এই যে আপনি কবরের ভেতর সোজা আর লম্বা হয়ে শুয়ে পঁচে যাচ্ছেন, শরীরে সাদা সাদা পোকা জন্ম নিয়ে আপনাকে ভেতর থেকে খাচ্ছে, সেই পোকারা কি জানে আপনি কেন মারা গেলেন বা কীভাবে মারা গেলেন? আপনি নিজে জানেন? জানলে ভালো, না জানলেও অসুবিধা নেই। আমার হঠাৎ মনে হলো আপনাকে, আপনার কবরকে, কবর ঘিরে থাকা দামি দামি মার্বেল পাথর, ইট সিমেন্ট, কবরের চারপাশের ছোট ছোট ঘাস, আপনার ক্রমশ পঁচতে থাকা দেহের ভেতরের সেই সাদা সাদা পোকা—তাদেরকে আমি জানাই এসব। এসব জানানোর কথা ছিল আমার একমাত্র প্রেমিকা ম্রুনাকে, কারণ আমি তাকে সবই বলি, কিন্তু তাকে যে কোথায় পাই সেটাই বুঝতে পারছি না। বুঝতে পারছি না বলতে আসলে মনে করতে পারছি না। এই যে ম্রুনা এটা কিন্তু তার আসল নাম নয়। আসল নাম ভুলে গিয়েছি। দুয়েকদিন হলো তাকে আমি এই ম্রুনা নাম দিয়েছি। এরকম অনেক কিছুই মনে করতে পারি না আজকাল। এই যে আজ এখানে আপনার কবরের সামনে বসে আছি, এই ধবধবে সাদা মার্বেল পাথরের সমাধি খুঁজে বের করতে আমার অনেক বেগ পেতে হয়েছে। আমি কিছুতেই মনে করতে পারছিলাম না কীভাবে এখানে আসতে হয়। মাঝে মাঝে মগজ আর মন দুইই খুব হালকা লাগে, মনে হয় এই দুইটাই খালি। আমি জানি, আর কয়েকটা দিন গেলে হয়তো আমি ভুলেই যাব কে আপনি, কেন আপনাকে এরকম করে মরে যেতে হলো। অবশ্য এসব ভুলে গেলেও খুব একটা সমস্যা নেই। কিন্তু আমি চাই আপনার শরীরের শেষ কণাটাও যেন কারও না কারও কাছ থেকে এসব কথা শুনতেই থাকে। তাই, সবটুকু বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যাওয়ার আগে আপনার শরীরের সবগুলো হাঁড়, পঁচতে থাকা সব কোষ, ওই সাদা সাদা পোকা, কবরের ভেতর থেকে আসা স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধ এবং আরও আরও যা কিছু আছে তাদের সাক্ষী রেখে সবটা বলতে চাই। আচ্ছা, কবরের এই স্যাঁতসেঁতে গন্ধটা কি আপনি পাচ্ছেন?
প্রথমেই আপনার বা এখানে যারা যারা আমার সম্মানিত ও গুরুত্বপূর্ণ শ্রোতা, তাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে যে আমি আপনাকে পেলাম কী করে। এই প্রশ্নটা আসা স্বাভাবিক। আমিও স্বাভাবিকভাবেই সব খুলে বলব। আসলে জীবনে এত সাসপেন্স, ক্লাইম্যাক্স, অ্যান্টি-ক্লাইম্যাক্স করে কী লাভ? শুধুই সময় নষ্ট। যাই হোক, শুরুতে একটা ভূমিকা দেই। ভূমিকা হলো আমার নিজের কথা আরকি। আমি তো ধরেন যে খুব সোজা আর সরল একজন লোক। আপনি যেমন সোজা একটা সরলরেখার মতো হয়ে কবরে শুয়ে আছেন সেরকম। আপনার কথা আমার মনেও ছিল না। স্পেকট্রাম কর্পের বিজনেস ডেভেলপমেন্ট অফিসার হয়ে মাস শেষে কিছু টাকা পেয়ে কোনো রকমে দিন পার করছিলাম। আমি কতটা বোকা যে, এআইয়ের স্বর্ণযুগে এসেও ভাবতাম এই ডেস্ক জবটা বুঝি ধ্রুব সত্য। কিন্তু এই এআই যুগ খুবই নিষ্ঠুর। একদিন ছিল মঙ্গলবার, সেই মঙ্গলবার সকালে যখন অফিসে ঢুকলাম, আমার কফিটাও তখন শেষ হয়নি, ঠিক তখনই আমার সামনে থাকা কম্পিউটার স্ক্রিনে একটা লাল ডট ফুটে উঠল। মাত্র এক সেকেন্ডের ব্যবধানে আমার এক্সেস মুছে গেল। কোনো ব্যাখ্যা নেই, কোনো ফরমাল বিদায় নেই। মোবাইলে একটা মেসেজ এলো শুধু যে আমার সার্ভিস আর ‘অপ্টিমাইজড’ নয়। চুপচাপ বের হয়ে এলাম। এমন অবস্থায় কিছু করারও নেই বের হয়ে আসা ছাড়া। কিছু জমানো টাকা ছিল যা দিয়ে কোনো রকমে এক মাস পার করলাম। এরপর আর চলে না। একেবারে দিশেহারা অবস্থা। এখানে সেখানে সমানে সিভি ড্রপ করছি আর রিজেক্টেড হচ্ছি। আমার তেমন কোনো বিষয়ে দক্ষতা না থাকায় কোনো জায়গা থেকেই আমাকে ডাকে না। এআই বিষয়ে অল্পস্বল্প জানি কিন্তু তাও বেসিক লেভেল যা দিয়ে কোনো কাজই হবে না। এরমধ্যে একদিন একটা মেসেজ এলো ডুটক অ্যাপে। মেসেজটা এরকম ‘আপনি কি মাত্র এক মিনিটে ১০ ডলার আয় করতে চান? তাহলে এখনই নিচের লিংকে ক্লিক করুন’। এগুলো তো আসলে সবসময়ই স্ক্যাম হয়। কয়েকবার আমি এসব ফাঁদে ধরাও খেয়েছিলাম। তাই ইগনোর করে গেলাম। কিন্তু টানা কয়েকদিন এই মেসেজ আসতেই থাকল। দিনে তিনবার, চারবার এমনকি পাঁচবারও। আমার পকেট তখন প্রায় শূন্য। একদিন লিংকে ক্লিক করলাম। সাথে সাথে মোবাইল স্ক্রিনে ভেসে উঠলো, ‘আমাদের গ্রাহকেরা এখন আর এআই জেনারেটেড স্বপ্নের স্ট্রিমিং দেখতে চায় না। তাই আমরা হিউম্যান ড্রিম আর্কিটেক্ট নিতে চাই। আপনি যদি মনে করেন যে আপনার প্রখর স্মৃতিশক্তি এবং প্রবল সৃজনশীলতা আছে তাহলে আপনার জন্য আছে প্রতি মিনিটে নিশ্চিত দশ ডলার পর্যন্ত আয় করার সুযোগ’। আমি সাথে সাথে তাদের ওয়েবসাইটে ঢুকে রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম জেনে নিলাম। খুবই সহজ নিয়ম। NeuroSync 4.5 নামে একটা অ্যাপ ডাউনলোড করে ড্রিম আর্কিটেক্ট হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে। রেজিস্ট্রেশন কমপ্লিট করতেই একটা নোটিফিকেশন এলো, ‘আপনি কি আপনার রেটিনা স্ক্যান করে দেখতে চান আপনি ড্রিম আর্কিটেক্ট হওয়ার উপযুক্ত কি না?’ আমি হ্যাঁ তে চাপ দিলাম। মুহূর্তেই আরেকটা নোটিফিকেশন এলো, ‘অভিনন্দন, আপনার রেটিনা স্ক্যান করে আমরা আপনার মেমোরি এন্ড ক্রিয়েটিভ ইনডেক্স ‘এ’ ক্যাটাগরির পেয়েছি। আপনি কি ড্রিম আর্কিটেক্ট হিসেবে যুক্ত হতে চান?’ আমি আবারও হ্যাঁ-তে চাপ দিলাম। সাথে সাথে একটা ফ্রি কোর্স করার জন্য বলা হলো। কোর্স করার পর বুঝলাম ব্যবস্থাটা খুবই সিম্পল। পুরো বিষয়টাই স্মৃতির খেলা, কারণ স্বপ্ন আসে মূলত স্মৃতি থেকে তা হোক সচেতন বা অবচেতন। গ্রাহকের কানে বসানো নিউরাল-পড মস্তিষ্কের ভেতরে থাকা নিউরনগুলোতে থাকা স্টোরেজ রিড করে তার জীবনের সমস্ত গোপন স্মৃতি আর ইতিহাস ড্যাশবোর্ডে তুলে ধরবে। আবার যে আর্কিটেক্ট, তার কানেও একটা নিউরাল পড থাকবে। আর্কিটেক্ট গ্রাহক এবং তার নিজস্ব স্মৃতি থেকে তথ্য মিলিয়ে তা ফিল্টার করে নেবে। এরপর যা পাওয়া যাবে তা আর্কিটেক্ট তার সৃজনশীলতা ব্যবহার করে গ্রাহকের চাহিদা অনুযায়ী সুন্দর একটা লুসিড ড্রিম তৈরি করে দেবে। এখানে ঘুমের কিছু বিষয়-আশয়, আবার মেডিকেল সায়েন্সের কিছু বেসিকস জেনে নিতে হয়েছে। পরদিনই আমাকে এক সেট নিউরাল পড পাঠানো হলো। রাতেই একটা অর্ডার এলো। এক বয়স্ক মহিলা তার মাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে চায়। আমি আবার মায়ের ব্যাপারে খুবই আবেগী। সেই সুবাদে খুব ভালো একটা স্বপ্ন বানিয়ে দিলাম। পাঁচ মিনিটের স্বপ্ন। একাউন্টে ৫০ ডলার জমা হলো। পরদিন সকালে উঠে দেখি অনেকগুলো নোটিফিকেশন। ওই মহিলা খুব ভালো রেটিং আর রিভিউ দেয়ায় বেশ কিছু অর্ডার এসেছে। আমি অল্প কয়টা গ্রহণ করতে পারলাম। সব গ্রাহকের প্রোফাইল আবার সব আর্কিটেক্টের সাথে মিলে না। তাই চাইলেও অনেক অর্ডার গ্রহণ করা যায় না। যেগুলো গ্রহণ করলাম, সেই স্বপ্নগুলোও বেশ ভালো করে বানিয়ে দিই। এরপর কয়েকদিনের ভেতরে খুব দ্রুতই আমি টপ টেন ড্রিম আর্কিটেক্টদের মধ্যে চলে এলাম।
আমি আসলে এত বিখ্যাত হয়ে যাচ্ছিলাম সময়ের কারণে। সময়ই আসলে ঠিক করে দেয় কে কখন কোথায় থাকবে। যেমন, এখানে এই সময় জগতের সবার দিনগুলোকে ধূসর করে দিচ্ছিল। মানুষের শরীর টিকে থাকলেও তাদের আত্মাগুলো যেন শুকিয়ে ফেটে যাচ্ছিল। প্রযুক্তির অতিশয় বাড়াবাড়ি আমাদের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কল্পনাশক্তিকে অনেকটা উইপোকার মতো ভেতর থেকে খেয়ে ফেলছিল। মানুষ আর নিজে থেকে স্বপ্ন দেখতে পারত না; কারণ আমাদের অবচেতন মন সারাক্ষণ এআইয়ের অ্যালগরিদম আর ডিজিটাল নোটিফিকেশন গোলকধাঁধায় বন্দি থাকত। যেন এক অদ্ভুত মানসিক খরা নেমে এসেছে পৃথিবীতে। সারাদিন স্ক্রিনের নীল আলো আর নিউরাল চিপের প্রভাবে মানুষের ঘুমের সেই REM পর্যায়, যেখানে স্বপ্নের জন্ম হয়, তা পুরোপুরি যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছিল। গভীর ঘুমে ডুব দিলেই মানুষ দেখত কেবল শূন্যতা অথবা ডাটা ক্র্যাশের মতো ভাঙা ভাঙা কিছু অর্থহীন দৃশ্য। এই চরম শূন্যতা থেকেই জন্ম নিল NeuroSync 4.5-এর মতো অ্যাপের চাহিদা। মানুষ চাইলো তাদের এই বন্ধ্যা মগজে কেউ কৃত্রিমভাবে স্বপ্ন বুনে দিক। তারা টাকা দিয়ে আমাদের মতো ড্রিম আর্কিটেক্টদের ভাড়া করতে শুরু করল, যাতে আমরা তাদের মগজের শুকিয়ে যাওয়া ভূমিতে জল ঢেলে কল্পনা আর স্মৃতির সংশ্লেষে স্বপ্নের বীজ বুনে দিই। আমরা ছিলাম তাদের অবচেতন জগতের ভাড়াটে মালি। আর এই সুযোগেই আমি আপনার মতো রাঘববোয়ালদের মগজে ঢোকার পাসওয়ার্ড পেয়ে গেলাম।
NeuroSync 4.5 অ্যাপের ড্যাশবোর্ডে আঙুল চালাতেই আমার চারপাশের জগত হুট করে বদলে গেল। টাকা আসতে শুরু করল স্রোতের মতো, জীবন হয়ে উঠল অসম্ভব রকমের বিলাসবহুল। দামি পারফিউম, সব রকম স্মার্ট গ্যাজেটস, ড্রোন-ট্যাক্সির লাক্সারি আর শহরতলীর সেই হাই-রাইজ অ্যাপার্টমেন্ট সবই আমার হাতের মুঠোয়। সেই সময়ে একদিন রাস্তার উপর পেয়ে গেলাম ম্রুনাকে। ম্রুনার সাথে কাটানো সময়গুলো ছিল ঠিক যেন আমারই তৈরি কোনো নিখুঁত লুসিড ড্রিম। তার হাসিতে কোনো কৃত্রিমতা ছিল না, চোখের মণি দুটো ছিল ঠিক যেন শরতের স্বচ্ছ আকাশ। আমরা যখন ডিনার শেষে শহরের নিয়ন আলোর নিচে হাত ধরে হাঁটতাম, তখন মনে হতো এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে আমরাই শুধু জীবন্ত দুটো মানুষ। আমার এত টাকা হলো যে আমি স্বপ্ন বানানোর কাজ প্রায় ছেড়েই দিলাম। আসলে একঘেয়েমি চলে এসেছিল। আমি আর ম্রুনা ভাবতাম আমরা একটা ছোট্ট পাহাড়ের কোলে ছোট্ট একটা বাড়িতে থাকব, যেখানে কোনো অ্যাপ থাকবে না, কোনো এআই থাকবে না। এসব ভেবে দিন ভালোই যাচ্ছিল। এসবের ভেতর আপনাকে কীভাবে পেলাম বলি। একদিন আমার ড্যাশবোর্ডে একটা নোটিফিকেশন পিং করে উঠল। অ্যাপের হিডেন এক্সটাসি অপশন থেকে এসেছে। পেমেন্ট রেট সাধারণের চেয়ে দ্বিগুণ, মিনিটে ২০ ডলার। ক্লায়েন্টের প্রোফাইল লোড হতেই আমার চট করে মাথা ধরে গেল, মুখের ভেতরটা তিতা হয়ে গেলো আর চোখগুলো যেন পুড়ে গেল আগুনে। দেশের প্রভাবশালী নেতা যার কথায় কোটি মানুষ উঠে বসে তার মাথায় ঢোকার চাবি এখন আমার কাছে! দ্যা ফা..!! আমিতো বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না আমার কাছে এমন একটা সুযোগ আসবে। আপনার নিউরাল-পড তখন মস্তিষ্কে জমা থাকা ডাটা ট্রান্সমিট করতে শুরু করেছে। আমার ড্যাশবোর্ডে আপনার স্মৃতির বাবলগুলো ভাসতে শুরু করেছে।
সেই দিনের সেই স্মৃতিটা এখনও আমার মগজের কোষে কোষে পচন ধরা ঘায়ের মতো দগদগে হয়ে আছে। আপনি ছিলেন আমাদের এলাকার খুব প্রভাবশালী একজন। আপনার বাকি পরিচয় মনে নেই। বললাম না যে অনেক কিছুই মনে নেই। সবাই আপনাকে সম্মান করতো বিনা কারণে। আমরা পেতাম ভয়। আপনার কি মনে পড়ে সেই তপ্ত দুপুরের কথা? আপনি যখন নীরাদির ওপর আপনার লোকজন লেলিয়ে দিয়ে এক পৈশাচিক উল্লাসে মেতেছিলেন। সেখানে আপনি আমাকেও ব্যবহার করেছিলেন। রোজার দিনে নীরাদি আমাকে একটা আইসক্রিম কিনে দিয়েছিল। আপনি কোথা থেকে সেটা দেখলেন আর কয়েকজন নিয়ে এসে এই অপরাধে তাকে বাজেভাবে বকতে লাগলেন আর চড় থাপ্পড় দিতে থাকলেন যে সে কোন কথাই বলতে পারলো না। বলতে থাকলেন সে নাকি বাচ্চাদের ধর্মানুভূতি নষ্ট করছে। আজ NeuroSync 4.5-এর ড্যাশবোর্ডে আপনার মেমোরি আর্কাইভ ঘাঁটতে গিয়ে দেখতে পেলাম সেই মুহূর্তে আপনার মগজের ভেতরে কী চলছিল। আপনার মস্তিষ্কের নিউরনে কেবল ক্ষমতা আর প্রতিশোধের এক আদিম নেশা টগবগ করে ফুটছিল। আপনি ভাবছিলেন, ‘এই মাগির এত সাহস সে আমায় অপমান করে। তার মতো কত মাগি চুষে দেয় আর সে কি না আমায় ফিরিয়ে দেয়!’ আপনার মগজের সেই অন্ধকার গলিতে ঢুকে বুঝতে পারলাম কেন সেদিন নীরাদিকে এভাবে পিটিয়ে মারা হলো। আপনি তার সাথে শুতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনার মতো বদমাশকে সে প্রশ্রয় দেয়নি। এতটুকুর জন্য। দেখতে পেলাম, আপনি যখন তার ছিঁড়ে ফেলা জামার ফাঁক দিয়ে রক্তে ভেজা শুভ্র দেহটা দেখছিলেন, তখন আপনার ভেতরে এক ধরনের আদিম উত্তেজনা কাজ করছিল। সবচেয়ে বড় কথা আপনি ক্ষমতার স্বাদ নিচ্ছিলেন, অনুভব করতে পারছিলেন আপনার আঙুলের ইশারায় কী না হতে পারে। তার সেদিনের আর্তনাদ আপনার কানে কোনো মানুষের কান্না হিসেবে পৌঁছায়নি, পৌঁছেছিল আপনার বিজয়ের রাগ হিসেবে। আপনি যখন উনার বুকের ওপর শেষ লাথিটা মারলেন, আপনার মগজ তখন ডোপামিনে ভাসছিল। আপনি মনে মনে হাসছিলেন আর ভাবছিলেন, ‘এইখানে আমার কথার ওপরে কোনো কথা নেই, আমিই এখানকার খোদা।’ আমি, সেদিনের এইটুকুন একটা বাচ্চা, দূর থেকে ঠায় দাঁড়িয়ে এসব দেখছিলাম, নড়তে পর্যন্ত পারছিলাম না, আমার হাতে ধরে থাকা আইসক্রিমটা গলে গলে রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল।
আমার প্রোফাইলের সাথে এতটা ম্যাচ হয়ে যাওয়া প্রোফাইল আমি সমগ্র ক্যারিয়ারে আর পাইনি। আমার প্ল্যান ছিল ফুলপ্রুফড এবং ক্লিয়ার, আপনার জীবনের সবচেয়ে ভয়াবহ দুঃস্বপ্নটা দেখানো। সুখস্বপ্নের সর্বোচ্চ চূড়ায় তুলে এমন ভাবে ছেড়ে দেয়া, যাতে মুখ দিয়ে আপনার হৃদপিণ্ড বেরিয়ে আসে। NeuroSync 4.5-এর ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী আপনি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, আমি তখন আপনার চাওয়া অনুযায়ী সবকিছু সাজালাম। আপনার চাহিদা ছিলো ওল্ডস্কুল প্যাশনেট এক্সটাসি। আমি তাই করলাম। রাস্তা ধরে যেতে যেতে আপনি দেখলেন একটা নির্জন পুকুর, ঘাটে এক রূপবতী নারী গোসল করছে। আমার কল্পনায় তাকে যতটা যৌনাবেদনময়ী করে তোলা যায় আমি ঠিক তাই করলাম। তাকে দেখে ধীরে ধীরে আপনি নিচে নামলেন। বিভিন্নভাবে প্রলুব্ধ করে নিয়ে গেলেন পাশের এক ভাঙা আর দেয়ালে শ্যাওলাপড়া ঘরে। আপনারা একে অপরকে নিজেদের মতো করে পেতে যাবেন ঠিক ওই মুহূর্তে সেই নারীকে খুঁজতে খুঁজতে ঘরে ঢুকলো তার স্বামী। মুহূর্তেই সেই নারী ভোল পালটে কাঁদতে থাকলো আর বললো আপনি জোর করে এখানে টেনে এনেছেন তাকে। সে আর তার স্বামীর চিৎকারে আশপাশ থেকে মানুষ চলে এলো। এক, দুই বা তিন, চারজন নয়। অনেক মানুষ, অগণিত মানুষ। আমি তৈরি করলাম পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মব, তারপর আপনার ঘুমের REM লক করে দিলাম। ঠিক এই সময়ে সতর্কবার্তা পপ আপ এলো,
[Your contract is going to be breached. This could seriously damage your Memory and Creative Index]
আমি এক পলকে চুক্তিনামাটা পড়ে নিলাম। নিচে ছোট করে লেখা, ‘গ্রাহকের চাহিদার বাইরে গিয়ে কিছু করা যাবে না। যদি করা হয় তাহলে আর্কিটেক্টের মেমোরি ও ক্রিয়েটিভ ইনডেক্স ক্ষতিগ্রস্ত হবে’। আমি এত পাত্তা না দিয়ে আপনার স্বপ্নে মনোযোগ দিলাম। মব আপনাকে উলঙ্গ করে সারা গ্রাম ঘুরাতে লাগলো। তারপর শুরু করলো ধোলাই। সে এক ভীষণ ধোলাই। স্বপ্নের ভেতর আপনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন, আপনার হৃদস্পন্দনের গ্রাফ পাহাড়ের মতো খাড়া হয়ে উঠতে লাগল। আমি তখন স্থির চোখে ড্যাশবোর্ডের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। হুট করেই স্ক্রিনের ডান কোনায় লাল রঙের উইন্ডো পপ-আপ হতে শুরু করল।
[SYSTEM WARNING: NEURAL OVERLOAD DETECTED]
[CLIENT ID: predator_771 | STATUS: REM-LOCKED]
আপনার অবচেতন মনের সেই অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তখন প্রচণ্ড হাহাকার। স্বপ্নের ভেতরেই আপনি ভাবছিলেন, ‘এই নরক কোত্থেকে এলো?’ আপনার সারা শরীর রক্তে ভেসে যাচ্ছিল। শরীরের হাঁড়গোড় ভেঙে যাচ্ছিল। ড্যাশবোর্ডে ভেসে উঠল পরবর্তী সতর্কবার্তা :
[PHYSIOLOGICAL ALERT: HEART RATE 168 BPM – CRITICAL] [ADRENALINE LEVELS: 400% ABOVE NORMAL]
[ACTION REQUIRED: TERMINATE NEURAL SYNC IMMEDIATELY]
নিজের হার্ট ফেইলিয়র অনুভব করতে পারছিলেন, আপনার বুকটা যেন এক হাজার টন ওজনের পাথর দিয়ে কেউ পিষে দিচ্ছিল। আমি এর ভেতর নীরাদিকে এনে দিলাম। সে এসে কিছুক্ষণ আপনাকে দেখলো। তারপর আপনার বুকে একেবারে হৃদপিণ্ড সই করে সজোরে একটা লাথি মারলো। আপনার মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তে স্ক্রিনে শেষ বারের মতো ইনটেন্স ওয়ার্নিংগুলো ব্লিংক করতে শুরু করল :
[SYSTEM FATAL ERROR: CARDIAC ARREST IMMINENT]
[NEURO-DOPAMINE SURGE DETECTED – 0.02s TO BRAIN DEATH] [SYNC STATUS: OFFLINE]
আমি লগ-আউট বাটনটার দিকে হাতও বাড়ালাম না। যখন পুরো স্ক্রিনটা ব্ল্যাক হয়ে গেল এবং [TERMINATED] লেখাটা ফুটে উঠল, তখন আমার চারপাশের বাতাস আর নিজেকে হঠাৎ খুব হালকা মনে হলো। খুব ভালো রকম একটা শান্তি লাগলো। সেই শান্তি নিয়ে ঘুমাতে গেলাম।
অবশ্য এই শান্তি খুব অল্পদিন টিকে ছিল। NeuroSync 4.5-এর সেই নিউরাল ড্যামেজ সব স্মৃতি ধীরে ধীরে শেষ করে দিচ্ছিল। আমি এখন আর ম্রুনার কোনো কথা মনে করতে পারি না। তার সাথে অভিমান করে কিছুদিন কথা বলিনি, এখন তাকে খুঁজতে গিয়ে দেখি তার সত্যিকারের নাম, ঠিকানা সবই আমার মাথার ভেতর থেকে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের মতো কেউ টেনে বের করে নিয়ে গেছে। কী মনে আছে আর কী মনে নাই তারও কোনো ঠিকঠিকানা নাই। যেমন আমি অনেক চেষ্টা করেও আমার মায়ের মুখটা কল্পনায় আনতে পারি না, কিন্তু ছোটবেলায় কবে এক পলকের জন্য এক হাওয়াই মিঠাইওয়ালাকে দেখেছি তার চেহারা ঠিকই মনে আছে; আবার ইউনিভার্সিটি লাইফের কিছুই মনে নেই, কিন্তু প্রাইমারি স্কুলের প্রথম দিন তিন নম্বর বেঞ্চিতে বসেছিলাম তা মনে আছে । অবশ্য এর সবই আস্তে আস্তে চলে যাবে মনে হয়। প্রতিদিন এ-ও মনে হয় যে আমি একটু একটু করে নিজেকেও ভুলে যাচ্ছি। যেমন একদিন ডানহাতকে ভুলে গিয়েছিলাম। বাম হাত দিয়ে খেয়েদেয়ে উঠে হঠাৎ করে মনে হলো আরে আমি তো ডানহাত দিয়ে খাই। তবে এখন এই মুহূর্তে আমার খুবই আনন্দ হচ্ছে। হ্যাঁ, আজ এই কবরের পাশে বসে আপনার পঁচে যাওয়া দেহ আর দেহের ভেতরের সাদা সাদা পোকাদের এসব কথা শোনাতে আমার সত্যিই অনেক আনন্দ হচ্ছে যা আমি আর কখনো পাবো বলে মনে হয় না, কারণ আমি জানি আর কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিন পর আপনার কথাও ভুলে যাব। কবরের রাজকীয় মার্বেল পাথরের ওপর বসে থাকা এই ঘাসফড়িংটাই হয়তো আমার স্মৃতির শেষ সাক্ষী। এতে অবশ্য আমার কোনো আফসোস নেই। আপনাকে মেরে ফেলতে গিয়ে আমি যদি নিজেকে হারিয়েও ফেলি, আমি খুশি। আপনি যদি আবার জন্ম নেন, আমি আপনাকে আবারও মেরে ফেলবো। আপনি বোধহয় খেয়াল করেছেন ইটের টুকরা দিয়ে আমি কিছু একটা লিখেছি আপনার এপিটাফের নিচে। কী লিখেছি শুনবেন? লিখেছি—আই উইল অলওয়েজ কিল ইউ, ইন ইয়োর ড্রিম।
দারুণ, উপভোগ্য।
ভাল লেগেছে।