ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি মুসলিম ধর্মীয় শ্রেণির মনোভাব বোঝার জন্য উনিশ শতকের প্রথমার্ধে দিল্লি ও বাংলায় যেসব ধর্মীয় আন্দোলন গড়ে ওঠে সেগুলো বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। দিল্লি ছিল ধর্মীয় ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার কেন্দ্র, সেখানে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর নেতৃত্বে একটি সর্বভারতীয় আন্দোলনের সূচনা হয়। এই আন্দোলন হায়দরাবাদ, পাটনা, বাংলা, টঙ্ক, অযোধ্যা প্রভৃতি দূরবর্তী কেন্দ্র পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। বাংলায় হাজী শরীয়তুল্লাহ, নেসার আলী তিতুমীর ও কারামত আলী জৌনপুরীর নেতৃত্বে অনেক স্থানীয় আন্দোলনের জন্ম হয়।
যদিও এসব আন্দোলনের দৃষ্টিভঙ্গি ও ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের জীবনসংক্রান্ত প্রশ্নে তাদের দৃষ্টিকোণ ভিন্ন ছিল, তবুও তাদের মধ্যে একটি বিষয়ে ঐক্য ছিল : ভারতে ইসলামকে বিশুদ্ধ করার দৃঢ় সংকল্প। তাদের লক্ষ্য ছিল মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। এর অর্থ ছিল অমুসলিম শাসকদের বিরুদ্ধে একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম শুরু করা। ব্রিটিশরাই ছিল বাংলার অমুসলিম শাসক; সমগ্র ভারতেও ব্রিটিশ শক্তিই তখন ছিল প্রধান ক্ষমতাশালী। যেসব দেশীয় রাজ্য সরাসরি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসনের অধীন ছিল না, তারাও ‘সাবসিডিয়ারি এলায়েন্স’-এর মাধ্যমে ব্রিটিশ প্রভাবাধীনে ছিল। তাই ব্রিটিশ-সংরক্ষিত অমুসলিম প্রাদেশিক সরকারগুলো উৎখাতের যে-কোনো প্রচেষ্টা কার্যত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই পরিচালিত হচ্ছিল।
বাংলার ধর্মীয়-সংস্কারকেরা সরাসরি ব্রিটিশদের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু দিল্লির আন্দোলনের নেতারা প্রথমে দুর্বল প্রদেশগুলোতে নিজেদের শাসন প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেছিলেন, তারপর সমগ্র ভারতে একটি ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠার কাজ হাতে নিতে চেয়েছিলেন। বাংলায় করামত আলী জৌনপুরী কোনো জিহাদে অংশ নেননি; তিনি নিজেকে কেবল ধর্মীয় সংস্কারের কাজে নিবেদিত করেছিলেন। তবে বাংলার অন্য ধর্মীয় নেতারা ব্রিটিশ সরকারের প্রতি তাদের তীব্র বিদ্বেষ ও শত্রুতা লুকাননি। তারা ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করেছিলেন। এর ফলে মুসলিম দেশে হিজরত ও ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল। বাংলার ধর্মীয় নেতারা তাদের সংগ্রামে কখনোই শিথিলতা প্রদর্শন করেননি; তাঁরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে গেছেন।
দিল্লির ধর্মীয় নেতারা এক দ্ব্যর্থক মনোভাব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁরাও ব্রিটিশ শাসনের অধীন ভারতকে ‘দারুল হারব’ হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁদের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড থেকেই এটি স্পষ্ট। তবুও তাঁরা এ-বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ঘোষণাপত্র জারি করেননি। এমনকি জুমা ও ঈদের মতো বিশেষ উপলক্ষ্যে জামাতে নামায আদায়ের অনুমতিও তাঁরা দিয়েছিলেন। একই সময়ে সংগ্রামকালে তাঁরা জিহাদের জন্য মুসলিম দেশে হিজরত করেছিলেন। এ থেকেই বোঝা যায় যে তাঁরা ভারতকে ‘দারুল হারব’ বিবেচনা করতেন। তাঁরা পাশ্চাত্য শিক্ষাকে ঘৃণা করতেন এবং মুসলমানদের ব্রিটিশদের অধীন চাকরি গ্রহণ করা সহ্য করতে পারতেন না। কিন্তু তারা মুসলমানদের ইংরেজি শেখা ও ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি করার অনুমতি দিয়েছিলেন—অর্থ উপার্জনের জন্য নয়, বরং ব্রিটিশদের গোপনীয় বিষয়াবলি জানার জন্য এবং তা নিজেদের লক্ষ্য পূরণের কাজে ব্যবহার করার জন্য।
তাঁদের লক্ষ্য ছিল ভারতে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। তবুও দীর্ঘ সময় তাঁরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলেছিলেন। দিল্লি ঘরানার কিছু নেতার উদার দৃষ্টিভঙ্গিকে ভুলভাবে বোঝা হয়েছিল। বরং ব্যাপকভাবে বিশ্বাস করা হয়েছিল যে তাঁরা ব্রিটিশদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাব লালন করেন। ১৮৫৭ সালের পর কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাদের এ-ভাবমূর্তিকে নিজেদের স্বার্থে আরও দৃঢ় করার চেষ্টা করে। তবে তাঁরা প্রকৃতপক্ষে একটি ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য নিয়েই কাজ করেছিলেন; সে-উদ্দেশ্যে ব্রিটিশদের সঙ্গে এক চূড়ান্ত সংঘর্ষের পরিকল্পনা করেছিলেন; এবং ১৮৫৭-৫৮ সালে তারা ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধও করেছিলেন।
এসব আন্দোলন রাজনৈতিক লক্ষ্য পূরণে ব্যর্থ হয় এবং ১৮৫৭ সালের মধ্যেই দমন হয়ে যায়। তবুও যে-ব্রিটিশবিরোধী মনোভাব তাঁদের চালিত করেছিল এবং ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যে-বিরোধিতা তাঁরা প্রকাশ করেছিলেন, তা ১৮৫৭ সালের পরও মুসলমানদের অনুপ্রাণিত করতে থাকে। পরবর্তী সময়ের জাতীয় আন্দোলনে উলামাদের ভূমিকা নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করলে এ-কথা পরিষ্কার হবে।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর ঘরানার রক্ষণশীল উলামাদের মানসিক গতিপ্রকৃতি ও কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করলে সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ব্রিটিশ শাসনাধীন ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করার ক্ষেত্রে তাঁদের যে-সংযম, মুসলমানদের পাশ্চাত্য শিক্ষাগ্রহণের অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁদের যে-উদারপন্থা এবং সকল অমুসলিম সরকারের উৎখাতের পথে তাদের যে-ধীর কিন্তু অবিচল অগ্রযাত্রা তা ছিল কেবল একটি কূটনৈতিক দ্ব্যর্থতা, যা তারা নিজেদের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বলে মনে করেছিলেন। তাদের দীর্ঘ সংগ্রামের ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ প্রমাণ করে যে, তাদের লক্ষ্য ছিল, প্রথমত, মুসলিম সমাজের সামাজিক ও ধর্মীয় পরিশুদ্ধি এবং শেষপর্যন্ত ইসলামি শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা, যা অবশ্যই ব্রিটিশদের উৎখাত করা ছাড়া সম্ভব ছিল না।
তারীকা-ই-মুহাম্মদিয়ার, যা সাধারণত সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর ওয়াহাবি আন্দোলন নামে পরিচিত, উৎপত্তির উৎস ছিল দিল্লিকেন্দ্রিক শাহ ওয়ালিউল্লাহ-কর্তৃক পরিচালিত সংস্কার আন্দোলন। এ-আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ছিল ভারতে ইসলামি সামাজিক ব্যবস্থার সঙ্গে একটি ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যার ভিত্তি হবে কেবল খিলাফত-ই-রাশিদা।[1]মুরারি থার্স্টন টিটাস, The Religious Quest o f India, লন্ডন, ১৯৬৩, পৃ. ১৭৮-১৭৯; সাইয়িদ মুহাম্মদ … Continue reading ইসলামিক রাষ্ট্রব্যবস্থা মানবজীবনের একটি ঐক্যবদ্ধ ও সুসংহত সামাজিক-ধর্মীয়-রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিনিধিত্ব করে। সুতরাং ইসলামি রাজনীতিকে আলাদা কোনো প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা সম্ভব নয়।
এমন মুসলিম রাজনৈতিক শাসনও কুরআন ও হাদীসের নির্দেশনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে সেটাও প্রত্যাখ্যানের পক্ষপাতী ছিলেন শাহ ওয়ালিউল্লাহ ও সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর অনুসারীরা। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুঘল সরকারকেও সমালোচনায় বিদ্ধ করেছিলেন, কারণ সেই সরকার ইসলামি নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল না। জীবনের সর্বক্ষেত্রে তিনি মুসলিম সমাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছেন। তিনি মুঘল প্রশাসনকে ইসলামি আদর্শের ভিত্তিতে উন্নত করার ব্যাপারে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। এ-উদ্দেশ্যে তিনি তরবারি ব্যবহারের কথাও ভেবেছিলেন, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন কলমধারী মানুষ, তরবারিধারী নন।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গির একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য এখানে আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য : তিনিই প্রথম ধর্মীয় সংস্কারক যিনি ইজতিহাদের নীতি প্রবর্তনের মাধ্যমে তাঁর পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গিতে নমনীয়তা প্রদর্শন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরিদের বলয়ে ইজতিহাদের ব্যবহার এই আন্দোলনের একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়। ইজতিহাদের নীতি হয়তো রাজা ও হিন্দুদের সমর্থন অর্জনে সহায়তা করেছিল এবং তা ছিল চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের জন্যই।
শাহ ওয়ালিউল্লাহর সময়ে যা তাঁকে ও তাঁর অনুসারীদেরকে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করেছিল তা হলো মুঘল রাজনীতির দুর্বলতা এবং অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ ও অবক্ষয়, ব্রিটিশদের উত্থান নয়। এ-উদ্বেগ তাঁর পুত্র ও উত্তরসূরি শাহ আবদুল আযিযকেও তাড়িত করেছিল। প্রকৃতপক্ষে শাহ আবদুল আযিযকে আরও কঠিন ভূমিকা পালন করতে হয়েছিল এবং তিনি তা যথেষ্ট প্রজ্ঞা ও ধৈর্যের সঙ্গে সম্পাদন করেছিলেন।
শাহ আবদুল আযিয ১৭৪৬ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং মৃত্যুবরণ করেন ১৮২৩ সালে। ফলে তিনি মুঘল সাম্রাজ্যের ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাওয়া এবং একই সময়ে ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সুসংহত হয়ে ওঠা প্রত্যক্ষ করেছিলেন। মুসলমানদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার এই পরিবর্তন স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের উপর নতুন কিছু কর্তব্য চাপিয়ে দেয় এবং এর প্রথমটি ছিল বিদেশীদের বিতাড়ন করা। কেননা কুরআন মুসলমানদেরকে বিজয়ী জাতি হিসেবে বিবেচনা করে, পরাজিত জাতি হিসেবে নয়। শাহ আবদুল আযিয বলেছিলেন যে, হাদিস অনুযায়ী খ্রিস্টান শাসনই শেষ পর্যায়ে আসবে। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস প্রকাশ করেছিলেন যে, এখানে খ্রিস্টান বলতে ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের বোঝানো হয়েছে এবং তাদেরকে শাসনক্ষমতা থেকে উৎখাত করার পর প্রতিশ্রুত মাহদির শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
তবে শাহ আবদুল আযিয তাঁর আন্দোলনকে কেবল প্রচারণা ও সাংগঠনিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি মুসলমানদের অবস্থান-সম্পর্কিত তাঁর ফাতওয়াগুলো প্রায়শই অস্পষ্ট ও পরস্পরবিরোধী ছিল। এটা স্পষ্ট যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই সে-সময়ে প্রকাশ্যে খোলাখুলি ঘোষণা দেওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি সরাসরি ব্রিটিশ শাসনের অধীন ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করেননি, তবে তাঁর বক্তব্য সহজেই সে-অর্থে ব্যাখ্যা করা যেত। তিনি বলেননি যে ইংরেজি শেখা শরীয়ত-বিরুদ্ধ, তবে তিনি বলেছিলেন, শুধু আর্থিক সুবিধা অর্জনের জন্য বা ব্রিটিশ সরকারের অধীন চাকরি লাভের উদ্দেশ্যে ইংরেজি শেখা উচিত নয় ।
শাহ আবদুল আযিয মুসলমানদেরকে কিছু বিষয়ে আপাতত আপসমূলক মনোভাব গ্রহণ করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে, সে-সময়কার পরিস্থিতিতে টিকে থাকার জন্য ব্রিটিশদের সঙ্গে এক ধরনের সীমিত সহযোগিতা মুসলমানদের জন্য প্রয়োজনীয়। তিনি মুসলমানদের জন্য “না যুদ্ধ, না শান্তি” নীতির কল্পনা করেছিলেন। তিনি একটি ফাতওয়া জারি করেছিলে যাতে বলা হয়েছিল, কোনো মুসলমান ব্রিটিশ সরকারের অধীন চাকরি গ্রহণ করতে পারে যদি সে নিশ্চিত হয় যে তাকে তার স্বধর্মীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে না, কিংবা মদ্যপান, শূকরের মাংস ভক্ষণ বা পরিবেশনের মতো কবিরা গুনাহে (মা‘সিয়াতে কাবিরা) লিপ্ত হতে হবে না।
ফাতওয়াটির এই শর্ত মুসলমানদেরকে কার্যত ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে চাকরিগ্রহণ থেকে বিরত রাখে। কারণ সে-সময়ে ব্রিটিশ সেনাবাহিনী বহু মুসলিম শাসকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। তবে শাহ আবদুল আযিযের ফাতওয়ার দ্বিতীয় অংশ পরোক্ষভাবে মুসলমানদেরকে সরকারের বেসামরিক দপ্তর ও প্রতিষ্ঠানে চাকরি গ্রহণের অনুমতি দিয়েছিল, যেমন পুলিশ বিভাগ, কোর্ট-কাচারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইত্যাদি।
শাহ আবদুল আযিয নতুন শিক্ষার বিরোধী ছিলেন না, তবে তিনি আশঙ্কা করতেন যে পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা ইসলামের মূল ভিত্তিকেই ধ্বংস করে দিতে পারে। অবশ্য তিনি মুসলমানদের ইংরেজি শেখার অনুমতি দিয়েছিলেন; তবে তিনি সেই উদ্দেশ্যও নির্ধারণ করেছিলেন, যার জন্য ইংরেজি শেখা যেতে পারে। তাঁর একটি ফাতওয়ায় বলা হয়েছে :
“চিঠি লেখা, পড়াশোনা, এবং শব্দের গূঢ়ার্থ বোঝার উদ্দেশ্যে ইংরেজি শেখা অনুমোদিত। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তি ইংরেজদের সঙ্গে একাত্ম হওয়ার জন্য ইংরেজি শেখে, তবে সে পাপ করে এবং শরীয়তের সীমা লঙ্ঘন করে। এটি অস্ত্রের মতো : যখন তা চোরদের তাড়াতে বা ধরতে তৈরি করা হয়, তখন তা তৈরি করা নেক কাজ; কিন্তু যদি তা চোরদের সাহায্য বা রক্ষার জন্য তৈরি হয়, তবে তা তৈরি করা পাপ।”[2]শাহ আবদুল আযিয, ফাতওয়া-ই আযিযি, দিল্লি, ১৯০৪, খ. ১, পৃ. ৯১-৯২।
উনবিংশ শতকের প্রথম দিকে শাহ আবদুল আযিয যে ফাতওয়া জারি করেছিলেন, তা রক্ষণশীল উলামাদের মানসিকতার একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। উদাহরণ হিসেবে এখানে সেই ফতওয়ার একটি অংশ তুলে ধরা হলো :
“…এই শহরে [দিল্লিতে] ইমামুল মুসলিমীন কোনো কর্তৃত্ব প্রয়োগ করেন না, অথচ খ্রিস্টান নেতাদের নির্দেশাবলি নির্ভয়ে মানা হয় [পরিণামে কী ঘটবে তার কোনো ভয় নেই]। কুফরের আদেশ জারি করার অর্থ এই যে, শাসনব্যবস্থায় ও জনগণের নিয়ন্ত্রণে, ভূমি কর, খাজনা ও শুল্ক আরোপে, চোর-ডাকাতদের শাস্তিতে, বিবাদের নিষ্পত্তিতে, অপরাধের দণ্ড প্রদানে কাফিররা নিজেদের মর্জি অনুযায়ী কাজ করে। অবশ্য কিছু ইসলামি আচার-অনুষ্ঠানে তারা হস্তক্ষেপ করে না, যেমন জুমার নামায, ঈদের নামায, আযান ও গরু কুরবানি। কিন্তু এর কোনো মূল্য নেই। এসব আচার-অনুষ্ঠানের মৌলিক নীতির কোনো গুরুত্ব তাদের কাছে নেই। কেননা তারা বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মসজিদ ধ্বংস করে ফেলে এবং কোনো মুসলমান বা জিম্মি তাদের অনুমতি ছাড়া শহর বা তার উপকণ্ঠে প্রবেশ করতে পারে না। শহরে মানুষের যাতায়াত, পর্যটক ও ব্যবসায়ীদের শহরে আসা-যাওয়ার অনুমতি দেওয়াটা তাদের নিজেদের স্বার্থে। কিন্তু শুজাউল মুল্ক ও বিলায়াতি বেগমের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা তাদের অনুমতি ছাড়া শহরে প্রবেশ করতে পারেন না। এখান থেকে কলকাতা পর্যন্ত পুরোপুরি খ্রিস্টানদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ডানদিকে-বামদিকে হায়দরাবাদ, রামপুর, লখনোউ ইত্যাদি মুসলিম রাজ্য আছে বটে, কিন্তু নীতিগত কারণে তারা প্রত্যক্ষ শাসন করে না, আর এসব এলাকার শাসকেরা ব্রিটিশদের অধীন হয়ে গেছে…।”[3]প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭।
শাহ আবদুল আযিয বৃদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন। ফলে জিহাদে বা ধর্মীয় যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার মতো শারীরিক সক্ষমতা তাঁর ছিল না। তাই তিনি তাঁর শক্তি সাংগঠনিক কার্যক্রমে নিয়োজিত করেছিলেন। তিনি দুটি পরিচালনা বোর্ড গঠন করেছিলেন : এদের একটি ছিল সামরিক বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য এবং অপরটি ছিল আন্দোলনের আদর্শিক ও মতাদর্শগত বিশুদ্ধতা রক্ষার্থে তদারকি কমিটি হিসেবে কাজ করার জন্য। সামরিক বিষয়াদি দেখাশোনার জন্য যে-বোর্ডটি গঠিত হয়েছিল তাতে ছিলেন মাওলানা আবদুল হক, মাওলানা ইসমাঈল এবং সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী। বোর্ডটির চেয়ারম্যান ছিলেন সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী। আর আন্দোলনের আদর্শগত বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য যে-বোর্ডটি গঠিত হয়েছিল তার দায়িত্বে ছিলেন মাওলানা মুহাম্মদ ইসহাক এবং তাঁর ভাই মাওলানা মুহাম্মদ ইয়াকুব। শাহ আবদুল আযিয স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, এই দুটি বোর্ডের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তকেই তিনি তাঁর নিজস্ব রায় হিসেবে গণ্য করবেন। তিনি একটি আলেমগোষ্ঠীকে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য প্রশিক্ষণ দিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী (১৭৮৬-১৮৩১) রায়বেরেলীর এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। শাহ আবদুল আযিয প্রথম সাক্ষাতেই তাঁর সরল ইসলামি জীবনধারা ও চরিত্র দেখে তাকে যথার্থ মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি দেন। শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ সমাপ্ত করার পর সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন, বিবাহ করেন এবং কিছুদিন শান্তিপূর্ণ পারিবারিক জীবনযাপন করেন। কিন্তু তাঁর মন একটি মিশনের অনুসন্ধান করছিল।
প্রথমে, ১৮১০ সালে, শাহ আবদুল আযিযের অনুমতিতে তিনি টঙ্কের আমির খানের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। এ-সময়ে লেখা একটি চিঠিতে তিনি আমির খানের সেনাবাহিনীতে তাঁর যোগদানের বিষয়টি উল্লেখ করেন এবং বলেছেন, এটা ছিল আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নির্ধারিত। গোলাম রাসূল মেহ্রের মতে, এটি সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। তিনি টঙ্কের নবাবের সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এ-কারণে যে, তিনি ছিলেন একমাত্র মুসলিম শাসক, যিনি ব্রিটিশ প্রভাব থেকে স্বাধীন ছিলেন। কিন্তু আমির খান যখন ব্রিটিশদের সঙ্গে চুক্তি করেন, তখনই সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দেন। এটি প্রমাণ করে যে তিনি প্রকাশ্যে ও অন্তরে উভয়ভাবেই ভারতের ব্রিটিশ শাসনের প্রতি বিরূপ ছিলেন। এমনকি আমির খানের সেনাবাহিনীতে থাকাকালীন তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে এক যুদ্ধেও অংশ নেন এবং তাঁর শর্ত মেনে নিতে ব্রিটিশদের বাধ্য করেন।[4]জাফর থানেশ্বরী, তাওয়ারীখ-ই আজীবা : সাওয়ানেহ আহমদী, দিল্লি, ১৮৯৪, পৃ. ১৬-১৯; … Continue reading
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী এক কঠোর প্রচারণা শুরু করেছিলেন; তিনি এমনভাবে কথা বলতেন ও লিখতেন, যেন তিনি ভারতকে একটি ‘দারুল হারব’ মনে করেন, যতদিন তা অমুসলিম শক্তির শাসনাধীনে থাকবে। অবশ্য এ-কথা সর্বজনীনভাবে স্বীকৃত নয় যে তিনি আসলেই ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করেছিলেন। তাঁর লেখাগুলো বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, তিনি সরাসরি ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করেননি; কিন্তু তিনি নিজে যেমন জানতেন, আন্দোলনের অনুসারীরাও তেমনি জানত যে ভারত মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে কার্যত তার অস্তিত্ব হারিয়েছে। তাঁর মতে, যতদিন ভারত অমুসলিম শক্তির অধীন থাকবে, ততদিন তা যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হবে। খ্রিস্টানরা মুসলমানদের ক্ষমতা ছিনিয়ে নিয়েছিল, এবং এটা এক ঐতিহাসিক সত্য যে তারা মুসলিম শাসনের মূলে আঘাত করেছিল। সুতরাং অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা যথার্থ ছিল।
মুহাম্মদ ইসমাঈলের সঙ্গে মিলে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী উদ্যোগ নেন, তবে তা ব্রিটিশ ভারতের বিরুদ্ধে নয়, যেখানে ধর্মীয় সহনশীলতা বিদ্যমান ছিল, বরং তৎকালীন অ-ব্রিটিশ পাঞ্জাবের বিরুদ্ধে, যেখানে শিখরা মুসলমানদের উপর নিপীড়ন ও নির্যাতন চালাচ্ছিল। মুজাহিদিনরা সোয়াত উপত্যকাকে তাদের ঘাঁটি বানান এবং ১৮২৬ থেকে ১৮৩১ সাল পর্যন্ত তাঁরা সেখানে শিখদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক সশস্ত্র সংগ্রাম চালিয়ে যান। এমনকি ১৮৩০ সালে তাঁরা পেশোয়ার দখল করে নেন। তবে ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে তাঁরা লড়াই করতে গিয়ে শহীদ হন।[5]৬ মে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে/২৩ জিলকদ ১২৪৬ হিজরিতে জুমার দিন সাইয়িদ আহমদ … Continue reading
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর এই আকস্মিক মৃত্যু একটি বিভ্রান্তি তৈরি করে। এটা স্পষ্ট নয় যে তিনি তাঁর সংগ্রাম পাঞ্জাব থেকে সমগ্র মাতৃভূমিতে প্রসারিত করার পরিকল্পনা করেছিলেন কি-না। তবে এ-ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য প্রমাণাদি রয়েছে যে, তিনি পাঞ্জাবে পরিচালিত সংগ্রামকে তাঁর আন্দোলনের কেবল প্রথম ধাপ হিসেবে ভেবেছিলেন এবং উপযুক্ত সময়ে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
মুসলমানদের কাছে জিহাদের চারটি রূপ রয়েছে : ১. অন্তরকে পরিশুদ্ধ করার মাধ্যমে জিহাদ; ২. কথা বা বক্তৃতার মাধ্যমে জিহাদ; ৩. কলমের মাধ্যমে জিহাদ; ৪. তরবারির মাধ্যমে জিহাদ।
আহমদ বেরেলভীর আন্দোলন ইতোমধ্যেই প্রথম তিনটি রূপ পরিগ্রহণ করেছিল এবং চতুর্থ রূপের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। এই চতুর্থ রূপ প্রয়োজন অনুসারে যতদিন খুশি যথাযথ সতর্কতার সঙ্গে বিস্তৃত করা যেত, ভয়ের কিছু ছিল না। যে-অবিশ্বাসীরা অস্ত্রের শক্তিতে ভূমি দখল করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা বৈধ ছিল। এর দ্বারা বোঝা যায় যে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী এবং তাঁর অনুসারীরা শিখদের পরাজিত করার পর ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেও যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন। ফলস্বরূপ, সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর উত্তরসূরিরা তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ব্রিটিশদের সঙ্গে দীর্ঘ সংগ্রাম শুরু করেন।[6]মাজীদ খাদুরী, War and Peace in the Law of Islam, জুন, ১৯৯৫
আসলে, ব্রিটিশ শাসনের অধীন ভারতের মুসলমানরা ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করছিল। তাই কৌশলগত দিক থেকে ব্রিটিশ শাসিত ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করা সম্ভব ছিল না। তবে মুসলমানদের আশঙ্কা ছিল যে অবিশ্বাসীদের একটি শক্তিশালী সরকার উপযুক্ত সুযোগে মুসলমানদের স্বার্থবিরোধী যে-কোনো পদক্ষেপ নিতে পারে। পরে ঘটে-যাওয়া নানা ঘটনা প্রমাণ করে যে অবিশ্বাসীদের পক্ষে মুসলমানদের ধর্মীয় জীবনে হস্তক্ষেপ করা মোটেও অসম্ভব নয়। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো তখন থেকেই নিরন্তর হয়রানির শিকার হচ্ছিল। তাই মুসলমানরা মনে করেছিল যে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালানো ন্যায়সঙ্গত।
ফাতওয়াগুলো কেবল যুদ্ধ চালানোর প্রক্রিয়া কিংবা আইনগত জটিলতা নিরসনের ইঙ্গিত দিচ্ছিল। এ-সময়ের বিভিন্ন আলেম-ফকীহের ফাতওয়া এতটাই দ্ব্যর্থক ছিল যে সেগুলো উভয় মতকেই (যুদ্ধের সমর্থন ও বিরোধিতা) বৈধতা দিচ্ছে বলে মনে হতো। তবে তাদের লেখনীর মর্মার্থ—ফতোয়া, চিঠিপত্র ও অন্যান্য সাহিত্য—স্পষ্টতই ব্রিটিশ শাসন ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রতি বিরুদ্ধতা ও বৈরিতার প্রকাশ ঘটিয়েছে। তারা কোনোদিন ব্রিটিশ শাসনকে মেনে নেননি। তাদের লক্ষ্য সব সময়ই ছিল একটি ইসলামি সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
অতএব, সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী কোনো নতুন আন্দোলন শুরু করেননি; তাঁর আন্দোলন ছিল কেবল শাহ ওয়ালিউল্লাহর ফাক্কু কুল্লি নিযামিন (সমস্ত ভ্রান্ত ব্যবস্থার উচ্ছেদ)-এর ধারাবাহিকতা।
ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার, এস. জি. উইলসন এবং ভারতের ওয়াহাবি আন্দোলন সম্পর্কে লিখেছেন এমন অন্য লেখকদের মতে, সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর নেতৃত্বাধীন আন্দোলন শুরু থেকেই ব্রিটিশবিরোধী ছিল। কিন্তু মাওলানা কারামত আলী, মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী, স্যার সাইয়িদ আহমদ খান এবং মাওলানা জাফর থানেশ্বরী এই অভিযোগ অস্বীকার করেন যে ওয়াহাবি আন্দোলন ব্রিটিশবিরোধী ছিল। বরং তারা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের পর যে, সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী ব্রিটিশদের প্রতি অনুকূল বা বন্ধুভাবাপন্ন মনোভাব পোষণ করতেন।
প্রকৃতপক্ষে তারা নানা তথ্য বিকৃত করেন, যাতে ব্রিটিশদের মন থেকে এই ধারণা দূর করা যায় যে তাদের বিরুদ্ধে বৈরিতার মনোভাব বিদ্যমান। এমনকি তারা সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর কিছু কূটনৈতিক ঘোষণার দ্বারা বিভ্রান্তও হন। উদাহরণস্বরূপ, তাঁরা তাঁর এই বক্তব্যকে কাজে লাগান : “আমরা কোনো মুসলিম শাসকের সঙ্গে লড়তে চাই না… এবং ইংরেজ সরকারের সঙ্গেও আমাদের কোনো বিবাদ নেই।”
জাফর থানেশ্বরী তো সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর চিঠির মূল পাঠই বদলে দেন। তাঁর তাওয়ারীখ-ই-আজীবা বইতে তিনি “নাসারা নিকোহিদা” (অভিশপ্ত খ্রিস্টান) শব্দবন্ধ পরিবর্তন করে “শিখান-ই নিকোহিদা” (অভিশপ্ত শিখ) লিখে দেন, যাতে ব্রিটিশদের বোঝানো যায় যে ওয়াহাবিরা ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ছিল না।[7]মুহাম্মদ আবদুল বারী, The Politics of Saiyyad Ahmad Barelvi, ইসলামিক কালচার, বর্ষ ৩১, জানুয়ারি ১৯৫৭, … Continue reading
কিন্তু প্রকৃত সত্য এই যে, যতদিন ভারতে মুসলমানদের জীবন ইসলামী শরীয়ার আলোকে নির্বিঘ্নে চলার উপযুক্ত পরিবেশ বিদ্যমান ছিল, ততদিন সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর পক্ষে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করার মতো দৃঢ় ভিত্তি ছিল না। সম্ভবত তিনি অপেক্ষা করতে চেয়েছিলেন যতক্ষণ না সমস্ত আইনগত জটিলতা দূর হয়।
একবার সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী খ্রিস্টান শাসনের অধীন ভারতের মুসলমানদের দুরবস্থায় গভীর আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে চিত্রলের শাসক শাহ সুলায়মান জাহকে প্রেরিত এক চিঠিতে লিখেছিলেন :
“গত কয়েক বছরে এ-দেশের সরকার ও প্রশাসনের প্রতি ভাগ্য এতই নির্মম হয়েছে যে খ্রিস্টান ও বহুঈশ্বরবাদীরা দেশের বৃহৎ অংশে নিজেদের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মানুষকে নির্যাতন শুরু করেছে… আমার হৃদয় কেবল একটি চিন্তায় পূর্ণ, তা হলো জিহাদের চিন্তা…।”[8]হাফিয মালিক, Moslem Nationalism in India and Pakistan, ওয়াশিংটন ডিসি, ১৯৬৩, পৃ. ১৫১-১৫২; মুহাম্মদ আবদুল … Continue reading
তবে পুরোপুরি বাস্তবিক কারণেই সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী ব্রিটিশদের পরিবর্তে শিখদেরকে অবিলম্বে আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। তিনি এক সময়ে একজন শত্রুর সঙ্গেই মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। উপরন্তু, শিখরা তুলনামূলকভাবে দুর্বল ছিল এবং সীমান্তের মুসলিম (পাঠান) রাজ্যগুলো থেকে সাহায্য পাওয়া সম্ভব ছিল। ব্রিটিশরাও শিখদের শক্তি দমাতে এই উদ্যোগকে সমর্থন করতে পারে বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। একবার যখন লক্ষ্য নির্ধারিত হলো, সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ব্রিটিশদের কোনোভাবে বিরক্ত করা থেকে বিরত থাকেন। বরং তিনি জনশক্তি ও অর্থ সংগ্রহের ঘাঁটি হিসেবে ব্রিটিশ-শাসিত ভূখণ্ডকে ব্যবহার করেন ।[9]মুহাম্মদ আবদুল বারী, প্রাগুক্ত।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী হিন্দু রাজাদের উদ্দেশেও চিঠি লিখেছিলেন, যেগুলোতে তিনি ভারতে ব্রিটিশদের ক্ষমতা দখলের ঘটনায় গভীর মর্মযাতনা প্রকাশ করেছিলেন। উলামাগণও বিদেশি শাসকদের বিতাড়নের জন্য হিন্দুদের সঙ্গে সহযোগিতায় প্রস্তুত ছিলেন। তিনি গোয়ালিয়র মন্ত্রী রাজা হিন্দু রাওকে লিখেছিলেন :
“…সমুদ্রের ওপার থেকে আসা অচেনা লোকেরা আজ ভারতের শাসক হয়ে উঠেছে; কেবল ব্যবসায়ীরাই সাম্রাজ্যের ভিত্তি স্থাপন করেছে। ধনীদের প্রাসাদ ও জমিদারদের এস্টেট আজ আর টিকে নেই, তাদের সম্মান আর শান্তি ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। ভূমি ও সাম্রাজ্যের অধিপতিরা আজ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছে। অবশেষে কয়েকজন সাধক ও সন্ন্যাসী কোমর বেঁধেছেন। এ-বিশ্বস্ত মানুষগুলো আল্লাহর দ্বীনের জন্য বিদ্রোহের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন। তারা দুনিয়ার সুখ কিংবা ক্ষমতা কিছুই চান না; যখন ভারত বিদেশি শত্রুদের হাত থেকে মুক্ত হবে, তখনই মুমিনদের আকাংক্ষা পূর্ণ হবে। রাজনীতি এবং রাষ্ট্রের উচ্চপদগুলো তখন তাদের জন্যই থাকবে, যারা সেগুলো কামনা করে।”[10]গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত।
এই চিঠি থেকেও স্পষ্ট হয় যে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী নিজে ক্ষমতা অর্জনে কোনোরকম আগ্রহী ছিলেন না। তিনি স্বাধীন ভারতের নেতৃত্ব এমন একজন যোগ্য ব্যক্তির হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন, যিনি বহুপ্রতীক্ষিত ইসলামি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন। মহারাজা রণজিৎ সিং তাঁকে শতদ্রু নদীর ওপারের কোনো অঞ্চলে স্বাধীন শাসন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছিলেন; কিন্তু তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি পরাজিত শাসক সুলতান মুহাম্মদের হাতে পুনরায় পেশোয়ার ফিরিয়ে দেন। (১৮৩০ সালে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর মুজাহিদ বাহিনী পেশোয়ার দখল করে নিয়েছিলেন।) তিনি নিজেকে কেবল কাজি (বিচারক) এবং ‘হাসিব’ (জননৈতিক আচরণের তত্ত্ববধায়ক) পদে নিযুক্ত হওয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখেন, যেন মুসলমানরা ইসলামি সামাজিক বিধিবিধানের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জীবনযাপন করে। সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর অনুগামীগণ, যেমন সাইয়িদ কুতুব আলী নকভী, তাঁর পুত্র জাফর আলী নকভী এবং শাইখ গুলাম আলী, একমত যে তাঁর জিহাদ কেবল শিখদের বিরুদ্ধেই নয়, বরং ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেও পরিচালিত হয়েছিল। একজন ইংরেজ ভ্রমণকারী, ম্যাসন, মন্তব্য করেছিলেন যে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর উদ্দেশ্য প্রথমে শিখদের নিশ্চিহ্ন করা এবং পরে ভারত ও চীন জয় করা।[11]গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত; সাইয়িদ মুহাম্মদ মিয়াঁ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. … Continue reading কিন্তু ম্যাসনের এই বক্তব্য অতিরঞ্জিত মনে হয়।
এইচ. ডব্লিউ. বেলিউ ইউসুফজাই উপজাতি উপর তাঁর প্রতিবেদনে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী সম্পর্কে লিখেছেন :
“তিনি আর কেউ নন, বরং মীর সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী, যিনি এখানে ‘সাইয়িদ বাদশাহ’ নামে পরিচিত ছিলেন… যিনি স্বল্প সময়ের জন্য অত্যন্ত সফল জীবনযাপন করেছিলেন। তিনি পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন সুন্নি মুসলিম রাজ্যের রাজা ও প্রজাদের তাঁর পতাকার নিচে সমবেত হতে উদ্দীপিত করেছিলেন। সেই পতাকা উন্মোচিত হয়েছিল ইসলামি সাম্রাজ্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং ভারত উপমহাদেশকে এর অবিশ্বাসী জনগণ—ব্রিটিশ ও শিখদের—হাত থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে।”[12]কিয়ামুদ্দীন আহমদ, The Wahabi Movement in India, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ. ২৬। কাজী আবদুল ওদুদ দেখিয়েছেন … Continue reading
একবার সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী হয়দরাবাদের নিজাম সিকান্দার জাহকে একটি চিঠি লিখেছিলেন, তাতে তিনি তাঁকে তাঁর জিহাদে যোগ দিতে আহ্বান জানিয়েছিলেন :
“আমার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো জিহাদ প্রতিষ্ঠা করা এবং যুদ্ধকে হিন্দুস্তানে নিয়ে যাওয়া, খোরাসানের ভূমিতে অবস্থান করা নয়।”[13]প্রাগুক্ত, পৃ, ৩২৬।
তিনি একটি সীমান্তবর্তী মুসলিম রাষ্ট্রকে বেছে নিয়েছিলেন, কারণ কৌশলগতভাবে তিনি কেবল একটি মুসলিম রাষ্ট্র থেকেই জিহাদ চালাতে পারতেন। তাঁর দৃষ্টিতে ভারত কার্যত একটি ‘দারুল হারব’ হয়ে গিয়েছিল। অন্যদিকে কোনো অমুসলিম রাষ্ট্র থেকে যুদ্ধ শুরু করা বিদ্রোহ হিসেবে বিবেচিত হতে পারত।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর আরেকটি চিঠিতে শুধু পাঞ্জাবের মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র ভারতের মুসলমানদের প্রতি তাঁর উদ্বেগ প্রকাশ পেয়েছে।[14]জাফর থানেশ্বরী, কালাপানি : তাওয়ারীখ-ই আজীব, করাচি, ১৯৬৯, পৃ. ৫৫।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর অনুসারীদের মধ্যে শাহ ইসমাঈল এবং মাওলানা আবদুল হাই নিজ নিজ উপায়ে বিশেষ অবদান রেখেছিলেন। শাহ ইসমাঈল ছিলেন শাহ আবদুল আযিযের ভ্রাতুষ্পুত্র (শাহ আবদুল গনীর পুত্র)। তিনি আহমদ বেরেলভিকে ইমামুল মুসলিমীন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তিনি শিখদের বিরুদ্ধে আহমদ বেরেলভির সামরিক অভিযানে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ১৮৩১ সালে বালাকোটের যুদ্ধে তাঁর সঙ্গে শাহাদতবরণ করেন। তিনি আন্দোলনকে পুরোপুরি সমর্থন করেছিলেন, তাই তাঁর মনোভাব ব্রিটিশদের প্রতি সাইয়িদ আহমদ বেরেলভির মনোভাব থেকে ভিন্ন ছিল না।
শাহ ইসমাঈল মানসাব-ই ইমামত নামে একটি বই রচনা করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের জন্য একটি মতাদর্শিক ভিত্তি প্রদান করা। এই বইতে ভারতের মুসলমানদের রাজনৈতিক সমস্যাবলি সম্পর্কে শাহ ইসমাঈলের চিন্তাভাবনাও প্রতিফলিত হয়েছে। যদিও বইটিতে কোথাও সরাসরি ভারতকে ‘দারুল হারব’ বলা হয়নি, তবে তা নিবিড়ভাবে পাঠ করলে বোঝা যায় যে এই ধারার অনুসারীদের নিকট খ্রিস্টান শাসনাধীনে ভারত ছিল শত্রুর দেশ। বইটিতে খ্রিস্টান শাসকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনার এবং ভারতকে একটি ইসলামী রাষ্ট্রে পরিণত করার নীরব আকাংক্ষা বিদ্যমান। বইয়ের একটি উদ্ধৃতাংশ শুধু রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি শাহ ইসমাঈলের দৃষ্টিভঙ্গিই প্রকাশ করে না, বরং সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীকে মানসাব-ই ইমামত-এ উন্নীত করার যৌক্তিকতাও ব্যাখ্যা করে :
“সুলতানরা, যারা নামেমাত্র মুসলমান, কিন্তু বাস্তবে পরিপূর্ণ কাফিরে পরিণত হয়েছে, প্রত্যেকটি কথা ও কাজের মাধ্যমে ইসলামকে অপমান করতে ব্যস্ত… তারা আসলে উদ্ধত কাফির, যিন্দিক ও মুরতাদ। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি হলো তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালানো এবং তাদের অবমাননা করা মানেই রাসূলকে সম্মান ও প্রশংসা করা। তাদের সরকারকে কোনোভাবেই ইমামতের অন্তর্ভুক্ত বলে গণ্য করা যায় না।”[15]মুহাম্মদ মুজীব, Indian Muslims, লন্ডন, ১৯৬৭, পৃ. ৩৯৪-৩৯৫। মুজীব মানসাব-ই ইমামত থেকে … Continue reading
শাহ ইসমাঈল ও সাইয়িদ আহমদ বেরেলভী উভয়েই ভেবেছিলেন যে তাদের কাজগুলোকে বৈধ ও আইনানুগ করার জন্য এমন কোনো অঞ্চল খুঁজে-পাওয়া প্রয়োজন যা দারুল আমান (নিরাপদ-ভূমি) হিসেবে বিবেচিত হতে পারে; সেখান থেকেই তাঁরা নিজেদের অভিযান পরিচালনা করে জিহাদকে আইনী ও ন্যায্য রূপ দিতে পারবেন। তাঁরা উত্তর-পশ্চিম সীমান্তকে (North-West Frontier) ঘাঁটি হিসেবে নির্বাচন করেছিলেন, সেখান থেকে শিখদের বিরুদ্ধে জিহাদ পরিচালনা সম্ভব। শিখরা পাঞ্জাবে মুসলমানদের উপর নির্যাতন চালাচ্ছে এবং তাদের ধর্মীয় বিষয়সমূহে হস্তক্ষেপ করছে। শিখদের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ সফলতা তাঁদের আত্মবিশ্বাসকে শক্তশালী করত এবং তাঁদের মনোবল সুদৃঢ় করত। এরপর নিশ্চিতভাবে ব্রিটিশরাই হতো তাদের পরবর্তী লক্ষ্য। কিন্তু শিখদের বিরুদ্ধে আংশিক সফলতা তাদের পরিকল্পনা বিঘ্নিত করেছিল।[16]আযিয আহমদ, Islamic Modernism in India and Pakistan, লন্ডন-বোম্বে-করাচি, ১৯৬৭, পৃ. ২০; সাইয়িদ আহমদ খান, … Continue reading
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর মতো শাহ ইসমাঈলও ব্রিটিশবিরোধী বৈরিতা প্রকাশের ব্যাপারে খুব সতর্ক ছিলেন। তাই তিনিও তাঁর লেখায় ব্রিটিশ-শাসিত ভারতকে স্পষ্টভাবে ‘দারুল হারব’ আখ্যা দেওয়া এড়িয়ে গিয়েছিলেন। আসলে মুহাম্মদ ইসমাঈলের বক্তব্যে মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপ না-করা পর্যন্ত তাদের সঙ্গে এক ধরনের অনুগত সহাবস্থানের পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল, যা তাঁর প্রাথমিক ফাতওয়া বা নির্দেশনার সঙ্গে বৈপরীত্য সৃষ্টি করেছিল।[17]প্রাগুক্ত।
কিন্তু একই সঙ্গে এ-বক্তব্যের অর্থ ছিল এই যে, ব্রিটিশরা যদি মুসলমানদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, যা ছিল সম্ভাব্য ও প্রত্যাশিত, তাহলে মুসলমানদেরও তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ চালাতে হবে।
ব্রিটিশদের এমন হস্তক্ষেপ শুরু হয়েছিল বালাকোট যুদ্ধের পরপরই, যখন উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ও তাঁর সহকর্মীরা তথাকথিত ‘পশ্চাৎপদ’ ভারতীয়দের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাদানের কাজে নেমে পড়েন। এই প্রক্রিয়াটি ১৮৫৭ সালের দিকে আরও জোরালো হয়, বিশেষ করে লর্ড ডালহৌসির সময় থেকে।
শাহ ইসমাঈল রাজতন্ত্রকে ঘৃণা করতেন এবং একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা করেছিলেন। সুস্পষ্টভাবে এর অর্থ ছিল এটাই যে, কোনো এক সময় ব্রিটিশদের সঙ্গে উন্মুক্ত ও চূড়ান্ত সংঘর্ষ ঘটবেই। তিনি খ্রিস্টান শাসনকে কাফিরদের শাসনের সমান মনে করতেন, তাই খ্রিস্টান শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ ছিল অবশ্যম্ভাবী, যেমনটা কাফিরদের শাসনের বিরুদ্ধেও ছিল।[18]আবদুল্লাহ বাট, Aspects of Shah Ismail Shahid, লাহোর, ১৯৪৩, পৃ. ৮৫-৮৬।
এটা সত্য যে খ্রিস্টানদেরকে পবিত্র কুরআনে আহলে কিতাব বা কিতাবধারী জাতি বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু যেহেতু তারা নিজেদের প্রকৃত বিশ্বাস ও অনুশীলন থেকে বিচ্যুত হয়েছিল তাই শাহ ইসমাঈল তাঁদেরকে কাফিরদের চেয়ে ভালো মনে করতেন না। তিনি এমন মানুষ ছিলেন না যে এক কাফিরের বিরুদ্ধে জিহাদ করবেন আর অন্য কাফিরকে রেহাই দেবেন। যদি শিখদেরকে প্রথম আক্রমণের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেওয়া হয়ে থাকে তবে তা ছিল কেবল উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে।
একইভাবে মাওলানা আবদুল হাই, যিনি শাহ আবদুল আযিযের জামাতা, তাঁর শ্বশুরের পরামর্শে সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীকে ইমামুল মুসলিমীন হিসেবে মেনে নেন এবং তাঁর প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন। তিনি একজন বিশিষ্ট আলেম ও ফকীহ ছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মীরাটে মুফতির পদ প্রস্তাব করেছিল। প্রথমে তিনি তা গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু মাত্র তিন বছরের মধ্যেই তিনি পদত্যাগ করেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে এই পদ তাঁর রাজনৈতিক ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।[19]গোলাম রাসূল মেহ্র, জামাআত-ই মুজাহিদীন, লাহোর, ১৯৫৫, পৃ. ১১১।
যখন ব্রিটিশ শাসনের অধীন ভারতের অবস্থান নিয়ে সময়ের জ্বলন্ত প্রশ্ন সামনে আসে, আবদুল হাইও অত্যন্ত সতর্ক ও সংযত মনোভাব গ্রহণ করেন। যখন তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয় মুসলমানদের ইংরেজি শেখা উচিত কি না, তিনি তাঁর শ্বশুরের মতোই ঘোষণা করেন যে, তারা তা শিখতে পারে, তবে কেবল প্রয়োজনীয় জ্ঞান অর্জনের জন্য, বৈষয়িক উন্নয়নের জন্য নয়।[20]মাওলানা আবদুল হাই, মাজমুআতুল ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ১০৯।
তিনি সেই সময়কার সবচেয়ে জটিল প্রশ্নেরও সুস্পষ্ট উত্তর দেন। তাঁকে যখন জিজ্ঞাসা করা হয় যে ব্রিটিশ শাসনাধীনে ভারত ‘দারুল হারব’ না দারুল ইসলাম, তখন তিনি উত্তর দেন যে ভারত ‘দারুল হারব’ নয়, বরং দারুল ইসলাম। একই সঙ্গে তিনি কলকাতা ও তার আশেপাশের অঞ্চলকে ‘দারুল হারব’ বলে অভিহিত করেন। তাঁর মতে, একটি দেশ তখনই ‘দারুল হারব’ হয় যখন কাফিরদের শাসন প্রকাশ্যে কার্যকর হয়, অথবা তা ‘দারুল হারব’ সন্নিকটে থাকে এবং আশেপাশে কোনো দারুল ইসলাম থাকে না যা মুসলমানদের আশ্রয় দিতে পারে, অথবা যখন মুসলমান ও জিম্মিদের কেউই ধর্মীয় স্বাধীনতা ভোগ করে না।
তদ্রুপ তিনি জুমআ ও ঈদের মতো জামাতের সঙ্গে নামাযও বৈধ বলে প্রমাণ করেন। কারণ অমুসলিম শাসকেরা ধর্মীয় ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করত না। দ্বিতীয়ত, মুসলমানরা সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীকে তাঁদের ইমাম হিসেবে মেনে নিয়ে সুলতানের পরিবর্তে ইমামের নামে খুতবা পাঠের শর্তও মেনে নিয়েছেন। এটাই ছিল তাঁর মত।[21]প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৪; আযিয আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯। তবে এসব ফাতওয়া ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চূড়ান্ত লক্ষ্যবিরোধী ছিল না; বরং তখনকার জটিল পরিস্থিতিতে মুসলমানদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই প্রয়োজনীয় ছিল।
মাওলানা আবদুল হাই সাইয়িদ আহমদ বেরেলভিকে আইনগত দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। তবে এটাই সত্য যে তিনি সাইয়িদ আহমদ বেরেলভির আন্দোলনকে সম্পূর্ণ সমর্থন করেছিলেন এবং ব্রিটিশদের অধীনে চাকরি থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাঁর এসব কাজ প্রমাণ করে যে, তিনিও প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশবিরোধী ছিলেন এবং ব্রিটিশদের ভারত থেকে উৎখাত করে ভারতে একটি ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। তবে দীর্ঘ সংগ্রামের প্রথম ধাপ শেষ হওয়ার আগেই ১৮২৮ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি তিনি ইন্তেকাল করেন।[22]গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫।
ব্রিটিশরা ভারতের জনগণের ধর্মীয় ও সামাজিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ না-করার নীতি মেনে চলছিল। উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের আগমন পর্যন্ত তারা এই নীতির উপর ছিল। তাই উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম তিন দশকের পরিবেশ-পরিস্থিতিতে দিল্লির কোনো আলেম স্পষ্টভাবে ভারতকে ‘দারুল হারব’ ঘোষণা করতে পারেননি। প্রকৃতপক্ষে, আলেমগণ ব্রিটিশদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে চলতেন। কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে ব্রিটিশরা জনগণের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ব্যাপারে হস্তক্ষেপ শুরু করে। এর ফলে ঐ সময়কার আলেমদের ফাতওয়ায় স্পষ্টভাবে ভারতে ‘দারুল হারব’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং সাইয়িদ আহমদ বেরেলভির উত্তরসূরিরা ব্রিটিশদের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে দ্বিধা করেননি।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | মুরারি থার্স্টন টিটাস, The Religious Quest o f India, লন্ডন, ১৯৬৩, পৃ. ১৭৮-১৭৯; সাইয়িদ মুহাম্মদ মিয়াঁ, উলামা-ই হিন্দ কা শানদার মাযী, দিল্লি ১৯৫৭, খ. ২, পৃ. ৬-৮, ৩০-৩৫।
সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর আন্দোলনের সঙ্গে আরবের ওয়াহাবি আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক ছিল না। প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল শাহ ওয়ালিউল্লাহর “ফাক্কু কুল্লি নিযামিন” আন্দোলনেরই ধারাবাহিকতা, যা ‘তারগীব-ই মুহাম্মদিয়া’ ও ‘তারিকা-ই মুহাম্মদিয়া’ নামেও পরিচিত। ভূপালের নবাব মুহাম্মদ সিদ্দিক হাসানের মতে, প্রথম যে-ব্যক্তি সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর মুসলিম অনুসারীদের “ওয়াহাবি” আখ্যা দিয়েছিলেন তিনি হলেন বাদায়ূনের ফজল রাসূল। সিদ্দিক হাসান যা লিখেছেন তা অত্যন্ত চমকপ্রদ : “বাদায়ূনে বসবাসকারী ফজল রাসুল নামের এক ব্যক্তি প্রথম ভারতের মুসলমানদের ‘ওয়াহাবি’ নাম দেন, যা ক্রমে সাধারণভাবে প্রচলিত হয়ে যায়। যাদের মধ্যে বিদ্বেষপ্রবণতা ছিল, তারা হাকিমদের (ব্রিটিশ বিচারকদের) মনে এই ধারণা গেঁথে দেয় যে ওয়াহাবিরা ব্রিটিশ সিংহাসনের শত্রু। তবে বহু অনুসন্ধানের পর তারা বুঝতে পেরেছে যে কাউকে কেবল ‘ওয়াহাবি’ বলা মানেই যে সে শাসনক্ষমতার শত্রু তা নয়, যতক্ষণ না সে কোনো রাষ্ট্রদ্রোহমূলক কাজ করে। কিন্তু এ-সিদ্ধান্তে পৌঁছতে তাদের অনেক সময় লেগেছে। একসময় শুধু কাউকে ‘ওয়াহাবি’ বলা মানেই তার বিরুদ্ধে কঠোর জবাবদিহি নিশ্চিত ছিল। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে এখন আর সে অবস্থা নেই।” এ-প্রসঙ্গে দেখুন: An Interpreter of Wahabiism, উর্দু থেকে ইংরেজি অনুবাদ : সাইয়িদ আকবর আলম, ১৮৮৪, পৃ. ৭৬। |
|---|---|
| ↑2 | শাহ আবদুল আযিয, ফাতওয়া-ই আযিযি, দিল্লি, ১৯০৪, খ. ১, পৃ. ৯১-৯২। |
| ↑3 | প্রাগুক্ত, পৃ. ১৭। |
| ↑4 | জাফর থানেশ্বরী, তাওয়ারীখ-ই আজীবা : সাওয়ানেহ আহমদী, দিল্লি, ১৮৯৪, পৃ. ১৬-১৯; গোলাম রাসূল মেহ্র, সাইয়িদ আহমদ শহীদ, লাহোর, ১৯৫২, পৃ. ৫২-৫৪, ৭৩, ৭৬-৭৭ ও ৮২; কিয়ামুদ্দীন আহমদ, The Wahabi Movement in India, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ. ২৬। |
| ↑5 | ৬ মে ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে/২৩ জিলকদ ১২৪৬ হিজরিতে জুমার দিন সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর মুজাহিদিন বাহিনী মানসেহরা জেলার পার্বত্য উপত্যকায় অবস্থিত বালাকোট ময়দানে চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। মুজাহিদিন বাহিনী ছিল দুর্বলভাবে সজ্জিত। তাদের মুখোমুখি হতে হয়েছিল শিখ সেনাপতি শের সিংয়ের নেতৃত্বাধীন তাদের চেয়ে বহুগুণ বিশাল বাহিনীর। সেই দিন সাইয়িদ আহমদ, শাহ ইসমাইল এবং ইসলামী আন্দোলনের বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দ যুদ্ধক্ষেত্রে শহীদ হন। বালাকোটে শিখদের বিজয়ে লাহোরে উল্লাস ছড়িয়ে পড়ে। বালাকোটে এই পরাজয় ইসলামী আন্দোলনের জন্য এক বিধ্বংসী আঘাত ছিল। (The Salafis, History of the Ahle Hadees Movement in India, পৃ. ১৪৮ |
| ↑6 | মাজীদ খাদুরী, War and Peace in the Law of Islam, জুন, ১৯৯৫ |
| ↑7 | মুহাম্মদ আবদুল বারী, The Politics of Saiyyad Ahmad Barelvi, ইসলামিক কালচার, বর্ষ ৩১, জানুয়ারি ১৯৫৭, পৃ. ১৬০-১৬১; জাফর থানেশ্বরী, তাওয়ারীখ-ই-আজীবা : সাওয়ানেহ আহমদী, পৃষ্ঠা ১৬-১৯; গোলাম রাসূল মেহ্র, সাইয়িদ আহমদ শহীদ, পৃষ্ঠা ২৫৪-২৬০। |
| ↑8 | হাফিয মালিক, Moslem Nationalism in India and Pakistan, ওয়াশিংটন ডিসি, ১৯৬৩, পৃ. ১৫১-১৫২; মুহাম্মদ আবদুল বারী, প্রাগুক্ত। |
| ↑9 | মুহাম্মদ আবদুল বারী, প্রাগুক্ত। |
| ↑10 | গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত। |
| ↑11 | গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত; সাইয়িদ মুহাম্মদ মিয়াঁ, প্রাগুক্ত, খ. ২, পৃ. ২১৭। |
| ↑12 | কিয়ামুদ্দীন আহমদ, The Wahabi Movement in India, কলকাতা, ১৯৬৯, পৃ. ২৬।
কাজী আবদুল ওদুদ দেখিয়েছেন যে, ধর্মীয় নেতারা মূলত মুসলমানদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ও সুবিধা পুনরুদ্ধারের জন্য সংগ্রাম করছিলেন, মুসলিম ভারতে ব্রিটিশদের অগ্রাসনের ফলে এগুলো হারিয়ে গিয়েছিল। তবে কাজী আবদুল ওদুদ সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর আন্দোলনকে আরবের ওয়াহাবি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। যা সঠিক নয়। তবে তিনিও এই সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, ঐসব ধর্মীয় নেতাদের কাছে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ভারত একটি ‘দারুল হারব’ হয়ে গিয়েছিল। তাঁর মতে, তাঁরা যে কেবল ধর্মীয় সংস্কারে আগ্রহী ছিলেন তা নয়, বরং ব্রিটিশদের ভারত দখলের ফলে মুসলমানরা যেসব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন তার জন্যও তাঁরা লড়াই করেছিলেন। (কাজী আবদুল ওদুদ, ক্রিয়েটিভ বেঙ্গল, কলকাতা, ১০৩৩, পৃ. ৫১-৫৩ |
| ↑13 | প্রাগুক্ত, পৃ, ৩২৬। |
| ↑14 | জাফর থানেশ্বরী, কালাপানি : তাওয়ারীখ-ই আজীব, করাচি, ১৯৬৯, পৃ. ৫৫। |
| ↑15 | মুহাম্মদ মুজীব, Indian Muslims, লন্ডন, ১৯৬৭, পৃ. ৩৯৪-৩৯৫। মুজীব মানসাব-ই ইমামত থেকে উদ্ধৃত করেছেন। |
| ↑16 | আযিয আহমদ, Islamic Modernism in India and Pakistan, লন্ডন-বোম্বে-করাচি, ১৯৬৭, পৃ. ২০; সাইয়িদ আহমদ খান, আসহাবে বাগাওয়াত-ই হিন্দ, ১৯০৩ থেকে উদ্ধৃত। |
| ↑17 | প্রাগুক্ত। |
| ↑18 | আবদুল্লাহ বাট, Aspects of Shah Ismail Shahid, লাহোর, ১৯৪৩, পৃ. ৮৫-৮৬। |
| ↑19 | গোলাম রাসূল মেহ্র, জামাআত-ই মুজাহিদীন, লাহোর, ১৯৫৫, পৃ. ১১১। |
| ↑20 | মাওলানা আবদুল হাই, মাজমুআতুল ফাতাওয়া, খ. ১, পৃ. ১০৯। |
| ↑21 | প্রাগুক্ত, পৃ. ১২৪; আযিয আহমদ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯। |
| ↑22 | গোলাম রাসূল মেহ্র, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১৫। |