হাদির রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন : কালচারাল ফ্যাসিজমের বিরুদ্ধে এক সাংস্কৃতিক প্রতিবাদ

শামস আরেফিন

ফ্যাসিজমকে বিশ শতকের পূর্ব পর্যন্ত রাজনৈতিক ফ্যাসিজমের আদলেই দেখা হতো। কিন্তু উমবার্তো ইকো প্রথম  Eternal Fascism ফ্যাসিবাদ বিষক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন যেখানে ফ্যাসিজ শুধু মুসোলিনির ইতালি বা জার্মানির নাৎসিদের মতো রাষ্ট্র ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ইকো ফ্যাসিবাদকে সাংস্কৃতিক ও মানসিক স্ট্রাকচারে ব্যাখা করেন। ইকোর মতো ফ্যাসিবাদ কোনো মতাদর্শ এবং এটি মানুষের কোন আদর্শ নয়। বরং এটা কতগুলো মতবাদের সমষ্টি যেখানে মিথ এবং আবেগ প্রবণতা সত্য বলে প্রতিষ্ঠা করা হয়। যে মিথ আবার বারবার কোনো গণতান্ত্রিক সমাজেও ফিরে আসতে পারে। ইকো বলেছেন, ফ্যসিবাদ আনুষ্ঠানিক স্বৈরশাসন ছাড়াও তার অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারে। কারণ ফাসিবাদ সংস্কৃতি, ভাষা ও দৈনন্দিন সামাজিক আচার আচারণের মাঝে প্রোথিত থাকতে পারে।[1]Eco, U. (1995). Ur-Fascism. The New York Review of Books, 42(10), 31–33. পরবর্তী সময়ে অনেক সমালোচক ও গবেষক একে সাংস্কৃতি ফ্যাসিবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

কালচারাল ফ্যাসিজম বলতে আমরা সহজ ভাষায় সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদ বোঝাই। যেখানে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণি বা গোষ্ঠীকে তাদের সংস্কৃতি, মূল্যবোধ, দর্শন ও চিন্তার ধরনকে একমাত্র বৈধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। গ্রামসির মতে শাসকশ্রেণি কেবল আইন শৃঙ্খলার মাধ্যমে সমাজ শাসন করে না। বরং তারা সংস্কৃতি, শিক্ষা, ধর্ম, ভাষা, গণমাধ্যম ও নৈতিক মূল্যবোধের মাধ্যমে শোষিত শ্রেণির সম্মতি অর্জন করে।[2]Bourdieu, P. (1991). Language and symbolic power. Harvard University Press. আর এই কালচারাল হেজেমনির মাধ্যমে তারা জনগণের মধ্যে কমনসেন্স তৈরি করে। যাতে সাধারণ মানুষের সামনে শাসকশ্রেণির আদর্শকে স্বাভাবিক, যুক্তিসঙ্গত ও অপরিবর্তনীয় সত্য বলে মনে হয়। ফলে বিকল্প চিন্তা “অবাস্তব” বা “বিপজ্জনক” বলে বিবেচিত হয়। যেমন নেংটা রাজাকে তার সকল মন্ত্রী পোশাকপরিহিত দেখে। কিন্তু এক শিশুই তাকে নেংটা দেখে। কারণ সেই সমাজের তথাকথিত কমনসেন্স রপ্ত করতে পারেনি। বুঝেনি মিথ্যাকে কীভাবে সত্য বলে মানতে হয়। হাদির সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন কীভাবে কালচারাল ফ্যসিজমকে মোকাবেলা করার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে, কীভবে সেই তথাকথিত কমনসেন্স ভেঙে দিয়েছে, তাই এখানে আলোচনা করব।

 

১. মিশেল ফুকোর দৃষ্টিতে কালচারাল ফ্যাসিজম

মিশেল ফুকো ফ্যাসিজমের কাঠামোকে মাইক্রো ফ্যাসিজম হিসেবে চিহ্ণিত করেছেন। তিনি বলেছেন মাইক্রো ফাসিজম এমন প্রক্রিয়া যাতে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্বৈরাচারী যুক্তি ও দর্শন আত্মীকরণ করা হয়। এই দর্শন ব্যক্তির আনুগত্যের মাধ্যমে, স্বাভাবীকরণের মাধ্যমে, নৈতিকতাকে পুলিশীকরণের মাধ্যমে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এবং এমনকি প্রগতিশীল আন্দোলনের মাধ্যমে মানুষের অন্তস্তলে প্রোথিত করা হয়। যেমন আধুনিক প্রতিষ্ঠান বিশেষত বাংলাদেশে বিভিন্ন শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রতিষ্ঠান আমাদের মাঝে কিছু সাংস্কৃতিক রীতিনীতি প্রচলন করে। স্বাধীনতা ও মুক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করে। অথবা কোনো সংবাদপত্রের মাধ্যমে মতাদর্শ প্রচার কারে। তাদের  এই প্রচলিত সংস্কৃতি চর্চা নিয় প্রশ্ন করা যাবে না । কেউ যদি এসব প্রশ্ন নিয়ে প্রশ্ন না করতে পারে, তবে সেই সমাজ বা জাতি স্বাভাবিকভাবে মাইক্রো ফ্যসিজম দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে।[3]Foucault, M. (1983). Preface. In G. Deleuze & F. Guattari, Anti-Oedipus: Capitalism and schizophrenia (R. Hurley, M. Seem, & H. R. Lane, Trans., pp. xi–xiv). Minneapolis, MN: University of … Continue reading ফলে তার সাংস্কৃতিক রীতিনীতি অন্য কেউ না মানলে সহজে অন্যদের আনকালচারড বলে বসতে পারে। অন্যদের অসামাজিকও বলতে পারে ।

মিশেল ফুকোর মতে ক্ষমতা (Power) কেবল রাষ্ট্র, আইন বা দমনমূলক যন্ত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।  বরং এটি জ্ঞান (Knowledge), বয়ান (Discourse), প্রতিষ্ঠান, নৈতিকতা এবং দৈনন্দিন আচরণের ভেতর ছড়িয়ে থাকে।[4]Foucault, M. (1980). Power/knowledge: Selected interviews and other writings, 1972–1977. Pantheon Books. এই দৃষ্টিকোণ থেকে কালচারাল ফ্যাসিজমকে বোঝা যায় এমন এক শাসনব্যবস্থা হিসেবে, যেখানে নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক বয়ান (Discourse) ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সেই বয়ানের বাইরে থাকা চিন্তা, বিশ্বাস ও পরিচয়গুলোকে অস্বাভাবিক, বিপজ্জনক বা অগ্রহণযোগ্য বলে চিহ্নিত করা হয়। ফুকোর ভাষায়, এটি হলো Regime of Truth—অর্থাৎ কোনটি সত্য, কোনটি যুক্তিসঙ্গত, কোনটি নৈতিক— এই সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষমতা।[5]Foucault, M. (1977). Discipline and punish: The birth of the prison. Pantheon Books. কালচারাল ফ্যাসিজম এই ব্যবস্থার মাধ্যমে কাজ করে মানুষকে বলপ্রয়োগে নয়, বরং what to think, how to think এবং how to be—এই কাঠামোর ভেতরে আবদ্ধ করে শাসন করা হয়। যে বাস্তবতা আমরা গত ১৭ বছরের ফাসিবাদের আমলে দেখেছি।

বিগত ১৭ বছর ফ্যাসিবাদী এ ধরনের চর্চা পরিবারে, স্কুলে, কর্মস্থলে, আমাদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে এমনকি আমাদের প্রগতিশীল আন্দোলনেও দেখতে পেয়েছি। ফলে দেখা যায় আনু মোহাম্মদকে যখন আপোসহীন নেত্রী বেগম জিয়া অসুস্থ অবস্থায় দেখতে যান, তখন তিনি বিব্রত হন। অথবা বেগম জিয়া রাষ্ট্রীয় খরচে রাশেদ খান মেননের চিকিৎসা ব্যবস্থা করান। তারপরও ক্ষমতায় যাওয়ার পর তথাকথিত সাম্যের প্রচারক মেনন ভদ্র আচরণ দেখাতে পারেন না। কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিকে অন্ধ করে মিথ্যা মূল্যবোধ তৈরি করতে উৎসাহিত করে। যে মূল্যবোধ নিয়ে কোনো প্রশ্ন করা যাবে না। কারণ এই মাইক্রো ফ্যাসিজম চায় তার নির্দিষ্ট বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের একটু অবনমন বড় ধরনের হুমকি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে। আর বিরোধিতাকারীদের জীবনের হুমকি সৃষ্টি করে। এই কারণে ফুকো বলেছেন, “The major enemy, the strategic adversary, is fascism… the fascism in us all, in our heads and in our everyday behavior.[6]Foucault, M. (1977). Preface. In G. Deleuze & F. Guattari, Anti-Oedipus: Capitalism and Schizophrenia (R. Hurley, M. Seem, & H. R. Lane, Trans.). New York, NY: Viking Press.

 

২. কালচারাল হেজেমনি

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কালচারাল হেজেমনি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি ও রবীঠাকুরের গানে পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশি কালচারকে প্রামোট না করে কলকাতাকেন্দ্রিক সাংস্কৃতিক চর্চা। পহেলা বৈশাখী বাঙালি হয়ে সকল জাতিগোষ্ঠীকে পহেলা বৈশাখ উদযাপনে মনস্তাত্বিতকভাবে বাধা তৈরি করা। এই তথাকথিত বুদ্ধিজীবীরা জাতিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিপর্যস্ত করেছেন। সমাজে টুপি-দাড়িকে করেছে অচ্ছুত রাজাকারের প্রতীক। এই সাংস্কৃতিক আগ্রাসন মোকাবেলায় বুদ্ধিজীবীরা নিশ্চুপ। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায় বলতে হয় “তারা বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করে, পশ্চিম বঙ্গের শিল্প সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় নিজেদের ব্যস্ত রেখেছেন”।[7]Ahmed, A. M. (1999). Bangladesher culture [বাংলাদেশের কালচার]. Dhaka, Bangladesh: Ananya তারা রবীন্দ্রনাথকে বড় করতে গিয়ে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী কবি বা কবিতার আলাদা ভাষা থাকতে পারে, তারা তা ভাবতে পারেননি। ফলশ্রুতিতে দেখা গেছে আমেরিকান কবি টি.এস.এলিয়টরা শেক্সপিয়রকে বড় কবি হিসেবে স্বীকার করলেও তারা ইংল্যান্ডের ভাষায় আমেরিকানদের আবেগ, অনুভূতি বা দ্রোহ প্রকাশ করতে যাননি। ভাষা ও সংস্কৃতি যার যার আলাদা। আবেগ ও অনুভূতি প্রকাশের ভঙ্গিও আলাদা। ফলে আমেরিকানরা একই ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য চর্চা করেছেন। তবে কখনো ইংল্যান্ডের সমসাময়িক কবিদের ভাষায় আমেরিকানদের আবেগ অনুভূতি প্রকাশ করতে যাননি। তারা ইংল্যান্ডের সাংস্কৃতিক আধিপত্যে বিলীন হয়ে যাননি। অথচ এই বাংলাদেশে জয়গোস্বামীর মতো কবিতা লিখে হাজার জয়গোস্বামী তৈরি হয়েছে আমাদের তরুণদের মাঝে।

দেশের বুদ্ধিজীবীরা বিকলাঙ্গ বুদ্ধির অধিকারী হয়েও নিজেদের চিন্তার দিক থেকে স্বাধীন মনে করেন। আর বিকল্প চিন্তা ও প্রান্তিক শ্রেণি থেকে উঠে আসা তরুণদের অভিব্যক্তিকে পরিকল্পিতভাবে দমন করার জন্য নিত্য নতুন ব্যাখা দাঁড় করান। তারা এই দমন প্রক্রিয়া ফ্যাসিস্ট আমলে সরাসরি বল প্রয়োগের মাধ্যমে সরকারকে বেকারত্ব সমস্য ও আর্থসামজিক সম্যসা সমাধানে উৎসাহিত করেছেন। সরকারও তাদের নিয়ন্ত্রণে পারিতোষিক, ফ্লাট, প্লট ও নানা রাষ্ট্রীয় স্বৃকৃতি দিয়েছে। ফলে জুলাই বিপ্লবে ১৪০০ শতাধিক শহীদ হলো। প্রায় ত্রিশ হাজারের মতো আহত হলো। কিন্তু কোন কবি সাহিত্যিক সরকার প্রদত্ত কোন পুরষ্কার বর্জন করার মতো সৎ সাহস দেখাতে পারেনি। এই বাস্তবতা বোঝাতেই অ্যান্থনি গ্রামসি বলেছিলেন “The ruling class maintains its dominance not only through coercion, but by securing the active consent of the governed through intellectual and moral leadership.”[8]Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. Nowell Smith, Eds. & Trans.). International Publishers. ফলে দেখা যায় শুধু রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাসীনরা নির্যাতনের মাধ্যমে তাদের কতৃত্ব বজায় রাখে না। বরং তারা মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে মানুষের সরব সমর্থন আদায় করে। যেমন বলা যায় কালচারাল হেজেমনির মাধ্যমে এই ফ্যাসিস্টরাই শিক্ষাব্যবস্থা, গণমাধ্যম, সাংস্কৃতি প্রতীক, স্বাধীনতার চেতনা, মুক্তিযুদ্ধে স্বপক্ষ শক্তি ইত্যাদি রাজনৈতিক ভাষা ও মিথ তৈরি করে জনগণের মধ্যে আত্মবিচ্ছিন্নতা, বুদ্ধিবৃত্তিক অবদমন ও সাংস্কৃতি হীনষ্মন্যতা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছেন।

হাদির রাজনৈতিক অবস্থানকে এই প্রেক্ষাপটে একটি সুস্পষ্ট Counter-hegemonic intervention হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়। তিনি কালচারাল ফ্যাসিজমের মোকাবেলায় ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোকে এমনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন, যা এর আগে কেউ এমনভাবে করেনি। তিনি সাংস্কৃতিক আধিপত্য ও কাঠামোকে ভাঙতে চেয়েছেন। নৈতিকতা ও বাংলাদেশী চেতনার সমন্বয়ে গড়ে ওঠা মানবসম্পদই যে সাংস্কৃতিক মুক্তির প্রধান হাতিয়ার, তা তিনি বুঝেছেন। গ্রামশীয় বুদ্ধিবৃত্তিক মুক্তির আন্দোলনকে আরো ব্যাপক করেন। ফলে তিনি সাংস্কৃতিক হুজুর অস্বস্তি নিয়ে সহজাতভাবে প্রশ্ন তুলেছেন।  হাদি কালচারাল ফ্যাসিজমের একচেটিয়া সাংস্কৃতিক কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক গণতন্ত্রায়ণের একটি বিকল্প পথ নির্দেশ করেছেন। এই কারণে হাদি নতুন বয়ান তৈরি করে বলেছিলেন, “বাংলাদেশ কি ভালো আছে কি না তা বোঝার জন্য বেগম জিয়াকে দেখতে হবে।….  কতটা আপোসহীন হলে তিনি তার স্বামী সন্তান সবকিছু হারিয়ে বলে দিতে পারেন বাংলাদেশ ছাড়া আমার কোনো যাওয়ার জায়গা নেই। পৃথিবীর ইতিহাসে যে এমন কোন সামরিক কর্মকর্তা নেই, যারা সামরিক বাহিনী থেকে গণতান্ত্রিকভাবে দেশের প্রধান নির্বাচিত হয়েছেন। আবার নির্বাচিত হয়ে দেশের সাংবিধানিক গণতন্ত্রকৈ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন”। এতদিন এই সবই বুদ্ধিজীবীরা জানত। কিন্তু তাদের কেউ এই কথা বলার সাহস হয়নি। কারণ এসব বললে মুজিবকে ছোট করা হয়। একইভাবে এই বুদ্ধিজীবীরাই তাদের সাংস্কৃতিক আধিপত্য বজায় রেখে মুক্তিযুদ্ধকে লীগের নিকট বর্গা দিয়েছেন ও বগলদাবা করতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। নয়তো দেশে বিপ্লব হলো, তাই বলে একটি দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে কেন পালাতে হবে। কেন পালাতে হলে চৌর্যবৃত্তি করে লেখা জনপ্রিয় সাইন্সফিকশন লেখকদের ।

 

৩. হাদির রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ফ্যাসিজমের প্রতি আঘাত

উমবের্তো একো মোট ১৪টি ধারণাকে ফ্যাসিজমের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্ণিত করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো অতীত ইতিহাসকে পুজা, আধুনিকতাকে অস্বীকার, মতবিরোধকে ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করা, ভিন্নমতকে ভয় পাওয়া, সামাজিক হতাশাকে কাজে লাগিয়ে জনসমর্থন আদায় ও চিরস্থায়ী ষড়যন্ত্রের ধারণা লালন করা। পাশাপাশি, ফ্যাসিবাদী বয়ানে শত্রুকে একদিকে সর্বশক্তিমান হুমকি হিসেবে দেখানো হয়, আবার অন্যদিকে নৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় ঘৃণাও তৈরি করা। তাছাড়া, ফ্যাসিবাদ দেখাতে চায় শান্তিবাদ মানেই শত্রুর সঙ্গে আঁতাত, দুর্বলের প্রতি অবজ্ঞা। আর নির্বাচিত জনগণতন্ত্র বা (Selective Populism) অর্থাৎ ‘জনগণ’ বলতে শাসকের অনুগত একটি অংশকেই প্রকৃত জনগণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।[9]Eco, U. (1995). Ur‑Fascism: Fourteen ways of looking at a blackshirt. The New York Review of Books, 42(10), 31–33. ফলে রাজাকারের বাচ্চারা চাকরি পেতে পারে না। অধিকার শুধু আওয়ামী সমর্থকদের। এই বৈশিষ্ট্যগুলো দেখায় কীভাবে ফ্যাসিবাদ ভয়, ঘৃণা ও কৃত্রিম বীরত্বের রাজনীতি গড়ে তোলে এবং গণতন্ত্রিক যুক্তিবোধকে ধ্বংস করে, যা হাদি জনসাধারণ বুঝাতে চেয়েছেন।

  •       হাদি জেনেবুঝে এইসব বৈশিষ্ট্যকে আঘাত করেছিলেন। তিনি চিহ্নিত করতে পেরেছিলেন রাজনৈতিক ক্ষমতার বৈধতা জনগণ থেকেই আসে। কোনো ক্যারিশমাটিক নেতার মতো বৈধতা তার দরকার নেই। জনগণের সরাসরি ভোটে মানুষ নির্বাচিত হতে পারে, যদি নেতা জনগণের আস্থা অর্জন করতে পারেন। তিনি জনগণ বলতে ব্যক্তি বিশেষ সুশীল বা এলিট ক্লাস বা শুধু মধ্যবিত্তকে বুঝেননি। এ কারণে প্রতিদিন সকালে ফজরের নামাজের পর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করতেন।
  •       তিনি অতীত ইতিহাসকে পুজা করার ইতিহাস ভেঙে স্বাধীনতা অর্জনে মাওলানা ভাসানী, শেরে বাংলা একে ফজলুল হক ও জিয়াউর রহমানের বিরোচিত ভূমিকা বিভিন্ন আলোচনায় তুলে ধরেছেন। এমনকি এনসিপির জুলাই দখল করার প্রবণতাকে আশঙ্কা হিসেবে চিহ্ণিত করে বলেছিলেন এনসিপির দোষ তারা “জুলাইকে নিজেদের সম্পদে পরিণত করেছে। মনে করিয়ে দেই, জুলাই কেবল এনসিপির নয়, জুলাই গোটা দেশের”।
  •       ফ্যাসিবাদীদের মতো মতবিরোধের জায়গাকে ভয় না পেয়ে তিনি ঢাকা-৮ আসনে নিজের দুই প্রতিদ্বন্দ্বী মির্জা আব্বাস ও হেলাল উদ্দীনকে ভাই বলে দোয়া চেয়েছিলেন। হাদি রাজনীতিতে/নির্বাচনের মাঠে হেভিওয়েট কনসেপ্ট ভেঙে দিয়ে সবার জন‍্য লেভেল প্লেয়িং মাঠ বানানোর কালচার সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন। হাদি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে চেয়েছিলেন যে সততা-ভালবাসা-ত‍্যাগ-ডেডিকেশন আর জনগণের ভাষা বুঝে চলার রাজনীতি দিয়ে যেকোনো প্রার্থীর সাথেই কম্পিটিশন করা যায়।
  •       তিনি ফুকোর দুর্বলের প্রতি অবজ্ঞা ও নির্বাচিত জনতন্ত্রকে রাজনৈতিক আন্দোলনের মাধ্যমে আঘাত করেছেন। কারণ মুষ্টিময় মানুষের জন্য শুধু গণতন্ত্র থাকলে তার মাধ্যমে বারবার ফ্যাসিজম ফিরে আসে। তিনি মসজিদে মসজিদে ভোটের জন্য ঘুরেছেন। এমনকি হেভিওয়েটদের মাথায়ও তিনি চিন্তার ভাঁজ ফেলে দিয়েছেন। রাজনৈতিক আদর্শকে তিনি ভারতীয় আধিপত্যবাদের করাল গ্রাস থেকে মুক্ত করতে চেয়েছেন। এ দেশের মানুষের মুক্তির পথে সবাইকে সাথে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তিনি পর্যদুস্ত অবস্থা দেখে বলেছিলেন, “৫৪ বছরেও আমরা নিজেদের জন্য একটা ইনসাফের রাষ্ট্র বানাইতে পারি নাই। এই সময়টুকুর অবহেলা করলে আগামী ১০০ বছরেও হয়তো এমন সূযোগ আর না-ও আসতে পারে। ১৪০০ শহিদের রক্তের ঋণ মেটানো আমাদের দায়।”

 

৪. গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রথাগত নিবার্চন

গণতান্ত্রিক তত্ত্বের দৃষ্টিতে হাদির বক্তব্যগুলো মূলত Substantive Democracy বা বাস্তব গণতন্ত্রের পক্ষে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে সীমাবদ্ধ রয়েছে— নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা, দলীয় ক্ষমতার পালাবদল, এলিট-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধিত্বে। হাদি এই সীমাবদ্ধতাকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন—জনগণের বিশ্বাসই আসল বৈধতা (legitimacy)। তার নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বীকে “ভাই” বলা মানে রাজনৈতিক শত্রুতার সংস্কৃতি ভাঙা, “লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড” মানে কেবল আইনগত সমতা নয়, নৈতিক ও কাঠামোগত সমতা প্রতিষ্ঠা করা। এসবের মাধ্যমে তিনি Participatory Democracy-র ভাষায় কথা বলেন—যেখানে জনমত শুধু ভোটের দিন নয়, প্রতিদিন গুরুত্বপূর্ণ। ফলত তিনি হিন্দুদের জন‍্য একটা আলাদা রাজনৈতিক দল বানাতে চেয়েছিল। যেন একেক দল একেকে সময়ে তাদেরকে ব‍্যবহার করতে না পারে। আর এসবের মাধ্যমে হাদি দেখাতে চেয়েছিল— নির্বাচনে কম্পিটিশন করার জন‍্য কোটি টাকা থাকা লাগে না। জনগণই টাকা দিয়ে নির্বাচন করায়ে দিতে পারে, কেবল যদি জনতার ভরসার প্রতীক হয়ে উঠা যায়। সর্বোপরি হাদি ফ্যাসিবাদকে চুড়ান্তভাবে কবরস্থ করার জন্য দেখিয়েছেন— কোনো কিছুর কাছে বিক্রি হয়ে না হয়েও রাজনীতিটা করা যায়। মুড়ি আর বাতাসা দিয়ে নির্বাচনি জনসংযোগ করা যায়।

 

৫. রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে বিশ্লেষণ

রাজনৈতিক অর্থনীতির দৃষ্টিতে হাদির বক্তব্যগুলোর কেন্দ্রীয় বিষয় হলো ক্ষমতা, সম্পদ ও শ্রেণি-সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস। তিনি বারবার যে কথাগুলো বলেছেন— কোটি টাকা ছাড়া নির্বাচন, জনগণের টাকায় ক্যাম্পেইন, “হেভিওয়েট” রাজনীতির ভাঙন—এসব মূলত বাংলাদেশের বিদ্যমান প্লুটোক্র্যাটিক রাজনীতি (অর্থশালী-নিয়ন্ত্রিত রাজনীতি)-এর বিরুদ্ধে একটি স্পষ্ট চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতি পরিচালিত হয়েছে— বড় ব্যবসায়ী পুঁজি, ভারতীয় আধিপত্য এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা ও এলিটদের মেলবন্ধনের মাধ্যমে। হাদি এই কাঠামোর বিরুদ্ধে জনভিত্তিক রাজনৈতিক অর্থনীতির ধারণা দাঁড় করান। যেখানে জনগণই রাজনৈতিক পুঁজির উৎস, নির্বাচন হতে পারে সামাজিক আস্থার ভিত্তিতে এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাজারের মতো কেনাবেচার বিষয় নয়। তিনি “জুলাইকে বিক্রি”, “বিদেশে এক পা রাখা”, “ভারতের দাসত্ব”—এই ভাষার মাধ্যমে বোঝাতে চান যে, ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় এলিটই রাষ্ট্রকে ভাড়া দেওয়া সম্পদ (rent-seeking state) হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই হাদি গ্রামসির থিউরি অনুযায়ী ফ্যাসিবাদকে “war of position” এর মাধ্যমে ঠেকাতে চেয়েছেন। তিনি মনে করতেন War of Maneuver জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ঘটেছে। কিন্তু  war of position এর জন্য দরকার ইনকিলাব কালচারাল সেন্টার ও সাংস্কৃতিক আন্দোলন। আর এই সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপট হবে যেমন গ্রামসি বলেছেন  “A war of position is not a frontal attack but a struggle for hegemony within civil society.[10]Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. N. Smith, Eds. & Trans.). International Publishers. অর্থৎ সুশীল সমাজের প্রতিষ্ঠিত সাংস্কৃতিক রীতি, বাঙালি অহমিকা, বাংলাদেশভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তে বাঙালিকেন্দ্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে হিন্দু মুসলমান, উপজাতি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া মতবাদের বিরুদ্ধে নতুন বয়ান প্রতিষ্ঠা করার মাধ্যমে। তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতি ও ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসী জিয়াউর রহমানের সেই বিএনপির আদর্শ পুনুরুজ্জীবিত করতে চেয়েছেন। যে মধ্যপন্থ্যার অনুপস্থিতিতে দেশের অবস্থা, তিনি চেয়েছিলেন তাদের শক্ত অবস্থান। তাঁর দৃষ্টিতে রাজনীতি কেবল ক্ষমতা অর্জনের কৌশল নয়। বরং জনগণের সাংস্কৃতিক সক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্ব পুনর্গঠনের একটি প্রক্রিয়া।

হাদি জানতেন, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা ও ন্যয়বিচার যেকোনো সভ্য সমাজের মানদণ্ড। তাই হাদি চেয়েছিলেন ইনসাফ। এমনকি দালাল ফ‍্যাসিস্ট আওয়ামীলীগের যারা গণহত্যা করেনি, তাদের সাথেও ইনসাফ করতে চেয়েছিল। হাদি জুলাইয়ের শহীদদের খুনিদের বিচার হোক এটা চেয়েছিলেন। তিনি মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন। কারণ Gladstone বলেছিলেন  Justice delayed is justice denied[11]Twining, W., & Miers, D. (2008). How to do things with rules (6th ed.). London, UK: Sweet & Maxwell. রাষ্ট্রবিজ্ঞান এবং মানবাধিকারের প্রেক্ষাপটে, বিচার প্রশাসনে দীর্ঘায়িত হলে জনসাধারণের আস্থা নষ্ট হয়ে যায়। আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। বিলম্বিত ন্যায়বিচার দুর্বল জনগোষ্ঠীকে চরম বৈষম্যের শিকারে পরিণত করে।  তাই সময়মতো বিচার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক শাসন এবং মানবাধিকার সুরক্ষার জন্য একটি মৌলিক প্রয়োজন। আর এই প্রয়োজনকে মেটাতে আমাদের হাদির খুনের বিচার নিশ্চিত করতে হবে। আর তা না হলে সততা, স্বাধীনতা বা সার্বভৌমত্বের সূর্য আবার ডুবে যেতে পারে। বাংলাদেশি বা বাংলাদেশপন্থি সাংস্কৃতিক আন্দোলনের মাধ্যমে প্রতিহত করতে হবে কালচারাল টাউট ও ফ্যাসিস্টদের। আর এমন ইনসাফ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হবে নতুন দিনের সার্বভৌম বাংলাদেশ।

তথ্যসূত্র:

তথ্যসূত্র:
1 Eco, U. (1995). Ur-Fascism. The New York Review of Books, 42(10), 31–33.
2 Bourdieu, P. (1991). Language and symbolic power. Harvard University Press.
3 Foucault, M. (1983). Preface. In G. Deleuze & F. Guattari, Anti-Oedipus: Capitalism and schizophrenia (R. Hurley, M. Seem, & H. R. Lane, Trans., pp. xi–xiv). Minneapolis, MN: University of Minnesota Press. (Original work published 1972
4 Foucault, M. (1980). Power/knowledge: Selected interviews and other writings, 1972–1977. Pantheon Books.
5 Foucault, M. (1977). Discipline and punish: The birth of the prison. Pantheon Books.
6 Foucault, M. (1977). Preface. In G. Deleuze & F. Guattari, Anti-Oedipus: Capitalism and Schizophrenia (R. Hurley, M. Seem, & H. R. Lane, Trans.). New York, NY: Viking Press.
7 Ahmed, A. M. (1999). Bangladesher culture [বাংলাদেশের কালচার]. Dhaka, Bangladesh: Ananya
8 Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. Nowell Smith, Eds. & Trans.). International Publishers.
9 Eco, U. (1995). Ur‑Fascism: Fourteen ways of looking at a blackshirt. The New York Review of Books, 42(10), 31–33.
10 Gramsci, A. (1971). Selections from the Prison Notebooks (Q. Hoare & G. N. Smith, Eds. & Trans.). International Publishers.
11 Twining, W., & Miers, D. (2008). How to do things with rules (6th ed.). London, UK: Sweet & Maxwell.

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments