অদ্ভুত নীরবতা চারপাশে জমে থাকার এই সময়। মাঝেমধ্যে দুয়েকটা ভারী ট্রাক বিকট শব্দ তুলে হাইওয়ে ধরে চলে যায়। ঠিক এমনই নিশুতি রাতের মধ্যভাগে কেন বইটা শেষ হতে হলো? পড়ার পর কেমন একটা ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে থাকলাম বেশ কিছুক্ষণ। চোখ বইয়ের খোলা পাতাতেই। মনের ভেতর চলে অন্য ভাবনা। বইয়ের চরিত্রগুলো খেলা করে কল্পনায়। যেন অন্য কোনো জগতে ডুবে আছি। স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন নাকি আর কিছু! মন ঠাহর করতে পারছে না। মনে হচ্ছে কোনো শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষ করে কেবলই একটুখানি স্থির হওয়ার সময় পেলাম। থ্রিলে ভরপুর এই বইয়ের সঙ্গের জার্নিটা বেশ দীর্ঘ ও উপভোগ্য ছিল। পরিচয়হীন এক পেশাদার খুনির জীবনের আশ্চর্যজনক আখ্যানকে কেন্দ্র করে বইয়ের গল্প এগিয়ে চলে। যে খুনির কো্নো পিছুটান নেই, জীবন নিয়ে কোনো ভাবনা নেই। তার কো্নো নামও থাকে না। যাকে শুধু কিলার বললেই চেনা যায়। সবকিছুর পরেও সে অন্যসব পেশাদার খুনি থেকে আলাদা। তার মধ্যে এমন কিছু একটা রয়েছে যা তাকে অনন্য করে তোলে।
মুরাদ কিবরিয়ার মূল চরিত্রগুলো বরাবরই বিষাদগ্রস্ততায় আক্রান্ত থাকে। কিলারও এখানে ব্যতিক্রম নয়। পড়তে পড়তে টের পাই মনের ক্যানভাসে ভেসে উঠে কিলারের চোখে সবসময় খেলা করে বিষাদের মিহিন শ্যাওলা। চেহারায় লেপ্টে থাকা দুনিয়ার প্রতি বিতৃষ্ণা, যাপিত জীবন নিয়ে অদ্ভুত রকমের ঔদাসীন্য সব। কিলারের জীবনকাহিনীর সঙ্গে লেখক বলে যান আন্ডারওয়ার্ল্ডের নানান গল্প। বিচিত্র সব চরিত্রের কথাও উঠে আসে তার লেখায়। যেখানে থাকে বিজ্ঞ ওস্তাদ হাকিম বা ইলিয়াসের মতো লোক। কবি খুনি মাইনুদ্দীন। যে কী না একাধারে খুনও করে আবার কবিতা বলে অশান্ত মনকে শান্ত করতে।
সবগুলো চরিত্র কেমন ধোঁয়াশার মতো সারাক্ষণ ভাবনায় ডুবিয়ে রাখে। নির্লিপ্ততাই কী কেবল জীবন? এর বাইরে তো থাকে মানবজনমের শত চাওয়াপাওয়া। জীবনের প্রতি এই যে কিলারের বিতৃষ্ণা এটাই তো শেষ গন্তব্য নয়। মানুষ দুনিয়ার প্রতি যতই নির্লিপ্ত, বিতৃষ্ণ থাকতে চায় প্রকৃতির নিয়মকে উপেক্ষা করে, দিনশেষে তারও মন চায় কোনো একটা আশ্রয় হোক তার। তাই তো সবকিছুর পরেও কিলারের এই নির্লিপ্ত জীবনের গতিরোধ করে দাঁড়ায় খেয়া, শীলা নামের দুই রহস্যময়ী নারী। না চাওয়া সত্ত্বেও কিলার জড়িয়ে পড়ে তাদের কলহাস্যে আর রহস্যে ঘেরা চুলের খোঁপার বাঁধনে। এই দুই চরিত্রকে রহস্যময়ী বললাম এজন্য যে, কিলারের কাছে তাদের চাওয়াপাওয়াটা ঠিক কী তা আমার কাছে একপ্রকার অস্পষ্টই রয়ে গেছে। কিলারের জীবন যে রুক্ষ, নিষ্ঠুর পথ ধরে এগিয়ে গেছে সে পথে ভালোবাসার মতো সুন্দর জিনিসের বন্ধন রাখা বোকামিই বলা চলে। যার নিজের প্রাণটাই কখন যেন বেঘোরে চলে যায় ঠিক নেই তার জীবনে প্রেম নামক ফুলের ঘ্রাণ মানায় না। তবুও ভুল তো মানুষই করে। কিলারও তাই জীবন এখানে অধিকতর বিপন্ন জেনেও বারবার ফিরে আসতে চায় খেয়ার কাছে। বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝখানে আলো-আঁধারিতে ঘেরা খেয়ার মুখখানা তার হৃদয়কে আন্দোলিত করে তোলে। তাকে হারানোর বেদনায় নীলাভ হয়ে উঠে কিলারের হৃদয়। শিলার সঙ্গে গভীর রাতে হাঁটতে গিয়ে মনে হয় এটাই তবে জীবনের শেষ গন্তব্য হোক। না চাইতেও জড়িয়ে পড়ে শিলার বেখেয়ালি গল্পে। অন্যসব পেশাদার খুনি থেকে তাকে আলাদা করে তুলেছিল তার মোহহীনতা। ক্ষমতা, জীবন কোনোকিছুর প্রতিই তার কো্নো লোভ নেই। যেন বেঁচে থাকতে হচ্ছে বলে বেঁচে থাকা। তার বৈচিত্রময় শৈশব, কৈশোর তাকে এই পথে এনে দাঁড় করিয়েছে বলেই পথচলা। মুরাদ কিবরিয়ার লেখার মূল চমকটা এখানেই।
উপন্যাস বাঙালা মুলুকের প্রেক্ষাপট নিয়ে লেখা হলেও চরিত্রের যাপিত জীবন বা অতীতের হাত ধরে পাঠককে তিনি নিয়ে যান বৈশ্বিক ভ্রমণে। তার লেখার এই বিস্তীর্ণতা তাকে সমসাময়িক অন্য লেখকদের থেকে অন্যতম করে তোলে। এছাড়াও তার কাব্যিক গদ্য, মোহনীয় ভঙ্গিতে স্টোরিটেলিং পাঠককে তার ঢাউস সাইজের বইগুলোতেও আটকে রাখতে সক্ষম হয়। তার লেখা ও অদ্ভুত চরিত্রের এইসব জাদুময়তা পাঠকের চোখে এঁকে দেয় বহুরূপের এক কল্পনার জগত। যেখানে একবার ডুব দিলে সহজে বেরিয়ে আসা যায় না। একটা লম্বা জার্নি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বুঝি নিস্তার মিলে না। সেই জার্নিতে আমার মতো অন্যসব পাঠকদেরও স্বাগতম। হ্যাপি হোক জার্নি, হ্যাপি রিডিং!

প্রেম প্রর্থনা মৃত্যু বইয়ের প্রচ্ছদ
মুরাদ কিবরিয়ার বৈশিষ্ট্য এখানেই।তার লেখা পাঠককে মোহগ্রস্ত করে।পাঠক গল্পের চরিত্রের ন্যায় কতখানি বিষাদগ্রস্ততায় কতখানি নির্লিপ্ততায় এগিয়ে চলে। অজানা শক্তি তাকে সম্মোহন করে।ফলে সে সহজেই তা থেকে বের হতে পারেন না।