বইয়ের প্রচ্ছদে ইসলামি মোটিফের ব্যবহার কিংবা বাংলা প্রকাশনায় ইসলামি মোটিফের ব্যবহার দুইটা আলাদা প্রসঙ্গ। একটা ওয়াইড আরেকটা ন্যারো। কিন্তু আলাদা হইলেও মিল একটা আছে। মিলটা মোটিফে। আবার দুইটাই বিস্তৃত অর্থ নিয়া হাজির হয় আমাদের সামনে। আবার মিলটা মোটিফে থাকলেও শেষপর্যন্ত আবার মোটিফে থাকে না। আবার প্রসঙ্গটা আসলে শুধু অলংকরণের ইতিহাসেও থেমে থাকে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ইসলামি শিল্পভাবনার অনেককিছু। এর মধ্যে আছে ক্যালিগ্রাফি, পাণ্ডুলিপি-সংস্কৃতি, মুদ্রণপ্রযুক্তি, উপমহাদেশের মুসলিম সমাজ, বাংলা ভাষার বইয়ের বাজার এবং সেইসাথে আধুনিক প্রকাশনা-নন্দনতত্ত্ব। আবার বইয়ের প্রচ্ছদে ইসলামি মোটিফ ব্যবহারের আছে নিজস্ব ইতিহাস ও নন্দনভাবনা। বাংলা প্রকাশনায় এই যাত্রাটা দীর্ঘ বলা না-গেলেও এর গুরুত্বকে খাটো করে দেখার উপায় নাই। বরং নতুন করে দেখার কারণ আছে।
বইয়ের প্রচ্ছদ তো শুধু একটা বইকে অন্য বই থেকে আলাদা করে চেনানোর উপায় না। একজন পাঠক বইটা হাতে নেওয়ার আগেই প্রচ্ছদটা দেখে। পাঠক সেই প্রচ্ছদ দেখে বইটার বিষয়, আবহ, সংস্কৃতি এমনকি কখনো কখনো লেখকের মানসিক জগত সম্পর্কেও একটা ধারণা তৈরি করেন। ফলে বলা হয়ে থাকে যে, প্রচ্ছদ এক অর্থে বইয়ের প্রথম পৃষ্ঠা, যেখানে কোনো বাক্য লেখা না থাকলেও অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংকেত কাজ করে। আর এই জায়গাতেই মোটিফের প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইসলামি মোটিফ বলতে আমরা প্রায়ই মসজিদের গম্বুজ, মিনার, চাঁদ-তারা, আরবি ক্যালিগ্রাফি, জ্যামিতিক নকশা, আরাবেস্ক, লতা-পাতা, আট বা বারো কোনার নক্ষত্র, মুকারনাস, মেহরাব, ইসলামি অলংকরণ কিংবা কুরআনিক অলংকরণকে বুঝি। কিন্তু ইতিহাসের দিক থেকে দেখলে বিষয়টা এত সরল না। ইসলামি শিল্পের নিজস্ব কোনো একক ‘ডিজাইন’ নাই; বরং বহু শতাব্দী ধরে আরব, পারস্য, মধ্য এশিয়া, তুরস্ক, উত্তর আফ্রিকা, ভারতীয় উপমহাদেশসহ নানা অঞ্চলের শিল্পরীতি, কারুশিল্প ও স্থানীয় ঐতিহ্য পরস্পরের সঙ্গে মিশে যে বিস্তৃত নন্দনতত্ত্ব তৈরি করেছে, তাকেই আমরা আজ মোটামুটি ‘ইসলামি শিল্প’ বলে চিহ্নিত করি। আর বইয়ের প্রচ্ছদে এই ঐতিহ্যের ব্যবহার শুরু হয়েছিল আধুনিক প্রচ্ছদ ডিজাইনের বহু আগে, যখন ‘বুক কভার’ কথাটিই আজকের অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয় নাই।
তো, প্রচ্ছদের ইতিহাস আসলে শুরু হয় পাণ্ডুলিপির মলাট থেকে। আজকের বইয়ের প্রচ্ছদ মূলত মুদ্রিত বইয়ের একটা বাণিজ্যিক ও নান্দনিক উপাদান। কিন্তু মধ্যযুগীয় পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে বইয়ের মলাট ছিল একই সঙ্গে সুরক্ষা, মর্যাদা ও শিল্পের বাহক। ইসলামি বিশ্বে কুরআনসহ গুরুত্বপূর্ণ পাণ্ডুলিপির জন্য চামড়ার তৈরি অত্যন্ত অলংকৃত মলাট ব্যবহারের ঐতিহ্য গড়ে ওঠে। এইসব মলাটে জ্যামিতিক বিন্যাস, উদ্ভিদজাত অলংকরণ, কেন্দ্রীয় মেডেলিয়ন, বর্ডার এবং ক্যালিগ্রাফি ব্যবহৃত হতো। কখনো সোনার প্রলেপ, কখনো খোদাই, কখনো চামড়ার ফিলিগ্রি; বিভিন্ন কৌশলে মলাটকে একটা শিল্পবস্তুতে পরিণত করা হতো।
১৫শ শতকের মামলুক বই বাঁধাইয়ের একটা উদাহরণে কেন্দ্রীয় গোলাকার মেডেলিয়নের মধ্যে জ্যামিতিক ইন্টারলেসের ওপর আরাবেস্ক নকশা এবং চারপাশে ফুলের অলংকরণ দেখা যায়। অর্থাৎ বইয়ের মলাটের নকশা তখন নিছক ‘সাজসজ্জা’ ছিল না। বই নিজেই ছিল একটা মূল্যবান বস্তু। তার মলাট ঘোষণা করত ভেতরের জ্ঞানকে সম্মান করতে হবে। এই ধারণাটি পরবর্তী সময়ে ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদ-নন্দনতত্ত্বের একটা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন আসতে পারে, ইসলামি শিল্পে ‘মোটিফ’ কোথা থেকে এলো? এখানে একটা ভুল ধারণা দূর করা দরকার। জ্যামিতিক নকশা, ফুল, লতা-পাতা কিংবা সর্পিল অলংকরণ ইসলামের আবির্ভাবের পর হঠাৎ সৃষ্টি হয় নাই। এগুলোর মধ্যে অনেকটার শিকড় ইসলাম-পূর্ব সভ্যতাতেও ছিল। ইসলামি সভ্যতার বিশেষ কৃতিত্ব ছিল এইসব উপাদানকে নতুন নন্দনতাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা।
ইসলামি শিল্পের তিনটা বড় অলংকারধারা এখানে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; ধারা তিনটা হলো: এক. ক্যালিগ্রাফি; দুই. জ্যামিতিক অলংকরণ; তিন. উদ্ভিদভিত্তিক আরাবেস্ক। জ্যামিতিক শিল্পে বৃত্ত, বর্গ, বহুভুজ, নক্ষত্র, আন্তঃসংযুক্ত রেখা ইত্যাদির পুনরাবৃত্তি ও বিন্যাস থেকে অসংখ্য জটিল প্যাটার্ন তৈরি করা হয়। গবেষণায় ইসলামি জ্যামিতিক শিল্পের বিকাশে প্রাক-ইসলামি উত্তরাধিকার এবং পরবর্তী ইসলামি সভ্যতার গণিত, স্থাপত্য ও অলংকরণ-চর্চার পারস্পরিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
আরাবেস্কে একটা লতা যেন শেষ হয়েও শেষ হয় না। একটা পাতা আরেকটি পাতায়, একটা বাঁক আরেকটি বাঁকে গিয়ে মিলিত হয়। এই পুনরাবৃত্তি ইসলামি অলংকরণের অন্যতম শক্তি। এ কারণেই ইসলামি মোটিফের মধ্যে ‘অসীমতার’ একটা অনুভূতি তৈরি হয়।
ক্যালিগ্রাফি তো যার মানে যখন লেখা নিজেই একটা ছবি হয়ে ওঠে। ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদ নিয়ে কথা বলতে গেলে ক্যালিগ্রাফিকে বাদ দেওয়ার কোনো সুযোগই নাই।
আরবি ভাষার বর্ণ বা হরফ শুধু ভাষার বাহন না; ইসলামি সভ্যতায় ক্যালিগ্রাফি নিজেই একটা প্রধান শিল্পরূপে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে কুরআনের বাণীকে সুন্দরভাবে লিখে উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে লেখার দৃশ্যমান সৌন্দর্য একটা বিশেষ মর্যাদা লাভ করে। ফলে বইয়ের প্রচ্ছদে আরবি হরফ ব্যবহার করলে তা শুধু ‘আরবি লেখা’ থাকে না; পাঠকের কাছে তা একটা সাংস্কৃতিক সংকেত হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের প্রকাশনায় এই বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে আরবি হরফের সঙ্গে বাংলা হরফের একটা আকর্ষণীয় সম্পর্ক তৈরি হয়েছে। বাংলা ভাষার বই, কিন্তু প্রচ্ছদে আরবি ক্যালিগ্রাফির উপস্থিতি। এটি বইটির ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক কিংবা বিষয়গত পরিচয় এক মুহূর্তে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে পারে। তবে এখানেই একজন দক্ষ প্রচ্ছদশিল্পীর দায়িত্ব শুরু হয়। আরবি লেখা মানেই তো আর ইসলামি নকশা না। আরবি হরফকে শুধু ‘ডেকোরেশন’ হিসেবে ব্যবহার করলে অনেক সময় তার ভাষাগত ও ধর্মীয় মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। বিশেষ করে কুরআনের আয়াত বা আল্লাহর নামকে নিছক গ্রাফিক উপাদান হিসেবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে নান্দনিকতার পাশাপাশি ধর্মীয় সংবেদনশীলতার বিষয়টিও বিবেচনা করা জরুরি।
পারস্য থেকে অটোমান সময়কাল পর্যন্ত বইয়ের মলাটে এক স্বতন্ত্র নন্দনযাত্রা ধরা যায়। ইসলামি বই বাঁধাইয়ের ইতিহাসে পারস্য ও অটোমান তুরস্কের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পারস্যের বইয়ের মলাটে সেন্ট্রাল মেডেলিয়ন এবং কর্নার-পিস অলংকরণের একটা শক্তিশালী ঐতিহ্য তৈরি হয়। ‘লাচাক-তোরাঞ্জ’ নামে পরিচিত এই বিন্যাস ১৫শ শতকে পারস্যে বইয়ের মলাট ও পাণ্ডুলিপির অলংকরণে বিকশিত হয় এবং পরে কার্পেটের নকশাতেও প্রবেশ করে।
অটোমান শিল্পীরা পারস্যের নানা নকশাকে গ্রহণ করলেও সেটাকে নিজেদের স্বতন্ত্র শিল্পভাষায় রূপান্তর করেন। ১৬–১৭শ শতকের বইয়ের মলাটে আরাবেস্ক, হাটাই, মেঘরেখা, ফুল, মেডেলিয়ন, সোনালি বর্ডার ইত্যাদির সমন্বয় দেখা যায়। কুরআনের পাণ্ডুলিপির মলাটে জ্যামিতিক নকশা ও ফুল-লতার সঙ্গে ক্যালিগ্রাফির সমন্বয়ও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অর্থাৎ ইসলামি বইয়ের মলাটের ইতিহাস আসলে এক অঞ্চলের ইতিহাস নয়। এটি সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ইতিহাস।
ভারতীয় উপমহাদেশে এসে ইসলামি মোটিফের নতুন ভাষা যোগ হয়। ইসলামি শিল্প যখন ভারতীয় উপমহাদেশে আসে, তখন সেটি স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে গভীরভাবে মিশে যায়। মুঘল শিল্পে পারস্যের প্রভাব যেমন ছিল, তেমনি ভারতীয় ফুল, লতা, স্থাপত্য, রঙ ও অলংকরণও তার নিজস্ব চরিত্র তৈরি করে। পরবর্তী সময়ে দিল্লি, লখনৌ, হায়দরাবাদ, মুর্শিদাবাদ, কলকাতা, ঢাকা এইসব বিভিন্ন অঞ্চলে মুসলিম পাণ্ডুলিপি, ক্যালিগ্রাফি, বই বাঁধাই ও মুদ্রণশিল্পের নিজস্ব রূপ দেখা যায়।
ইসলামি বিশ্বের বইশিল্পের এই আঞ্চলিক বৈচিত্র্যের একটা বড় উদাহরণ হলো ভারত ও তুরস্কে পারস্য-উদ্ভূত মলাটের বিন্যাসের বিভিন্ন রূপান্তর। মেট্রোপলিটন মিউজিয়ামের গবেষণাতেও দেখা যায়, পারস্যের বইশিল্পের কিছু নকশা ভারত ও তুরস্কে বিস্তার লাভ করেছিল। তাই বাংলাদেশের কোনো বইয়ের প্রচ্ছদে ব্যবহৃত ‘ইসলামি’ মোটিফকে কেবল আরব সংস্কৃতির উত্তরাধিকার বলে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
বাংলার ইসলামি নন্দনতত্ত্বের মধ্যে রয়েছে আরব, পারস্য, তুর্কি, মুঘল এবং স্থানীয় বাংলার দীর্ঘ সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়া।
বাংলা বই ও ইসলামি মোটিফের জার্নিটা দেখলে ঔপনিবেশিক মুদ্রণ থেকে আধুনিকতার জার্নিটাও চোখে পড়বে। এই কাল পর্বে একটা বইয়ের জন্য শিল্পীরা যে নকশা তৈরি করতেন, মুদ্রণযুগে একই নকশা অসংখ্য বইয়ের জন্য পুনরুৎপাদন করা সম্ভব হলো। ফলে অলংকরণ হয়ে উঠল পুনরুৎপাদনযোগ্য গ্রাফিক ভাষা।
বাংলা মুসলিম সমাজে ধর্মীয় বই, পুঁথি, জীবনী, নসিহতনামা, ইসলামি ইতিহাস, কাব্য এবং অনুবাদগ্রন্থের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে প্রচ্ছদে ধর্মীয় পরিচয়ের দৃশ্যমান চিহ্নের ব্যবহারও বাড়তে থাকে। কিন্তু এই সময়ের প্রচ্ছদ আজকের অর্থে আধুনিক গ্রাফিক ডিজাইনের প্রচ্ছদ ছিল না। বইয়ের নাম, লেখকের নাম, প্রকাশকের পরিচয় এবং কিছু অলংকরণ মিলেই মূলত বইয়ের বাইরের চেহারা তৈরি করত। এখানে আরবি ক্যালিগ্রাফি, ফুল-লতা, বর্ডার, মসজিদ বা ইসলামি স্থাপত্যের ইঙ্গিত এবং অলংকৃত টাইপোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশের বর্তমান প্রকাশনায় ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদ দেখলে একটা পরিচিত দৃশ্য প্রায়ই দেখা যায়, সেটা হলো গম্বুজ, মিনার, চাঁদতারা, সবুজ রং, আরবি ক্যালিগ্রাফি এইসব বা এইসবের সমন্বয়। তাইলে প্রশ্ন আসে ‘মসজিদচাঁদতারা’ই কি ইসলামি প্রচ্ছদ?
বাংলাদেশে এই সূত্রটা এত বেশি ব্যবহৃত হয়েছে যে এটি প্রায় একটা ভিজুয়াল ক্লিশে-তে পরিণত হয়েছে। সমস্যা মোটিফটিতে না; সমস্যা হয়েছে তার অতিরিক্ত পুনরাবৃত্তিতে।
একটা ইসলামি ইতিহাসের বই, বা একটা সুফিবাদবিষয়ক বই, বা একটা কুরআন-ব্যাখ্যার বই, বা একটা মুসলিম মনীষীর জীবনী, বা একটা সমকালীন মুসলিম সমাজবিষয়ক বই, যেটাই হোক, সবগুলোর প্রচ্ছদ যদি একই ধরনের গম্বুজ-মিনার-চাঁদ-তারায় তৈরি হয়, তাহলে বইয়ের বিষয়গত পার্থক্য হারিয়ে যায়। অথচ ইসলামি শিল্পভাণ্ডার এত বিশাল যে প্রচ্ছদশিল্পী চাইলে একই ধর্মীয় পরিচয়কে অসংখ্য আধুনিক ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু বাংলাদেশে সেটা কমই দেখা যায়।
আবার দেখেন, ইসলামি মোটিফ মানেই তো আর সবুজ না। মানে সবুজের অনেক শেড ব্যবহার করা হয়। বাংলাদেশে ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদে সবুজের ব্যবহার এত প্রচলিত যে অনেক সময় মনে হয় ইসলামি বইয়ের জন্য সবুজই যেন বাধ্যতামূলক রং। কিন্তু ইতিহাস তা বলে না। ইসলামি পাণ্ডুলিপি ও বইয়ের অলংকরণে নীল, লাল, সোনালি, কালো, বাদামি, ফিরোজা, সাদা ইত্যাদি বহু রঙের ব্যবহার হয়েছে। বিশেষ করে নীল ও সোনার সমন্বয় বহু ইসলামি শিল্পে দেখা যায়। কুরআনের পাণ্ডুলিপি থেকে শুরু করে রাজদরবারের বই এখানে রঙের ব্যবহার কখনো শুধু ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে নাই; বরং মর্যাদা, অঞ্চল, সময় ও শিল্পরীতিও প্রকাশ করেছে। স্মিথসোনিয়ান-এর কুরআনশিল্প বিষয়ক প্রকাশনাতেও জ্যামিতিক অলংকরণ, রঙ ও ক্যালিগ্রাফির সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তার মানে, ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদে কালো-সোনালি, নীল-সাদা, মাটির রং, গাঢ় লাল কিংবা মিনিমাল একরঙাও অত্যন্ত শক্তিশালী হতে পারে।
আরাবেস্ক হচ্ছে ইসলামি প্রচ্ছদের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ভাষা। অনেকের দৃষ্টিতে আধুনিক বাংলা প্রকাশনায় সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় ইসলামি মোটিফগুলোর একটা হলো আরাবেস্ক। কারণ আরাবেস্ক সরাসরি কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় স্থাপনার ছবি না। ফলে এটি ধর্মীয় আবহ তৈরি করতে পারে, কিন্তু প্রচ্ছদকে অতিরিক্ত আক্ষরিক করে তোলে না। আরাবেস্কের পুনরাবৃত্ত লতা, পাতা ও বাঁক একটা বইকে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক করে তুলতে পারে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এই নকশা শুধু ধর্মীয় বইতেই ব্যবহারযোগ্য তা না। ইসলামি দর্শন, মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস, সুফিবাদ, ইসলামি স্থাপত্য, আরবি সাহিত্য, পারস্যের কবিতা, মধ্যযুগীয় জ্ঞানচর্চা কিংবা মুসলিম দার্শনিকদের বইয়েও এটি ব্যবহার করা যায়।
আধুনিক আরবি বইয়ের প্রচ্ছদেও পুরোনো কুরআনিক পাণ্ডুলিপির ফুল, রোজেট, আরাবেস্ক, কার্টুশ, ফ্রেম ইত্যাদি উপাদানকে নতুনভাবে ব্যবহার করার উদাহরণ রয়েছে। গবেষণায় মিশরীয় শিল্পী মোহিয়েদ্দিন এল্লাবাদের প্রচ্ছদ-নকশাকে এই ধরনের ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সৃজনশীল সমন্বয়ের উদাহরণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। এখানেই আমাদের জন্য বড় শিক্ষা আছে। অর্থাৎ ঐতিহ্যকে হুবহু কপি না করে তার ভাষাকে পুনর্নির্মাণ করা যায়।
ইসলামি জ্যামিতিক নকশা এবং আধুনিক মিনিমালিজমও আজকাল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। অর্থাৎ, এখানে আধুনিক গ্রাফিক ডিজাইনের সঙ্গে ইসলামি জ্যামিতিক নকশার একটা আশ্চর্য সামঞ্জস্য আছে। কারণ আধুনিক ডিজাইনও চায় সরলতা, পুনরাবৃত্তি, ভারসাম্য, গ্রিড, সিমেট্রি, নেগেটিভ স্পেস, সীমিত রঙ, স্পষ্ট টাইপোগ্রাফি।
আবার ইসলামি জ্যামিতিক শিল্পেও পাওয়া যায় সিমেট্রি, মডিউলারিটি, রিপিটেশন, প্রোপর্শন, জিওমেট্রি, ভিজুয়াল রিদম। ফলে একজন আধুনিক ডিজাইনার ৮-কোনা বা ১০-কোনা নক্ষত্র, ইন্টারলেসিং প্যাটার্ন কিংবা জ্যামিতিক গ্রিড ব্যবহার করে অত্যন্ত সমকালীন প্রচ্ছদ তৈরি করতে পারেন। এই ধরনের প্রচ্ছদে মসজিদের ছবি থাকার প্রয়োজন নাই। কখনো শুধু একটা জ্যামিতিক প্যাটার্নই যথেষ্ট।
বাংলা হরফ ও ইসলামি মোটিফের সম্পর্কটা দেখা জরুরি। বাংলা প্রকাশনার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আকর্ষণীয় সম্ভাবনাটি সম্ভবত এখানেই। আমরা যদি ইসলামি নন্দনতত্ত্বকে শুধু আরবি হরফ দিয়ে প্রকাশ করতে চাই, তাহলে বাংলা বইয়ের নিজস্ব ভিজ্যুয়াল পরিচয় দুর্বল হয়ে যায়। বরং বাংলা অক্ষরের নিজস্ব আকৃতি, বাঁক, মাত্রা, ফাঁক এবং রেখাকে ইসলামি জ্যামিতিক ও আরাবেস্ক মোটিফের সঙ্গে মিলিয়ে একটা নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি করা সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়: বাংলা শিরোনামের সাথে আরাবেস্ক বর্ডার; অথবা, বাংলা টাইপ এবং এর সাথে জ্যামিতিক ইসলামি গ্রিড; অথবা, বাংলা ক্যালিগ্রাফিক অক্ষর এবং এর সাথে মুঘল ফুলের অলংকরণ; অথবা, বাংলা নাম এবং এর সাথে অত্যন্ত সংযত আট-কোনা জ্যামিতিক প্রতীক। এতে বইটি একই সঙ্গে বাংলা এবং ইসলামি দুটাই হয়ে ওঠে। অনেকে মনে করেন, এটাই হয়ে উঠতে পারে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রচ্ছদ-নন্দনের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিক।
ইসলামি মোটিফের একটা রাজনৈতিক দিক আছে। ওটাও গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি মোটিফ সবসময় শুধু ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে না। অনেক সময় এটি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়েরও সংকেত দেয়। কোনো সমাজে ইসলামি স্থাপত্যের ছবি, আরবি ক্যালিগ্রাফি বা নির্দিষ্ট প্রতীক ব্যবহার করে একটা বই নিজের পাঠকগোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে। প্রচ্ছদ তখন হয়ে ওঠে এক ধরনের আইডেন্টিটি মার্কার। বাংলাদেশে বিষয়টি বিশেষভাবে সংবেদনশীল। কারণ এখানে ইসলাম দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ, আবার বাংলা ভাষা ও বাঙালি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও জাতীয় পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। ফলে ‘বাংলা’ ও ‘ইসলামি’ এই দুই পরিচয়কে পরস্পরের বিপরীতে দাঁড় করানো একটা ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল পদ্ধতি। বাংলার মুসলিম সাহিত্য ও সংস্কৃতির ইতিহাস দেখায় যে এই দুই প্রবাহ বহু ক্ষেত্রেই পাশাপাশি চলেছে। প্রচ্ছদ সেই সহাবস্থানকে দৃশ্যমান করার একটা শক্তিশালী জায়গা হতে পারে।
ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদে সবচেয়ে বড় ভুল হলো প্রতীককে বিষয় ভেবে নেওয়া। প্রচ্ছদ ডিজাইনের একটা মৌলিক নিয়ম হলো প্রতীক কখনো বিষয় না। একটা বই ইসলাম নিয়ে লেখা হলেই মসজিদের ছবি দিতে হবে এমন কোনো নিয়ম নাই। যেমন, একজন মুসলিম দার্শনিকের বইয়ের প্রচ্ছদে তার চিন্তার কোনো বিমূর্ত ধারণা প্রকাশ করা যেতে পারে। সুফিবাদ নিয়ে বইয়ে দরবেশের সরাসরি ছবি না দিয়ে ঘূর্ণায়মান জ্যামিতিক বিন্যাস ব্যবহার করা যেতে পারে। ইসলামি দর্শন নিয়ে বইয়ে ক্যালিগ্রাফির বদলে আলো ও অন্ধকারের বিমূর্ত সম্পর্ক ব্যবহার করা যায়। কুরআনের ভাষাতত্ত্ব নিয়ে বইয়ে আরবি অক্ষরের গঠনকে গ্রাফিক মোটিফে রূপ দেওয়া যায়। ইসলামি স্থাপত্য নিয়ে বইয়ে পুরো মসজিদের ছবি না দিয়ে একটা খিলান, একটা জ্যামিতিক জানালা বা একটা অলংকরণকে ফোকাল এলিমেন্ট করা যায়। এতে প্রচ্ছদ ইলাস্ট্রেটিভ এর বদলে হয়ে ওঠে ইন্টারপ্রিটিভ। কমার্শিয়াল কভার আর জেনারেল কভারের মধ্যে এখানেই পার্থক্য তৈরি হয়।
প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে বাংলা প্রকাশনায় ইসলামি মোটিফের ভবিষ্যৎ কী? ভবিষ্যতের কথা ভাবার আগে বর্তমানটা দেখা যাক। বাংলাদেশের প্রকাশনা এখন এমন একটা সময়ে দাঁড়িয়ে আছে যখন প্রচ্ছদ শুধু বইয়ের প্যাকেজিং নয়; এটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইয়ের প্রথম বিজ্ঞাপন। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, অনলাইন বুকশপ কিংবা ডিজিটাল ক্যাটালগে পাঠক প্রথমে বইয়ের প্রচ্ছদই দেখেন। ফলে প্রচ্ছদকে এখন একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক, নান্দনিক, বাণিজ্যিক এবং ডিজিটাল হতে হয়। এই বাস্তবতায় পুরোনো ইসলামি মোটিফের সরাসরি অনুকরণ খুব বেশি কার্যকর নাও হতে পারে।
বরং প্রয়োজন ঐতিহ্যের গবেষণা, কোন মোটিফ কোথা থেকে এসেছে তা জানা। স্থানীয়করণ, আরব বা তুর্কি নকশা হুবহু না এনে বাংলা ও উপমহাদেশীয় উপাদানের সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়া। আধুনিক টাইপোগ্রাফি আরবি ক্যালিগ্রাফির সঙ্গে সুন্দর বাংলা টাইপোগ্রাফির সম্পর্ক তৈরি করা। মিনিমালিজম অর্থাৎ, অতিরিক্ত অলংকরণ এড়িয়ে একটা শক্তিশালী ভিজুয়াল আইডিয়া তৈরি করা। নতুন রঙের ভাষা, সবুজ-সোনালির বাইরে নীল, কালো, সাদা, মাটি, টেরাকোটা, গাঢ় লাল ইত্যাদি ব্যবহার করা। প্রতীকের পুনর্ব্যাখ্যা; চাঁদ-তারা বা মিনারকে সরাসরি ছবি না বানিয়ে বিমূর্ত গ্রাফিক সংকেতে রূপ দেওয়া।
‘ইসলামি’ মানেই অতীতমুখী এই ধারণাটিও বদলানো দরকার। ইসলামি নন্দনতত্ত্বকে অনেক সময় এমনভাবে ব্যবহার করা হয় যেন ইসলামি বই মানেই পুরোনো যুগের বই। এটা একটা বড় সীমাবদ্ধতা। ইসলামি শিল্পের ইতিহাস আসলে পরিবর্তনের ইতিহাস। পারস্য থেকে তুরস্ক, মধ্য এশিয়া থেকে ভারত, আরব বিশ্ব থেকে উত্তর আফ্রিকা—প্রতিটি অঞ্চল ইসলামি শিল্পকে নিজের মতো করে গ্রহণ করেছে। আজকের ডিজাইনারও সেই ঐতিহ্যের উত্তরসূরি হতে পারেন। তিনি চাইলে একটা ইসলামি মোটিফকে পিক্সেল, গ্রিড, লাইন-আর্ট, অ্যাবস্ট্রাক্টশন, মনোক্রোম, কোলাজ কিংবা কনটেমপোরারি টাইপোগ্রাফির সঙ্গে যুক্ত করতে পারেন। আশা করা যায়, ঐতিহ্য তখন আর জাদুঘরের বস্তু থাকবে না; জীবন্ত শিল্পভাষায় পরিণত হয়ে উঠবে।
আমাদের প্রয়োজন ইসলামি মোটিফের অনুকরণ না; বরং ইসলামি নন্দনতত্ত্বের পুনঃআবিষ্কার। কারণ ঐতিহ্যকে ভালোভাবে বাঁচিয়ে রাখতে হলে তাকে কাচের বাক্সে বন্দি না রেখে নতুন সৃষ্টির মধ্যে ব্যবহার করাই উত্তম। বাংলা বইয়ের প্রচ্ছদে তাই ইসলামি মোটিফের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আমাদের ভাবতে হবে। বাংলা হরফ, ইসলামি জ্যামিতি, আরাবেস্ক, ক্যালিগ্রাফি, স্থানীয় কারুশিল্প এবং আধুনিক গ্রাফিক ডিজাইনের এক নতুন সংলাপ নিয়ে ভাবতে হবে। আর সেই সংলাপ সফল হলে প্রচ্ছদ তখন আর বইটাকে শুধু ‘ইসলামি’ বলে চিহ্নিত করবে না। প্রচ্ছদ নিজেই হয়ে উঠবে একটা স্বতন্ত্র শিল্পকর্ম। হোক সেটা আকারে নির্দিষ্ট ও ছোট। সেই শিল্পের মধ্যে একই সঙ্গে থাকবে ইতিহাস, বিশ্বাস, স্মৃতি এবং আধুনিকতার গল্প।
হদিস: এই প্রবন্ধে ইসলামি বইয়ের প্রচ্ছদ বা বুক ডিজাইন, কুরআনিক পাণ্ডুলিপি, অটোমান ও পারস্যের পুস্তকশিল্প, জ্যামিতিক নকশা এবং আধুনিক আরবি বইয়ের প্রচ্ছদ-রূপান্তর বিষয়ে Cleveland Museum of Art, Metropolitan Museum of Art, Aga Khan Museum, Museum With No Frontiers, Smithsonian এবং Oxford Academic-এর নানা সূত্র ও রেফারেন্সের সাহায্য নেওয়া হয়েছে।