প্রিয় মুস্তাফা,
আমি তোমার চিঠি পেয়েছি। তুমি লিখেছ, স্যাক্রামেন্টোতে থাকার সব ব্যবস্থা করেছ। আমি চাইলে তোমার সঙ্গে থাকতে পারি। খবর পেয়েছি, ক্যালিফোর্নিয়ার ইউনিভার্সিটিতে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে ভর্তির সুযোগও হয়েছে। আমার জন্য অনেক কিছু করেছ। ধন্যবাদ, বন্ধু।
কিন্তু আমার ভাবনা বদলে গেছে। তোমার ওখানে যাব না। এখানেই থাকব। কখনোই ছেড়ে যাব না।
হ্যাঁ, আমি কষ্ট পাচ্ছি। কারণ আমাদের জীবন একই পথে চলবে না। তুমি মনে করিয়ে দিচ্ছ, আমরা একসঙ্গে চলার শপথ নিয়েছিলাম। চিৎকার করে বলতাম, ‘আমরা অনেক ধনী হব!’
কিন্তু আমি যেতে পারছি না বন্ধু।
আমার সেই দিনের কথা মনে পড়ে। যেদিন কায়রো বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে তোমার হাত চেপে ধরে বিদায় দিচ্ছিলাম। আমার পৃথিবীটা তখন ঘুরছিল। কিন্তু তুমি স্থির দাঁড়িয়ে ছিলে, শান্তভাবে।
তুমি বলেছিলে, ‘প্লেন যাওয়ার পনের মিনিট বাকি। এবার বাড়িতে যাও। আগামী বছর তুমি কুয়েতে যাবে, বেতন জমাবে, তারপর ক্যালিফোর্নিয়ায় যাবে। আমরা একসঙ্গে শুরু করেছি। একসঙ্গে চলব…’
আমি তোমার কথা শুনছিলাম। বুঝতে পারছিলাম, তুমি খুশি ছিলে না। আমিও কষ্ট পাচ্ছিলাম। কিন্তু আমরা কেন গাজা ছেড়ে পালাব? তুমি এর তিনটা কারণ বলতে পারবে?
তোমার অবস্থা ধীরে ধীরে ভালো হচ্ছিল। কুয়েতের শিক্ষামন্ত্রণালয় তোমাকে চাকরি দিল, আমাকে দেয়নি। তুমি আমাকে অল্প অল্প টাকা পাঠিয়েছিলে। সেগুলো নিতে আমার খারাপ লাগবে, তাই তুমি চেয়েছিলে, আমি যেন ঋণ মনে করি। তুমি জানো আমার পরিবার কেমন, মা, ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী আর তার চার সন্তান। এই পরিবার চালানোর জন্য আমার বেতন যথেষ্ট ছিল না।
তুমি বলেছিলে, ‘সাবধানে লিখো। প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টা, প্রতি মিনিট! প্লেন ছাড়ছে। বিদায়! আবার দেখা হবে।’
তোমার শীতল ঠোঁটের ছোঁয়া আমার গালে লেগেছিল। আমার চোখে তুমি অশ্রু দেখেছিলে।
পরে কুয়েতে আমার চাকরি হলো। কিন্তু আমার জীবন কষ্টের ছিল। একা ও একঘেঁয়ে। সময় যেন কাটতে চাইত না।
সে বছর ইহুদিরা গাজায় হামলা চালাল। চারদিকে বোমা ও আগুন। গাজার মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাতে শুরু করে। তখন আমিও রুটিন বদলানোর চিন্তা করি। গাজা ছেড়ে ক্যালিফোর্নিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমি নিজের জন্য বাঁচব। তখন আমি গাজা ও তার বাসিন্দাদের ভালোবাসতাম না। সবকিছু ব্যর্থ মনে হচ্ছিল।
সেখান থেকে মা, ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী ও তার সন্তানদের সামান্য টাকা পাঠাব। কিন্তু নিজেকে মুক্ত করব। আমাকে পালাতে হবে।
তুমি এই অনুভূতি জানো, মুস্তাফা। তারপরও আমি গাজা ছেড়ে দিতে পারিনি। কেন পারিনি জানো?
জুনে ছুটি নিলাম। সব জিনিস জড়ো করলাম। এখান চলে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত। তার আগে গাজাতে এলাম। আগের মতোই আছে। ক্ষীণ, ছোট। সংকীর্ণ রাস্তা, ছোট ছোট কক্ষ।
কিন্তু সত্যি কথা কী জানো? মানুষ তার পরিবার ও স্মৃতির কাছ থেকে দূরে যেতে পারে না। আমি মায়ের কাছে গেলাম। ভাইয়ের বিধবা স্ত্রী চেয়েছিল, নাদিয়াকে যেন একবার দেখে যাই। তারা আমার কাছ থেকে কিছু গোপন করলেন। কারণ আমি নাদিয়াকে অনেক ভালোবাসতাম। অনেক স্নেহ করতাম।
তুমি নাদিয়াকে চেনো, আমার ভাইয়ের তেরো বছরের ফুটফুটে মেয়ে।
হাসপাতালে গিয়ে দেখলাম নাদিয়া বিছানায় শুয়ে আছে। বড় বালিশে মাথা রাখা। চুল ছড়ানো। চোখ বড় করে আছে। তাকে দেখে বোঝা যাচ্ছিল, কষ্ট পাচ্ছে। সে শিশু, কিন্তু সেই মুহূর্তে অনেক বড় মনে হলো।
আমি বললাম, ‘নাদিয়া!’
সে চোখ উঁচু করল। আমার দিকে তাকাল। চোখে অশ্রু। ও বলল, ‘চাচা, তুমি কুয়েত থেকে এসেছ?’
আমি তার হাত ধরে পাশে বসলাম।
আবার বললাম, ‘নাদিয়া! আমি কুয়েত থেকে তোমার জন্য উপহার এনেছি। তুমি সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে যাবে। তুমি লাল প্যান্ট চেয়েছিলে, আমি এনেছি।’
নাদিয়া কেঁপে উঠল। মাথাটা নিচু করল। আমি তার হাত ধরলাম। নাদিয়ার হাত ভিজে গেছে। সে কাঁদছে।
আমি বললাম, ‘কিছু বলো, নাদিয়া! তুমি লাল প্যান্ট নেবে না?’
সে আমার দিকে তাকাল। তার চোখের ভাষায় মায়া। তারপর কিছুক্ষণ চুপ। কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘চাচা!’
এই বলে সে পায়ের দিকে হাত বাড়াল। সাদা চাদর তুলে পা দেখাল। তার পা কেটে ফেলা হয়েছে! সে আর কোনোদিন ফুল প্যান্ট পরতে পারবে না।
বন্ধু… আমি নাদিয়ার কথা কখনো ভুলব না। তার মুখের অভিব্যক্তি ভুলব না। আমি হাসপাতাল থেকে বের হলাম। আমার হাতে দু পাউন্ড আপেল। চিরচেনা গাজাকে নতুন মনে হলো, মুস্তাফা! আমরা কখনো এভাবে দেখিনি।
আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম। নাদিয়ার পা কেটে ফেলা হয়েছে। কারণ সে তার ছোট ভাই-বোনকে ইহুদিদের বোমা থেকে রক্ষা করেছে। সে নিজেকে রক্ষা করতে পারত। কিন্তু করেনি।
কেন করেনি জানো? নিজের ভাই-বোনকে বাঁচাতে!
না, বন্ধু, আমি স্যাক্রামেন্টো আসব না। কোনো অনুশোচনা নেই। শৈশবে আমরা যা শুরু করেছি, তা শেষ করব না। এই অনুভূতি তোমার মধ্যেও জেগে উঠুক। নিজেকে খুঁজে পাওয়ার চেষ্টা করো। এখানে, এই ধ্বংসাবশেষের মধ্যে নিজের অস্তিত্ব খুঁজে নিতে চাই।
আমি আসব না। কিন্তু তুমি ফিরে এসো! নাদিয়ার কেটে ফেলা পা থেকে শেখো, জীবন কী এবং অস্তিত্বের মূল্য কত।
ফিরে এসো, বন্ধু! আমরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
চিঠির অনুবাদটা আগে কোনো এক দৈনিক পত্রিকায় পড়েছিলাম। আজ আবার পড়লাম— সম্ভবত আমাদের এসব পড়া ছাড়া খুব বেশি কিছু করার নেই!