আলো পড়ে চকচক করছে মহুয়ার গাল। ব্লাস করার কথা, হচ্ছে না। মেকাপ আর্টিস্ট ব্লেন্ডিংটায় মনোযোগ দেয়নি। গাদাখানেক হাইলাইটার ছড়িয়ে রেখেছে নাকে, গালে, চোখে। নিজেকে তার আস্ত একটা ইলিশ বলে মনে হচ্ছে। দুটো কাঁচামরিচসহ লুঙ্গিপরা কারো পান্তাভাতের থালায় বসিয়ে দিলে নির্ঘাত কচকচ করে খেয়ে নেবে তাকে। মহুয়া দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। কিছুক্ষণ পর শো। স্টপার কে এখনো ঘোষণা হয়নি। জানার চেষ্টাও নেই তার। এমনিতেই ক্যারিয়ারে চাকা উল্টোদিকে, বয়সও চল্লিশের শেষ। মিডিয়াপাড়ার হালচাল দম ধরে না দেখলে কাজ বন্ধ। ভাবা যায়, একসময় র্যাম্প টপ মডেল ছিল মহুয়া। কী এক ছাতার মাথা নার্কোটিক মামলায় জড়িয়ে বি গ্রেডেও ডাক পায় না এখন। জেলে থাকা দু’বছরে শরীরের ছিরিছাঁদও গেছে। মহুয়ার মাথায় এখন চেপে থাকে অ্যাপার্টমেন্ট রেন্ট, কার ইন্সুইরেন্স বিল। এসব ভাবনায় গালে আর একটু ব্লাসন লাগায়। মাথার স্কার্ফটা টেনে টেনে বাঁধে। টাই টপস স্কার্টে তাকে ঠিকঠাক মানাচ্ছে না। মনে হচ্ছে কাকতাড়ুয়া। মহুয়া উসখুস করে। মেকাপ রুমে কেউ আসছে না কেন? চেঁচায়। কেউ শুনলো কি না বোঝা যাচ্ছে না। হোয়াই এভরিবডি ইজ সো সাইলেন্ট! ইগনোরেন্স? হাউ ডেয়ার। কনটাক্ট লেন্স বসেনি। কটকটাচ্ছে চোখ। অন্তর্বাসের হুক আট হয়ে বিঁধে আছে পিঠে, কেটে বসে যাবে না তো। আচ্ছা মহুয়ার কী ওয়েট বাড়ছে! জিমে যাওয়া তো শুরু করেছে আবার। নাইট পার্টিতে গেলে অবশ্য গিলতে হয় গাদা গাদা। ফ্রিতে পাওয়া মালে ওভার ওয়েট হবে না! মহুয়া অস্বস্তি কাটাতে চায়, কাটে না, পায়ের হিলগুলো ভয়ঙ্কর চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে, পারবে তো আজ! তাকে পারতেই হবে। ওয়াইনের একটা গ্লাস হলে মন্দ হতো না। পাবে কই এখন? কতদিন হলো এখনো ফ্লাশ জ্বলে উঠলে কেঁপে যায় মহুয়ার বুক। ধুকপুক। আচ্ছা আজ কি কোনো বিশেষ দিন, কেউ কি মারা যাচ্ছে? ড্রেসিং রুম এত খালি কেন? সে তো প্রস্তুত। এমন তো কখনো হয় না। না, কেউই আসছে না। আসলেই কি তার কোনো শিডিউল ছিল আজ? অবশ্যই ছিল। কী ভুলভাল ভাবছে সে। ওই তো ওখানে সবাই আছে। ট্রায়ালরুম। একঝাঁক রঙিন মেয়ে। তার সময়েরও কেউ কেউ আছে। কিন্তু তাদের তো খুকী খুকীই লাগছে। বেকলেস গাউন, হট, বোল্ড। মহুয়া নিজের গাল টেনে ধরে। কণ্ঠার হাড় খোঁজে, বিউটি বোন। মাথা ঝিমঝিম করে, কেউ তাকে কিছু খাইয়েছে আজ, নাকি সে নিজেই খেয়েছে। মহুয়া আরও দুপাফ নেয়। আহ! বেশ লাগছে। ফুরফুরা। ভয়ও লাগছে, কবে জানি আবার এসবের জন্য ধরা খায়। খাক। তার তো আর হারাবার কিছু নেই, কার কথা ভাববে সে। একসময় ঘর ছিল, বর ছিল। স্টেটাস, বাজারদর। সবই গেছে৷ ওই তো ক্যামেরা, আলো, রঙ, মুখ-মুখোশ। খচখচ করে তার; সে ভাবতে চায় এভরিবডি জাস্ট জেলাস টু হার। কিন্তু অন্যের দিকে তাকালে ভাবনাটা তাকেই কেবল ইন্ডিকেট করে। হাউ ফানি। ওখানে জুবুথুবু ভঙ্গিতে ডিরেক্ট করছে একটা ছেলে। ছেলে না সাদা শুয়োর। রাহাত, বয়স কম। এই ছেলে একদিন তাকে উন্মাদ ক্ষ্যাপাটে বুড়ি বলেছে। হাহ্ বুড়ি। হাঁটুর বয়সী ছেলে ও কেমন করে বুঝবে মহুয়ার দর। সুপার মডেল চেনে? শো স্টপার? ব্যাগের গোপন চেম্বার থেকে সিরিঞ্জ বের করে এবার মহুয়া। একটু লাগে চামড়ায়, সামান্য সময়! আহ! কানে শব্দ আসে উৎকট। এক-দুই-তিন, লেটস হ্যান্ডস টুগেদার উইথ তানিয়া। আলো জ্বলে উঠছে। সহস্র আলো। একটা দুইটা তিনটা। হাতে পায়ে ছড়িয়ে পড়া ঝিমঝিম ঝিঁঝি অগনিত জোনাকি হয়ে জ্বলছে মাথায়! মহুয়া ভেবে পায় না তানিয়া কেন? শো স্টপারতো সে? হাউ ডেয়ার! আলো জ্বলছে, বলো নিবছে এটা কী?। মহুয়া আগায়। স্টেজের দুপাশে বসে থাকা মানুষগুলোকে কেমন অদ্ভুত। ঠোঁটের কোনায় লম্বা লম্বা দাঁত। হাঁটা জারিয়ে যাচ্ছে। রঙিন আলো, এত আনন্দ। মহুয়া নাচবে না? স্কার্ট তুলে পায়ের জুতো খোঁজে সে। বিড়াল হাঁটায় ঠকঠকে শব্দ লাগে। মহুয়া ব্যাকসাইড দোলায়, ড্যাম ড্যাম ড্যাম। একি! সবাই তাকে ঠেসে ধরছে কেন? কী চায় ওরা? মারছে। ওহ লাগছে তো!
ভোঁতা মাথায় শুধু শব্দ। সে কোথায়? সে কি ঘুমিয়ে পড়েছিল স্টেজে। এই তো কিছুক্ষণ আগেই না সুই ফুটল। আহা মোজার্ট! ঘুম পাড়ানি মাসি পিসি মোদের ঘরে এসো। নো নো এটা তো ক্যাসিনো। নো এটা সেই হই হট্টগোলের মাঠ। মিড নাইট পার্টি। পিন, পিন, পিন! এক দুই তিন, লেটস হ্যান্ডস টুগেদার উইথ তানিয়া, ক্ল্যাপ ফর হার। ক্ল্যাপ, ক্ল্যাপ, ক্ল্যাপ। তানিয়া তানিয়া তানিয়া। হোয়াই তানিয়া, হোয়াই নট শি? মহুয়া কান পাতে। কেউ তো তাকে বলুক পা উঁচু করো, এই এভাবে তুলে দাও দুই ঠ্যাং, এইভাবে হয় ডগি! তোলো তোলো। মহুয়া ল্যাবঘরে উল্টে থাকা অর্ধমৃত ব্যাঙের মতো হাত নাড়ায়, পা নাড়ায়, ঠোঁট নড়ায়, কুমুরের মাটির চাকার মতো ঘুরছে তার শরীর।
বেগুনী, নীল, আসমানি, সবুজ, হলুদ, কমলা, লাল। লাল লাল লাল—তাকান এইদিকে, দেখুন লাল। বেছে নিন একটা লাল! গাঢ় লাল, ফিকে লাল, কমলা লাল, খয়েরি লাল। লোকটা বলে যায় ক্রমাগত, বলেই যায়। কতক্ষণ এমন চলছে? অনেকগুলো বাক্স তার চোখের সামনে। কোনোটায় ত্রিভুজ, কোনোটায় চতুর্ভুজ, কোনোটায় বৃত্ত! বৃত্তের মাঝে নীল, বৃত্তের মাঝে সবুজ, বৃত্তের মাঝেই লাল। চোখের সামনে ঘুরছে। একঘণ্টা দুঘণ্টা তিনঘণ্টা। মহুয়ার চোখ ক্লান্ত, মন ক্লান্ত। লোকটা কি ডিরেক্টর না ডক্টর? বাক্সগুলো নড়তে নড়তে সেগুলো চোখের ভেতর দিয়ে মগজে ঢোকার পথ পেয়ে যায় তার। মগজে ব্যথা পিনপিন। তলপেট অনুভূতিহীন! ঘরটা অদ্ভুত সাদা! এটা কি ঘর না মর্গ? নড়ে না কেন দেয়াল! কানে কথা বাজছে, চোখের র্যাপিড মুভমেন্ট মাপতে হবে। রোগীর শ্বাস পড়ছে ঘন! কে লোকটা? কার নির্দেশে এমন বলছে ওরা।
সশব্দে কে যেন এলো, নিঃশব্দ হয় আবার! তার ইচ্ছে হয় বাইরে গিয়ে জোরে একটা চিৎকার দেয়, ডাকে রাহাত রাহাত। না না রাহাত হবে কেন, শুয়োর সে। তাকে ক্ষ্যাপাটে বুড়ি বলে তাড়িয়ে দিলো, মারলো কত! কুৎসিত গালিগালাজ। অথচ সে সিনিয়র! হায় হায় আজকের শো কি শেষ! কখন হলো? কড়া ঘুম আবার তার চোখ আটকে দিতে ধেয়ে আসছে, ঘুমুবে না সে, একদম না। আচ্ছা ড্রেসিং রুমে কেউ তাকে দেখেনি তো গুঁড়ো নিতে? দেখুক। অদ্ভুত ক্রোধ তাকে অধৈর্য করে। তানিয়াকে মনে পড়ে, লেটস হ্যান্ডস টুগেদার উইথ তানিয়া। ভিভোর টপ। স্টাইল ওয়ার্ল্ড টপ। কারোয়া টপ। মহুয়া কুঁকড়ে যায়, কুকুরের মতো ছটফট করে। মেয়েটা তার মতো সুন্দর না, নাক থ্যাবড়া, গায়ের রংও চাপা, অথচ কী তার দর! মেয়েটাকে ভেবে ভেবে সে এমন এক খাদের কিনারায় চলে যাচ্ছে যেখান থেকে একদিন সে সীমাহীন অধৈর্যে ফেলে দিতে পারবে আলো, পর্দা, মিউজিক, ক্যামেরা ফ্লাশ, সব। কেউ তাকে ঠেকায় না কেন? স্টাইল-সম্রাজ্ঞীদের মতো এক্সপ্রেশন তার, তাকে ছুড়ে ফেলা এত সহজ। লোকটার মুখ বরাবর ছুড়ে দেয় টেবিল ল্যাম্প, কে লোকটা, ডক্টর না ডিরেক্টর? মহুয়ার ভালো লাগে, উল্লাস হয়; লোকটাকে দেখানো দরকার তার ক্রোধের দৈত্য বের হচ্ছে এবার। পানির গ্লাসের দৈত্য, খাবার প্লেটের দৈত্য, আয়নার দৈত্য, পরনের কাপড়ের দৈত্য—সব। ঘাড় মটকে দেবে সবার। যৌবনের সওদা? শেষ হলেই ছুড়ে ফেলা। মহুয়া আর মনে করতে চায় না কিছু, হাতড়ে শরীরে খোঁজে স্তন, যোনী, পায়ুপথ। আছে তো সব এখনো। রথের চাকা তবু কি উল্টে যেতে পারে। চুষে চুষে নিঃশেষ শরীর আর কি জ্বলবে না? অম্ল মধুর নোনা, কিছুই নেই? মহুয়ার কান্না পায়। নেই কিচ্ছু নেই। আস্ত নিরেট দানায় নেই সুগন্ধী, নেই স্বাদ। এত সহজে বাদ পড়া যায়। দান চলে যায় তানিয়ার ঘরে। ক্ল্যাপস ফর তানিয়া, লেটস হ্যান্ডস টুগেদার। মহুয়া আর কিছু ভাবতে পারে না। এক নিস্তেজ অনুভূতিতে তড়পাতে তড়পাতে অবশেষে ঘুম। শ্যামলীর তৃতীয় শ্রেণির ইমার্জেন্সি, হসপিটাল অখ্যাত। মহুয়া পড়ে রয় একা ঝাঁঝহীন আবরণহীন। পরদিন অখ্যাত পত্রিকার এককোনায় অবহেলায় পড়ে রয় এক সংবাদ—
র্যাম্প মডেল মহুয়া : অ্যাট্যাম্পট টু সুইসাইড; অ্যা ফেইলর অব সাকসেস!