সলাত এল মওত

এনাম মুরতাজা

এক

ভোররাতে উঠে গোসলে যাই। ঘুম থেকে উঠলে যে ধড়ফড়ানি বুকে বাজে বা জগতে নিজেকে খুব ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন লাগে সেই অনুভূতির লেশ এখনো কাটে নাই.. আমি ঝর্নার নিচে। আমি ভিজতে থাকি। গোসলটি যেন শেষই হচ্ছে না অথচ আমি শীঘ্রই একটি চূড়ান্ত নামাযে দাঁড়াতে চাই। নামাযটি যদি আমার জীবনের সমাপ্তি টানে তাহলে বিরাট সৌভাগ্যের ব্যাপার হবে, যদিও আমি সেইরকম উঁচুস্তরের আধ্যাত্মিক লোক না, এক অপাঙ্‌ক্তেয় মানব।

অনিঃশেষ গোসল শেষ হওয়ার পর নামাযে দাঁড়িয়ে প্রথমেই যে চিন্তাটা মাথায় আসে যে আমি এই ঘর, এই ভ্যাপসা অন্ধকার, টেবিল ফ্যানের ক্যারক্যার শব্দ কিছুটি চিনি না। এই অআপন শব্দ ও আঁধারগুলি আমার মাংসের মাঝে ধীরে ধীরে ঢোকা শুরু করে। 

এইসব দিনগুলো আমার উপর দিয়ে কীভাবে পার হচ্ছে সেটা অনুভবের ঊর্ধে চলে গেছে। শরীরে সর্বদা পাহাড়সম ক্লান্তি ভর করে থাকে, প্রতিটা বস্তু থেকে নিজেকে অস্পৃশ্য লাগে আর দিনগুলো যেন আমার মুখের বুলি কেড়ে নিয়েছে।

প্রতিদিন ক্লান্তিপূর্ণ দুপুর, কুয়াশার মতো ঝুলন্ত হাঁটতে থাকা, আর স্বাদহীন সন্ধ্যাগুলোতে অযথাই বেঞ্চে বসে চা টানতে থাকা থেকে পরিত্রাণ পেতে চাই। জীবন্মৃত আর কয়দিন বাস করা যায়! খুব ইচ্ছা করে আল্লাহয় আমাকে কবুল করে তার কোড়ে নিয়ে যাক, আমার সবদাগ ধুয়েমুছে!

প্রথম রাকাতের রুকু থেকে ওঠার সময় মাথাটা চক্কর খায় তখন অন্ধকারগুলো গোল গোল মারবেল হয়ে মাথার করোটিতে ঢুকতে থাকে, মারবেলগুলো চোখের খোলে ঢোকার সময় লালরঙ ধারণ করে দ্রুতই পাল্টে যায় জমাটবাঁধা রক্তের মতো খয়েরি রঙে, আর তখনই কপালের কোটরে ওগুলো বারুদের ঘষা দেয় ফলে তীব্র গোলাগুলি শুরু হয়ে যায়। মস্তিষ্কের করোটিতে পুরা চিত্রটা আবার শুরু থেকে প্লে হয়—স্কুলের হোস্টেলে একটা আবদ্ধ কামরা আর আমিসহ তিনটি ব্যাচেলর পুরুষ শুয়ে আছে অনন্তকাল ধরে যেভাবে স্যাঁতসেঁতে আবদ্ধ পানি ফ্লোরে বিছিয়ে আছে যুগযুগ ধরে। সন্ধ্যার আগের মিটমিটে অন্ধকার তিনজনের শুয়ে থাকাকে যুগ থেকে যুগান্তর করছে। ফ্লোরের পানিগুলো একটু একটু ফেঁপে ওঠে তখন সোৎ সোৎ শব্দ তোলে। যদিও জলের ধ্বনিগুলো খাটের নিচে বাজে, তবু মনে হয় এগুলো সুদূর থমথমে কোনো জলাভূমি থেকে ভেসে আসছে। পানি ফুলে আমাদেরকে ডুবিয়ে দিক তাতে কী আসে যায়, আমরা খাটের সাথে যে স্থবিরতা অনুভব করছি তাতে কোনোই প্রভাব ফেলতে পারছে না।

সেই কামরায় কোনো সন্ধ্যায় আৎকা ঘুম ভেঙে যায়। কারণ পার্টিশন বোর্ডের ওপারে আবাসিক ছাত্ররা খেলতে খেলতে কেউ একজন উড়ে এসে দেয়ালে আছড়ে পড়ে বেদম শব্দ তোলে, তারপর আরেকজন, তারপর আরেকজন। এভাবে ঘুম ভাঙলে আমাকে একটা ক্ষুদ্রবিন্দুর মতো লাগে, আমি কী বা কোথায় এমন একটি অস্তিত্ব সাত আকাশের ঊর্ধে উঠে আরশের কাছাকাছি চিৎকার করে করে ফেটে যায়। পানির ছলছলানি আর শ্যাওলা-গন্ধের সাথে অন্ধকারগুলো মিশে ঘরের চারকোণায় যেন ঘুরতে থাকে, তখন অনেক দূরে কোথাও থাকা একমাত্র মায়ের কথা মনে পড়ে থাকবে, যিনি এই কামরা পার হয়ে বিরাট খোলা প্রান্তর-পৃথিবী পার হয়ে কোথায় আছেন জানি না। অথবা আমার এই খাট থেকে ওই অপরিচিত ‘কোথায়’ পর্যন্ত একটা অদৃশ্য তারের সংযোগ অনুভব করি যার অপর প্রান্তের মানুষটি মায়ের মতো কোনো সত্তা হয়ে থাকবে। তবে সত্তাটি পরম ও মায়াবান অনুভব হলেও অত্যন্ত অচিন ও দূরবর্তীই লাগে।

খাটের তলের পানিতে ঢেউ খেলে বা পুরনো স্যাঁতসেঁতে বাথরুমে ট্যাপ থেকে টপটপ করে পানি পড়ার আওয়াজ আসে কোণা থেকে। এই তিন পুরুষ শিক্ষকের বয়স বাড়তে থাকে, কেউ ৩৩, কেউ ২৭, আর কেউ মাত্র ২৪। এই কামরার বাইরের জগত থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই তিন পুরুষ জমানার পর জমানা এই কামরার কোটরে কাটাতে থাকে। কী জন্য কাটায় বা এই আবাসিক কামরার কোণে আর্দ্র ও উড়ন্ত বোর্ডের আঁশের গন্ধে কোন নেশায় এই পুরুষগুলো মুখ থুবড়ে পড়ে থাকে সময়-ছাড়া কোনো সময়ে, স্পেস ছাড়া এক অনুভূতিতে? একটা নিরাপদ নারী-সেক্স-সংসারের জন্য ছাড়া মাস্টারির এই ভূতুড়ে হাড়খাটুনি আর আবাসিক হোস্টেলে অচল পড়ে থাকার আর কীইবা কার্যকরণ থাকতে পারে? তারা জানে এই বিষয়টি কতটা হাস্যকর! তবু উপরে উপরে কৃত্রিম খুশি ঝুলিয়ে রাখে, তারা বোঝায় যে তারা ঠিক আছে। 

আমি স্কুলে ওই কামরায় স্থবির শুয়ে শুয়ে সন্ধ্যাগুলো ও অন্ধকারগুলো যাপন করতে থাকি। আর ওই আতকা ছেঁড়া ঘুম, মাতৃকোড় থেকে অস্তিত্বের সুদূর বিচ্ছিন্নতা ও সহসা মৃত হয়ে পড়ে থাকার মতো অনুভূতিগুলো আমার একপ্রকার অভ্যস্ত হয়ে যায়। 

পরবর্তীতে আমি স্কুলহোস্টেল ত্যাগ করি। সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর সাথে রাত যাপনের লক্ষ্যে একটি ভাড়া বাসায় উঠি। প্রতিদিন সকালে স্কুল করি, বিকালে বাসায় ফিরে যাই। আমার স্ত্রীর কাছে রাত যাপনের জন্য চলে গেলেও হোস্টেলরুমের ওই আবছা অন্ধকার, মিশমিশে সন্ধ্যার অনুভূতিগুলোই আমার একমাত্র আপন হিসাবে রয়ে যায়। আমার আত্মার বহু পুরনো বন্ধু মনে হয় এগুলোকেই (যখন কোনো অসন্ধ্যায় বা অপ্রত্যাশিত মাঝরাতে ঘুম ছিঁড়ে যায়)। 

অনুভূতিগুলো হঠাৎ কোনো ঘুম ভেঙে গেলেই আসে। এমনিতে দিনেরবেলা কর্মব্যবস্ততায় বা রাতের দীর্ঘ জাগুনিতে আমি ওগুলো মনে করতে পারি না। বা জিনিসগুলো আমার থেকে বিস্মৃত হয়ে যায়। সারাদিন প্রিন্সিপালের কামলা দেওয়া, অর্থ কামানোর নেশা আর সন্ধ্যা হলেই উপ্তা হয়ে লিঙ্গের যন্ত্রণা মেটানো এগুলো আসলে আমার ‘আসল হাকিকত’ থেকে আমাকে ভুলিয়ে রাখে। পার্টিশন বোর্ডের উড়ন্ত আঁশের মতো বা পানির মৃদু ঢেউতোলা শব্দে লেপ্টানো আবছা অন্ধকারের মতো সহসা মৃত হয়ে পড়ে আছি—এসব অনুভূতি থেকে ভুলিয়ে রাখে। 

 

দুই

সেজদা থেকে উঠে দ্বিতীয় রাকাতে উঠতে গেলে মাথায় জিকজাক বাতির মতো বারুদ জ্বলতে থাকে। যদি এই মুহূর্তে মস্তিষ্কে কালো-লালচে মারবেলগুলোর গোলাগুলি বিস্ফোরিত হয়ে ফ্লোরে পড়ে যায়, যদি ঘিলুগুলো আর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছড়িয়ে আছে ধরি, তাহলে দৃশ্যটা ঘরে ছড়িয়ে থাকা কাগজ, ঝরে পড়া চুল আর বাতাসে নড়তে থাকা পলিথিনের চাইতে আলাদা কিছু হবে কি? ঠিক কতক্ষণ পড়ে থাকবে ছিন্ন ঘিলুগুলো? এগুলো কে আগে কুড়াতে আসতে পারে, অফিসের বস, অনুগ্রহকারী সহকর্মী, স্ত্রী নাকি বাড়িওয়ালা? এমনিতে এটা চোখ বন্ধ করে বলা যায় ছিন্ন দেহটির ব্যাপারে আমার জননী বা জনক অবগত হতে মিনিমাম ১২ ঘন্টা লেগে যাবে, আর আমার পর্যন্ত পৌঁছে কবর পর্যন্ত নিতে একদিন ও একরাত লাগবে। তখন প্রথমবারের মতো মাথায় এই চিন্তাটি আসে যে নিজের পড়ে থাকা মৃতদেহের ব্যবস্থা আমার নিজেকেই করে যেতে পারা উচিত, অন্তত অবহেলিত পড়ে না থাকতে পারে সেরকম কিছু একটা, যেমন কোনো একটা পাহাড়ের কোলে বৈরাগ্য হালতে মৃতদেহ পড়ে থাকল, যেখানে জনমানুষ পৌঁছবার কোনো চান্সই থাকল না! 

এরই মাঝে চোখের সামনে বাকি চিত্রটা প্লে হয়—যখন ওয়ালাদ্দাল্লিন-আমিন বলার পরে ঠিক কী করব সহসা ঠাহর করতে পারছি না—একদিন স্কুলে কোর্ডিনেটর মহিলা আমাকে তার কামরায় ডেকে পাঠায়, পূর্ব নোটিশ ছাড়া আমাকে বলে যে কাল থেকে আপনার আর স্কুলে আসা লাগবে না। এমন সুন্দর ঘটনা আমার জীবনে বেশ কয়েকবার ঘটেছে যেহেতু, আমি অভ্যস্ত ভঙ্গিতে এটা সাদরে গ্রহণ করি। এর আগের সুন্দর ঘটনাগুলোও বুক উজাড় করে বরণ করেছিলাম। এবারের ঘটনাটা একটু বেশিই সুন্দর লাগে, কিন্তু এটা আর আগের ঘটনাগুলো তো একইভাবে ঘটেছে, আলাদা কোনো তফাত দেখি না। বর্তমান ঘটনাটা এত সুন্দর অনুভব হওয়ার পেছনের কারণ আমি তালাশ শুরু করি। এর আগের দিন আমার এককালীন সহপাঠী ও বর্তমান সহকর্মী আমাকে বলেছিল, উপর থেকে ওয়ার্নিং এসেছে তোমার চুল-মোচ বড় থাকে, এগুলো পরিপাটি করে স্কুলে আসলে ভালো হয়। আরো বলেছিল, স্কুলে আজকে অমুক ইন্টারভিউ দিতে এসেছে। আমি মেলানোর চেষ্টা করি, বরখাস্ত করার সাথে চুল-মোচ সাইজ করার বা অন্য কেউ ইন্টারভিউ দিতে আসার সম্পর্কটা কী? আমি এটা মেলাতে পারি না। 

আমি বহুত চিন্তাভাবনা করে যে সামারিটা পাই তা হলো, আমাকে বাদ দেওয়া হচ্ছে এটা দুয়েকদিন আগ থেকেই কিছু সহকর্মী জানত। তাদের মধ্যে সহপাঠী ওরফে সহকর্মীও অন্তর্ভুক্ত। অথচ সে আমাকে বিষয়টা অবগত করতে নিতান্তই অনাগ্রহী ছিল (আমার প্রতি তার অনুগ্রহ হচ্ছে তিনিই আমাকে চাকরিটি পাইয়ে দিতে সাহায্য করেছেন)। যেভাবে জানিয়েছে সেটাও ইঙ্গিতপূর্ণ ভাষায়। 

দ্বিতীয়ত আমি যখন হোস্টেল ত্যাগ করে বাসা টু স্কুল যাওয়া আসা শুরু করি আর কর্মব্যস্ততা আমার নিজস্বতা ও আপন সত্তাকে ভুলিয়ে রাখা শুরু করে, আমি এই পেশাজীবন ও সহকর্মীগণ—এগুলোকেই আমার একান্ত আপন মনে হতে লাগে। এগুলোই আমার আসল সত্তা। ওইসব আবছা অন্ধকারে ঘুম ভেঙে একলা মৃত পড়ে থাকার অনুভূতি বলতে আমার কখনো কিছু ছিল না।

কিন্তু মূল সত্য হলো, আমার অগোচরে আমাকে নিয়ে অনেক কিছুই ঘটে থাকে, যেমন কিছু সহকর্মী আমাকে নিয়ে অনেক ভেবেছে ও একটি পরিকল্পনার অংশ হয়েছে। এদের একটি জগত আছে যেখানে আমি নাই। এদের একটি প্রোগ্রাম আছে যেটার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নাই। এরা প্রায় সবাই আমার উপরে থাকা বিগ ব্রাদার। আমি এই খেলাটার ছোট্ট একটি চাল মাত্র। তাহলে আমার স্বরূপ ও আসল সত্তা কোনটা? আমি আসলে কোনটা বা কী?

 

তিন 

দ্বিতীয় রাকাতের রুকু শেষ করে সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ এবং রাব্বানা লাকাল হামদ পাঠ করি। এখানে খোদার প্রশংসা ও স্মরণ করতে বলা হয়েছে। নামাযের লক্ষ্যই হচ্ছে আল্লাহর জিকির ও তাঁর প্রতি ধ্যানমগ্নতা। সেজদায় যেতে মনে মনে খোদার কাছে মিনতি করি—খোদা! আমার সলাতে তো তোমার জিকির নাই, ধ্যানমগ্নতা নাই। আমারে কি কবুল করবা তুমি? আমি তোমার দরবারে দাঁড়িয়ে, তোমার কদমে কপাল রেখে আমার খেয়াল যায় দুনিয়ার তুচ্ছ বস্তুগুলোর দিকে। আমি তো তোমার জালালতের সামনে বসেও তোমার প্রতি মনযোগ দিতে পারি না, তোমার হক নষ্ট করি খোদা, আমারে কি তুমি মাগফেরাত করবা খোদা! 

প্রথম সেজদায় অনুশোচনায় চোখের পাতা ভিজে আসে। এই বুঝি তাঁর অস্তিত্বে ফেটে পড়ব, বিলীন হয়ে যাব। এবং এটা আমার এখনই লাগবে.. আমি গলা কাটা মুরগির মতো ছটফট করতে চাই তাঁর অস্তিত্বের দ্বিধায়। কিন্তু দ্বিতীয় রাকাতে শয়তানের প্ররোচনায় পড়ি। আমি ভাবতে লাগি কেন এমন হয়, বান্দা কেন নামাযের মতো জায়গাতেও খোদার জিকির থেকে উদাসীন থাকে। আবার উদাসীন থাকলে তিনি তাৎক্ষণিক শাস্তি দিয়ে তাকে ধ্বংসও করেন না। বরং ধ্যানমগ্নতা ও খুশুখুজুকে বানানো হয়েছে নামাযের অতিরিক্ত বৈশিষ্ট্যরূপে। নামাযের মূল হলো নামাযের ফরজ ও ওয়াজিবগুলো আদায় করা; তাকবিরে তাহরিমা, রুকু-সেজদা, বৈঠক ইত্যাদি আদায় করলেই বান্দার উপর নামাযের ফরজ দায়িত্ব আদায় হয়ে যায়। সে আজাব থেকে মুক্তি পেয়ে যায়। কিন্তু ধ্যানমগ্নতাসহ নামায নামাযের বিশেষ এক শোভা বর্ধন করে, বান্দাকে খোদার আশেকে পরিণত করে, এমন ইমান তৈরি করে যা তাকে যাবতীয় পাপাচার থেকে দূরে রাখে। আল্লাহর নিয়মগুলো কত অদ্ভুত! দ্বিতীয় সেজদায় এভাবে খোদার জিকির থেকে দূরে সরে যাই, ফলে দ্বিতীয় রাকাতের বৈঠক না করেই ভুলে দাঁড়িয়ে যাই তৃতীয় রাকাতে। বরাবর দেয়ালের দিকে চোখ পড়ে, জমাট বাঁধা আঁধার গলে গোল গোল লালচে মারবোলগুলো ধেঁয়ে আসে। চিত্রের বাকি অংশগুলো প্লে হয়ে যায়—

পুরানা একটা ঘটনা স্মরণ হয়। দুই তিনমাস আগের কাহিনি। প্রিয় সহপাঠী ওরফে সহকর্মীর হাত ভাঙা থাকায় স্কুলে অনুপস্থিত। সে ফোন দিয়ে বলে, এই মাসের বেতনটা কষ্ট করে নিয়ে আসো আমার বাসায়। বিশাল রাস্তা পেরিয়ে টাকা তার কাছে পৌঁছে দেই। এরও একমাস পর স্কুলের প্রিন্সিপাল এক সন্ধ্যায় ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে। ইফতার পার্টির দিন দুপুরবেলা আমাদের ছুটি দিয়ে বলা হয়, সন্ধ্যায় যাতে সবাই সময়মতো উপস্থিত থাকে। আমরা সবাই চাচ্ছি বেতনটা আজকেই দিয়ে দেওয়া হোক। কিন্তু কর্তৃপক্ষ আমাদেরকে বলে, আগামীকাল সকালে বেতন দেওয়া হবে এবং একইসাথে স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষাকালীন ছুটিও হয়ে যাবে। আমি দুপুরে ছুটি পাওয়ার পর বাসায় গিয়ে ভাবি, আবার এত টাকা ভাড়া গুণে যাওয়া আসা করব; বেতনও তো আজ দিবে না। ইফতার মাহফিলে যোগ দিতে ইচ্ছা করে না। থাক কালই যাই। আগামীকাল সকালে গিয়ে দেখি স্কুল ফাঁকা ও নির্জন। একজন মাত্র স্টাফকে পাই যে বলে, কাল সন্ধ্যাতেই তো সবার স্যালারি পরিশোধ করে ছুটি দিয়ে দিছে। আপনি জানেন না? আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, আমার বন্ধুবর সহকর্মীও কি বেতন গ্রহণের সময় এসেছিলেন? সে জবাব দেয়, হ্যাঁ। আমি বলি, কই তিনি তো আমাকে জানাননি ! 

এমনিতে লজিক্যালি চিন্তা করলে সে আমাকে জানাতে ভুলে যাওয়াটা স্বাভাবিকই আছে। ধরা যাক, সে ওইদিন ইভেন্টের পরে দীর্ঘক্ষণ ধোঁয়া ও ধুলাঘন দমবন্ধ পরিবেশে বাসের অপেক্ষায় দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। বাসে ঝুলে ঝুলে বাসায় যাওয়ার পর ক্লান্ত শরীর বিছানায় ফেলতেই স্ত্রীর নরম মাংসের কথা মনে পড়ে তার। তারপর উপ্তা হয়ে লিঙ্গের যন্ত্রণা মিটিয়ে ক্লান্ত চোখ বুজে আসতেই লংটার্মের স্থায়ী কোনো উপার্জনের পরিকল্পনা-প্রকল্প নিয়ে চিন্তা অল্প একটু আগাতেই ঘুমের রাজ্যে নেতিয়ে যায়। তো এই মহাযজ্ঞের ভিতরে আমার কথা মনে পড়বার সুযোগ না হওয়াটা লজিক্যাল আছে। 

 

চার

চাকরি খোয়া যাওয়ার পর, আমার মধ্যে মনমানসিকতায় কিছু পরিবর্তন আসে যেগুলো বড়ই অদ্ভুত। 

প্রথমত অনুগ্রহকারী সহকর্মীর সাথে আমি কথা বলা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে চাই, কিন্তু বিভিন্ন অনুষঙ্গ এসেই যায় তখন কথা বলেই ফেলতে হয়.. যদিও আমার মন তীব্রভাবে ঘৃণা করছে লোকটিকে। এটা বারবার ঘটে, ফলে মানসিকতায় মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়ে। নিজেকে মনে হয় ছিলা কলার মতো উদাম বা গাছের ডালে একটা ঝুলন্ত ছাগল যার মেরুদণ্ড খুলে ফেলা হয়েছে। 

দ্বিতীয়ত আমার স্ত্রীর সাথে আশ্চর্যজনকভাবে কথা বলা কমে যায়। বা আমি নিজেই কথা কম বলা শুরু করি। সে সান্ত্বনামূলক কিছু বলতে আসলেও আলাপটা বেশিক্ষণ এগিয়ে নিয়ে পারে না। দুই চারদিন পরপর অবশ্য কথাবার্তা যা-ই কিছু হয় শেষমেশ সেটা ঝগড়ার দিকে গড়ায়। 

তৃতীয়ত এক সন্ধ্যায় মতিঝিলে ভাইব্রাদারদের সাথে আড্ডা দেয়ার সময় পান খেতে ইচ্ছা করে। তখন পানওয়ালার প্রতি খুব সামান্য কারণেই চটে যাই। কারণটা হলো আমি তাকে বলি জর্দা ছাড়া খালি পান দাও। সে বলে, খালি পান দেওয়ার নিয়ম নাই। আমি বলি, টাকা তো পুরাটাই দিব। সে বলে, না খালি পান নেওয়ার নিয়ম নাই, দেওয়া যাবে না। তখন তাকে মাদারচোত বলে গালি দেই। জিনিসটা প্রথমে ক্যাজুয়াল লাগলেও পরে চিন্তা করে বের করি যে এগুলো চাকরি হারানোর পরিস্থিতিতে উদ্ভুত মানসিক অস্বাভাবিকতা বা বিকৃতির সেই ধারাবাহিকতারই একটি অংশ। এটা আমার মধ্যে সন্তর্পণে বিল্ড হচ্ছে আর গভীরভাবে ডালপালা ছড়াচ্ছে। 

তৃতীয় রাকাতের রুকু থেকে উঠে হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি। সাময়িকভাবে আমি ভুলে গেছি আমি কী করছি। বিভ্রাট ও বিহ্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারি না। জমাট অন্ধকার থেকে ভেঙে আসা গোল ও লালচে মারবেলগুলো একবার করোটিতে ঢোকে আরেকবার বাহির হয়। হর্দম ছোটাছুটি করে, ভিতর-বাহির করে। চিত্রের বাকি ভাগগুলো ধেঁয়ে আসতে থাকে—

আমি নিজেকে পাই যে ঢাকার প্রায় সবগুলো অলিতে-গলিতে হাঁটছি, চাকরির খোঁজে। মানে আমি শুধু হাঁটছিই এই রাস্তা থেকে ওই রাস্তায়, কোন এলাকার কোন রাস্তা সেটাও স্মরণে থাকে না। সব রাস্তাই এখানে সমান লাগে। মানে রাস্তা.. আর রাস্তা মানেই হাঁটতে হবে.. হেঁটেই চলতে হবে। আমি শুধু হাঁটিই.. অনন্তকাল। চাকরি খুঁজতে গেলেও প্রচুর হাঁটা লাগে, চা বিড়ি খেতে গেলেও হাঁটা লাগে, ভাত খেতে চাইলেও অনেক হেঁটে হোটেলে যাওয়া লাগে, স্কুল থেকে স্ত্রীকে আনতে গেলেও আমার প্রচুর হাঁটতে হয়। আমি অনুভব করি আমি শুধু হাঁটার উপরেই আছি, এই গলি থেকে ওই গলি.. এই টং থেকে সেই টং.. এই হোটেল থেকে ওই হোটেল। 

একদিন ধানমন্ডিতে এক প্রতিষ্ঠানে সিভি নিয়ে যাই। প্রিন্সিপাল বলে, আই উইল কল ইউ থ্রু দা ফোন। আই হ্যাভ আ মিটিং রাইট নাও। আমি মহানন্দে বের হয়ে হাঁটতে লাগি, হি উইল কল মি। ইটস গোয়িং টু হ্যাপেন। চা খেতে তুমুল ইচ্ছা করে। কাঠফাটা রোদে ঘামে দরদরিয়ে চা পান করি। যাক ঘটনাটা তাহলে ঘটেই যাবে, হি উইল কল মি- ভাবতে ভাবতে চোখ আমুদে হয়ে আসে। ঘাড়ের কোণে মৃদু ঘামে হালকা শিহরণ বয়। 

ধানমন্ডি থেকে ফিরে এলাকায় আসি সন্ধ্যায়। ভাত খেতে হোটেলে যাই যখন, তখন অনেক হাঁটি। আমার অজান্তেই রাস্তাগুলো সুদীর্ঘ হয়ে যায়, অনন্ত.. ভাবনা বা ভাবলেশহীন..। কী এক ঘোর যে আজকে আমার সমস্ত রগরেশায় নেশার আগুন জ্বালিয়েছে! ভাত গ্রহণের পরে—যে ভাতের প্লেটের তালুতে কিচকিচ বালি লেগে থাকে আর কয়েক লোকমা বাকি থাকার সময়ে ডাল ঢালার পর কিচকিচিগুলো ভালো মতো মিশে উঠে এসে দাঁতের সাথে বন্ধুতালি পাতে—অভ্যাসমতো সবচে পছন্দসই চা-দোকানে হাজির হই। যেটা মূলত রাজমিস্ত্রী ও অটো রিকশাওয়ালাদের চা পানের উৎকৃষ্ট দোকান। ফুরফুরে হৃদয়ে ভিতরের দিকে এক আসনে যুৎ মতোন বসি। এইখানে হাতের বামে সর্বদা এক বয়স্ক মানুষ খালি গায়ে বসে বিভিন্ন দিকে ধূসর দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে। শার্টের বোতাম খোলা ও ঘাড়ে গামছা ঝোলানো কোনো এক তরুণ অটোরিকশা থেকে নেমে এসে স্টাইল করে বিড়ি ধরায়। দোকানের সম্মুখভাগে একটা পা-রিকশা ঘিরে দাঁড়িয়ে কিছু মাঝবয়সী লোক তীব্র উচ্ছ্বাস ও আনন্দে গল্প করছে জোর গলায়। সেই স্বপ্নগুলো বুনছে, সেই আগত ও অপেক্ষমাণ ঘটনাগুলো বর্ণনা করছে যে ঘটনা নিয়ে আমি এখন বিভোরে আছি.. আবিষ্ট মনে ভাবছি—ঘটনাটা ঘটেই যাবে। হি উইল কল মি। আর কথার তোড়ে তাদের চোখগুলো চকচক করে ওঠে। ব্যবহৃত পাতিমিশ্রিত পানি পাইপ দিয়ে জমিনে গড়িয়ে চিকন একটি নালা প্রবাহিত হয়, নালার দুধারে মাছিগুলো শব্দ তুলে বসে.. উড়ে যায়। ওদের ওড়া আর ঘূর্ণনরত শব্দগুলো সুসংগত একটি মিউজিকের আবহ তৈরি করে আমাদের স্টলবাসীর ঘটনাগুলো ঘটবার বিভোর স্বপ্নে ও উত্তেজনায়। 

মন যখন নেশায় ভীষণ আমোদিত আর ঘাড়ে আকাশসম ক্লান্তির ভার, তখন বড়ই উদাস গতিপথে হাঁটতে লাগি। মনে হয় একটু বাদাম খেতে চাই। এ গলি থেকে সে গলি কোথাও এক ঠোঙা বাদাম মিলে না। আমি জানি কোথায় কোথায় বাদামওয়ালা বসে, তাই ঘুরে ঘুরে একই স্থানে আসি হয়ত এখন বসেছে এই আশায়। কিন্তু তারা কেউই বসেনি। গতিপথ পাল্টে অন্য গলিগুলোর দিকে ধাবিত হই। হয়ত একটু পুরি খেতে ইচ্ছা করে। শুধু হাঁটিই, পুরি মেলে না। কোথায় জানি একটা দোকানে পুরি মেলে। চরম ঠাণ্ডা ও বিদ্ঘুটে পুরি গিলে আগ্রহ মিটাই।

অস্বস্তি, ব্যর্থতা, অনুতাপ আর ভবিষ্যতে এক টুকরো ঘটনা ঘটে যাবার বিভোরে প্রায় ম্রিয়মান এক দীর্ঘ রাস্তায় হাঁটা শুরু করি। রাস্তার মাঝখান দিয়ে সরু একটা পার্ক ও কিছু গাছগাছালি আমার ছায়ার সাথে এগোতে থাকে। ইদানিং হাঁটার সময় যে অনুভূতিটা প্রায় অভ্যাস হয়ে গেছে—পিছনে অদৃশ্য একদল মানুষ আমার পিঠে ম্যাগনেটিক প্রভাব ফেলে.. পিঠে হাজার টন ভার নিয়ে সামনে এগোই বা কুয়াশার মতো একদল মৃত সত্তা উপর থেকে আমাকে টেনে ধরে রাখে অদৃশ্য তারের মাধ্যমে। মাটি আর পায়ের পাতার মাঝখানে যে একটা শূন্যস্থান বিরাজ করে। ধীরে ধীরে মাটি থেকে কদমদুটি যে উপরের দিকে আলাদা হয়ে যায়। রাস্তায় যত এগোয়, লাইটগুলো কমে আসে.. গাছের অশরীরী বাতাস আর মৃত ও কাঁচা পত্রগুলো রাস্তায় লুটোপুটি খায়। অন্ধকার আরো প্রভাব বিস্তার করে। সামনে দুটি মেয়ে ভারী দুটি পাছা দুলিয়ে হৃদয় খুলে গল্প করতে করতে হাঁটে। ঘাড়ের রগে অপেক্ষমাণ ঘটনার আমোদ, ক্লিষ্ট শরীরের ঝরন্ত ঘামের মিশ্রণে মেয়েগুলোর প্রতি ভীষণ কাম জাগে। রক্তগুলো লাফিয়ে শরীর থেকে বের হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় আমি মেয়েগুলোকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। সর্বোচ্চ গতিতে পা চালাই.. কিন্তু কেবল অনুভূত হয় আমি শূন্যস্থানের উপরে হাঁটছি। যতই পা চালাই যেন একই জায়গায় রয়ে যাই। আর পেছন থেকে অদৃশ্য লোকগুলো তো পিঠে ম্যাগনেটিক আকর্ষণ করছেই। 

যাক মেয়েগুলো আপনা থেকেই বাঁয়ের গলিতে ঢুকে যায়। আমি ফের অন্ধকার ঘন হয়ে আসা নির্জন রাস্তায় চলা শুরু করি। কোনো বাড়ির বারান্দা থেকে উড়ানো কাগজের প্লেন মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মাটিতে। জিনিসগুলো দেখে মুগ্ধ হই। সাবধানে পা চালাই যাতে মাড়াতে না হয়। দুচারজন যে ওগুলো মাড়ায়নি তা নয়। কিন্তু কাগজের সাদাত্ব ও কাগজত্ব জিনিসটায় এখনো টিকে আছে, আকারগুলোর প্রাণবন্ততা এখনো যথেষ্ট আছে যা দেখে মুগ্ধ হওয়া যায়। রাস্তায় এসব ব্যবহৃত বিনোদন সামগ্রী—সেটা বিড়ির পাছা, মদের বোতল, কাগুজে প্লেন, ব্রার ফিতা বা সেক্স ডল যাই হোক—মাটিতে পড়ে থাকার মানেটাই এটা যে এই জিনিসটা দেখে আরো কিছু মানুষ ব্যবহার করতে উদ্বু্দ্ধ হবে। এটাই এটার মূল্য। নগরে যা কিছু আছে—ব্যবহারকারী হলো প্রথমস্তরের মূল্যবান, ব্যবহৃত হলো দ্বিতীয়স্তরের মূল্যবান জিনিস। আর আমি বা আপনি যারা অপেক্ষমাণ সেই ঘটনা ঘটবার আনন্দে বিভোর, তারা নগরের রাস্তায় চলতে চলতে হঠাৎ একদিন আবিষ্কার করে যে তাদের মূল্যটা ব্যবহারকারী বা ব্যবহৃতের স্তরের না। তারা মূল্যবান হওয়ার দ্বিতীয় স্তরেও পড়ে না। সমস্ত নগর জুড়ে নিজেদের অস্তিত্ব আবিষ্কার করে তৃতীয় স্তরে, যেটার আদৌ কোনো মূল্য আছে কি না সে ব্যাপারে তারা সন্দিহান। তাদেরকে অনুকরণ করতে বা তাদেরকে দেখে ব্যবহার করতে কেউ উৎসাহিত হয় না। পুরা নগর জুড়ে তারা কোনো কিছুকে উত্তেজিত করতে পারে না, এটাই তাদের নগরে বাস করার মূল্য। 

যাক মাটি স্পর্শ না করে শূন্যের উপর দিয়ে কতখানি হাঁটলাম জানি না। পৃথিবীর পৃষ্ঠে আমার শরীরের কোনো ভার নাই, একদম ওজনহীন। তবে পিছন থেকে পিঠের মধ্যে চুম্বকীয় আকর্ষণের কারণে পায়ের পেশিতে প্রচুর চাপ পড়ে। যেন একটা পাহাড়ের ভার টেনে নিয়ে যাই সামনে। প্রচণ্ড ঘেমেনেয়ে একটা টং পেতে সক্ষম হই। টংয়ের ভিতরটা একটাই আসন বিশিষ্ট, এমনই সংকীর্ণ। একটার পর একটা পান চিবাই। পাঁচটা.. আটটা.. দশটা। ঝুলন্ত টেবিল ফ্যানের বাতাস আর চাওয়ালার উড়ানো বিড়ির ধোঁয়ায় কাশি আসে মাঝেমধ্যে, কপালের এক কোণে চিনচিন ব্যথা ওঠা শুরু করে। পাতিমিশ্রিত পানি পাইপ বেয়ে মাটিতে যেখানে পড়ে সেখানে সাদা সাদা কীড়া কিলবিল করে। মাছিগুলো ওড়ে গভীর ঘুমপাড়ানি মৃদু সুরে। কীড়া ও মাছি—ওরা ঘনীভূত হয়। ওই কাগুজে প্লেনগুলো মস্তিষ্কের পর্দায় ভেসে ভেসে আসে। সেগুলোর পিঠে চড়ে আসে মাছিগুলো.. কীড়াগুলো, কিলবিল করে, ঠাণ্ডাভাবে, শীতল গতিতে, আস্তে আস্তে। 

 

পাঁচ

তৃতীয় রাকাতে রুকুর পরে কতক্ষণ হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে আছি জানি না। কোনো হিসাবনিকাশ না করেই আল্লাহু আকবার বলে সেজদার দিকে যাওয়া শুরু করি। আসলে খোদার সাথে নিজের খামখেয়ালির হিসাবনিকাশ না করেই আজ আমার এই অবস্থা। ইবাদতগুজারির বারোটা বেজে গেছে। দ্বিতীয় সেজদায় আমি খোদাকে মনে মনে বলি, খোদা! আমার আত্মার এই জাগরণ এই গাফলতি—এই ঝুলন্ত অবস্থা থেকে আমাকে উদ্ধার করবা কি? আমি খুব তড়িঘড়ি করি, আমি তাঁর কদমে হামলে পড়ি, জোর করা শুরু করে দিই এখনই চাই আমার উদ্ধার! শরীর জুড়ে ঝাঁকুনি আসে আর সবকিছু ব্লাংক হয়ে যায়। কপালের নিচ থেকে ফ্লোর সরে গিয়ে বিস্তীর্ণ শূন্য জায়গা হাজির হয়.. যেখানে শুধু উজ্জ্বল সাদা রঙ ঘুরে বেড়ায়। ব্লাংক স্থানটিতে চিকমিক সাদাগুলো ওঠানামা করে। আমার মাথার মগজ ফাঁকা হয়ে যায়। পুরা জগত ফাঁকা লাগে, স্মৃতি ফাঁকা লাগে। স্মৃতিকে অনেক তাড়িয়ে তাড়িয়ে বর্তমানে হাজির করবার আপ্রাণ চেষ্টা করি। চিত্রের ভাঙা ভাঙা টুকরাগুলো আসা শুরু করে, জোড়া লাগে, স্পষ্ট প্লে শুরু হয়—

নিঃসন্দেহে চাকরির তালাশ আমাকে ওইসব হোস্টেল কামরা, মৃদু অন্ধকার, ফ্লোরে বিছানো পানি আর অদূরে বাথরুমের ট্যাপ থেকে পানির টপটপ পতনের অনুভূতিগুলো ভুলিয়ে দেয়। আমার নিজস্বতা, স্বাধীনসত্তা বা স্মৃতিশক্তি ইত্যাদিকে সম্পূর্ণরূপে মুছে দেয়। স্বকীয়তা বা বুদ্ধিমত্তার অনুভূতিগুলো আসলে কেমন—এসবকিছুই আমার থেকে গায়েব করে দেয়। এই হাস্যকর তালাশ ও অন্বেষা আমার অস্তিত্ব থেকে ওই আদুরে ও অদ্ভুত অনুভূতিগুলোকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। ওইগুলো থেকে আমি এমন দূরে সরে যাই যেখান থেকে প্রত্যাবর্তন করা সম্ভব নয়। 

চাকরির তালাশ ও আশা-বিভোর দৌঁড়ঝাপ আমার সত্তাকে একটু একটু করে আলাদা করে, ক্ষুদ্র করে। মনে হয় যেন আমি ভেঙে ভেঙে ওই কাগুজে প্লেনে ঢুকে পড়েছি, পাতিমিশ্রিত জলের নালার মাছিগুলোতে প্রবিষ্ট হয়েছি। বা ওই কীড়াগুলোতে প্রবেশ করে আমার আস্ত শরীর বিলীন হয়ে গেছে। এটাই আমার দেহের মূল্য। আমি যতই যে টংয়েই চা খাই শুধু এই কাগজের টুকরো বা পোকাগুলোই আবিষ্কার করি। এগুলোই আমার সামনে আপনরূপে আসতে থাকে ।  

কিছু একটা তীব্রভাবে খুঁজি। এমন কিছু যা আমার আপন ছিল। আমি ব্যাপারটাকে খুব মিস করি। অধৈর্য হয়ে উঠি। মনে হয় কোনো অসন্ধ্যায় ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর ফ্লোরে  বিছানো সেই পানি আর স্যাঁতসেঁতে শীতল বাতাসে নিজের অস্তিত্ব ও অবস্থান খোঁজার তাড়না খুঁজি। ওইটা নিবিড়ভাবে অনুভব করার বাসনা হয়। পৃথিবী সমান দূরে মায়ের মতো মায়াবী সত্তার প্রতি শরীর শিরশিরানি অনুভূতি খুঁজে ফিরি। কিন্তু ওই জিনিসগুলো আসে না। শরীর ও পায়ের তালু দরদরিয়ে ঘামে। শিরদাঁড়া থেকে মগজ বরাবর প্রকাণ্ড কাঁপুনি ওঠে। ছিনছিন করে রক্তের ধারা। কাগুজে প্লেনের পিঠে করে কীড়াগুলো শিয়রে চলে আসে.. বুড়ো আঙুলে, পায়ের গোছায়, হাঁটুতে। আমার সমস্ত শরীর যেন গলে গলে ছুটে যায় ওগুলো সাদরে আলিঙ্গন করতে। তীব্রভাবে ওই জিনিসটা খুঁজি.. সন্ধ্যায় বিছানো পানি, বোর্ডের আঁশ মিশ্রিত অন্ধকার। কিন্তু স্মৃতিতে জিনিসটা পুরাপুরি ক্যাপচার হয় না। হৃৎপিণ্ড ওটার জন্য তুমুল তড়পাতে থাকে। 

তৃতীয় রাকাতের শেষ সেজদা অনেক দীর্ঘায়িত হয়। কপালের নিচে শূন্য স্পেস আবার মিলে গিয়ে ফ্লোরে রূপান্তর হয়। দুহাতে ভর করে বিভ্রান্তের মতো দাঁড়াতে থাকি। লালচে মারবেলগুলো মাথার চারদিকে দ্রুত ঘুরতে লাগে। ভাঙা ভাঙা চিত্রগুলো এসে জোড়া লাগা শুরু করে—

স্মৃতি হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে মারাত্মক কসরত করে ওই বোর্ডিং কামরা, ফ্লোরে বিছানো পানির দৃশ্যটা হাজির করতে পারি। ওই কামরার খাটে যে-ই না কাৎ হতে যাব তখনই শরীরের ভিতরের রক্ত, পেশি ও মাংসগুলো যেন ছিটকে ছিটকে পড়ে। হাড়, চর্বি, রগ ও ফুসফুস ইত্যাদি ভেঙে ভেঙে যায়। বাহিরের দিকে ঠেলে আসে। শিরদাঁড়া থেকে মগজ পর্যন্ত চলমান কম্পনটা হঠাৎ বিস্ফোরিত হয়। সমস্ত শরীর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র হয়ে পড়ে যায়, বিল্ডিং পড়ার মতো ধ্বসে যায়, বিছানো জলের উপরে। আমি খাটের নিচে বিছানো শ্যাওলাপূর্ণ পানিতে ভাসতে লাগি। আমার দলাদলা মাংস, হাঁড়, মগজ ইত্যাদি পানিতে ভাসে। সেইসাথে ভাসে কীড়াগুলো.. অসংখ্য.. আরো ঘনে হয়ে। খণ্ডিত মাংস ও কীড়াগুলো ওশমিশ হয়ে যায়। জওহরের সুরলহরি ভেসে আসে কামরার কোণা থেকে, পানির শব্দের সাথে সাথে— 

شو الأعمار اللي تتساوم 

بالركعات وصلاة الموت  

 

২১/৮/২০২৬ ইং

ঢাকা

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments