আমি এখনো মরছি

হুমায়ূন শফিক

আমি মরে গেছি। আমার আত্মা এখন ঘোরাফেরা করছে তোমাদের চারপাশে। এই কথা তোমরা মানো আর না মানো, আমি এখন মরা। আমার দেহত্যাগ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তাই তোমরা আমাকে দেখতে পাচ্ছো না। কিন্তু আমি তোমাদের ঠিকই দেখতে পাচ্ছি। তোমাদের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, আমোদ-ফুর্তি—সব। আমি তোমাদের মতোই ছিলাম। আমার সুখ-দুঃখ ছিল। আমিও অনেক ফুর্তি করেছি। অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়িয়েছি। অনেক কুকর্মও করেছি। কিন্তু আমি আজ মরে গেছি।

আগে আমি আমার পরিচয় দিই। নয়তো তোমরা আমাকে চিনবে না। কারণ বেঁচে আছে এমন কয়জনকেই তোমরা ভালমতো চেনো। আর আমি তো মরা, আমি পরিচয় না দিলে কীভাবে চিনবে। আচ্ছা আমার নামটা বলেই দিই। আমি হলাম কায়েস চৌধুরী। আমার বয়স ছাপ্পান্ন। তোমরা হয়তো ভাবতে পারো মরা মানুষের আবার বয়স দিয়ে কী হবে। কিন্তু তোমরা তো মরা মানুষেরও জন্মদিন পালন করো। আমি তো আর তোমাদের জন্মদিন পালন করতে বলছি না। শুধু বয়সটা বলে রাখলাম। আমার ঘর ছিল, সংসার ছিল। ছিল একটি ছেলেও। বেঁচে ছিলেন বাবা-মা। সুন্দরী স্ত্রীও ছিল। সবাই খুব সুখেই ছিলাম।

তোমাদের এখন আমি কীভাবে মরলাম—সে গল্পটাই বলব। তোমাদের কাছে মনে হতে পারে কী এক মরার পাল্লায় পড়লাম রে বাবা। তবে এটা বলে রাখি, আর পাঁচজনের মতো স্বাভাবিক মুত্যু আমার হয় নি। আবার অস্বাভাবিক ভাবেও মরি নি। তোমরা হয়তো ভাবছো কী বলছি পাগলের মতো। তবে গল্পটাই শোনো। ছোট গল্প, বেশি সময় নেব না, তাহলে তোমরা ধৈর্য হারাবে জানি। তাই অতি সংক্ষেপে বলছি আমার মৃত্যুর গল্প।

আমি যেদিন মরেছিলাম সেই দিনটি ছিল শনিবার। লম্বাটে গড়নের সুন্দরী স্ত্রী আমায় চুমো দিয়ে বলেছিল আজ তোমার অফিসে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু আমি শুনিনি। শুনলে হয়তো আমাকে এমনভাবে মরতে হতো না। সেদিন অফিসে বিশেষ কাজ ছিল না। আমি ভেবেছিলাম অফিস থেকে ফিরবার পথে ছেলেকে স্কুল থেকে নিয়ে এক সঙ্গে বাসায় যাবো। কিন্তু তা আর হয় নি। কারণটা তোমরা জানো। আমি আর ফিরতে পারিনি। আমার স্ত্রী যেমন সুন্দরী তেমনি বুদ্ধিমতি ছিল তাই হয়তো কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছিল। আমি মাঝারি আকৃতির ছিলাম। আমার বাবা আর আমি একই রকম ছিলাম দেখতে। অনেকেই বলতো আরেহ! বাবা-ছেলের এত মিল যেন জমজ ভাই। আমার মা এই সব শুনে হাসতেন। বাবা মাঝে মাঝে আমাকে ভাই বলেও সম্বোধন করতেন। মজা করে আমাকে ‘শালার পু’ বলে গালিও দিতেন। আমি বাবার সাথে খুব মজা করতাম। বাবা ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। আমিও বাবার দেখাদেখি সরকারি কাজে যোগ দিই। বাবা ছিলেন খুবই সৎ একজন লোক। কারো সাতেও থাকতেন না পাঁচেও থাকতেন না। একদম নির্ভেজাল প্রকৃতির।

তোমরা হয়তো ভাবছো—আমরা বসেছি কীভাবে মরলাম সেই গল্প শুনতে আর আমি কী বলছি না বলছি। যা-ই হোক আমি এখন আসল গল্পে আসি। আমি সেইদিন অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। আমার সামনে মা এসে প্রতিদিনের মতো আমাকে কিছু দোয়া কালাম পড়ে ফু দিয়ে দিলেন। কোনো সিনেমা দেখে মার এমন অভ্যাস হয়েছিল। মা যেই ভাবে ধর্ম-কর্ম অনুসরণ করতেন, বাবা সেই ভাবেই এগুলো বর্জন করতেন। তাই বলে ভেবো না আমার বাবা নাস্তিক। তিনি আস্তিকই ছিলেন। তবে কিছু কিছু কুসংস্কার বিশ্বাস করতেন না। সেগুলো না হয় না-ই বললাম। বাবা-মা দুজনে এখনও কিন্তু বেঁচে আছেন। আমার স্ত্রী-ছেলেটিও ভালো আছে।

আমার স্ত্রী স্বল্প শিক্ষিত হলেও সংসার কীভাবে গুছিয়ে রাখতে হয় সেটা খুব ভালোমতোই রপ্ত করেছিল। আমার মা-বাবা খুব ভালবাসত তাকে। আর ছেলেটি হয়েছিল ঠিক আমার মায়ের মতো। সে ধর্ম-কর্ম খুব সতর্কতার সাথেই পালন করত। আমার মা তাকে এইসব শিক্ষা দিয়েছিলেন। আমার মায়ের ছেলে হয়ে আমি যা করতে পারি নি আমার ছেলে সেই কাজগুলো খুব দৃঢ়তার সাথে করত। সত্যি কথা বলতে আমি নামাজ পড়ার জন্য যে সূরাগুলো দরকার সেগুলোই ঠিকমতো জানতাম না।

দুঃখিত আমি বার বার গল্প ছেড়ে অন্য প্রসঙ্গে চলে যাচ্ছি। আমি তখন আমাদের দু’তলা বাড়ির গেট থেকে বের হয়ে বাগানের ফুলের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে রাস্তায় বের হলাম। বাগানটা কে করেছে বলার প্রয়োজন মনে করছি না। আমি রাস্তায় নেমেই গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলাম। একটা ট্যাক্সি দেখে হাত নাড়ালাম। ট্যাক্সিটা আমার সামনে এসে ব্রেক কষল। আমি বললাম, এই পল্টন যাবে?

৬০০ টাকা।

এত বেশি কেন চাইছো?

এই মিরপুর থেকে পল্টন এর কমে যদি কেউ যায় তাহলে যান, আমি যাবো না।

আমি অবাক, বলছে কী ড্রাইভারটা। মনে মনে কয়েকটা চড় বসিয়ে দিলাম ওর গালে।

শেষ পযর্ন্ত ৪০০ টাকায় রাজি করানো গেল।  উঠে বসলাম ট্যাক্সিতে।

ট্যাক্সিটা প্রথমে ফার্মগেটের দিকে প্রচণ্ড গতিতে চলতে লাগল। তারপর যথারীতি প্রাচীন জ্যামে ট্যাক্সিটি একেবারে থেমে গেল। তখন নভোথিয়েটারের সামনে জ্যামে আটকে আছি। মানে সেই বিখ্যাত বিজয় সরণীর জ্যাম। যে রাস্তায় এক বাইকার কোনো জ্যাম ছাড়া বের হতে পেরে কান্না করে দিয়েছিলেন। পরে তার কান্নার ভিডিওটা ফেসবুকে ভাইরালও হয়। যাক সে গল্প। ড্রাইভারটা এফ. এম রেডিও ছেড়ে দিল। বিরক্তিকর লাগলেও শুনতে লাগলাম। কারণ তখন আর কিছু করার ছিল না। প্রায় আধা কিলোমিটার জুড়ে জ্যাম। সামনে দেখলাম এমনভাবে সব গাড়িগুলো দাড়িয়ে আছে যেন কোন বাচ্চা এগুলো সাজিয়ে রেখেছে পরে খেলবে বলে। কিছুক্ষণ পর একটা বাচ্চা মেয়ে হাতে পপকর্ন নিয়ে জানালায় টোকা দিতে লাগল। ‘স্যার এক প্যাকেট  নেন না, ও স্যার নেন না।’ আমি দ্বিধায় পড়ে গেলাম। মানিব্যাগ থেকে পাঁচ টাকা বের করে হাতে ধরিয়ে দিলাম তার। প্যাকেট আর নিলাম না। আবার দেখলাম একটি যুবক ছেলে শসা বিক্রি করছে। অনেকে কিনছে। বাচ্চা মেয়েটিকে দেখলাম বিভিন্ন গাড়িতে ঘুরঘুর করছে। কেউ হয়তো নিচ্ছে আবার কেউ নিচ্ছে না।

ট্রাফিক পুলিশ বাঁশি দেওয়ার সাথে সাথে সবগুলো ইঞ্জিন একসাথে চালু হয়ে গেল। এক সাথে ধোঁয়া ওড়াতে ওড়াতে চলতে থাকল সবগুলো গাড়ি। ফার্মগেট পার হওয়ার পর কারওয়ান বাজারে আবার সেই একই জ্যাম। এদিকে আমি তো গরমে অস্থির হয়ে গেলাম।

হঠাৎ করেই সামনে থেকে চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ শুনতে পেলাম। দেখলাম যারা আশে-পাশে হেঁটে হেঁটে গন্তব্যের দিকে যাচ্ছিল তারাও উল্টা দিকে দৌড় শুরু করল। ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করলাম, কী হয়েছে? কিছু বুঝতে পারলে! বলল, মনে হয় বাসে পেট্রোল মারছে। আমি ট্যাক্সি থেকে নামলাম। দেখলাম সত্যি সত্যি আকাশে মেঘের মতো ধোঁয়া উড়ে যাচ্ছে। সামনে পুলিশের হুঁইসেলের আওয়াজ শুনতে পেলাম। এবার সাহস করে এগিয়ে গেলাম। এখন মানুষগুলো আর ভয়ে পালাচ্ছে না, তারা বুঝতে পেরেছে যে দুবৃত্তরা পালিয়েছে। তাই সবাই ঘটনাস্থলের দিকে যাচ্ছে। আমিও গেলাম। ফায়ার সার্ভিস থেকে লোক এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করছে।

কাছাকাছি যাওয়ার পর দেখতে পেলাম আহত লোকগুলো ব্যথায় কাতরাচ্ছে। প্রায় ছয় থেকে সাতজন আগুনে ঝলসে গেছে। তাদের কারো চেহারা বোঝা তো দূরের কথা, মনে হচ্ছিল কেউ যেন তাদের উপরের ভাগ তুলে ফেলেছে। শুধু বাকি রয়েছে রক্ত ও মাংস। তাদের দলে একটি বাচ্চাও ছিল। বাচ্চাটিকে দেখে সৃষ্টিকর্তার প্রতি আমার প্রচণ্ড রাগ হল। এই নিষ্পাপ শিশুটি কী এমন পাপ করেছিল যে তাকে এই নির্মমভাবে মরতে হবে। সে না বুঝতো রাজনীতি, না বুঝতো পৃথিবীর কোনো মোহ। তার প্রতি কেন সৃষ্টিকর্তার এমন অবিচার। তাকে বাঁচাতে কেন তিনি আগুনকে ঠান্ডা করে দিলেন না। যারা যুবক বা বৃদ্ধ তারা না হয় পাপ করেছিল শাস্তি পেয়ে মরল। কিন্তু এই শিশুটি কেন? শিশুটির ঝলসে যাওয়া দেহটির দিকে কেউ ফিরেও তাকালো না। মনে হল তার সাথে যে ছিল সে মরেছে। নইলে কেউ তো তার খোঁজ করত।

মানুষেরা লাশগুলোর দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছে যেন এরা কোনো অপরাধ করে মরেছে। হয়তো তাদের আত্মীয়-স্বজনরা মেডিকেলের মর্গে তাদের দেহ সনাক্ত করতে এসে বিরক্ত হবে। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়বে। আবার অনেকে বোকা বোকা চোখ নিয়ে তাকিয়ে থাকবে ডাক্তারের দিকে; তার স্বজনকে চিনতে না পেরে।

অনেকে আবার লাশ না পেয়ে ফিরে যাবে। অনেকে কয়েকদিন হাসপাতালের আশ-পাশে ঘুরঘুর করবে। দেখা যাবে কতিপয় মন্ত্রী তাদের ক্ষতিপূরণ হিসিবে কিছু টাকা দান করবে। হাসপাতালে এসে কান্না জুড়ে দেবে। অনেকে আবার ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়বে তার পত্রিকার জন্য। ফেসবুকে লাইভ করবে কেউ কেউ। এই মরা ছবিগুলো দিয়েই সে তাজা তাজা টাকা ইনকাম করবে। টাকাগুলো হাতে পেয়ে আর কিছুর চিন্তা তার মাথায় থাকবে না হয়তো। অনেকে আবার আন্দোলন শুরু করবে। অনেকে ফেইসবুকে ছবি আপলোড করেই বার বার লগ ইন করবে কতগুলো লাইক, কতগুলো শেয়ার হল—এসব দেখবে। আবার অনেকেই চায়ের দোকানে বসে এ সবের বিরুদ্ধে কীভাবে কী করা যায় এইসব নিয়ে আলোচনা করবে। আবার অনেকেই টেলিভিশনে দৃশ্যগুলো দেখে ওয়াশরুমে ঢুকবে বমি করতে। কিছুদিন পর আবার আগের মতো হয়ে যাবে। সবাই সবকিছু ভুলে যাবে।

আমি আবার ট্যাক্সিতে উঠলাম। খুব খারাপ লাগছিল এই দৃশ্যগুলো দেখে। ওহ! আবার মনে হয় আমি অন্য কথায় চলে গিয়েছিলাম। আমি তো আমার মরার কথা বলব। অন্যদেরটা বলছি কেন। তারপর কী হল শুনুন—আমি শেষপর্যন্ত পল্টন পৌঁছুলাম। অফিসগেট দিয়ে ঢুকে লিফ্টের জন্য অপেক্ষা করছি। কীভাবে যেন এক বৃদ্ধা গেটের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। আমার সামনে এসে বলছে, বাবা দুইটা টাকা দ্যান না?

আমি ধমক দিয়ে তাকে তাড়িয়ে দিলাম। সে ছলছল চোখ নিয়ে চলে গেল গেটের বাইরে। সেখান দিয়ে স্কুলের এক ছাত্র যাচ্ছিল তার কাছেও মনে হয় বৃদ্ধাটি ভিক্ষা চেয়েছিল, ছেলেটিকে দেখলাম একটি দশটাকার নোট বের করে তাকে দিল। মনে হল টিফিন না খেয়ে ছেলেটি কোনো কাজের জন্য টাকাটি ফেরত এনেছিল।

আমি অফিসে ঢুকে টুকটাক যা কাজ ছিল সব সেরে আবার বের হলাম। এবার আমার ছেলেকে নিয়ে বাসায় ফিরতে হবে। কিন্তু আতঙ্ক। কারণ মাঝেমধ্যে পেট্রোলবোমা ফুটছে বাসে বাসে। একটা গণ-অভ্যুত্থানের পর আমরা ভেবেছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু নির্বাচনের পরেই আবার কোনো কুচক্রীমহল এসব শুরু করেছে। মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ না করা পর্যন্ত এদের শান্তি নেই। দেশটার কী যে হবে, আল্লাহই জানেন। টেলিভিশনে দেখে আসা ঘটনাটা দেখলাম। আমি অফিস থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামলাম চার তলা থেকে। নেমে আবার পল্টন মোড়ে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করলাম। কয়েকটা ট্যাক্সিকে ইশারা করলাম কিন্তু অজানা কারণে তারা থামলো না। শেষপর্যন্ত একটা সিএনজি পেলাম। এবার আর দামাদামি করলাম না। ধানমণ্ডি গভ. বয়েস স্কুলের দিকে ছুটল সিএনজিটি।

আমার ছেলে ওই স্কুলেই পড়ে। ক্লাস সেভেনে। ও প্রতিদিন নিজেই স্কুলে যায়। কিন্তু কয়দিন ধরে দেশের অবস্থা বেশি ভাল যাচ্ছে না। তাই আমি ওকে বাসায় নিয়ে যাই। এমন অবস্থায় কেন যে স্কুলগুলো খোলা রাখে? হয়তো কাল থেকে বন্ধ ঘোষণা করবে। আর বন্ধ ঘোষণা না করলেও ছেলেকে আর স্কুলে আসতে দেওয়া যাবে না। রাস্তায় যেভাবে বাচ্চাটি পুড়ে মারা গেল এখনও সেই দৃশ্য আমি ভুলতে পারি নি।

আমি ধানমণ্ডির স্কুলের সামনে পৌঁছুলাম। সিএনজি থেকে নেমে গেটের সামনে গেলাম। দেখলাম কাওছার গেটের সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ওকে ডাক দিলাম। ও কাছে এল। বললাম কিরে ক্ষুধা লাগছে? ও বলল—না, বাসায় গিয়েই খাবো। তারপর দুইজনে সিএনজিতে উঠলাম। সিএনজির ড্রাইভারটা মিরপুর রোড ধরে খুব জোরে চালাতে লাগল। আমি ড্রাইভারকে ধমক দিয়ে বললাম, এত জোরে চালানোর কী আছে? আস্তে চালাও। বলতে বলতেই ক্রসিং পার হতে গিয়ে ড্রাইভার একটা প্রাইভেট কারের সাথে ধাক্কা লাগিয়ে দিল। আমি আর আমার ছেলে উল্টা হয়ে পড়ে গেলাম। আমার হাত-পা ছিলে গেল। আর তেমন কিছুই হল না। কিন্তু কাওছার প্রচণ্ড আঘাত পেল। তার অনেক রক্তক্ষরণ হতে লাগল। ড্রাইভারটার তেমন কিছু হয়নি। সে তার সিএনজি ঠিক করতে ব্যস্ত। আমি তাড়াতাড়ি আর একটা গাড়ি ঠিক করে কাওছারকে স্কোয়ার হাসপাতালে নিয়ে গেলাম।

কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে ইমার্জিন্সিতে নিয়ে গেল। আমি তো সৃষ্টিকর্তার নাম নিচ্ছি। কিছুক্ষণ পর ডাক্তার এসে বলল, প্রচুর রক্ত লাগবে। তাড়াতাড়ি O+ রক্তের ব্যবস্থা করুন। আমি তো ভীত। কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না। তাড়াতাড়ি ঢাকা মেডিকেলের বন্ধুকে ফোন দিলাম। ও বলল রক্ত আছে। সে এখনই পাঠিয়ে দিচ্ছে। আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। যদিও জানি তাকে মোটা অংকের টাকা দিতে হবে। তবু ছেলেটি তো বাঁচবে। আর কী চাই।

রক্ত আধঘণ্টার মধ্যে চলে এল। ডাক্তার পাঁচ ব্যাগের মতো রক্ত নিয়ে অপারেশন থিয়েটারে চলে গেল। আমি তখনও বাসায় কিছু জানাই নি। জানি, শুনলে কান্নাকাটি শুরু হয়ে যাবে।

ডাক্তার অপারেশন থিয়েটার থেকে বের হয়ে আমাকে অভয় দিয়ে বললেন চিন্তার কোনো কারণ নেই, আপনার ছেলে এখন পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত। আমি কিছু বলতে পারলাম না। মনে মনে আমার বন্ধুটিকে ধন্যবাদ জানালাম। তারপর বাসায় ফোন দিয়ে জানালাম। বাসায় কী অবস্থা জানি না। বন্ধুকে আবার ফোন দিলাম ধন্যবাদ জানানোর জন্য।

হ্যালো কায়েস!

বল তোর ছেলের কী অবস্থা।

আমি বললাম, হুম এখন ঠিক আছে। তোকে কত দিতে হবে।

আরেহ! এত তাড়া কীসের! পরে দিলেও চলবে।

আমি ওকে একটা প্রশ্ন না করে পারলাম না। এত তাড়াতাড়ি রক্ত কোথায় পেলি?

ও উত্তর দিল, পেট্রোল বোমায় আজ একটা বাচ্চা মরেছিল, তার রক্ত মরার পরও সচল ছিল। সেই রক্তই তোর ছেলের জীবন বাঁচালো।

এই কথা শুনে আমি চুপ হয়ে গেলাম।

আমি এবার কীভাবে মরলাম সেটা বলি। আমার ছেলে এখন বড় হয়ে গেছে। মাস্টার্স পাশ করল গত বছর। এখন ভালো একটা চাকরি করছে। তার জন্য মেয়ে দেখা হচ্ছে। বিয়ে হবে। হয়তো তারও বাচ্চা হবে। তার বাচ্চারও বাচ্চা হবে। কিন্তু তাদের শরীরে সেই পেট্রোল বোমায় পোড়া বাচ্চার  রক্ত মিশে থাকবে সারাজীবন।

ওহ! দুঃখিত আমার স্ত্রী আমাকে ডাকছে। আচ্ছা গল্পটা না হয় আর একদিন বলবো—আমি কীভাবে মরলাম। আসলে আমরা তো প্রতিদিনই মরছি। দেখা যায় আমরা প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একবার করে মরি। কেন যে আমরা মরি—এই তথ্যটাই সবার কাছে পরিষ্কার না। 

ঐ যে আবার ডাকছে।

বিজ্ঞাপন

guest
1 Comment
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
Habibullah Habib
Habibullah Habib
8 months ago

অন্যরকম তো!