নীল কুঠির অন্ধকারে

সাঈদ আজাদ

বনগ্রাম নীলকুঠিতে দিনের কাজ শুরু হয় অন্ধকার থাকতেই। সবার আগে জাগে রসুইঘর। কাঠ-কয়লার উনুন ভালো মতো ধরতে ধরতে চারপাশ আলোকিত হতে শুরু করে। পুরো কুঠি জাগতে না জাগতে চার চারটা উনুনেই রান্না শুরু হয়ে যায় পুরোদমে।

বাবুর্চিরা বেশিরভাগই বিহারের মুসলিম। সাহেব-মেম আর তাদের বন্ধুরা ইউরোপীয় স্বাদের রান্না খেতে পছন্দ করলেও ইদানিং তারা ভারতীয় খাবারে আগ্রহ দেখাচ্ছে। তবে ঝালটা এখনো বেশি খেতে পারে না তারা। খাবারে মরিচ না দিয়ে, গোল মরিচ দিতে হয়। বাবুর্চিদের অবশ্য কোনো ধরনের খাবার তৈরিতেই সমস্যা নেই। বলে দিলে, তারা নীলকর সাহেবদের পছন্দের সব রকম খাবারই তৈরি করতে পারঙ্গম। স্থানীয় মশলা ব্যবহার করে বাবুর্চিরা ইউরোপীয় স্বাদের খাবার যেমন সহজেই তৈরি করতে পারে, তেমনি দেশীয় মসলায় অ্যাংলো ইন্ডিয়ান খাবারও তারা তৈরি করতে পারে।

প্রধান বাবুর্চি সুলেমান মেসোয়াক করতে করতে সকাল থেকেই রান্নার তদারকি করছিল। এমনিতে সকালে সাহেবরা ‘ব্রেকফাস্টে’ সাধারণত বেশ ভারী খাবার খায়। আধা সিদ্ধ ডিম, বেকন বা সসেজ, মাংসের কাটলেট, পাউরুটি, মাখন, দুধ, ফলের রস চা বা কফি। কোনো কোনো দিন হয় চাল-ডাল-সবজি-মাছ-ডিমের মিশ্রণে খিচুড়ি। খিচুড়ি হয় দেশীয় এবং ইউরোপীয় পদ্ধতিতে। সকাল হতেই কুঠির চারপাশ ভাজা মাংস আর নানান মসলার গন্ধে ম ম করতে থাকে।

তবে আজকের আয়োজন সংক্ষিপ্ত। ডিম পোচ, পাউরুটি, কলা আর ঘন দুধ। আজ সাহেবদের তাড়া আছে, তাই আজকে ‘ব্রেকফাস্টে’ পদ কম করা হয়েছে। আজ নীলকর উইলিয়াম হোয়াইট সদলবলে শিকারে যাবেন। সকাল থেকে মূলত তারই প্রস্ততি চলছে। ফিরে এসে, শিকার করা মাংশ দিয়ে রাতে পার্টি হবে সাহেবদের।

রাতের রান্নাই আজকে প্রধান রান্না। আজ বড়দিন। নীলকুঠিতে উৎসব আজ রাতে। সে উপলক্ষ্যে আশেপাশের কুঠির সাহেবদের বনগায়ের কুঠিতে নিমন্ত্রণ। নীলকর উইলিয়াম হোয়াইটের বন্ধু-বান্ধবরাও আসবেন। তাদের কেউ পুলিশ, কেউ ম্যজিস্ট্রেট, কেউ জজ, কেউ ব্যবসায়ী। সাহেব বলে গেছেন, ডিনারে আজ গেম মিট হবে প্রধান খাবার। সাহেবরা শিকারে গিয়ে যে শুয়োর, হরিণ বা খরগোশ শিকার করে—তার মাংসই হলো গেম মিট। সকালের নাস্তা দ্রুত সেরে হোয়াইট দেওয়ান, আমিন, নায়েব, গোমস্তাদের নিয়ে শিকারে বের হচ্ছেন। সাথে আরো যাচ্ছে জনাদশেক কুলি আর জনাসাতেক লাঠিয়াল। সাহেবের দুই বন্ধুও যাচ্ছেন। ফিরতে ফিরতে তাদের দুপুর গড়াবে।

এখন বাবুর্চিদের কাজ হলো প্রয়োজনীয় মশলা বেটে রাখা। সাধারণত সাহেবরা গেম মিটের রোস্ট খেতেই পছন্দ করেন। রোস্টে ইউরোপ থেকে আনা মশলাই ব্যবহৃত হয়। তবে ইদানিং বাবুর্চিরা দেশীয় কিছু মসলাও ব্যবহার করছে। যেমন আদা, রসুন, শুকনো লংকার গুড়া। ঝলসানো মাংশের সাথে সাহেবরা এসব মশলা পছন্দও করছেন।

নীলকর হোয়াইট আর তাঁর দুই বন্ধু, তিনজন চড়েছেন ঘোড়ার পিঠে। আগে আগে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন দেওয়ান দিগম্বর বিশ্বাস। তিনিও ঘোড়ার পিঠে আসীন। সবার পেছনে কুলি আর লাঠিয়ালরা। তাদের দায়িত্ব শিকার বহন করে নিয়ে যাওয়া। মাঝে-মধ্যে আহত শিকারকে তাড়া করা।

হোয়াইট আর তাঁর দুই বন্ধুর কাছে আছে বন্দুক। কুলিদের কাছে তীর ধনুক, বল্লম। শিকার গুলি খেয়েও পালাতে চেষ্টা করে। তখন কুলিরা তীর-ধনুক বা বল্লম দিয়ে আহত শিকারকে ফের বিদ্ধ করে। … যেতে যেতে দেখা যায়, কৃষকরা জমিতে কাজ করছে।

একজন কৃষক হোয়াইটকে দেখে তাঁর ঘোড়ার দিকে এগিয়ে আসে। হাত জোড় করে বলে—সাহেব, এবার মোর ভূঁইতে নীলের চাষ কত্তি চাচ্ছি না আমি। ভূঁইয়ে মুই ধান চাষ করব। তা না হলি মাগ-ছেলে-পিলে নিয়ে সারা বৎসর উপোস দিতে হবে মোর। সাহেব, তোমার লোকদের বলো না, মোর ভূঁইতে দাগ না মারতি।

হোয়াইটের সাথে সব সময়ই শ্যামচাঁদ (চামড়ার তৈরি চাবুক) থাকে। তিনি চাবুক দিয়ে বৃদ্ধের পিঠে সপাৎ করে আঘাত করেন। তাঁর মুখে গালি ছোটে, শালা-বাঞ্চোত! নিমকহারাম। দাদন নেওয়ার সময় সে কথা মনে ছিল না? টোমার তো গত বছরের দাদনের টাকাও বাকি। নীলচাষ না করলে টাকা শোধ কে করবে? টোমার বাপ?

আঘাতের কারণে বৃদ্ধ মাটিতে পড়ে যায়। তার পরনে খাটো ধুতি, উর্ধ্বাঙ্গ খোলা। উদোম পিঠে দেখতে দেখতে রক্তাক্ত একটা অবয়ব ফুটে উঠে। সে শক্তি সঞ্চয় করে কোনো মতে দাঁড়িয়ে বলে—সাহেব, আমি তো নীলের জন্য দাদন নিতি চাইনি। কুঠির দেওয়ান আর গোমস্তা মিলে মোর কাছ থেকে টিপসই নিল করে। মোর পাঁচ বিঘা ভূঁইতে দাগও দিয়ে গেলো জোর করে। … দয়া করো সাহেব, আমার মোটে পনেরো বিঘে ভূঁই। পাঁচ বিঘেতে আগে থেকেই নীলের চাষ করি। সেখানে আরো পাঁচ বিঘে ভূঁইতে নীল বুনলি পরিবারসহ মোরে না খেয়ে মত্তি হবে।

শালা হারামখোর, দাদন নিয়ে এখন নীল চাষ করতে অস্বীকার করিটেছো। টাকা নেওয়ার সময় এইসব কথা টোমার মনে ছিল না? … নায়েব, এরে বেধে কুঠিতে নিয়ে আটকে রাখার ব্যবস্থা করো। আমি ফিরে ওকে শায়েস্তা করছি।

দিগম্বরের ইশারায় দুইজন লাঠিয়াল বৃদ্ধকে ধরে কুঠির দিকে নিয়ে যেতে থাকে। তার সাথে আরো যারা কাজ করছিল জমিতে, তারা সবাই নির্বাক পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। কেউ একটু নড়ে না, কেউ কোনো কথাও বলে না। সবাই জানে, প্রতিবাদ করলে কী দুটো কথা বললে, শ্যামচাঁদ তাদের পিঠেও পড়বে।

যেতে যেতে আহত বৃদ্ধ মলিন মুখে শেষবারের মতো করুণ কণ্ঠে মিনতি করে। ও সাহেব, মোরে দয়া করো। মোরে ধরে নিয়ে গেলি মোর মাগ-ছাওয়াল না খেয়ে মরবে। … ও সাহেব দয়া করো। আর বছর নীলির চাষ করে আমি সর্বশান্ত হয়েছি। আমার ঘরে খাবার নেই একদানা। গত বছর চলেছি ধার-কর্য করে। … ও সাহেব।

বৃদ্ধের আর্তনাদে কেউ ভ্রূক্ষেপ করে না। সবাই শিকারের উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে থাকে। দলটা শিকারের আশায় কুঠি থেকে অনেকটা দূরেই এসেছে। সামনে ঘন জঙ্গল, তারপরেই উলুখাগড়ার বিস্তীর্ণ মাঠ। সবাই মিলে শব্দ করে, ঝোপ-ঝাড় ভেঙ্গে, ভয় দেখিয়ে জঙ্গল থেকে খেদিয়ে খেদিয়ে পশুদের উলুখাগড়ার মাঠে নিয়ে যাবে। তারপর হোয়াইট আর তাঁর দুই বন্ধু মিলে গুলি ছুঁড়বে পশুদের লক্ষ্য করে।

কুঠিতে ফিরতে ফিরতে দলটার দুপুর পার হয়ে যায়। চারটা বুনোহাঁস, দুইটা তিতির আর বড় একটা শুয়োর নিয়ে হইহই করে ফিরে সবাই।

রান্নাঘর কুঠি থেকে বেশ খানিকটা দূরে। সেখানে মৃত প্রাণীগুলোকে নিয়ে রাখা হয়। দিগম্বর—দিগু, উপস্থিত থেকে নির্দেশনা দিচ্ছেন। তিনি নীলকর আর তাঁর বন্ধুদের ফরমায়েশ মতো কী কী রান্না হবে তাই বলেন।

সুলেমান, সাহেব আর তাঁর বন্ধু-বান্ধবরা কেমন কী পছন্দ করে সবাই তো জানো। সাহেব বলেছেন, শুয়োর রোস্ট হবে, ভেতরে যেন নরম তুলতুলে থাকে। হাঁস আর তিতির গ্রিল। … কাস্টার্ড করবে। আর মুলিগাটানি স্যুপ দিয়ে খানা সার্ভ করবে। আজ কিন্তু সাহেবদের পরব। আশেপাশের কুঠি থেকে আরো সাহেবরা আসবেন। গণ্যমান্য লোকজন আসবেন। খানা কিন্তু সেরা হওয়া চাই। খেয়ে যেন সবাই ধন্য ধন্য করে।

সে হবেখন। সুলেমান বলে। আপ সোচিয়ে মাত। হামি তো আর নতুন কাজ করছে না কুঠিতে। কিন্তু হামি শুয়োর রাঁনতে পারবে না, সে তো জানেন নায়েব সাহেব। হামার ধর্মে শুয়োর ছোঁয়া নিষেধ আছে।

আচ্ছা শুয়োর পদ্ম আর গণেশরা রাঁধবে। ওরা তো খেরেস্টান হয়েছেই কুঠিতে এসে। ওদের শুয়োর রাঁধতে সমস্যা হবে না। … কিন্তু মশলা-টশলা দেওয়া, আর কীভাবে কী করতে হবে—সব তোমাকেই দেখিয়ে দিতে হবে তো।

সে হামি দূর থেকে দেখিয়ে দিতে পারব। … গ্রিল করতে কিছু কয়লা লাগবে। কুঠিতে কয়লা মজুদ নেই।

আমি কাউকে পাঠিয়ে কয়লা আনাচ্ছি। তুমি এখনই কাজে লেগে যাও। সময় মতো সব হওয়া চাই। সময় কিন্তু বেশি নেই। মন দিয়ে সব করো। আজ রাতে রান্নার গড়বড় হলে কিন্তু তোমার চাকরি থাকবে না।

আশা করি সময় মতো সবই হোয়ে যাবে। 

বিয়ার, ব্র্যান্ডি, শেরি, শ্যাম্পেন, সোডা ওয়াটার—এসব পর্যাপ্ত আছে তো? এদের তো আবার এসব ছাড়া উৎসব হয় না।

ভাড়ারে যতটা আছে, তাতে শত লোকের হয়ে যাবে।

দেখো আবার টান না পড়ে। … খানসামাদের বলবা, সার্ভিস যেন ঠিকঠাক মতো হয়। সাহেবদের কিন্তু দেখনদারিই সব। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, আদব-কায়দার যেন কমতি না হয়। … আমি যাই, দেখি বাইজিদের আসার কতদূর। কলকাতা থেকে বজরায় করে বাইজি আসছে জানো তো?

সুলেমান সবই জানে। তবু বলে, হামি আদার ব্যাপারী, সেসব জাহাজের খবর হামার জেনে কাজ কী! জেনে-ই-বা করব কী! বাইজি তো আর নতুন আসছে না। … আপনি শুয়োর-টুয়োর যারা রাঁধবে তাদের জলদি জলদি আসতে বলেন। শুয়োর রোস্ট করতে সময় লাগবে বহুত। এখুনি কাজ শুরু করা দরকার। … সাফ-সুতরো করতেও সময় লাগে।

এখুনি সবাই এসে হাত লাগাবে। … সবকিছু শেষ হলে আমাকে জানিও। ডিনারের আগে আমি সবাইকে নিয়ে আবার বসবখন। তখন কীভাবে সব পরিবেশন করতে হবে, সব আবার বলে দিব।

দিগু চলে গেলে সুলেমান লোক নিয়ে বিশাল ডাইনিং টেবিল আর চেয়ারগুলো মুছতে শুরু করে। চেয়ার মোছা শেষে রূপার বাসন-কোসন, গ্লাস-বাটি, পানপাত্রগুলো বের করে ধোয়ার জন্য। রূপার তৈজসপত্র নিত্যকার ব্যবহারের জন্য না। এগুলো ব্যবহৃত হয় অনুষ্ঠান-পরবে।

বাসনপত্র ধোয়া-মোছা শেষে, জলসাঘরের ঝাড়বাতিগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে নতুন মোমবাতি বসাতে বসাতে পুরোপুরি বিকাল হয়ে যায়। ওইদিকে পদ্মরাও কাজে লেগে পড়েছে; তিতির আর হাঁসের পালক ছাড়ানো হয়ে গেছে।

কুঠির বাইরে, বড় ছাতিমগাছের তলে শুরু হয়েছে বিশেষ এক আয়োজন। শিকার করতে যাওয়ার পথে নীলকর হোয়াইটের হুকুমে যে বৃদ্ধ চাষীকে কুঠিতে ধরে আনা হয়েছিল, সে সকাল থেকে ছিল গুদামঘরে। তাকে বের করা হয়েছে। লোকটা ঠিক মতো পা ফেলতে পারছিল না। তার পিঠের কোথাও রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে আছে, কোথাও লালচে রক্তের ধারা দেখা যাচ্ছে। কুঠিতে আনার পর তাকে ফের মারধোর করা হয়েছে বোঝা যাচ্ছে। না হলেও তো নতুন করে রক্ত ঝরার কথা না। তাকে ধরাধরি করে এনে ছাতিমগাছের তলে মাটিতে বসানো হয়। কাছেই হোয়াইট তাঁর কয়েকজন আমন্ত্রিত বন্ধুসহ চেয়ার পেতে বসেছেন।

নাপিতকে খবর দেওয়া হয়েছিল। সে এসেছে। নাপিত বেশ আয়োজন করে তার ক্ষুর, কাচি প্রভৃতি বের করছে। সময় নিয়ে যত্ন করে ক্ষুরে ধার দেয় সে। তারপর ক্ষুর ঠিক মতো ধারালো হলো কি না, সেটাও হাত দিয়ে পরীক্ষা করে। এই ক্ষুর দিয়ে ধরে আনা চাষীর মাথা ন্যাড়া করা হবে।

হেই বারবার, আর কত টাইম লাগবে টোমার? হোয়াইট অধৈর্য কণ্ঠে জানতে চান। টুমি তো হেড মুন্ডাবা, গলা তো আর কর্তন করবা না! নাকি গলা কর্তনের মতলব টোমার? বলতে বলতে হো হো করে হেসে উঠেন তিনি। তাঁর সঙ্গীরাও শরীর কাঁপিয়ে হাসতে থাকে।

মজা দেখার জন্য খবর পেয়ে কোত্থেকে রাজ্যের সব লোক এসে জমা হয়েছে ছাতিমগাছের কাছে। তারা অনেকে বিস্মিত চোখে হোয়াইটকে দেখছে। তিনি দেখার মতো লোকই বটে। হলদেটে গায়ের রং, সোনালী চুল, আর কটা চোখে তাকে যে কেউ সুপুরুষই বলবে। বয়সও তাঁর বেশি না। এখনো চল্লিশ হয়নি। স্বভাবটাও তাঁর অল্পবয়সীদের মতো, ছটফটে। সুরার পাত্র হাতে ক্ষণে ক্ষণে হাসছেন তিনি। হাততালি দিচ্ছেন।

উপস্থিত সকলে অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে, কখন মূল কাজ শুরু হবে। চাষী লোকটাকে গুদামঘর থেকে বের করে আনার পর থেকে সে মাথা নিচু করে আছে। এত এত লোক দেখেও সে একবার মাথা তুলেনি।

নাপিত তার কাজ শুরু করে। চাষী লোকটার মাথা ন্যাড়া করতে থাকে। দুজন শক্তপোক্ত লাঠিয়াল দুপাশ থেকে চাষী লোকটাকে ধরে রেখেছে। যাতে লোকটা উল্টাপাল্টা কিছু করতে না পারে বা ন্যাড়া করার সময় বাধা দিতে না পারে। তবে লাঠিয়ালরা খামোখাই লোকটাকে ধরে রেখেছে, বাধা দেওয়ার চেষ্টাটুকুও করে না লোকটা। সে ক্ষুরের নিচে মাথা পেতে শান্তভাবে বসে থাকে।

ন্যাড়া করানো হয়ে গেলে, লোকটার মাথায় আঁঠালো কাদা মাখানো শুরু করে দুজন লোক। প্রায় আধইঞ্চি মতো পুরো করে তার মাথায় কাদা লেপটানো হয়। তারপর সেই কাদার উপর নীলের বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়। কাজ মোটামুটি শেষ। লোকটার দু হাত পিছমোড়া করে বেঁধে টানতে টানতে গুদামঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। লোকটা লজ্জায় চোখ বুঝে আছে। তার হেঁচকি উঠছে ক্রমাগত। মুখটা নীল হয়ে গেছে।

কুঠিতে এমন প্রায়ই করা হয়। যে সব চাষীরা নিজেদের জমিতে নীল চাষ করতে অস্বীকার করে, লাঠিয়াল দিয়ে তাদের ধরে আনা হয় কুঠিতে। ধরে এনে অবাধ্য সেই চাষীকে চাবুক মারা হয়। অভুক্ত রেখে কুঠির গুদামঘর বা জেলখানায় আটকে রাখা হয়। কারো কারো মাথা ন্যাড়া করে মাথায় কাদা লেপটে নীলের বীজ বুনে দেওয়া হয়। তারপর তাকে গুদামঘরে আটকে রাখা হয় ততদিন, যতদিন পর্যন্ত নীলের বীজ থেকে চারা না গজায়। শাস্তি কার্যকর করা হয় হোয়াইটের নির্দেশ অনুযায়ীই।

হোয়াইট এবং তাঁর অতিথিরা যতটা না খান তারচেয়ে বেশি নষ্টই করেন। শুয়োরটা বেশ বড় ছিল। অর্ধেকও খেয়ে শেষ করতে পারেন না তাঁরা। টেবিলময় খাবারের ছড়াছড়ি। মদের গ্লাস গড়াগড়ি খাচ্ছে মেঝেতে। কুঠিতে তিনটা বিলেতি কুকুর আছে। উচ্ছিষ্ট রোস্ট আর খাবার বেশিরভাগই ওদের পেটে যাবে। আর কিছু নিবে পদ্ম আর গণেশরা। ওরা এক সময় নিচু জাতের হিন্দু ছিল। কুঠিতে কাজ করতে এসে খ্রিস্টান হয়েছে। এখন ওরা গরু, শুয়োর, মদ-সবই খায়। সুলেমান বা মুসলিম বাবুর্চিরা সাহেবদের জন্য রান্না করা খাবার সাধারণত খায় না। তারা নিজেদের জন্য আলাদা করে রান্না করে।

বাইজি দুজন এসেছে কলকাতা থেকে। নাচে বেশ পারদর্শীই তারা। নাচ শুরু হতেই সাহেবদের হর্ষধ্বনি শোনা যায়।

সুলেমান খানসামাদের নিয়ে মদ পরিবেশন করতে করতে আড়চোখে নাচ দেখে। কুঠির সব কাজের মধ্যে এটাই তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে। মদ পরিবেশন করা। কলকাতা থেকে আসা অবাঙ্গালী বাইজিদের গড়ন-গাড়ন পোশাক-আশাক, নাচ-নখরা সবই অতি মনোহর। ওদেরকে ঠিক যেন মানুষ মনে হয় না। মনে হয় বেহেশতী হুর। মেয়ে মানুষগুলো যেন মোমের তৈরি, এমন মনে হয় সুলেমানের। সাহেবগুলোর কপাল কী! মেয়ে-মদ-ভালো খাবার সবই তাদের জন্য বরাদ্দ। আর তাদের মতো লোকদের না আছে ভালো পরনের কাপড়, না আছে ভালো খাবার, আর না তাদের ঘরের নারীরা সৌন্দর্যে এদের ধারে কাছে ভিড়তে পারে! … সুলেমান পরিবেশন করতে করতে সব দেখে আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আহা জগতে পয়সার মতো শক্তিশালী আর কী আছে! পয়সা থাকলে সব ক্ষমতা তোমার, পয়সা থাকলে বসবাসের জন্য প্রাসাদ তোমার, পয়সা থাকলে সেবার জন্য অগণিত দাস-দাসী, পয়সা থাকলে বিঘার পর বিঘা জমি, পয়সা থাকলে সুন্দর স্বাস্থ্য, পয়সা থাকলে সুন্দরী নারীরা তোমার, পয়সা থাকলে ইয়ার-বন্ধুরা তোমার প্রশংসা করবে, পয়সা থাকলে জগতের সমস্ত সুখই তো তোমার হাতে। বেঁচে থাকার জন্য আর কী চাই ওই এক পয়সা ছাড়া?!

দিগু সবকিছু তদারকি করছেন। একবার তিনি জলসাঘরের বাইরে যাচ্ছেন, ফের ভেতরে আসছেন। বাইজিদের নাচ তাঁর তেমন পছন্দ না। কুঠিতে আসাতক কোনো দিন তিনি মদ ছুঁয়েও দেখেননি। চাইলেই তিনি সাহেবদের একপাশে বসে গ্লাস হাতে সুরা পান করতে পারেন, সাহেবের খাওয়ার জন্য তৈরি করা খাবার খেতে পারেন। হোয়াইট তাকে বলেছেনও বহুবার—দিগম্বর, চাইলে টুমি আমাদিগের সাথে খানা খাইতে পারো। ড্রিঙ্ক করতে পারো। … দিগুর কেন জানি ইচ্ছে করে না। বহুবছর কুঠিতে চাকরি করলেও কেন জানি সাহেবদের জীবনাচরণ, খাবার-দাবার তাকে আকৃষ্ট করে না। তবে দায়িত্ব হিসেবেই সব কিছুর তদারকি করা হয় তাঁর। আগত মেহমানদের সেবার যেন কমতি না হয়, সে ব্যাপারে খুব সচেতন থাকতে হয়। নিজের বেলায় যেমন তেমন বন্ধু-বান্ধবদের সেবার ত্রুটি হলে হোয়াইট ভীষণ ক্ষেপে যান। তখন যাকে সামনে পান তার গায়েই শ্যামচাঁদ চালান। এমনিতেই হোয়াইট মানুষ হিসেবে যথেষ্ঠ রগচটা। পান থেকে চুন খসলেই মেজাজ খারাপ হয়ে যায় তাঁর। দিগুরও তখন তাঁর সামনে যেতে সাহস হয় না। … কুঠিতে নায়েবগিরি করতে এসে কম তো আর সাহেব দেখা হলো না! ওরা সবাই মোটামুটি একই। তারা প্রায় সকলেই রগচটা, দুর্মুখ। মনে তাদের দয়া-মায়া কম। যেমন অবলীলায় তারা বন্য শুয়োর শিকার করে, তেমন করেই এদেশের গরীব চাষীদের পিঠে চাবুক চালায়। যে চাবুককে তারা আদর করে বলে শ্যামচাঁদ।

দেখভাল করতে করতে হঠাৎ দিগুর চোখ যায় গুদামঘরের দিকে। আজ উৎসব বলে সমস্ত কুঠি মশাল জ্বেলে আলোকিত করা হয়েছে। গুদামঘরের দেয়ালে আলো পড়েছে ভালো মতোই। সে ঘরের ছোট্ট জানালাটা দিয়ে লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। মুখটা জানালার শিকে লাগিয়ে সে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। এখনো স্বাভাবিক হতে পারেনি বেচারা। দূর থেকেও তার মুখের অস্বাভাবিক ভয়টা টের পাওয়া যাচ্ছে। ক্ষণে ক্ষণে হেঁচকিও উঠছে তার। মায়া লাগে দিগুর, লোকটার জন্য। আজ সন্ধ্যা থেকে কত কত সুস্বাদু খাবারের আয়োজন করা হয়েছে কুঠিতে। হোয়াইট আর তাঁর অতিথিরা কত কত খাবার অপচয় করছে। অথচ সারাটাদিন বেচারাকে না খাইয়ে রাখা হয়েছে। কেউ বোধহয় ভয়ে এক ফোঁটা পানিও দেয়নি তার সামনে। দিগু লোকটার দিকে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। তাঁর মনটা হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। কুঠির কুকুর তিনটাও আজ পেটপুরে খেয়েছে। সেখানে মানুষ হয়েও সারাটা দিন অভুক্ত থাকতে হয়েছে লোকটাকে। তার বাড়ির লোকেরা নিশ্চয়ই খবর পেয়ে কুঠির সামনে এসে দাঁড়িয়ে আছে। কুঠির লাঠিয়াল বা প্রহরীরা কি আর তাদের ভেতরে ঢুকতে দিবে? হয়তো দূর দূর করে তাড়িয়েই দিয়েছ। … জলসা ঘরের উল্লাসের শব্দে গরীব কৃষক আর তার স্বজনদের আহাজারি চাপা পড়ে গেছে। আচ্ছা,  তাদের সেই নিঃশব্দ কান্না যদি অভিশাপ হয়ে ফিরে আসে কোনোদিন? ভাবতেই দিগুর কেমন ভয় ভয় লাগে। সেই অভিশাপের উত্তাপ কি তাঁর গায়েও লাগবে না? নিপীড়িত কৃষকদের চোখের পানির শীতলতায় কি তাঁর গা একদিন ঠান্ডা হয়ে আসবে না?

জলসাঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে দিগুর মনে হয়—জীবনের হিসেবে তাঁর বড় একটা ভুল হয়ে গেছে। মস্ত বড় ভুল। গরীব কৃষকটি আর তিনি তো একই মাটিরই সন্তান। দুজনের জন্ম, শ্বাস নেওয়া, বেড়ে উঠা—সব একই মাটিতে। কই কখনো তো তাঁর মনে হয়নি—এই অভুক্ত, গরীব, নিরীহ চাষীদের উপর অত্যাচার করাটা ঠিক হচ্ছে না। একবারও তো তাঁর মনে হয়নি, এই মাটি যাদের তাদের ইচ্ছেতেই সেই মাটিতে ফসল ফলবে। তিনি নিজেও তো কত কত কৃষকের পেটে লাথি দিয়েছেন, মুখের অন্ন কেড়ে নিয়েছেন। গ্রাম ছাড়া করেছেন কত কত জনকে। মিথ্যা দাদনের নামে কত জনের নামে মামলা করেছেন। … এই যে কুঠিতে এত কর্মচারী, দাস-দাসী—সবাই তো এই মাটিরই সন্তান। তারা সবাই তো স্বাজাতির উপর অত্যাচারে, নিপীড়নে বিজাতীদের সাহায্য করছে। এই যে বাংলায় শত শত কুঠি আছে, বছরের পর বছর ধরে নীলের চাষ হচ্ছে—এতে তো লাভবান হচ্ছে সাদা চামড়ার লোকেরাই। সুদূর বিলেত-ইউরোপ থেকে এসে এরা বাংলার জমিন দখল করে সম্পদের পাহাড় গড়ছেন। অথচ সেই পাহাড় গড়ার পেছনে যারা উদয়াস্ত খেটে শ্রম দিচ্ছে, তারা খাওয়ার জন্য দুই বেলা খাবার পাচ্ছে না ঠিক মতো। … অভিশাপ কি দেয় না তারা? দেয় তো প্রতিনিয়ত! তাদের চোখের জল নিরবে-নিঃশব্দে তো দেয়ই, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রকাশ্যেও তো অভিশাপ দেয় অনেকে। অভিশাপ! অভিশাপ! হঠাৎ সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে তাঁর।

নির্যাতিত কৃষকটির দিকে তাকিয়ে আজ যেন হঠাৎই চোখ খুলে যায় দিগুর। তবে আর বেশি কছু ভাবতে পারেন না তিনি। সাহেবের এক বন্ধুর ডাকে ভেতরে যেতে হয় তাকে।

পরবর্তী কয়েকটা দিন কাজে-কামের ফাঁকে ফাঁকে বারবার লোকটার মুখ মনে পড়ে দিগুর। চোখ বোজা লোকটার মাথা হেচকির থমকে থমকে নড়ে নড়ে উঠছে। … তার মাথা ন্যাড়া করা হচ্ছে। … ন্যাড়া মাথায় কাদা লেপ্টানো হচ্ছে নীলের বীজ বোনার জন্য। … আচ্ছা, অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে লোকটা কী দেখছিল সেদিন রাতে?

বড়দিনের চারদিন পর কী কাজে যেন দিগু গুদামঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবেই গুদামঘরের দিকে তাকান।  সেই লোকটার কী হলো? তাকে কি ছেড়ে দেওয়া হয়েছে? না তো! ওইতো লোকটাকে দেখা যাচ্ছে। বসে আছে মাটিতে। তার মাথায় চিকন চিকন নীলের চারা গজিয়েছে সত্যি সত্যি!

কুঠির নিয়ম হলো, যতদিন না নীলের বীজ থেকে চারা হয়, ততদিন তাকে খাবার-দাবার না দিয়ে বেঁধে রাখা হয়। এই লোকটার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে! দেখে তাই মনে হচ্ছে। আহা চোখ দুটো গর্তে ঢুকে গেছে বেচারার। মুখটাও কেমন মলিন!

লোকটাকে দেখতে দেখতে দিগুর ভেতরে হঠাৎ যেন কী হয়। তিনি লোকটার কাছে গিয়ে তাকে ডাকেন। গুদামঘরের ঘরের দরজা খুলে দিয়ে, তাকে কুঠির পেছন দিক দিয়ে বের হয়ে যেতে বলেন। লোকটা অবাক হয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকে। কিছু একটা যেন বলতে চায়। কিন্তু লোকটার কথা শোনার মতো সময় নেই তাঁর হাতে। কুঠির ভেতরে গিয়ে তাঁর হেফাজতে রক্ষিত কুঠির আওতাধীন সমস্ত কৃষকের দাদনের হিসাব রাখা লাল খাতাখানা নিয়ে কুঠি থেকে বের হয়ে যান দিগু।

কুঠি থেকে বের হয়েই জোর কদমে হাঁটতে শুরু করেন দিগু। কী এক ঘোরের মধ্যে পায়ে হেঁটেই প্রায় মধ্যরাতে তিনি পৌঁছান পোরাগাছা গ্রামে। আঁধারে তাঁর পথ চিনতে কষ্ট হয় না একটুও। তাঁর পা একবারের জন্যও থমকায় না। যেন কেউ একজন আলো হাতে তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। … পোরাগাছা তার জন্মগ্রাম। গ্রামের সমস্ত মানুষ সারাদিনের পরিশ্রম শেষে ঘুমের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে বহুক্ষণ আগেই। নিস্তব্ধ রাতের স্নিগ্ধ বায়ু তাকে স্বাগত জানায়। স্বাগত জানায়, গ্রামের বুড়ো বটগাছ আর তার ডালে বসা থাকা পেঁচাটাও। গ্রামের শ্মশানের পাশ দিয়ে, কবরস্থান পেরিয়ে তিনি হনহন করে হেঁটে যান।

বিজ্ঞাপন

guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments