মাহমুদ হুজাইফার কবিতা

মাহমুদ হুজাইফা

নক্ষত্র জননী—১


সমুদ্র ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসে দেখি

পাড় এখনো দস্যুদের দখলে

আমার মায়ের অভাবের মতোই —

কিছুই ঠিক হবে না আর পৃথিবীর

তৃষ্ণান্ধা চোখ

কাম খেতাবি ধর্ষক

হৃদয় চূরিয়ে দেয়া চাহনি, আর—

সৌন্দর্যের বিক্ষোভে আটকে যাওয়া তোমার

টোলকূপে আমার নজর;

 

কতদিন হয় ফেরা হয় না মায়ের কোলে

গিঁট দেয়া শাড়ি খুলে

খয়ার কিনেছি কবে মনে পড়ে না

 

শুধু মনে পড়ে —

হান্ডি পাতিল না মাজার  অপরাধে

এক সন্ধ্যায় মা নক্ষত্রে হারিয়ে গিয়েছিলেন।

 


নক্ষত্র জননী—২


যেটুকু পথ ছেড়ে দিয়েছি, রাজ্য হেঁটে যেতে পারে অনায়েসে।

পৃথিবীর একপ্রান্তে আমি আর বিদ্রোহী ছায়া। আলোভেজা সকালে রোজ ত্যাগ করতে হয় বসন্ত পিরামিড। এখানে ফেরাউন নয়—নক্ষত্র ঘুমান। দিনগত কায়ক্লেশ শাড়িটার উপর মাটি তার আঁচল শুকোতে দেয়। দরিদ্রের ভাঁজে ভিক্ষার যে দুটি চোখ নেমে এসেছে থুতনিতে—পৃথিবীতে আমার মায়ের প্রতিকৃতি আঁকতে চায়নি কেউ। ভয়। বড্ড ভয়। যদি অমাবস্যার গায়ে নতুন করে ফের চুনকালি পড়ে।

যে রাতে পাপড়ির বৃষ্টি হয়েছিলো প্রথম সন্ধ্যায়

মানচিত্রখোর ভূপৃষ্ঠে ভেষজের অভাবে মা—খাটিয়ার সাথে হেরে গিয়েছিলো খুব।

কোঁচড় ধরতে পারেনি। যদি বাপ এসে যায় আর বুঝে নেয়

শ্বাস টেনে নির্মলতা খাওয়ার শক্তি হয়েছে এখন;

তবেই তো আগাম একুশ রজনী জলজ নদীর ঠোঁটে বোশাখের খরা প্রতাপী যমিনে রূপ দিবে।

 

আমাদের দ্বিদগ্ধ সন্ধ্যাখচিত রাত ছিলো।

প্রথমটা ক্ষমতালোভী সূর্যের প্রতাপ, উদোম পিঠেই চড়াও হও;

দ্বিতীয়টা—

আব্বার ধিক্কার চোটে ছিটকে পড়ায় প্রথম আসমানের নক্ষত্র হয়ে গিয়েছিলেন আম্মা।

এরপর থেকে আজ অব্দি—কুয়াশারের সাথে কোন কোমল জননীর জন্ম হয়নি।

 


নক্ষত্র জননী —৩


ঔদাস্যে ডেকে ওঠা উঠোন কুকুরটা

শহর পুড়ে যাওয়ার গন্ধবায়ু নিয়েই

মায়ের আঁচলের ছায়ায় ঘুমিয়ে যায়

তখন তার সন্ধ্যাপাহারা পালিয়ে গেল

 

রাজার গতরের মালিক গন্ধম হরিণের মত

বন্দুক ছেড়ে যাওয়া বুলেট,

আদতে জন্মহীন শুয়োরের বাচ্চা—আর

নীলকেশু মেমসাহেবের প্রতিকৃতি যেন;

 

অতীতের সুভাষ নিয়ে বাবার ছায়া

কখনো ভাবেনি।

মাটিকে মানুষ করাও—মায়ের আবশ্যকীয়তা,

ছায়াকে কায়া বানাও—একান্ত মা’দেরই ধর্ম যেন!

 

যুদ্ধে বিজেতা ঘোড়ার বীর্যধ্বনি তখন

বাবার কন্ঠস্বর, তাগড়া গোলাপ;

আকাশি বৃক্ষের গতর—পাথর কবান্ধ।

পাহাড় কেটে নদী গড়া তখনও—মায়ের ফরজ বিধান।

 

শবগন্দি শকুন, ছায়াশিকারি ঈগল;

আরো যত হিংস্রগতর—আমার বাবারই প্রেক্ষাপট—

পৃথিবীর প্রতিটি বাবাই—নতমুখী জানোয়ার

বিমর্ষ হৃদয়ের পাশে আগুন জ্বেলে বসে থাকে তারা।

 

এত রাত হিমেল কুড়িয়ে

ভোরের সঙ্গমে চেয়ে দেখি

নক্ষত্র জোয়ারে কোথাও মা’কে খুঁজে পাইনি।

 


নক্ষত্র জননী — ৪


ডালিমের দানা ভেঙে বৃষ্টি ঝরছিলো

আজ বর্ষার প্রথম মেঘ।

পাতারা উড়ছিলো হরিণের চোখে—বয়স্ক, মৃত, উচ্ছিষ্ট

তিন প্রকার গয়নার বাক্সে আম্মার দুঃখ তখন ঘুমিয়ে থাকে।

 

১ম—আম্মার মোহরের নামে ভিক্ষার থালা

২য়—ধর্ষিতা বোনের রাজকীয় সান্তনা

৩য়—পৃথিবীর নিয়মে তালাকের বিনিময়ে আব্বার থুতু নিক্ষেপ।

আজ প্রথম বর্ষায় দলকলস মধুর মতো আম্মার অভাব ঝরছিলো

 

বোশেখ ফুরিয়ে গেছে। ভেজা বারুদের ভিতর ঘুমিয়ে আছে

তিনটে বিড়াল, তিনফোঁটা অশ্রু আর আম্মার দেহ।

ঘর ভেঙে তাকালে মনে হয় নগরকম্পন জন্ম নিচ্ছে

আব্বার ধমক, ইস্রাফিলের শিঙায় ইফতারের আজান হচ্ছে।

 

একসন্ধ্যায় শেয়ালের চোখ দেখে কালোজ্বর বাঁধিয়েছিলো সাহানা বানু। আমার ছোটবোন। শামুকের পায়ে হাঁটে। চোখের ডানায় ঝিনুকের পাখনা গজিয়েছে তার। তিলক আঁকা নাক। শাপলা পাতার কান। হলুদ ফ্রক পরে হেঁটে গেলে—আব্বা ময়ুর বলে ডাকতেন। যেন সূর্যের চোখ ধাঁধিয়ে যাচ্ছে। তারারা লজ্জায় ছায়া গুটিয়ে নিচ্ছে। আর ওমন আদুরী বিড়াল কালাজ্বরে মারা যাওয়ায়—আম্মার প্রথম নাম হয়েছিলো খানকিমাগি। এবং

 

আমরা দেখছিলাম—আব্বার পবিত্রমুখ কাঁপেনি।

অথচ একেকটা দুর্বোধ্য বিকেলে আম্মাকে দেখি

মৃত আত্মার নামে কাঁপতে কাঁপতে মিশে যাচ্ছে নক্ষত্রের জোয়ারে।

 


খাঁচার পরিধি মাপতে চাচ্ছিলাম


ভাঙচুরে সংসারে কে কার খোঁজ রাখে

ভাতের ফাঁসি গলায় নিয়ে মা ঘুরছেন

অপরাধ তার রাতে ঘুমিয়ে যাবার

বাবা অভাবের কাছে ঘাম বিক্রি করতে পারলে,

তোর মাগি ঘুমের খায়েশ!

 

শূন্য পাতিল আর ভবিষ্যৎ মা’র নিমকাটা বিছানো পথের সাথী।

 

এক কুসুম ভাঙা সকালে বিড়াল ডেকে উঠেছিল

মোরগ কিংবা কাক ডাকার কথা

মা’র পাতলা কণ্ঠস্বরে কেমন চিনচিনে ব্যথা তখন—

কেউ দেখেনি

বাহিরে কড়ায় চাপা হাওয়া

মায়ের নাকে কোমল আশ্রম

কি যেন এক অপরাধ মনে করে

জলের গতর

ঋতুর সতর

গোয়ালের স্তম্ভিত ফাঁকা

বোয়ালের ঠোঁটে মৃগয় রাখা

মা ঘুমিয়ে ছিলেন নিশ্চয়ই এমন শীতমগ্ন পৌষে

 

রোদ ঘুমায়। মৃণাল উড়ে। একটা আহত হরিণ জলের তৃষ্ণায় ঘুমিয়ে যায়। কুয়াশা তখন ক্লান্ত। বৃষ্টি দুঃখিত হলে একা—পৃথার কথা মনে পড়ে। কপালে সিঁদুর। ঠোঁটে লেপ্টে যাওয়া কাদার মতো লিপস্টিক। মহাভারত ছেড়ে তার কবিতার সংসার। গতরাত বোশাখ ভেঙে গেছে বলে আজ বর্ষা। একথোকা চুমুর রহস্যে ঘুম এসেছিলো পৃথার।

 

এমন মেঘধোয়া সকালে মা ঘুমিয়ে ছিলেন নিশ্চয়ই।

 

অথচ পৃথিবী জানতে পারিনি

হেঁশেলের জ্বালে মা’র তন্দ্রা এলে

রোজ রোজ জ্বলন্ত ভাজাকাটি সেঁকে দিয়ে তৃপ্তি মিটাতেন বাবা‌।

 

আজ মা’র একুশতম তন্দ্রা দিবস—আর

একুশতম সেঁকাফুল ফুটবে।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments