চূড়া

রাশেদ সাদী

পাহাড়ের মাথায় বসে আজিজুল ভাবছিল, কীভাবে এখান থেকে নামা যায়। কীভাবে যেন এই খাড়া পাহাড়ের চূড়ায় সে উঠে গেছে। যেখান থেকে পাদদেশের মানুষদেরকে পিঁপড়ের মতো ছোট ছোট দেখা যায়। সেখান থেকে সে নামতে চায়।

 

২.

আজিজুলের আজীবনের উদ্দেশ্য সে এই পাহাড়ের চূড়ায় উঠবে। সেই বালক বয়স থেকে প্রতিদিন ভোরে তার প্রথম কাজ, দাঁত মাজতে মাজতে ওই পাহাড়ে ওঠার চেষ্টা করা। কিছুদূর উঠে পা হড়কে যাওয়ার কোনো ঘটনায় বা হড়কানোর ভয়ে সে নেমে যায়। নেমে কুলকুচা করে কাজে বেরিয়ে যায়।

এ নিয়ে লোকেরা হাসাহাসি করত, আজিজুল কোনোদিন তুই পাহাড়ের চূড়ায় যেতে পারবি না রে। তোর আগে এমন হাজারটা চেষ্টা ব্যর্থ হতে আমরা দেখেছি। আধটাক উঠে পা হড়কে পড়ে থেঁতলে যাওয়া মানুষের সংখ্যাও কিন্তু কম না।

অতএব আজিজুল, তোমার পক্ষে এই পাহাড় জয় করার চিন্তা বাদ দেওয়াই উত্তম, বলে সিদ্ধান্ত টানেন মহরত মুন্সি।

কিন্তু আজিজুল কারো কথা শোনার লোক না। এই একগুঁয়েমির ফলে আজ সে পাহাড়ের চূড়ায়। ঘটনা হলো, আজ ভোরে তার একটু আগে আগে ঘুম ভেঙে যায়। সে চোখ মেলে দেখে তার বৌয়ের পেটিকোট উরুর কাছে উঠে ধপধপ করছে। দৃশ্যটা যেন একটা পূর্ণতা চাচ্ছে। আজিজুলের মুখের একফোঁটা লালা অসাবধানে অধর টপকে বেরিয়ে আসে, আর থুতনি ছুঁয়ে টুপ করে বিছানায় পড়ে যায়। ঊষর বিছানা তৃষিতের মতো তা অদৃশ্য করে দেয়। কিন্তু দাগটা তো থেকে যায়। আজিজুলের ঠোঁটজোড়া নিশপিশ করতে থাকে। পরক্ষণে তার দৃষ্টি চলে যায় বৌয়ের উঁচু পেটটার দিকে। কী গভীর ঘুমে সে মগ্ন! সারারাত এক কাতে মানুষ শুয়ে থাকে কীভাবে? ইশ! এপাশ-ওপাশ ফেরার উপায় নেই, আশ্চর্য!

তখনই তার মধ্যেকার চিরচেনা সেই একগুঁয়েমিটা জেগে ওঠে। সে নিজেকে আজ কামনা-বাসনা থেকে মুক্ত ঘোষণা করে এবং উদ্ধত হাত নামিয়ে নেয়। তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়ায়। মাজন না নিয়েই ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। তার গ্রীবায় কেমন অপ্রতিরুদ্ধভাব উথলে ওঠে, চোখে একগুঁয়ে ষাঁড়ের দৃষ্টি। সে পা পা করে পাহাড়ের পাদদেশে এসে দাঁড়ায়। আজ সে আর চূড়ার দিতে তাকায় না। অন্যান্য সময় হলে বাড়ি থেকে বেরুতে বেরুতে সে মাজন দিয়ে দাঁত মাজে আর পাহাড়টা পরখ করে এবং পাহাড়ের কাছে এসে দাঁড়ায়। একবার প্রদক্ষিণ করে। যে জায়গায় মন সায় দেয় সেখানটায় এসে স্থির হয়, আর উঠতে শুরু করে।

আজ সে আর দাঁতও মাজে না, পাহাড়ের চূড়াও দেখে না, প্রদক্ষিণও করে না। সে তার দৃষ্টি নিবদ্ধ করে এক জায়গায়। যেখানটায় সে হাত দিয়ে আঁকড়ে ধরছে, আর পা যে খাঁজে আটকবার চেষ্টা করছে—তার দৃষ্টি কেবল সেই দিকে নিবদ্ধ থাকে।

সূর্য নিজের অস্তিত্বকে যখন প্রকট করে তুলল, ঠিক সেই মুহূর্তে আজিজুল পাহাড়ের চূড়ায় পা রাখে।

চূড়ায় দেখতে পায় অল্প একটু জায়গা। একজনের পক্ষে খুব বেশি না। শুয়ে পা সোজা করলে বাইরে চলে যাবে। সেখানটায় পা রেখেই সে চিৎকার দিয়ে ওঠে—বিজয়ীর উল্লাস যাকে বলে। হ্যাঁ, বিজয়ের স্বাদ সকলেই পায় না। পৃথিবীর কম লোকই তা আস্বাদন করেছে এবং এভাবে চিৎকার দিয়ে উপভোগ করার সুযোগ পেয়েছে। আজ থেকে সেই দুর্লভ লোকদের একজন হয়ে গেল আজিজুল।

কিন্তু তার আনন্দ-চিৎকার মাঝপথে এসে থেমে যায়। যখন সে দেখে চারপাশে গভীর এক শূন্যতা। অশ্রুর মতো নীরব। মেঘগুলো নাগালের মধ্যে উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেন যেন সে ছুঁয়ে দিতে হাত বাড়াল না। নাকি মন চাইল না। নাকি ভালো লাগল না।

নিচে, পাহাড়ের পাদদেশে সংখ্যাতীত মানুষের সমাগম হয়েছে—তাদের দেখতে লাগছে পিঁপড়ের মতো। আজিজুলের সেদিকেও তাকাতে ইচ্ছা করল না, নাকি তাকাল না, নাকি ইচ্ছা করল না!

 

৩.

সম্মিলিত স্বরে সবাই আজিজুলের নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। সবাই চিৎকার করছে—আজিজুল তুমি সার্থক! তুমি আমাদের বীর, আমাদের গর্ব, একমাত্র বিজয়ী মহান পুরুষ!

এলাকার মাতব্বর মহরত মুন্সি সবাইকে চুপ করতে বললেন, এবার তোমরা একটু থামো!

এত বড় জনতার উল্লাস-ধ্বনি বাগে আনা কি সোজা কথা! রীতিমতো ঘাম ছুটে যায় মাতব্বরের লোকদের। তা-ও কি তারা থামে! শেষে বাজি ফাটিয়ে তাদের থামাতে হয়। কিন্তু গুঞ্জন রয়ে যায়।

সমবেত মানুষের এক গভীর গুঞ্জরণের ভেতর ঘোষক ঘোষণা করে, এখন আপনাদের সামনে মূল্যবান বক্তব্য রাখবেন আমাদের সম্মানিত মাতব্বর মহোদয়।

মহরত মুন্সি তার মূল্যবান বক্তব্য শুরু করলেন—

প্রিয় গ্রামবাসী,

আজ আমার আনন্দের শেষ নাই। আমি আজিজুলকে বলেছিলাম, তুমি চেষ্টা করে যাও। সফল তুমি হবাই। আজ সে সফল হয়েছে। এতে আমার চেয়ে বেশি খুশি কেউ হয় নাই, হতে পারে না।

আপনারা আনন্দ করুন। যুগ-পরম্পরায় আমাদের পূর্বপুরুষরা যা করার চেষ্টা করে গেছেন, যে জন্য প্রাণ বলি দিয়েছেন, সেই লক্ষ্যে আজ আমরা পৌঁছুতে পেরেছি। আজকের দিন-তারিখ ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে, লেখা থাকবে আমাদের মহান বীর আজিজুলের নাম।

লোকসকল, আজিজুলের নামে আপনারা জয়ধ্বনি করুন, উল্লাস করুন, উৎসব করুন। আজিজুল জিন্দাবাদ!

মাতব্বরের কথা শেষ হতে পারে না, সমবেত জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। একযোগে সবাই চিৎকার দিয়ে আজিজুলের নামে জয়ধ্বনি করে, আজিজুল! জিন্দাবাদ, জিন্দাবাদ! আমাদের বীর, আমাদের বীর—আজিজুল! আজিজুল!

সবার জয়ধ্বনিতে গাছে জিরোতে বসা পাখি আতঙ্কে উড়ে যায়। গৃহপালিত পশু ভয়ের দৃষ্টিতে ইতিউতি চায়, ঘুমন্ত শিশু জেগে উঠে কান্না জোড়ে। তথাপি জয়ধ্বনি চলতে থাকে। এ গর্ব যে সবার, গোটা প্রাণিকুলের—এ জন্য যা করা হবে তা-ই যেন কম!

জমায়েতের একপাশে দাঁড়ানো আজিজুলের বৌ মাহমুদা সতর্কভাবে নড়চড়া করে। সাত মাসের পোয়াতি সে। কিছুতেই যেন আগন্তুকের ক্ষতি না হয়, তার জন্য সে একটু লোকারণ্যের বাইরে দাঁড়িয়েছে। এই পরিস্থিতিতেই মাহমুদার মনে বিভ্রান্তি তৈরি  হয়, সে আসলে ডিসাইট করে উঠতে পারে না, আজিজুলের এই ঘটনায় সে আনন্দিত হবে, না দুশ্চিন্তাগ্রস্ত।

ঠিক তখন মাহমুদার পাশঘেঁষে এসে দাঁড়ায় মনিরুল। সম্পর্কে আজিজুলের দূরবর্তী চাচা, কিন্তু প্রাণের বন্ধু। মাহমুদা তাকে কখনোই কিছু বলতে পারেনি, স্বামীর কারণে। কিন্তু তাকে কখনো ভালো চোখেও দেখতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে নারীদের দৃষ্টি অভ্রান্ত। কার চোখে কী খেলা করে তা তারা দিনের আলোয় দেখতে পায়। মনিরুলের চোখে সে চিহ্নিত করেছিল সেই দাগ—যাকে লোকে লাম্পট্য বলে।

মনিরুল কাছঘেঁষে এসে বলে, আজিজুল তো বাকির খাতায়! এবার?

মনিরুলের তামাক-চর্চিত ভেজা ঠোঁটের হাসির ভেতর লাম্পট্য ঝরে পড়ে। মনিরুলকে দুই চোখের আগুনে পুড়িয়ে ফেলে মাহমুদা। আঙুল বাগিয়ে দূরে ইশারা করে ভাগার নির্দেশ দেয়,

এই মুহূর্তে… জানোয়ার কোথাকার!

মনিরুল অবস্থা বেগতিক দেখে কেটে পড়ে।

মাহমুদা সরাসরি পাহাড়ের চূড়ার দিকে চায়। সেখানে সে আজিজুলকে খোঁজে। যেন সে বলতে চায়, দেখো, তোমার বন্ধু! চিনে রাখো, আমার সঙ্গে কী ব্যবহারটা করছে। তুমি কিছু বলবে না?

মাহমুদার চোখ অত দূরে যেতে অক্ষম হয়ে পড়ে। ঝাপসা হয়ে আসে দূর পাহাড়ের চূড়া এবং চারপাশের সকল দৃশ্য। চোখ মুছে সে একবার পাহাড়ের চূড়ার দিকে চায়, একবার নিজের পেটের চূড়ার দিকে। সে হয়তো পরখ করে নিতে চায়, কোন চূড়াটা বেশি উঁচুতে!

উল্লাসিত জনতার উপর চোখ রেখে সে আলতো করে নিজের পেটটা বুলিয়ে দিতে থাকে। আবার তার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। এই দ্বিধার মধ্যেই মাহমুদার ফ্যাকাসে ঠোঁটের কোনে আলতো একটা হাসির রেখা সকালের রোদের মতো পত্র-পল্লবের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে।

 

৪.

আজিজুল পাহাড়ের চূড়া থেকে অবাক হয়ে দেখে কত মানুষ। সব  পিঁপড়া। তারা হয়তো তার  দিকেই তাকিয়ে। তারা কী নিয়ে কথা বলছে এখন? কীভাবে বলছে? কেউ কি তাকে এখান থেকে নামানোর উদ্যোগ নিচ্ছে?

তার ভালোবাসার স্ত্রী? সে কি কান্না করছে? সে হয়তো মহরত মুন্সির পায়ে পড়ে কান্না করছে—আমার স্বামীকে বাঁচান, তাকে নামিয়ে আনার ব্যবস্থা করুন, আপনার পায়ে পড়ি।

আরে, কী করছো। এমন করো না তো। বাচ্চার ক্ষতি হবে তো।

নিজে নিজে আজিজুল মাহমুদা হয়ে ওঠে। একবার প্রশ্ন করে, একবার উত্তর দেয়। একবার আজিজুল, একবার মাহমুদা; একবার মাহমুদা, একবার আজিজুল—একাকী দুজন হয়ে ওঠে।

হঠাৎ একখণ্ড মেঘের ধাক্কায় তার ঘোর কেটে যায়। চিন্তাসমগ্র নিজের ভেতর থেকে ছিটকে বাইরে পড়ে যায়। অনেকটা গরমের মধ্যে জামা খোলার তাড়হুড়ার মধ্যে বুক পকেট থেকে কতক কয়েন ছিটকে পড়ার মতো; যা আর কুড়িয়ে নেয়া হয় না। আজিজুল সোজা হয়ে চূড়ায় শুয়ে পড়ে। তার অনেক পিপাসা পেয়েছে। অনেক খিদা। দাঁত না ঘষার ফলে মুখে কেমন অস্বস্তিভাব।

সূর্য মাথার উপর দগদগ করছে। সে চোখের  উপর হাত দিয়ে ভাবতে চেষ্টা করে আসলে, হাজার হাজার মানুষ কেন এই পাহাড়-চূড়ায় ওঠার জন্য জীবন দিয়েছে… দিচ্ছে! দিয়েছে? দেবে? বিষয়টা তার বোধে আসে না। সব কেমন জট পাকিয়ে যায়।

মাথাটা একদিকে কাত করে পৃথিবীর বুকে চোখ মেলে ধরে। দূরের গোটা জগৎ যেন তার পায়ের নিচে মোলায়েম হয়ে শুয়ে আছে। তাতে বিচিত্র ভাজ-বিভঙ্গ। পাদদেশে হাজার হাজার মানুষ—যাদেরকে আজিজুলের চোখে পিঁপড়া বলে মনে হয়।

এসব দৃশ্য দেখার পর কেন যেন অজ্ঞাতে আজিজুলের কালচে ঠোঁটের কোনে একটা দুঃখের হাসি খেলে যায়।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তা মি ম
তা মি ম
7 months ago

অথচ এই চিন্তাটা তার মাথায় আসার জন্য পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে হয়েছে!