ইতিহাসে কিছু অঞ্চল ও যুগ এমনভাবে অন্ধকারে ঢাকা পড়ে যার প্রকৃত অবস্থা উপলব্ধি করা কঠিন হয়ে যায়। তাতার সভ্যতা ইতিহাসের এমনই এক “অন্ধকারাচ্ছন্ন অধ্যায়”, যার উৎপত্তি, বিস্তার ও পরিচিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিভ্রান্তি বিরাজ করেছে। বহু সময় তাতারদেরকে মঙ্গোলদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলার মতো ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়েছে। এর ফলে এই সভ্যতার প্রকৃত সক্ষমতা, ঐতিহাসিক ভূমিকা ও অস্তিত্বকে কখনো অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে কখনো অনাবশ্যকভাবে খাটো করে দেখা হয়েছে। তাই তাতারদের সম্পর্কে একটি নির্ভুল ও পরিশীলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছুনো এখনও কঠিন হয়ে দাড়িয়েছে। তবে ইতিহাসের বিবিধ সূত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়—এরা একদা উল্লেখযোগ্য এক মুসলিম জনগোষ্ঠী ছিল, যাদের বৃত্তান্ত আমাদের কাছে অনেকটাই উপেক্ষিত।
তাতারদের উৎপত্তি
তাতাররা মূলত তুর্কি জাতিগোষ্ঠীর বিভিন্ন উপজাতির সমষ্টি, যারা কৃষ্ণ সাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের উত্তরে বিস্তৃত তৃণভূমিতে বাস করত। পরবর্তীকালে “তাতার” শব্দটি মঙ্গোল সাম্রাজ্যের শাসনাধীন নানা গোষ্ঠীকে বোঝাতেও ব্যবহৃত হতে থাকে—বিশেষত রাশিয়ার এলাকাগুলোতে। ঐতিহাসিকভাবে তারা ছিল তুর্কি জাতিসমূহের একটি জোট, যাদেরকে ত্রয়োদশ শতকে চেঙ্গিস খান নেতৃত্বাধীন মঙ্গোলরা পরাজিত ও নিপীড়ন করে।
জনশ্রুতির সূত্র ধরে অনেকেই মনে করেন তাতার জাতি বিলুপ্ত হয়ে গেছে; বাস্তবে কিন্তু মধ্য এশিয়া, কাজাখিস্তান এবং ভলগা নদীর অববাহিকায় আজও তাদের কয়েকটি সম্প্রদায় বিদ্যমান। তাদের নিজস্ব একটি ভাষা আছে, যা তুর্কি ভাষা-পরিবারের অংশ।
তাতারি ভাষা
তাতারি ভাষা তুর্কি ভাষাগুলোর অন্তর্গত। কিছু ভাষাবিদ একে তথাকথিত “আলতাই ভাষা-পরিবারের” সদস্য হিসেবে বিবেচনা করেন—যার মধ্যে তুর্কি, মঙ্গোল ও মানচু ভাষা অন্তর্ভুক্ত। তাতারি ভাষা বর্তমানে রুশ ফেডারেশনের অন্তর্গত তাতারস্তানের সরকারি ভাষা। এছাড়া রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে যেমন বাশকিরতস্তান, মারি এল, উদমুর্তিয়া, মর্দোভিয়া এবং আরও কয়েকটি এলাকায় এটি ব্যবহৃত হয়। রাশিয়ার বাইরে উজবেকিস্তান, কাজাখিস্তান, আজারবাইজান, কিরগিজিস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং চীনের কিছু অঞ্চলেও এ ভাষায় কথা বলে এমন লোক আছে।
রাশিয়ার ২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দেশে তাতার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ৪.৭ মিলিয়ন। ২০১০ সালের পরিসংখ্যানে দেখা যায়—রাশিয়ার মোট জনসংখ্যার ৩% মানুষ (প্রায় ৪ মিলিয়ন) তাতারি ভাষায় কথা বলতেন। তবে ২০২০ সালের এক জরিপে এই সংখ্যা কমে ৩ মিলিয়নের কাছাকাছিতে দাঁড়ায়। রাশিয়ার বাইরেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তাতারি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী রয়েছে।
তাদের বর্ণমালার ইতিহাসেও বেশ পরিবর্তন দেখা যায়; যেমন, ১৯২৭ সাল পর্যন্ত আরবি লিপি ব্যবহৃত হতো। পরে সোভিয়েত নীতির অংশ হিসেবে ১৯৩৯ সালে সিরিলিক লিপি বাধ্যতামূলক করা হয়। সাম্প্রতিক সংস্কার অনুযায়ী আবার তাতারি ভাষাকে লাতিন লিপিতে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই ভাষাগত পরিচয় স্পষ্ট করে যে, তাতাররা মঙ্গোলদের থেকে পৃথক এক জাতিগোষ্ঠী—যদিও ইতিহাসে এ নিয়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি রয়েছে।
তাতার ও মঙ্গোল—ব্যবধান কোথায়?
অনেক গবেষক তাতার ও মঙ্গোলদের সম্পূর্ণ ভিন্ন জাতি বলে মনে করেন, যদিও তারা উভয়ই তুর্কি জাতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাতাররা মঙ্গোলিয়ার দক্ষিণ দিকে—চীনের কাছাকাছি এলাকায়—বসবাস করত; অন্যদিকে মঙ্গোলরা থাকত উত্তর দিকের সাইবেরিয়ার প্রান্তে। মঙ্গোলদের গ্রীষ্মকালীন চারণভূমি বিস্তৃত ছিল সাইবেরিয়ার দূর প্রান্ত পর্যন্ত।
জনশ্রুতি ছিল যে তাতাররা ছিল অপেক্ষাকৃত প্রাথমিক বা প্রাচীন সভ্যতার অধিকারী; তবে বহু ইতিহাসবিদের মতে—তারা ছিল উত্তর চীনের সর্বশেষ শাসকগোষ্ঠী, যারা চেঙ্গিস খানের আগ্রাসনের আগে যথেষ্ট উন্নয়নশীল রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনা করত।
চেঙ্গিস খানের অভিযানে তাতারদের বিশাল অংশ ধ্বংস হয় এবং তাদের যে কজন অবশিষ্ট ছিল, তারা মঙ্গোলদের সাথে মিশে যায়। মুসলিম ইতিহাসে প্রায়শই “তাতার” শব্দটি দিয়ে মঙ্গোল ও তাতার উভয়কেই বোঝানো হয়েছে। এর কারণ—
- মঙ্গোলরা যুদ্ধে নিজেদের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে তাতারদেরকে অগ্রবর্তী বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করত।
- অভিযানের পর মঙ্গোলরা উষ্ণ আবহাওয়ার স্বদেশে ফিরে যেত এবং বিজিত অঞ্চলের শাসনভার তাতারদের হাতে ছেড়ে দিত।
- উভয় জাতি চেহারা-সুরতে অনেক বেশি সাদৃশ্যপূর্ণ ছিল।
এই মিশ্র পরিবেশের কারণে আজকের তাতার পরিচয় অতীতের তুলনায় অনেক পরিবর্তিত।
“নতুন তাতার”—তাতার পরিচয়ের পুনর্গঠন
তাতারদের মূল জনগোষ্ঠী ধ্বংস হওয়ার পর যারা অবশিষ্ট ছিল, তারা মঙ্গোল ও অন্যান্য প্রতিবেশী জাতির সাথে মিশে নতুন এক জাতি সৃষ্টি করে—যাদেরকে “নতুন তাতার” বলা হয়। এরা তুর্কি-মঙ্গোল-তাতারি মিশ্র বংশোদ্ভূত, এবং এদের থেকেই গড়ে ওঠে গোল্ডেন হোর্ড (القبيلة الذهبية) নামে পরিচিত শক্তিশালী রাষ্ট্র।
গোল্ডেন হোর্ডের ভূখণ্ড সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের বিস্তৃত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল—উরাল পর্বত থেকে দানিয়ুব নদী পর্যন্ত, কৃষ্ণ সাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত।
এই “নতুন তাতাররা” নিজেদেরকে প্রথমে তাতার বলে পরিচয় দিত না। রুশ ও ইউরোপীয় লেখকরাই এদের জন্য “তাতার” ব্যবহার করেন।
সুতরাং চেঙ্গিস খানের পর বিজেতা ও শাসক হিসেবে তাতারদের পরিচয় অনেকাংশেই মঙ্গোল রাষ্ট্রের অংশ হয়ে ওঠে। এখান থেকেই প্রশ্ন আসে—তারা কীভাবে ইসলামের সাথে পরিচিত হলো?
তাতার জাতি ও ইসলাম
ইসলাম পূর্ব ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রথম পৌঁছয় ৯৪ হিজরিতে মুসলিম সেনাপতি কুতাইবা ইবনে মুসলিম আল-বাহিলির সফল অভিযানের মাধ্যমে। তিনি খাওয়ারিজম, বুখারা, সমরকন্দ, বলখ এবং কাশগর পর্যন্ত অঞ্চল মুসলিম শাসনের আওতায় আনেন। কাশগর তখন চীনের রাজধানীও ছিল।
তবে ইসলাম সেই সময় তাতারদের মূল আবাসভূমি পর্যন্ত পৌঁছয়নি। মঙ্গোল সাম্রাজ্যের তাতার সৈন্যরা ইসলামের সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয় লাভ করে মূলত গোল্ডেন হোর্ড রাষ্ট্রের মধ্য দিয়ে।
গোল্ডেন হোর্ড ছিল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী অংশ; চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর তার পুত্র ও পৌত্ররা এই অঞ্চল ভাগ করে নেয়। জোচির পুত্র বাতু (باطو) এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন এবং পূর্ব ইউরোপ, ভলগা অঞ্চল ও ককেশাসের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ড শাসন করেন।
এই রাজ্যেই মানুষ ধীরে ধীরে ইসলামের ছায়াতলে আসতে থাকে এবং পরবর্তীকালে তাতার পরিচয় মুসলিম পরিচয়ের সাথে যুক্ত হয়ে যায়।
নতুন তাতার জাতি
চেঙ্গিস খানের হাতে প্রাচীন তাতারদের নিধন সম্পন্ন হওয়ার পর, এবং অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী যখন মঙ্গল গোত্রের সাথে মিশে যায়, তখন ইতিহাসে যে গোষ্ঠীকে “নতুন তাতার” বলা হয়, তার আবির্ভাব ঘটে। এরা ছিল এক ধরনের মিশ্র জাতিগোষ্ঠী—তুর্কি, মঙ্গল ও তাতার—যারা পরবর্তীতে চেঙ্গিস খানের নাতির প্রতিষ্ঠিত (Golden Horde) রাষ্ট্রের আদিপুরুষ ও মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে।
গোল্ডেন হোর্ড রাষ্ট্রের ভূখণ্ডের সর্বোচ্চ পরিধি সাইবেরিয়া ও মধ্য এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপের পূর্বাঞ্চলের বিস্তৃত অংশ পর্যন্ত প্রসারিত ছিল। পূর্বদিকে উরাল পর্বতমালা, পশ্চিমে দানিয়ুব নদী, দক্ষিণে কৃষ্ণসাগর থেকে কাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃতি নিয়ে তাদের ভূ-সীমা গঠিত হয়। আর ককেশাস পর্বতমালা ও ভূমধ্যসাগর অঞ্চলটি তাদের দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্তকে ঘিরে রেখেছিল।
এই নতুন তাতার জনগোষ্ঠীর পূর্বসূরি মঙ্গোলেরা প্রকৃতপক্ষে নিজেদেরকে কখনো “তাতার” নামে পরিচিত করাতে আগ্রহী ছিলেন না, এবং তাদের জাতিগত উৎপত্তি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তারা নিজেরাও নিজেদেরকে তাতার বলে পরিচয় দিতেন না; বরং রুশ ও ইউরোপীয়রা তাদেরকে এ নাম প্রদান করে, এবং সময়ের সাথে তারা এই অভিহিতকরণ গ্রহণ করেন।
এভাবে দেখা যায় যে, চেঙ্গিস খানের হাতে প্রাচীন তাতারদের ধ্বংসের পর বেঁচে থাকা অংশটি কার্যত মঙ্গোল সমাজের অংশ হয়ে যায়, এবং পরবর্তীকালে মঙ্গোলরাই মুসলিম ভূখন্ডগুলোতে আক্রমণ চালায়; সেই সূত্রে তাতারদেরও ইসলামের সাথে পরিচয় ঘটে এবং তারা ইসলামের অংশ হয়।
মাশাল্লাহ।
মাশাল্লাহ।
খানিকটা ঘোলাটে— মঙ্গোলেরা নিজেদেরকে তাতার বলে পরিচয় দিতেন না, তবু কীসের ভিত্তিতে রুশ ও ইউরোপীয়রা তাদেরকে তাতার খেতাব করতো? শুধু এদের খেতাবের কারণেই কি ইতিহাসে মঙ্গোলেরা তাতার হয়ে উঠলো?