বাহান্নর ভাষা আন্দোলন

এম. আর. আখতার মুকুল

যোগাযোগ ডেস্ক

এম আর আখতার মুকুল (৯ আগস্ট ১৯৩০—২৬ জুন ২০০৪) ছিলেন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে এক অনন্য নাম। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের বহুল জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘চরমপত্র’–এর পরিচালক, লেখক ও কথক হিসেবে অসামান্য ভূমিকা পালন করেন। তার কণ্ঠে প্রচারিত চরমপত্র শুধু একটি রেডিও অনুষ্ঠানই ছিল না; এটি ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সাহস, প্রেরণা ও মনোবল বৃদ্ধির শক্তিশালী অস্ত্র। ব্যঙ্গ, তীক্ষ্ণ ভাষা ও দেশপ্রেমে ভরপুর এই অনুষ্ঠান শত্রুপক্ষের বিরুদ্ধে মানসিক লড়াইয়ে বিশেষ ভূমিকা রাখে।

মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে এম আর আখতার মুকুল একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যে তার অবদান স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার প্রদান করে। তিনি আজীবন লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩৫টি। তার জীবন ও কর্ম বাংলাদেশি জাতিসত্তার সংগ্রামী চেতনার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।


 

১৯৫২ সালে খাজা নাজিমউদ্দীন ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আর নূরুল আমীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী। এঁদেরই আমলে রমনার পীচঢালা রাজপথ ছাত্রদের তাজা খুনে রঞ্জিত হলো। ছাত্রদের ‘অপরাধ’ তাঁরা মাতৃভাষা বাংলাকে মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলো। দাবী করেছিলো বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে ঘোষণা করা হোক। ভাষার দাবীর পর পরই শুরু হলো সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ষাট দশকে তা রূপান্তরিত হলো স্বাধিকার আন্দোলনে। একাত্তরের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা আন্দোলন। সব কিছুর ফলশ্রুতি আজকের স্বাধীন বাংলাদেশ।

১৯৫২ সালের ২৬শে জানুয়ারী পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমউদ্দীন ঢাকায় অনুষ্ঠিত নিখিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ অধিবেশনে এ মর্মে ঘোষণা করলেন, ‘উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা।

 

ভাসানীর উদ্যোগে গঠিত হলো সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ :

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর এ ধরনের উক্তির প্রতিবাদে ৩০শে জানুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ক্লাসে যোগদানে বিরত থাকে। একই দিন বিকেলে ঢাকা বার লাইব্রেরীতে সর্বদলীয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ (বর্তমানে আওয়ামী লীগ), আবুল হাশিমের খেলাফতে রব্বানী পার্টি, তমদ্দুন মজলিস, ছাত্রলীগ, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তান যুব লীগের (পাকিস্তান আমলেই অস্তিত্ব বিলুপ্ত) নেতৃবৃন্দ যোগদান করেন। তৎকালীন আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট মওলানা ভাসানীর উপস্থিতিতে ১৫ সদস্য বিশিষ্ট সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ পঠিত হয়। সর্ববৃহৎ বিরোধী দল হিসাবে আওয়ামী লীগের এককালীন সদস্য বরিশালের কাজী গোলাম মাহবুবকে সংগ্রাম পরিষদের আহবায়ক করা হয়। ঐ কমিটিতে মরহুম আবুল হাশিম, আতাউর রহমান খান, মরহুম শামসুল হক, মরহুম কমরুদ্দিন আহমদ (প্রাক্তন রাষ্ট্রদূত), অধ্যাপক আবুল কাসেম, মরহুম খালেক নেওয়াজ খান, আবদুল মতিন (বর্তমানে কৃষক নেতা), মোহাম্মদ তোয়াহা, অলি আহাদ প্রমুখ সদস্য ছিলেন।

২০শে ফেব্রুয়ারী নূরুল আমীন সরকার আকস্মিকভাবে ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে। ফলে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। ছাত্র ও যুব সমাজ সরকারী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ হিসাবে গ্রহণ করে।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনার জন্য সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ জরুরী বৈঠকে মিলিত হন। তুমুল বাক-বিতন্ডার পর ১১-৪ ভোটে হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। জনাব তোয়াহা ভোটদানে বিরত থাকেন। সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে ২০শে ফেব্রুয়ারী দিবাগত রাতে ঢাকা শহরে মাইকযোগে হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত প্রচার করা হয়। তৎকালীন কম্যুনিস্ট পার্টিও ১৪৪ ধারা ভাঙার বিপক্ষে ছিলো। কম্যুনিস্ট পার্টি এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিলো যে, আওয়ামী লীগ থেকে যেভাবে মত প্রকাশ করা হবে, পার্টিও সে মোতাবেক মত প্রদান করবে।

 

ছাত্রদের গোপন বৈঠকে ১৪৪ ধারা ভাঙার সিদ্ধান্ত :

২০শে ফেব্রুয়ারী গভীর রাতে কিছু সংখ্যক সংগ্রামী ছাত্রের উদ্যোগে বিভিন্ন হলের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিরা ফজলুল হক হলের পুকুর পাড়ে মিলিত হন। এঁদের মধ্যে সর্বজনাব গাজীউল হক, আবদুল মোমেন, মোহাম্মদ সুলতান, এম. আর. আখতার, আহম্মদ রফিক, জিল্লুর রহমান প্রমুখ অন্যতম।

এই বৈঠকে আখতারের বক্তব্যের সমর্থনে গাজীউল হক স্পষ্টভাবে ঘোষণা করলেন যে, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের হরতাল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কাপুরুষজনোচিত। ঘন ঘন ১৪৪ ধারা জারির মুখে বিরোধী দলগুলোর নিশ্চুপ বসে থাকা চরম অন্যায় ও ভ্রমাত্মক পদক্ষপ। ছাত্ররা কিছুতেই ভাষার প্রশ্নে মাথা নোয়াতে পারে না। তাই আগামীকাল ১৪৪ ধারা ভংগ করে সরকারের চ্যালেঞ্জের জবাব দিতে হবে আর বিরোধী দলগুলোকে সংগ্রামের মুখে ঠেলে দিতে হবে; বৈঠকে সবাই ১৪৪ ধারা ভংগ করার সপক্ষে যুক্তি দেখালেন। এখানেই সিদ্ধান্ত নেয়া হলো যে, পরদিন সকালে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ থেকে শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাংগণে আনতে হবে। ঘন্টা খানেকের মধ্যেই বিভিন্ন হল ছাড়াও, মেডিক্যাল হোস্টেল, ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেল, জগন্নাথ কলেজ, ঢাকা কলেজ প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দের কাছে ঐ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে দেয়া হলো।

এ কথা সত্য যে, ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরের অবস্থা কেবল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ছাড়া স্বাভাবিক ছিলো। পুরানা ঢাকায় দোকান-পাট খোলা ছাড়াও যানবাহন চলাচলে বিশেষ বিঘ্ন ছিলো না। অফিস-আদালতগুলোতেও স্বাভাবিক কাজকর্ম অব্যাহত ছিলো। কেবল টাউন সার্ভিসের বাস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনের সামনে দিয়ে চলাচল বন্ধ রেখেছিলো। এখন যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টেডিয়াম, এখানেই ২১শে ফেব্রুয়ারীর সকাল থেকে আস্তানা গাড়লো কয়েক শ’ সশস্ত্র পুলিশ আর ‘টিয়ার গ্যাস স্কোয়াড’।

এদিকে বেলা ন’টা নাগাদ হাজার হাজার ছাত্র এসে জমায়েত হতে শুরু করলো বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরানো কলা ভবনের চত্বরে। ঢাকা শহরতলী এলাকার প্রায় সমস্ত স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রদের শোভাযাত্রা এলো। আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হলো বিরাট ছাত্র-সভা, অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বাংলা ভাষাকে স্বীকৃতিদানের প্রস্তাব পাশ হলো।

এ সময় প্রথম খবর এলো যে, লালবাগ এলাকায় স্কুলের ছাত্রদের উপর পুলিশ বেপরোয়া লাঠিচার্জ করেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই মেডিক্যাল হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে এসে হাজির হলো জনা কয়েক আহত স্কুল ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে তখন চরম উত্তেজনা। মুহুর্মুহু শ্লোগানে চারদিক প্রকম্পিত। কলাভবনের চত্বরে তখন আনুমানিক ১৫/২০ হাজার ছাত্র-ছাত্রী উত্তেজনায় ফেটে পড়েছে। লোহার গেট বন্ধ রাখা হয়েছে, আর বাইরে সরু পীচঢালা রাস্তায় সশস্ত্র পুলিশ পজিশন নিয়ে দাঁড়িয়ে। সাধারণ ছাত্রদের সংগ্রামী মনোভাবে ছাত্রনেতারা কিছুটা হতভম্ব। কী ধরনের প্রোগ্রাম ঘোষণা করা সময়োচিত হবে? এমন সময় ছাত্র নেতা আবদুস সামাদ প্রস্তাব করলেন যে, লোহার গেট খুলে দশজন করে ছাত্রের এক একটা দল বেরিয়ে ১৪৪ ধারা ভংগ করবে। এক সংগে বেরুলে নিশ্চিতভাবে পরিস্থিতি মুহূর্তে ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। মরহুম মুজাফফর আহমদ চৌধুরী তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রোক্টর’। উনিও এ ব্যাপারে সম্মতি দিলেন। সিদ্ধান্ত মোতাবেক লোহার গেট খুলে ‘দশজনী’ ছাত্রের মিছিল বেরিয়ে স্বেচ্ছায় গ্রেফতার হতে শুরু করলো। এটা এক ধরনের সত্যগ্রহ। গ্রেফতারের সংখ্যা হাজারের বেশী হবার পর পুলিশ কর্তৃপক্ষ বহু ছাত্রকে ধরে বাস বোঝাই করে জয়দেব পুরের ওধারে ভাওয়ালের জংগলে ছেড়ে এলো।

এদিকে আকস্মিকভাবেই পুলিশ বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করলো। ফলে উত্তেজনা উঠল তুংগে। মিনিট কয়েকের মধ্যে পুরো এলাকাতে শুরু হলো খন্ড যুদ্ধ। একদিকে পুলিশের কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ, আর দিক থেকে ছাত্রদের ইট-পাটকেল নিক্ষেপ। ছাত্ররা নিজেদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কলাভবন ও মেডিক্যাল হাসপাতালের মধ্যবর্তী দেয়াল ভেংগে ফেললো। ফলে কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশের সংগে খন্ড যুদ্ধের স্থান বদলে গেলো। মেডিক্যাল কলেজের ব্যারাক হোস্টেল, ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেল ও চারদিকের এলাকায় ছড়িয়ে পড়লো সংঘর্ষ। পুলিশের বেপরোয়া লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাসে বহু ছাত্র আহত হলো।

আজকের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আউট-ডোর যেখানটায় ঠিক সেখানটাতেই ছিলো সেদিনকার মেডিক্যাল হোস্টেলের সারি সারি ব্যারাক। আর আজকের জগন্নাথ হলই ছিলো সেদিনকার প্রাদেশিক পরিষদ ভবন। তাই পুলিশ কর্তৃপক্ষ পরিষদ ভবনে মন্ত্রী ও সদস্যদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য সামনের রাস্তা পরিষ্কার রাখতে সচেষ্ট হলো। হাজার হাজার ছাত্র এসে জমায়েত হলো মেডিক্যাল হোস্টেল এলাকায়। সকাল থেকে পুলিশের হাতে মার খেয়ে ছাত্ররাও তখন মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাই নির্মীয়মাণ নার্স কোয়ার্টারের ইট হলো এদের অস্ত্র। পুলিশ অবিরামভাবে মেডিক্যাল হোস্টেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এলাকা এবং রাস্তার উপর লাঠিচার্জ অব্যাহত রাখলো, আর ছাত্ররা পাল্টা ইট বৃষ্টি শুরু করলো।

বেলা তিনটায় পরিষদের অধিবেশন। আড়াইটা নাগাদ পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটলো। আরও সশস্ত্র পুলিশের আগমন হলো। উদ্দেশ্য হচ্ছে পরিষদে মন্ত্রী ও সদস্যদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন হতে হবে। গাড়ীতে মন্ত্রী বা পরিষদ সদস্য দৃষ্টিগোচর হলেই ছাত্ররা আরও বেশী মারমুখো হয়ে উঠলো। কিন্তু পুলিশের ব্যারিকেড তখন দূর্ভেদ্য। তবে ছাত্ররা মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং হোস্টেলে দুটো মাইক লাগিয়ে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবীতে বিরামহীন বক্তৃতা শুরু করলো। আর এ দুটো মাইক থেকে কর্মীদের নির্দেশ দেয়া শুরু হলো। এতে কাজের অনেক সুবিধা দেখা দিলো। ছাত্র নেতাদের অধিকাংশই গ্রেফতার হয়েছে। কেউ কেউ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, আবার কেউ বা আহত (গাজীউল হকের মতো) হয়েছে। অধিকাংশ বিরোধী রাজনৈতিক দল হরতাল প্রত্যাহারের পক্ষে মত প্রকাশ করে দায়িত্ব এড়িয়ে গেছে। গোপন কম্যুনিস্ট পার্টি আসন্ন সাধারন নির্বাচন পিছিয়ে যাবে কিংবা বানচাল হবে আশংকায় প্রকাশ্যে মতামত দানে বিরত। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠিত বুদ্ধিজীবিদের (দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া) কেউই তখন পর্যন্ত ঐ আন্দোলনে প্রকাশ্যে সমর্থন দিতে এগিয়ে আসেননি। এমনকি কোন আইনজীবি, অধ্যাপক, ডাক্তার, সাংবাদিক, প্রকৌশলী কিংবা ব্যবসায়ী কেউবা প্রকাশ্যে ছাত্রদের সংগে একাত্মতাবোধ পর্যন্ত ঘোষণা করেননি। বুদ্ধিজীবিদের যাঁরা এই আন্দোলনে সক্রিয় সহযোগিতা করতে দ্বিধাবোধ করেননি, তাঁদের তখন মুখ্য পরিচয়ই ছিলো ছাত্র হিসাবে। এদের মধ্যে সর্বজনাব শামসুর রাহমান, হাসান হাফিজুর রহমান, আবদুল গাফফার চৌধুরী, সায়্যিদ আতীকুল্লাহ, কে. জি. মোস্তফা, মুস্তাফা নুরুল ইসলাম, জিল্লুর রহমান, ফজলে লোহানী, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ খান, বোরহান উদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, আতাউর রহমান, আবদুল্লাহ আল মুতী শরফুদ্দীন, মর্তুজা বশীর, আমিনুল ইসলাম, কাইয়ুম চৌধুরী প্রমুখ অন্যতম।

এরকম পরিস্থিতিতে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের একাংশ ছাড়া অসংখ্য নির্দলীয় ছাত্র ঐ আন্দোলনের পুরোভাগে এসে দাঁড়িয়েছিলো। পরবর্তীকালে অনেক রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ মর্মে দাবী করতে থাকেন যে, বাহান্ন সালে তাঁরা গোপন স্থান থেকে নির্দেশ দিয়ে আন্দোলনকে সফল করে তুলেছেন। কিন্তু এই দাবী সত্যের অপলাপ বলা চলে।

 

গুলীবর্ষণের পর সর্বমহলের সমর্থন :

প্রসঙ্গত একটা কথা বলতে চাই যে, একুশে ফেব্রুয়ারী গুলী বর্ষণের পর সামগ্রিকভাবে বাংগালী বুদ্ধিজীবি শ্রেণী ভাষা আন্দোলনকে সমর্থন দান এবং হত্যাকান্ডের তীব্র প্রতিবাদ করেন। বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো গুলী বর্ষণের পরেও আন্দোলনে নেতৃত্বদানে দক্ষতা দেখাতে পারেনি। একথা সত্য যে, বাংলা ভাষার প্রতি সহানুভূতিশীল কিছু বুদ্ধিজীবি ও রাজনীতিবিদকে গ্রেফতার করায় পরবর্তীকালে এঁরা ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী হিসাবে চিহ্নিত হয়েছেন। কিন্তু আন্দোলনের প্রারম্ভিক পর্যায়ে এঁদের তেমন উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিলো না।

একুশে ফেব্রুয়ারী বেলা তিনটা দশ মিনিটের সময় আকস্মিকভাবে একদল সশস্ত্র পুলিশ মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের মধ্যে প্রবেশ করে এবং গুলীবর্ষণ করে। ঘটনাস্থলে জব্বার ও রফিকউদ্দীন নিহত হন। প্রকাশ্যে রাস্তার উপর পড়ে থাকা গোটা দুয়েক অছাত্রের লাশ পুলিশ নিজেদের ট্রাকে নিয়ে যায়। হাসপাতালে গুরুতররূপে আহত রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র বরকত ও বাদামতলীর একটা প্রেসের কর্মচারী সালামের মৃত্যু হয়। হাসপাতালে আহতের সংখ্যা ১৬ জন।

এদিকে গুলী বর্ষণের খবর দাবাগ্নির মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সংগে সংগে সরকারী অফিস-আদালত থেকে শুরু করে দোকান-পাট, যানবাহন চলাচল সব কিছুই বন্ধ হয়ে গেলো। এমনকি রেডিও অফিসের শিল্পীরা পর্যন্ত বেরিয়ে এলেন। চারদিকে যেন কবরের নিস্তব্ধতা। শ্রোতের মতো মানুষ শুধু এগিয়ে চলছে হাসপাতালের দিকে। মুখে বিষাদের ছায়া, চোখে আগুনের স্কুলিংগ। শোকাভিভূত জনতা শ্রদ্ধা জানায় শহীদের প্রতি।

বারুদ ও কাঁদানে গ্যাসের গন্ধে যখন রমনার বাতাস বিক্ষুব্ধ-মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাংগণে সবুজ ঘাসে চাপ চাপ লাল রক্ত আর হাসপাতালে আহতদের আর্তনাদ, তখন এক ফালং দূরে পরিষদ ভবনে অধিবেশন চলছে। বিরোধী দলের জনা কয়েক মুসলিম সদস্য রংপুরের খয়রাত হোসেন, ঢাকার আনোয়ারা বেগম, শামসুদ্দিন আহমদ ও কুমিল্লার আহমদ আলী এবং অমুসলিম সদস্যদের সোচ্চার প্রতিবাদ সরকার পক্ষ অগ্রাহ্য করলো। খয়রাত হোসেনের আনীত মূলতবী প্রস্তাব পরিষদ প্রত্যাখ্যান করলো। এমনি সময় সরকার দলীয় মুসলিম লীগ সদস্য পাবনার মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ চীৎকার করে বলে উঠলেন, মেডিক্যাল কলেজ এলাকায় যখন গুলীতে নিহত ছাত্রদের লাশ পড়ে রয়েছে তখন জনসাধারণের প্রতিনিধি হিসাবে আমাদের এই পরিষদে বসে থাকার কোন অধিকার নেই। আমি এই মুহূর্তে পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করলাম। বিরোধী দলীয় সদস্যরা ছাড়া সেদিন মওলানা তর্কবাগীশও পরিষদ কক্ষ ত্যাগ করেন।

২১শে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় ঢাকায় জারি হলো কারফিউ। প্রতিটি মহল্লায় সশস্ত্র পুলিশ। এমনি এক পরিস্থিতিতে মেডিক্যাল কলেজের ছাত্ররা এই মর্মে সিদ্ধান্ত নিলো যে, আগামীকাল জানাযার জন্য সলিমুল্লাহ হল থেকে যে ঘোষণা দেয়া হয়েছে, সেই জানাযায় শহীদের লাশ মর্গ থেকে নিয়ে হাজির করা হবে। কয়েক শ’ মেডিক্যাল ছাত্র সন্ধ্যা রাত থেকে মর্গ পাহারা দিতে শুরু করলো। রাত আড়াইটার দিকে প্রায় তিন শ’ সশস্ত্র পুলিশ সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় এসে মর্গে হামলা করে লাশগুলো নিয়ে গেলো।

একুশে ফেব্রুয়ারী সন্ধ্যায় মওলানা আকরম খাঁ’র আজাদ পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা বেরুলো। হেডিং ছিলো, ‘ছাত্রদের তাজা খুনে ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। নূরুল আমীন সরকার দৈনিক আজাদের এই বিশেষ সংখ্যা বেআইনী ঘোষণা করলো। গুলী বর্ষণের প্রতিবাদে আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন পরিষদ সদস্য পদে পদত্যাগ করলে পরদিন দৈনিক আজাদের প্রথম পৃষ্ঠায় ফলাও করে সে সংবাদ ছাপা হলো।

তৎকালীন মেডিক্যাল ছাত্র ও বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মঞ্জুরের উদ্যোগে রাতারাতি মেডিক্যাল হোস্টেল প্রাংগণে ২২শে ফেব্রুয়ারী যে শহীদ মিনার তৈরী করা হলো, আনুষ্ঠানিকভাবে আজাদ সম্পাদক শামসুদ্দীন সাহেব সে মিনার উদ্বোধন করলেন ২৬শে ফেব্রুয়ারী।

 

শেরে বাংলার উপস্থিতিতে গায়েবানা জানাযা :

বাইশে ফেব্রুয়ারী সকালে মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাংগনে শহীদদের গায়েবানা জানাজার ব্যবস্থা করা হলো। লাশের অভাবে শহীদদের রক্তমাখা জামা কাপড় নিয়ে সংগ্রামী ছাত্ররা জানাযায় শরিক হলো। জানাযার পর ১৪৪ ধারা ভংগ করে এক বিরাট শোভাযাত্রা বের হলো। এ জানাযায় তৎকালীন এ্যাডভোকেট জেনারেল শেরে বাংলা ফজলুল হক এসে শামিল হলেন। হাইকোর্ট আর কার্জন হলের মাঝামাঝি রাস্তায় শোভাযাত্রার মাঝ বরাবর সশস্ত্র পুলিশ হামলা চালালো। ঘটনাস্থলে একজন নিহত এবং বহু সংখ্যক আহত হলো। শোভা যাত্রার আগের অংশ চলে গেলো নবাবপুর রোডের দিকে, আর পিছনের অংশ নাজিমউদ্দীন রোড দিয়ে এগিয়ে গেলো চক বাজারের দিকে।

এদিকে আর একদল বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা জগন্নাথ কলেজ এলাকা থেকে এসে বাহাদুর শাহ্ পার্কের কাছে মর্নিং নিউজ প্রেসে (জুবিলী প্রেস) আগুন ধরিয়ে দিলো। প্রায় একই সময়ে সশস্ত্র পুলিশ নবাবপুর রাস্তায় গুলীবর্ষণ করলো। হাইকোর্টের কর্মচারী শফিকুর রহমান রথখোলার কাছে নিহত হলেন।

ভাষা আন্দোলনের বার্ষিকীতে যে গানটা বছরের পর বছর ধরে এই জাতিকে অনুপ্রাণিত করেছে, যে গানের শব্দ চয়ন আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার মনকে আন্দোলিতে করে চলেছে, সেই গানের (“আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারী, আমি কি ভুলিতে পারি”) রচয়িতা আবদুল গফফার চৌধুরী তখন কলেজের ছাত্র। গুলী বর্ষণের সংবাদে গফফার চৌধুরী আর্মানীটোলা এলাকার ছাত্রাবাসে বসে এই গান রচনা করলেন। প্রথমে সুর সংযোজন করলেন আবদুল লতিফ। এসুর অনেকেরই ততটা মনঃপুত হলো না। তখন আর এক সুরকার মরহুম আলতাফ মাহমুদ লতিফ ভাই-এর অনুরোধেই অশ্রুভেজা অথচ দুর্জয় শপথের সুরে এ গানে প্রাণ সঞ্চার করে গেলেন। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো’ গানের রচয়িতা ও সুরকার দু’জনেই বরিশালের সন্তান। একজন বর্তমানে বিদেশে রয়েছেন আর একজন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন।

এদিকে ২২শে ও ২৩শে ফেব্রুয়ারী ঢাকায় পূর্ণ হরতাল পালিত হয়। সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের কন্ট্রোল রুম থেকে মাইকযোগে ‘অর্ডার অব দি ডে’ ঘোষণা অব্যাহত থাকে। প্রকৃত পক্ষে সলিমুল্লাহ হল থেকে যে ঘোষণাই করা হয়, সেটাই ঢাকাবাসী সানন্দে গ্রহণ করে। একুশে ফেব্রুয়ারী বিকেল থেকে শুরু করে ২৮শে ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ঢাকায় সরকারী প্রশাসন প্রায় অচল ছিলো বললেই চলে। দিন তিনেক সেক্রেটারিয়েটের গেটের তালা খোলার লোক পর্যন্ত ছিল না; ফলে ২৪শে ফেব্রুয়ারী থেকে পরিষদ অনির্দিষ্টকালের জন্য মূলতবী ঘোষণা করা হলো।

২৫শে ফেব্রুয়ারী সাধারণ প্রতিবাদ দিবস হিসাবে আবার সর্বাত্মক হরতালের জন্য ঘোষণা করা হলো। কেবল কাঁচা বাজার সকালে দু’ঘন্টার অন্য খোলার অনুমতি দেয়া হলো।

২৫শে ফেব্রুয়ারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রাবাসগুলো অনির্দিষ্ট কালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এর আগেই মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলের শহীদ মিনার পুলিশ ভেংগে দেয় এবং নিরাপত্তা আইনে আবুল হাশিম, খয়রাত হোসেন, মওলানা তর্কবাগীশ, অধ্যাপক মুজাফফর আহমদ চৌধুরী, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী, অধ্যাপক অজিত গুহ, অধ্যাপক পুলিন দে, পরিষদ সদস্য গোবিন্দলাল মুখার্জী এবং মওলানা ভাসানীকে গ্রেফতার করে। ২৭শে ফেব্রুয়ারী ফজলুল হক হল এলাকা থেকে তৎকালীন যুবলীগ নেতা অলী আহাদ, মোহাম্মদ তোয়াহা ও আরও কয়েকজন ছাত্র নেতাকে আটক করা হয়।

এদিকে প্রতিটি ছাত্রাবাস থেকে ছাত্রদের বিতাড়িত করা হয় এবং বিপুল সংখ্যক ছাত্রকে গ্রেফতার করা হয়। কিন্তু সরকারী কর্তৃপক্ষ সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে হামলা চালাতে দ্বিধা করে। শেষ পর্যন্ত সামরিক বাহিনীকে আহ্বান করা হয়। বেলুচ রেজিমেন্ট প্রায় ৩৬ ঘন্টা ধরে সলিমুল্লাহ হল ঘেরাও করে রাখার পর ইকবাল হলের দিকের দরজা ভেংগে প্রবেশ করে। হলের প্রতিটি কামরা সার্চ করে বহু ছাত্রকে গ্রেফতার এবং বাকী ছাত্রদের বিতাড়িত করা হয়।

এর পরে পরেই ক্ষমতাসীন সরকার পরিস্থিতি আয়ত্তে আনার জন্য নারায়ণগঞ্জে জনৈক পুলিশ কনস্টেল হত্যার ব্যবস্থা করে সমস্ত দোষ ভাষা আন্দোলনকারীদের ঘাড়ে চাপিয়ে বিষোদগার করলো। আর দৈনিক আজাদ, সংবাদ ও মর্নিং নিউজ পত্রিকা সরকারের সমর্থনে ভাষা আন্দোলনকারীদের ‘দেশদ্রোহী’ আখ্যায়িত করলেন। তবুও পরবর্তীকালে এই আন্দোলনের সাফল্য কেউই অস্বীকার করতে পারলেন না। এরই ফলাফল হিসাবে ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে মুসলিম লীগের ভরাডুবি হলো আর ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয়া হলো।

পরবর্তী অধ্যায়ে শুরু হলো বাংগালী সংস্কৃতির উন্মেষের আন্দোলন, স্বায়ত্বশাসন ও স্বাধিকারের আন্দোলন এবং চরম পর্যায়ে একাত্তরের রক্তক্ষয়ী মুক্তি সংগ্রাম। সবই একসূত্রে গাঁথা। পার্থক্যটা হচ্ছে এই যে, স্বাধিকার আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে পেটি বুর্জোয়া পার্টি আওয়ামী লীগের বলিষ্ঠ ভূমিকা আর মধ্যবিত্ত নেতৃত্বে মার্কসীয় দলগুলোর সামগ্রিকভাবে ব্যর্থতা।

ভাষা আন্দোলনে যেসব নাম নাজানা আর নির্দলীয় ছাত্র শুধু মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে দৃপ্ত পদক্ষেপে সেদিন জীবনকে তুচ্ছ করে এগিয়ে এসেছিলেন আর ইতিহাসের যুগ সন্ধিক্ষণে নিজেদের বলিষ্ঠ ও সময়োপযোগী অবদান রেখে গেছেন, তাঁদের অনেকেই বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছেন কিংবা জীবনযুদ্ধে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে আছেন, তাঁদের জানাই শ্রদ্ধাঞ্জলী আর শহীদদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

সবশেষে একটা কথা বলা দরকার যে, আদিতে কিন্তু বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনটা শুরু হয়েছিল জ্ঞান তাপস ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সোচ্চার কন্ঠস্বর থেকে। সেই পুরুষ সিংহ কার্জন হলের চৌহদ্দির এক কোণায় অন্তিম শয়নে শায়িত রয়েছেন।

[বানানরীতি আপরিবর্তনীয় রাখা হলো]

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments