট্রাফিক জ্যাম পার হয়ে

শহরের গিলতে থাকা কোন ঝিলের হাজামজা পানিতে

শামুকের হাঁটা দেখে ফেলি

যদি ঝিলের পানিতে শাপলার দল মাথা তুলে রাখে

যদি কলমি, মালঞ্চ আর ক্ষুদেপানা ছড়ায়ে ছিটায়ে থাকে

যদি হোগলার বনে থাকে বাদামি রঙের ফুল

উত্তর-দক্ষিণ মুখ করে সিধা দাঁড়ানো, রেণু ঝলমল

আর নানুর বানানো পিঠার কথা মনে চলে আসে

সেই  সুবাস গাঢ় সবুজ বনের মত ঘিরে ধরে

সাইড হয়ে কোথাও দাঁড়াবো না হয়

কাশফুলের মত ঝোপালো না

কচুবনের মত নিবিড়ও হবো না

কাঠবাদাম গাছের মতন হাত ছড়ায়ে রাখবো

মেঘ চঞ্চল শাওনের আকাশে

আর তোমারে সাইড করতে করতে

দেখব,  দড়িছাড়া বাছুর ঘুরতেছে একা

দালানের পাশে পাশে

নিরিবিলি ঘাসে

আর তুমি পাথর খোঁজো রাস্তায়

একটা একটা পাথর ফেলতে থাকো ঝিলে

বলো, পাথরের তো পা নাই

শামুকের মত শুঁড় নাই

মাছের মত পাখনাও যদি নাই

পাথরেরা পানিতে পড়লে কই চলে যায়?

তারা কি মাটিতে মিশতে পারে?

নাকি জুদা শরীরেই শ্যাওলার পরৎ গায়ে নিয়ে ঘুমায়ে পড়ে?

 

তোমারে দেখাই, দোলকলমির পাতা

দেখাই, কাঠবাদামের পাতা

ক্রমশ হলুদ হতে হতে

বিকালের সূর্যের মতন

টুপ করে পড়ে যাবে একদিন

আর আমরা

একটা একটা করে কুড়ায়ে তাদের বাসায় আনবো

ঝুলাবো, মালার মত গাঁথবো

তারপর শনশন পাতার আওয়াজ

ফ্যানের বাতাসে, আমাদের ঘুমের ভিতরে

পাথরের শরীরে শ্যাওলার মতন

আমাদের গায়ে লেপ্টায়ে থাকবে

তোমার ছোট ছোট হাত

আমার নাকে, গালে, ঠোঁটে ঘষে ঘষে

তোমারে পাইতে দিব নানুর হাতের পিঠার সুবাস

মনে হবে, হোগলার ফুল

বাদামী বাদামী, রেণু ঝলমল গোধূলির আকাশ

 


দুপুরের ফুল


সবসময় ত আর সব করতে ভাল্লাগে না

মাঝে মাঝে সোফার উপরে হাত পা ছড়ায়ে ল্যাটকায় থাকতে মন চায়

আর জানলা দিয়ে যদি শরতের আকাশ দেখা যায়, আরো ভালো

তাকায়ে থাকলাম মেঘেদের দিকে।

 

সবসময় যে বিষ্টি নামবে এমনও তো না;

মাঝে মাঝে মেঘেরাও হাত পা ছড়ায়ে উড়তে থাকলো হাওয়ায়

রঙিন প্রজাপতির মতন তাদের ডানায় দুপুরের রইদ ঝিলমিলালো

কখনো বা অন্ধকার ছড়ায়ে পড়লো।

আর আলো ছায়ার এই খেলায়

পাশের ছাদে কুশরের খসখসে পাতারা দুলতে থাকলো

একটা শশা হয়ত ঝুলে থাকলো লতায়

দুয়েকটা হলুদ ফুল তারই পাশে

তোমার মতই উজ্জ্বল

যে টিভি দেখে দেখে ব্যোর হইতেছো

আমার এতটা কাছে

 


লুচিরও আছে হৃদয়


বর্ণের ধারণাসহ

কোন শব্দের লগে কথা কইতে চাইলে

একটা দুপুরে হবে না কখনো

২০টা দুপুর অন্তত

এক এক করে পার করতে হবে

অনেক চকখড়িচক আঁকতে হবে বক

তারপর হয়ত কোন কোন শব্দ কথা বলতে শুরু করবে

কিছু ভঙিমা মনে ধরবে

আর কিছু শুধু ভেঙচিই কাটবে।

 

কিন্তু তারপরও সঙ্গের আশায়

বিলাই আমি পালবো না কখনো

বিলাইয়ের নরম হৃদয় আমার লাগবে না জড়ানো।

বিলাইয়ের নখ আর নখরামির চাইতে

অনেক ভালো গরম তেলে ভাজা নরম লুচি।

খিদার চোটে আমি বরং কিচেনেই ঢুকি—

আর ময়দার দলাগুলা আঙুলে মলে টলে

একটা গোলগাল রুটি যখন ছাড়লাম ডুবোতেলে

বয়ঃসন্ধিতে না ফিরেও বলতে পারি,

ফুলতে থাকা লুচিরও আছে হৃদয়—

আছে গরম বাষ্পের মতো চাপা দীর্ঘশ্বাস

আছে খারাপ লাগা আর

ধরতে না পারা ব্যথার কনকনে বাস!

যদি থেকে যায় কারো নামে চুপসানো লুচি

আমারও খারাপ লাগে, দুপুর হলেই বুঝি

 


টকটক তেঁতুল চকলেট


মরানদীর খরার মতন

তোমার কল্পনারা শুকায়ে গেলে

কী আর করবা, সোনা?

ঘুরে ফিরে না হয় আমার কুয়াতেই

বালতি ফেলতে আসিও।

নদীর বুকের বান ত ছুটানো গেলো না

এমন বর্ষায়ও খালি আহা উহু চুকচুক!

আর দরদের নামে চলমান ভোজবাজির দিনে

দুয়েকটা লাভ রিয়েক্ট দাও এইত অনেক।

 

ইলিশের সুবাস পেতে

শেষবার বাবুরে পেটে নিয়েই

গেছিলাম কাঁচাবাজারে

থকথকা কাদার ভিতরেও

পা টপকে টপকে

মাছের দাম করতেছিলাম ভরা স্বৈরাচারে।

সবজির দোকানে সাজানো সবজির মতন

আশেপাশের মানুষগুলা এমনভাবে তাকায়ে ছিল

যেন তাদেরকেই কিনতে আসছি

তাদের দিকে তাকালেও চোখ সরায় না

আরো তাকায়ে থাকে

কী ফ্যালফ্যালানো সেইসব চাউনি!

তারাও কি চাইতেছিলো তাদেরকে মূলামূলি করি?

তাদের দাম কত  হতে পারতো?

ঘরে না হয় আনা যেত, কিনতে না পারলেও

অন্তত ভাড়া করে

তারা থাকতো আমার আশেপাশে

আমারে দেখতো, আমিও তাদের

কথা যদি বলতো আরো ভালো

তার আগে ভাবলাম, ইলিশের দরদাম করি

এক হাজারে একটা ইলিশ ছিল! কী আর বলব

না কিনেই, শুঁটকি মাছের বাজারে শুধু হাঁটলাম

মাছের কড়া গন্ধ ভালো লাগতেছিল।

 

অসুখের পরে মুখের অরুচি হলে

শুধু খাবারের কথাই মনে আসে

ছোট্টবেলার প্রিয় স্বাদের টকটক তেঁতুল চকলেট

বিনিময়টা ঠিকঠাক সারতে চাই এখনো, যেই কিনে দিক

তারপরও মনে হয়, দরদের নামে চলমান ভোজবাজির দিনে

দুয়েকটা লাভ রিয়েক্ট পাই এইত অনেক।

 


তোমার হৃদয় ঘামবে কখনো


ইবাদতে নাই মন তবু

দরুদের সুরে আমার জাদুরে ঘুম পাড়াই

এমন পাগল আমি খালি তোমার দরদ চাই

 

কখনো লবণচাষীর সুরে

এত দরদ রে, দরিয়া যেখানে থামে

দরিয়ার সমস্ত পানি বুঝি লবণ হয়ে জমে

 

কখনো কল মিস্তিরির সুরে

এত বেচাইন বেচাইন লাগে

বাপের দেশে যাইতে পানিও মাটির গভীরেত্তুন জাগে

 

আমি পাপী, নামেই রাবিয়া

তোমার হৃদয় ঘামবে কখনো এমন মনে করি

পথে পথে দরদের যত সুর বিছরায়ে মরি

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments