আমি যেহেতু লিখব এবং যেহেতু লিখব এবং যেহেতু লিখবই—এই করে আমার রাতের পর রাত কেটে গেল। আমি রাত জাগতে লাগলাম আর লিখব লিখব করে কলম-খাতা নিয়ে বসে থাকলাম।
রাতের কোনাকাঞ্চি থেকে ছোট ছোট পায়ে বেরিয়ে আসে ছারপোকা—বসে বসে তাদের দেখি। তারা আসে, আমার নিষ্ক্রিয় হাতে হুল ফুটিয়ে রক্ত পান করে চলে যায়, তথাপি আমার হাত সচল হয় না। আমি বুঝতে পারি তারা মুমূর্ষু, মৃত্যু আসন্ন—তবু তারা নিষ্ক্রিয় পাথরের মতো কলম আঁকড়ে পড়ে থাকে।
হ্যাঁ, প্রাণ বলতে এখন ওইটুকুই। কলম ছাড়ে না। কী এক দুর্বার টানে কলম আঁকড়ে থাকে। যেহেতু আমি লিখব, যেহেতু আমি লিখব, যেহেতু…
এমনই নির্ঘুম প্রস্তরিত এক রাতে আক্কাস কবিরাজের কথা মনে পড়ে। তার থুতনিতে একগুচ্ছ দাড়ি। পান চিবানোর তালে তালে তিনি যখন মন্ত্র আওড়ান, চারদিকে ঘুরে ঘুরে—তার সেই জর্দা গন্ধময় মুখের সুবাস হঠাৎ এসে মনে হলো একেবারে আমার স্মৃতির মণিকোঠায় ধাক্কা মারল। শত শত পাথর-রাতের নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে হাত কীসের এক অভেদ্য মন্ত্রবলে চলতে শুরু করল। আমি শুধু নিজেকে বসিয়ে রাখলাম—বাকিটা যেন সে নিজেই করে নিল।
শহরের এই অগভীর রাতে ছারপোকার কামড় খেতে খেতে আক্কাস কবিরাজের কথা মনে পড়ে। তিনি একটা কাঁসার বাটিতে কতগুলো রসুনের কোয়া আঙুলের মাথায় থ্যাঁতলে নিতেন। শর্ষের তেলে মাখিয়ে ঝাড়ফুঁক দিয়ে কণ্ঠায়, ব্রহ্মতালুতে, নাকের ডগায় একটু একটু ছুঁইয়ে ডলে দিতেন। ‘যদি ভালা না হও তেত্রিশ কোটি দেবদেবীর মাথা খাও’ বলে তার মন্ত্রটা শেষ করে কেবলই আমার মাথায় ফুঁ দিয়েছেন কি অমনি আমার মাথার উপর থেকে একটা পাহাড় নেমে যেত, বুকের উপর থেকে একটা পাথর। দেরি না করে হাসফাঁস করতে থাকা আমার অবরুদ্ধ আত্মা ঘর থেকে বাইরের দিকে একটা দৌড় দিত। ততক্ষণে আমার পালকের মতো হালকা শরীরটা বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হতে হাওয়ায় ওড়ে চলেছে।
আমার আক্কাস কবিরাজের কথা মনে পড়ে যায়। মনে পড়ে ‘সাপের বাতাস’ লেগে আমি যখন পৃথিবীর বোঝা বুকে নিয়ে বিছানায় চিৎ হয়ে পড়ে কাতরাচ্ছি, তখন ক্ষীণকায় থুতনিতে একগোছা দাড়ি নিয়ে পান চিবাতে চিবাতে তিনি উদয় হতেন। বিসমিল্লাহ বলে তার ঝাড়মন্ত্র শুরু হতো। শেষ হতো গোটা পৃথিবী এক চক্কর দিয়ে। মাঝেমধ্যেই সাপের বাতাস লাগত আমার। দাদি বলত, মাথার উপর দিয়ে পঙ্খিরাজ সাপ উড়ে যাওয়ার সময় সাপের নিঃশ্বস গায়ে লাগলে তার সাপের বাতাস লাগে। সেই বাতাসেরই এতো তেজ! তার থেকেও তেজ ছিল আক্কাস কবিরাজের মন্ত্রে। তার ঝাড়ফুঁকের অবধারিত মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে সুস্থ হয়ে ওঠার মধ্যে।
এখন বুঝতে পারি, সেটা ছিল আসলে আমার মাইগ্রেনের ব্যথা। কিন্তু তার ঝাঁড়ফুঁক আমাকে এভাবে সুস্থ করে দিত কেন তার কোনো ব্যাখ্যা আমি আজ অবধি পাইনি। হতে পারে তার তেল-রসুনের কাজ, হতে পারে তার মন্ত্রের প্রতি অকাট্য বিশ্বাস। হতে পারে অনেক কিছুই।
আমার মনে পড়ে রুহির কথা। বাহির-বাড়িতে শুকাতে দেওয়া পাটখড়ির মাথায় ফড়িংয়ের পাখনায় রোদের চিলিকের মতোন একবিন্দু ভালোবাসা আমার অপরিপক্ব হৃদয়ে খেলা করে গিয়েছিল। আমি আর রুহি; সবার সঙ্গে খেলাধুলা করার মধ্যেই আমরা দুজন দুজনকে আলাদা করতে পারতাম, হাত ছুঁতাম, অন্যদিকে তাকিয়ে হাসতাম অথচ আমরা নিজেরা ঠিকই জানতাম আমরা এমনি এমনি হাসছি না। শৈশবের দণ্ডকলসের ফুলের মধু চুষে খাওয়ার সেই শৈশবে আমরা একদিন গিয়েছিলাম সেই আক্কাস কবিরাজের বাড়ি।
সেগুন বাগান। বাগান পেরিয়ে বিল পেরিয়ে বন। বনের কিছুটা ভেতরে, বসতির বাইরে একটা কুঁড়েঘর। ঠিক যেন রূপকথার দেশের ছবির মতো। কত অদ্ভুত অদ্ভুত জিনিস নিয়ে তার বাস! তা-ই দেখতে এসেছি আমি আর রুহি। ফ্রক পরেছে সে। ওর ঘাড় অবধি চুলের মাথায় বাঁক ধরেছে। সে দৌড়ালে তার চুলও দৌড়ায়। আমি আর সে হাত ধরাধরি করে বহু সংকোচে বাড়িটিতে ঢুকে পড়লাম। আমার পরনে হাফপ্যান্ট আর গা উদোম। প্যান্টের কোঁচায় দুইটা পেয়ারা আর চারটা কাগজি নেবু রাখা।
বাড়ির কাছাকাছি যেতেই মাথার উপর থেকে কে যেন কথা কয়ে উঠল, খাব পান্তা, জুড়াবে জান্তা।
আমাদের হৃদপিণ্ড ধক করে গলার কাছে চলে এলো। আমরা দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করেই উপরের দিকে তাকালাম। দেখি একটা টিয়া ডালে বসে সমান তালে একবার এদিক, একবার ওদিক গলা নাচাচ্ছে। বেশ কিছু সময় আমরা টিয়াটির ওখানে দাঁড়িয়ে থেকে ভিতর বাড়ির দিকে পা বাড়ালাম। আট-দশ পা ভিতরে গিয়েছি কি অমনি হুড়মুড় করে বেরিয়ে প্রায় আমাদের উপর চড়ে বসল একটা বানর। ওর কাছ থেকে ছুটে পালানোর তাড়াহুড়ার মধ্যেই আমার কোঁচার ভাজ খুলে যকের ধন বেরিয়ে এলো। মাটিতে গড়িয়ে পড়ল পেয়ারা, নেবু। বানরটা আর কিচ্ছুটি না বলে নিজের মনে কুচকুচ করে দাঁতে কেটে খেতে লাগল পেয়ারা।
আমাদের ভয়ার্ত গলা শুনে কুঁড়ের ভিতর থেকে বেরিয়ে এলেন কবিরাজ আক্কাস, কেডা রে?
আক্কাস কবিরাজের হাতে কতগুলা শেকড়-বাঁকল ধরা, ও তরা। আমি ভাবছি ‘চোরা’ আইল নাহি। তা কী মুনে কইরা?
কবিরাজের কথাটা মনে বড় বাজল। সে কত কত দিন আমাদের বাড়ি যায়, খায়, আমাকে আদর করে, আর এখন বলছে কি না চোর! আমার কপালে ভাঁজ পড়ল, আমরা চুরমুর না।
হেইডা তো দেখতেই পারতাছি। আহা, অত কষ্ট পাওন নাগব না। এই চোরা হেই চোরা না রে। এই চোরা আমার আদরের বেজি—কবিরাজ ব্যাখ্যা করে, বেজি গো, আমার একমাত্র পোলা। আদর কইরা ডাকি চোরা। সকালে বাইরইছে গাছের শিবা খুঁজতে, এহনও আইল না, তাই ভাবলাম চোরা আইছে। বান্দর আর ওর মইধ্যে হেই ফাইট কি না…গণ্ডগুল হুইনা মুনে করছি হেই আইছে। তরা মুনে কিছু নিস না গো। আইচ্ছা, এইবার ক কী জুন্য আইছত তরা, মজা দেখবার? আইচ্ছা আয় এইদিকে…
বলতে বলতে আক্কাস কবিরাজ তার তপনের কোঁচা থেকে ফিনফিনে চিকন আর বাহারি রঙের একটা সাপ বের করে আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিল, ধর, দ্যাখ কী ত্যালত্যালা! ঠান্ডা!
হঠাৎ আমি লক্ষ করি রুহি আমার পাশে নেই। সে ভোঁ-দৌড় দিয়ে পগার পার হয়েছে। আমি ভয়ে প্রস্তরিত। নড়তে পারছি না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছি কবিরাজের দিকে। সে এগিয়ে এলো না মাটিটাই সংক্ষেপিত হয়ে তাকে এগিয়ে দিল বোঝ গেল না। শুধু ঘাড়ের উপর অনুভব করলাম ফিনফিনে শরীরের ঠান্ডা অনুভূতি। সেটা ডান কাঁধ থেকে বা-কাঁধের দিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে। একদা তা কান ছুঁল। এ পর্যন্তই আমার মনে আছে। পরে শিমুল তুলার তুলতুলে বালিশে নিজেকে আবিষ্কার করি। সেটা আমার বাড়ি।
এখন ছোট একটা রুমে শত শত ছারপোকার মধ্যে অর্ধমৃত হয়ে বসে একটা গল্পের জন্য অপেক্ষা করছি। এই হলো গল্পের গল্প।
গল্প? কোথায় গল্প? অদ্ভুত একটা কণ্ঠ আমি শুনতে পাই। আসলে কি শুনতে পাই? হয়তো। আমার অবস্থা হয় শৈশবের সেই আক্কাসের অদ্ভুতদর্শন সাপ দেখার মতো। যেন ভয়ে আমি পাথর হয়ে যাই—কে কথা কয়?
পরক্ষণে আমার হাসি পায়। ভয় আমি পাইনি। ভয় পাওয়া এখন আর হয় না। ভয় হারিয়ে গেছে। এ কেবল ভয়ের অভিনয়। আমি আসলে বলতে চাইছি, কে যেন কথা বলে উঠল মনের ভিতর থেকে। বিষয়টা আসলে সত্যি না। মিথ্যা। তবু যেন কথা কইছে কেউ, টিয়া পাখির মতো, গল্প? আমি জানি বিষয়টা সত্যি না, তবু শুনতে পাচ্ছি। টিয়া পাখিটার মতো, তাকে যেটুকু কথা শেখানো হয়েছিল, সে কেবল ততটুকুই বলতে পারে।
হ্যাঁ। আমি উত্তর দিলাম সেই ডাকে সাড়া দিয়ে।
তোমার মর্জিনার কথা মনে পড়ে?
বেহুলা—লক্ষীন্দরের সেই বেহুলা? হ্যাঁ, তাকে স্পষ্ট মনে আছে। মুখে পুরো করে পাউডার মেখে, চোখের পাতায় জরি দিয়ে, কোমরে বিছা আর বাজুতে বাজুবন্দ—আহা, সেই পরীর কথা বলছো তো?
না, সে এখন সাত সন্তানের মা। জামাই ভ্যাগাবন্ড, জুয়ায় তাস খেলে আর মর্জিনাকে অকথ্য নির্যাতন করে। তার বাড়ির সব কটা সদস্য আধপেটা হয়ে ঘুমায়। মর্জিনার শাড়ি ছেড়া, ব্লাউজ নোংরা, পেটিকোট রশি দিয়ে বাঁধা। মুখটা হাড্ডিসার, কঙ্কালের উপর যেন চামড়ার আবরণ বসিয়ে দিয়েছে কেউ—দেখলে বুকে ব্যথা লাগে। বাচ্চাগুলো ক্ষুধায় কাঁদছে। হাঁপানিতে আক্রান্ত শাশুড়ি বিছানার উপর হাগুমুতু করে তার উপর পড়ে পড়ে কাতরাচ্ছে।
থামো। আমি চিৎকার দিয়ে উঠি। নজর আলির কথা মনে পড়ছে আমার।
নজর আলির কথা? হোসেনদের গরু রাখত…
সঙ্গে সঙ্গে নির্মম পর্দায় ভেসে উঠল নজর আলির মুখ। বড় বড় চুলগুলো সে বারবার ঝাঁকি দিয়ে মুখের উপর এনে ফেলত আর সেগুলোকে কানের পিছনে নিয়ে গুজে দিত। খুব ভালো বাঁশি বাজত। ভরা দুপুরে তাঁর বাঁশি! আকাশ যেন খণ্ডখণ্ড হয়ে মেঘে পরিণত হত আর বেদনাতুর চোখে দূরে চলে যেত। বাঁশির অনুরাগী হোসেনের মেয়ে আমিরুনের আত্মঘাতী হওয়ার কথাও মনে পড়ে। জোর করে আমিরুনকে বিয়ে দিল। পরের রাতেই সে বিষ খেয়েছিল। হোসেন আলি নজরের নামে মামলা করল। নজরের জেল হয়েছিল বোধ হয়। জেলে কি বাঁশি বাজানো যায়?
তোমার কি সোহরাব মুন্সির কথা মনে পড়ে? হারমোনিয়ামকে দিয়ে যে কথা বলাতে পারতেন!
হ্যাঁ, আমার মনে পড়ে। বাউল স্বাতীর মণ্ডলের কথা, মুয়াজ্জিন আবুর বাপের কথা, চইরা-চইরানীর কথা।
তোমরা বন্ধুরা মিলে চইরাদের বাড়িতে গেছো তাল পেড়ে আনতে। তখন গভীর রাত। নিঃসন্তান দম্পতি। অন্ধকার ঘর থেকে স্বামী-স্ত্রীর কথা শোনা যাচ্ছে। বুড়া-বুড়িতে গল্পটা ছিল এমন—নও চরে যাইগা, বুড়ি বলছিল, নিজ দ্যাশে গিয়া মরণ ভালা।
এতো বছর ধইরা আছি এইহানে, বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করি, কেমুন মায়া পইড়া গেছে গা। যাইতে মুন চায় না।
মরলে মাটি দিব কেডা এইহানে, হেই চিন্তা আছে? বুড়ি খনখনে গলায় রেগে ওঠে। চইরা ফ্যাসফ্যাসে গলায় গলায় উত্তর দেয়, যারা ভিক্ষা দেয়…
আজ এই ছারপোকার কামড় খেতে খেতে মনে হয়, মানুষ একটু নিশ্চয়তার জন্যই বাঁচে। এই নিশ্চয়তা পাওয়ার জন্য কত করে সে, হন্যে হয়ে ছুটে। ছুটতে ছুটতেই কখন জানি জীবনগাড়ির তেল ফুরিয়ে যায়, ফুরাতে ফুরাতে সে একটু নিশ্চয়তার পেছনে ছুটে।
চইরা-চইনরানী যেমন মৃত্যুর পর নিজের কবরে মাটি দেবার একটু নিশ্চয়তা চায়, আমিও চাই।
আমি কী চাই?
আমি চাই পরের গল্প লেখার নিশ্চয়তা। কিন্তু সত্যিটা হলো, কোনো একদিন কোনো এক অসমাপ্ত গল্প রেখেই আমার জীবনগাড়িটার তেল ফুরিয়ে যাবে। সেই সঙ্গে থেমে যাবে আমার গল্পের জন্য অপেক্ষা।