প্রিয় ছেলে আমার,
এই দিনগুলোতে তোমাকে নিয়ে আমার উদ্বেগ উৎকণ্ঠার অন্ত নেই। আমি দেখতে পাচ্ছি তুমি দাঁড়িয়ে আছো বেশ কিছু বিপরীতমুখী স্রোতধারার মাঝে। সবগুলোই তোমাকে টানছে প্রবলভাবে। তুমি দাঁড়িয়ে আছো উত্তাল ঢেউয়ের মুখে। যা তোমাকে প্রতিনিয়ত আঘাত করছে। আমার বড় ভয় হয়—পাছে এই প্রতিকূলতার কাছে হেরে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলো। আমি এমন প্রতিকূলতার কাছে হেরে যাওয়া অনেককে দেখেছি যাদের পরিণতি আমাকে ব্যথিত করেছে। ডুবে যাওয়ার এমন অনেক দৃশ্য দেখেছি যা আমাকে আতঙ্কিত করেছে। আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে তোমার নিরাপত্তা কামনা করি। তুমি যেন এই প্রবল স্রোত আর বিক্ষুব্ধ ঊর্মিমালার ভয়াল থাবা থেকে নিরাপদে কূলে ফিরতে পারো।
রাজনীতির দুই স্রোতধারা
এই স্রোতধারাগুলোর মধ্যে সবার আগে সামনে আসে রাজনীতির স্রোতধারা। আমার দৃষ্টিতে রাজনীতির স্রোতধারা দুই দিকে প্রবাহিত হয়।
এক. জাতীয় স্বার্থের রাজনীতি।
দুই. দলীয় রাজনীতি।
জাতীয় স্বার্থের রাজনীতি হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ, আধিপত্যবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো। এসব ক্ষেত্রে ছাত্ররা অনেক সময় প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করেছে, যা দেশকে উপকৃত করেছে এবং স্বাধীনতার পথকে সুগম করেছে।
আর দলীয় রাজনীতি হচ্ছে, এক দলকে টেক্কা দিয়ে আরেক দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য ছাত্রদের তৎপরতা। এখানে কিছু ছাত্র একটি দলের পক্ষে আরেকটি দলের বিপক্ষে কাজ করবে, বিভিন্ন ছোটখাটো ইস্যুকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে এবং শাসনব্যবস্থার স্বাভাবিক গতি ব্যাহত করবে। এক দল ক্ষমতায় এলে, আরেক দলের ছাত্ররা তাদের বিরুদ্ধে সুযোগ পেলেই গোলযোগ সৃষ্টি করবে। আবার এরা ক্ষমতায় এলে ওরা একই কাজ করবে। এটাই হচ্ছে দলীয় রাজনীতির সাধারণ চরিত্র। এখানে জাতীয় কল্যাণের কিছু আছে বলে মনে হয় না? এখানে যা আছে তা হচ্ছে, এক দলকে ক্ষমতায় বসানো ও অন্য দলকে নামানোর খেলায় সময়, মেধা ও শক্তি-সামর্থ্যের অপচয়।
শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়
এ ধরনের অবস্থায় ছাত্ররা আসলে পরস্পরকে ধ্বংস করে, জাতির জন্য দৃশ্যমান কোনো অর্জন কিংবা জনকল্যাণে কোনো কার্যকর অবদানের কিছু এখানে থাকে না। দুঃখজনকভাবে কোনো কোনো সময় ছাত্রদের আন্দোলন এমন পর্যায়ে চলে যায় গোটা শিক্ষাব্যবস্থাটাই কার্যত অচল হয়ে পড়ে এবং ছাত্রদের একাডেমিক জীবন বরবাদ হয়ে যায়। যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চতর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়মিত পাঠদানের মোট সময় হিসাব করি, তাহলে তিন মাসের নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রমের হিসেবও বোধহয় পাওয়া যাবে না। ভয়াবহ দুরবস্থা অনুমানের জন্য এটুকুই যথেষ্ট।
জাতির ভবিষ্যৎ কোন দিকে
এর ফলাফল কী? ফলাফল বের করা সহজ। দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত এসব ছাত্ররা হয়তো পরীক্ষায় অকৃতকার্য হবে, ফলে প্রতিটি অকৃতকার্য ছাত্রের জীবনের একটি বছর নষ্ট হবে। সেই সঙ্গে জাতিরও বহু বছরের ক্ষতি হবে। যতজন ছাত্র ফেল করবে তত বছরের সমান ক্ষতি? অথবা তারা যদি পরীক্ষায় শিথিলতার কারণে পাস করে, তবে অযোগ্যদের হাতে সনদ তুলে দিতে হবে। জাতি পাবে একজন অদক্ষ চিকিৎসক, একজন অপরিপক্ব প্রকৌশলী ও একজন অযোগ্য কৃষিবিদ। এতে জাতির সর্বনাশ ছাড়া আর কিছুই হবে না।
জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ
বাবা, আমি তোমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ মেনে নিতে পারি—যদি তা হয় জাতীয় স্বার্থের রাজনীতি। জাতির স্বাধীনতা অর্জন ও জাতীয় অগ্রগতির লক্ষ্যে। তবে একটি শর্তে: দলের নেতৃবর্গ ও জাতির পথপ্রদর্শকগণকে আগে নিজেদের কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে এবং ছাত্রদের কাছে সহযোগিতা চাইতে হবে। তখন তোমাদের সাড়া দেওয়া কর্তব্য।
নেতৃত্বহীন আন্দোলনের পরিণতি
কিন্তু যদি নেতারা ময়দান থেকে সরে যান আর ছাত্ররা নেতৃত্ব ছাড়াই সামনে আসে, তবে তাদের অবস্থা হবে এমন এক সেনাবাহিনীর মতো, যার কোনো অফিসার নেই, কোনো জেনারেল স্টাফ নেই। ফলে একই বাহিনীর ভেতরেই কর্মপন্থা ও কর্মকৌশলের সংঘর্ষ ঘটবে, দ্রুত বিভক্তি সৃষ্টি হবে এবং অবধারিতভাবে পরাজয় নেমে আসবে।
রাজনীতি হবে মতাদর্শভিত্তিক, অন্ধভাবে পথচলা নয়
দলীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে তোমার নিজস্ব কোনো মতাদর্শের প্রতি ঝোঁক থাকতেই পারে। আমি এটাকে সমর্থন করি। কিন্তু প্রত্যক্ষ কর্মকাণ্ডে জড়ানোকে সমর্থন করি না। তুমি যে রাজনৈতিক দলের আদর্শে বিশ্বাস করো, তা গ্রহণ করতে পার এবং যুক্তি খাটিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করে তার সঠিকতা যাচাই করো; কিন্তু তা যেন কখনো স্ট্রাইক, ধর্মঘটের রূপ না নেয়। কারণ সাধারণ অবস্থায় স্ট্রাইক-ধর্মঘট মানে যথেষ্ট কারণ ছাড়াই পড়াশোনার ক্ষতি করা।
ব্যক্তি নয়, ব্যক্তিত্ব চিনতে হবে
শুধু পার্টি প্রধানের চেহারা দেখে পার্টির সমর্থন করা বাচ্চাসুলভ কাজ। বাচ্চারা ব্যক্তি চেনে, ব্যক্তিত্ব চেনে না। এরা সাদা চেনে, শুভ্রতা কী জিনিস তা জানে না। পিতাকে চেনে, পিতৃত্ব কী জিনিস তা বোঝে না। পরিণত মানুষই মূল্যবোধ ও নীতিমালাকে সঠিকভাবে মূল্যায়ন করে এবং শাসকদের কার্যক্রম বা সেই মূল্যবোধ ও নীতিমালা থেকে তাদের বিচ্যুতির জন্য জবাবদিহিতার আওতায় আনে। উন্নত জাতিগুলোর মাঝে এ সংস্কৃতির চর্চা দেখা যায়। কিন্তু প্রাচ্যের জাতিগুলোর মাঝে এটা এখনো গড়ে ওঠেনি।
প্রস্তুতি ছাড়া নেতৃত্ব নয়
তুমি ও তোমার মতো যারা আছো, তোমরা রাজনীতিকে হালকা-ফুলকা বিষয় মনে কর। তোমাদের কাছে মনে হয় এটা আর এমন কী বিষয়, সামান্য চিন্তাভাবনা করে যেকোনো পরিস্থিতিকে তোমরা সামাল দিতে পারবে। এটা তোমাদের ভুল ধারণা। প্রকৌশল, চিকিৎসা, রসায়নের মতো এটাও একটা পাঠ্য বিষয়। যে চিকিৎসাবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেনি তাকে কি তুমি প্রেসক্রিপশন লেখার বৈধতা দেবে? যে প্রকৌশলবিদ্যা শেখেনি তাকে কি তুমি প্রকৌশলী হিসেবে মেনে নেবে? তাহলে বলো, রাষ্ট্রবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা ছাড়া নিজেকে কেন রাজনীতিক হিসেবে দেখতে চাও?
এই কারণেই আমি তোমাকে রাজনীতিতে অনুশীলন ও প্রস্তুতির পর্যায়ে যুক্ত হওয়ার অনুমতি দিচ্ছি, সরাসরি নেতৃত্ব বা মাঠ পর্যায়ে সক্রিয় অংশগ্রহণের অনুমতি দিচ্ছি না। যারা রাজনীতিকে পেশা হিসেবে নিয়েছে, গভীরভাবে অধ্যয়ন করেছে এবং গবেষণাভিত্তিক মত গঠন করেছে—তাদের কাজ পর্যবেক্ষণ করো। তারা যদি তোমাদের সাহায্য চায়, তখন সাড়া দিয়ো।
তোমার কাছে আমার প্রথম ও প্রধান চাওয়া
আমি চাই, প্রথমে তুমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলবে, জ্ঞান ও শিক্ষাকেই প্রাধান্য দেবে। তারপর রাজনীতির অঙ্গনে প্রবেশ করবে। কারণ এই স্বাভাবিক ধারাটাই সঠিক; এর বিপরীত পথ প্রকৃতির নিয়মের সঙ্গে যায় না। তুমি নিজেকে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও সামরিক নেতার অবস্থানে দাঁড় করিয়েছ, আর তোমার জ্ঞানচর্চাকে করে তুলেছ রাজনৈতিক জীবনের এক তুচ্ছ পার্শ্ব-অনুষঙ্গ মাত্র! তোমার মতো একজনের কাছ থেকে—সে আমার সন্তান হিসেবেই হোক বা জাতির একজন সদস্য হিসেবে—এমন কাজ বড়ই পরিতাপের।
ছাত্র রাজনীতি কখন লাভজনক
বাবা, এই বিষয়ে সত্য জানতে চাইলে দেখো—ছাত্র রাজনীতি থেকে জাতি কী পেয়েছে আর কী খুইয়েছে। জাতি লাভবান হয়েছে তখন, যখন ছাত্র আন্দোলন ছিল বহিঃশত্রুর বিরুদ্ধে, নেতাদের সিদ্ধান্তে সংগঠিত এবং কেবল প্রয়োজনের মুহূর্তে পরিচালিত। কাজ শেষ হলে ছাত্ররা শৃঙ্খলা ও মনোযোগের সঙ্গে পড়াশোনায় ফিরে গেছে। আর জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তখন, যখন ছাত্ররা শত্রুকে নয়, নিজেদের মধ্যেই আঘাতে জড়িয়েছে—এক দলকে আরেক দলের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছে, সামান্য কারণ ও তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নেমে পড়েছে।
সমাপ্তি
হে আমার সন্তান! আমি আরও কিছু বিপজ্জনক প্রবণতা নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু চিঠি দীর্ঘ হয়ে গেল—তোমার ক্লান্তির আশঙ্কা করলাম।
তাই এখানেই বিদায় নিচ্ছি। আল্লাহ তোমাকে হেফাজত করুন।
ড. আহমদ আমীন