404 not found

মিলু হাসান

সমস্ত ক্লেদ যেন দূর হয়ে যাবে এমন বেশুমার বৃষ্টি নামছে আজ; তেরছা বৃষ্টির ফোঁটা নেচে নেচে আসছে ধেয়ে বাতাসের সমর্থন পেয়ে; বাতাস বন্ধ হয়ে গেলে বৃষ্টির গতি বেড়ে যায় যেন জেটবিমানের গতি; কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করে না সে—লোকাল বাসের এক প্যাসেনজারের হাত থেকে ফসকে পড়ে যায় দশ টাকার নোট, তা ভেসে গিয়ে ড্রেনে পড়ে ছোঁয়ার আগেই বৃষ্টির উদ্যমে; অফিসে অফিসে বাসে বাসে মোড়ে মোড়ে বদ্ধ ঘরে একই সংলাপ—বৃষ্টি আসছে। বৃষ্টি হচ্ছে এ বিষয়টা সত্য; চোখের সম্মুখে এমন দৃশ্য ইগনোর করার অধিকার অন্ধেরও নেই, সেও বৃষ্টির ফোঁটার পতনের শব্দ শুনছে যখন বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে পিচঢালা রাস্তায়, পড়ে এমনভাবে ছিটকে যাচ্ছে যেভাবে থার্মোমিটার রাস্তায় পড়লে ফেটে যাবে, যে অন্ধ তার কান সজাগ বেশি, সে ভূমণ্ডলের যে কোনো মিহি শব্দ অতি দ্রুত ইন্দ্রিয়ানুভব করতে সক্ষম। 

নিজামকে শাদা প্রাইভেটকার থেকে মাটিতে নিক্ষেপ করা হলো, তার হাত খোলা, চোখে কালো কাপড় বাঁধা; নিজাম ভয়ে কুঁকড়ে গা হিম করা ঠান্ডায় যেন অ্যান্টার্কটিকার একখণ্ড  বরফ হয়ে গেলো, কলেমায় শাহাদাত পাঠ করছে সে হুড়মুড় করে কিন্তু কলেমায় শাহাদাত পড়া ঠিক মতোন হচ্ছে না, ভয়ে তার মুখস্থবিদ্যা উবে গেছে কর্পূরের ন্যায়, তবুও আমরণ চেষ্টা করছে সে; কিন্তু না, প্রাইভেটকার থেকে গুলির আওয়াজ না শোনার বদলে সে শুনলো প্রাইভেটকারের ধপাস করে লাগানো দরজার শব্দ তারপর শুনলো বৃষ্টির শব্দ—একটানা; বৃষ্টিতে সে ভিজে যাচ্ছে—এগারো বছর নয় মাস তেরো দিন পর সে বৃষ্টিতে ভিজছে, সে নিজেকে একদমই বিশ্বাস করতে পারছে না। জীবনে এমন মিরাকল কখনো কখনো ঘটে যখন চোখে দেখেও বিশ্বাস করা যায় না কী হলো। তা বুঝতে একটু সময় লেগে যায়। হাইওয়ে রাস্তার পাশে পড়ে থাকা নিজামের কানের মধ্যে বৃষ্টির পানি ঢুকে যাচ্ছে, সে কোনোরকমে উঠতে গিয়ে দেখলো তার হাত খোলা, এটা সে একদমই বিশ্বাস করতে পারছে না; হাত উন্মুক্ত স্বাধীন থাকা যে কত বড় স্বাধীনতা সে এতোদিনে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছে, সে হাত দিয়ে চোখে বাঁধা কালো কাপড় সরালো আর তৎক্ষণাৎ তার চোখ আলোর ঝলকে কেমন জানি ঝলসে গেলো। সে আবার চোখ বন্ধ করে আবার চোখ খুললো, চোখের আলো সহ্য করার ক্ষমতা ফিরে পেতে ২-৩ মিনিট লেগে গেলো, সে এখন স্পষ্ট ফকফকা দেখতে পাচ্ছে। এমন আলো সে গত ১১ বছর দেখেনি, আলো দেখে তার কী যে ভালো লাগছে, কিন্তু তার মুখে ভালো লাগার বিন্দুমাত্র অনুরণন নেই,  বরং তুমুল গাঢ় বিষাদ ভরা মুখ; সে মুখ যে কোনো গাঢ় অন্ধকার রাত্রির চে’ কালো। নিজাম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে একটানা কলা গাছের পাতার দিকে তাকিয়ে আছে, চার থেকে পাঁচটা কলা গাছ একসঙ্গে—সবগুলোর পাতার মধ্যে চর  বেঁধে আছে হাইওয়ে সড়কের ময়লা, সেসব বৃষ্টির তোড়ে ধুয়েমুছে যাচ্ছে নিরঙ্কুশ; নিজাম কিছুক্ষণ পর টের পেলো সে এখন—Free.  নিজাম এতোদিনে বুঝতে পারলো ফ্রি শব্দের যথাযথ মমার্থ, তার চে’ ভালো করে আর কে জেনেছে এ শব্দের কদর। ফ্রি মানে সে মুক্ত, স্বাধীন এখন সে, যেখানে ইচ্ছা সেখানে যেতে পারবে; সে তাকাতে পারবে যতদূর চোখ যায়, সে দেখতে পারবে নীল আসমান, সে খেতে পারবে যা মন চায়, সে শুতে পারবে যতটুক জায়গা দখল করে তার শুতে মন চায়—কতদিন সে আরাম করে ঘুমায় না, তার চোখ ব্লাক সার্কেলে ঘিরে আছে নির্ঘুম রাতের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে; তাকে ভয়ে কুঁকড়ে থাকতে হবে না—মরণের ভয়কে সঙ্গে নিয়ে প্রতি সেকেন্ড বাঁচতে হবে না।  নিজামের খুব তৃষ্ণা পেলো, আশেপাশে পানির কোনো উৎসক্ষেত্র দেখতে না পেয়ে নিজাম মুখ হা করে বৃষ্টির পানি খেতে খেতে হাঁটছে। এ পানিকে তার মনে হচ্ছে হাউজে কাউসারের পানি; মনে হচ্ছে সে দ্বিতীয় জীবন পেলো কিন্তু এ জীবন দিয়ে সে করবে কী সেটা সে বুঝতে পারছে না। 

তারপর মুখ বন্ধ করে নিজাম হাঁটছে। তার পায়ের তলায় জুতো সে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে খালি পায়ে হাঁটছে; কতদিন তার পা মাটি ছোঁয় না। নিজাম হাঁটছে অতি অল্প গতিতে,  ধীরে ধীরে। হাঁটার স্বাধীনতা সে উপভোগ করছে, কতদিন এতো খোলা জায়গায় হাঁটেনি, সে যেখানে গত এগারো বছর থাকতো সেখানে কোনোরকম শুয়ে থাকা যায়—এ কাত হলে ও কাত হওয়া যায় না, এমন সরু; এজন্য উন্মুক্ত খোলা জায়গায় হাঁটার যে নিয়ামত সেটা সে ফিল করছে প্রতি কদমে কদমে। আর হুট করে সে চিৎকার দিয়ে আসমানের দিকে চেয়ে  বললো—আল্লা, তুমি আমারে জান  ভিক্ষা দিছো। ইয়া মাবুদ। ইয়া পরওয়ারদেগার। কথাটি বলার সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ভুর ভুর করে; বৃষ্টির পানি আর চোখের পানি মিলেমিশে একাকার হয়ে যাচ্ছে। বদ্ধঘরে কত কেঁদেছে নিজাম, কাঁদতে কাঁদতে তার গামছা ভিজে যেতো। তার মাথা কাজ করছে না—ব্লাঙ্ক। কোথায় যাবে সে। কী করবে এখন। এজন্য সে হাঁটছে সোজা, হেঁটেই যাচ্ছে অবিরাম, ধীর গতিতে। কিন্তু সে বুঝতেও পারছে না সে কী স্বপ্নের মধ্যে হাঁটছে না আসলেই হাঁটছে। সে যে বেঁচে আছে তা–ও তার বিশ্বাস হচ্ছে না। মাঝে মাঝে দূরপাল্লার বাস যেতে দেখে তার বিশ্বাস হলো সে বেঁচেই আছে এবং হাঁটছে। স্বপ্নের মধ্যে এরকম দূরপাল্লার বাস যেতে পারে না অনর্গল। বৃষ্টি হচ্ছে, বৃষ্টি দেখে একটা বাগধারাই নিজামের মনে হচ্ছে—“cats and dogs.” নিজাম কিছুদূর হাঁটার পর বুঝলো সে গাবতলি; তার চোখে পড়লো হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেল, নিচে লেখা গাবতলি বাসস্ট্যান্ড, গাবতলি। হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেল লেখাটি দেখে নিজাম বুক ভরা শক্তি পেলো। তার পায়ের গতি বেড়ে গেলো। ওদিকে বৃষ্টি পড়ছে তো পড়ছেই, থামার নাম নাই। এ বৃষ্টি যে সহসা নামবে সে লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেলে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়ে নিজাম; ঢুকে আশেপাশে তাকাতে থাকে কোথাও হোসেন মিয়াকে দেখতে পাওয়া যায় কি না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে হোসেন মিয়াকে দেখতে না পেয়ে কাউন্টারে বসা কম বয়সী ছেলেটাকে জিজ্ঞাসা করে: হোসেন ভাই কই ? —আব্বায় তো মসজিদে। নমাজ পড়তে গেছে। 

—এদিকে মসজিদটা কই বলতে পারবা?— আঙ্কেল রোডের ওই সাইডে। নীলিমা বাস কাউন্টারের পিছে। নিজাম বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে রাস্তা পার হয় হরদম; রাস্তা পার হয়ে অযু করে  মসজিদে ঢোকে। মসজিদে ঢুকে দেখে পুরো মসজিদ খালি, কেউ নাই। একজন মুসল্লি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আছেন; আজানের সময় হওয়ামাত্র তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন এবং আজান দেয়া শুরু করলেন। বৃষ্টি আর মুক্ত পৃথিবীর আজানের শব্দ মিলেমিশে  একাকার হয়ে যাচ্ছে। এক অলৌকিক সুরের মোহ তৈরি করেছে নিজামের কর্ণকুহরে। 

 আল্লাহ আকবার। আল্লাহ আকবার। শোনামাত্র নিজামের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে যায়, নিশব্দে সে কাঁদতে থাকে। এ খোলা পৃথিবীতে যে সে আবার আজান শুনতে পাবে কে জানতো। বৃষ্টির মধ্যে সময় ঘুলিয়ে যায়, মিহি অন্ধকার আর দিনের আলোর মিশ্রণে সময় ঠাহর করা টাফ হয়ে যায়। নিজাম বুঝতে পারছে না এটা কীসের নামাজ—যোহর না আছর না মাগরিব। মুহূর্তের মধ্যে  মসজিদ মুসল্লীতে ভরে গেলো। আশেপাশের দোকানগুলোর শাটার বন্ধের আওয়াজ হতে লাগলো হরদম। এ মার্কেট মসজিদে আগে আগে মুসল্লীরা আসে না; সবাই যেহেতু ব্যবসায়ী তাই নামাজের সময় হলে আসে আবার নামাজ শেষ হলেই চলে যায়। নিজাম দেখলো যে লোকটা আজান দিলো সেইই নামাজ পড়ালো। নামাজের মধ্যে নিজাম বুঝলো এটা আছরের নামাজ। নামাজ শেষে সবাই যখন বের হচ্ছে তখন মুয়াজ্জিন আর ইমামসাবকে দেখে নিজাম বুঝলো এটা আর কেউ না হোসেন ভাই। হোসেন ভাইয়ের চেহারা বিশেষ পরিবর্তন হয়নি, শুধু চুল পাকছে আর দাঁড়ি রাখছে আর লুঙ্গি-গেঞ্জির বদলে লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি। একজনের সঙ্গে মসজিদের বাহিরে কথা বলার সময় কণ্ঠ শুনে পুরাপুরি নিশ্চিত হয়ে যায় নিজাম—এটাই হোসেন ভাই। চেহারা সুরত যত অদলবদলই হোক কণ্ঠের বিশেষ পরিবর্তন হয় না। হোসেন মিয়াকে দেখে চিনতে পেরে নিজাম কী করবে না করবে বুঝতে পারতাছে না। হুট করে নিজাম হোসেন মিয়াকে ডাক দেয়—হোসেন ভাই। হোসেন মিয়া নিজামের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারে না এটা কে; কিন্তু লোকটাকে চেনা চেনা মনে হচ্ছে। হোসেন নিজামের চেহারার দিকে তাকায়, পরনে ভেজা ট্রাউজার, গায়ে ফতুয়া। মুখে দাঁড়ি, শুকনা লিকলিকে; মাথায় চুল আছে আবার নেই; চেহারা চূড়ান্ত রকমের বিমর্ষ আর গায়ের রঙ ফর্সা হলেও এখন কেমন জানি একটা রঙ; না ফর্সা না কালো না শ্যামলা। হোসেন মিয়া বলে—কে ভাই আপনে? চিনবার পারতাছি না,  চেনা চেনা ঠেকছে।  নিজাম বলে—আমি  নিজাম। কলমাকান্দির।—ভাই আপনে বাঁইচা আছেন? হোসেন মিয়া জাপটায় ধরে নিজামকে। জড়ায়া ধরে দুজন কাঁদে, আশেপাশের লোক বুঝতে পারে না তারা কেন কাঁদতাছে; সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। হোসেন মিয়া জাপটিয়ে ধরতে গিয়ে টের পায়   নিজামের ফতুয়া ভেজা। হোসেন মিয়া নিজামের সঙ্গে হালকাপাতলা বাতচিৎ করে বুঝতে পারে নিজাম এইমাত্রই ছাড়া পেয়েছে, এখনও বাড়িতে যায়নি। হোসেন মিয়া নিজামকে দুপুরের খাবার খেতে অনুরোধ করলেও নিজাম রাজি হয় না। হোসেন মিয়াও বিশেষ তাড়া দেয় না। একটা মানুষ এতোদিন দুনিয়াতে আছে না নাই তার পরিবার জানে না। তার সবার আগে উচিত হল পরিবারের সঙ্গে দেখা করা। নিজামকে শুকনা জামাকাপড়ও কিনে দিতে চাইলো হোসেন মিয়া; তাতেও নিজাম রাজি হলো না। নিজাম কতক্ষণে বাড়ি যাবে তার সে চিন্তা। অবশেষে হোসেন মিয়া নিজামকে এক অব্যর্থ প্রস্তাব দেয়।—ভাই চলেন বিড়ি খাই। এ প্রস্তাবে হোসেন মিয়া ও নিজাম দুজনে কয়েক মুহূর্তের জন্য বিব্রত হলেও পরে তারা পুরানো স্মৃতি মন্থন করে বিব্রত অবস্থা কাটিয়ে ওঠে। নিজাম প্রতি মাসের প্রথম শুক্রবার বেতন পেয়েই লাভলিকে নিয়ে হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেলে যেতো। নিজাম ছিলো শৌখিন মানুষ। সে খেতে খুব পছন্দ করতো। ঢাকা শহরের অলিগলিতে কোথায় কী ভালো পাওয়া যায় তার সব মুখস্ত। লাভলিকে প্রথম যখন হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেলে নিয়ে আসে লাভলি অবাক হইছিলো। সে জীবনে এমন ভাতের হোটেল দেখেনি। হোটেলটা বড়জোর সাড়ে তিনহাত চওড়া মাত্র। ক্যাশবাক্স ফেলার পরে কোনোরকমে একটা লোক হোটেলে ঢুকতে পারে। সরু এ হোটেলটার ভিতরটাও আহামরি বড় না। চারটা টেবিল পাতা মাত্র। হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেলের বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে অন্যান্য হোটেলের মতোন আইটেমের পাশাপাশি শুধু কচুকেন্দ্রিক স্পেশাল কয়েকটা আইটেম থাকতো শুধুমাত্র শুক্রবার। কচুর ছড়ির ডাল, কচুর সঙ্গে গুঁড়া চিংড়ি, কচুর লতি দিয়ে ইলিশ মাছ, কচু পাতার ভর্তা, কচু সেদ্ধ করে রসুন তেলে বার্গার, শুধু কচুর লতি—এসব পাওয়া যেতো। হোসেন মিয়ার ভাতের হোটেলের কচু খেয়ে কখনো গলা চুলকাতও না আর কচুর আইটেম নিলে এমনিতেই বেশি লেবু দিতো হোসেন মিয়া। নিজাম এ কথা যে কত জায়গায় বলেছে—হোসেন ভাইয়ের কচুর আইটেমের ধারেকাছে আর কেউ নাই। ঢাকা শহরে এক পিস। একটাই মাল হোসেন ভাই। এভাবে আসতে আসতে হোসেন মিয়া এক সময় হোসেন ভাই আর নিজামুদ্দিন আসগর চৌধুরী নিজাম হয়ে যায় নিজাম ভাই। লাভলিকে হোটেলে বসিয়ে রেখে খাওয়ার পরে  হোসেন আর নিজাম চিপায় গিয়ে সিগারেট খেতো। নিজাম লাভলিকে বলতো  তুমি বসো, মিষ্টি পান নিয়া আসি। এ পথেঘাটে পরিচয় হোসেনের সঙ্গে নিজামের; কোনো রক্তের বন্ধন নেই, কোনো আত্মীয়তার সূত্র সেই, শৈশব-কৈশোর যৌবনের কোনো বন্ধু না অথচ তাদের সম্পর্ক যেন সবকিছুকে ছাপিয়ে কেমন এক গভীর ভ্রাতৃত্ব, যেন মায়ের পেটের ভাই। হোসেন মিয়ার কাছ থেকে ৫০ টাকা খুঁজবে এ নিয়ে ভাবতে ভাবতে বিড়িতে টান দিতেছিলো নিজাম। লজ্জায় বলতে পারছে না। নিজাম লজ্জা পেলে তার কান লাল হয়ে যায়। বাড়ি না গিয়ে নিজাম মূলত বাসায় যাওয়ার ভাড়ার জন্যই হোসেন মিয়ার কাছে আসে। নিজামের টাকা চাওয়ার আগেই হোসেন মিয়া তাকে ৫০০ টাকার একটি নোট দিয়া বলে—ভাই রাখেন, কিছু নিয়া যাইয়েন বাসায়। নিজামের চোখে পানি টলমল করতে লাগলো, কেন লাগলো সে জানে না। 

নিজাম গাবতলি থেকে চলতি রাজধানী বাসে উঠে গেলো। বৃষ্টি থামার নাম নাই, থামবে যে তার কোনো সিনটম দেখা যাচ্ছে না। বাসভর্তি লোকজন সবাই রাজনৈতিক আলাপ করছে। মানুষের চোখমুখে স্বস্তির প্রকাশ—প্রশান্তি। সে আলো দেখার দিনগুলিতে মানুষকে এতো স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজনৈতিক আলাপ করতে দেখেনি। যার যা মনে আসে নির্দ্বিধায় বলে যাচ্ছে, গালি দিতেও বাধ সাধছে না। এক মুরব্বি তো বলেই বসলো—চুতমারানি দ্যাশটারে কী করে থুইয়া গেছে। কত লোক যে মারছে কে জানে! পাশ থেকে আরেকজন বললো—মন থেইক্কা দুইটা কথা কমু  কী না কী কইরা ফালায় জানে বাঁচিনি সে ডরে থাকা লাগছে। মানুষ যে দম বন্ধ হয়ে মারা যাইতেছিল এতোদিন, এখন যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলো। নিজামের চোখ মুখে কোনো আনন্দ নাই—বিমর্ষ। নানান কথাবার্তা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়। রাস্তায় পানি জমে কোমর সমান। বাসের চাকা পানিতে ডুবুডুবু। বাস চললে পানির ছিটকা লাগে তাই সবাই জানালা লাগিয়ে বাসে বসে আছে। বৃষ্টি কমার কোনো নাম নাই,  ক্রমশ বেড়েই চলছে; মাঝে মাঝে বৃষ্টির সঙ্গে দমকা বাতাস আসছে। কোথায় থেকে উড়ে একটি পলিথিন বাসের সামনের গ্লাসে এসে ঠেকলো আবার পলিথিনটা ঝড়ো বাতাসে কোথায় যেন উড়ে গেলো। মিরপুর কলেজের সামনে এসে বাস থেকে নামে নিজাম। রাস্তা পার হয়ে অপজিটে মিরপুর ২ এর পোস্ট অফিসের সামনে আসে নিজাম। কোমর সমান পানি। একটি রিকশা দাঁড়িয়ে আছে। রিকশার চাকা অর্ধেক দেখা যাচ্ছে না—পানিতে ডুবন্ত। ভাড়া চায় ৫০০। ভাড়া শুনে নিজামের অনেক রাগ লাগলেও সে বহুকষ্টে রাগ সংবরণ করলো। বৃষ্টি এলে রিকশা চালকদের ঈদের দিন আর সাধারণ মানুষ হয়ে পড়ে নিরুপায়। গরিব মানুষ মানে যে ভালো মানুষ, অসহায়, তার বিপরীত চিত্র বৃষ্টি এলে রিকশা চালকের ভাড়া চাওয়ার মাধ্যমে দৃশ্যমান হয়। কোমর সমান পানিতে আস্তে আস্তে সাবধানে আগায় নিজাম। তার মিশ্র অনুভূতি হচ্ছে। প্রচণ্ড আনন্দ ও একইসঙ্গে বিষাদ। সে তার বাসা ৬৬৬/১, মোল্লারোডের দিকে আগাতে থাকে ধীরে ধীরে। পানিতে দুনিয়ার সব ভেসে বেড়াচ্ছে—কলার খোসা, চিপসের প্যাকেট, পচা পোটল, কনডম, কাগজ, পলিথিন। নিজাম তার বাসার গেটের সামনে এসে জোরে বলতে থাকে—আছেন কেউ? গেটে সে জোরে জোরে বাড়ি দিতে থাকে। এদিকে সে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার। এখনও বৃষ্টি পড়ছে। বৃষ্টির শব্দের কারণে তাকে আরো জোরে জোরে ডাকতে হচ্ছে। নিজামের শরীর বৃষ্টিতে ভিজে গা কাটা দিয়ে শীত লাগছে। মনে হচ্ছে জ্বর আসবে। অবশেষে ইয়াং একটা ছেলে চোখ ডলতে ডলতে দারোয়ানের  রুম থেকে বের হয়। মনে হচ্ছে সেই দারোয়ান—বৃষ্টির মধ্যে একটু ঘুমাইতে ছিলো। খু্ব বিরক্তি নিয়ে বলে—কী চান ? কয় তলায় যাবেন? 

নিজাম বলে—দ্বিতীয় তলা।—কার এখানে আসছেন?— লাভলি ম্যাডামের এখানে।  

—এ নামে কেউ এনে থাকে না।

—আপনে কি নতুন জয়েন করছেন? —হ, ৬ মাস অইলো কেবল।

—আগের দারোয়ান চাচা আলী মিয়া কই? চাকরি ছেড়ে দিছে? 

—না। তিনি মইরা গেছেন। আমি তার পোলা। নিজাম চূড়ান্ত রকমের হতাশ হয়। সে কী করবে না করবে বুঝে উঠতে পারে না। নির্বিকার দাঁড়িয়ে থাকে গেটের বাহিরে, বাহিরে বৃষ্টি পড়ছে—বেশুমার বৃষ্টি। তার এখন আসমান ফাটিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা করছে কিন্তু সে কাঁদতে পারছে না। নিজাম কোমর সমান পানি ভেঙে  মোল্লা রোডের আশেপাশের প্রত্যেকটা বাসায় গিয়ে লাভলি নামে এখানে কেউ থাকে কি না জিজ্ঞেস করছে। বলছে তাদের একটা ছোট্ট মেয়ে আছে নাম জুন। কিন্তু নিজামের মাথায় এটা আসছে না সে ছোট্ট মেয়েটি এখন আর ছোট্ট থাকার কথা না। কিন্তু কোথাও লাভলির খোঁজ পায় না নিজাম, জুনেরও না। নিজাম কিছুই ভাবতে পারছে না কী করবে না করবে। 

নিজাম কী করবে না করবে ভাবতে না পেরে হঠাৎ করে তার মনে পড়ে সে তো লাভলির নাম্বার মুখস্থ জানে। তড়িঘড়ি করে সে ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকান খুঁজতে থাকে পাগলের মতোন। এখন ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকান মানেই বিকাশ, নগদের দোকান। এতো বৃষ্টি হওয়ায় অনেক দোকানদার দোকান বন্ধ করে বাসায় চলে গেছে। নিজাম অবশেষে একটা ফেক্সিলোডের দোকান খুঁজে পায়। 

—ভাই একটা কল করা যাবে? এ প্রশ্ন শুনে ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানদার নিজামের দিকে তাকায়। আজকাল কেউ তার দোকানে এসে সচরাচর  ফোন কল দেবে বলে না। কারণ সবার হাতে হাতেই ফোন। সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফেক্সিলোডের দোকানদার বলে—না।

—দেন না ভাই। জরুরি দরকার। টাকা বাড়ায়া দিবোনে। 

—কত টাকা দিবেন? 

—কত  চান? 

—মিনিটে বিশ টাকা। 

—আচ্ছাহ, দেন। 

এদেশের সবচে অসহায় লোকটিও নিরুপায় মানুষ পেলে  হিংস্র হয়ে ওঠে। তখন সে পারে না গলা টিপে টাকা আদায় করে।

নিজাম  ১১ বছর পরে লাভলির নাম্বারে ফোন দেয়। তার বুক ভয়ে দুরু দুরু করে, কেমন জানি হিম হয়ে আসে সমস্ত শরীর। নিজাম ফোন বাজার সঙ্গে সঙ্গে হালে পানি পায় কিন্তু কেউ ফোন রিসিভ করে না। নিজাম আবার ফোন দিলে ওপাশ থেকে কল রিসিভ করে বলে—হ্যালো, আসসালামু আলাইকুম। কে ? 

নিজাম লাভলির কণ্ঠ শুনে তার মনে এক প্রশান্তি নেমে আসে। সে বলে—ওয়ালাইকুসুস সালাম। আমি নিজাম। ওপাশ থেকে এক দীর্ঘ নিঃশ্বাসের শব্দ আর চাপা কান্নার শব্দ শুনে নিজাম।  

 —তুমি বাঁইচা আছো? 

 —হ। আল্লায় বাঁচায়া রাখছে। কই  তুমি?

 —ময়মনসিংহ। 

—ওইখানে কেন? এ প্রশ্ন করার পর লাভলি কিছু বলে না। দুপাশে এক অসীম নিস্তদ্ধতা নেমে আসে। কিছুক্ষণ পর লাভলি বলে— তুমি মইরা গেছো ভাইবা গত বছর আমি বিয়া করছি। আমার হ্যাজব্যান্ড এখানে জব করে। এ কথা বলতে গিয়ে লাভলির যে কী কষ্ট হয় সেটা লাভলিই জানে শুধু আর জানে তার  খোদা। এপাশ থেকে নিজামের মাথা কেমন জানি হ্যাং হয়ে যায়; নিজামের মনে হয় তার মাথায় যেন কেউ ইয়া বড়ো হাতুড়ি দিয়ে বাড়ি মারছে আর বুকে ঘাই মারছে ধারালো ছুরি দিয়ে; মাথা ঝিমঝিম করতে থাকে তার। নিজাম কী বলবে না বলবে বুঝে উঠতে পারে না। তার মনে হয় জীবন আর একটু কম নিষ্ঠুর হলে কী এমন ক্ষতি হতো। 

তারপর নিজাম বলে—আম্মা, জুন কেমন আছে ?

—আম্মা তো তিন বছর আগে স্ট্রোক করে মারা গেছে। এ কথা শুনে নিজাম কোনোরকমে নিজেকে সামলায়। সে তার চাপা কান্নার দলা গলায় আটকে রেখে কোনোরকমে জিজ্ঞাসা করে—আর জুন ? 

—জুন আমার লগেই থাকে। ভালোই আছে। 

—এখন কই তুমি ? 

—আমি  মিরপুর।

নিজাম ফোন কেটে দিয়ে ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানে  টাকা পরিশোধ করে দ্রুত বেরিয়ে যায়। ওদিকে লাভলি ফোন দিতেই থাকে। তখন ফ্ল্যাক্সিলোডের দোকানদার ফোন ধরে জানায় নিজাম দোকান থেকে বেরিয়ে গেছে। 

এদিকে বৃষ্টি থামার কোনো সম্ভবনা নাই, ক্রমশ পানি বেড়েই চলছে।  সন্ধ্যা হয়ে গেছে। চারোপাশে এতো অন্ধকার নেমে এসেছে যে মনে হচ্ছে রাত দুইটা বাজে। মসজিদের মাইক থেকে মাগরিবের আজান ভেসে আসছে। কোমর সমান পানি বেড়ে এখন গলা সমান। নিজাম গলা সমান পানিতে হাঁটছে নিরুদ্দেশহীন। আর মাথার উপর বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। বৃষ্টির পানি তিল তিল করে বেড়ে চলছে আর গলা ডুবে যাচ্ছে নিজামের।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments