বখতিয়ার খিলজি, নালন্দা ও অন্যান্য প্রসঙ্গ

ভূমিকা

মালিক গাজী ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খিলজি। তিনি ‘ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি’ বা শুধু ‘বখতিয়ার খিলজি’ হিসেবে বেশি প্রসিদ্ধ। বখতিয়ার খিলজি তুর্কি জাতির খিলজি গোত্রের সন্তান ছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস চর্চায় বখতিয়ারকে আফগানিস্তান থেকে আগত দেখানো হলেও খলজি বা খিলজি ট্রাইব মূলত তার্কি বা তুর্কিস্তানের। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ রচিত তবাকাতে নাসিরির ইংরেজি অনুবাদক রেভার্টির স্পষ্ট বিবরণ রয়েছে এ বিষয়ে। তুরস্ক থেকেই এদের একাংশ ১০০০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আফগানিস্তানে এসে বসতি স্থাপন করে। তারপর বিভিন্ন আক্রমণকারী সৈন্যদলের হয়ে এরা ভারতে আসে। আফগানিস্তানে এরা মূলত যাযাবর জাতি হিসেবে পরিচিত। পশুচারণ ছিল এদের পেশা। আফগানিস্তানে এরা গিলজি বা গিলজাই নামে প্রসিদ্ধ ছিল, যা ভারতে এসে খলজি বা খিলজি নামে উচ্চারিত হতে থাকে।

এ কারণে জন্মসূত্রে বখতিয়ার খিলজি আফগানি হলেও তাঁকে তুর্কি বলা হয়। তাঁর জন্মস্থান উত্তর আফগানিস্তানের গরমশির (বর্তমানে এটি দশত-ই-মার্গ নামে পরিচিত) এলাকার বাসিন্দা। তাঁর বাল্যকাল সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। তবে ধারণা করা হয়, দারিদ্র্যের কারণে তিনি স্বদেশ ত্যাগ করে ভাগ্যান্বেষণে বেরিয়েছিলেন।

সে সময় খিলজি গোত্রের পুরুষেরা সৈনিক পেশাকে অগ্রাধিকার দিত। বখতিয়ার খিলজিও তাই ১১৯৫ সালে গজনীর সুলতান শিহাবুদ্দিন মুহাম্মদ ঘুরি’র সেনাবাহিনীতে যোগদানের আবেদন করেন। কিন্তু দৈহিক গড়নে তিনি ছিলেন খাটো। এছাড়া তাঁর দু’বাহু ছিল হাঁটুর নিচ পর্যন্ত লম্বা–যা ছিল দৃষ্টিকটু। শুধু তাই নয়, তিনি দেখতেও ছিলেন কুশ্রী । এ কারণে মুহাম্মদ ঘুরি’র বাহিনীর সেনাধ্যক্ষ তাঁর আবেদন নাকচ করে দিয়েছিলেন।

গজনীতে চাকুরি না পেয়ে তিনি দিল্লি চলে আসেন। দিল্লির প্রথম মুসলিম শাসক কুতুবউদ্দিন আইবেকের দরবারে চাকুরিলাভের চেষ্টা করেন। অসম সাহসী ও উচ্চাভিলাষী হওয়া সত্ত্বেও অনার্কষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে তিনি দিল্লিতে বিশেষ সুবিধা করতে পারেননি। এবারও তিনি ব্যর্থ হন। এরপর তিনি বাদায়ুন চলে যান। বাদায়ুন বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি জেলা শহর। বাদায়ুনের তৎকালীন শাসক মালিক হিজবরউদ্দিন বখতিয়ার খিলজিকে নগদ বেতনে সেনাবাহিনীতে চাকুরি দেন।

কিন্তু বখতিয়ার ছিলেন উচ্চাভিলাষী। সামান্য বেতনভুক্ত সিপাই হিসেবে চাকুরি করে তিনি সন্তুষ্ট হতে পারছিলেন না। কিছুদিন পর তিনি অযোধ্যা চলে যান। অযোধ্যার শাসক হুসামুদ্দিন তাকে বর্তমান ভারতের উত্তর প্রদেশের মির্জাপুর জেলার পূর্ব-দক্ষিণ কোণে অবস্থিত ভগবৎ ও ভিউলি নামের দুটি পরগণার জায়গীর দেন। এ পরগণা দুটিই পরবর্তীতে তাঁর শক্তির উৎস হয়ে ওঠে এবং এখানেই তিনি খুঁজে পান তাঁর উন্নতির শিখরে পৌঁছার উৎস সোপান।

১২০১ সালে বখতিয়ার মাত্র দু হাজার সৈন্য নিয়ে সীমান্তবর্তী বিভিন্ন ছোট ছোট হিন্দু রাজ্যে আক্রমণ পরিচালনা করতে থাকেন। এতে একদিকে তাঁর ধনসম্পদ বাড়তে থাকে, অন্যদিকে তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। খিলজি গোত্রের অন্যরাও দলে দলে তাঁর সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। এতে তাঁর সৈন্যসংখ্যাও বৃদ্ধি পায়। তাঁর বাহিনী আরো শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হয়ে ওঠে।


বৌদ্ধদের উপর হিন্দু নিপীড়নের সিলসিলা

ড. দীনেশচন্দ্র সেন ( ১৮৬৬-১৯৩৯) রচিত প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে মুসলমানের অবদান বই থেকে আমরা জানতে পারি, মুসলিম-পূর্বকালে এ দেশে নিম্নবর্গের মানুষের পাশাপাশি বৌদ্ধদেরও ভয়াবহ নির্যাতন করা হতো। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দুঃশাসনে তাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একাধিকবার তাদের গণহত্যা ও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের শিকার হতে হয়।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন আরও লিখেছেন, ‘কর্ণসুবর্ণের রাজা শশাঙ্কের (৫৯০-৬২৫) আদেশ ছিল সেতুবন্ধ হতে হিমগিরি পর্যন্ত যত বৌদ্ধ আছে, বালক-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করবে, যে না করবে তার মৃত্যুদণ্ড হবে।’

মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ( ১৮৫৩-১৯৩১) দেখাচ্ছেন, ‘যে জনপদে (পূর্ববঙ্গে) এক কোটির অধিক বৌদ্ধ এবং ১১ হাজার ৫০০ ভিক্ষু বাস করত, সেখানে একখানা বৌদ্ধগ্রন্থ ৩০ বছরের চেষ্টায় পাওয়া যায় নাই।’

এর পাশাপাশি শশাঙ্ক এ অঞ্চল থেকে বৌদ্ধ অধিকারের চিহ্নমাত্র বিলুপ্ত করতে চেয়েছেন। শশাঙ্কের পর বাংলায় চারশ বছর পাল বংশ রাজত্ব করে। এগারো শতকে আবারও ক্ষমতায় আসে সেন বংশ। এ বংশ ছিল গোঁড়া ব্রাহ্মণ্যবাদী ও এর কঠোর প্রয়োগে অনমনীয়। অন্য ধর্মের প্রতি বিন্দুমাত্র সহিষ্ণুতা ছিল না তাদের। জনগণের অর্থনৈতিক বিপন্নতা, ভয়াবহ বর্ণাশ্রম প্রথা, প্রশাসনের উচ্চতর থেকে শুরু করে নিম্নতর পর্যন্ত ব্রাহ্মণ্য অনুশাসন চরম পর্যায়ে উপনীত হয়। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের তখন করুণ অবস্থা। তাদের অস্তিত্ব ছিল চরম হুমকির মুখে। তারা দেশত্যাগে বাধ্য হচ্ছিল। মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছিল।

নলিনী দাশগুপ্ত ও ভিক্ষু সুনীথানন্দ দেখিয়েছেন, বৌদ্ধদের উপাসনালয় ও ঐতিহ্য বিনাশ চলছিল তুমুলভাবে। এমনকি তারা ‘বৌদ্ধদের ইতিহাসের উজ্জ্বলতম অধ্যায়কে এ দেশীয় ইতিহাসের পাতা থেকে চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে প্রয়াসী হয়েছিলেন’। বাংলাদেশের বৌদ্ধবিহার ও ভিক্ষু জীবন গ্রন্থে ভিক্ষু সুনীথানন্দ দাবি করেন, এর জন্য একমাত্র হিন্দুরাই দায়ী।

এ অত্যাচার কী তীব্র আকার ধারণ করে এবং বৌদ্ধজীবন কী ভয়াবহতায় পর্যবসিত হয়, এর চিত্র তুলে ধরা হয়েছে প্রাচীন শঙ্কর বিজয় ও শূন্য পুরাণ—এর মতো গ্রন্থে।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন তাঁর বৃহৎবঙ্গ গ্রন্থের প্রথম খন্ডে বৌদ্ধদের উপর হিন্দু নিপীড়নের বিস্তর আলোচনা করেছেন। তার মতে, হিন্দুরা শুধু বৌদ্ধদের অত্যাচার ও তাদের ধর্ম নষ্ট করে ক্ষান্ত হননি, তারা এতকালের সঞ্চিত বৌদ্ধ ভান্ডারের সর্বৈব লুন্ঠন করে লুণ্ঠিত সম্পদ নিজেদের নামাঙ্কিত করে সামগ্রিকভাবে সর্ববিধ নিজস্ব করে নিয়েছেন। হিন্দুদের পরবর্তী ন্যায়, দর্শন, ধর্মশাস্ত্র প্রভৃতির মধ্যে এ লুন্ঠন পরিচয় পাওয়া যায়।

এ পরিস্থিতিতে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ত্রাণকর্তা রুপে আবির্ভূত হন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি। তিনি বঙ্গ জয় করলে বৌদ্ধরা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পায়। অথচ এ লোকটিকেই ইতিহাসে খলনায়ক হিসেবে চিহ্নিত করার অপপ্রয়াস চালানো হয়েছে।

বিপ্লবী মানবেন্দ্রনাথ রায় (১৮৮৭-১৯৫৬) লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রিয়ায় বৌদ্ধ-বিপ্লব যখন পর্যুদস্ত হয়ে গেল আর তাতেই হলো ভারতের সমাজে বিশৃঙ্খলার উৎপত্তি; তখন অগণিত জনসাধারণ তা থেকে স্বস্তি ও মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলে বাঁচার জন্য ইসলামের বার্তাকেই জানাল সাদর সম্ভাষণ।’

মুসলিম-বিদ্বেষী লেখক আর্নেস্ট হ্যাভেলও ( ১৮৬১-১৯৩৪) তাঁর দ্য হিস্ট্রি অব এরিয়ান রুল ইন ইন্ডিয়া গ্রন্থে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন, “মুসলমান রাজনৈতিক মতবাদ শুদ্রকে দিয়েছে মুক্ত মানুষের অধিকার, আর ব্রাহ্মণদের উপরেও প্রভুত্ব করার ক্ষমতা। ইউরোপের পুনর্জাগরণের মতো চিন্তাজগতে এ-ও তুলেছে তরঙ্গাভিঘাত, জন্ম দিয়েছে অগণিত দৃঢ় মানুষের আর অনেক অদ্ভূত মৌলিক প্রতিভার। পুনর্জাগরণের মতো এ-ও ছিল আসলে এক প্রৌঢ় আদর্শ।… এরই ফলে গড়ে উঠল বাঁচার আনন্দে পরিপূর্ণ এক বিরাট মানবতা।’

ড. দীনেশচন্দ্র সেন-এর ভাষায়, ‘মুসলমানগণ কর্তৃক বঙ্গবিজয়কে বৌদ্ধরা ভগবানের দানরূপে মেনে নিয়েছিল।’

 

বখতিয়ার খিলজি ও নালন্দা : মিথ বনাম বাস্তবতা

১২০১-১২০২ সালে বখতিয়ার খিলজি বিহার আক্রমণ করেন। সেখান থেকে অনেক মূল্যবান সম্পদ তাঁর হস্তগত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, বিহার আক্রমণকালে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের দ্বারা ৪২৭ সালে নির্মিত পৃথিবীর প্রাচীন বিদ্যাপীঠ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করেছিলেন এবং এখানকার লাইব্রেরির সব বই পুড়িয়ে দিয়েছিলেন।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান বিহারের নালন্দা জেলার রাজগীরে অবস্থিত। ২০০৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার করা হয়। ২০১৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ফের শুরু করা হয়।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বহিরাগতদের দ্বারা বেশ কয়েকবার আক্রান্ত হয়েছিল। গুপ্ত সাম্রাজ্যের শাসক স্কন্ধগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খ্রিস্টাব্দ) চরম বৌদ্ধ বিদ্বেষী মিহিরাকুল এখানে আক্রমণ করে গণহত্যা চালায়। পরে স্কন্ধগুপ্ত ও তার পরবর্তী শাসকদের অনুকূলে নালন্দা ফের উঠে দাঁড়ায়।

কিন্তু রাজা শশাঙ্ক মগধে প্রবেশ করে আবারও নালন্দা ধ্বংস করেন। বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলোর ওপর চড়াও হন। গৌতম বুদ্ধের পদচিহ্ন বিনষ্ট করেন। বিখ্যাত চীনা পর্যটক হিউয়েন সাঙ (৬০২-৬৬৪)-এর ভ্রমণকাহিনীতে শশাঙ্কের বিনাশযজ্ঞের বিবরণ পাওয়া যায়।

রাজা জাতবর্মা সোমপুর মহাবিহার আক্রমণ করে ধ্বংস করেন। মঠাধ্যক্ষ করুণাশ্রী মিত্রকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। হিন্দু রাজা ভোজবর্মার বেলাবলিপি-তে এ বিবরণ পাওয়া যায়।

বখতিয়ার খিলজি ঠিক কবে নালন্দা ধ্বংস করেছেন তার সঠিক কোন তথ্য পাওয়া যায় না। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ জানাচ্ছে, ১১০০ খ্রিস্টাব্দে বখতিয়ার খিলজি নালন্দা ধ্বংস করেন।

স্যার উলসলি হেগ-এর মতে, বখতিয়ার ওদন্তপুরী আক্রমণ করেছেন ১১৯৩ সালে।

স্যার যদুনাথ সরকার ( ১৮৭০-১৯৫৮) বলছেন, ১১৯৯ সালে।

অথচ বখতিয়ার খিলজি বঙ্গে এসেছেন ১২০৪ সালে। বাংলায় আসার ১০৪ বছর আগ থেকেই তিনি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করতে শুরু করেছিলেন?

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মতে, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। কিন্তু তখনও বখতিয়ার খিলজির আগমন ঘটেনি। যদিও স্যার যদুনাথ সরকার বখতিয়ার খিলজির আগমনকে ১২০৪ থেকে পিছিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তার মতে, বখতিয়ার খিলজি ১১৯৯ সালে বঙ্গে এসেছেন। কিন্তু তাতেও ১১৯৩ সালে নালন্দা ধ্বংসের দায় তার ওপর চাপানো যায় না।

বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থে রমেশচন্দ্র মজুমদার ( ১৮৮৮-১৯৮০) লিখেছেন, ‘বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয় প্রশ্নে যত কাহিনী ও মতবাদ চাউর আছে, সবই মিনহাজের ভাষ্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। কারণ এ সম্পর্কে অন্য কোন সমসাময়িক ঐতিহাসিক বিবরণ পাওয়া যায় নাই।’

বখতিয়ার খিলজির বাংলা জয়ের ৪০ বছর পর মিনহাজ বাংলা সফরে আসেন এবং এ সম্পর্কে প্রচলিত মৌখিক বক্তব্য ব্যক্তিগতভাবে সংগ্রহ করেন।

রিচার্ড এম ইটন ( ১৯৬১-২০১৩) তাঁর দ্য রাইজ অব ইসলাম এন্ড দ্য বেঙ্গল ফ্রন্টিয়ার বইয়ে লিখেছেন, ‘১২০৪ সালে মুহাম্মদ বখতিয়ারের সেন রাজধানী দখলের প্রায় সমসাময়িক একমাত্র বর্ণনা হচ্ছে মিনহাজের তবাকাতে নাসিরি।’

এ গ্রন্থের রচয়িতা ঐতিহাসিক মিনহাজ উদ্দিন উমর ইবনে সিরাজ উদ্দিন জুজযানি, যিনি মিনহাজ-ই-সিরাজ নামে পরিচিত। তবাকাতে নাসিরি-তে রয়েছে, বখতিয়ার খিলজির সৈন্যরা ভুলক্রমে ওদন্তপুরীর বৌদ্ধমঠে আক্রমণ করে। মিনহাজের ভাষ্যমতে, ২০০ সৈন্য নিয়ে বখতিয়ার বিহার দুর্গ আক্রমণ করেন। ওদন্তপুরীকে তিনি শত্রুদের সেনাশিবির মনে করেন। হামলায় বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে। আদতে এটি দেখতে সেনাশিবিরের মতোই ছিল। এর চারদিকে ছিল বেষ্টনী প্রাচীর।

বিখ্যাত তিব্বতি ঐতিহাসিক লামা তারানাথ ( ১৫৭৫-১৬৩৪) লিখেছেন, সেন আমলে তুর্কি অভিযানের ভয়ে বৌদ্ধবিহারগুলোতে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেয়া হতো।

ওদন্তপুরী বিহারের প্রতিষ্ঠাতা পাল বংশের রাজা ধর্মপাল ( ৭৭০-৮১০)। এটি নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে মগধে অবস্থিত।

কোন কোন গবেষক দাবি করেন, সেন রাজাদের ব্রাহ্মণ্যবাদী গুপ্তচররা তুর্কি বাহিনীকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে ওদন্তপুরীতে আক্রমণ করতে প্ররোচিত করে।

ড. দীনেশচন্দ্র সরকার ( ১৯০৭-১৯৮৪) দেখিয়েছেন, ওদন্তপুর বৌদ্ধবিহার ধ্বংস করা হয় ১১৯৩ সালে। বিভিন্ন গবেষকের মতে, ১১৯১-৯৩ সময়কালে। 

বলাবাহুল্য, বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ জয় এর বেশ পরের ঘটনা। যদিও ওদন্তপুরী আক্রমণের বিষয়টিও নানা কারণে সংশয়পূর্ণ।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি, ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের ওদন্তপুরী তত্ত্ব নালন্দাকে প্রমাণ করছে না।

সুখময় মুখোপাধ্যায় (মৃত্যু : ২০০০ খ্রিস্টাব্দ) তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে, ড. আবদুল করিম (১৮৭১-১৯৫৩) বাংলার ইতিহাস : সুলতানি আমল গ্রন্থে ও রমেশচন্দ্র মজুমদার তাঁর বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থে দেখিয়েছেন, তবাকাতে নালন্দা অভিযানের কোন বিবরণ নেই, বখতিয়ার আদৌ নালন্দা অভিযান করেননি। বস্তুত কোন প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানেও বখতিয়ারের নালন্দা আক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবাকাতের পরের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাসগ্রন্থ হচ্ছে, আবদুল মালিক ইসামি রচিত ফুতুহুস সালাতিন ও খাজা হাসান নিজামি রচিত তাজুল মাসীর। এতেও নালন্দা অভিযানের কোন উল্লেখ নেই। তাদের পরবর্তী ঐতিহাসিক গোলাম হোসেন সলিম বা চার্লস স্টুয়ার্টও নালন্দা অভিযানের কোন সূত্র খুঁজে পাননি।

বাংলাদেশের বখতিয়ার-গবেষক সরদার আবদুর রহমান দেখিয়েছেন, নালন্দা ধ্বংস আসলে হিন্দু-বৌদ্ধ সঙ্ঘাতের ফসল। তিনি আমাদের জানাচ্ছেন, হিন্দু প্রচারক ও দার্শনিক শঙ্করাচার্য (৭৮৮-৮২০)-এর প্রচেষ্টায় বৌদ্ধধর্মের প্রভাব ক্ষয় হয়। ১২ বছর ধরে সূর্যের তপস্যা করে যজ্ঞাগ্নি নিয়ে নালন্দার প্রসিদ্ধ গ্রন্থাগারে অগ্নিসংযোগ করেন ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। ফলে নালন্দা অগ্নিসাৎ হয়ে যায়।

তবাকাতে নাসিরি-র বঙ্গানুবাদক আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া’র (১৯১৮-২০১৬) মতে, লড়াই সম্ভবত একপক্ষীয় ছিল না, এখানে প্রচন্ড প্রতিরোধ হয়েছিল, এমন সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়ও (১৮৮৫-১৯৩০) বৌদ্ধ ভিক্ষু এবং সেনাদের যৌথ প্রতিরোধের বিবরণ দিয়েছেন। সেনারা চারদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে হয়তোবা এখানে এসে আশ্রয় নিয়েছিল।

ড. সুশীলা মন্ডলের মতে, ‘ওদন্তপুর ছিল দুর্গম, সুরক্ষিত, শিখরস্থিত আশ্রম। এখানে স্বয়ং বিহার রাজা গোবিন্দ পাল নিজের সৈন্যদের নিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করেন। ফলে বিহার জয়ের জন্য বখতিয়ার খিলজি রাজধানীর পরে এখানে আক্রমণ করেন। এতে সৈন্যদের পাশাপাশি বৌদ্ধ ভিক্ষুরাও অস্ত্রধারণ করেন। যুদ্ধে তারা পরাজিত হন এবং গোবিন্দ পাল দেব নিহত হন।’ প্রবল যুদ্ধ শেষে অতিকষ্টে পেছনের দ্বার দিয়ে অভ্যন্তরে ঢুকে বখতিয়ারের সৈন্যরা রক্তপাত করেন। এখানে বেশির ভাগ বাসিন্দা ছিল ন্যাড়া মাথা।

মুসা আল হাফিজ বলছেন, ‘বখতিয়ার যখন দেখলেন, সেখানে প্রচুর বই এবং জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পারলেন এটি দুর্গ নয়, তখন নিজেদের ভুল বুঝতে পারলেন। ওদন্তপুর বা উদন্তপুর ছিল একটি বৌদ্ধবিহার; যা আগ থেকেই ছিল বিপর্যস্ত।’

ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত ( ১৮৮০-১৯৬১) তাঁর বাংলার ইতিহাস গ্রন্থে নালন্দা ধ্বংসের জন্য সাম্প্রদায়িক ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দায়ী করেন।

বুদ্ধপ্রকাশ তার আসপেক্টস অব ইন্ডিয়ান হিস্ট্রি এন্ড সিভিলাইজেশ্যন গ্রন্থে এমন মতামতের পক্ষে জোরালো বয়ান হাজির করেছেন।

 

বখতিয়ারের বঙ্গবিজয়

বিহার জয়ের পর বখতিয়ার অনেক ধনসম্পদসহ কুতুবুদ্দিন আইবেকের সঙ্গে দেখা করেন। সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক তাঁকে সমাদর করেন। তাঁর বীরত্ব ও সাহসিকতার কদর করেন। সুলতান তাঁকে উপঢৌকন দেন। সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক-এর দরবার থেকে ফিরে তিনি বাংলা জয়ের জন্য মনস্থির করেন। তিনি তাঁর বাহিনীকে বাংলা আক্রমণের জন্য প্রস্তুত করতে থাকেন।

তখন বাংলার শাসক ছিলেন রাজা লক্ষ্মণ সেন। তাঁর রাজধানী ছিল নদীয়া। তিনি রাজধানীতেই থাকতেন। কেননা নদীয়া ছিল বহি:শত্রুর আক্রমণ থেকে সবচেয়ে সুরক্ষিত এলাকা। কথিত আছে, বখতিয়ার খিলজির বাংলা আক্রমণের আগে রাজা লক্ষণ সেনের দরবারের কিছু জ্যোতিষী তাঁকে সতর্ক করেছিলেন যে, এক তুর্কি সৈনিকের কাছে তিনি পরাজিত হতে পারেন। লক্ষণ সেন শাসক হিসেবে ছিলেন দুর্বল। জ্যোতিষীদের ভবিষ্যদ্বাণী শুনে তিনি ভীত হয়ে পড়েন। তিনি নদীয়ার প্রবেশপথ রাজমহল ও তেলিয়াগড়ের নিরাপত্তা জোরদার করেন। ঝাড়খণ্ডের দুর্গম ও শ্বাপদসংকুল অরণ্য পাড়ি দিয়ে কোন সেনাবাহিনী নদীয়া আক্রমণ করতে পারে—লক্ষ্মণ সেন তা কখনো স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি। কিন্তু রণকুশলী বখতিয়ার খিলজি এ পথেই বাংলায় আসেন। তিনি এত দ্রুতগতিতে সামনে অগ্রসর হয়েছিলেন যে, মাত্র ১৭ জন সৈনিক তাঁকে অনুসরণ করতে পেরেছিলেন। তাঁর নদীয়া আক্রমণের তারিখ সম্পর্কে পন্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। তবে এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, ১২০০-১২০৪ সালের মধ্যে তিনি নদীয়ায় অভিযান পরিচালনা করেছেন।

সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক-এর সভাসদ খাজা হাসান নিজামি’র তাজুল মাসীর গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ১২০৩ সালের মার্চ মাসে সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেক কালিঞ্জর দুর্গ জয় করে সেখান থেকে সরাসরি বাদায়ুনে চলে আসেন। তাঁর বাদায়ুনে চলে আসার পরপরই বখতিয়ার খিলজি ওদন্তপুরী বিহার থেকে তাঁর কাছে উপস্থিত হন এবং তাঁকে বিশটি হাতি, বিভিন্ন ধরনের রত্ন ও বিপুল পরিমাণ অর্থ উপহার হিসেবে প্রদান করেন।

তবাকাতে নাসিরি থেকে জানা যায়, ‘বিজয় লাভের পর (ওদন্তপুরী বিহার দখলের পর) লুণ্ঠিত দ্রব্য নিয়ে বখতিয়ার খিলজি প্রত্যাবর্তন করেন ও সুলতান কুতুবুদ্দিন-এর নিকট উপস্থিত হন। তিনি সেখানে প্রভূত সম্মান ও পুরস্কার লাভ করেন।’

ওদন্তপুরী থেকে সংগৃহীত সম্পদ যে তখনকার দিল্লির সুলতান কুতুবুদ্দিন আইবেককে উপহার দেয়া হয়, সে বিষয়ে গবেষক ডক্টর মোহাম্মদ মোহর আলীও উল্লেখ করেছেন, তবে তিনি এটা স্বীকার করেননি যে, ওই অভিযানে বখতিয়ার কাউকে হত্যা করেছেন।

ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজ তাঁর তবাকাতে নাসিরিতে উল্লেখ করেছেন, বিহার থেকে প্রত্যাবর্তনের পর কুতুবুদ্দিন আইবেক বখতিয়ার খিলজিকে খিলাফত দান করেন এবং এর পরের বছর বখতিয়ার খিলজি নদীয়া আক্রমণ করেন।

এ থেকে সহজেই অনুমেয় যে, ১২০৩ সালের পরের বছর অর্থাৎ ১২০৪ সালে ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজি বাংলা আক্রমণ করেছেন।

বখতিয়ার খিলজি সরাসরি রাজা লক্ষ্মণ সেন-এর প্রাসাদে এসে উপস্থিত হন। দ্বাররক্ষী ও প্রহরীদের বাধা অতিক্রম করে তিনি প্রাসাদের ভেতরে ঢুকে পড়েন। তাঁর এ অতর্কিত আক্রমণে প্রাসাদে ভীষণ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বৃদ্ধ ও অসহায় রাজা লক্ষ্মণ সেন প্রাসাদের পেছনের দরজা দিয়ে পালিয়ে যান। তিনি নৌপথে পালিয়ে বিক্রমপুরে গিয়ে আশ্রয় নেন। ফলে নদীয়া মুসলমানদের অধীনে চলে আসে। এভাবে বাংলায় সর্বপ্রথম মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজা লক্ষ্মণ সেন ছিলেন বাংলার শেষ স্বাধীন হিন্দু শাসক।

আবদুল মান্নান তালিব তাঁর বাংলাদেশে ইসলাম গ্রন্থে লিখেছেন, “ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজির বাংলাদেশে মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠার ঘটনা কোন বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক কিছু নয়। বখতিয়ার খিলজির বঙ্গ অভিযানের কয়েকশ বছর পূর্ব থেকে মুসলিম সুফি, দরবেশ, আলেম ও মুজাহিদগণ বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলামের সত্যবাণী প্রচার করে আসছিলেন। সম্ভবত ইসলাম প্রচারকদের অভাবিতপূর্ব সাফল্যই বখতিয়ার খিলজিকে বঙ্গ অভিযানে উদ্বুদ্ধ করে। বখতিয়ার খিলজি যখন নদীয়া ও লক্ষ্মণাবতী (গৌড়) অধিকার করেন, তার মাত্র কয়েক বছর পর শায়খ জালালুদ্দীন তাবরিজি গৌড় থেকে মাত্র ১৭ মাইল দূরে পান্ডুয়ায় অবস্থান করে সারা বাংলায় ইসলাম প্রচার অভিযান পরিচালনা করেন।” (বাংলাদেশে ইসলাম, পৃষ্ঠা ১৩৫)

বখতিয়ার খিলজি এরপর গৌড়ের দিকে এগিয়ে যান। রাজা লক্ষ্মণ সেন-এর নামানুসারে গৌড় তখন লক্ষণাবতী নামে পরিচিত ছিল। ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণামতে, গৌড়ে তিনি রাজধানী স্থাপন করেন। এ লক্ষ্মণাবতীই পরবর্তীতে লখনৌতি নামে প্রসিদ্ধ হয়ে ওঠে।

গৌড় জয়ের পর দু’বছর পর্যন্ত বখতিয়ার খিলজি কোন অভিযানে বের হননি। এ দু’বছর তিনি লখনৌতি রাজ্যে সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রতি মনোযোগ দেন। সমগ্র রাজ্যটিকে তিনি কয়েকটি ভাগে বিভক্ত করেন। প্রত্যেক প্রদেশে নিজের একেকজন সহযোগী সেনানায়ককে শাসনকর্তা নিযুক্ত করেন। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে তিনি মসজিদ ও মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এ মাদ্রাসাগুলোতে মুসলমানদের ইসলাম ও রাষ্ট্র পরিচালনা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করা হতো। আধ্যাত্মিক সাধকদের জন্য তিনি কয়েকটি খানকাও নির্মাণ করেন। তিনি জোরপূর্বক কোন হিন্দুকে ইসলামে দীক্ষিত করেননি। তবে তাঁর আমলে অনেক হিন্দু ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি রক্ত-লোলুপ ছিলেন না। অযথা নরহত্যা ও প্রজা নিপীড়নও তিনি অপছন্দ করতেন।

বখতিয়ার খিলজির সেনাপতিদের মধ্য হতে তিনজনের নাম পাওয়া যায়। এঁরা হলেন—বরসৌলের শাসক আলি মর্দান খিলজি, গঙ্গতরীর শাসক হুসামুদ্দিন ইওজ খিলজি ও পূর্ববঙ্গের শাসক সুবেদার আউলিয়া খাঁ। এ আউলিয়া খাঁ ছিলেন বখতিয়ার খিলজির ১৭ জন অগ্রগামী সৈনিকের অন্যতম। তিনিও আফগানিস্তানের গরমশিরের অধিবাসী ছিলেন এবং বখতিয়ারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমৃত্যু তিনি বঙ্গ অঞ্চলের শাসক ছিলেন। পরবর্তীতে তাঁর বংশধরেরা এ অঞ্চল শাসন করেন। বর্তমানে ঢাকার পার্শ্ববর্তী গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ থানার বক্তারপুর মূলত ছিল বখতিয়ারপুর। প্রিয় বন্ধুর স্মরণে নিজের প্রশাসনিক কেন্দ্রের এ নামকরণ করেছিলেন সুবেদার আউলিয়া খাঁ। তিনি পার্শ্ববর্তী ফুলহরী গ্রামে বসতি স্থাপন করেছিলেন। এক বর্ণনা অনুসারে, বৃটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে সুবেদার আউলিয়া খাঁ’র বংশধর তৎকালীন রূপগঞ্জ সার্কেলের পুলিশ ইন্সপেক্টর মুন্সি মোহাম্মদ সরওয়ার খাঁ এ গ্রামের নাম রাখেন ফুলদী। বর্তমানে গ্রামটি এ নামেই পরিচিত।

 

তিব্বত অভিযান

বখতিয়ার খিলজির রাজ্য পূর্বে তিস্তা ও করতোয়া নদী, দক্ষিণে পদ্মা নদী, উত্তরে দিনাজপুর জেলার দেবকোট হয়ে রংপুর শহর পর্যন্ত এবং পশ্চিমে পূর্বে অধিকৃত বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। যদিও বাংলাদেশের বৃহদাংশ তার রাজ্যের বাইরে ছিল। তিনি সেসব অঞ্চল দখল না করে তিব্বতে অভিযান পরিচালনার প্রতি মনোনিবেশ করেন। তার উদ্দেশ্য ছিল সরাসরি তুর্কিস্তানের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করা।

বখতিয়ার খিলজির জীবনের শেষ উল্লেখযোগ্য কাজ তিব্বত অভিযান। তিব্বত আক্রমণের রাস্তা আবিষ্কারের জন্য বখতিয়ার খিলজি আলি মেচকে নিয়োগ দেন। লখনৌতি ও হিমালয়ের মধ্যবর্তী প্রদেশে কোচ, মেচ ও থারু নামে তিনটি উপজাতির বসবাস ছিল। আলি মেচ ছিলেন মেচ উপজাতির সর্দার। তিনি বখতিয়ার খিলজির হাতে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন।

তিব্বত অভিযানে আলি মেচ বখতিয়ার খিলজিকে যথেষ্ট সাহায্য করেন। অভিযানের সব প্রস্তুতি গ্রহণ সম্পন্ন হলে তিনি তিনজন সেনাপতি ও প্রায় দশ হাজার সদস্যের বাহিনী নিয়ে লখনৌতি থেকে তিব্বত রওনা হন। সেনাবাহিনী বর্ধনকোট পৌঁছে তিস্তার চেয়েও তিন গুণ চওড়া বেগমতী নদী দেখতে পান। তারা নদী পার না হয়ে নদীর তীর ধরে তিন দিনের দূরত্ব অতিক্রম করেন। এভাবে তারা একটি দুর্গের কাছে গিয়ে পৌঁছেন। দুর্গে থাকা শত্রুবাহিনীর সঙ্গে তাদের লড়াই হয়। এ যুদ্ধে বখতিয়ার খিলজি জয়ী হলেও তার বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হয়। তিনি জানতে পারেন, অদূরে করমবত্তন শহরে কয়েক লক্ষ সেনা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত রয়েছে। এ কথা শুনে পরিস্থিতি বিবেচনায় বখতিয়ার খিলজি সামনে অগ্রসর না হয়ে ফিরে যাওয়ার মনস্থ করেন। বহু কষ্টে অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে তিনি দেবকোটে ফিরে আসতে সক্ষম হন। গৌহাটির কাছে ব্রহ্মপুত্রের তীরে কানাই বড়শি বোয়া নামক স্থানে তুর্কি সেনাদলের বিধ্বস্ত হওয়ার বিভিন্ন আলামত পাওয়া যায়। তিব্বত অভিযান ব্যর্থ হওয়ায় এবং সেনাবাহিনীর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ফলে লখনৌতির মুসলিম রাজ্যের প্রজাদের মধ্যে বিদ্রোহ ও বিরোধ দেখা দিতে শুরু করে। এরই ফলশ্রুতিতে বাংলার ছোট ছোট মুসলিম রাজ্যগুলো দিল্লির সঙ্গে সম্ভাব্য বিরোধে আগে থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

 

বখতিয়ারের মৃত্যু

তিব্বত অভিযানের পর বখতিয়ার খিলজি বুঝতে পারেন, তার শক্তি মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে। নানাবিধ দুশ্চিন্তা ও পরাজয়ের গ্লানিতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। এ চাপ সইতে না পেরে তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। এর অল্প কিছুদিন পর ১২০৬ সালে তিনি মারা যান। তবে ঐতিহাসিক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনামতে, ৬০২ হিজরি তথা ১২০৬ সালে সেনাপতি আলি মর্দান খিলজি তাঁকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করেন। রিয়াযুস সালাতিন গ্রন্থকারও এমনটি লিখেছেন। তবে তিনি আলি মর্দানকে নারানকোই এলাকার শাসক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার নারায়ণপুরের পীরপাল গ্রামে তার সমাধিস্থল রয়েছে।

 

সাহিত্যে বখতিয়ার খিলজি

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ-এর একটি অসাধারণ কাব্যগ্রন্থ বখতিয়ারের ঘোড়া। এ কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতার শিরোনামে এ নামটি গ্রহণ করা হয়েছে।

কবিতাটি হচ্ছে—

বখতিয়ারের ঘোড়া

মাঝে মাঝে হৃদয় যুদ্ধের জন্য হাহাকার করে ওঠে

মনে হয় রক্তই সমাধান, বারুদই অন্তিম তৃপ্তি;

আমি তখন স্বপ্নের ভেতর জেহাদ, জেহাদ বলে জেগে উঠি।

জেগেই দেখি কৈশোর আমাকে ঘিরে ধরেছে।

যেন বালিশে মাথা রাখতে চায় না এ বালক,

যেন ফুৎকারে উড়িয়ে দেবে মশারি, মা

তৃস্তনের পাশে দু’চোখ কচলে উঠে দাঁড়াবে এখুনি;

বাইরে তার ঘোড়া অস্থির, বাতাসে কেশর কাঁপছে।

আর সময়ের গতির ওপর লাফিয়ে উঠেছে সে।

 

না, এখনও সে শিশু। মা তাকে ছেলে-ভোলানো ছড়া শোনায়।

বলে, বালিশে মাথা রাখো তো বেটা। শোনো

বখতিয়ারের ঘোড়া আসছে।

আসছে আমাদের সতেরো সোয়ারি।

হাতে নাঙ্গা তলোয়ার।

 

মায়ের ছড়াগানে কৌতূহলী কানপাতে বালিশে

নিজের দিলের শব্দ বালিশের সিনার ভিতর।

সে ভাবে সে শুনতে পাচ্ছে ঘোড়দৌড়। বলে, কে মা বখতিয়ার?

আমি বখতিয়ারের ঘোড়া দেখবো।

 

মা পাখা ঘোরাতে ঘোরাতে হাসেন,

আল্লার সেপাই তিনি দুঃখীদের রাজা।

যেখানে আজান দিতে ভয় পান মোমেনেরা,

আর মানুষ করে মানুষের পূজা,

সেখানেই আসেন তিনি। খিলজীদের শাদা ঘোড়ার সোয়ারি।

দ্যাখো দ্যাখো জালিম পালায় খিড়কি দিয়ে

দ্যাখো, দ্যাখো।

মায়ের কেচ্ছায় ঘুমিয়ে পড়ে বালক

তুলোর ভেতর অশ্বখুরের শব্দে স্বপ্ন তার

নিশেন ওড়ায়।

 

কোথায় সে বালক?

 

আজ আবার হৃদয়ে কেবল যুদ্ধের দামামা

মনে হয় রক্তেই ফয়সালা।

বারুদই বিচারক। আর

স্বপ্নের ভেতর জেহাদ জেহাদ বলে জেগে ওঠা।

 

প্রদোষে প্রাকৃতজন

বাংলাদেশের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক শওকত আলী রচিত একটি ঐতিহাসিক উপন্যাস প্রদোষে প্রাকৃতজন। উপন্যাসটি ১৯৮৪ সালে প্রথম প্রকাশিত হয়। বখতিয়ার খিলজির বাংলায় আগমনের আগে সেন রাজাদের নিপীড়ন ও তুর্কিদের বঙ্গ আক্রমণের সময়ে বঙ্গের প্রাকৃতজনদের কাহিনী বিবৃত হয়েছে এ উপন্যাসে।

 

বাংলা ভাষায় বখতিয়ার খিলজির পূর্ণাঙ্গ জীবনী

সরদার আবদুর রহমান বাংলা ভাষায় বখতিয়ার খিলজির পূর্ণাঙ্গ জীবনী লিখেছেন। এ ছাড়া অন্যান্য ঐতিহাসিকগণ তাঁদের বইয়ে বখতিয়ার খিলজির প্রসঙ্গে আলোচনা করলেও এ পর্যন্ত কেউ তাঁর পূর্ণাঙ্গ জীবনী রচনা করেননি। সরদার আবদুর রহমানের বইটি দিব্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয়েছে।

 

তথ্যসূত্র :

১. বাংলাদেশে ইসলাম, আবদুল মান্নান তালিব

২. বখতিয়ার খিলজি ও নালন্দার সত্য-মিথ্যা, মুসা আল হাফিজ, দৈনিক নয়াদিগন্ত, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১

৩. বখতিয়ারের ঘোড়া ও বাংলায় ইসলাম প্রচারের তরবারিতত্ত্ব, আলতাফ পারভেজ, প্রতিচিন্তা ( জানুয়ারি-জুন ২০২১)

৪. ভারতে ইসলাম ভারতীয় মুসলিম, অনির্বাণ মুখোপাধ্যায়

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments