মুসলিমরা অ্যারিস্টটলের রথের সঙ্গে জোয়ালবদ্ধ ছিল—আর্নেস্ট রেনাঁ[1]Averroes et l’averroïsme (Averroes and Averroism), ১৮৫২.
সিরিয়া ও মিশর বিজয়ের সময় থেকেই ইসলাম বিজ্ঞানের সংস্পর্শে এসেছিল। মিশরের আলেকজান্দ্রিয়া ছিল তৎকালীন ‘খ্রিস্টীয়-গ্রিক’ দর্শনের কেন্দ্র এবং অ্যারিস্টটলের দর্শনের বহু প্রবক্তার প্রধান আবাসস্থল। গ্রিক দর্শন সরাসরি গ্রিস থেকে নয়, বরং আলেকজান্দ্রিয়ার খ্রিস্টান পণ্ডিতদের মাধ্যমেই মুসলিমদের কাছে পৌঁছেছিল। আমীর মুয়াবিয়া (রা.) কেবল চিকিৎসাবিজ্ঞানের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন, তার পৌত্র খালিদ ইবনে ইয়াযিদ এর সঙ্গে রসায়নশাস্ত্রকেও যুক্ত করেন। তাঁকে ইসলামের ইতিহাসের প্রথম ‘হাকিম’ বা বিজ্ঞান-অনুরাগী রাজপুত্র বলা হয়। তাঁর হাতেই মুসলিম কিমিয়া বা রসায়নের (Alchemy) ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল। উমাইয়া যুগে কেবল এই দুটি বিষয়ের উপরই বই অনূদিত হয়েছিল। পরবর্তীকালে যখন (১৩২ হিজরি/৭৫০ খ্রিষ্টাব্দ) আব্বাসীয় বংশের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন গ্রিক বিজ্ঞানগুলো বিকশিত হতে শুরু করে; এবং সপ্তম খলিফা আল-মামুনের রাজত্বকালে গ্রিক বিজ্ঞানের চর্চা এক বিশাল ও ব্যাপক রূপ ধারণ করে। আল-মামুনের সময়েই ‘বাইতুল হিকমাহ’ বা হাউজ অফ উইজডম পূর্ণতা পায়, যেখানে দর্শন, গণিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানের স্বর্ণযুগ শুরু হয়।
সে সময়ে মিশর, বাইজান্টিয়াম কিংবা গ্রিস—সবখানেই অ্যারিস্টটলের দর্শন একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। খ্রিস্টান ‘দার্শনিক-ধর্মতত্ত্ববিদগণ’ একে তাঁদের উদ্দেশ্যের অনুকূল ও উপযোগী মনে করে নিজেদের দর্শন হিসেবে আপন করে নিয়েছিলেন। মুসলিমরা এই খ্রিস্টানদের কাছ থেকেই দর্শন ঋণ করেছিলেন; তাই এটি মোটেই অস্বাভাবিক বা আশ্চর্যজনক ছিল না যে, তাঁরা দর্শনের এই বিশেষ শাখাটির প্রতি গভীর এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছিলেন। তারা এই দর্শনধারার উপর এত বেশি বই লিখেছিলেন যে, পরবর্তীকালের মুসলিমরা যদি গ্রিসের অন্যান্য ঘরানা বা দার্শনিকদের নামও না জানতেন, তবে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকত না। পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে যখন অ্যারিস্টটল প্রাচ্যে ইবনে সিনার মতো বাগ্মী এবং পাশ্চাত্যে ইবনে রুশদের মতো উচ্চাভিলাষী ও বুদ্ধিদীপ্ত সমর্থক-ব্যাখ্যাদাতা পেয়ে যান; তাঁরা তাঁর চিন্তার ও তত্ত্বের ব্যাখ্যা করেন ও প্রচার ঘটান। ফলে তাঁদের কণ্ঠস্বর সমগ্র ইসলামী জগৎ জুড়ে বজ্রনিনাদের মতো প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। তবে ভিন্নতাও যে ছিল না তা নয়।
অ্যারিস্টটলের জন্মের আগেই সাতজন মহান দার্শনিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন: থেলিস (৬২৪-৫৪৬ খ্রি.পূ.), মিলেতাসের আনাক্সিমেনিস (৫৮৬-৫২৬ খ্রি.পূ.), পিথাগোরাস (৫৭৫-৪৯৫ খ্রি.পূ.), আনাক্সাগোরাস (৫১০-৪২৮ খ্রি.পূ.), এম্পেদোক্লেস (৪৯৪-৪৩৪ খ্রি.পূ.), সক্রেটিস (৪৭০-৩৯৯ খ্রি.পূ.) এবং প্লেটো (৪২৭-৩৪৭ খ্রি.পূ.)। শীর্ষস্থানীয় মুসলিম মনীষীগণ এই সাতজন দার্শনিকের চিন্তা ও তত্ত্বের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন এবং তাঁদের রচনায় এই দার্শনিকদের উল্লেখ করেছেন। আবদুল করিম শাহরাস্তানি (১০৮৬-১১৫৩ খ্রি.) তাঁর আল-মিলাল ওয়া আন-নিহাল গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডের পঞ্চম অধ্যায়ে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ নির্ভুলভাবে তাঁদের জীবন ও দর্শন লিপিবদ্ধ করেছেন। এমনকি বর্তমান সময়ের সেরা দর্শন-ইতিহাসগ্রন্থগুলোও দর্শনের আকাশের এই সাত নক্ষত্র সম্পর্কে তাঁর চেয়ে ততটা বেশি তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি।
ইসলামী দর্শনের ইতিহাস সম্পর্কে আরেকটি ভুল ধারণা এই যে, এটি কেবল আবু বকর রাযী (৮৬৫-৯২৫ খ্রি.), আল-ফারাবী (৮৭০-৯৫১ খ্রি.), ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.), ইমাম গাযালী (১০৫৮-১১১১ খ্রি.), ইবনে রুশদ (১১২৬-১১৯৮ খ্রি.), নাসিরুদ্দীন তুসী (১২০১-১২৭৪), কুতবুদ্দীন রাযী (১২৯৫-১৩৬৫ খ্রি.), মোল্লা সদরা শিরাজী (১৫৭২-১৬৪১) প্রমুখের রচনাবলিতেই সীমাবদ্ধ। আসল ব্যাপার এই যে, সত্যিকার ইসলামী দর্শন কেবল এসব লেখকের ‘ধর্মীয়-দার্শনিক’ রচনার প্রতিপাদ্য নয়; তা বরং আবুল হুযাইল আল-আল্লাফ (৭৫২-৮৪০ খ্রি.), আল-জাহিয (৭৭৬-৮৬৮ খ্রি.), আবুল হাসান আশআরী (৮৭৩-৯৩৬ খ্রি.), নিজামুল মুলক (১০১৮-১০৯২ খ্রি.) প্রমুখের রচনায়ও প্রধান বিষয় হিসেবে এসেছে। তাঁরা প্রাচীন দর্শনকে তাঁদের আলোচনার অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁদের গ্রন্থসমূহে বিভিন্ন শিরোনামে সে সব নিয়ে আলোচনা করেছেন।
এম্পেদোক্লেসের তত্ত্বসমূহ মুসলিম লেখকদের মধ্যে বেশ প্রচলিত ছিল। আবুল হুযাইল আল্লাহ তাআলার ‘সিফাত’ বা গুণাবলি-সংক্রান্ত ব্যাখ্যায় এই প্রাচীন দার্শনিকের কাছে ঋণী ছিলেন।[2]ইবনে আবী উসাইবিয়া, উয়ূনুল আনবা ফী তাবাকাতিল আতিব্বা, দারু মাকতাবাতিল … Continue reading কর্ডোভার মুহাম্মদ ইবনে আবদুল্লাহ (ইবনে মাসাররা) ছিলেন এই দার্শনিকের একজন অনুসারী এবং তিনি কেবল তাঁরই রচনাসমূহ অধ্যয়ন করতেন।[3]তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ২১। এমনকি হিজরি সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত এম্পেদোক্লেসের রচনাসমূহ জেরুজালেম লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ছিল।[4]জামালুদ্দীন আল-কিতফী, ইখবারুল উলামা বিআখবারিল হুকামা, লেবানন, দারুল কুতুব … Continue reading
সায়িদ আল-আন্দালুসী বলেছেন, “পিথাগোরাসের বিখ্যাত কাজগুলোর মধ্যে ছিল (আরবিতে অনূদিত হয়েছিল) আত্মা-বিষয়ক গ্রন্থ ‘কিতাবু ফাদিন’ (Phaedo); রাষ্ট্রদর্শন-বিষয়ক গ্রন্থ কিতাব আস-সিয়াসাতুল মুদুনিয়্যাহ (The Republic); এবং তিমাইউস আল-রুহানি (Timaeus of the Spirit), যা আলোচনা করেছে তিনটি বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের গঠন নিয়ে: ঐশ্বরিক জগৎ, যৌক্তিক চিন্তার জগৎ এবং আত্মার জগৎ। এছাড়া তাঁর তিমাইউস আত-তবীয়ি (Timaeus of Physics) গ্রন্থটিতে তিনি মহাবিশ্বের ভৌত গঠন নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই শেষোক্ত বই দুটি তিনি তিমাইউস নামক তাঁর এক শিষ্যকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন।”[5]তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ২৩।
এখানে একটি কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় এই যে, অনুবাদক বা তৎকালীন মুসলিম ঐতিহাসিকগণ প্লেটোর বিখ্যাত সংলাপ ফেডো (Phaedo), দ্য রিপাবলিক (The Republic) এবং তিমাইউস (Timaeus)-কে পিথাগোরাসের কাজ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর কারণ হলো, পিথাগোরাস নিজে কোনো বই লিখে যাননি, তাঁর দর্শন মূলত প্লেটোর লেখার মাধ্যমেই টিকে ছিল। মধ্যযুগীয় অনেক মুসলিম পণ্ডিত প্লেটোকে পিথাগোরাসের দর্শনের একজন মহান প্রচারক বা সরাসরি উত্তরসূরি হিসেবে দেখতেন। প্লেটোর এই বিখ্যাত সংলাপগুলো প্রধানত নবম শতাব্দীতে (আব্বাসীয় শাসনামলে) বাগদাদের ‘বাইতুল হিকমাহ’-কেন্দ্রিক অনুবাদ-আন্দোলনের সময় আরবিতে অনূদিত হয়েছিল।
‘তিমাইউস আল-রুহানি’ গ্রন্থে যে তিনটি জগতের কথা বলা হয়েছে, তা নব্য প্লেটোবাদী (Neoplatonism) দর্শনের মূল ভিত্তি। এটি মুসলিম ‘সুফি’ এবং ‘ইশরাকি’ (Illuminationist) ধারার দর্শনের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল।
তিমাইউস মূলত প্লেটোর অন্যতম প্রভাবশালী সংলাপ, এতে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে মহাবিশ্বের সৃষ্টিতত্ত্ব বুঝতে এটি ব্যবহৃত হত। মুসলিম দার্শনিকগণ একে দুই ভাগে ভাগ করেছিলেন: একটি আধ্যাত্মিক (Spiritual) এবং অন্যটি প্রাকৃতিক (Physical)।
তিমাইউস আরবিতে অনুবাদ করেন নবম শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিখ্যাত অনুবাদক ইয়াহইয়া ইবনে আল-বিতরিক এবং পরবর্তীকালে হুনাইন ইবনে ইসহাক এটিকে আরও পরিমার্জিত করেন। দ্য রিপাবলিকও নবম শতাব্দীতেই অনূদিত হয়েছিল। এর প্রথম দিকের অনুবাদক ছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক। আত্মার অমরত্ব-বিষয়ক সংলাপ ফেডো নবম শতাব্দীতে অনূদিত হয়। সক্রেটিস তাঁর মৃত্যুর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে বন্ধুদের সঙ্গে আত্মার অমরত্ব এবং পরকালের প্রকৃতি নিয়ে যে আলোচনা করেছিলেন তা এতে উঠে এসেছে। সক্রেটিস বিষপানে মৃত্যুবরণ করার আগমুহূর্তে মোটেও বিচলিত ছিলেন না; বরং তিনি যুক্তি দিয়ে প্রমাণ করছিলেন যে, শরীর ধ্বংস হলেও আত্মা অবিনশ্বর। মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে ইমাম গাযালী এবং ইবনে সিনার চিন্তা ফেডো সংলাপের যুক্তিরাশির দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল, তারা আত্মার স্বরূপ নিয়ে যে আলোচনা করেছেন তা থেকে তার প্রমাণ মেলে। ঐতিহাসিক আল-মাসউদী এবং ইবনে নাদিমের তথ্যমতে, ফেডো অনুবাদ করেছিলেন হুনাইন ইবনে ইসহাক অথবা তাঁর সমসাময়িক কোনো পণ্ডিত।
সায়িদ আল-আন্দালুসী লিখেছেন যে, পরবর্তীকালের লেখকদের মধ্যে পিথাগোরাসের অসংখ্য অনুসারী ছিলেন, যাঁরা তাঁর প্রাচীন পদার্থবিদ্যা-সংক্রান্ত তত্ত্বকে সুসংহত ও পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন। প্রখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক ও দার্শনিক আবু বকর রাযী ছিলেন তাঁদেরই একজন। তিনি অ্যারিস্টটলের দর্শনের ঘোর বিরোধী ছিলেন এবং পিথাগোরাসকে সমর্থন করে ও অ্যারিস্টটলকে খণ্ডন করে একাধিক বই লিখেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, অ্যারিস্টটল কেবল দর্শনকেই ধ্বংস করেননি, বরং এর মূল নীতিগুলোকেও বিকৃত করেছেন।[6]তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৩৩। যেখানে ইবনে সিনা বা ইবনে রুশদ অ্যারিস্টটলকে অনুসরণ করতেন, রাযী সেখানে প্লেটো এবং পিথাগোরাসের পরমাণুবাদের কাছাকাছি মতবাদ পোষণ করতেন। সাধারণত আমরা পিথাগোরাসকে গণিতবিদ হিসেবে চিনি; কিন্তু মুসলিম পণ্ডিতদের কাছে তিনি একজন আধ্যাত্মিক ও তাত্ত্বিক দার্শনিক হিসেবেও জনপ্রিয় ছিলেন।
সায়িদ আল-আন্দালুসী, যিনি তৎকালীন জাতিসমূহের বিজ্ঞান ও জ্ঞান বিভাগ নিয়ে ‘তাবাকাতুল উমাম’ শিরোনামে বই লিখেছিলেন, তিনি নিজেও দর্শনের সবকটি ঘরানা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখতেন। অ্যারিস্টটলের একজন একনিষ্ঠ অনুসারী হওয়া সত্ত্বেও তিনি গ্রিক দর্শনের বিভিন্ন মতবাদ সম্পর্কে অত্যন্ত সততার সঙ্গে বিবরণ দিয়েছেন। তাঁর এই গ্রন্থ মধ্যযুগের বিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম আকর গ্রন্থ, যা থেকে প্রমাণ মেলে যে স্পেনের মুসলিম পণ্ডিতরা কতটা বস্তুনিষ্ঠ ছিলেন।
আন্দালুসের আরেকজন বিখ্যাত মনীষী ও দার্শনিক ইবনে হায্ম গ্রিক দর্শনের সব ঘরানা সম্পর্কে সম্যক অবহিত ছিলেন, যা তাঁর কিতাব ‘আল-ফাস্ল ফী আল-মিলাল ওয়া আল-আহওয়া ওয়া আন-নিহাল’ (الْفَصْلُ فِي الْمِلَلِ وَالْأَهْوَاءِ وَالنِّحَلِ) গ্রন্থের পাঠকমাত্রই জানেন। তা সত্ত্বেও তিনি অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যার বিরোধী ছিলেন এবং এর ভুলত্রুটিগুলো প্রকাশ করে একটি বই লিখেছিলেন। সে বইটির নাম ছিল ‘আত-তাকরীব লি-হাদ্দিল মানতিক ওয়া আল-মাদখাল ইলাইহি’ (التَّقْرِيبُ لِحَدِّ الْمَنْطِقِ وَالْمَدْخَلُ إِلَيْهِ)।[7]তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৭৬।
মুতাযিলা পণ্ডিত ইব্রাহীম আন-নাজ্জামও ছিলেন অ্যারিস্টটলের দর্শনের অন্যতম বিরোধী। বিখ্যাত আব্বাসীয় উজির জাফর আল-বারমাকির দরবারে তিনি কেবল অ্যারিস্টটলের কাজগুলো পাঠই করেননি, বরং তৎক্ষণাৎ সেগুলো খণ্ডন করেছিলেন এবং এই বিষয়ে একটি গ্রন্থও রচনা করেছিলেন।
বিখ্যাত মুতাযিলা তত্ত্বজ্ঞানী আবু আলী জুব্বায়ী ‘মহাবিশ্ব এবং বিশৃঙ্খলা’ (Cosmos and Chaos/অ্যারিস্টটলের On Generation and Corruption)-বিষয়ক অ্যারিস্টটলের বইটির প্রতিবাদে একটি খণ্ডনমূলক গ্রন্থ লিখেছিলেন।[8]প্রাগুক্ত।
আল-হাসান ইবনে মুসা নাওবাখতি ছিলেন একজন বিখ্যাত পণ্ডিত, যাঁর দিকনির্দেশনা ও তত্ত্বাবধানে সাবিত ইবনে কুররা এবং অন্যরা গ্রিক গ্রন্থসমূহ অনুবাদ করেছিলেন। তিনি নিজেও অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যার ভুলত্রুটি নিয়ে একটি বই লিখেছিলেন। এই বইটি ইবনে তাইমিয়ার সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ হিজরি সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত প্রচলিত ছিল। ইবনে তাইমিয়া তাঁর ‘আর-রাদ্দু আলাল মানতিকিয়্যীন’ (الرَّدُّ عَلَى الْمَنْطِقِيِّينَ/যুক্তিবিদদের খণ্ডন) গ্রন্থে এটির উল্লেখ করেছেন। আল-হাসান নাওবাখতি যা কিছু লিখেছিলেন, তা মূলত অ্যারিস্টটলের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়ার জন্য তাঁর পূর্বসূরিদের মতামতেরই একটি সংকলন ছিল। নাওবাখতির বইটির নাম ‘কিতাব আল-আরা ওয়া আদ-দিয়ানাত’ (كِتَابُ الْآرَاءِ وَالدِّيَانَاتِ)।
ইবনে মালকা আল-বালাদি আল-বাগদাদি (১০৮৭-১১৬৫ খ্রি.) ছিলেন তাঁর সময়ের অন্যতম সেরা দার্শনিক ও চিকিৎসাবিদ; তাঁর পুরো নাম ছিল আবুল বারাকাত হিবাতুল্লাহ ইবনে আলী ইবনে মালকা আল-বাগদাদি। তিনি চিকিৎসক এবং দার্শনিক হিসেবে দ্বাদশ শতাব্দীতে বেশ খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি খলিফা মুসতানজিদ বিল্লাহর দরবারী ছিলেন এবং অ্যারিস্টটলের দর্শনের প্রতিবাদে একটি বই লিখেছিলেন। ইবনে তাইমিয়া তাঁর গ্রন্থে এই বইটিরও তথ্যসূত্র প্রদান করেছেন। ইবনে মালকার শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হলো ‘আল-মুতাবার ফিল হিকমাহ’। এ বইটিতে তিনি অ্যারিস্টটলের অনেক পদার্থবিদ্যার তত্ত্বকে (যেমন : গতিতত্ত্ব) চ্যালেঞ্জ করেছিলেন, যা আধুনিক বিজ্ঞানের ‘জড়তা’ বা ধারণার পূর্বসূরি হিসেবে বিবেচিত হয়।
শহীদ শাহাবুদ্দিন সুহরাওয়ার্দী (১১৫৪-১১৯১ খ্রি.) প্লেটোর দর্শনকে সমর্থন করেছিলেন এবং এর প্রতিদ্বন্দ্বী মতবাদগুলোর (বিশেষ করে অ্যারিস্টটলের অনুসারীদের) বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁর যে গ্রন্থে নব্য প্লেটোবাদ (Neo-Platonism) নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, সেটির নাম ‘হিকমাতুল ইশরাক’ (The Philosophy of Illumination/আলোকিত প্রজ্ঞার দর্শন)। তিনি এর সঙ্গে পারস্যের প্রাচীন দর্শনকে সংমিশ্রিত করেছিলেন। কুতবুদ্দীন শিরাজী এই গ্রন্থের উপর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থ লিখেছিলেন, যা প্রকাশিত হয়েছিল। শাহাবুদ্দিন তাঁর ‘আল-মাশারী‘ ওয়া আল-মুতারিহাত’ (المشارع والمطارحات) গ্রন্থে প্রাচীন ও আধুনিক দর্শনের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন।
আল-মাসউদী ইতিহাসবিদ এবং ভূগোলবিদ হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান হলেও তিনি একজন মহান দার্শনিকও ছিলেন। গ্রিক এবং পারস্যের দর্শন সম্পর্কে তাঁর অগাধ জ্ঞান ছিল; তিনি তাঁর ‘মুরুজ আয-যাহাব’ গ্রন্থের বিভিন্ন স্থানে এগুলোর ইঙ্গিত দিয়েছেন এবং তাঁর ‘আখবার আয-যামান’ গ্রন্থে এগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। এছাড়া প্রথমোক্ত গ্রন্থটির (মুরুজ আয-যাহাব) ভূমিকায় তিনি তাঁর নিম্নোক্ত বইগুলোর নাম উল্লেখ করেছেন: ১. কিতাব আল-ইবানাহ আন উসুল আদ-দিয়ানাহ (الإِبَانَةُ عَنْ أُصُولِ الدِّيَانَةِ); ২. কিতাব আল-মাকালাত ফি উসুল আদ-দিয়ানাত (الْمَقَالَاتُ فِي أُصُولِ الدِّيَانَاتِ); ৩. কিতাব সিররুল হায়াত (سِرُّ الْحَيَاةِ فِي أَسْرَارِ الطَّبِيعَةِ وَالْحَوَاسِّ وَالْمَبَادِئِ وَالتَّرْكِيبِ); এবং ৪. কিতাব নাযমুল আদিল্লাহ ফি উসূলিল মিল্লাহ (نَظْمُ الأَدِلَّةِ فِي أُصُولِ الْمِلَّةِ)। ‘মুরুজ আয-যাহাব’-এর প্রস্তাবনায় তিনি যে সব বইয়ের তালিকা দিয়েছেন তাতে তিনি মূলত দর্শনের পরিধি এবং এর মূলনীতিসমূহ ব্যাখ্যা করেছেন।[9]‘মুরুজ আয-যাহাব, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫, পৃ. ৯।
বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক আবু যাইদ আহমদ বিন সাহল আল-বালখী (৮৫০-৯৩৪ খ্রি.) ভারতীয়, চৈনিক এবং গ্রিক দর্শনেও পারদর্শী ছিলেন। তিনি খোরাসানের বাল্খ থেকে ইরাকে সফর করেন এবং সেখানে আট বছর অতিবাহিত করে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় অধ্যয়ন করেন। তাঁর শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন বিখ্যাত দার্শনিক আবু ইউসুফ আল-কিন্দি (৮০১-৮৭৩ খ্রি.)। দর্শনশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি অন্যান্য গ্রিক বিজ্ঞান, যেমন চিকিৎসাবিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যাও অধ্যয়ন করেছিলেন। ইবনে নাদিম তাঁর ‘আল-ফিহরিস্ত’ (পৃ. ১৭০) গ্রন্থে তাঁর লেখা ৪৩টি বইয়ের তালিকা দিয়েছেন এবং ইয়াকুত আল-হামাভী তাঁর ‘মুজামুল উদাবা’ (খ. ১, পৃ. ২৭৯-২৮০) গ্রন্থে ৫৬টি বইয়ের তালিকা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু কালের আবর্তে এবং মঙ্গোল আক্রমণের মতো দুর্যোগে তাঁর বেশিরভাগ রচনাই হারিয়ে গেছে। তাঁর রচিত ‘কিতাব আল-বাদয়ি ওয়া আত-তারীখ’ (كِتَابُ الْبَدْءِ وَالتَّارِيخِ) গ্রন্থটি তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং বিপুল তথ্যের আধার।
মুসলিম দার্শনিকগণ একদম শুরু থেকেই ডেমোক্রিটাসের (৪৬০-৩৭০ খ্রি. পূ.) ‘অবিভাজ্য পরমাণু’ (Indivisible Atom) তত্ত্বের সাথে পরিচিত ছিলেন। অবিভাজ্য পরমাণু হলো এমন একটি ক্ষুদ্রতম কণা, যাকে আর কোনোভাবেই ভাগ করা বা ভাঙা সম্ভব নয়। এটি পদার্থের সেই শেষ সীমা যার পরে আর কোনো বিভাজন চলে না। ‘Atom’ শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘Atomos’ থেকে। ‘A’ অর্থ ‘না’। ‘Tomos’ অর্থ ‘কাটা’ বা ‘ভাগ করা’। অর্থাৎ, যা আর কাটা যায় না বা ভাগ করা যায় না। খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীতে গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এ তত্ত্বটিকে জনপ্রিয় করে তোলেন।
অ্যারিস্টটল এই পরমাণুবাদে বিশ্বাস করতেন না। তিনি মনে করতেন, পদার্থকে অনন্তকাল ধরে ভাগ করা সম্ভব (Infinite Divisibility)। মধ্যযুগের মুসলিম দার্শনিকদের একটি বড় অংশ অ্যারিস্টটলের এই ধারণার বিরোধিতা করে ডেমোক্রিটাসের ‘অবিভাজ্য পরমাণু’ তত্ত্বটি গ্রহণ করেছিলেন। মুসলিম ধর্মতত্ত্ব বা কালামশাস্ত্রে এই তত্ত্বের বেশ গুরুত্ব রয়েছে। মুসলিম পণ্ডিতরা (বিশেষ করে মুতাযিলা এবং আশআরি সম্প্রদায়) এই অবিভাজ্য কণা বা ‘আল-জুয্অু আল্লাযি লা ইয়াতাজায্যা’ (الْجُزْءُ الَّذِي لَا يَتَجَزَّأُ) তত্ত্বটিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিতেন। তাঁদের যুক্তি ছিল এই যে, যদি পদার্থকে অনন্তকাল ধরে ভাগ করা যেত, তবে আল্লাহর সৃষ্টিতত্ত্ব ব্যাখ্যা করা কঠিন হত। তাঁরা বিশ্বাস করতেন, আল্লাহ এই ক্ষুদ্রতম কণাগুলো সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি ইচ্ছা করলেই এগুলোকে একত্রে জুড়ে দিয়ে কোনো বস্তু তৈরি করেন অথবা বিচ্ছিন্ন করে ধ্বংস করেন। সহজ উদাহরণ: মনে করুন একটি স্বর্ণের টুকরোকে আপনি দুই ভাগ করলেন, তারপর চার ভাগ, তারপর আট ভাগ… এভাবে করতে করতে এমন এক পর্যায়ে পৌঁছলেন যখন আপনার কাছে স্বর্ণের এমন একটি কণা থাকল যাকে আর কোনোভাবেই ভাগ করা সম্ভব নয়। প্রাচীন দর্শনে সেই কণাটিই হল Indivisible Atom বা অবিভ্যাজ পরমাণু।[10]আধুনিক বিজ্ঞানে আমরা জানি যে, পরমাণুকে (অঃড়স) ভাঙা সম্ভব (ইলেকট্রন, প্রোটন, … Continue reading
এ কারণেই মুসলিম দার্শনিকগণ অ্যারিস্টটলের ‘আদি বস্তু’ (Primitive Matter) তত্ত্বটি প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্রিটাসের তত্ত্ব গ্রহণ করেন এবং এর পক্ষে জোরালো সমর্থন দেন। তাঁরা প্লেটোর ‘প্রোটোটাইপ’ বা ‘আদর্শ রূপতত্ত্বের’ (Theory of Forms/Ideas) প্রতিও সহানুভূতিশীল ছিলেন এবং তাঁদের রচনাবলিতে এটি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এই তত্ত্বের উপর ভিত্তি করেই নকশবন্দিয়া-মুজাদ্দিদিয়া তরীকার সুফিগণ ‘আলমে মিসাল’ বা ‘প্রতিম জগতের’ (World of Prototypes) ধারণাটি গ্রহণ করেছিলেন।
হিজরি চতুর্থ শতাব্দীতে প্লেটোর বইগুলো মুসলিম বিশ্বে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। আল-ফারাবি তাঁর ‘আল-জামউ বায়নাল রা‘য়াই আল-হাকীমাইন’ (الْجَمْعُ بَيْنَ رَأْيَيِ الْحَكِيمَيْنِ) পুস্তিকায়[11]الْجَمْعُ بَيْنَ رَأْيَيِ الْحَكِيمَيْنِ أَفْلَاطُونَ الإِلٰهِيِّ وَأَرِسْطُوطَالِيسَ: আবু নাসর … Continue reading লিখেছেন যে, তাঁর এই রচনার উদ্দেশ্য হলো প্লেটো এবং অ্যারিস্টটলের পাঠকদের মন থেকে সন্দেহ দূর করা।
আল-ফারাবির উপর্যুক্ত বইটির মূল ভিত্তি বা অনুপ্রেরণা ছিল এই অ্যামোনিয়াস হারমিয়ার মতো নব্য প্লেটোবাদীদের চিন্তাধারা। তাঁরাই প্রথম দাবি করেছিলেন যে, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল পরস্পরবিরোধী নন। অ্যামোনিয়াস হারমিয়া (৪৪০-৫১৭/৫২৫ খ্রি.) ছিলেন নব্য প্লেটোবাদী দর্শনের একজন প্রভাবশালী শিক্ষক এবং ভাষ্যকার। তিনি মনে করতেন যে, গ্রিক দর্শনের এই দুই মহারথী আসলে একই সত্যের কথা বলছেন, কেবল বলার ভঙ্গি ভিন্ন।
অ্যামোনিয়াস হারমিয়া অ্যারিস্টটলের রচনাবলির উপর যে সব ভাষ্য বা ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন তার অধিকাংশই আরবি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল। এগুলোর মধ্যে আছে আল-মাকুলাত (Categories), আল-বুরহান (Prior Analytics) ও আল-ইবারাহ (On Interpretation)। ইবনে নাদিম তাঁর ‘আল-ফিহরিস্ত’-এ অ্যামোনিয়াসের কয়েকটি কাজের তালিকা দিয়েছেন, যা তখনকার গ্রন্থাগারগুলোতে পাওয়া যেত। যেমন অ্যারিস্টটলের ‘আর্গানন’ (যুক্তিবিদ্যা)-এর বিভিন্ন অংশের উপর ভাষ্য এবং পরমাণুবাদ ও বিশ্ব-সৃষ্টিতত্ত্বের উপর কিছু ক্ষুদ্র পুস্তিকা। যুক্তিবিদ্যার প্রাথমিক পাঠ হিসেবে গ্রিক দার্শনিক পর্ফিরি (২৩৪-৩০৫ খ্রি.) ‘ইসাগোজি’ (Porphyry’s Isagoge) লিখেছিলেন। এর উপর অ্যামোনিয়াসের করা ব্যাখ্যাটি আরবিতে ‘শরহ ইসাগোজি’ নামে বেশ জনপ্রিয় ছিল। আরব দার্শনিকেরা আলাদাভাবে ইসাগোজির অনুবাদ ও বিভিন্ন ব্যাখ্যা রচনা করেছিলেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আসিরুদ্দীন আল-আবহারী (১২০০-১২৬৪ খ্রি.) কর্তৃক ইসাগোজির অনুবাদ ও ব্যাখ্যা।
ফারাবি নিজেই গ্রিক দর্শনের বিভিন্ন ঘরানার উপর একটি পুস্তিকা লিখেছিলেন, তাতে তিনি সেগুলোর নাম, তত্ত্ব এবং মতামতসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন। পুস্তিকাটি তাঁর অন্যান্য রচনার সাথে ১৮৯০ সালে লেইডেন থেকে প্রকাশিত হয় এবং এটি সেই সিরিজের চতুর্থ খণ্ড। এতে তিনি পিথাগোরাস ও অ্যারিস্টোফেনিনের দার্শনিক ঘরানা, ফোরেনের স্টোইক মতবাদ, ডায়োজিনিসের সিনিক মতবাদ, এপিকিউরিয়ান মতবাদ এবং অ্যারিস্টটলের দর্শনপদ্ধতি ব্যাখ্যা করেছেন। পুস্তিকাটির নাম رِسَالَةٌ فِي مَا يَنْبَغِي أَنْ يُقَدَّمَ قَبْلَ تَعَلُّمِ الْفَلْسَفَةِ (What Should Be Learnt Before Attempting Philosophy)।
জার্মান পণ্ডিত ফ্রিডরিখ ডিয়েটেরিসি (Friedrich Dieterici) ১৮৯০ সালে নেদারল্যান্ডসের লেইডেন থেকে আল-ফারাবির ৯টি গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক প্রবন্ধ ও পুস্তিকা একত্রে প্রকাশ করেন। এই সংকলনটি Al-Farabi’s Philosophische Abhandlungen (আল-ফারাবির দার্শনিক প্রবন্ধসমূহ) নামে পরিচিত। এটির আরবী নাম الثَّمَرَةُ الْمَرْضِيَّةُ فِي بَعْضِ الرَّسَائِلِ الْفَارَابِيَّةِ। এই সংকলনের প্রথম পুস্তিকার নাম الْجَمْعُ بَيْنَ رَأْيَيِ الْحَكِيمَيْنِ أَفْلَاطُونَ الإِلٰهِيِّ وَأَرِسْطُوطَالِيسَ। ১৮৯০ সালে মুদ্রিত এই আরবী সংস্করণটি মুসলিম দর্শনের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। কারণ এটিই প্রথমবার পশ্চিমা বিশ্বে আল-ফারাবির মূল আরবী কাজগুলোকে যথার্থরূপে উপস্থাপিত করেছিল। ১৮৯২ সালে ডিয়েটেরিসি এগুলোর জার্মান অনুবাদও প্রকাশ করেন।
আবু রায়হান আল-বিরুনী (৯৭৩-১০৪৮ খ্রি.) কেবল গ্রিক দর্শনেই নয়, বরং ভারতীয় ও পারসিক দর্শনেও সমানভাবে পণ্ডিত ছিলেন। তাঁর রচিত ‘আল-আসারুল বাকিয়া’ এবং অন্যান্য অনেক বই তাঁর এই বিশাল পাণ্ডিত্যের সাক্ষ্য বহন করে। বিশেষ করে তাঁর ‘কিতাব আল-হিন্দ’ গ্রন্থটি ভারতীয় দর্শন সম্পর্কে তাঁর গভীর জ্ঞানের এক জীবন্ত প্রমাণ।
কাজী জামালুদ্দীন কিফতী (১১৭২-১২৪৮ খ্রি.) ছিলেন বিখ্যাত ভূগোলবিদ ইয়াকুত আল-হামাভীর পৃষ্ঠপোষক। তিনিও গ্রিক দর্শনের সকল ঘরানার মতামত সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত ছিলেন। তিনি তাঁর ‘আখবারুল উলামা বি-আখবারিল হুকামা’ গ্রন্থে গ্রিক দার্শনিকদের জীবনী ও তত্ত্বসমূহ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
আবুল ফজল (১৫৫১-১৬০২ খ্রি.) তাঁর ‘আইন-ই-আকবরি’-তে হিন্দু দর্শন সম্পর্কে যা কিছু লিখেছেন, তা থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে, তিনি হিন্দু দর্শনের ছয়টি ঘরানা (ষড়্দর্শন) সম্পর্কেও সম্যক পরিচিত ছিলেন।
গ্রিক দর্শনের বিরুদ্ধে যিনি এককভাবে লড়াই করেছেন তিনি ইবনে তাইমিয়া। তিনি একজন ধর্মতত্ত্ববিদ হওয়া সত্ত্বেও দর্শনের মায়াজাল ও মন্ত্রপুরী থেকে অক্ষত অবস্থায় বেরিয়ে আসতে পেরেছিলেন। তাঁর সমস্ত রচনা দর্শনের তিক্ত নিন্দায় পরিপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও তিনি নিজে একজন মহান দার্শনিক ছিলেন। তিনি তাঁর কিতাব ‘আল-আকল ওয়া আন-নাকল’ গ্রন্থে দার্শনিকদের বিভ্রান্তি ও বিস্ময়কে অত্যন্ত চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা খণ্ডন করে ‘আর-রাদ্দু আলাল মানতিকিয়্যীন’ নামে পূর্ণাঙ্গ গ্রন্থ রচনা করেছেন। এতে তিনি অ্যারিস্টটলের ‘সিলোজিসম’ (Syllogism) বা অবরোহী যুক্তিবিদ্যার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি দাবি করেন যে, অ্যারিস্টটলের যুক্তিবিদ্যা মানুষকে নতুন কোনো জ্ঞান দিতে পারে না, তা কেবল জানা জিনিসেরই পুনরাবৃত্তি করে। এ গ্রন্থটি পাঠ করলে পাঠকের মনে এ ধারণাই জন্মে যে, বাস্তবে তিনিই ছিলেন জন স্টুয়ার্ট মিলের যুক্তিবিদ্যার প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা এবং ডেভিড হিউমের দর্শনের অগ্রদূত। ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ দার্শনিকজন স্টুয়ার্ট মিল যে আরোহী পদ্ধতি (Inductive Logic) জনপ্রিয় করেছিলেন এবং ডেভিড হিউম যে সংশয়বাদ ও কার্যকারণ সম্পর্ক (Causality) নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, ইবনে তাইমিয়ার যুক্তিবিদ্যার খণ্ডনে তার অনেক নমুনা কয়েকশ বছর আগেই পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র:
| ↑1 | Averroes et l’averroïsme (Averroes and Averroism), ১৮৫২. |
|---|---|
| ↑2 | ইবনে আবী উসাইবিয়া, উয়ূনুল আনবা ফী তাবাকাতিল আতিব্বা, দারু মাকতাবাতিল হায়াত, বৈরুত, তা. বি., পৃ. ৬১; সায়িদ আল-আন্দালুসী, তাবাকাতুল উমাম, (الْمَطْبَعَةُ الْكَاثُولِيكِيَّةُ لِلْآبَاءِ الْيَسُوعِيِّينَ) বৈরুত, ১৯১২, পৃ. ২২। |
| ↑3 | তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ২১। |
| ↑4 | জামালুদ্দীন আল-কিতফী, ইখবারুল উলামা বিআখবারিল হুকামা, লেবানন, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, ২০০৫, পৃ. ১৯। |
| ↑5 | তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ২৩। |
| ↑6 | তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৩৩। |
| ↑7 | তাবাকাতুল উমাম, পৃ. ৭৬। |
| ↑8 | প্রাগুক্ত। |
| ↑9 | ‘মুরুজ আয-যাহাব, আল-মাকতাবাতুল আসরিয়্যাহ, বৈরুত, ২০০৫, পৃ. ৯। |
| ↑10 | আধুনিক বিজ্ঞানে আমরা জানি যে, পরমাণুকে (অঃড়স) ভাঙা সম্ভব (ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন)। এমনকি এগুলোর ভেতরেও কোয়ার্ক (ছঁধৎশ) নামক কণা আছে। কিন্তু প্রাচীনকালে ‘ওহফরারংরনষব অঃড়স’ বলতে পদার্থের সেই কাল্পনিক একককে বোঝানো হত, যা ছিল সবকিছুর মূল ভিত্তি। |
| ↑11 | الْجَمْعُ بَيْنَ رَأْيَيِ الْحَكِيمَيْنِ أَفْلَاطُونَ الإِلٰهِيِّ وَأَرِسْطُوطَالِيسَ: আবু নাসর মুহাম্মদ আল-ফারাবীর রচনাবলির মধ্যে ‘আল-জামউ বাইনা রা‘য়াই আল-হাকীমাইন: আফলাতুন ওয়া আরিসতুতালিস’ (দুই মহাজ্ঞানী—প্লেটো ও অ্যারিস্টটলের দর্শনের মধ্যে সমন্বয়) পুস্তিকাটি ইসলামি দর্শনের ইতিহাসে বিশেষ গুরুত্বের অধিকারী। লেখক গ্রিক দর্শন কতটা আত্মস্থ করেছিলেন, সে সম্পর্কে তাঁর বোঝাপড়ার গভীরতা কতটুকু ছিল, তাঁদের দর্শনের প্রতি তাঁর অবস্থান কী ছিল এবং কেন তিনি সেই অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, এসবের প্রতি তিনি এতে আলোকপাত করেছেন।
আল-ফারাবী এ পুস্তিকাটি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত ‘আরাউ আহলিল মাদীনাতিল ফাদিলাহ’ (آرَاءُ أَهْلِ الْمَدِينَةِ الْفَاضِلَةِ وَمُضَادَّاتُهَا/আদর্শ নগরের অধিবাসীদের মতামত এবং তার বিরুদ্ধ মতসমূহ) এবং ‘আস-সিয়াসাতুল মাদানিয়্যাহ’ (السِّيَاسَةُ الْمَدَنِيَّةُ /রাষ্ট্রনীতি) পুস্তিকা দুটি রচনার আগে; এই পুস্তিকা দুটি তিনি তাঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে রচনা করেছিলেন। তবে তিনি এ পুস্তিকাটির প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিলেন তাঁর পূর্ববর্তী বই ‘তাহসীল আস-সাআদাহ’ (تَحْصِيلُ السَّعَادَةِ /সুখ অর্জন)-এর মাধ্যমে। এর প্রমাণ মেলে ‘তাহসীল আস-সাআদাহ’ বইয়ের শেষে, যেখানে তিনি গ্রিক দার্শনিক প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল সম্পর্কে আলোচনার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। মনে হয়, এ পুস্তিকাটি (আল-জামউ বাইনা রা‘য়াই আল-হাকীমাইন) ‘তাহসীল আস-সাআদাহ’ বইয়ের একটি পরিশিষ্ট বা সমাপ্তি অথবা ‘তাহসীল আস-সাআদাহ’ বইটি এ পুস্তিকাটির একটি ভূমিকামাত্র। আল-ফারাবী মনে করতেন যে, সত্য এক এবং অভিন্ন। তাই যদি প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল উভয়েই সত্যসন্ধানী হয়ে থাকেন, তবে তাঁদের দর্শনের মধ্যে মৌলিক কোনো বিরোধ থাকতে পারে না। তিনি এই পুস্তিকায় তাঁদের আপাতবিরোধী মতবাদগুলোর মধ্যে একটি তাত্ত্বিক মিল খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন এবং দেখিয়েছেন যে, প্রকৃতপক্ষে তাঁদের দুইজনের মধ্যে পার্থক্যের পরিমাণ ছিল অতি সামান্য। |