প্রতিদিন দেখা হয় তার সাথে। বাস থেকে ঝুলন্ত উদ্যানের লতার মতো ঝুলে থাকা মানুষের ঢল থেকে যখন বের হয়ে আসি, তখন ড্রিম লাইটের মতো মৃদু আলোর নিচে টাইট কামিজ পরে সে দাঁড়িয়ে থাকে। তার কাছে যত এগিয়ে যাই আমার মহিলা ধারণাটি নাই হয়ে আসে, আরেকটু কাছে গেলে ধরা পড়ে আসলে সে মহিলা নয় তরুণী, কিন্তু একহাত দূরত্বে দাঁড়ালে বুঝতে পারি সে মহিলা, তরুণী কিছুই নয়, একজন ঝা চকচকে হিজড়া! ওর নাম সুরভী।
ঢাকা শহরে শীত নেতিয়ে এসেছে কিন্তু ধুলো ও জ্যামের যৌবন ফুরাচ্ছে না। ম্যানিব্যাগটা হাতরে দেখলাম, না ঠিকই আছে। তবে রাত বারোটার কাছাকাছি হওয়ায় ক্ষুধাটা দাবড়ে বেড়াচ্ছে। ক্লিনিকের নিজস্ব ফার্মেসিগুলোর সাটার বন্ধ করে কর্মচারীরা বসে ছিল। তারাও বাড়ি ফিরবে। একটা ওষুধ কিনব বলে গেলাম, না, সেখানে সেই কোম্পানির ওষুধ নেই। সমস্ত ক্লান্তির তাবু আমাকে ছেয়ে ফেলেছে, অসহ্য লাগছিল এই রাত। কিন্তু এখনো সু্রভী দাঁড়িয়ে ছিল একা, জিন্সের ভেতরে আঙ্গুল দিয়ে কি যেন গুজে দিচ্ছিল। চায়ের দোকানটা তখনো চালু। সারারাত বোধহয় এভাবেই জেগে থাকবে৷ বৈদ্যুতিক পোলের আড়ালে চলে গেল সে। কিন্তু একটু পর ভাঙ্গা গলার হাসি দিয়ে মুতের উৎকট গন্ধের নালার কাছ থেকে একজন বেরিয়ে এল।
আরেকটি মেয়ে। না না, আরেকজন হিজড়া। সুরভীর বান্ধবী। সে দেরি করে আসায় তাকে ধাক্কা দিয়ে পুরুষমানুষের মুতে সৃষ্ট নালার কাছে ফেলে দিল সুরভী। পড়ে গিয়েও হাসতে থাকে হিজড়াটি; যার নাম বিউটি। দুধ চা হালকা পড়ল তার কামিজে। বুকে ওড়না নেই, থাকলে আকর্ষণের চাঁদ আড়াল হয়ে যাবে যে। বিউটি একটু হ্যাংলা পাতলা কিন্তু পিচের চেয়েও কালো। সৌন্দর্য তার দিকে কুনজরও দেয়নি, যদি দিত তাহলে বোধহয় একটু দেখার মতো হত। এসব ওরই ভাবনা। আমি চুরি করে ফাঁস করে দিচ্ছি। কিন্তু খোদার হস্তশিল্পে সে খানিকটা নিজের মতো হস্তক্ষেপ করেছে।
বিউটি বুকে চাঁদের মতো গোল শক্ত মাংসপিণ্ড দুটো নিজের মতো গড়ে তুলেছে। নিতম্ব ছেড়ে দিয়েছে পেছনের অতীতের কাছে, যেটা সে দেখতে চায় না। বড় ভয়ংকর কুৎসিত সে অতীত। কিন্তু সে জায়গা বুঝে বুক তুলে ধরে শিক্ষিত সমাজের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর মতো।
সুরভী এখনো খলখল করে হেসে যাচ্ছে, আর খুব সতর্ক হয়ে কাপে চুমুক দিচ্ছে। যেন দামি লিপস্টিক না উঠে যায়। ওটা সে আজ রাতের প্রথম কোনো পুরুষের জন্য তুলে রেখেছে। এই লিপিস্টিকের দাগ, প্রথম ভার্জিনিটির মতো। যেন নতুন করে আজ কোনো পুরুষের কাছে নিজেকে খুলে ধরবে।
ফিনফিনে হাওয়ার দূরত্ব নিয়ে মানুষের চলাফেরা হঠাৎ উধাও। তবুও ঢাকা শহরের রাত ঢোঁড়া সাপের মতো বিষের গ্রন্থি ফুলিয়ে ডর দেখায়। আমি ওদের দুজনের চা খাওয়া দেখে স্টলের সামনে গিয়ে বললাম, মামা এক কাপ চা দাও। আমি তার কাছে চা চাইছি সে খেয়ালই করেনি। চায়ের দোকানদার তখন একটি বালতিতে গুঁড়া দুধ পানিতে গুলতে ব্যস্ত। তার কাজ দেখার জন্য তাকে বিরক্ত না করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তখনো সুরভী আর বিউটি দাঁড়িয়ে। তারা একবার মেইন রোড ধরে ওভার ব্রিজের কাছে যায়, একবার জেনেভা ক্যাম্পের রাস্তার মুখে গিয়ে দাঁড়ায়। চাঅলা এবার দুধ মিশিয়ে তাতে এক প্যাকেট বিস্কুট ভেঙে নাড়তে থাকে, আমি অবাক হয়ে তার এই কীর্তি দেখতে থাকলাম। মানুষকে কীভাবে ঠকিয়ে আসল দুধ বলে এই মাল চালিয়ে দিচ্ছে।
দমকা একটা বাতাসে বাসগুলো অলৌকিক যানের মতো উড়ে যাচ্ছে। এবার চা খেতে খেতে দেখি সুরভী আর বিউটি ঝগড়া শুরু করেছে। তারপর কান্নার শব্দ সাথে বোনাস হিসেবে গালিগালাজ। এর কিছুক্ষণ পর সবকিছু নীরব। বিউটি হিজড়া আমার পাশে এসে গজরগজর শুরু করল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে তার মুখ চাঅলার কাছে নামিয়ে দেখাল, দ্যাখ কি কইরা মারসে খানকিটা!
চাঅলা কোনো কিছুই বলল না, শুধু মহিষের মতো হাসল। তারপর দুধে বলক ওঠল সেটার রাগ দমাতে চামুচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল, তগো ক্যাচালে আমি ঢুকুম না, আমারে এসব দ্যাহায়া লাভডা কি? কাইল দেখমু আবার তরা এক লগে এহানে খাড়ায়া চা গিলবি।
বিউটি এবার খেপল, তুমিও অই মাগির মতো।
ট্যাকা দিয়া মর গা, ভাগ!
ট্যাকা কাইল দিমু, আইজ বিজনেস হয় নাই।
অত কথা বুঝি না, অহনই টাকা ঝার নইলে তরে…
লাগাইবা?
চাঅলা বেশ খেপে তার দিকে দুধ নাড়া চামচ দিয়ে তেড়ে এল। আমি তাকে থামিয়ে বললাম, কত হয়েছে মামা? আমার বিল বলার পর তাকে বললাম, ওরটাও ধরে নাও আমি দিব।
চাঅলা কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে বিলটা বলল। আমি তাকে টাকাটা দিতেই বিউটি বলল, আপনে আমার টাকাটা দিয়া দিলেন! একটা হাসি দিয়ে ব্যাপারটা ওখানেই শেষ করে দিতে গিয়েও শেষ করতে পারলাম না, এর কারণ একটু পর আপনারা সবটাই জেনে যাবেন।
রাত বারোটা ওভার। খুবই ক্লান্ত, জেনেভা ক্যাম্পের ওপাশে রিকশার কাছে কয়েকজনকে দেখলাম টায়ার ধরিয়ে আগুন পোহাচ্ছে। আমি হাঁটছি, রুমে গিয়ে ঘুমাব। নির্বাচনের জন্য কাজের খুব চাপ। নিজের সাথেই নিজে এসব নিয়ে কথা বলছি এমন সময় সেই কণ্ঠ, আপনে সিগারেট খান?
পেছনে তাকাতেই চমকে উঠি, আরে আপনি?
সে হাসল, হাসলে তাকে আরো বিকট লাগে। চেহারার সাথে হাসির মিল না থাকলে আরও বীভৎস লাগছিল। আমি বললাম, না না। আমি সিগারেট খাই না। ভাবলাম এই লোক আমার পিছু নিল কেন? মোবাইল ছাড়া আমার কাছে দামি কোন কিছু বা টাকা কিছুই সে পাবে না। কিন্তু তার আচরণ সেরকম কিছুই না। তবুও মানুষের মন, কত কী আসে যায়। হঠাৎ এবার বিউটি আমাকে সত্যি সত্যি ভয় পাইয়ে দিল। এবার আমি যেটা দেখে সবচাইতে বেশি ভয় পেয়েছি সেটা হল, চাকুর মতো চকচকে ধারলো তার টেকো মাথা। পোলের লাইট একেবারে তার মাথার উপর এসে পড়ছে। একি আপনার এই অবস্থা কেন? কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে যেতে বিউটি কেমন যেন মুষড়ে পড়ল। এবার সত্যি ভয় পেয়েছি। যদি চাকু মাকু মেরে দেয় তাহলে আজকে যে তার ব্যাপারে লিখতে বসেছি তা আর লেখা হত না, আর আপনারাও বিউটি হিজড়ার ব্যাপারে কিছুই জানতে পারতেন না। বিউটি আমার সামনে কোন ভণিতা না করেই সাফ সাফ বলল, আপনে গাঞ্জা লইবেন? সন্ধ্যার পর থিকা ঘুরতাছি কাউরেই দেখতাছি না। ভোটের মুখে পুলিশ ঘুরতাছে হ্যার লাইগা কেউই বাইর হইতেছে না। একটা কথা কমু?
বলেন!
আমি জানি আপনে গাঞ্জা খাওয়া পাবলিক না।
বললাম, কীভাবে বুঝলেন?
সে বলল, চা খালি খালি খাইলেন, সিগারেট লন নাই! আমি ব্যাপারটা বুঝে ফেলছি, এরপর শুধু আচ্ছা বলে চলে যেতে যাচ্ছিলাম এমন সময় বিউটি হিজড়া কোন রাখঢাক ছাড়াই বলল, তোমারে আমার ভাল্লাগসে! এইবার আমি কী বলব, কী উত্তর দেব সেটা না বুঝতে পেরে, নিজেকে খানিকটা দোষ দিলাম, কারণ এর জন্য আমিই দায়ী। এত দরদ দেখানোর কী ছিল! হুদাই।
একটু জোরে পা চালিয়ে আসতেই, ক্যাম্পের মাঝামাঝি বিউটি আমার সামনে এসে দাঁড়াল, আমি এবার সত্যি ভয় পেলাম। সে সামনে এসে আবছা ইঙ্গিতের মাধ্যমে আবার পেট বরাবর তার আঙ্গুল উঁচিয়ে কি যেন বলল। ভাবলাম, সে কি বলছে যা আছে বের কর, নইলে খেল খতম করে দেব!
বিউটি হিজড়া ওরকম কিছুই করেনি, সে বোঝাতে চেয়েছিল তোমার পেটের মতো আমারও পেট আছে। বুঝে গেছি সে আজ আমার পেছন ছাড়বে না, এখন এর থেকে কীভাবে ছুটি পাই তারই পরিকল্পনা করতে থাকি। কিন্তু গাঞ্জা বিক্রির জন্য সে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে এটা শুনে খারাপই লাগল। বিউটি হিজড়া আমারই পাশে দাঁড়িয়ে তার গাঞ্জার প্যাকেট খুলে দেখছিল।
আচ্ছা আপনাদের লোকদের তো দেখি বাসে ভালোই ইনকাম করে, তা আপনি এসব ড্রাগ বিক্রি করে বেড়াচ্ছেন কেন?
সে নতুন হিজড়া দেখার মতো আমার দিকে তাকিয়ে কোমরে হাত রেখে এবার আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসে বলল, তুমি ব্যাডা দুইনার কিছুই জানো না দেখতাসি, হাসাইলা সোনা। তুমি এই লাইনের কতটুকু জানো?
আমি কিছুই জানি না।
তা তোমার গলায় স্টুডেন্ট কাড নাকি? তুমি ছাত্র?
না না, আমি চাকরি করি।
ও তাই কও। তুমি ব্যাডা দেহি কিছুই জানো না, বলে আমার থুতনি ধরতে আসার আগেই আমি সরে আসি।
ঢাকা শহরে নেশা বেচা বিক্রির কাহিনি সব এক, তোমারে আমার ভাল্লাগসে তাই অন্য একটা হিস্টরি শুনাইতে চাই। তুমি শুনবা আমার কথা? এই যাবত কেউই শুনে নাই। বললাম অবশ্যই আমি শুনব যদি আপনি বলেন। খাড়াও বলে বিউটি গোপন পকেট থেকে গাঞ্জা বের করল। তারপর স্টিক বানিয়ে গ্যাস লাইটের চাকা কয়েকবার ঘুরিয়ে আগুন বের হতেই তার মুখ আগুনের মতো তীব্র আক্রমণাত্মক হয়ে উঠল। ধোঁয়া ছাড়ার সময় বলল, এই ব্যাডা তুমি কিয়ের চাকরি কর?
আমি সাংবাদিক। এবার বিউটি হিজড়া থতমত খেয়ে কী বলবে বুঝতে না পেরে বলল, আইচ্ছা, আমারে বেইজ্জত কইরো না য্যান! হিজড়ার ও কিন্তু ইজ্জত আছে, দেখবা নাকি? তারপর সে মুচকি টানে হাসল।
শোন মিয়া, বুঝলে, আমার জন্মের হিস্টরি খারাপ, মানে জন্মই খারাপ। বাড়িতে আমারে হওয়াইতে গিয়া মা হাসপাতালে মরল, বেডি মরসে আমার মুখ না দেইখাই। হাসপাতালের বেডে জ্ঞানের মাথামুথা হারায়া তিনদিনের দিন খালাস। ভালই হইসে, বদ সুরত না দেইখা দুইনা ছাড়সে, সে আল্লার খাস বান্দা। বিউটি থামল। আমি তার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। তারপর সে ফোন বের করে গ্যালারিতে ঢুকল, সেখানে তন্নতন্ন করে কি যেন খুঁজে যাচ্ছে। বললাম, কি খুঁজেন? বিউটি বলে, খাড়ান!
মিনিট কয়েক পর বিউটি আমাকে একটা ছবি দেখিয়ে বলল, মা! ততক্ষণে তার চোখ লাল হয়ে এসেছে, সেটা মায়ের জন্য হলেও খানিকটা গাঞ্জারও টানে।
জন্ম ঠিকই হইল, কিন্তু মা মরার ধাক্কা কাটায়া ওঠার আগেই সবচে বড় ধাক্কাটা আমিই দিছি। শুধু আমার বাপ দাদারে না পুরা বংশরে। আমার জন্মের ধাক্কায় এরা হক্কলে যে ধাক্কা খাইসে, সেইটা হইল গিয়া আমাগো বংশের পাপের একটা নমুনা। যা আমারেই বহন করা লাগসে।
আমি তার মুখে পাপ বহনের কথা শুনে তাকে থামিয়ে যিশুর প্রসঙ্গ টেনে আনি। আপনি জানেন কি আমাদের একজন নবি মানুষের পাপ বহন করে মারা গেছিলেন? বিউটি আমার দিকে তাকিয়ে শুধু উচ্চারণ করল “লা হাওলা”।
এসবের মইধ্যে নবিগরে টাইনা আইনো না। শুইনা যাও। তার শুইনা যাও শুনে মনে হল আমি কী গসপেলের কোন সুসমাচার শুনছি, আমার এমন ভাবনা বিউটি জানলে নিশ্চয়ই সুসমাচারকে কুসমাচার বলত। বরং নিজের ভাবনাকে একটু দূরে সরিয়ে শুনতে থাকলাম তার কথা।
আমার আগে দাই গালি খাইসিলো কারণ সে বলেইনি, হিজড়া শিশু জন্ম নিছে। মাঝখান দিয়া বাপের কয়েক কেজি মিষ্টির টাকা, দাইয়ের বখশিশ আর হাসপাতালে মায়ের পেছনে খরচের টাকা তার পকেট থেকে বেকার চইলা গ্যাছে। এডা তার প্রথম বিরক্তের কারণ। পরে আমার দাদি আমারে যখন ন্যাংটা কইরা দেখছিল, তখন সে চেচায়া ওঠে। বলে এডা কারে লইয়া আইসোস তরা, জ্বিনের বাচ্চা এডি। সবাই দাদির চিৎকারে চমকায়া ওঠে। মায়ের জন্য শোক করা পাবলিক যখন এই খবর কানে শুইন্যা নিজ চোখে দেখল, তখন প্রথম গালিটা খাইল আমার অবলা মা। তার কুনো দোষ আছিল না। কিন্তু আমার লাইগা বেদম গালি খাইয়া বেডি কবরে ঘুমাইতেছে।
সবাই বলাবলি করল, এইটা জ্বিনের বাচ্চা। অহন এই আপদডারে কি করন যায়। কেউ কইল নুন মুখে দিয়া মাইরা ফেল, কেউ কইল, অইডারে ডাক্তারের কাছে লইয়া যাও অপরাশন কইরা যদি ভাল হয়।
এর পরের কাহিনিটুকু বিউটি স্কিপ করে যায়। সে মনে করতে চায় না। আমি জোর করিনি, কারণ সে কষ্ট পাবে।
বড় হইয়া দাদির মুখে শুনি আমি কুনদিন কান্দি নাই। এই জন্য হয়তো তারা আমারে তাদের সংসারে বাঁচায়ে রাখসিলো। পরে শুনসি দাদির মুখে, যে দাদি আমারে জ্বিনের বাচ্চা বইলা চিৎকার দিসিলো সেই আমাকে মানুষ করসে। ডাক্তার প্রথমে দেখাইসিলো ঢাকায় আইনা, ডাক্তাররে বাপে কইসিলো এডা বইনের পোলা। ডাক্তার আমাকে দেইখা কি কইসিলো আমি জানতে পারি নাই।
আমি দাদির সাথেই থাকতাম, মা মরা বইলা বাইরের লোকজন অন্য চোখে দেখত, কিন্তু আমার দাদি যেইদিন মরল, বাড়িসুদ্ধা মানুষের সামনে আমার সৎ মা রটায়া দিল, এই ব্যাডা মানুষ না ও একটা হিজড়া। আমি যে গান শুনলেই ড্যানিস মারতাম, ঠোঁটে রঙিন কাগজ ঘইষা লাল করতাম এসবের কারণ সবার চোখে স্পষ্ট হইয়া গেল। জানাজানি হইল আমি হিজড়া, কিন্তু হিজড়া ক্যামনে হয় আমি জানতাম না। তয় আমারে মাইয়া মানুষ সাজতে ভাল লাগতো। তারপর সেই দিন থিকা আমার জীবন জাহান্নাম হইয়া গেল। যারা আমার লগে খেলত তারাও আমাকে দেইখা হাসে। খেলে না, কথা কয় না। আমি যদি দাদির লগে কবরে চইলা যাইতে পারতাম বা জন্মের সময় মইরা যাইতাম তাইলে ভালো হইতো! বিউটি কাঁদছে, শুষ্ক কান্না। এই কান্নায় তার চোখে কোন পানি দেখলাম না, শুধুই বিকার, যন্ত্রণা ও নাই হয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছা।
আমি বিউটির কাঁধে হাত দিলাম, সে কিছুই মনে করল না, হাসল এবং আবার আরেকটা স্টিক সাজাতে বসল। এখন মনে হল নাই হয়ে যাওয়ার প্রবল ইচ্ছার পাশাপাশি বাঁচার আকাঙ্ক্ষা আরো তীব্র।
স্টিক সাজাতে সাজাতে বলল, এডার পরের কাহিনি শুনো। আমার জীবন নিম্ন জাহান্নাম থিকা হাবিয়া জাহান্নামে তুলে দিছিল সৎ মাই। তার মায়ের বাড়ি আমারে বিয়ের দাওয়াতের জন্য নিয়া গেছিল। সেখানে হেবি ড্যানিস মারলাম, সবাই খুশি। থাকসি বেশ কয়েকদিন। কিন্তু আসার দিন আমারে ট্রেনের সিটে বসায়া কইল, সিট ধইরা রাখ, আমি জিনিসপত্র লইয়া আইতাছি। এই যে গেল, আসার নাম কথা নাই। আমি অপেক্ষা করতে করতে ঘুমায়া যায়। মেলা রাইতে আমার ঘুম ভাঙ্গে, দেখি একজন যাত্রী কয়, কই যাইবা? নামবা না! এটাই শ্যাষ স্টেশন!
আমি চোখ মুছতে মুছতে দেখি আমার সৎ মা নাই, আর এটা কোন স্টেশনে আইয়া পড়লাম। কানতে শুরু করি। সবাই একবার দুইবার তাকিয়ে নিজ নিজ গন্তব্যে চইলা যাইতেছে। আমিও নামি। জিগ্যেস করি, এইটা কোন স্টেশন?
চলন্ত মানুষের ঢেউ আছড়ায়া পড়ে আমার উপড়ে, একজন কইল ঢাকা এটা। কিন্তু কে এই উত্তর দিল তার মুখ দেখতে পাইনি, এত পিচ্ছিল মানুষের স্রোত আছিল।
এবার বিউটি থামে, ভেবেছিলাম দম নেয়ার জন্য। আসলে তা নয়। সে থামল ভেতরের ঘেন্না থেকে। আমি তাকে জিগ্যেস করলাম, আপনি এখানে এসে পড়লেন কীভাবে? মানে এই মাদক বিজনেস!
বিউটি বলল, জীবন অনেক রকম বুঝলে, বাসে উঠি টাকা চাই পাবলিকে দেয় না। উলটা গালিগালাজ করে। আমিও কই আমার স্বামী হইবা? বিয়া দিবা তোমার পোলার লগে? তখন ব্যাডারা আর কথা কয় না। আমি যেখানে থাকতাম চেহারা সুরাতের জন্য খেদাইয়া দিল, বড় কথা হইল ইনকাম নাই। তার উপরে আমি টাকা সাইডে রাখতাম, ধরা পইড়া যাই বেদম পেটায় গুরুপের লোক। আমি তবুও থাকতে চাইসিলাম, আর সেটা মাইর গাইল অপমানের চাইতে ভবিষৎ কইয়া বেশি কিছু ডিমান্ড করসিলাম। আবেগ বেশি তো, কিন্তু এই বিউটি হিজড়ার কথা কে শুনবো!
রাগ কইরা বের হইয়া আসি সেই দল থিকা, তারপর আমার পরিচয় হয় সুরভী মাগির লগে। জেনেভা ক্যাম্পে তার লগে আইসা উঠি। সে প্রথম ভালোই ছিল। কিন্তু রুপের দেমাগে তার মাটিতে পা পড়ত না। এখন ও পড়ে না। এরপর বিউটি আমার ঘাড়ের কাছে এসে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিস করে বলে, অই মাগি ভিডিও কলে ন্যাংটা হইয়া নাচে। ভালই ইনকাম। আমার ইনকাম নাই। আমি শুধু বুক দেখাই। প্যাটে লোম আর মুখের ছিরি দেখসো না! সুরভীর নিন্দা করলাম। তুমি আবার ওরে গিয়া কইওনা য্যান!
আমি হাসছিলাম তার কথা শুনে। মোবাইলে সময় দেখে আর বিস্তারিত আলাপের দিকে গেলাম না। কিন্তু বিউটি যে আমার কাছে গাঞ্জা বিক্রি করতে এসে এভাবে ফেঁসে যাবে, বোধহয় সে কল্পনা করতে পারেনি। একবার ভাবলাম, ও এখন নেশার ঘোরে আছে, যাই। কিন্তু আবার তার এই মাদক বিক্রির পথে আসার কাহিনি জানবার লোভটা সামলাতে পারলাম না।
আচ্ছা আপনি হঠাৎ এই মাদক বিজনেস শুরু করলেন কেন?
বিউটি আমার দিকে শিকার করা কুমিরের মতো কিছুক্ষণ মুখ হা করে থাকল, যতক্ষণ না আমার প্রশ্নটি তার বোধগম্য হয়ে শিকারের মতো মুখে ঢোকে। সে থামল, সময় নিল। যেন ভেতর ভেতর নিজেকে গুছিয়ে নিচ্ছে।
তার ভয়ার্ত লাল চোখ আমাকে টেনে ধরছিল অজানা ভয়ের বাথানের ভিতর।
শুনবা তুমি? জাওড়া লোক মিয়া! সাংবাদিকরা বুঝি এমনডাই হয়!
আমি নতুন জয়েন করেছি, জাওড়া হতে সময় লাগবে। সে খিলখিল করে হাসতে লাগল। এরপর পালটা জিগ্যেস করল, তুমি এভাবেই কথা বল?
হ্যাঁ।
আইচ্ছা। শোন, এই হিস্টরি শুনতে গেলে আমার লগে যাওন লাগবো।
মনে মনে ভাবলাম, এই রে কই আবার নিয়ে যায়।
বিউটি আমাকে কলেজের পেছনের দিকে নিয়ে গেল। সেখানে যেতে যেতে দেয়ালে, বিখ্যাত ব্যক্তিদের বাণী পড়তে পড়তে তার সাথে দাঁড়াই একটা কাঠবাদামের গাছের গুঁড়ির কাছে। সামান্য দূরে একটা আমগাছ। তাতে মুকুল এসেছে, তারই গন্ধে চারপাশটা অন্য রকম মনে হচ্ছে।
কামিজ ছেড়ে কোমরের উপরটা চুলকাতে চুলকাতে বিউটি বলল, সামনে দেখতে পাইতেছ পলিথিন আর চাইলের বস্তা দিয়ে ঘেরা ঝুপড়ি ঘর?
হ্যাঁ।
ওগুলোর মইদ্ধে আমার একটা ঘর আছিল।
তুমি ক্যাম্পের ঘর ছেড়ে এখানে থাকো?
বাল, ন্যাকা সাইজনা!
কিসের ন্যাকা সাজলাম!
সে নিজেকে সামলে বলল, আমার কাস্টমার আইতো, শুইতে!
আমি বুঝে ফেলেছি তার কথার মানে।
আরে সুরভীর মতো অত না পাইলেও আমার চইলা যাইতো, কিন্তু…
কিন্তু কী?
হইট্যালের মাগি আর বস্তির কচি কচি মাইয়া থুইয়া এই হিজড়ার কাছে কোন বোকাচোদা আইবো? রিক্সাওলা থিকা নাইটগাড সকলে অই বস্তির মাইয়াগো কাছে যে মজা পাইতেছে, তখন থিকা একলগে সব হাওয়া। আমার ফোনে কতজনের নাম্বার কেউই আর ধরে না। চল তোমারে একটা খেলা দেখায়া আনি। সে আমার হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল মুকুল আসা আম গাছটার দিকে, আমি সুড়সুড় করে চলে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে বিউটি হিজড়া আমার হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে না, নিয়ে যাচ্ছে মুকুলের সুগন্ধ! আম গাছটার কাছে যেতেই বিউটিকে বললাম, থামেন আর যাব না। কারণ যে খেলা দেখাতে সে নিয়ে গেছিল সেখানে অজানা কোন এক পিচে রিক্সাওলা অথবা নাইটগার্ড চার-ছক্কা হাঁকাচ্ছে, তারই শব্দ শুনতে পাচ্ছি। শুধু শব্দ শুনেই আমার জি খারাপ করতে লাগল, আমি বিউটিকে বললাম, চলেন এখান থেকে। বিউটি কতটা হারামি, চোখের সামনে যা করল, তাতে অবাক হলাম। সে ঈর্ষান্বিত হয়ে প্যান্টের চেইন খুলে সেই ঝুপড়ির উপর প্রস্রাব করে দিল। এটাই ওর স্বপ্নের বাসর ঘর, যেখানে কালনাগিনী ঢুকে তার লখিন্দরদের টেনে নিয়ে গেছে। ভেতরের কালনাগিনী ও লখিন্দর বুঝতেই পারল না বিউটি হিজড়ার প্রকোপ কতটা ভয়ানক!
এরপর আমি কী করব বুঝে ওঠার আগেই দেখি সে কাঁদতে কাঁদতে রেগে ফুঁসে ওঠল। তখন তার নারী সাজের ভেতর থেকে লুকানো পুরুষত্ব বেরিয়ে আসে। বিউটি হিজড়ার হাতের মাসল ফুলে ওঠে গলার রগ টানটান হয়ে যায়। সে আমাকে বলে, অই খানকিদের আমি খুন করব। ওরা আমার ভাত কাড়সে! আইজ হোক কাইল হোক অই খানকিদের আমি মাডার করব!
আমি বললাম, আপনার যে ফাঁসি হবে!
সে মিচকা শয়তানের মতো হাসে। কিসের ফাঁসি? হিজড়াদের ফাঁসি হয় না। হগলে এই হিজড়া জন্ম নিয়াই মরণ অব্দি ফাঁসির দড়িতে ঝুইলা থাকে। তাগোর আবার কিসের মৃত্যুদণ্ড! সাথে আমার বান্ধবী খানকিটাকেও খুন করমু ও আমার হক্কল কাস্টমার ছিইনা নিছে। আমার সব ছিইনা নেয়া হইছে। আমিও খুন কইরা ছিইনা নিমু।
এরপর সে গাঞ্জা টানা শুরু করল৷ গাঞ্জার গন্ধে আমার অসহ্য লাগছিল দেখে সে খানিকটা দূরে সড়ে দাঁড়াল। দূর থেকেই বলল, দেখলা মিয়া, ল্যাওড়া জীবনের সোদন! আমার দল হারাইলো, দেহ বিকায়া খাইতাম সেডাও হারাইলো, তারপর ক্যাম্পে থিকা ধরলাম গাঞ্জা হিরোইন বিজনেস। লাভের বদলে লস মিয়া, আইজ ভাবলাম কিছু কামামু। ভোটের আগ দিয়া পুলিশ আর্মির অত্যাচারে জীবনডা শ্যাষ, দ্যাহো পাইলাম এক ব্যাডা যে কিনা বিড়িই টানে না। বিউটি হিজড়ার কপালে এইসবই আহে! এসব আফসোসের বাণী ঝাড়ার পর আমার সাথে ফান করে বলল, টানবা নাকি একটা টান, এক টানে পুরা ক্যাম্প ঘুইরা আইবা! হা হা হা হা। তার বিকট হাসি যেন ঝড়ের মতো আমাকে তোলপাড় করে দিচ্ছিল।
মাঘের খানিকটা রেস বাড়ে মধ্যরাতের দিকে। গাছগুলো বাতাসে নড়ছিল। এখন নির্বাচনের মুখে পুলিশের গাড়ি টহল দিচ্ছে। বিউটি আমাকে একটু আড়ালে নিয়ে গেল। এতক্ষণে একটা জিনিস আমি বুঝতে পেরেছি, আমি রুমে যেতে চাচ্ছি কিন্তু পারছি না, এর কারণ বিউটি হিজড়া আমাকে কন্ট্রোল করছে!
রাত বাড়ছে। কিন্তু বিউটি আরও ছটপট করছে। সে সঙ্গীহীন একা। আমি তার পাশে বসে রইলাম কোনো কারণ ছাড়াই, তাকে দেখছি আর অবাক হচ্ছি। মানুষের কাছে গেলে তার নিজস্ব সমুদ্রের গর্জন শোনা যায়; যদি মন থেকে শোনার আকাঙ্ক্ষা থাকে। আমিও বোধহয় তার ভেতর প্রাচীন টেরাকোটার সন্ধান পেয়েছি এমন ভেবে তার পাশে বসে বিউটিকে দেখে যাচ্ছি! সে গুম মেরে বসে ছিল, মনে হল এতক্ষণ যত বকবক করেছে এর জন্য হয়তো ক্লান্ত। কিন্তু তা নয়। বিউটি হঠাৎই তার মাংসল বুকে দুম দুম করে কিল মারতে লাগল, সে নিজে থেকেই নিজের স্তন চেপে ধরল। যেন সে টেনে ছিড়ে ছুড়ে ফেলে দিতে চাইছে। এরপরক খনিক থেমে যক্ষা রুগির মত শ্বাস টেনে নিজেকে স্থির করতে গিয়েও আর পারল না। এবার আক্ষেপে বিউটি টাকের পাশে পাটের ফেস্যার মতো চুল নিজেই টেনে ধরল। রাতে বের হবার আগে যে চুলে শ্যাম্পু করে বের হত সে। আমি তার আক্ষেপের কাছে মেহগনি গাছের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। তার কাজে বাধা দিলাম না। বুঝতে পারলাম সে একজনকে পেয়েছে যার সামনে তার সমস্যাগুলো প্রকাশ করতে পারছে। বিউটি আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত হল। তারপর বলল, তুমি বিপদে পড়বা! আশ্চর্য হয়ে জিগ্যেস করলাম, কেন?
সে মৃদু হেসে বলল, মিয়া তুমি বাইঞ্চোদ নও তাই! এবার আমি না হেসে পারলাম না। বিউটি আমার হাসি দেখে বিরক্ত হল, কিন্তু কিছুই বলল না। সে একটা পুরিয়া বের করে দেখে আবার পলিথিনে ভরে নিল।
আমি তার হাতের দিকে তাকাতেই অবাক হলাম, আরে তোমার হাত এত কাটা কেন? আমি নিজেই কাটছি। দুঃখে গো দুঃখে। সে তার মুখটা আমার কাছে নিয়ে এসে বলল, পেরাই এক বছর ধইরা মানুষ খুইজা যাইতাছি। দেহের মানুষ, মনের মানুষ। সে ফিসফিস করে বলল, মনের মানুষ পাইব না জানি, দেহের মানুষ চাই। চুপচাপ শুনে গেলাম তার কথা। কিন্তু আমি তাকে আর ঘাটালাম না।
বিউটির চোখের দিকে তাকালাম। সে উন্মাদ হয়ে যাওয়ার উপক্রম, এত স্টিক টেনেছে যে চোখ লাল হয়ে গেছে। সে আবার ইশারায় দেখালো জোড়ায় জোড়ায় সঙ্গমরত মানুষ। যে দিনে বাসে ঝুলে ঝুলে টাকা তুলে এই রাতে খুঁজে বেড়াচ্ছে মানুষ। যেন শুকনো পাতা বাতাসে এপাশ ওপাশ হচ্ছে৷
সারারাত কাটিয়ে মাদক বিক্রি করতে করতে ফজর অব্দি সে এরকম ভাবেই মানুষের সন্ধান করে বেড়াবে। কিন্তু মাদকের কাস্টমার পেলেও কামনার কাস্টমার তার থেকে লক্ষ কোটি মাইল দূরে ভেগে যায়।
কী মনে হল তার, এবং হুট করে সে আমার হাত ধরে বলল, যাবি আমার ঘরে? চল না, চল! আমার এই সোনার আংটিটা দিতাছি। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম তারপাশে। সে ছটপট করছে। বুঝলাম সে তার কন্ট্রোল হারিয়ে ফেলেছে। জিভ কাটল, কানে ধরল। তারপর বলল, জানি তুই ওরকম নোস। তুমি থেকে সে তুই এ নেমে এসেছে। এরমধ্যে কী যে হল সে আমাকে ধাক্কা মেরে মাথায় দুইহাত দিয়ে বসে পড়ল ফুটপাতে। তুই রাতে ঘুরিস না। কুত্তারবাচ্চা পুলিশ তোকে ধরবো, টাকা না লইয়া ছাড়বো না! বললাম আমি তো জার্নালিস্ট, কার্ড আছে আমার। সে বড়বড় চোখ করে তাকাল। ও ভুইলা গেসিলাম। যদিও নেশার ঘোরে তার চোখের পাতা উঠছে না।
একটু পর একটা গাড়ির শব্দ এল। বিউটি গা ঝাড়া দিয়ে উঠল।
পুলিশ! ভাগ তুই!
কেন? পুলিশ পুলিশের কাজ করবে, এখানে পালানোর কি আছে?
তুই বেশি বুঝোস? শুয়োরের বাচ্চা তরে যাইতে কইছি যা।
আমি অনড় হয়ে দাঁড়িয়ে আছি।
বিউটি মুখে আরো ভয়াবহ সব গালি শান দিচ্ছে, সবগুলোই আমাকে দেওয়ার জন্য। আমিও গোঁয়ার হয়ে দাঁড়িয়ে আছি, নড়ছিনা কারণ কি হয় তা দেখার জন্য। ‘শালা ভাগ’ বলে ভাঙা ইট তুলে যখন মারল তখনই আমি সেখান থেকে সড়ে দেয়ালের আড়ালে গিয়ে দাঁড়ালাম।
গাড়িটা সামনে এল। বিউটি টলতে টলতে রাস্তার ওপার যাওয়ার আগেই, একজন পুলিশ গাড়ি থামিয়ে বলল, ক্যাম্পের হিজড়াটা না? এই তো সেদিন হিরোইন বিক্রি করছিল, এরেই তো খুঁজছিলাম। একজন পুলিশ গাড়ি থেকে নেমে কষে একটা লাথি মারতেই বিউটি রাস্তায় পড়ে গেল।
পাশ থেকে একজন বলল, যত কেস আছে দে হিজড়াটার উপর। জেল থেকে যেন বের হতে না পারে। পাশ থেকে আরেকজন পুলিশ সদস্য বলল, ওকে আজ পেয়েছি। জানেন কী? ও হচ্ছে এ এলাকার মাদক বিক্রির রাজা। না না। হিজড়া রাজা হয় কীভাবে? রানি? না না। রাজা-রানির মাঝামাঝি কিছু একটা। বলতেই হাসির রোল পড়ল ওদের মধ্যে।
বিউটি বলল, আমি যাব না। আমার কাছে ড্রাগ নাই, দ্যাখো দ্যাখো, বলে পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল। তারপর সে তার মুঠি বন্ধ করা হাত এগিয়ে ধরল পুলিশের সামনে। এবং মুঠি খুলতেই ড্রাগের বদলে বেরিয়ে এল একটা ধারাল ব্লেড। তাতে রোড লাইটের আলো পড়তেই ঝিলিক মেরে উঠল। আর সেটা নিয়ে বিউটি হিজড়া নিজের হাতে দিতে লাগল পোচ।
পুলিশ সদস্যরা প্রথমে বলল, এটা ওর অভিনয়। এভাবেই সে নিজের হাত এর আগেও রক্তাক্ত করে আমাদের বোকা বানিয়ে ভেগেছে, আজ সেই সুযোগ নেই। কিন্তু আগের তুলনায় আজ অতিরিক্ত পোচ দিতে লাগল সে। পুলিশগুলো হতবাক হল। বিউটির হাত দিয়ে চো চো করে রক্ত পড়তে লাগল। এই দৃশ্য দেখে আমি যেন মাঘের হিম ঠান্ডায় জমে মমি হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বিউটি টলতে টলতে রাস্তায় পড়ে গেল। একজন পুলিশ বলল, সামনে নির্বাচন। এই ঝামেলা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার দরকার নাই, মরুক রাস্তায়, একটা হিজড়ায় তো! এরপর ধোঁয়া ছেড়ে চলে গেল পুলিশের গাড়ি। এতক্ষণে বুঝলাম বিউটির হাতে কেন এত কাটার দাগ। কিন্তু বিউটি অচেতন হয়ে রাস্তায় পড়ে আছে কেন? ওর তো এতক্ষণে উঠে চলে যাওয়ার কথা। আসলে কী সে অচেতন নাকি সে অচেতনের ভান করে পড়ে রয়েছে রাস্তায়! আমি কি যাব তার কাছে? এর উত্তর কী হবে সেটা ভাবতে গিয়ে কল্পনা করতে লাগলাম, জীবন যে কত বিচিত্র রেখায় ভরপুর, তা বিউটি হিজড়ার শরীরের কাটা দাগের মতো খানিকটা দৃশমান। আর খানিকটা তার যন্ত্রণামুখর হৃদয়ের মতো রহস্যময়!