আপা

মূল : মুমতাজ মুফতি

জাবির মাহমুদ

মুমতাজ মুফতি। ১৯০৫ সাল, ১১ সেপ্টেম্বর, সকাল নয়টা। বর্তমান ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার বাটালায় জন্ম। দাদারা নাম রেখেছিল মুমতাজ হুসাইন। নানারা রাখে মকবুল হুসাইন। মুমতাজ মুফতি নামে লিখতেন। মোঘল আমলে কাজী ও মুফতি ছিল আদালতের সাথে সম্পৃক্ত সরকারি দুটি পদ। কাজীরা বিচারকার্য পরিচালনা করতেন; মুফতিরা দিতেন কুরআন ও হাদিসের আলোকে জীবন জিজ্ঞাসার সমাধান। পূর্বসূরিরা ছিলেন মুফতি পেশায় সক্রিয়। সেইসূত্রে মুফতি উপাধিটা নামের সাথে জুড়ে যায়। ১৯২৯ সালে ইসলামিয়া কলেজ, লাহোর থেকে বিএ পাশ করেন। ১৯৩০ সালে শর্টহ্যান্ড এবং টাইপিংয়ে ডিপ্লোমাও করেছিলেন। ১৯৩২ সালে সাহিত্যপাঠে নিমগ্ন হন। সে বছরই ২৩ সেপ্টেম্বর গভর্নমেন্ট হলি স্কুল খানিওয়ালে ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে মনোনীত হয়েছিলেন। ১৯৩৬ সালে ‘ঝুকি ঝুকি আঁখে’ শিরোনামে তার প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। ১৯৪৩ সালে লাহোর থেকে প্রকাশিত হয় ‘উন কাহি’ নামে প্রথম গল্পগ্রন্থ। দ্বিতীয় গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৯৪৪ সালে, বইটি পাবলিশ করেছিল লাহোরের সিন্ধ সাগর একাডেমি। ১৯৪৭ সালে লাহোর থেকে প্রকাশিত হয় তার তুমুল জনপ্রিয় গল্পগ্রন্থ ‘চুপ।’ দেশভাগের পর পাকিস্তান চলে আসেন। পাঞ্জাবের একটা সাপ্তাহিকী ‘ইস্তিকলাল’-এর সহকারী সম্পাদক নিযুক্ত হন। ১৯৪৮ সালে ইশফাক আহমদ ও বানু কুদসিয়ার সাথে সাক্ষাত করেন। ১৯৫২ সালে মাকতাবায়ে জাদিদ, লাহোর থেকে প্রকাশিত হয় চতুর্থ গল্পগ্রন্থ ‘ইসমারায়েন’। ১৯৫৩ সালে লিখেন ড্রামা, ‘নিজাম-এ-সিক্কাহ’। এটাও মাকতাবায়ে উর্দু, লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৫৭ সালে কুদরতুল্লাহ শাহাবের সাথে সাক্ষাত হয়। পরবর্তীতে তিনি তার চিন্তায় বেশ প্রভাবিতও হয়ে পড়েছিলেন। ১৯৫৯ সালে আত্মজৈবনিক উপন্যাস ‘আলিপুর কা ইলি’ লেখা শুরু করেন। ১৯৬১ সালে কাজটি সম্পন্ন হলে লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত হয় তার পঞ্চম গল্পগ্রন্থ ‘গিড়ইয়া ঘার’। ১৯৬৬ সালে চাকুরি থেকে অবসর গ্রহণ করেন। পেনশন পান ২১৪ রূপি। ১৯৬৮ সালে ন্যাশনাল পাবলিশিং কমিটি লাহোর থেকে প্রকাশিত তার জীবনী জনরার বই ‘পেয়াঝ কে চুকলে’। এ বছরই কুদরতুল্লাহ শাহাবের সাথে হজ করেন। ১৯৭০ সালে পলিটিকাল সাইন্সে ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় তার জননন্দিত বাইতুল্লাহর সফরনামা, ‘লাব্বাইক’। ষষ্ঠ গল্পগ্রন্থ ‘রুগ্নি পাত্তে’ প্রকাশ করে ইসলামাবাদের হুরমত পাবলিকেশন্স। ১৯৮৬ সালে সাহিত্যে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ পাকিস্তান সরকার তাকে বিশেষভাবে সম্মানিত করে। ১৯৮৬ সালেই তার লেখা জীবনী জনরার বই ‘উখে লৌগ’ ইউনিভার্সল বুক্স, উর্দু বাজার, লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৮৭ সালে প্রকাশিত হয় তার সপ্তম গল্পগ্রন্থ ‘সামে কা বান্ধান’। ফাইরুজ সন্স লাহোর থেকে প্রকাশিত হয়েছিল বইটি। ১৯৯০ সালে প্রচণ্ড অসুস্থ হয়ে পাকিস্তান মেডিকেল ইন্সটিটিউটে চিকিৎসা নেন। ১৯৯২ সালে প্রকাশিত হয় তার অষ্টম গল্পগ্রন্থ ‘কাহি না জায়ে’। 

ছোটগল্পের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। এছাড়া প্রবন্ধ, জীবনী, উপন্যাস, আত্মজৈবনিক, নাটক, ভ্রমণ, আধ্যাত্মিকতা, কিছুই বাদ যায়নি। দু’হাত ভরে লিখেছেন। বিংশ শতাব্দীকে দেখেছেন হৃদয়ের চোখে। গভীর মমতায়। এখান থেকেই ফিকশনের সৃষ্টি। তার ফিকশনকে ঐতিহ্য ও পটপরিবর্তনের নজরে পরখ করে দেখলে বোঝা যাবে, তিনি ঠিক কোথায় আলো ফেলতে চেষ্টা করেছেন। গল্পের চরিত্র নির্মাণ এবং সৃজনশীল প্রকাশ থেকেও অনেকটা বুঝে উঠা যায়। এই বিশ্লেষণী ধারাই তার বৈষয়িক পারদর্শীতাকে করে তুলেছে দীপ্যমান।

১৯৯৫ সালে জনপ্রিয় এই কথাসাহিত্যিক ইন্তেকাল করেন।


কখনো শুয়ে-বসে আপাকে মনে পড়ত। তখন আমার চোখের সামনে ভেসে উঠত একটা স্ফটিকস্বচ্ছ প্রদীপ। লোহার মতো জ্বলে-গলে-ঢলে পড়ছে যার শরীর।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, এক রাতে আমরা সবাই রন্নাঘরে বসে ছিলাম। কোনো রা নেই। আমি, আপা, আম্মা। আম্মার ছোট্ট বুদ্দু দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে রান্নাঘরে চলে আসে। তখন ওর বয়স আর কত হবে; ছয় কি সাত। এসেই হড়বড়িয়ে বলতে থাকে, আম্মা, আমিও দৌঁড়াব।

ওমা! এখন থেকেই? আম্মা হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেন। তারপর বলেন, আচ্ছা বুদ্দু, আপার সাথে তোমার বিয়ে দিয়ে দিই?

উঁহু! 

আম্মা বলতে থাকেন, কেন, আপাকে বিয়ে করলে কী সমস্যা?

আমি আমার কাজিনকে বিয়ে করব।

আম্মা হাসতে হাসতে আপার দিকে তাকিয়ে বলেন, কেন, আপা কী কম সুন্দর?

আমি বলব কেমন? ও চিৎকার জুড়ে দেয়!

আরে হ্যাঁ, বলো বলো। আম্মাও চোখে প্রশ্ন নিয়ে বুদ্দুর দিকে তাকিয়ে থাকেন। মাথা উঁচিয়ে চারপাশ দেখে নেয় বুদ্দু, যেন-বা কিছু একটা খুঁজছে। চুলার উপর আটকে যায় ওর চোখ। গোবরে লাকড়ি দিয়ে রান্না হচ্ছিল। চুলার মুখে তারই জ্বলন্ত একটা টুকরা। সেদিকে আঙুল তাক করে বুদ্দু বলে, আপা এমন। পরক্ষণেই উপরে জ্বলতে থাকা বৈদ্যুতিক বাতির দিকে আঙুল উঁচিয়ে চিৎকার করে বলে ওঠে, আর এ হচ্ছে আমার কাজিন। আমরা সবাই হাসিতে ফেটে পড়ি। হঠাৎ তাসাদ্দুক ভাই চলে আসেন। আম্মা হাসতে হাসতেই তাসাদ্দুক ভাইকে বলতে থাকেন, তাসাদ্দুক, বুদ্দুকে জিজ্ঞেস কর, ওর আপা দেখতে কেমন? আপা তাসাদ্দুক ভাইকে আসতে দেখে এমনভাবে মুখ ঘুরিয়ে বসে, যেন-বা আগে থেকেই সে খুব মনোযোগ দিয়ে রান্না করছিল।

আচ্ছা, তাহলে বলো, তোমার আপা দেখতে কেমন। তাসাদ্দুক ভাই বুদ্দুকে জিজ্ঞেস করেন। সত্যি বলব? চিৎকার করে ওঠে বুদ্দু। তারপরই গোবরে লাকড়ির জ্বলন্ত টুকরাটি ধরতে হাত বাড়িয়ে দেয়। হয়তো সে টুকরাটি হাতে নিয়ে আমাদের দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু আপা খপ করে ওর হাতে ধরে ফেলে। আঙুলগুলো হালকা মুচড়ে দিয়ে বলে, উঁহু! বুদ্দু কান্না করে দেয়। আম্মা বলেন, আরে পাগল ছেলে, জ্বলন্ত কয়লায় কেউ হাত দেয়! ওর ভেতরে আগুন। বুদ্দু কাকুতি করে বলে, আম্মা, আগুন তো নেই। জ্বলেই তো কয়লা হয়েছে। আম্মা বলেন, মানিক আমার, তুমি বুঝতে পারছো না, ওর ভেতর এখনো আগুনের স্ফূলিঙ্গ আছে। উপর থেকে দেখে যদিও বোঝার কায়দা নেই; আছে সত্যি। বুদ্দু সরল মনে আপাকে জিজ্ঞেস করে, সত্যিই ওর ভেতর আগুন আছে, আপা? আপার চেহারায় লালিমা খেলে যায়, আমি কেমন করে জানব! ভেজা কন্ঠে আপা জবাব দেয়। অকারণেই ফুকনি দিয়ে জ্বলন্ত চুলায় দম ফুঁকতে থাকে!

হৃদয়ে ক্ষত নিয়ে আপার বেঁচে থাকার মর্মটা আমি এখন বুঝি। আর সেই ক্ষতগুলো ছিল অনেক গভীর; বুক ফাটলেও কখনো মুখ ফাটেনি। সেদিন বুদ্দু অনেক পাকা পাকা কথা বলেছিল। তবে আমি প্রায়সময় বলতাম, আপা, তুমি তো কেবল বসেই থাকো। আর কাজ কী তোমার। আপা হেসে বলত, পাগলি! তারপর কাজে লেগে পড়ত। সারাটা দিন এভাবেই কেটে যেত। কোনো অবসর নেই। কেউ কেউ কিছু না কিছু ফুটফরমাশ করছেই। কখনো সখনো অনেকগুলো কাজ একসাথে করতে হতো। একদিকে বুদ্দুর চিৎকার, আপা, আমার দালিয়া (গমের সুজি) কোথায়? আরেকদিকে আব্বার হাঁকডাক, সাজেদার মা! এখনো চা হয়নি? আম্মাও হাঁক ছেড়ে বলতেন, বাইরে কাজের মহিলা দাড়িয়ে আছে, আর এদিকে তুমি একা একা কাজ করে মরছো! আমি তো সবই জানতাম। তবুও আপাকে কাজ করতে দেখে কখনোই মনে হতো না যে, সে কাজ করছে বা সারাদিন এত কাজ করে! আমি এটুকুই বুঝতাম, সে বসেই থাকে সারাদিন। ঘাড়টা ফেরাতেও তার অনেক সময় লেগে যায়। হাঁটলেও মনে হয় না যে হাঁটছে। আমি কখনোই আপাকে হো হো করে হাসতে শুনিনি। হ্যাঁ, মুচকি হাসত। এটুকুই। বেশিরভাগ সময় মুচকিই হাসত। যেন-বা মুচকি হাসি ছাড়া আর কোনো হাসি নেই। অথবা থাকলেও সেটা সে জানে না। মুচকি হাসির সময় আপার ঠোঁট ঈষৎ খুলে যেত। অশ্রসিক্ত হয়ে উঠত চোখ। হ্যাঁ, আমি এটাই মনে করতাম, আপার সারাদিনের কাজ কেবল বসে থাকা। হাসতও না খুব একটা। না হেঁটেও এদিক-সেদিক চলে যেত। যেন-বা কেউ তাকে ধাক্কিয়ে চালাচ্ছে। সাহেরা ছিল ঠিক তার উল্টো। ভারি আনন্দ নিয়ে চলাফেরা করত। যেন ঢোলের তালে নাচছে। আমার কাজিন সাজুকে দেখেও আমি কখনো বিরক্ত হইনি। উল্টো আগ্রহবোধ করেছি। মন বলতো, ও এভাবেই আমার সামনে থাকুক। অনবরত হেঁটে চলুক। আমি পেছন থেকে বলব, হায়, হ্যাল্লো! হেসে উঠবে তার কাজল-কালো চোখ। কী মিষ্টিই না ছিল ওর গলা!

সাহেরা আর সুরাইয়া ছিল আমাদের প্রতিবেশি। দিনভর তাদের ঘর হাসির খলবলানিতে মুখর থাকত। যেন-বা মন্দিরে অনবরত ঘন্টা বেজে যাচ্ছে। মনে চাইত, সারাদিন ওদের বাড়িতে গিয়ে থাকি। আমাদের ঘরে দিনমান পড়ে থাকারই-বা কী আছে! একদিকে মূর্তি হয়ে বসে থাকা আপা। ‘এটা করো ওটা করো’ বলতে থাকা আম্মা। আরেকদিকে বাস্তবতার উপর লেকচার ঝেড়ে যাওয়া আব্বা!

একদিন আমি শুনতে পাই, আম্মাকে আব্বা বলছেন, ‘সত্যি কথা বলতে কী, সেদিন আমার অনেক রাগ হয়েছিল।’ সাজেদার মা শোনো! মনে তো হচ্ছে, সাহেরাদের ঘরে অনেক হান্ডিপাতিল।

কেন? হঠাৎ এমন কথা? আম্মা চোখে প্রশ্ন নিয়ে আব্বার দিকে তাকান।

আব্বা বলেন, না মানে সারাদিন ওই একই কাজ, হান্ডিপাতিল মাজা। কদাচিৎ হাসির শব্দ শোনা যায়। এই-তো। 

আম্মা বিরক্ত হয়ে বলেন, তোমার মতো আমি আরেকজনের দেয়ালে আড়ি পেতে বসে থাকি না!

আব্বা বলতে থাকেন, উফ! আমি বলতে চেয়েছি, মেয়ে বড় হয়েছে। ঘরে টুংটাং শব্দ তুলে কাজ করে। বাজারের মোড় অব্দি খবর চলে যায়, ও বাড়ির মেয়ে ডাঙর হয়েছে! কিন্তু দেখো, আমাদের সাজেদার ভেতর যেন সেসবের কিছুই নেই। আমি আব্বার কথা শুনি। ধীরে ধীরে আমার অন্তর খুলতে শুরু করে। মেজাজ বিগড়ে যায়। মনে চাচ্ছিল, তখনই রান্নাঘরে গিয়ে মূর্তি হয়ে বসে থাকা আপাকে একচোট ঝেড়ে আসি! রাগ করে সেদিন আর কিছু খাইনি। নদীর মতো ভেঙেছে হৃদয়। আব্বা তেমন কীই-বা জানে। আজীবন শুধু কর্তব্য পালন করে গেছে। কখনো খটোমটো আলাপ। এরপর বই খুলে বসে থাকা। আবারও সেই খটমটানি। যেন-বা কড়াইয়ে ঢাকনা দিয়ে পপকর্ন ভাজা হচ্ছে! বাসার কেবল তাসাদ্দুক ভাই-ই একটু হৃদয়ের সুরে কথা বলতেন। আর কেউ নয়। আব্বা বাসায় না থাকলে বিকট শব্দে গানও জুড়ে দিতেন কখনো সখনো—

‘নীরবে বসে আছ সে, চোখে মুক্তোর দানা

নাজুক চোখের তারায় বড্ড নাজুক তার গল্প।’

তাকে গাইতে শুনলে আপা কোনো না কোনো বাহানায় হাসত। অকারণেই বুদ্দুকে কাছে ডেকে মৃদু থাপ্পড় মেরে বলত, কাঁদ বুদ্দু, কাঁদ! তারপর একা একাই হাসতে থাকত।

তাসাদ্দুক আমার ফুপাতো ভাই। আমাদের বাড়িতে দু’মাস হবে এসেছে। কলেজে পড়ে। শুরুতে বোর্ডিংয়ে থাকত। একদিন ফুপি আমাদের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। কথা প্রসঙ্গে তাসাদ্দুক ভাইয়ের কথাও উঠে আসে। ফুপি বলছিলেন, বোর্ডিংয়ের খাবার একদম ভালো না। প্রায়সময়ই ছেলেটা অসুস্থ থাকে। আম্মা কষ্ট পেয়ে বলেন, কেন আপা! নিজেদের ঘর পড়ে থাকতে আমাদের ছেলে বোর্ডিংয়ে থাকবে কেন! তারপর তাদের মাঝে অনেক কথা হয়। দুনিয়ার কথা নিয়ে বসা তো আম্মার পুরোনো স্বভাব। এক সপ্তাহ পর তাসাদ্দুক ভাই বোর্ডিং ছেড়ে আমাদের বাড়িতে চলে আসেন।

আমার আর বুদ্দুর সাথে তার খুব ভাব হয়ে যায়। আমাদের নিয়ে জমে ওঠে তার গল্পের আসর। তার কথার ঢঙ ছিল মুগ্ধকর। বুদ্দুকে সারাদিন বিরক্ত করতেন, এমন না। আপার সাথেও কথা বলতেন না খুব একটা। কীভাবে বলবেন? যখনই আপার সামনে পড়তেন, আপা চেহারার সামনে এমনভাবে ওড়না ঝুলিয়ে দিত, মাটিতে গড়াগাড়ি খেতো ওড়নার আঁচল। নতজানু চোখ। টলোমলো। তড়িৎ কোনো না কোনো কাজে নিজেকে জড়িয়ে নিত। আমি তাকিয়ে ভাবতাম, আপা যদি তাসাদ্দুক ভাইয়ের কথা মন দিয়েও শুনত; কোনো প্রতিক্রিয়া দেখত না। তাসাদ্দুক ভাইও বুদ্দুর কাছে আপার কথা জিজ্ঞেস করতেন। অবশ্য দুজন একা থাকার সময়। সবার সামনে নয়। ভাই জিজ্ঞেস করতেন, বুদ্দু, তোমার আপা কী করছে?

আপা…? খেয়ালিপনায় পুনর্ব্যক্ত করত বুদ্দু, বসে আছে হয়তো। ডাকব?

ভাই ঘাবড়ে গিয়ে বলতেন, আরে না না। ডাকতে যাবে কেন। ডাকার দরকার নেই। আচ্ছা বুদ্দু, এটা দেখো, এভাবে আজকে তোমাকে দেখাব। বুদ্দুর খেয়াল সরে গেলে মাঝারি আওয়াজে বলতেন, আরে আরে, তুমি দেখি ফ্রিতেই সব দেখে নিতে চাচ্ছো! বুদ্দু চিৎকার জুড়ে দিত। আমি কী করতে চাচ্ছি? বলো বলো? চিৎকারের পাশাপাশি ফ্লোর চাপড়িয়েও সে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করত। এমনভাবে চাপড়াত, মনে হতো যেন ঢোল বাজাচ্ছে। এমন পরিস্থিতে আপা কাজের মাঝে চলতে ফিরতে দরজায় একটু থামত। দুজনের আলাপ শোনার চেষ্টা করত। তারপর চুলার সামনে বসে চিরাচরিত হাসি। তখন মাথায় ওড়না থাকত না। খোলা চুলের গোছা চেহারায় এলিয়ে পড়ে লাবণ্য বাড়িয়ে দিত কয়েকগুণ। জলজ চোখদুটো চুলোর পাত্রে নাচার পাশাপাশি লাকড়ির দিকেও নজর রাখত। ঠোঁটজোড়া এমনভাবে দুলে উঠত যেন-বা সে গাইছে। শোনা যেত না কিছুই। হুট করে যদি আব্বা বা আম্মা রান্নাঘরে ঢুকে পড়তেন, আপা নিমিষেই চোখ-চুল-ওড়না সামলে নিত। যেন-বা অযাচিত কেউ ঘরে ঢুকে পড়েছে!

একদিন আমি, আম্মা আর আপা বাড়ির আঙিনায় বসে ছিলাম। তখন তাসাদ্দুক ভাই তার রুমে বসে বুদ্দুর সাথে কথা বলছিলেন। ভাই হয়তো খেয়াল করেননি যে আমরা বাইরে বসে আছি। তার কথা শুনছি বা পষ্ট শোনা যাচ্ছে। শোনো বু্দ্দু, আমি কেমন মেয়ে বিয়ে করব, জানো? যে আমার সাথে ইংরেজিতে কথা বলতে পারবে। বইপত্র পড়তে পারবে। দাবা, কেরাম বা চড়ুইভাতি খেলতে পারবে। তুমি চড়ুইভাতি খেলতে পারো? এভাবে এভাবে খেলে, বুঝলে? তাসাদ্দুক ভাই বুদ্দুকে ভেঙে ভেঙে বোঝাচ্ছিলেন। সারকথা হচ্ছে, যে আমাকে বাহারি রান্না করে খাওয়াতে পারবে, আমি তাকেই বিয়ে করব।

বুদ্দু বলে ওঠে, আমি তো আমার কাজিনকে বিয়ে করব। 

উঁহু, ভাই মাথা নাড়েন। চলবে না।

বুদ্দু হঠাৎ চিৎকার করে বলে, আমি জানি তুমি আপাকে বিয়ে করবে, হ্যাঁ!

আম্মা আপার দিকে চোখ ফেরায়। কিন্তু আপা তার পায়ের নখ খুঁটাতে এতটাই ব্যস্ত ছিল, যেন কিছুই শুনতে পায়নি। ভেতর থেকে তখনো কথার আওয়াজ ভেসে আসছে, ভাই বলছিলেন, হুহ, তোমার আপা ফিরনিতে তো চিনিই দেয় না ঠিকমতো! একদম স্বাদহীন। ওয়াক থু!

বুদ্দু কাউন্টার দেয়, আপা বলে, ফিরনিতে কম মিঠাই নাকি ভালো।

সেটা তো আব্বার জন্য করে, আমাদের কথা ভেবে তো করে না!

বলব আপাকে? বুদ্দু চিৎকার করে ওঠে।

দাঁড়াও, তোমাকে টেবিলে চাপড়ে ঢোল বাজিয়ে শোনাচ্ছি। ঢোল বাজাতে বাজাতে খুশিতে কেঁপে উঠে ওর কন্ঠস্বর। তাসাদ্দুক ভাই বলেন, বুদ্দু, এবার থামো। বুঝতে পেরেছি, টেবিল চাপড়ে তুমি অনেক ভালো ঢোল বাজাতে পারো। হ্যাঁ, এভাবেই ঢোল বাজাতে হয়। আচ্ছা বুদ্দু, তুমি কুস্তি লড়েছো কখনো? চলো আমরা দুজন কুস্তি খেলি। আমি হচ্ছি গামা আর তুমি পালোয়ান বুদ্দু। একটু সবুর করো, রেডি হয়ে নিই, ওয়ান-টু-থ্রি বললেই শুরু করে দেবে। তারপর চাপা স্বরে তাসাদ্দুক ভাই বলেন, তুমি তো আমার কালঘাম ছুটিয়ে দিলে ইয়ার!

আপা হাসি চেপে রাখতে পারেনি, দৌঁড়ে রান্নাঘরে চলে যায়। এদিকে হাসি আটকে রাখতে গিয়ে আমার পেট ফেটে যাচ্ছিল। আম্মাও মুখে ওড়না চেপে ধরেছিলেন।

আমি আর আপা রুমে বসে ছিলাম। ভাই চলে আসে। কী পড়ছো জাহিনা? নাম ধরে বলেছিলেন। আমার খুব ভালো লাগে। আগে আমার নাম নিজের কাছেই ভালো লাগত না। নূরজাহানের মতো পুরোনো নাম। উচ্চারণ করলে বাসি রুটির ফিল চলে আসে মুখে। এই নামে আমাকে কেউ ডাকলে মনে হতো, ইতিহাসের পাতা থেকে বুঝি কোনো থুত্থুড়ে বুড়িমা লাঠি ঠকঠকিয়ে উঠে চলে এসছে। তবে ভাইয়ের নাম ধরে ডাকার ফিলটা ছিল অসামান্য। তার মুখে জাহিনা ডাক শুনে নিজের নামের উপর থাকা আমার তাবৎ ঘৃণা মুহূর্তে উবে যায়। নিজেকে মনে হচ্ছিল ইরানের কোনো শাহজাদি। আপাকে ভাই সাজেদা না ডেকে সাজদে ডাকতেন। সে তো অনেক আগের গল্প। এখন তো আপা বড় হয়েছে। এখন সাজদে বলে ডাকবে তো দূর, আসল নামটাও মুখে নিতে ভয় পান। আমি জবাব দেই, ‘হোমওয়ার্ক করছি।’ তারপর জিজ্ঞেস করেন, তুমি জর্জ বার্নারড শ’র কোনো বই পড়েছো?

আমি জবাব দেই, না। 

আমার আর আপার মাঝে ঝুলানো দেয়ালঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভাই বলেন, তোমার আপা তো বোধহয় ‘হার্টব্রেক হাউস’ পড়েছে। তিনি আড়চোখে আপাকে দেখছিলেন।

আপা চোখ না তুলেই মাথা নাড়ে। মৃদু আওয়াজে বলে, পড়েনি। তারপর একমনে শেলাই করতে থাকে।

কী আর বলব, জাহিনা! সেই একটা বই। একদম নেশার ডিব্বা। খাঁটি মধু। তুমি অবশ্যই পড়বে। সহজ বই। পরীক্ষার পরে নিয়ে পড়ে ফেলো। আমার কাছে আছে।

আমি বলি, অবশ্যই পড়ব।

তারপর শূন্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবার ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা, তোমার আপা মেট্রিকের পর পড়ালেখা ছেড়ে দিল কেন?

আমি সামান্য একটু চটে গিয়ে বলি, আমি কী জানি; আপাকেই জিজ্ঞেস করুন না! আমি জানতাম আপা কেন মেট্রিকের পর কলেজে যেতে অস্বীকার করে। তবু বলিনি। আপা বলেছিল, আমার কলেজে যেতে মন চায় না। কলেজের মেয়েদের দেখে মনে হয়, যেন-বা ওরা ক্লাসে নয়, কোনো পিকনিক স্পটে বেড়াতে এসেছে। ক্লসরুমকেও ক্লাসরুম মনে হতো না। পড়ার বাহানায় রুমজুড়ে ছড়িয়ে আছে অযাচিত ময়লা। আপার কথাগুলো আমার মোটেও ভালো লাগেনি। আমি জানি, বাইরে না গিয়ে সে ঘরে বসে থাকতেই বেশি পছন্দ করে। সেজন্য এমন বলেছে। যত্তসব নখরা।

এরপর থেকে তাসাদ্দুক ভাই যখনই আপার কথা বলতেন, আমি অকারণেই চটে যেতাম। আপা কোনো কথারই তেমন একটা জবাব দিত না। এদিকে তিনি ভাঙা রেকর্ডের মতো বারবার আপার আলাপই করে যাচ্ছেন। আমি কণ্ঠে ঝাঁজ মিশিয়ে বলতাম, আপার কথা আমাকে এত জিজ্ঞেস করার মানেটা কী? আমি কি টেলিফোন? সরাসরি জিজ্ঞেস করে জেনে নিলেই পারেন। এদিকে আপা গুমরো মুখে বসে থাকে। যেন মাসুম বেড়াল। 

রাতে খেতে বসে আব্বা চিৎকার করে ওঠেন। আজকে ফিরনিতে এত চিনি কেন? মুখ মেরে আসছে। সাজেদা! এই সাজেদা! আপা এসে চুপচাপ পাশে দাঁড়ায়। চিনি কি অনেক সস্তা যাচ্ছে আজকাল? একটা নলাও তো গেলা যাচ্ছে না!

আপার চোখ টলোমলো। আব্বা কখনো রেগে গেলে আপার চেহারা ভয়ে হলুদ হয়ে যেত। কিন্তু সেদিন তার গালজুড়ে ছিল টকটকে লাবণ্য। ওসব কিছু না, আব্বা, হয়তো আজ চিনি একটু বেশি পড়ে গেছে। এটুকু বলেই সে রান্নাঘরে চলে যায়। আমি দাঁত পিষতে থাকি। বাহ আপা, বাহ! তোমার জবাব নেই!

এদিকে আব্বা নিয়ম মতো বিড়বিড়িয়ে যাচ্ছেন। ‘চার-পাঁচদিন ধরেই এটা দেখছি; ফিরনিতে চিনি বেশি হচ্ছে!’ গলা শুনে আম্মা দৌঁড়ে আসেন। তারপর যা হবার তাই; খেকিয়ে ওঠে বলেন, ‘আপনি তো বিনা কারণে গজরাচ্ছেন। আপনি হালকা মিষ্টি পছন্দ করেন, ঠিকাছে, তাই বলে বাকিরাও মিষ্টি কম খাবে? ঘরে যুবক ছেলে আছে, মেহমান; তার দিকে খেয়াল রাখতে হবে না? আব্বা ফেঁসে যাচ্ছেন দেখে বের হবার পথ খুঁজতে গিয়ে বলেন, ও আচ্ছা, এই ব্যাপার? আমাকে বললেই হতো! বলি কী সাজেদার মা… দুজনের গলাই ফিসফিসানিতে নেমে যায়। 

আপাকে সাহেরাদের বাসায় যাবার জন্য রেডি হতে দেখে আমি অবাক হই। ওর সাথে মেশা তো দূর, কথাই সহ্য করতে পারত না। নাম শুনলেই নাক কুঁচকে ফেলত। আমার ধারণা তলে তলে একটা কিছু ঘটেছে। নয়তো এভাবে পাশা উল্টে যাবার কারণ দেখি না। সাহেরা কখনো সখনো ওদের বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে চেয়ার ফেলে সেটার উপর দাঁড়িয়ে আমাদের দেখত। কথা বলার বাহানা খুঁজত। আপা নির্দয়ভাবে দু’চারটা কথা বলে তাকে এড়িয়ে যেত। নিজ থেকে বলত, আরে, আমার কত কাজ পড়ে আছে; আর আমি কিনা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে গল্প করছি। এটা বলে আপা রান্নাঘরে চলে যেত। আজকে আপা সাহেরাদের বাড়ি থেকে ঘুরে আসার পর আমি চুপিচুপি ওদের বাড়িতে যাই। গল্প চলতে থাকে। জিজ্ঞেস করি, আজকে আপা এসেছিল? 

সাহেরা নখে নেলপলিশ লাগাতে লাগাতে বলে, হ্যাঁ, এসেছিল। কী একটা বই যেন কিনে আনতে বলে গেছে; ও হ্যাঁ, মনে পড়েছে, হার্টব্রেক হাউস।

বইটা আমার থেকে লুকিয়ে ড্রয়ারে তালা দিয়ে রাখত। আমার বুঝে আসত না, রাত গভীর হলেই কেন সে বারবার আমার দিকে আর ঘড়ির দিকে তাকাতে থাকে। তার তড়প দেখে আমি বই বন্ধ করে শুয়ে পড়ি। ভাবটা এমন, গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছি। আমার ঘুমের ব্যাপারে নিশ্চিত হলে ড্রয়ার খুলে বই বের করে পড়তে শুরু করত। তবে একদিন ঠিকই আমার কাছে ধরা পড়ে যায়। হুট করেই কাঁথার নিচ থেকে মাথা বের করে জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা আপা, হার্টব্রেক হাউসের মানে কী? হৃদয়-ভাঙা ঘর; এর কী মানে হতে পারে! আপা হকচকিয়ে যায়। নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে বসে। কিন্তু আমার প্রশ্নের জবাব দেয়নি। আমি ভেতরে ভেতরে জ্বলছিলাম। নিজেকে আটকে রাখতে পারিনি। বলে বসি, যতটুকু বুঝে আসছে, সেই হিসেবে তো আমাদের বাড়িকে হার্টব্রেক হাউস বলা যায়! ছোট্ট করে জবাব দেয়, আমি কী জানি! 

আমি একটু খোঁচা দিয়ে বলি, হ্যাঁ, সেটাই তো; আমাদের আপা আর ভালোমন্দ কী জানবে! আমার ধারণা, কথাটা তার কাছে খুব ভারি লেগেছে। বই রেখে দেয়। আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে। আরেকদিন আমি এদিক-সেদিক করতে করতে ভাইয়ের ঘরে ঢুকে পড়ি। আলাপ জমে যায়। শুরুতে ইরান-তুরান টাইপ কথা হচ্ছিল। সময় গড়াতেই কথার মোড় ঘুরে যায়। ভাইয়া জিজ্ঞেস করেন, আচ্ছা জাহিনা, তোমার আপা কী ফ্রুট সালাদ বানাতে পারে? আমার সেই চিরাচরিত জবাব, আমি কী জানি। সরাসরি আপাকে গিয়েই জিজ্ঞেস করুন না। হেসে বলতে থাকেন, মনে হচ্ছে কারও সাথে ঝগড়া করে এসেছো! আমি কোনো জবাব দেইনি। একটু পর বলি, না, ঝগড়া হয়নি। এখন তো মেয়ে আছি, ক’দিন পর ছেলেও হয়ে যেতে পারি। হেসে ফেলি। আটকে রাখতে পারিনি। ভাই বলতে থাকেন, দেখো জাহিনা, আমি ঝগড়া ভীষণ পছন্দ করি। আমি এমন কাউকে বিয়ে করব, যে আমার সাথে সকাল-সন্ধ্যা ঝগড়া করবে। ক্লান্ত বা বিরক্ত হবে না। লজ্জা পেয়ে প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলতে বলি, আচ্ছা ভাইয়া, ফ্রুট সালাদ কী জিনিস?

বলে, আরে, কিছু সাদা-সাদা, কিছু লাল-লাল, কিছু কালো-কালো আবার কিছু নীল-নীলও হয়ে থাকে। তার কথা শুনে অনেক হাসি। তারপর বলেন, ফ্রুট সালাদ আমার ভীষণ পছন্দ। তোমাদের এখানে তো ফিরনি খেতে খেতে পাগল হয়ে যাচ্ছি! 

আমার ধারণা, ভাইয়ার কথা আব্বা শুনে ফেলেছেন। কারণ তখন তিনি রান্নাঘরেই ছিলেন। বসে বসে ‘নিয়ামত খানা’ পড়ছিলেন। এরপর থেকে নিয়ম করে রোজ দিনের রান্না শেষ করে আপা ফ্রুট সালাদ বানানোর চেষ্টা করত। আমরা কেউ গেলে লুকিয়ে ফেলতে দেরি করত না। 

একদিন আমি আপাকে খোঁচানোর জন্য বুদ্দুর উদ্দেশ্যে বলি, আচ্ছা বুদ্দু, আপার পেছনে কী রে ওটা? 

বুদ্দু উঠে আপার পেছনে চলে যায়। আপাও লুকিয়ে রাখতে পারেনি। বুদ্দুর হাতে তুলে দেয়। তারপর বুদ্দুকে আরেক দফা চমকে দিয়ে বলি, বুদ্দু, ভাইয়াকে গিয়ে জিজ্ঞেস করে আসো, এটাকে কী বলে?

বুদ্দু যেতে নিলে আপা উঠে গিয়ে খপ করে ওর হাত চেপে ধরে। আমার দিকে গরম চোখে তাকায়। সেদিনই প্রথম আপা আমার দিকে অমন আগুন চোখে তাকিয়েছিল! 

সেদিন ভোররাতেই আপা শুয়ে পড়ে। আমি পষ্ট দেখছিলাম, সে কাঁদছে। তখন নিজের উপরই আমার রাগ হতে থাকে। মনে চাচ্ছিল, উঠে গিয়ে আপার পা জড়িয়ে ধরে পড়ে থাকি। সান্ত্বনা দিই। কিন্তু আমি উঠে যাইনি। একভাবে বসে ছিলাম। বই খোলা। একটা শব্দও পড়তে পারিনি সেদিন। 

সামনে মেট্রিক পরীক্ষা। সাজেদা আপার মতো আমাদের এক কাজিন ছিল। সাজু বাজি বলে ডাকতাম। আমাদের বাড়িতে চলে আসে। এখানে থেকে পরীক্ষা দেবে। সাজুর আগমনে ঝলমলিয়ে উঠে আমাদের ঘর। সময়ে সময়ে হাসির রোল পড়ে যায়। 

সীমানা প্রাচীর ঘেঁষা পাতা চেয়ারে দাঁড়িয়ে সাহেরা আর সুরাইয়া বাজির সাথে কথা বলে। দিনমান সাজু সাজু, সাজু বাজি বলে চেঁচায় বুদ্দু। আমি সাজু বাজিকে বিয়ে করব বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে! 

বাজি হাসতে হাসতে বলে, আগে চেহারা দেখো তোমার। যাও, মুখ ধুয়ে এসো। তারপর তাসাদ্দুক ভাইয়ের দিকে চোখের তারায় হাসির ঝিলিক মেখে তাকিয়ে সমর্থনের আশায় জিজ্ঞেস করে, ঠিক বলেছি না ভাইজান?

সাজু বাজি তাসাদ্দুক ভাইকে এমন করে ভাইজান ডাকত, আমার আনন্দ ধরত না। আপা ছিল ঠিক উল্টো। আপা ভাই সাহেব ডাকলে মনে হতো আসলেও সে তাকে ভাই ডাকছে। সাহেব শব্দের “হা” একদম ভেতর থেকে উচ্চারণ করত। অপরদিকে সাজু বাজি সাহেবের বদলে ডাকত জান। ভাবটা এমন, জান শব্দের ভেতর নিজের জানটাই ঢেলে দিচ্ছে। জান শব্দ শুনলে ভাইয়া থমকে যেত। যেন-বা সে তাকে ভাই বলে ডাকেনি। সরাসরি জান ডেকেছে। তাছাড়া বাজি ভাইজানের জান উচ্চারণ করতে গিয়ে চোখমুখ এমন করে তাকাত, কণ্ঠের যে তাল, শ্রোতারা ঠাওর করতে পারত না। আপার ভাই সাহেব আর বাজির ভাইজানের ভেতর ছিল রাত-দিনের তফাত। 

বাজি আসাতে আপার অবসর আরও বেড়ে যায়। বুদ্দুও ভাইজানের সাথে খেলে না। সারাদিন শুধু বাজির চারপাশে ঘুরঘুর করে। এদিকে বাজি ভাইয়ের সাথে কখনো দাবা কখনো কেরাম খেলে কাটায়। 

কখনো বাজি বলে, ভাইজান, হবে নাকি এক বোর্ড? কখনো ভাই বুদ্দুকে জড়িয়ে বলে, তা বুদ্দু, দাবায় প্রতিদ্বন্দী কেউ আছে? বাজি বলত, আপাকে জিজ্ঞেস করুন। জবাবে ভাই বলতেন, আর তুমি? বাজি এদিক-সেদিক বলে কথার মোড় ঘুরিয়ে দিতে চেষ্টা করত। তারপর চেহারা রাশভারি করে ফেলত। প্রস্ততি সম্পন্ন করে দুয়োধ্বনি দিয়ে উঠতে উঠতে বলত, এহ, আমার সাথে খেলতে চায়! ক্লিয়ার হেরে যাবেন। ভাই হাসতে হাসতে বলত, কালকের কথা ভুলে গেলে? বাজি বলত, রাখুন তো কালকের আলাপ। আমি বলি কী, আজকে নিজেকে প্রমাণ করুন। নয়তো মানুষ কী বলবে, আপনি আমার সাথেই হেরে গেছেন! কথা শেষ করেই হো হো হাসি।

রাতে ভাই রান্নাঘরেই বসে পড়েন। চুপচাপ রান্না করছে আপা। বুদ্দুর তো দিনমান ওই এক কাজ, সাজু বাজি সাজু বাজি করে সারাদিন বাজির আশপাশে ঘুরঘুর করা। ও তাই করছিল। বাজি ভাইকে সমানে খোঁচাচ্ছিল, বলছিল, ভাইজান, আপনি তো শুধু ফল খান। পাশাপাশি এক প্লেট ফিরনি পেলেও আপত্তি নেই। কী আর করা, এইটুকু তো খেতে হবেই। নয়তো মামি রাগ করবেন। তাকেও তো খুশি রাখতে হবে, তাই না? বাজির কথা শুনে আমরা প্রচুর হাসি। অবস্থা খারাপ হতে পারে ভেবে বাজি এদিক-সেদিক দেখে আপার পেছনে গিয়ে দাঁড়ায়। আপার পেছনে ছিল ফ্রুট সলাদের বাটি। বাজি ঢাকনা খুলে হাতে তুলে নেয়। আপা কিছু বুঝে উঠার আগেই সালাদের বাটিটা এনে ভাইয়ের সামনে মেলে ধরে, নিন ভাইজান! তারপর চোখে দুষ্টু হাসির ঝিলিক তুলে বলে, নিন নিন, ধরুন। খেয়ে উদ্ধার করুন। নয়তো বলবেন, সাজু কখনো কিছু খাওয়ায়নি।

ভাইজান দু’তিন চামচ মুখে দিয়ে বলে, কসম, অনেক ভালো হয়েছে। কে বানিয়েছে? বাজি আমার দিকে গলা খাকারি দিয়ে তাকিয়ে বলে, সাজুই তার ভাইজানের জন্য বানিয়েছে; আর কে বানবে! আপার চেহারার দিকে গভীর চোখে তাকিয়ে ছিল বুদ্দু। ক্রমশ লাল হয়ে উঠছিল তার চেহারা। চিৎকার করে উঠে বুদ্দু, ভাইজান, আমি বলব কে বানিয়েছে? আপা বুদ্দুর মুখ চেপে ধরে তাকে কোলে টেনে নেয়। তারপর উঠে চলে যায় বাইরে। কাপড় শুকানোর দড়ির কাছে আপা দাঁড়িয়েছিল। হালকা আওয়াজে ভাই কিছু একটা বলে। আপা ওড়না সরিয়ে কান বের করে দেয়। সাজু বাজির চিৎকার ভেসে আসে ভেতর থেকে; ছাড়ুন ছাড়ুন! তারপর আবার নীরবতা। 

পরদিন আমরা বাড়ির আঙিনায় বসে আছি। ভাই তার রুমে পড়ছেন। বুদ্দুও আশাপাশে কোথাও খেলছিল। সাজু বাজি রোজকার মতো আজও ভাইয়ের রুমে ঢুকে পড়ে। ভাইকে বলে, আজকেও একটা ঝাকানাকা বোর্ড হবে নাকি? ভাই বলেন, ভাগো, একটা কিক মারব, দূরে গিয়ে পড়বে! হয়তো সাজু বাজির দিকে তিনি বেশ জোরেই পা চালিয়েছিলেন। তবুও বেশ আরোপিত গলায়ই চিৎকার করে উঠে সাজু। হ্যাঁ, ওই পা দিয়েই পারবেন। ভাই জবাব দেয়, তবে কী হাতও চালাব? একদম চুপ; চিৎকার করে উঠে বাজি। পলায়নের শব্দ শোনা যায়। পরের এক মিনিট ধস্তাধস্তি। তারপর আবার নীরবতা। 

হঠাৎ বুদ্দু কোত্থেকে যেন ছুটতে ছুটতে চলে আসে। হড়বড়িয়ে বলতে থাকে, আপা, রুমে সাজু বাজি আর ভাইয়া কুস্তি শুরু করে দিয়েছে, এসো দেখবে। এখনই চলো। আপার হাত ধরে টানতে থাকে বুদ্দু। আপার চেহারা হলুদ হয়ে গিয়েছিল। মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিল সে। আপার হাত ছেড়ে দেয় বুদ্দু। আম্মাকে খুঁজতে শুরু করে। দৌঁড়ে বেরিয়ে যাবে সময়ই আপা খপ করে ওর হাত ধরে ফেলে। কোলে তুলে নেয়। তারপর রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। 

সেদিন রাতে আমি আলমারি খুলে দেখি আপার অতি গোপনীয় হার্টব্রেক হাউস পড়ে আছে। হয়তো আপা ওভাবেই রেখেছিল। আমি পেরেশান হয়ে পড়ি, ব্যাপারটা কী; এমন তো হওয়ার কথা না। এদিকে আপা রান্নাঘরে চুপচাপ বসে আছে। যেন কিছুই হয়নি। পেছনে ফ্রুট সালাদের বাটিটা খালি পড়ে আছে। ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল আপার ঠোঁট।

তাসাদ্দুক ভাইয়ের সাথে সাজুর বিয়ের ঠিক দু’বছরের মাথায় ওদের বাড়িতে যাওয়ার সুযোগ হয়। সেই পুরোনো সাজু যেন কোথাও হারিয়ে গেছে। হাসির কলকলানিও আর নেই। হলদেটে চেহারা। উসকোখুসকো চুল। যেন শকুনের বাসা। ভাইজানও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিলেন। একদিন আম্মা বাদে আমরা সবাই রান্নাঘরে বসে ছিলাম। ভাই বলছিলেন, বুদ্দু, সাজুকে বিয়ে করবে?

এহ, আমি জীবনে বিয়েই করব না। বুদ্দু বলে।

আমি জিজ্ঞেস করি, ভাইজান মনে আছে, বুদ্দু বলত, আমি সাজু বাজিকে বিয়ে করব। আম্মা জিজ্ঞেস করেন, আপাকে করবে না কেন? তখন ও বলে, বলব আপা দেখতে কেমন? চুলায় জ্বলন্ত লাকড়ির দিকে ইশারা করে বলে, এমন। আর লাইটের দিকে ইশারা করে বলে, এই হচ্ছে সাজু। ঠিক তখনই দুম করে লাইট নিভে যায়। ঘরে চুলার এরিয়া ছাড়া সবটুকু অন্ধকারে ডুবে ছিল। ভাইয়া জবাব দেন, হ্যাঁ, বেশ মনে আছে। বাজি উঠে বাইরে চলে গেলে ভাই বলেন, আজকাল কী হয়েছে কে জানে; কারেন্ট এই যাচ্ছে, এই আসছে! আপা চুপচাপ। খুন্তি দিয়ে চুলার ভেতরটা নেড়ে দিচ্ছিল। ভাইজান বিষণ্ন গলায় বলেন, উফ, কী জঘন্য শীত! তারপর উঠে গিয়ে চুলার কাছাকাছি গিয়ে বসেন; আপারও কাছাকাছি। চুলার উপর হাত মেলে উষ্ণতা নিতে থাকেন। মামি ঠিকই বলেছিলেন, জ্বলন্ত আঙ্গারে আসলেও আগুন থাকে; তবে দেখা যায় না। আপা দূরে সরে যেতেই ছ্যাত করে আওয়াজ ওঠে; যেন-বা নিভু নিভু চুলায় পানি ছিটানো হয়েছে। ভাইজান ককিয়ে উঠে বলেন, ধিকিধিকি আগুন বুজিয়ো না সাজদে; দেখছো না কেমন ঠান্ডা পড়েছে!

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments