অফিস ব্যাগ

মাহমুদুর রহমান

নভেম্বর এলেই মেজাজ বিগড়ে যায় সৌমির। দোষটা নভেম্বরের না, শীতের। এই একটা ঋতু তার খুবই অপছন্দের। অবশ্য জাইমা বলে শীতের সাথে লড়াইটা সৌমির নতুন। আফনানের সঙ্গে সৌমির সম্পর্কটা হয়েছিল যেমন শীতে?, চুকেছিলও শীতে। সে কারণেই শীতের সঙ্গে সৌমির দ্বন্দ্ব। কিন্তু সৌমি তা মানে না। ওর বক্তব্য, শীতের রুক্ষতা ভালো লাগে না।

সৌমি ছোটবেলা থেকেই উষ্ণ আলিঙ্গন পছন্দ করত। সেখানে শীত কেবলই রুক্ষ। আলো পছন্দ সৌমির কিন্তু শীতের রাত বড় দীর্ঘ। ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার সময় থেকে অনিদ্রা বাসা বেঁধেছে তার চোখে। আফনান চলে যাওয়ার পর তা বাড়ল আরো। এখন তো কোনো কোনো দিন ঘুম আসে সূর্য ওঠার খানিক আগে। ঘুম শরীরে জেঁকে বসতেই অ্যালার্ম বাজা শুরু হয়। বছরখানেক হলো, অফিস নামের বাস্তবতা সৌমিকে ব্যস্ত রাখে।

আজ সকালে উঠেও প্রথমেই মনে মনে দুষল শীতকে। কেননা সৌমির মনে হলো শীতই তার আধ ঘণ্টা দেরির কারণ। দুদিন হলো ফ্যান দরকার হয় না। সকালে ঘুম আরেকটু বেশি সময়ের অতিথি হতে চায়।

বাথরুম থেকে বের হয়ে দেখল সৌমি, বাবা বসে আছে বারান্দায়। লোকটার সঙ্গে সৌমির সদ্ভাব বেশি নেই। সরাসরি দ্বন্দ্বও নেই। কিন্তু সৌমির মনে হয়, মাকে কখনো স্বস্তি দেয়নি আমিনুল ইসলাম।

স্বস্তি কোন পুরুষ তার নারীকে কবে দিয়েছে আমিনুল ইসলামের জানা নেই। মেশিন নিয়েই কেটেছে তার জীবনের একটা বড় অংশ। মেশিন সঙ্গী হওয়ার আগে সঙ্গী ছিল গণিত। নারীকে তাই বোঝা হয়নি তার। বাবার পছন্দে মেহেরিনকে যখন বিয়ে করেন, শুরুটা খারাপ ছিল না। কিন্তু বছর খানেক যেতেই বুঝেছিলেন, কোথাও একটা গোলমাল আছে। আর গোলমালের কারণ তার মন। কাজের মধ্যে ডুবে থাকা সেই মন দায়িত্ব, দাম্পত্যের বাইরে গিয়ে স্ত্রীকে বোঝার মতো সময় বের করতে পারেনি। মেহেরিনও খুব বেশি কিছু বলেনি। শুধু বলত, আমিনুল বড় রুক্ষ।

কিন্তু রুক্ষ শীত পছন্দ ছিল মেহেরিনের। দুরত্বের মধ্যেও জীবনের শেষ শীতটা সে আমিনুলের সঙ্গে রোজ এসে বসত এই বারান্দায়। বছর ছয়েক আগের কথা। তখন বারান্দার বিপরীতে দুটো দালান ছিল না। তিন তলার ঝুল বারান্দা দিয়ে দেখা যেত একটা মাঠ। রোজ সকাল আটটায়, সেই মাঠের দিকে তাকিয়ে দুজন বসে এক কাপ চা খেত আমিনুল আর মেহেরিন। সৌমি তা জানে না। তখন সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকত।

তাই সাড়ে আটটায় রিকশায় ওঠা সৌমি বোঝে না বাবা কেন এই সময় শীতের কাটা দেওয়া বাতাসের মধ্যে বসে থাকে। সে শুধু খেয়াল করে রহমত আলীর রিকশার গতি ঠিক আছে কি না।

রহমত আলীকে সৌমি চিনেছে গত বছর। সেটা তীব্র শীতের সময়। তার আবাসিক এলাকার রিকশাওয়ালারা নির্দিষ্ট। বসুন্ধরা আবাসিকে বাইরের রিকশা চলে না। সেজন্য অবশ্য সব রিকশাওয়ালাকে তার চেনার কথা না। রহমতকে চেনার কারণ, সেদিন রিকশায় উঠে তার মনে হয়েছিল ছেলেটার কোনো একটা সমস্যা আছে।

ইউনিভার্সিটিতে উঠে সোশ্যাল সার্ভিস ক্লাব করার কারণে মানুষের সুখ-দুঃখ খুঁজতে পছন্দ করে সৌমি। সেদিনও ত্রিশ বছর বয়সী রহমতের সবুজ নিয়ন কোটির নিচে থাকা ময়লা গেঞ্জির রহস্য বের করেছিল সে। জেনেছিল করোনায় অনেক কিছু হারানো যুবকের গল্প। তারপর থেকে প্রায় নিয়মিত সৌমির অফিসে যাওয়ার সময় বাসার নিচে হাজির থাকে রহমত।

সৌমি খেয়াল করে আজ সাদা একটা ফুল হাতা গেঞ্জি পরেছে রহমত। লুঙ্গিও একদম ফ্রেশ। মন একটু খুশি হয় সৌমির। তাকায় আশেপাশে। রাস্তা আজ বেশ পরিষ্কার। শীতকাল অপছন্দ হলেও সৌমি দেখেছে, অন্য ঋতুর তুলনায় শীতকালে ঢাকার রাস্তা মোটামুটি পরিষ্কার থাকে। অবশ্য ধূলা ওড়ে অনেক। কিন্তু ডাস্ট অ্যালার্জি নেই সৌমির। তাই ধূলা নিয়ে চিন্তাও সে করে না।

এই রাস্তার সঙ্গে সৌমির পরিচয় অনেকদিনের। দশ বছর আগে ওরা এসেছিল বসুন্ধরা আবাসিকে। প্রথমে একটা ফ্ল্যাট কিনেছিলেন আমিনুল। চাকরিটা তার ভালো ছিল কিন্তু টেবিলের নিচে হাত দেয়ার অভ্যাস ছিল না। নয়ত তার সহকর্মী অনেকেই এই এলাকায় ছোটখাটো বাড়ি করে ফেলেছে। এসব নিয়ে অবশ্য সৌমির কোনো ক্ষোভ নেই। এমনকি সে তো গ্যারেজে পার্ক করা গাড়িটাও নেয় না। স্বাধীন তার বাইকটা নিয়েই ঘুরে বেড়ায় এমাথা-ওমাথা। গাড়িটা পড়েই থাকে। মাঝে মাঝে নয়ন (সৌমিদের ড্রাইভার) বের হয় আমিনুল ইসলামকে নিয়ে। ঢাকা ক্লাবে এখনো কোনো কোনোদিন যায় সে।

বসুন্ধরায় যখন প্রথম এসেছিল সৌমি, সেটা ২০১১ সাল। ওর বয়স ১৪ বছর। আমিনুল ওদেরকে নিয়ে এসেছিলেন একটা প্লট দেখানোর জন্য। সৌমির ঠিক মনে নেই, এফ ব্লক না জি ব্লকে ছিল। কিন্তু খুব মনে আছে, জায়গাটা বেশ ফাঁকা ছিল। দৌড়ে বেড়াচ্ছিল সৌমি। স্বাধীন তখন  গোলগাল একটা পুতুলের মতো। শান্ত থাকত। জামা ধরে ঘোরার বাতিক ছিল। পরের বছর মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। কেনা জমিটা ছেড়ে দিতে হয়েছিল।

ভুলে যেতে চায় সৌমি এসব। সে খেয়াল করে রাস্তার একপাশ ধরে চলা ছেলেমেয়েদের দিকে। সবই ছাত্রছাত্রী। হার্ডকোর বাচ্চাগুলোকে অবশ্য এদিকে দেখা যাবে না। ওরা বাবা মায়ের গাড়ি করে আসে। তবে ভার্সিটির ছেলেমেয়েরা বেশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। একটা সময় এই মিছিলে সৌমিও ছিল। সকাল সকাল ক্লাস ধরতে চলে আসত। সারাদিন ক্লাস করে, আড্ডা দিয়ে বাড়ি ফিরত সন্ধ্যায়।

কালো জিন্স পরা মেয়েটা সুন্দর করে ধরে আছে সাদা শার্ট পরা ছেলেটার বাম হাত। দেখেই বোঝা যায় ওরা সর্বোচ্চ সেকেন্ড সেমিস্টার। এখনো নতুন ওরা। এমন সময় সৌমিরও ছিল। শীতের সকালে একজনের হাত ধরে সে এই রাস্তা ধরে ক্যাম্পাসের দিকে যেত। কোনো কোনোদিন এক কাপ চা নিয়ে নিতো হার্ডকোর পাশের দোকানটা থেকে। তখনো ক্যানারি রেস্টুরেন্ট হয়নি এখানে।

সৌমির মনে আছে একদিন বেশ কুয়াশা পড়েছিল। জিপি হাউজের সামনে দাঁড়িয়ে গেটের দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল পুরো জায়গা ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা। একটা শাল জড়ানো ছিল তার গায়ে। হেঁটে হেঁটে গিয়েছিল সে একদম গেট পর্যন্ত। এই যেমন এখন গেট থেকে এদিকে এগিয়ে আসছে একটা মেয়ে। তার গায়ে জড়ানো সবুজ শাল।

মা চলে যাওয়ার পর সৌমির জীবনটা ওলটপালট হয়ে গেল। সৌমি অবশ্য ভাবেনি এতটা হবে। আফনানের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পরও সামলে নিয়েছিল সে। কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর সামলাতে পারেনি। একেক দিন ঘাটপাড়ে বসে থেকে সিগারেট টেনেছে একের পর এক। গত শীতেও সন্ধ্যায়, এমনকি রাতে বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ত। জি, এইচ ব্লক ছাড়িয়ে চলে যেত আরো ভিতরে। কয়েকবারই গার্ডরা সতর্ক করেছে ওকে। কিন্তু সৌমির ভালো লাগত। মনে হতো দূরে চলে যাচ্ছে অনেক কিছু থেকে। শীতের বাতাসের সঙ্গে কথা বলছে। গায়ে জড়ানো থাকত মায়ের শাল। শীত না, হয়ত মায়ের সঙ্গেই কথা বলতে চাইত সৌমি।

অফিস শুরু করার পর মন খারাপি তার কমেনি, বেড়েছে। সৌমির প্রথম স্কুলের দিন থেকে ব্যাগ গুছিয়ে দিত মা। কলেজ, ইউনিভার্সিটিতেও বদলায়নি সে নিয়ম। এমনও দিন গেছে, সৌমির অ্যাসাইনমেন্ট তুলে দিয়েছিল মা। আগের রাতে সৌমি ঘুমিয়েছিল বেহুঁশের মতো। সকালে উঠে দৌড়ে গেছে ক্লাসে। কিন্তু ব্যাগে কখনো কোনোকিছু বাদ যায়নি।

লিফটের বোতাম টিপে দাড়িয়ে কাঁধে ঝোলানো ব্যাগটায় হাত বোলায় সৌমি। মনে করে, স্কুল ব্যাগ আর অফিসের ব্যাগে পার্থক্য অনেক। একটাতে উদ্যম থাকে, আরেকটায় ক্লান্তি।

সৌমি জানত না, অফিসের ব্যাগেও ভালোবাসা থাকতে পারে। ডেস্কে বসে ব্যাগ খুলতেই সে দেখল একটা ডেভিনফের নতুন জার। ওর আগের জারটা শেষ হয়েছে গতকালই। থমকে যায় সৌমি। তারপর মনে হয়, বাবা এখনো বসে আছে বারান্দায়, শূন্য চায়ের কাপ সামনে নিয়ে।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
তা মি ম
তা মি ম
5 months ago

গাণিতিক ছকে বাঁধা জীবন— এভাবে উলটপালট হতেই থাকে।