‘ক্রিয়েটিভিটি হল কেয়ামত দিবসরে মাথার ভিতর বন্ধ কইরা নেওয়া’

সাক্ষাৎকার গ্রহণ : মিজা হাশমি

শেখ মুজাহিদুল ইসলাম

নাম কুদসিয়া বানু। পয়দা ফিরোজপুর, পুর্ব-পাঞ্জাব গ্রামে। দাম্পত্য-হাইছিয়ত : শাদিশুদা। সন্তান-সংখ্যা : মাশাল্লাহ তিন ছেলে। ব্যক্তিগত শখের কাজ : লেখা, পড়া, রান্না করা, সফর করা। গর্বের কোনো মুহূর্ত : যখন নাতি-নাতকুর কেউ নিজ থিকাই আমার কাছে আইসা পড়ে। হতাশার কোনো মুহূর্ত : যখন নিজের কথা-কাজ দ্বারা ইশফাক সাহেব বা কোনো সন্তানরে ব্যথা দেই। কোনো এমন কমজোরি যা আমারে অনুতপ্ত করে : দুপুরের খানা খেয়ে আরাম করে শোয়া। এমন কোনো খুবি যার উপর আমার ফখর হয় : খুবি আমার কাছে খারাবিরই বিপরীত; তাই কোনো খুবির উপর কখনো ফখর করারই খেয়াল আসে নাই। নিজের প্রতি আমার পয়লা সুয়াল : আমি কি বান্দার হক আদায়ে কামিয়াব থাকছি?


 মিজা হাশমি : আমি আপনাকে জিজ্ঞেশ করতে চাই, কবে বা কোনো বয়সে আপনার এই চিন্তা আসল, বা কবে এই পাক্কা ইরাদা আপনি করে নিলেন যে, আমি রাইটারই হব? 

বানু কুদসিয়া : প্রত্যিটা মানুশ, যে কোনো না কোনো সৃষ্টিশীল কাজ করে, জীবনে তার সবার আগে যেই জিনিশের মোকাবেলা করতে হয় তার নাম নিঃসঙ্গতা। সেই নিঃসঙ্গতা, যখন মানুশ ফয়সালা করে যে, আমি আমার ভাইবোন থেকে আলাদা, আমি আমার মা থেকে আলাদা, আমি আমার বাপ থেকে আলাদা, আমি আমার বন্ধুদের থেকে আলাদা, এবং আমার সম্পর্কগুলা বেশি দূর চলে না। এ ফয়সালার ফলে সে এক বিশেষ ধরণের খোলসের ভিতর চলে যায়। রেশমের যে খোলস (গুটি) থাকে না? সেরকম। ওখানে যেয়ে তার এহসাস হইতে থাকে, তার কিছু একটা করতে হবে। খুব জলদি তার জানা হয় না তার কী করতে হবে—আমার কি আইন্সটাইন হইতে হবে, না আমার ফয়েজ ছাহেব হইতে হবে, নাকি আমার মীর-দর্দ হইতে হবে। জানা যায় না। কিন্তু ভিতরের ওই যে নিঃসঙ্গতা—যেমন মোতী তৈরি হয়—ওই নিঃসঙ্গতাও তেমনই কিছু তৈয়ার করতে শুরু করে। কিছু লোকের জীন্দেগির শুরুয়াতি পর্বেই এমনসব মুহূর্ত মিলে যায়, যে তার প্রচণ্ডভাবে এহসাস জেগে যায় এবং খুব জলদি এ নতিজায় সে পৌঁছে যায়, যে আমার ম্যাথমেটিশান হইতে হবে। কিন্তু কিছু কাজ এমনও থাকে মিজু, যেগুলোর কথা শেষ অবধি জানা যায় না যে, আমার এই কাজই করার কথা ছিল, আমি এই কাজের জন্যই আসছিলাম।

 ওই লোকেদের মধ্যে একজন আমিও।

আমার আজ তরি জানা নাই আমার জীন্দেগির মাকছাদ কী, কী জন্য আমি এইখানে আসছি। আমার কাজ কি বাচ্চা পালা? না আমার কাজ স্বামীরে মাইনা যাওয়া কিংবা তার মহব্বতে সমস্তরকমভাবে গ্রেফতার হয়া থাকা? নাকি আমার কাজ এইটা যে, আমার লিখতে হবে? এই জন্য হয়তো আপনি দেইখা থাকবেন, নিজেরে তালাশ করবার জন্য, আপনারে জানবার জন্য বিগত দশটা বছর কি নিদারুণ কষ্টের ভিতর আমি পার করছি, যাতে জীন্দেগির আশল মানেটা আমার মালুম হয়ে যায়। কিন্তু আপনার যেই সুয়াল—যার ছোট্ট ভূমিকা ছিল এতক্ষণ যা আমি বললাম—তার জবাব হল ৫ম ক্লাশে থাকতেই আমার এ কথার বুঝ হয়ে গেছিল যে, আমি হয়তো লিখব। আর যেমনটা আপনারে বললাম, আমার যদি নিঃসঙ্গতা হাছিল না হইত, আমি হয়তো অন্য কোথাও বেরোয় যাইতাম, লেখক না হয়ে অন্যকিছু হইতাম 

তুমি বিশ্বাস করো, এমন কোনো কাজ নাই যার চেষ্টা আমি করি নাই। আমার চেষ্টা থাকে আমি বাবুর্চি বনে যাই, আমার চেষ্টা থাকে দর্জি বনে যাই, আমার চেষ্টা থাকে নার্স বনে যাই, বড় ডক্টর বনে যাই; এই সমস্ত মচ্ছগুলা কেমন জানি পাথর চাইটা আইসা আমারে, প্রতিবার ওই একই ঝুলিতে ঢাইলা দেয় যে—তুমি লেখালেখি করো। 

কেউ একজন কিছুদিন আগে আমারে এক স্বপ্নের কথা বলল। স্বপ্নে তার মুমতাজ মুফতির সাথে দেখা হইছে, উনি বলতেছে : ‘বানুরে বলো ফলের গাছ হইতে ফল ছাড়া আর কিছুই মেলে না। তুমি বাকি সব ছাইড়া দাও, শুধু লেইখা যাইতে থাকো।’

আমার মনে হয় আমি লেখি সবার শেষে, আর এই বাদে অন্য বহুত কিছু করি। আমি বেহুদা মশওয়ারা দেই, যার উপর অপরে আমল করবে না। আমি অন্যদের জীবনে দখলদারি করি, যা আশলে ঠিক না।

 

মিজা : কিন্তু করা থিকা বিরত হন না?

বানু : না বিরত হই না। এইসবে মানুশ মজবুর আরকি…। তারপর আমি ভুলভাল খাবার পাকাই, এক্সপেরিমেন্টাল ফুড যারে বলে; ওইটাও কারো পছন্দ হয় না, তবুও আমি পাকায়ে যাই। এছাড়া আমি ঘর সাফ করতে থাকি, যা কখনো সাফ হয়ে সারে না, কারণ আমাদের ঘরে আবার লেখার আন্দাজ, পড়ার আন্দাজ বড় অন্যরকম, ২২খানা বই এইখানে পড়া দেখবা তো ২৪খানা ওইখানে পড়া দেখবা, এগুলি সাফ হবার না। আর বড় জিনিশের তুলনায় আমাদের এখানে ছোট জিনিশ এতই যে, সাফাই হওয়া সম্ভব না। এছাড়াও আমার কোশিশ জারি থাকে আত্মীয়দের হুকুক আদায় করার—হুকুকুল এবাদ—যেইটা আমি কখনো আদায় করতে পারি নাই। বৎসরে একবার ভাইয়ের সাথে দেখা করে আসলাম, দুই সাল বাদ একবার ভাবিরে দেখে আসলাম, এবং এরেই খুউব মনে করলাম—এটা তো হুকুকুল এবাদ না। 

মানে ‘বহুমনা’ (কাসিরুল মাকাছেদ) হওয়াটা সমস্যা—হয়তো [স্বামী] জাভেদ সাহেবের এই একই সমস্যা—তাই যেই মানুশ বহুত কিছু করতে চায় এবং বহুত কিছু ভালোমতন করতে চায়, তার কিছুই ভালোমতন করা হয় না। আমার হলো এই দশা। তাই আমি পরে ঠিক করছি, যেহেতু সব আমি ভালো করতে পারি না, কিছু আমি ছেড়ে দিব, তো টেলিভিশন আমি ছেড়ে দিছি।

 

মিজা : হাঁ হাঁ, বহত আচ্ছা করছেন। 

‘লিখবেন’ আপনি ঠিক করে নিছেন, এবং লিখছেনও, আর মাশাল্লাহ বহুত নামও কামাইছেন। কিন্তু ওই মহান ব্যক্তিরা কারা,  যাদের অল্প হলেও আপনি ক্রেডিট দিবেন? 

বানু : না না, বেশি ক্রেডিট তো ‘উনার’ই প্রাপ্য। দেখো মিজু, আমার একটা নিজস্ব খেয়াল হলো যে, যেই যেইখানে সাপোর্ট-সিস্টেম ভালো, ওই ওইখানে ব্যক্তির কাজও বহুত ভালো। যেই লোকেদের জীবনে নিঃসঙ্গ হওয়ার কষ্ট সইতে হইছে না?—তাদের নিজের জীন্দেগি তো খারাপ হইছে, তাদের সাথেকার মানুশদের জীন্দেগিও খারাপ হইছে। তাই সবচে বড় ক্রেডিট তো আমার স্বামীরই। কারণ উনি শুরুতে দেখছেন, এই মেয়ে নালায়েক তো জরুর, কিন্তু সে করতে পারবে এই কাজ।

আমরা ওইসব দিনে একটা সাময়িকী বের করতাম। তোমার জানা থাকবে ‘দাস্তানগো’ নাম ছিল পত্রিকার। শাদিশুদা শুরু জীবন, আমাদের উপর তখন জাইকা বসা গরিবি। দাস্তানগো এইটুকুনি একটা পত্রিকা হইত। উনি আমারে বলছিলেন, যখন কোনো অথার এবস্কন্ডার হয়ে যাবে এবং লেখা আর পাঠাবে না, তখন মেহেরবানি করে, তুমি একটা সুডো নামে তার তরফ থেকে কাহিনি আমারে পাঠায়ে দেওয়া কইরো। 

উনি সর্বদা ঘরে আসতেন তো আমারে জিজ্ঞেশ করতেন কয় পাতা লিখছো। এইটা কখনো জিগান নাই, আজ কী পাকাইছ। আজতক কখনো জিগান নাই : কী পাকাইছ, আমরা কী খাব, বাচ্চা ঠিক আছে না নাই—বরং পয়লা সুয়ালটা আমার ব্যক্তিগতই করছেন : আজ তুমি কয় ঘণ্টা লিখছ, এবং কয় পাতা লিখছ?

দুসরা যার নাম আমি বলব, আমার মা। আমার মা আমার জন্য তা করছেন, যা হাতিয়ার হিশেবে আমার আজ কাজে আসতেছে। উনি শুরুদিন থেকে আমারে বলছেন—বাই ডিস্কাশন, কখনো ঘরে ফেসাদ করবা না। 

 

মিজা : মানে বেশি বলবা না? 

বানু : না, বেশি না, বহুত বলবা, কিন্তু মহব্বতের সহিত বলবা এবং অন্যের জুতায় দাঁড়ায়ে বলবা। নিজের জুতায় দাঁড়ায়ে থেকে বলবা না। অপরের পয়েন্ট অফ ভিউ বোঝার চেষ্টা করবা। 

এরও আগে, জীন্দেগির প্রথম যে কথা উনি আমারে শিখাইছিলেন—যখন কিনা দশ-বারো বছরেরও হব না আমি—যে : সময় নষ্ট কইরো না। এই এক ব্যাপারেই উনার জোরাজুরি ছিল—খাওয়ায়, শোয়ায়, গপ্প মারায়—এগুলারে টেবুলেইট করে নাও, এগুলার হিশাবকিতাব করে নাও। সময় বেশি নষ্ট করো না। 

তুমি বিশ্বাস করবে না, ছোটকালেও, উনি আমারে চরখা চালানো শিখায়ে দিছিলেন।

 

মিজা : যাতে ফারেগ বইসা না থাকেন? 

বানু : হ্যাঁ, ফারেগ বইসা থাকতে পারব না। যখন সবকিছু থেকে ফারেগ হয়ে গেছ, চরখা চালায়ে নাও। তো এই ব্যাপার আমারে সবচেয়ে বেশি ফায়দা দিছে। দ্বিতীয় ব্যাপারও যথাসম্ভব এজন্যই উনি আমারে বুঝাইছেন যে, যদি ঝগড়ায় পড়ো, ফেসাদে পড়ো, সময় নষ্ট যাবে। এটা প্রথমটারই একটা শাখাগত ব্যাপার।

তো আমি উনার বড়ই শুকুরগুজার। এখনও যদি আমি বাইরে বসে আছি আর কিছু ভাবতেছি, উনি দেখলে বলবেন : কিসে সময় নষ্ট করতেছ?

তেসরা হল, আমার এক অওরাত আছে, আমার খানা পাকানেওয়ালি। আমি সবচেয়ে বেশি তার শুকুরগুজার। ও না মিজু, এক আজিব কাজ করছে। ও আমার কাজবাজ বুঝে না। আনপর, বিলকুল আনপর ও। আমার সাথে তিরিশ বছর ধরে আছে।

শুরুদিনে ও আমারে জিজ্ঞেশ করল যে, আপাজি আপনি এগুলা কী করেন, মেঝেতে কেন বইসা থাকেন; আপনি শুয়ে নেন। আমি বললাম, বইন, এটা হলো আমি কোনোরকম লেখালেখি করি। সে বলল আল্লাহ বরকত দেয়? আমি বললাম হাঁ বড় বরকত দেয়। তো ওই তিরিশ বছরে যখনই আমি বাবুর্চিখানায় যাব, সে আমারে বলবে যে, আপা, আপনি এগুলা না করেন, আপনি বরং যান লেখেন-পড়েন। আমি এইটা করে নিতেছি, ঘণ্টাখানিক পর আইসা দেইখা নিয়েন। তো সবচে বেশি শুকুরগুজারি ওর, কারণ ও আমার লেখালেখির সময় বিয়ানবেলারে, ব্যস্ততা থেকে ফারেগ কইরা দিছে। 

 

মিজা : আমি আপনারে জিজ্ঞেশ করতে চাই—আপনার যেই ক্রিয়েটিভিটির আমল, তারে আপনি কিভাবে ডিস্ক্রাইভ করবেন? আপনার কী কাইফিয়ত হয় তখন, এবং তারপর অথবা তার ফলে? 

বানু : এক গুমনাম কবির সাথে দেখা হইছিল অসলোতে। ওই কবি বড় খুবসুরত কিছু কবিতা লিখছিল, কোনোটাই কোথাও ছাপে নাই। সে পরে ট্রান্সলেট করে আমারে দুই-তিনটা পাঠায়। 

সে লিখছে : ক্রিয়েটিভি হইল এমন জিনিশ, যেন কেয়ামত দিবসরে নিজের মাথায় বন্ধ কইরা নেওয়া। কেয়ামত দিবসরে! বলে যে এত বড় কেয়ামত ঘটে মাথার ভিতর, যে মানুশ নিজের দিল-ও-দিমাগে—দিলের তো তাদের কাছে তাসাউয়ুর ছিল না—তো দিমাগের ভিতরে, কেয়ামত দিবসরে বন্ধ কইরা নিছে; সে তারে আর ঠিক থাকতে দেয় না। না সে রাতে ঘুমাইতে পারি, না দিনে। 

আপনি এমনে বুঝেন যে—কোনো কেতলি চড়াইছেন পানির, আর তার স্টিম বেরোনোর রাস্তা বন্ধ করে দিছেন—তো যা কিছু তখন পানির উপর দিয়া যাইতে থাকে, একজন ক্রিয়েটিভ মানুশের উপর দিয়া আশলে তা-ই যাইতে থাকে।

এইটা এমন এক আজিব কর্মকাণ্ড—যেই আম মানুশ আপনার চারপাশে আছে, সে এইটারে বুঝতে পারবে না। আপনি মুখ বানায়ে বসে আছেন, আপনার চোখ ভয়ংকর হয়ে আছে, চলতে-ফিরতে আপনার চেহারা থিকা আজিব রকমের, ভয়ানক যারে বলে, এক্সপ্রেশন আসতেছে; মূলত, আপনি কোনোকিছু ক্রিয়েট করার একেবারে নজদিক আছেন। এখন আপনি নিঃসঙ্গতা খুইজা বেড়ান। লোকে বলে দেখো কেমন দাম্ভিক মানুশ, আমি তারে সালাম দিলাম সে জবাব দিল না। আশলে ওই লোক তার নজরেই আসে নাই। তার জানাই নাই যে, এই চেহারা তার পাশ দিয়া অতিক্রম করছে। বাজারে আপনি নিজের ব্যাগ ভুইলা আসবেন। বেশি পয়শা দিয়া আসবেন কিবা বেশি পয়শা নিয়া আসবেন। ওই লোকেরা বুঝবে না যে, সে আশলে এখন অন্য কোনো জগতে আছে এবং অন্য কোনো কাজে মশগুল আছে। 

তো সব ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টই, ভিতরে ভিতরে এক উথালপাতাল করা জীন্দেগি পাড় করতে থাকে। যেনবা অনেকগুলা জিনিশ একসাথে মিশে আছে তারে সর্টাউট করতে হবে। যেমন আপনার সফরে বেরইতে আধঘণ্টা আছে, আর এই সময়ের মধ্যে আপনার প্যাকিংও সাড়তে হবে—এইরকম; তো এমন হাল থেকে যখন কোনো ব্যক্তি বের হয়ে আসে, সে তখন ওই ক্রিয়েটিভিটির উপর খুশি হয় না, বরং সে ওই আজাব থিকা মুক্তি পাওয়ার কারণে খুশি হয়। ডু য়ু গেট মাই পয়েন্ট? 

 

মিজা : আমার একটা সুয়াল, যেটা আমার অনেক মন চায় লেখকদেরকে জিজ্ঞেশ করতে যে—সঙ্গীত তো রেওয়াজের দ্বারা ঠিক হয়ে যায়, খানাপাকানোও রেওয়াজের দ্বারা হয়ে যায়… 

বানু : হাঁ ঠিক আছে, পৌঁছায়েই যায় কোনো না কোনো লেভেলে, যদিও আমার ওরকম কিছু হয় নাই, অত প্রেক্টিস নাই আমার রান্নায়। 

 

মিজা : কারণ আপনার এটা প্রেক্টিস করারই নাই? 

বানু : হাঁ কারণ এটা আমার প্রেক্টিস করারই নাই। 

 

মিজা : তো লেখালেখিও কি প্রেক্টিসের দ্বারা ভালো হয়ে যায়, পলিশড হয়ে যায়, বেহতর হয়ে যায়? লাইক আ স্কিল ইউ ক্যান প্রেক্টিস এন্ড ম্যাক ইট বেটার?

বানু : দেখো তুমি বড় ভালো একটা কথা বলছ। এর জবাব হল তরমুজের মেছাল।  যদি তার বিজ ভালো হয় এবং বালুময় মাটিতে ভালো মৌসুম দেখে ভালোমতন এরে বুনা হয়, তাহলে অবশ্যই এটা ভিতর থেকে লাল রঙের বের হবে। আর যদি তারে ভিজা মাটিতে বুনা হয়, তার বিজও তেমন ভালো না হয়, তো স্বাভাবিকভাবেই তারে যখন তুমি কাটবা, সে শাদা রঙের বের হবে। এরকমই হল ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টের উদাহরণ। যদি তার ভিতরে পোটেনশিয়ালিটি থাকে, সৃষ্টির শক্তি থাকে, এবং এ কাজের জন্যই তারে বানানো হয়ে থাকে—তো তার যদি মহল ভালো মিলে যায়, কোনো এক টাইমে যেয়ে ভালো সঙ্গী মিলে যায়, কোনো এক টাইমে যেয়ে ভালো উস্তাদ মিলে যায়—তুমি দেখবা যে তার কাজ বহুত ভালো হবে। কিন্তু আবার কেউ আছে তার সুর ভালো না, চব্বিশ সাল ধরে রেওয়াজ করে যাইতেছে—সে কোথাও পৌঁছতেছে না। তো এইজন্য, সবচে বড় ব্যাপার যা হইল—আল্লাহর তৌফিক। 

 

মিজা : আপনি বিবিও, মাও, শাশুড়িও, মাশাল্লাহ আবার বানু কুদসিয়াও, একজন রাইটারও।  এগুলারে প্রায়রোটাইজ করেন একটু। ওয়াটস কাম ফার্স্ট। 

বানু : জি। সবচে আফসোসের সাথে বলতে হয়, আমি সবচে খারাপ শাশুড়ি। কারণ আমি ওই সময়টুকু আমার বাচ্চাদের, গ্র‍্যান্ডচিলড্রেনদের, বা আমার বউমাদের দিতে পারি নাই, যা এতগুলো রোলের মধ্যে বাটোয়ারা হয়ে গেছে।  দুসরা যেই রোল আসে, মা—মাও আমি ভালো ছিলাম না মিজু। এইকারণে ভালো ছিলাম না যে আমার কাছে ওইটুক সময় ছিল না, যা একজন প্রোফেশনলেস নারীর কাছে থাকে। 

 

মিজা : কোয়ালিটি অফ টাইমও তো জরুরি? 

বানু : না বেটা, কোয়ালিটি অফ টাইমে আমি বিলিভ করি না। সূর্য সবসময় যেইদিকে যাবে, সানফ্লাওয়ারের মুখ তার পিছে পিছে সেইদিকে যাবে। বাচ্চাও এইরকম, যেদিক তার মা যাবে, তার মুখও ওইদিক যাবে। আর আমি আমার বাচ্চাদের থেকে ও বিবিদের থেকে বড় শরমিন্দা। 

 

মিজা : শাশুড়িও আপনি ঠিক না? 

বানু : হা। 

 

মিজা : দাদিও ভালো না! 

বানু : দাদি তো নাইই আমি। 

 

মিজা : আচ্ছা মাও আপনি নিজেরে ভালো মনে করেন না, বিবি কেমন সেটা আলাদা আলাপ করব। তা রাইটার কেমন আপনি, রাইটার ভালো? 

বানু : এইটা অন্যরা বলবে। এইটা তো মিজু তুই বলবি, রাইটার ভালো কি না।

 

মিজা : এই ফিল্ডে এসে, রাইটিংয়ের কথা বলতেছি, কোনো রিগ্রেট আছে আপনার?

বানু : আমার মত লোকেদের, যাদের ভিতর হীনমন্যতাবোধ আছে, তারা এইটা ভাবতে থাকে যে, কাম তো এখনো করিই না আর ঘন্টি বেজে গেছে চলে যাওয়ার—কী হবে এখন?  বড় কাম হইতে পারে নাই মিজু। কারণ আমার কাছে এইটাই মনে হয় এইখানে যে, কাছিরুল মাকাছেদ (বহুমনা) হয়ে যাওয়া। অনেকপদের কাজ কইরা নেওয়া এবং করতে চাওয়া; এইটা খারাপ ব্যাপার আশলে। 

 

মিজা : ওয়াট ইন্সপায়ার্ড য়ু টু রাইট? ওয়াট ইজ ইট? 

বানু : মিজু, যখন কোনো একটা ড্রামা তৈরি হয়, তখন সেখানে ব্যাপক কনফ্লিকটের জজবা থাকে। তোমার আশপাশের পরিমহলে ইনজাসটিস হইতেছে, যারা সাম হিউমান বিয়িং; অথবা তোমার আশপাশে জুলুম হইতেছে না, কিন্তু কোনো বিশেষ একজনরে পিষে ফেলার কসরত হইতেছে; অথবা বেইনসাফি হইতেছে না কিছুই হইতেছে না, কোনো খারাবিই নাই, কিন্তু আশপাশে কেউ একজন টুপ করে চুপ হয়ে গেছে, কিচ্ছু বয়ান করতেছে না—তখন তোমার মনে তালাশ শুরু হয় : এ এমন কেন? এ এমনে থাকে কেন? সাতদিন ধরে এ গোশল করে নাই কেন? কাপড় বদলায় নাই কেন? 

‎কখনো তুমি দেখবা যে রাতের দশটা নাগাদ এমন ঘটনা ঘটবে—একজন মানুষ তোমার ঘরে থাকতেছে, ঐ মানুশ দেয়ালের মধ্যে মাথা ঠেকায়া বইসা আছে আর তুমি তার পাশ দিয়ে যাইতেছ—এটা তোমার সাথেও হইতে পারে, আমার সাথেও হইতে পারে, যে কারোর সাথেই—তো তারে অতিক্রমকালে সকল তানহাঈ খামোশি আর রাত্রতা পারি দিয়া তোমার নজর তার চোখে যায়া পড়ে। সেই চোখ তখন আর কোনো ইনসানী চোখ থাকে না, জানোয়ারের চোখ বনে যায়। জনোয়ার বলার উদ্দেশ্য, যে বুঝতে পারে না যে কেন এমন হইতেছে। জানওয়ারও তো বুঝে না। তুমি কুকুরের, বিড়ালের চোখ দেইখা থাকবা। তার ভিতরে কনফিউশন আর পেনিক থাকে—এবং আরেকটা জিনিশ থাকে—উদাসীনতা।‎

‎এরকম বহু চেহারা আমার মনে আসে যখন আমি লিখতে বসি। তাদের চোখ আমার মনে পড়ে। এখন যেমন তোমার চোখ আমার নজরে আসতেছে, এটা পরে আবারও আমার নজরে আসবে। তো এগুলি আমারে আগ্রহী করে, যে এই মিজুর সাথে আমি আবার মিলিত হই, ওইভাবে না মিলতে পারি তো কাগজের মাধ্যমে মিলত হই, এবং জানি যে, ঐ চোখের দিলের ভিতরে আশলে কী আছে? সে কেন এইভাবে চিন্তা করে? আর কখনোসখনো, আল্লাহর মেহেরবানিতে ইনসাইট-ই আসা শুরু হয়ে যায় যে, খুব সম্ভবত এই লোক ওই মুসিবত গুজরাইতেছে।

হালকা পাতলা কাশফের মাধ্যমেই।

কামরায় দাখেল হইতেই মানুশদের বডিলেঙ্গুয়েজ কিছু বইলা দিতে থাকে, তাদের চোখ কিছু বলে, তাদের লেবাস দেইখা কিছু বুঝা যায়। তো যখন লিখতে থাকি, কখনো কিছুই মওজুদ থাকে না মিজু—চিন্তা করতে করতেই একটা চেহারা চইলা আসে। সে জানলায় দাঁড়ায় আছে, দু–র দেখতেছে—এখন তোমার নিজের ধারণা কইরা নিতে হবে যে, তার স্বামী মারা গেছে, বা তার চাকরি ছুইটা গেছে, বা তার বাচ্চার অসুখ হইছে, কিংবা এই মেয়ে তার তৃতীয় বিবাহ পার করতেছে, অথবা তার প্রিয়জন তারে ছাইড়া গেছে। এমন বহু প্রশ্ন আসতে-যাইতে থাকে আর এগুলিই রাস্তা দেখাইতে থাকে। এইটা এমন যেনবা কেউ ভুলভুলাইয়ায় দাখেল হয়ে গেছে; তো পথ দেখা যাইতে থাকে আস্তে আস্তে। তারাই হাত ধরে ধরে পথ দেখায়ে নিয়ে যায়, যাদের চোখ তোমার নজরে আসা-যাওয়া করে।‎

বহুসময়, পড়তে পড়তে রাতে, কোনো এক বাক্য তোমারে স্ট্রাইক করে যাবে, যেটা অমুক খবরের কাগজে নাই বা অমুক আর্টিকেলে নাই, তুমি যেইটা পড়তেছ। 

যেমন উদাহরণত বলি, একটা গল্পের শুরু হিশেবে আমি এই বাক্যটা লিখছিলাম, “তার দিলের ভিতর দুখ-অভিমানের যেই কাইফিয়ত ছিল, তা একদিনে পয়দা হয় নাই।” এখন এই বাক্যটা একা আছে, কিন্তু পরে যেয়ে এটা অপরাপর ঘটনার সাথে মিলে যাবে।  

তুমি একিন করো, আমি কোনোদিন কোনো প্লট-কাহিনি শুনে—হোক সেইটা সত্য—গল্প লিখতে পারি নাই। আমি কারো থেকে কাহিনি ধার নিয়া, আশপাশের ঘটনা দেইখা, কখনো কিছু লিখতে পারি না। কারো ব্যক্তিত্ব তরি আমি লিখতে পারি না! যদিও [মুমতাজ] মুফতি সাব এইসবে বড় বাদশা মানুশ ছিলেন।‎

‎আমি কোনো খুশবু অনুসরণ করে লেখি। আমার কাছে যেখান থেকেই খুশবু আসে, ঘটনার, কনফ্লিকটের, কাহিনির—আমি তা ধরে ধরে যাইতে থাকি, আগে যেয়ে কখনো ফুলের দেখা মিলে যায়, কখনো বা আবার মিলে না।‎

‎কোনো আর্টিস্টই নিজের ক্রিয়েটিভিটি অনুসারে তোমারে কিছু বলতে পারবে না। কারণ ফুল কখনো বলতে পারে না যে, তার মধ্যে খুশবু কিভাবে পয়দা হয়। কোনো ফুলই না। তুমি নার্গিসকে জিজ্ঞেশ করতে পারো, গোলাপকে প্রশ্ন করতে পারো। কোনো ক্রিয়েটিভ আর্টিস্টই তোমারে সেই জ্বিনের ব্যাপারে বলতে পারবে না, যে তার পিছনে লাইগা আছে, যে তারে দৌড় পাড়াইতেছে।

বিজ্ঞাপন

guest
2 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
জুবায়ের রশীদ রশীদ
জুবায়ের রশীদ রশীদ
5 months ago

খুব আরাম করে পড়া গেল সাক্ষাৎকারটা, কী উমদা আলাপ। অনুবাদকের জন্য হার্দিক ভলোবাসা।

M Saifur Rahman
M Saifur Rahman
5 months ago

অসাধারণ অনুবাদ! একটানা পড়ে ফেলা যায়। অনেক ধন্যবাদ!! দুআ করি আল্লাহ্ তায়ালা লেখনীতে আরও বারাকাহ্ দিন, আমীন।