ঈদের আগে বা পরে আমার পরিবারের সকলেই ফেরি পারাপার হতে গিয়ে বাসডুবি হয়ে মারা গেছে। পরিবারের সাথে আমার সম্পর্ক বেশ কিছু সময় খুব বাজে গেছে। এর ভিতর আমি এমন কিছু সময় কাটিয়েছি যখন আমি কারো সাথেই যোগাযোগ রাখতাম না। নানারকম অবস্থা যাওয়ায় আমার সাথে তাদের সম্পর্কটাও খানিক জন্ম-মৃত্যুর সম্পর্কে পরিণত হয়েছিল। ফলে তাদের মৃত্যু আমাকে খুব একটা বিচলিত করেনি।
এই দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন আমি আমার বদ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করেছি মাত্র। নানারকম ওষুধ খেতাম। ফলে আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করত না। তাই এই ঘটনাটা ঠিক কখন ঘটে আর এতে করে আমার আসলে মানসিক কোনো পরিবর্তন এসেছিল কি না বা আমি শোক করেছিলাম কি না তা তেমন মনে নেই। এমনকি আমার এটাও মনে নেই যে, ঘটনাটা ঈদের আগে না কি পরে ঘটেছিল।
এরও বছর খানেক পরে, মানে চিন্তা করেন, একটা বছরে মানুষের নানাবিধ পরিবর্তন সম্ভব। তখন আমার মাথা একদম পরিষ্কার ছিল। আমি অবশ্য অনেককিছুই ঠিকমতো মনে করতে পারি না। কিন্তু আমি অতীত জীবন নিয়ে ভেবে দেখার একটা সুযোগ পাই। এবং যতটুক আমি ভাবলাম, তাতে করে আমার মনে হলো, এখন আমার সামনে দুটা পথ, চাইলে আমি পুরানো ওই অস্বাস্থ্যকর জীবনে ফিরে যেতে পারি, যা অমানুষিক খাটুনি আর নিজেকে শান্ত করতে নানান আজেবাজে অভ্যাস করা। এটা আবারো আমাকে ওই বিভ্রমপূর্ণ সময়ে নিয়ে যেতে পারে। অথবা আমি চাইলে এখন আমার পরিচিত সবকিছু ছেড়েছুড়ে নতুন কোনো মুক্তির পথ খুঁজতে বেরিয়ে পড়তে পারি।
এরপর আমি এক দীর্ঘ সফরে বের হই। ইবনে বতুতার মতো দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিভিন্ন এলাকা দেখা, সেইসব এলাকার মানুষদের সাথে কথা বলা, তাদের আচার-আচরণ লক্ষ্য করা ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। আমি কোনো দর্শনীয় স্থানকে আমার সফরের গন্তব্য বানাইনি, কারণ সব দর্শনীয় স্থান, তা যতো সুন্দর আর প্রাকৃতিকই হোক না কেন, সবই নষ্ট হয়ে গেছে। মানুষ যেখানেই নিজেদের বিনোদন থেকে শুরু করে বাসস্থান হিসেবে নির্বাচন করতে চেয়েছে সেসব জায়গা হয়ে গেছে সীমানা কেন্দ্রিক ছোট্ট পরিসর আর বাসি ডাল জমে যেমন উপরে লাল নীল সবুজ হলুদ বিচিত্র রঙের ছত্রাক ধরে ঠিক সেরকম। তাই আমি গেছি দূরে, যেখানে কেউ যায় না, যেখানে আজনবিকে মানুষ সহজেই আলাদা করতে পারে, কিন্তু তা নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা হয় না বা দশ টাকা বেশি ভাড়া নিয়ে তাকে ঠকানোর চিন্তাটা তাদের মাথায় আসে না।
এই সফরে আমি বিভিন্ন রকম কাজ করেছি। কখনো বাসের হেল্পারি, কখনো নিতান্ত বাধ্য হয়ে ভিখিরি সেজেছি। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে রাস্তা নির্মাণের কাজ আর হোটেলে বয়ের কাজ করেছি। হোটেলে বয়ের কাজ করার উপকারিতা হলো, আপনার নিজ খরচে আর খেতে হবে না, হোটেল থেকেই আপনি বাসি ডাল ভাত বা তেল চপচপ পরোটা টক টক সবজি সহকারে খেয়ে নেওয়ার অবাধ সুযোগ পাবেন। আমি সীমান্ত অঞ্চলে চায়ের বাগানেও কিছুদিন কাজ করেছি। কিন্তু কাজটাকে আমি ঘৃণা করেছি এই জন্য যে, দিনশেষে তারা আমাকে উলঙ্গ করে তল্লাশি চালাত, যাতে করে আমি কয়েকটা চা পাতা চুরি করে নিয়ে যেতে না পারি। চায়ের পাতা আর ব্যাংকের নোটের ব্যাপারটা একই।
তবে উত্তরের সীমান্ত অঞ্চলে কিছুদিন তামাক নিয়ে কারবারের সুযোগ আমি পাই। আলমগীর নামে এক তামাক চাষী, যার কাজ হলো অতিরিক্ত বকবক করা আর তামাকের পাতা শুকিয়ে অর্ধেকটাই পুড়িয়ে নিঃশেষ করা। এই চাষীর সাথে আমার চুক্তি ছিলো, আমি তার তামাক পাতার বস্তাগুলা শহরে নিয়ে তামাক কোম্পানির কাছে দিয়ে আসব আর সে আমাকে লাভের পনেরো পার্সেন্ট দেবে। সে নির্দিষ্ট একটা ভাড়া দিয়ে দায়িত্ব চুকিয়ে ফেলতে চাইছিল। কিন্তু আমি তাকে বলি, এটা যদি আমরা ব্যবসায়িক চুক্তির মাধ্যমে সম্পাদন করি তাহলে তোমার লস আমারও লস আর তোমার লাভ তো আমারও লাভ। এইভাবে যদি আমরা চুক্তিতে আসি তাহলে দেখো, তোমার লস হলেও তুমি লাভ করছো, কারণ আমাকে তোমার অতিরিক্ত ভাড়াটা আর দেওয়া লাগছে না।
সে তখন রোদে শোকানো কড়কড়ে তামাক পাতা গুড়ো করে কাগজে পুরে কাগজের শেষ দিকটা ছ্যাপ দিয়ে ভিজিয়ে গোল করে রোল বানানোতে ব্যস্ত। সুন্দর করে বেশ মোটা একটা রোল বানিয়ে আমার দিকে বাড়িয়ে বলল, নাও তামাক খাও আর এই তামাক চাষীকে শরিক হিসেবে সম্মান করো। সংস্কৃতিটা খানিকটা ভিনদেশি সংস্কৃতির মতো, কোনো একটা আকদ করার পর মদের গ্লাসে মদ ঢেলে সম্মান প্রদর্শন করা। আমি তামাক পোড়াতে আপত্তি করিনি। কারণ তামাক চাষীদের হোগা মারে সিগ্রেট কোম্পানি, আর তাই সিগ্রেট না খেলেও এরকম প্রাকৃতিক তামাক সেবন করা যায়। আমি একটা পরিকল্পনাও নিয়েছিলাম যে, আমি এইরকম ব্যবসায় নামব, তামাক চাষীদের ন্যায্যটা বুঝিয়ে দিয়ে হাতে বানানো পাছাহীন কাগজে মোড়া তামাক বেচব।
তবে আমি যেহেতু পরবর্তী মঞ্জিলে যাওয়ার জন্য পয়সা জমাতেই এখানে এই তারছিড়া চাষীর সাথে চুক্তিতে আসি তাই পয়সা হয়ে গেলেই আমি চাষীকে বিদায় জানিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। তবে দীর্ঘ পদব্রজ এই সফরে এক জোড়া ভালো জুতা, সেটা রবারের হোক বা চামড়ায় মোড়ানো গদগদে তুলুতুলু জুতাই হোক না কেন; দারুণ অভাববোধ করছিলাম এই জন্য, যে এই শক্ত আর ক্ষয়ে আসা জুতা জোড়া আমার জন্য দারুণ ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এই জুতা জোড়ার কারণে আমি তানসেফ হারাকাত তাহরির নামক গানের কনসার্টে প্রবেশের অনুমতি পাইনি। কী জন্য পাইনি তা আমি জানি না। কারণ জুতার জন্য কাউকে গান শোনা থেকে বারণ করা যেতে পারে এটা আমার কাছে ছিল অকল্পনীয়।
গান শোনাটা আমার জন্য জরুরি ছিলো না ঠিক। কিন্তু এরকম কিছু মজলিশে আমার বসার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে আকাশ-বাতাস, গাছপালা গাইছিল আর মানুষেরা তাদের সাথে তাল মিলিয়ে মৃদু সুর ভাজছিল। সেইসব মজলিশে বাতাসের সুর শোনা গেছিল, বাতাস আমাকে বলছিল অজানার কথা, আহ্বান করছিল সমুদ্রের দিকে আর আকাশ আমাকে মাটিতে হাঁটতে বলছিল ঠিক ওই দূরত্ব পর্যন্ত, যেখানে আকাশ এসে মিশে গেছে মাটির সাথে আর গাছপালা বলছিল, যেও না আরো কিছু সময় থাকো, আমার মরা পাতা বিছিয়ে বসো আর ঝরে পড়া পাতাগুলার আদর নাও আর এই ধুলোহীন জনবিরল ভূমিতে শ্বাস নাও ফুসফুস ভরে।
আমাকে একজন বলেছিল, কখনো য়াসমিনের বাগানে গিয়েছি কি না। আমি কখনো য়াসমিনের বাগানে যাইনি জেনে সে আমাকে বলছিল, তুমি কি জানো প্রতি বসন্তে কত কত বিড়াল সীমান্ত পেরিয়ে য়াসমিনের বাগানে যায়? আমি তাকে জানাই যে, বিড়ালরা যে সীমান্ত পার হয়ে ওপাশে যায় এটাই আমি জানি না এবং এটা নিয়ে আমার কোনো মাথা ব্যথা নাই। তখন সে অবাক হয়ে বলেছিল, অসংখ্য বিড়াল এরকম চলে গিয়েছে। য়াসমিনের বাগানটা কোন দিকে, নিতান্ত কৌতূহল থেকে তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমি। সে বলল, এটা ঠিক যে য়াসমিনের বাগান সীমান্তের ওপারে। সীমান্তের ওপারে সবকিছু একই, ওখানে দিক-টিকের এত গুরুত্ব নেই। এই প্রথম আমার মাথায় বিড়াল এবং য়াসমিনের বাগানের ব্যাপারটা ঢুকল। এর আগেও সীমানার ওপার সম্পর্কে কিছু আজব আজব তথ্য পেয়ে আসছি। বিভিন্ন জনপদে সীমানার ওপারের নানান আজগুবি কাহিনি প্রচলিত আছে। যেমন সাগর তীরের লোকেরা বলে এল বাকা পোর্ট নামে একটা দ্বীপ আছে যেখানে মানুষ স্পঞ্জ সংগ্রহ করে জীবিকা নির্বাহ করে। আবার কেউ বলে এল জলাম নামে একটা রেস্তোরার কথা, যেখানে নাকি সবকিছু থেমে যায়। অনেকে বলে এখানে মানুষ গেলে তারা পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়। এরকম নানান কাহিনি বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
আমার মানসিক অবস্থা ভালো থাকলে আমি হয়তো এসব কাহিনি সংগ্রহ করতাম আর এগুলোর উপর সিনেমা বানাতাম বা গল্প লিখতাম। সুন্দর সুন্দর গল্পের পাশাপাশি কিছু দুঃখ ও ভীতিকর কাহিনিও শোনা যায়। আমি জানতাম না যে, এরকমই একটা কাহিনির সাথে আমি ধীরে ধীরে জড়িয়ে যাব। পরে একটা সময় আমার মনে হয়েছে, যারা আসলে সবকিছু থেকে বিতাড়িত হয় বা যাদের আর কোনো দায়বদ্ধতা থাকে না তারাই এসব কাহিনির সাথে জড়িয়ে পড়ে। কেউ আসলে চাইলেও সব ছেড়েছুড়ে লোকান্তর হতে পারে না। দেশান্তর হওয়া তো আরো জটিল প্রক্রিয়া। আমি শুধু সীমানার ওপারে কী ঘটে সেটার কথা বলছি না, এসব কাহিনি কীভাবে আমার মতো মানুষদেরকে খুঁজে নেয় সেটাই বলতে চাইছি।
এই লোক আরো অনেককিছুই আমাকে বলেছিল। কিন্তু সব কথা আমার ঠিক মনে নেই। মনে না থাকার একটা কারণ ছিল, আমার নিয়ত আমি যে রাস্তায় একবার যাব সেই রাস্তায় আমি আরেকবার যাব না। সীমান্ত নিয়ে আমি দূর-দূরান্তের মানুষের কাছে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা শুনেছি। এক পাগল লোক আমাকে এটাও বলেছিল যে, সীমান্তের ওপারে রয়েছে আরো এক সীমানা, সেই সীমানা পার হতে গেলে সব জারিজুরি ফাঁস হয়ে যায়। সেখানেও নাকি একদল মানবের বসবাস আছে যাদের মাথাটা বিড়ালের মতো আর তারা গু করে ছাগলের মতো, তারা না কি শহর কায়েম করেছে, যেই শহরের মাত্র একটা রাস্তা, যেই রাস্তা খুবই সরল। কিন্তু সেই সরল রাস্তায় নাকি খুব বেশিদূর আগানো যায় না। একদল মানুষ এর শেষ দেখতে বের হয়ে এসে পড়েছিল এক নদীর কিনারায়, যেই নদী হলো ধীরে ধীরে জমে যাওয়া বরফের যমিন, যার মাঝে রক্ত মাংস নিয়ে খুব সহজেই জমে যাওয়া যায়, আর যাদের রক্ত খুব ঠাণ্ডা তাদের মস্তিষ্ক নাকি জমে গিয়ে হিতাহিত বোধবুদ্ধি হারিয়ে দিকভ্রান্ত হয়, আর এভাবে নিখোঁজ হয়ে যায় তারা।
এই ব্যাপারে আরো য়াকিন হয় আমার এক সাধুর সাথে উত্তরে কাটানো শেষ রাতটায়। সেদিন ছিলো তীব্র শীত আর আমিও তখন প্রায় নিঃস্ব হয়ে ছেড়াখোড়া জামা কাপড় আর কনসার্টে যেতে না পারার কারণ যেই জুতা জোড়া সেটার ক্রান্তি বয়ে নিয়ে একেবারে এক চূড়ান্ত মুহূর্তে উপস্থিত হব হব করছি। সন্ধ্যেটা হয়েছিল ঠিক আমি যখন ওপাড় নামক একটা উঁচু মতো জায়গায় পৌঁছাই, এখান থেকে আমি নিচটা ঠিক ঠাহর করে উঠতে পারছিলাম না, কারণ সেখানে ছিল উত্তরের একেবারে শেষ থেকে ভেসে আসা তীব্র কুয়াশার পাল আর ছিল দারুণ অন্ধকার বয়ে নিয়ে আসা এক রাত। ওপাড়ের শেষ মাথায় আমি তখন বসে পড়েছি ক্লান্তি আর জুতো জোড়ার সাথে চিরকালীন বিচ্ছেদের বিরহ ব্যথা নিয়ে। এক ভ্যানওয়ালা তখন আমার কাছে এসে জানতে চায় আমি হেলকুন্ড যাব কি না।
আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম, হেলকুন্ড! সে আবার কী আর আমি সেখানে গিয়েই বা কী করব! তাছাড়া আমি উত্তরের দিকটা শেষ করে দক্ষিণে সমুদ্রের দিকে যেতে চাইছিলাম। এ সময়ে থাকার জায়গাটাও দরকার ছিল আমার। কারণ রাতটা নামছিল প্রচণ্ড শীত আর কুয়াশা নিয়ে আর ছিল চিতাবাঘের উৎপাত। আমি যখন ইরাদা করতে কালক্ষেপণ করছি তখন পেছন থেকে কেউ বলল, না বাহে তুই আমার সাথে থাকবি চল। পেছনে চাইতে সাধুকে দেখলাম, ছিল তার লম্বা দাড়ি আর বাবরি চুল আর ছিল সবুজ পাঞ্জাবি। বললাম ঠিক কোথায় নিয়ে যেতে চাইছেন আমাকে? উত্তরে সে শুধু বলল, বিড়ালরা যেদিকে হারায় সেই পথে।
তার কথায় সম্মোহন শক্তি ছিল কি না শীতের তীব্রতায় আমি ঠিকমতো কিছু ভাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলছিলাম কি না বা প্রচণ্ড ক্লান্ত ছিলাম; যাইহোক আমি আর কোনো প্রকার আপত্তি বা প্রশ্ন করার কথা বেমালুম ভুলে গেলাম। সোজা তার পিছু পিছু হাঁটা ধরলাম। ভেবেছিলাম সে আমাকে কোনো বটতলা বা চৌরাস্তা বা গোরস্তানে নিয়ে যাবে। কিন্তু সে আমাকে নিয়ে গেলো জগদল নামে ছোট্ট একটা এলাকায়, যা শহর থেকে আধা ঘন্টার পথ। আমি ভাবিনি সে তার নিজের বাড়িতে আমাকে নিয়ে যাবে। কারণ তার বেশভূষায় আমার মনে হয়নি তার কোনো বাড়ি থাকতে পারে। তার বাসায় গিয়ে আমি আরো অবাক হলাম, কারণ এই সাধু পুরোদস্তুর সাংসারিক মানুষ। সেই শীতের রাতে থাকার ব্যবস্থা, খাবার ও গরম জল দিয়ে আমাকে রীতিমতো অস্থির করে তুলল।
সাধুর স্ত্রী যিনি আমাকে ডাকছিলেন আব্বু বলে তাই আমিও খুব সহজে তাকে মা ডাকতে শুরু করেছিলাম নিজের অজান্তেই। এ ছাড়াও পরিবেশটা এতটাই আপন ও কোমল ছিল যে, আমি দীর্ঘ সফরে কড়ে পড়া পা, ঘা আর বিভিন্ন রকম রুক্ষতার অনুষঙ্গ নিয়েও ঠিক রুক্ষ বা বন্য আচরণ করার সুযোগ পাইনি। খেতে খেতেই সাধু তার স্ত্রীকে জানাল, আমি হারানো বিড়ালদের খোঁজে য়াসমিনের বাগান খুঁজে বেড়াচ্ছি। দেখলাম, এটা শোনার পর একটু আশা জ্বালিয়ে মুখ অন্ধকার করে মা আমার দিকে তাকাল। আমি কিছুটা আশ্চর্য হলেও ব্যাপারটা এড়িয়ে খাওয়ায় মনোযোগী হলাম, কারণ সেখানে ছিল প্রচুর ঝোল সহকারে আলু ও মাংসের সমারোহ আর ভাত আর ছিল দুই টুকরা লেবু।
খাওয়ার পর সাধু হুক্কা ও সঙ্গীত নিয়ে বসলে আমি একপাশে সরে গিয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি। সে রাত্রে তাপ নেমে গেছিল অনেকটা নিচে আর লেপের তলায় শরীর গরম হতেও সময় নিচ্ছিল অনেক। এই সময়ে নিশুতি ও নৈশব্দের মধ্যে তাদের কথপোকথন শুনতে পেলাম, মা জিজ্ঞেস করছিল, ও কি সত্যিই যাবে ওদিকে? সাধু উত্তর করেনি। তারপর আবারো কিছুটা সময় নিরবতা। তারপর মা আবারো বললেন, কিন্তু সীমানা পার হয়েছে কেউ কি এমন আর ফিরতে পেরেছে? সাধু বলল, সীমানার ওপারে শুধু মৃত্যু আছে তুমি ওর আশা বাদ দাও। এরপরে আমি যতক্ষণ জেগেছিলাম ততক্ষণ শুনেছি ফুঁপিয়ে ওঠা কান্নার দমক, বেদনা মিশ্রিত ধমক আর বিষণ্ন বাতাসের একটা চিনচিনে রিনরিনে শব্দসুর।
সকালে বেশ দেরিতে আমার ঘুম ভাঙে তখন আমি নিজেকে আবিষ্কার করি শীতহীন আবহাওয়া পানি পরিবেষ্টিত প্রশস্ত ঋজু সড়কে। আমার পায়ে ছিল নতুন একজোড়া জুতা আর হাতে ছিল ছোট একটা ব্যাগ। আমি হিসেব মিলাতে চেষ্টা করলাম, ঠিক কী ঘটল যে, লেপের তলা থেকে আমি সোজা সড়কের মধ্যখানে এসে পৌঁছালাম। ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে ব্যাগটার মধ্যে হাত ঢুকালাম যেন বা সেখানে কোনো উত্তর মিলতে পারে। ব্যাগের মধ্যে আছে একসেট নতুন পোশাক আর চর্বিগলা তেলে জমা শুকনো মাংসের একটা মাঝারি সাইজ হাড়ি আর এক টুকরো কাগজ। কাগজটা খুলে দেখলাম এটা আসলে একটা চিঠি এবং পথ নির্দেশক ম্যাপ।
চিঠিতে বলা হয়েছে,
“প্রিয় আগন্তুক,
সীমানার ওপার বলতে যা বুঝছো, যা তুমি খুঁজছো তার পুরোটাই অতি কল্পনা, লোকমুখের গুজব। আমরা একদল সীমান্ত-ছিলো-না এমন এক সময়ের, যারা এসেছিলাম প্রচণ্ড আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষার্থে আর যারা আমাদের আক্রমণ করতে চাইছিল তাদের জোট ভেঙে যায় ধাওয়া করার পথে ফেলে আসা চাষের জমি কেন্দ্রিক বিবাদে জড়িয়ে ডানে ও বামে আলাদা হয়ে যায় এবং আমাদের ভূমিকে সংকীর্ণ করতে থাকে। আমরা চাই না কেউ এভাবে বিভাজন করুক। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই বিবাদ থেকে সৃষ্ট প্লেগে আক্রান্ত হলো সমগ্র অঞ্চল, মানুষে মানুষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ভাগ হয়ে ভেঙে পড়তে লাগল। আমি পুরাণ আত্মা তোমাকে বলছি ওপাশেও তোমাকে নিয়ে তাই ভাবা হয় যা ভাবো তুমি ওপাশ নিয়ে। আমরা পুরাণ আত্মা চাই না এটা এভাবেই চলুক। তা ছাড়া বিড়ালরা কেন য়াসমিনের বাগানে যায় সেটা জানুক সবাই, দেয়াল ভাংলে ওপাশ এপাশ কি এক হবে বা এই চিন্তাকে দূর করতে বিড়ালরা কি আমাদের সাহায্য করবে, জানি না। তুমি যদি ওপাশে যাও সম্প্রীতিকে খুঁজে বের করতে চেষ্টা করবে, সে হয়তো এর উত্তর খুঁজে পেয়েছে বা মারা পড়েছে। দক্ষিণের পথে তোমাকে এগিয়ে দেওয়া হলো, তুমি আরো আগাও আয়ু ফুরাবার আগে।”
দক্ষিণ বলতে আমি বুঝছিলাম, সমুদ্র আর বিশাল জঙ্গল। কিন্তু যখন বেলা ফুরাল আর নদীটির ওপারের ধূসরতায় সূর্য হারাল তখন আমি আশ্রয়ের জন্য জায়গা খুঁজছিলাম। অদ্ভুত ব্যাপার জায়গাটা একদমই নিরব। ঠিক কোথায় আছি আমি বুঝতে পারছিলাম না। যেন আধার নামার সাথে সাথেই সবকিছু হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। নাকি আমি আশ্চর্য কোনো মোহ-মায়ায় আক্রান্ত হয়েছি বিধায় জগৎ আমার থেকে আড়াল হয়ে গেছে!
দক্ষিণে শুনেছি আবহাওয়া উষ্ণ থাকে। কিন্তু রাত যত গভীর হলো ততই শীতের মাত্রা বাড়তে থাকল। মধ্যরাতে আমার অবস্থা এমন হলো যে আমি পায়ের দিকটায় কিছুই অনুভব করছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমার সমস্ত শরীর বরফে জমে যাচ্ছে। আমি জানি না মৃত্যু কি খুব কাছে চলে এসেছে কি না। দূরে, অনেক দূরে আমি আগুন দেখলাম মনে হলো। দেখলাম সারি সারি বিড়াল নৃত্য করছে। আগুনের আলোয় তাদের চোখগুলোও ঠিক আগুনের মতোই জ্বলছে।
দৃশ্যটা হয়তো ভয়াবহ নয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় এমন অকল্পনীয় ব্যাপার দেখতে থাকলে আপনি স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলতে পারেন। আমার বোধ-বুদ্ধি কিছুই কাজ করছিল না। আমি ভেবেছিলাম যে, এই বিড়ালগুলি সীমানার ওপারে কেন হারায়, বা বিড়ালগুলি কেন আর ফিরে আসে না। এরচেয়ে বড় ব্যাপার ছিল বোধহয় সম্প্রীতি।
সম্প্রীতিকে আমি চিনি না। কিন্তু আমার মনে তখন এটাই গেথে ছিল যে, সম্প্রীতির কাছেই আমি সবকিছু সম্পর্কে জানতে পারব। আমি হয়তো ভাবছিলাম বা হয়তো এই বার্তাটি কেউ আমাকে দিয়েছে যে, সীমানার ওপারে সবকিছু অনিশ্চিত, কিন্তু ওখানে গেলে আমি সম্প্রীতিকে খুঁজে বের করব। তার কাছে এই আজনবি অঞ্চলের অনেক জ্ঞান রয়েছে।
কিন্তু ব্যাপারটা কি অলীক! কারণ আমার পায়ে শেকল, তীব্র শীতে আমি ধীরে ধীরে অবশ হয়ে যাচ্ছি। আর বিড়ালগুলি আগুন ঘিরে অনবরত নৃত্য করে চলেছে। যেন এই শীতল জগতে নরকের দরজা খুলে গেছে আর শয়তানগুলি বিড়াল বেশে নেচে যাচ্ছে। বা এই উপাসনার মাধ্যমে খোদ ইবলিশকেই দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে কি না।
এই নারকীয় নৃত্য কি শেষ হয়েছিল? এই প্রশ্নের উত্তর আমার জানা নাই। এই নৃত্যের আগে কি চলছিল, জানা নাই। আমার যদ্দূর মনে পড়ে একটা ছোট্ট কামরায় শেকলে বাঁধা আমি, শরীর সম্পর্কে সম্পূর্ণ বেখবর। এবং এটাই ছিল সেই মুহূর্ত যখন আমি আবিষ্কার করি যে, একটা ট্রায়াল চলছে।
কয়েকজন মানুষ এই বিচারিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে। তাদের আলাপে যা বুঝলাম যে, তারা একেকজন একেকরকম দাবি তুলছে। কোনোটিই মুক্তির দাবি না। সকলেই চাচ্ছে এই ট্রায়ালে অপরাধী সর্বোচ্চ শাস্তিটা পাক। কিন্তু সেটা কীভাবে, এটাই কেউ নির্ধারণ করতে পারছে না।
একজন বলছে, সে সব জানে আর তার কারণে ইতিমধ্যে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাকে সরিয়ে দেওয়াটাই সবচেয়ে ভালো হবে। অন্যজনের বক্তব্য হলো, তাকে সরিয়ে দিলেও এটা নিয়ে জনরোষ তৈরি হতে পারে। সে কোর ডিজাইনের ভিতর ঝামেলা বাঁধিয়ে দিয়েছে। এখন তাকে একেবারে সরিয়ে দেওয়াটাও একটা সমস্যা সৃষ্টি করবে। আরেকজন বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, তাইলে ওরে নিয়ে করবেনটা কী?
সর্বশেষ তাদের মধ্যে বয়স্ক একজন—যাকে তাদের নেতা মনে হচ্ছিল—সে বলল, আপাতত তাকে আটকে রাখা যাক গোপন কোথাও। এর ভিতরে আমরা তাকে এমনভাবে উপস্থাপনযোগ্য করে তুলব যাতে করে সেও ভুলে যায় সব আর মানুষের মন থেকেও এসব আইডিয়া মুছে যায়।
সবাই এটায় স্থির হলো। সর্বশেষ তারা আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, এটাই চূড়ান্ত। আমি কী বলব, আমার তো বলার মতো অবস্থা নাই। আমি জমে আছি তীব্র শীতে, আমার জিহ্বা নাড়ানোর মতো ক্ষমতাও তখন নাই। আর আমি শুধু দেখছি আগুনের কুণ্ড ঘিরে বিড়ালদের উন্মাদ নৃত্য।
এই নৃত্যটার ব্যাপারে আগেও বলেছি যে, তীব্র শীতে এমন উন্মাদনার দৃশ্য কিছুক্ষণ দেখতে থাকলে মানুষের স্মৃতিশক্তি লোপ পায়, বিবেক-বুদ্ধি একদম হারিয়ে যায়। ফলে কোনোকিছুই বিচার করা যায় না, সিদ্ধান্তও নেওয়া যায় না। ব্যাপারটা পেন্ডুলামের মতো। একটানা চোখের সামনে ঘুরতে ঘুরতে আপনাকে অন্য এক জগতে নিয়ে যাবে, যেখানে কল্পনা ও বাস্তব এমনভাবে মিশে যাবে যে, মনে হবে এই নৃত্য একটি আজগুবি সিনেমার অংশ, আবার কখনো ভাববেন সম্প্রীতি কই!
এর ভিতর দিয়েই একটা নিরব ট্রায়ালের কার্যক্রম চলতে থাকবে। যেমন কোনো এক অজানা জায়গায় আর্মি ফেছেলেটির ভিতর মানুষকে বড় একটা কাঁচের বাক্সে রেখে বিভিন্ন পরীক্ষা চালানো হয়। আমি জানি না দীর্ঘদিন বাঁচব কি না, খোদা আমার প্রতি রহম করুন। যদি আমি অতদিন পর্যন্ত বেঁচে থাকি তাহলে আমি কি কিছু মনে করতে পারব কি না? কারণ আমার কল্পনা আর স্মৃতি এমনিভাবে মিশে গেছে যে, আমি কোনো ব্যাপারেই কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। এমন অনেক কিছুই আমার মাথায় আসছে আর যাচ্ছে যেগুলির অস্তিত্বের বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।