লোগোস বনাম আমানত—এক ভিন্ন দার্শনিক জগৎ:
মরক্কোর চিন্তক তহা আবদুর রহমান (জন্ম: ১৯৪৪ খ্রি.) সমকালীন মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রে এক ব্যতিক্রমী এবং জটিল ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক মহীরুহ’। তাকে প্রথাগত কোনো তাত্ত্বিক বর্গে—হোক তা ইসলামপন্থী, উদার সংস্কারবাদী, ধ্রুপদী সালাফি, মার্কসবাদী কিংবা উত্তর-আধুনিক বিনির্মাণবাদী—আবদ্ধ করা প্রায় অসম্ভব। তহার চিন্তার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছে ‘নৈতিক আধুনিকতা’—যেখানে বুদ্ধি (আকল), নৈতিকতা (আখলাক) এবং আধ্যাত্মিক আত্মশুদ্ধি (তাজকিয়া) একে অপরের থেকে বিযুক্ত কোনো সত্তা নয়, বরং এক অখণ্ড ও আন্তঃসম্পর্কিত দার্শনিক বাস্তবতা।
তিনি পশ্চিমা যুক্তিধর্মিতাকে কেবল একটি ভৌগোলিক বা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখেন না; বরং একে একটি ‘নৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ’ এবং ‘আধ্যাত্মিক বিযুক্তি’র আধার হিসেবে চিহ্নিত করেন। তাঁর ভাষায়, আধুনিকতার প্রকৃত সংকট জ্ঞানতাত্ত্বিক বা প্রযুক্তিগত নয়, বরং তা মৌলিকভাবে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক (Abderrahmane, 2006, pp. 45–67)।
বুদ্ধিবৃত্তিক গঠন: আন্দালুসি ঐতিহ্য, সুফি অভিজ্ঞতা ও বিশ্লেষণাত্মক দর্শনের সংশ্লেষ:
তহার বৌদ্ধিক বিবর্তনের মূলে তিনটি প্রধান ধারা কার্যকর: আন্দালুসি যুক্তিবিদ্যার ঐতিহ্য, সুফি-নৈতিক অভিজ্ঞতা এবং পশ্চিমা বিশ্লেষণাত্মক দর্শন। তিনি ইবনে রুশদীয় ‘বিশুদ্ধ যুক্তিধর্মিতা’র পরিবর্তে ইবনে আরাবির আধ্যাত্মিক-নৈতিক বোধকে যুক্তিকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস পান। প্যারিসে উচ্চতর লজিক ও ভাষা দর্শনে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে তাঁর কাজে উইটগেনস্টাইন, হাইডেগার এবং লেভিনাসের প্রভাব স্পষ্ট (Hallaq, 2019, p. 23)।
আল-লিসান ওয়া আল-মিজান (২০০৫): ভাষার নৈতিকতা ও অনুবাদের রাজনীতি:
তহা আল-লিসান ওয়া আল-মিজান-এ লেখেন: لا فكر إلا باللسان—’ভাষা ছাড়া কোনো চিন্তা নেই।’ তিনি ‘তাকলিদি অনুবাদ’ (হুবহু নকল, যা বুদ্ধিবৃত্তিক দাসত্ব তৈরি করে) এবং ‘তাজদিদি অনুবাদ’ (সৃজনশীল রূপান্তর)-এর মধ্যে পার্থক্য করেন। পশ্চিমা দর্শন যখন ‘লোগোস’-কেন্দ্রিক, ইসলামি দর্শন তখন ‘কালাম’-কেন্দ্রিক—যা সরাসরি আমলের সঙ্গে যুক্ত (Abderrahmane, 2005, p. 43)।
রুহ আল-হাদাসা (২০০৬): আধুনিকতার নৈতিক পুনঃসংজ্ঞা ও ‘তাখলিক’:
তহার আকর গ্রন্থ রুহ আল-হাদাসা-এ তিনি দাবি করেন যে, আধুনিকতা কোনো একক পশ্চিমা একচেটিয়া প্রকল্প নয়। তিনি আধুনিকতাকে দুই ভাগে বিভক্ত করেন: আধুনিকতার রুহ—সৃজনশীলতা, সমালোচনা ও স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা, যা কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সম্পদ নয়; এবং আধুনিকতার প্রয়োগ—পশ্চিমের বস্তুবাদী, যান্ত্রিক রূপ। তহা বলেন, পশ্চিমা আধুনিকতা একটি ‘কারিগরি আধুনিকতা’য় পর্যবসিত হয়েছে; ইসলামি সভ্যতা এর বিপরীতে একটি ‘নৈতিক আধুনিকতা’ উপহার দিতে সক্ষম, যেখানে প্রযুক্তি ও অগ্রগতি আমানতের অধীন থাকবে (Abderrahmane, 2006)।
সুয়াল আল-আখলাক (২০১০): নৈতিকতাকে জ্ঞানের কেন্দ্রে আনা:
তহার বিখ্যাত থিসিস: ‘নৈতিকতা জ্ঞানতত্ত্বের পূর্বগামী’ (Ethics precedes epistemology)। পশ্চিমা দর্শনে জ্ঞান ও যুক্তিকে নৈতিকতা থেকে আলাদা রাখা হয়—তহা এই বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি মনে করেন, একজন মানুষ যদি নৈতিকভাবে পরিশুদ্ধ না হয়, তবে তার দ্বারা প্রাপ্ত ‘জ্ঞান’ শেষ পর্যন্ত বিনাশী হতে বাধ্য (Abderrahmane, 2010, p. 17)।
দেকার্ত, কান্ট ও হাইডেগারের ব্যবচ্ছেদ: এক নৈতিক মোকাবিলা:
দেকার্তের cogito ergo sum-এর ‘বিচ্ছিন্ন আমি’-র বিপরীতে তহা ‘স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে সত্তা’ প্রস্তাব করেন। কান্টের ‘ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পেরাটিভ’কে তিনি ‘রুহানি অহংকার’ হিসেবে দেখেন—মানুষের নৈতিকতা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, এটি স্রষ্টার দেওয়া আমানত। হাইডেগারের Being-towards-death-এর বিপরীতে তিনি Being-towards-God-এর প্রস্তাব দেন। হাইডেগার লিখেছিলেন:
The essence of technology is by no means anything technological… Everywhere we remain unfree and chained to technology. (Heidegger, 1977, p. 4)
তহার মতে, হাইডেগারের চিন্তা ‘টেকনিক’ পর্যন্ত পৌঁছে থমকে গেছে—যা নৈতিক ও রুহানি মুক্তি দিতে অক্ষম (Abderrahmane, 2006, pp. 198–221)।
সমকালীন গাজালি বনাম তহা: এক বিনয়ী প্রত্যাখ্যানের দর্শন:
তহাকে প্রায়ই ‘একবিংশ শতাব্দীর ইমাম গাজালি’ বলা হয়। উভয়েই মনে করেন, নিছক বুদ্ধি মানুষকে সত্যের পূর্ণতায় পৌঁছাতে পারে না—যদি না তার সঙ্গে হৃদয়ের আলোক বা ‘নূর’ যুক্ত হয়। কিন্তু তহা এই তকমা প্রত্যাখ্যান করেন। গাজালি যেখানে গ্রিক দর্শনের এরিস্টটলীয় লজিক সরাসরি গ্রহণ করেছিলেন, তহা সেখানে দর্শনের ভাষা ও যুক্তিকাঠামোকেও ব্যবচ্ছেদ করেন। তিনি কেবল একজন ‘আলেম’ হিসেবে নয়, পেশাদার যুক্তিবিদ হিসেবে কান্ট-হাইডেগারের চোখে চোখ রেখে কথা বলেন।
সমকালীন মুসলিম দার্শনিকদের সঙ্গে তুলনামূলক পর্যালোচনা:
তহা আবদুর রহমানের দার্শনিক প্রকল্পটি সমকালীন মুসলিম চিন্তকদের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হলে তাঁর স্বাতন্ত্র্য ও গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। নিচে জন্মসালের ক্রমানুসারে প্রতিজন চিন্তকের সঙ্গে তাঁর মিল ও অমিল মূল গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতিসহ চিহ্নিত করা হলো।
দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ (১৯০৬–১৯৯৯):
বাংলাদেশের দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ দুটি গ্রন্থে বৈজ্ঞানিক জগৎ ও ধর্মীয়-নৈতিক জগতের সম্পর্ক নিয়ে গভীর অবস্থান গ্রহণ করেছেন। প্রথমটি জীবন দর্শনের পুনর্গঠন (প্রথম প্রকাশ ১৯৬৪, করাচি: তমিজউদ্দিন খান); দ্বিতীয়টি জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম (প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৫৯; মাওলা ব্রাদার্স সংস্করণ: নভেম্বর ২০০৬, ঢাকা)।
জীবন দর্শনের পুনর্গঠন-এ আজরফ বিজ্ঞান ও নৈতিকতার সমন্বয়ের প্রশ্নে লেখেন:
বৈজ্ঞানিক জগতের সঙ্গে ধর্মীয় ও নৈতিক জগতের মানগুলোর সমন্বয় সম্ভবপর হয়। কারণ, এতে বৈজ্ঞানিক জগতের সর্বপ্রধান সূত্র কার্যকারণের নীতি (Principle of causality) অক্ষুণ্ণ রেখেও নৈতিক ও ধর্মীয় মানগুলো সংরক্ষণের সুব্যবস্থা হয়। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানে বা ব্যবহারিক জ্ঞানে আল্লাহর সৃষ্টিজগতে আপাতত অণু-পরমাণুর খেলা দৃষ্ট হলেও যুক্তি ও স্বজ্ঞার মাধ্যমে সে অণু-পরমাণুর সত্যিকার স্বরূপ সম্বন্ধে সঠিক ধারণা করা সম্ভব। ইন্দ্রিয়জ জ্ঞানের পর্যায়ে না হলেও নৈতিক বা ধর্মীয় জীবনের অভিজ্ঞতাকে মায়া-মরীচিকা বলে উড়িয়ে দেওয়ার কোনো সংগত কারণ নেই। জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরে তাদের সত্যতা আমাদের বাধ্য হয়েই স্বীকার করতে হয়। (আজরফ, ১৯৬৪, পৃ. ৫১–৬০)
একই সূত্রে জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম-এর ‘জীববিজ্ঞানের শিক্ষা’ পরিচ্ছেদে আজরফ ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের একপেশে পাঠের সমালোচনা করেন:
জীবজগতের সর্বত্রই জীবনযুদ্ধের দৃশ্য দৃষ্ট হলেও ডারউইন জীবনের শত্রুতার দিকটাই লক্ষ করেছেন। প্রাণীজ জগৎ ও প্রকৃতির মধ্যে তিনি বৈরিতার সূত্রই আবিষ্কার করেছেন, তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার দিকটা তিনি এড়িয়ে গেছেন। তিনি জীবজগতের এ যুদ্ধকে শত্রুর বিরুদ্ধে এবং প্রাকৃতিক উপাদানের বিপক্ষে জীবের টিকে থাকার যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন। (আজরফ, ১৯৫৯/২০০৬, পৃ. ২০)
এই সমালোচনার ইতিবাচক বিকল্প হিসেবে আজরফ আরও বলেন:
জীববিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত অনুসারে বিভিন্ন শ্রেণির জীবের মধ্যে যুদ্ধ রয়েছে সত্যিই, তবে সে যুদ্ধই জীবনের একমাত্র রূপ নয়। সে যুদ্ধের মধ্যেও প্রেম, মৈত্রী ও ভালোবাসা রয়েছে। সন্তানের জন্য পিতামাতার বুকে রয়েছে অপার স্নেহ, দম্পতির মধ্যে সাধারণত রয়েছে অগাধ ভালোবাসা, বাচ্চাদের প্রতি বুড়োদের রয়েছে বাৎসল্যবোধ। একই প্রজাতির বিভিন্ন ব্যষ্টিদের মধ্যে রয়েছে সংঘবদ্ধ হয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা। মানবজীবনে কেবল যুদ্ধই একমাত্র সারসত্য নয়। সেই যুদ্ধের অন্তরালেও মানুষের যূথচারী প্রবৃত্তি তাকে সমষ্টিচেতনায় উদ্বুদ্ধ করে। মানবজীবনের অনেকগুলো কাজকর্মই নিয়ন্ত্রিত হয় প্রেম, দয়া-মায়া-স্নেহ প্রভৃতি সুকুমার বৃত্তি দ্বারা। (আজরফ, ১৯৫৯/২০০৬, পৃ. ২২)
▌ মিলের বিন্দু
ক. বৈজ্ঞানিক বিশ্বদৃষ্টির অসম্পূর্ণতার সমালোচনা: আজরফ দেখান যে ডারউইন জীবজগতের শুধু ‘যুদ্ধের’ দিক দেখেছেন, ‘সহযোগিতার’ দিক এড়িয়ে গেছেন—অর্থাৎ বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি বাস্তবতার কেবল একটি খণ্ডিত স্তর ধারণ করে। তহার সমালোচনার মূল সুরও একই: পশ্চিমা যুক্তিধর্মিতা মানব-অস্তিত্বের কেবল ‘কারিগরি’ মাত্রাটি দেখে, নৈতিক ও রুহানি মাত্রাকে অস্বীকার করে। তহা রুহ আল-হাদাসা-এ এই একই সমস্যাকে ‘আধুনিকতার প্রযুক্তিগত বিচ্যুতি’ বলে চিহ্নিত করেন (Abderrahmane, 2006)।
খ. ‘প্রেম ও মৈত্রী’ বনাম ‘আমানত’: আজরফ জীবজগতে ‘প্রেম, মৈত্রী ও ভালোবাসা’কে যুদ্ধের পাশাপাশি মানবজীবনের অপরিহার্য সত্য হিসেবে তুলে ধরেন। তহার কাছে এই ‘প্রেম ও সহযোগিতা’র নৈতিক ভিত্তি হলো ‘আমানত’—স্রষ্টার কাছে মানুষের দায়বদ্ধতা, যা মানুষকে কেবল যুদ্ধ-প্রতিযোগিতায় নয়, বরং পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীলতায় আবদ্ধ করে। আজরফের ‘যূথচারী প্রবৃত্তি’ এবং তহার ‘আন্তঃব্যক্তিক নৈতিকতা’ একই মানবিক বাস্তবতার দুটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ।
গ. জ্ঞানের স্তরভেদ ও নৈতিক জ্ঞানের সত্যতা: আজরফ বলেন ‘জ্ঞানের বিভিন্ন স্তরে’ ধর্মীয়-নৈতিক অভিজ্ঞতার সত্যতা স্বীকার করতে হবে। তহাও ঠিক একইভাবে জ্ঞানকে একক ইন্দ্রিয়জ মানদণ্ডে বিচার করার পশ্চিমা প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করেন। তহা সুয়াল আল-আখলাক-এ লেখেন: নৈতিকতা কোনো জ্ঞানের পরিশিষ্ট নয়, বরং এটিই জ্ঞানের ভিত্তি (Abderrahmane, 2010, p. 17)। আজরফের ‘যুক্তি ও স্বজ্ঞা’র মিলন এবং তহার ‘তাজকিয়া-পরিশুদ্ধ আকল’—উভয়ই ইন্দ্রিয়জ বুদ্ধির সীমা অতিক্রম করার চেষ্টা।
ঘ. ‘কার্যকারণের নীতি অক্ষুণ্ণ রেখে নৈতিক মান সংরক্ষণ’: আজরফের এই প্রস্তাব আসলে তহার ‘আধুনিকতার রুহ’কে নৈতিক কাঠামোয় পুনর্গঠনের সমতুল্য। উভয়েই বিজ্ঞানকে বর্জন না করে তাকে নৈতিকতার অধীনস্থ করতে চান।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. সমালোচনার গভীরতার তারতম্য: আজরফ ডারউইনীয় বিবর্তনবাদের ‘অসম্পূর্ণতা’ দেখিয়ে একটি পরিপূরক দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করেন—মূলত সমন্বয়বাদী অবস্থান। তহা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক: তিনি পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামোকে তার ভিত্তি থেকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন, কেবল সমন্বয় নয় বরং সম্পূর্ণ ‘তাখলিক’ বা পুনর্নির্মাণ দাবি করেন।
খ. ভাষার রাজনীতির অনুপস্থিতি: আজরফ পশ্চিমা পরিভাষায় (‘principle of causality’, ‘instinct’ ইত্যাদি) ইসলামি সত্য প্রকাশ করেন—যা তহার দৃষ্টিকোণ থেকে ‘তাকলিদি অনুবাদ’-এর সমস্যামুক্ত নয়। তহার কাছে, পশ্চিমা পরিভাষা গ্রহণ মানে সেই পরিভাষার জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোও গ্রহণ করা।
গ. ইসলামি পরিভাষার অনুপস্থিতি: আজরফ ‘আকল’, ‘তাজকিয়া’, ‘আমানত’ ইত্যাদি ইসলামি পরিভাষায় তাঁর যুক্তি নির্মাণ করেননি। এর ফলে তাঁর দর্শন সমন্বয়বাদী হয়ে পড়ে, সভ্যতামূলক বিকল্পের রূপ নেয় না। তহার প্রকল্প এই অর্থে আরও মৌলিক—তিনি ইসলামি পরিভাষাকেই দার্শনিক বিশ্লেষণের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।
ইসমাইল রাজি আল-ফারুকি (১৯২১–১৯৮৬):
ফিলিস্তিনি-আমেরিকান চিন্তক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকি ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ (Islamization of Knowledge) আন্দোলনের পথিকৃৎ। তাঁর আকর গ্রন্থ Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan (1982)-এ তিনি যুক্তি দেন যে, আধুনিক জ্ঞানকে ইসলামি ঐতিহ্যের সারমর্মের সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে এবং সমগ্র জ্ঞানভাণ্ডারকে তাওহিদের আলোকে পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি মনে করেন, উম্মার প্রকৃত সংকট রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়—এটি শিক্ষা ও চিন্তার সংকট; মুসলিমরা ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করছে (Al-Faruqi, 1982)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. পশ্চিমা জ্ঞানের সমালোচনা: ফারুকি এবং তহা উভয়েই একমত যে, পশ্চিমা জ্ঞানের কাঠামো মুসলিম উম্মার জন্য সরাসরি গ্রহণযোগ্য নয়। ফারুকির ‘ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থার উত্তরাধিকার’ এবং তহার ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ’ একই সমস্যার দুটি নাম।
খ. তাওহিদের কেন্দ্রীয়তা: ফারুকি তাওহিদকে জ্ঞানের ঐক্যকারী নীতি মনে করেন—তহাও ‘আমানত’ ও ‘তাজকিয়া’র মাধ্যমে একটি তাওহিদকেন্দ্রিক জ্ঞানতত্ত্ব নির্মাণ করেন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘যান্ত্রিক প্রয়াস’ বনাম দার্শনিক রূপান্তর: তহা সরাসরি বলেন যে, ফারুকির ‘ইসলামীকরণ’ প্রকল্প একটি ‘যান্ত্রিক প্রয়াস’ মাত্র। পশ্চিমা জ্ঞানের কাঠামো ঠিক রেখে তাতে ইসলামি প্রলেপ দেওয়া যথেষ্ট নয়। তহার ভাষায়, ‘ফারুকি পশ্চিমা পিরামিডের ভেতরে থেকেই কাজ করছেন।’ ফারুকির প্রকল্প কেবল সাবজেক্ট ম্যাটার বদলায়, কিন্তু ভাষার দার্শনিক কাঠামো—যা জ্ঞানের গভীরতম স্তর—অপরিবর্তিত রাখে (Hallaq, 2019, pp. 78–90)।
খ. ‘তাখলিক’ বনাম ‘ইন্টিগ্রেশন’: ফারুকি ‘আধুনিক জ্ঞানকে ইসলামি ঐতিহ্যের সঙ্গে সমন্বিত করা’ (integration)-এর কথা বলেন। তহা মনে করেন, ‘সমন্বয়’ নয়, প্রয়োজন ‘তাখলিক’—পশ্চিমা ধারণার পিরামিড ভেঙে নতুন মুসলিম নৈতিক মিজানে পুনর্নির্মাণ।
সৈয়দ আলী আশরাফ (১৯২৫–১৯৯৮):
বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ-ইসলামি শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক সৈয়দ আলী আশরাফ ইসলামি শিক্ষাদর্শনের ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য কণ্ঠস্বর। তিনি ১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত প্রথম বিশ্ব ইসলামি শিক্ষা সম্মেলনের অন্যতম মূল উদ্যোক্তা ছিলেন এবং কেমব্রিজে ইসলামিক একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দুটি প্রধান গ্রন্থ—Crisis in Muslim Education (সৈয়দ সাজ্জাদ হোসায়েনের সঙ্গে, ১৯৭৯) এবং New Horizons in Muslim Education (১৯৮৫)—মুসলিম শিক্ষাদর্শনের ভিত্তি পুনর্নির্মাণের দুটি মাইলফলক।
আশরাফের কেন্দ্রীয় যুক্তি হলো: মুসলিম সমাজের শিক্ষা-সংকট কেবল পাঠ্যক্রমের সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর দার্শনিক ও আধ্যাত্মিক সংকট—মানুষের সম্পূর্ণ সত্তার (রুহ, আকল, কলব, নফস) পরিবর্তে শুধু বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রাকে লালন করা হচ্ছে। তিনি যুক্তি দেন যে, পশ্চিমা সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা মানুষকে একটি ‘উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক একক’ হিসেবে গড়ে তোলে, ‘আল্লাহর খলিফা’ হিসেবে নয়। ইসলামি শিক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের সামগ্রিক ব্যক্তিত্বের সুষম বিকাশ—বুদ্ধিবৃত্তিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক মাত্রা একসঙ্গে (Ashraf, 1985)।
তিনি আরও মনে করেন, পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয় মডেল অনুসরণ করে মুসলিম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার অর্থ হলো পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা। এই কাঠামোয় ‘ধর্মীয় জ্ঞান’ ও ‘পার্থিব জ্ঞান’কে দুটি আলাদা বিভাগে রাখা হয়—যা ইসলামের তাওহিদি বিশ্বদৃষ্টির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। আশরাফের প্রস্তাব ছিল এই দ্বৈততার বিলোপ এবং একটি সমন্বিত ইসলামি পাঠ্যক্রমের নির্মাণ (Ashraf & Hussain, 1979)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. পশ্চিমা সেক্যুলার শিক্ষার সমালোচনা: আশরাফ ও তহা উভয়েই মনে করেন, পশ্চিমা শিক্ষা মানুষের রুহানি ও নৈতিক মাত্রাকে বাদ দিয়ে কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ও অর্থনৈতিক সত্তা গড়ে তোলে। তহার ‘কারিগরি আধুনিকতা’র সমালোচনা এবং আশরাফের ‘উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক একক’ বনাম ‘আল্লাহর খলিফা’র দ্বন্দ্ব মূলত একই সমস্যার ভিন্ন প্রকাশ।
খ. জ্ঞানের দ্বৈততার প্রত্যাখ্যান: আশরাফ ‘ধর্মীয় জ্ঞান’ ও ‘পার্থিব জ্ঞান’-এর পশ্চিমা বিভাজন প্রত্যাখ্যান করেন—তহাও ঠিক একইভাবে জ্ঞানকে নৈতিকতা থেকে আলাদা রাখার পশ্চিমা প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করেন (Abderrahmane, 2010, p. 17)। উভয়ের কাছেই তাওহিদ মানে জ্ঞানের অবিভাজ্যতা।
গ. মানুষের সম্পূর্ণ সত্তার বিকাশ: আশরাফ রুহ, আকল, কলব, নফস-এর সমন্বিত বিকাশের কথা বলেন। তহার ‘তাজকিয়া-পরিশুদ্ধ আকল’ও এই একই সামগ্রিক মানব-সত্তার ধারণার ওপর প্রতিষ্ঠিত—কেবল বুদ্ধি নয়, হৃদয়ও পরিশুদ্ধ হতে হবে।
ঘ. ঔপনিবেশিক শিক্ষাকাঠামোর প্রত্যাখ্যান: আশরাফ ও তহা উভয়েই একমত যে, মুসলিম সমাজে পশ্চিমা শিক্ষাকাঠামোর অনুকরণ জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদকে স্থায়ী করে—এটি তহার ‘তাকলিদি অনুবাদ’ সমালোচনার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. শিক্ষা-সংস্কার বনাম দার্শনিক পুনর্গঠন: আশরাফের প্রকল্প মূলত প্রাতিষ্ঠানিক ও পাঠ্যক্রমকেন্দ্রিক—কীভাবে বিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো পরিবর্তন করা যায়। তহার প্রকল্প আরও গভীর এবং মৌলিক—তিনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আগে ভাষা ও যুক্তির দার্শনিক কাঠামো পুনর্নির্মাণের কথা বলেন। তহার দৃষ্টিতে, শিক্ষাব্যবস্থা ঠিক করলেও যদি ভাষার জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো পশ্চিমা থাকে, তাহলে মূল সমস্যা অমীমাংসিত থাকে।
খ. ফারুকির সঙ্গে পার্থক্য এবং তহার সঙ্গে দূরত্ব: আশরাফ ও ফারুকি একই বৃত্তে কাজ করেছেন—১৯৭৭ সালের মক্কা সম্মেলনে উভয়ের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল। আশরাফ যেখানে শিক্ষার মাধ্যমে ‘সম্পূর্ণ মানুষ’ গড়তে চেয়েছেন, তহা সেখানে ‘সম্পূর্ণ মানুষ’ কী—এই প্রশ্নের দার্শনিক ভিত্তি নির্মাণে বেশি আগ্রহী।
গ. ভাষার রাজনীতি সম্পর্কে নীরবতা: আশরাফ ইংরেজিতে লিখেছেন এবং পশ্চিমা একাডেমিক ভাষায় ইসলামি শিক্ষাদর্শন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছেন। তহার দৃষ্টিতে এটি একটি মৌলিক দ্বন্দ্ব—ইসলামি শিক্ষার কথা পশ্চিমা পরিভাষায় বলতে গেলে সেই পরিভাষার জ্ঞানতাত্ত্বিক ভার বহন করতে হয়।
ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান (১৯২৬–২০২১):
বাংলাদেশের ইসলামি চিন্তার অন্যতম পুরোধা ড. মুঈনুদ্দীন আহমদ খান তাঁর ইসলামে দর্শন চিন্তার পটভূমি (১৯৮০) গ্রন্থে ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের মৌলিক প্রশ্নগুলো নিয়ে এক গভীর ও মৌলিক আলোচনা উপস্থাপন করেছেন। এই গ্রন্থ কেবল ইতিহাসের পুনর্কথন নয়—এটি একটি সুনির্দিষ্ট দার্শনিক অবস্থান, যেখানে ‘বিবেক’ বা নৈতিক অন্তর্দৃষ্টিকে মানবজ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
গ্রন্থের শুরুতেই ড. খান নৈতিক জ্ঞানের উৎস সম্পর্কে তাঁর কেন্দ্রীয় থিসিস উপস্থাপন করেন:
মানুষ যখন চাক্ষুষ দৃষ্টির অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে, শেষ বিচারের কথা স্মরণ করে স্বইচ্ছায় কৃত নিজের ভালোমন্দ কর্মের দায়িত্ব উপলব্ধি করে, তখনই নৈতিক ভিত্তিতে মানবিক জ্ঞানের উদয় হয়। কারণ, মানবিক অর্থনৈতিক এবং নৈতিক অর্থ বিবেকনিসৃত। (খান, ১৯৮০, পৃ. ১)
এই থিসিসের সঙ্গে সংগতি রেখে তিনি পশ্চিমা ‘সাদা-ফলকবাদ’ বা tabula rasa-এর তীব্র সমালোচনা করেন:
এরূপ সাদা-ফলকবাদে জ্ঞানকে বস্তুগত ও বন্ধ্যা করার প্রয়াস নিহিত থাকে। গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে মানব মনের এহেন ব্যাখ্যা বিভ্রান্তিকর প্রতীয়মান হয়। অন্তত পক্ষে মুসলমানদের নিকট ইহা গ্রহণীয় নয়। কেননা ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষ কেবল চিন্তাশীল প্রাণী নয়, এমনকি কেবলমাত্র প্রাণিশ্রেষ্ঠ জীব নয়, বরং বিবেকবান মানবও বটে এবং বিবেকগুণেই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ। (খান, ১৯৮০, পৃ. ১৩–১৪)
গ্রন্থের সবচেয়ে দার্শনিকভাবে সমৃদ্ধ অংশে ড. খান ইসলামি জ্ঞানতত্ত্বের দুটি মূল ধারণা—তাফাককুর ও তাদাব্বুর—বিশ্লেষণ করে একটি অনন্য জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেল তৈরি করেন:
‘তাফাককুর’ অর্থ দর্শন ও ‘তাদাব্বুর’ অর্থ হৃদয়াঙ্গম। সোজা কথায়, চোখে দেখা অনুভূতিকে চোখ বন্ধ করে ভেবে দেখলে যেমন ‘ভাবধারণা’ হয়, তেমনি চিন্তালব্ধ ‘ভাবধারণাকে’ হৃদয়ের মধ্যে আঙ্গম করলে অর্থাৎ হৃদয়ের স্পন্দনের আবর্তের মধ্যে মন্থন করলে যে উষ্ণ বা ঠান্ডা ভাবের উদ্রেক করে, তারই নাম ‘হৃদয়াঙ্গম’। ইহা বিবেকের স্তর। ইহাতে ভালো-মন্দের নিরিখ হয় এবং নৈতিকতাবোধের উৎপত্তি হয়। আমাদের চলতি ভাষায়, ভাবধারণাকে তলিয়ে দেখাকেই হৃদয়াঙ্গম বলে। হৃদয়াঙ্গমলব্ধ জ্ঞান—নীতিজ্ঞান বা তত্ত্বজ্ঞান মননশীলতা লাভ-ক্ষতি নির্ণয় করে এবং হৃদয়াঙ্গম ভালো-মন্দের নিরিখ করে। (খান, ১৯৮০, পৃ. ১৬)
এই তিনটি উদ্ধৃতি মিলে ড. খানের একটি সুসংহত জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থান স্পষ্ট হয়: ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি → তাফাককুর (দার্শনিক চিন্তা) → তাদাব্বুর (হৃদয়াঙ্গম বা বিবেকের স্তর) → নৈতিকতাবোধ। এই ত্রিস্তরীয় মডেলে জ্ঞান কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বা যৌক্তিক নয়—এটি শেষ পর্যন্ত নৈতিক ও বিবেকনিসৃত।
▌ মিলের বিন্দু
ক. ‘নৈতিক ভিত্তিতে মানবিক জ্ঞানের উদয়’ ও তহার ‘Ethics precedes epistemology’: ড. খানের কেন্দ্রীয় থিসিস—’নৈতিক ভিত্তিতে মানবিক জ্ঞানের উদয় হয়’—এবং তহার বিখ্যাত সূত্র ‘নৈতিকতা জ্ঞানতত্ত্বের পূর্বগামী’ (Abderrahmane, 2010, p. 17) মূলত একই দার্শনিক সত্যের দুটি ভিন্ন ভাষায় উচ্চারণ। ড. খান ‘শেষ বিচারের কথা স্মরণ’ ও ‘স্বইচ্ছায় কৃত কর্মের দায়িত্ব উপলব্ধি’কে নৈতিক জ্ঞানের শর্ত বলেছেন—তহার কাছে এই ‘দায়িত্ব উপলব্ধি’ই হলো ‘আমানত’-এর জ্ঞানতাত্ত্বিক রূপ।
খ. ‘সাদা-ফলকবাদ’-এর সমালোচনা ও পশ্চিমা এম্পিরিসিজমের প্রত্যাখ্যান: ড. খান লকীয় tabula rasa বা সাদা-ফলকবাদকে ‘জ্ঞানকে বস্তুগত ও বন্ধ্যা করার প্রয়াস’ বলে চিহ্নিত করেন। তহাও পশ্চিমা এম্পিরিসিজমের একই সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করেন—যে দর্শন কেবল ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য জগতকেই জ্ঞানের উৎস মানে, সে দর্শন মানুষের নৈতিক ও রুহানি মাত্রাকে অস্বীকার করে (Abderrahmane, 2006)। উভয়ের সমালোচনার লক্ষ্য একই—জ্ঞানের ‘বস্তুকরণ’।
গ. ‘বিবেকবান মানব’ ও তহার ‘আমানত-বাহক মানুষ’: ড. খান বলেন: ‘বিবেকগুণেই মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ।’ তহার কাছে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের ভিত্তি হলো সে ‘আমানত’ বহন করে—সেই দায়বদ্ধতা যা আকাশ, পৃথিবী ও পর্বত গ্রহণ করতে অস্বীকার করেছিল (সূরা আহযাব, ৩৩:৭২)। ড. খানের ‘বিবেক’ এবং তহার ‘আমানত’ উভয়ই মানুষকে নিছক ‘চিন্তাশীল প্রাণী’ বা ‘অর্থনৈতিক সত্তা’র ওপরে স্থাপন করে।
ঘ. তাফাককুর-তাদাব্বুর মডেল ও তহার ‘তাজকিয়া-পরিশুদ্ধ আকল’: ড. খানের তিনস্তরীয় মডেল—ইন্দ্রিয়জ অনুভূতি → তাফাককুর → তাদাব্বুর (হৃদয়াঙ্গম)—তহার জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেলের সঙ্গে কাঠামোগতভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তহাও বলেন, কেবল যুক্তি-বুদ্ধি যথেষ্ট নয়—বুদ্ধিকে ‘তাজকিয়া’ বা আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে পরিশুদ্ধ করতে হবে, তাহলেই সে সত্যের কাছে পৌঁছাতে পারে (Abderrahmane, 1998)। ড. খানের ‘হৃদয়াঙ্গম’ এবং তহার ‘তাজকিয়া-পরিশুদ্ধ আকল’ উভয়ই বুদ্ধির বাইরে একটি অতিরিক্ত অনুষদের কথা বলে—যা ভালো-মন্দের নিরিখ করতে পারে।
ঙ. ‘চাক্ষুষ দৃষ্টির অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষেপ’ ও তহার ‘মুরাকাবা’: ড. খানের ‘চাক্ষুষ দৃষ্টির অন্তরালে দৃষ্টি নিক্ষেপ করা’র ধারণাটি তহার ‘মুরাকাবা’ বা আত্মপর্যবেক্ষণের ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সংলাপ করে। উভয়েই মনে করেন, বাহ্যিক জগতের পর্যবেক্ষণ থেকে অভ্যন্তরীণ নৈতিক পর্যবেক্ষণে উত্তরণ ছাড়া পরিপূর্ণ জ্ঞান সম্ভব নয়।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘বিবেক’ বনাম ‘আমানত’—কেন্দ্রীয় ধারণার পার্থক্য: ড. খানের দর্শনের কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ‘বিবেক’—একটি অন্তর্জাত নৈতিক অনুষদ যা মানুষের মধ্যে ভালো-মন্দ নির্ণয়ের ক্ষমতা হিসেবে বিদ্যমান। তহার কেন্দ্রীয় ধারণা হলো ‘আমানত’—কোরআনি ঘোষণায় স্রষ্টার পক্ষ থেকে মানুষের কাঁধে অর্পিত এক দায়বদ্ধতা। ‘বিবেক’ ধারণাটি মানুষের অন্তর্জগতে উৎসারিত; ‘আমানত’ ধারণাটি স্রষ্টা-মানুষ সম্পর্কের মধ্যে নোঙর করা। ড. খানের ‘বিবেক’ তত্ত্বে ঐশ্বরিক উৎসের সম্পর্কটি অনুমেয় কিন্তু সুস্পষ্টভাবে কাঠামোবদ্ধ নয়; তহার ‘আমানত’-এ এই সম্পর্কটিই পুরো দর্শনের অক্ষ।
খ. পশ্চিমা দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের অনুপস্থিতি: ড. খান পশ্চিমা দার্শনিকদের—লক, হিউম, কান্ট—সমালোচনা করেন, কিন্তু তাঁদের নিজস্ব ভাষায় ও কাঠামোয় প্রবেশ করে সেই সমালোচনা করেন না। তহা কান্টের ‘ক্যাটাগরিক্যাল ইম্পেরাটিভ’-এর দার্শনিক ভেতরে ঢুকে সেটিকে খণ্ডন করেন—কান্টের নিজের যুক্তি দিয়েই। এই পদ্ধতিগত পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: ড. খান ইসলামি অবস্থান থেকে পশ্চিমকে প্রশ্ন করেন; তহা পশ্চিমের ভেতরে ঢুকে তাকে প্রশ্ন করেন।
গ. বাংলা ভাষায় দর্শনচর্চার স্বাতন্ত্র্য ও সীমা: ড. খান বাংলায় ইসলামি দর্শনচর্চার অগ্রদূত—এটি তাঁর ঐতিহাসিক অবদান। কিন্তু তহার দৃষ্টিকোণ থেকে একটি প্রশ্ন থেকে যায়: বাংলায় ইসলামি দর্শন লেখার সময় ড. খান কি পশ্চিমা পরিভাষার (‘সাদা-ফলকবাদ’, ‘দর্শন’ ইত্যাদি) জ্ঞানতাত্ত্বিক ভার বহন করছেন না? তহা মনে করেন, ভাষাটি নিজেই একটি দার্শনিক অবস্থান—আরবি ভাষায় ‘তাফাককুর’ ও ‘তাদাব্বুর’-এর যে অর্থঘনত্ব, তা বাংলা বা ইংরেজি পরিভাষায় অনুবাদের সময় হারিয়ে যায়। ড. খান নিজেই এই ধারণাগুলো আরবি পরিভাষায় ব্যবহার করেছেন—যা তহার ভাষাতাত্ত্বিক সংবেদনশীলতার কাছাকাছি।
মুহাম্মদ আরকুন (১৯২৮–২০১০):
আলজেরীয়-ফরাসি চিন্তক মুহাম্মদ আরকুন তাঁর Rethinking Islam (1994) এবং The Unthought in Contemporary Islamic Thought (2002)-এ যুক্তি দেন যে, ইসলামি চিন্তায় গোঁড়ামির বাধা ভেঙে ‘অচিন্তনীয়’ প্রশ্নগুলো উন্মুক্ত করতে হবে—যুক্তিকে তার পূর্ণ ভূমিকা পালন করতে দিতে হবে। তাঁর মতে, ইসলামি গোঁড়ামি যে প্রশ্নগুলো দাবিয়ে রেখেছে সেগুলো পুনরুন্মোচনই সমালোচনামূলক ইসলামি চিন্তার প্রধান কাজ (Arkoun, 1994; 2002)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. পশ্চিমা পদ্ধতির সঙ্গে সক্রিয় সংলাপ: আরকুন এবং তহা উভয়েই পশ্চিমা দার্শনিক হাতিয়ার ব্যবহার করেন—তবে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। আরকুন ফুকো-দেরিদার প্রত্নতাত্ত্বিক পদ্ধতি ব্যবহার করে ইসলামি চিন্তার ‘অচিন্তনীয়’ স্থানগুলো উন্মোচন করতে চান; তহা উইটগেনস্টাইন-লেভিনাসের পদ্ধতি ব্যবহার করে পশ্চিমা আধুনিকতাকে নৈতিক মানদণ্ডে বিচার করতে চান।
খ. ঐতিহ্যের সমালোচনামূলক পর্যালোচনার প্রয়োজন স্বীকার: উভয়েই ‘ঐতিহ্যবাদী তাকলিদ’-এর সমালোচক। আরকুন ‘রিথিংকিং’ চান, তহা ‘তাজদিদ’ চান—উভয়েই যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তির বিরুদ্ধে।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. বিনির্মাণ বনাম পুনর্নির্মাণ: আরকুনের মূল প্রকল্প হলো ইসলামি চিন্তার ‘বিনির্মাণ’ (deconstruction)—কর্তৃপক্ষ-নির্মিত ‘অচিন্তনীয়’ স্থানগুলো ভেঙে ফেলা। তহার মতে, এই বিনির্মাণ আসলে ‘নিজস্বতাকে ভিত্তিহীন করা’র প্রকল্প। তহা বিনির্মাণ নয়, বরং ঐতিহ্যের নৈতিক শক্তিকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চান।
খ. পশ্চিমা ‘ইতিহাসবাদিতা’র গ্রহণ: আরকুন পশ্চিমা ঐতিহাসিকতার পদ্ধতিকে ইসলামি পাঠে প্রয়োগ করেন—যা তহার দৃষ্টিতে ‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজমের’ একটি রূপ। হাল্লাক মনে করেন, আরকুনের সমালোচনামূলক প্রকল্প তার সাহসিকতা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত সেই আলোকায়নবাদী কাঠামোর বন্দী হয়ে পড়ে যাকে সে সমালোচনা করতে চায়। তহার পক্ষ থেকেও একই আপত্তি উত্থাপিত হয়েছে (Hallaq, 2019)।
গ. ওহির মর্যাদা: আরকুনের পদ্ধতিতে ওহি ও মানবিক পাঠের মধ্যে পার্থক্য ক্রমশ ধূসর হয়ে যায়। তহার কাছে ‘আমানত’-এর ধারণাটি ওহিপ্রদত্ত এক অপরিবর্তনীয় দায়বদ্ধতা—এটি ঐতিহাসিক-বিশ্লেষণের বিষয় নয়।
সাইয়েদ নাকিব আল-আত্তাস (জন্ম: ১৯৩১):
মালয়েশিয়ান দার্শনিক সাইয়েদ নাকিব আল-আত্তাস তাঁর Aims and Objectives of Islamic Education (1979) এবং Prolegomena to the Metaphysics of Islam (1995)-এ যুক্তি দেন যে, মুসলিম বিশ্বের মূল সমস্যা রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়—এটি জ্ঞানতাত্ত্বিক; ‘আদব’ বা জ্ঞানের যথাযোগ্য বিন্যাস থেকে বিচ্যুতিই সংকটের মূল কারণ। তিনি আরও মনে করেন, জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়—পশ্চিমা জ্ঞান যেভাবে পাঠদান করা হয় তা তার ধর্মীয়, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়বস্তু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে (Al-Attas, 1979; 1995)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. নৈতিক সংকট হিসেবে আধুনিকতার চিহ্নিতকরণ: আল-আত্তাসের ‘মূল সমস্যা জ্ঞানতাত্ত্বিক’ এবং তহার ‘আধুনিকতার প্রকৃত সংকট নৈতিক’—এই দুটি থিসিস মূলত একই সমস্যাকে চিহ্নিত করে।
খ. জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়: আল-আত্তাসের ‘জ্ঞান নিরপেক্ষ নয়’ থিসিসটি তহার ‘তাকলিদি অনুবাদ’ সমালোচনার সঙ্গে একমত—পশ্চিমা জ্ঞান সরাসরি গ্রহণ করলে তার সঙ্গে পশ্চিমা বিশ্ববীক্ষাও গ্রহণ করা হয়।
গ. ওহি-নির্ভর অধিবিদ্যার কেন্দ্রীয়তা: উভয়েই চান জ্ঞানকে ওহির মানদণ্ডে পুনর্বিন্যস্ত করতে।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘আদব’ বনাম ‘ভাষার রাজনীতি’: আল-আত্তাস সংকটের মূলে ‘আদব’ বা জ্ঞানের যথাযোগ্য বিন্যাসের বিচ্যুতি দেখেন এবং ধ্রুপদী কাঠামোর পুনঃপ্রতিষ্ঠার ডাক দেন। তহার লড়াইয়ের ময়দান ভিন্ন—তিনি ভাষা ও লজিকের গভীর স্তরে নেমে যান। তহার দৃষ্টিতে, ‘আদব’ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করলেই হবে না—ভাষার জ্ঞানতাত্ত্বিক বশ্যতা থেকে মুক্তি না পেলে ‘আদব’ও পশ্চিমা বিশ্ববীক্ষা দ্বারা কলুষিত থাকবে।
খ. অভিজাত বনাম গণতান্ত্রিক দর্শন: আল-আত্তাসের প্রকল্প মূলত অভিজাততান্ত্রিক ও ধ্রুপদী কাঠামোকেন্দ্রিক। তহার ‘তাখলিক’ পদ্ধতি আরও নমনীয় ও সৃজনশীল—তিনি আধুনিক লজিক ও ভাষাতত্ত্বের সরঞ্জাম ব্যবহার করে আধুনিকতাকে ভেতর থেকে চ্যালেঞ্জ করেন।
সাইয়েদ হোসেইন নসর (জন্ম: ১৯৩৩):
ইরানি-আমেরিকান দার্শনিক সাইয়েদ হোসেইন নসর তাঁর Knowledge and the Sacred (1981) এবং Religion and the Order of Nature (1996)-এ যুক্তি দেন যে, আধুনিক বিজ্ঞান সম্পূর্ণরূপে সেক্যুলার হয়ে পবিত্রতার শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রকৃতি ও শেষ পর্যন্ত মানুষেরই আধিপত্যের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। তাঁর মতে, ‘কীভাবে কাজ করে’ থেকে ‘কেন আছে’ আলাদা করা সম্ভব নয়—আধুনিক জগৎ এই বিচ্ছেদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক মূল্য দিচ্ছে (Nasr, 1981; 1996)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. আধুনিক বিজ্ঞানের সেক্যুলার চরিত্রের সমালোচনা: নসর এবং তহা উভয়েই ‘কীভাবে কাজ করে’ (how) থেকে ‘কেন আছে’ (why) আলাদা করার আধুনিক প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করেন। তহার ভাষায়, এটিই ‘কারিগরি আধুনিকতা’র মূল সংকট।
খ. ‘পবিত্র জ্ঞান’-এর ধারণা: নসরের ‘পবিত্র জ্ঞান’ (sacred knowledge)-এর ধারণা তহার ‘তাজকিয়া-পরিশুদ্ধ আকল’-এর ধারণার কাছাকাছি।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘আধুনিকতার বর্জন’ বনাম ‘তাখলিক’: নসর আধুনিকতাকে একটি ‘দীর্ঘস্থায়ী বিচ্যুতি’ (long deviation) হিসেবে দেখেন এবং ‘পবিত্র বিজ্ঞানে’র পুনরুদ্ধার চান। তহার কাছে এটি অগ্রহণযোগ্য। তহার মতে, আধুনিকতার ‘রুহ’—সৃজনশীলতা, সমালোচনা, স্বায়ত্তশাসন—মানুষের ফিতরাতেরই অংশ; তাকে বর্জন করা মানে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মহনন’ বেছে নেওয়া।
খ. সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ থেকে বিচ্ছিন্নতা: নসরের ঐতিহ্যবাদী অবস্থান মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের সমকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক সংলাপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়। তহা আধুনিকতার সঙ্গে সরাসরি সংলাপে বিশ্বাসী, কিন্তু সেই সংলাপ হবে নিজের ‘মিজান’ বজায় রেখে।
আলি শরিয়তি (১৯৩৩–১৯৭৭):
ইরানি বিপ্লবী চিন্তক আলি শরিয়তি তাঁর On the Sociology of Islam (1979)-এ ইসলামকে কেবল ‘হৃদয়ের ধর্ম’ নয়, বরং আধুনিক জাহিলিয়া—পুঁজি ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার নতুন বর্বরতা—থেকে মানবজাতিকে মুক্ত করার একটি চিন্তার বিদ্যালয় হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁর মতে, ইসলাম কেবল আচার-অনুষ্ঠানের সমষ্টি নয়—এটি সমাজ রূপান্তরের একটি কর্মসূচি (Shariati, 1979)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. আধুনিক জাহিলিয়্যাহর চিহ্নিতকরণ: শরিয়তির ‘পুঁজি ও ঔপনিবেশিক ক্ষমতার নতুন বর্বরতা’ হিসেবে ‘জাহিলিয়া’ চিহ্নিত করা এবং তহার ‘কারিগরি আধুনিকতার’ নৈতিক সমালোচনা একই সমস্যাকে নির্দেশ করে।
খ. ইসলামকে সমাজ রূপান্তরের শক্তি হিসেবে দেখা: শরিয়তি ও তহা উভয়েই ইসলামকে কেবল ‘আচারের সমষ্টি’ নয়, বরং সমাজ ও মানুষ পরিবর্তনের শক্তি হিসেবে দেখেন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. রাজনৈতিক বিজয় বনাম আত্মার নৈতিক রূপান্তর: শরিয়তি ইসলামকে একটি ‘বিপ্লবী আইডিওলজি’ হিসেবে ব্যবহার করে রাজনৈতিক মুক্তি চেয়েছিলেন। তহার মতে, রাজনৈতিক বিজয় ততক্ষণ অর্থহীন যতক্ষণ না তা ‘নৈতিক আমানত’-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়ায়। শরিয়তির সমাজ রূপান্তর ‘বাইরে থেকে’; তহার রূপান্তর ‘ভেতর থেকে’।
খ. আইডিওলজি বনাম নৈতিক দর্শন: শরিয়তি ইসলামকে আইডিওলজিতে পরিণত করতে চেয়েছিলেন। তহা এই ‘আইডিওলজিকরণ’কে বিপজ্জনক মনে করেন—কারণ আইডিওলজি মূল্যবোধকে হাতিয়ারে পরিণত করে।
৮.৯ মুহাম্মদ বাকির আল-সদর (১৯৩৫–১৯৮০):
ইরাকি শিয়া মনীষী মুহাম্মদ বাকির আল-সদর তাঁর Falsafatuna (Our Philosophy, 1959/1980)-এ যুক্তি দেন যে, ইসলামি চিন্তার ভিত্তি হলো একটি ঐশ্বরিক অধিবিদ্যা যা পুঁজিবাদ ও মার্কসবাদ উভয়ের বস্তুবাদী ভিত্তির সঙ্গে মৌলিকভাবে সাংঘর্ষিক। মানুষ কেবল একটি অর্থনৈতিক প্রাণী নয়—সে একটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক সত্তা, ঐশ্বরিক মিশনে অর্পিত (Al-Sadr, 1980)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. ‘ঐশ্বরিক মিশনে অর্পিত’ মানুষের ধারণা: আল-সদরের ‘ঐশ্বরিক মিশনে অর্পিত মানুষ’ তহার ‘আমানত-বাহক মানুষ’-এর ধারণার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত। উভয়েই মানুষকে একটি নৈতিক-আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে দেখেন।
খ. বস্তুবাদের বিকল্প হিসেবে ইসলামি দর্শন: আল-সদর ও তহা উভয়েই মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদ উভয়ের বিকল্প হিসেবে ইসলামি দার্শনিক কাঠামো প্রস্তাব করেন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. কাঠামোগত বিকল্প বনাম নৈতিক রূপান্তর: আল-সদর একটি সুসংহত ‘ইসলামি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামো’ নির্মাণ করতে চেয়েছেন—তহা মনে করেন এই কাঠামো তখনই অর্থবহ হবে যখন তার মধ্যে থাকা মানুষের আত্মার নৈতিক রূপান্তর ঘটবে। তহার কাছে, কাঠামো পরিবর্তনের আগে প্রয়োজন ‘আমানত’-এর অভ্যন্তরীণ উপলব্ধি।
মুহাম্মদ আবিদ আল-জাবরি (১৯৩৫–২০১০):
মরক্কোর চিন্তক আল-জাবরি তাঁর Critique of Arab Reason (Naqd al-ʿAql al-ʿArabī, 1982–1992)-এ যুক্তি দেন যে, আরব মনন ইরফানি (নোস্টিক) ও বয়ানি (আখ্যানকেন্দ্রিক) জ্ঞানপদ্ধতির আধিপত্যে বুরহানি (যুক্তি-প্রমাণভিত্তিক) জ্ঞানপদ্ধতিকে পিছিয়ে দিয়েছে—এই ভারসাম্যহীনতাই বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার মূল। তাঁর মতে, আরব বুদ্ধিবৃত্তির সবচেয়ে বড় বিপর্যয় হলো ইবনে রুশদের পরাজয়—বুরহানি যুক্তির ওপর ইরফানি অযৌক্তিকতার বিজয় (al-Jabri, 1990)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. আরব বুদ্ধিবৃত্তির সংকট চিহ্নিতকরণ: আল-জাবরি এবং তহা উভয়েই মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক স্থবিরতার কারণ অনুসন্ধান করেন। সমস্যা চিহ্নিতকরণে উভয়েই একমত যে, কোনো একটি অন্তর্গত ঘাটতি রয়েছে—যদিও সেই ঘাটতির প্রকৃতি নির্ধারণে তারা মৌলিকভাবে ভিন্ন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘ইবনে রুশদ বনাম ইবনে আরাবি’ বিতর্ক: আল-জাবরি ‘ইবনে আরাবির বিজয়কে ইবনে রুশদের পরাজয়’ হিসেবে দেখেন—অর্থাৎ যুক্তির ওপর ‘অযৌক্তিকতা’র বিজয়। এটি তহার সঙ্গে এক মৌলিক বিভেদের জায়গা। তহা ইবনে আরাবির আধ্যাত্মিক-নৈতিক বোধকে যুক্তির সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা দেখেন—তাঁর কাছে ইবনে আরাবি ‘অযৌক্তিকতা’র প্রতীক নন।
খ. ‘এপিস্টেমিক কলোনিয়ালিজম’: তহার মতে, আল-জাবরি পশ্চিমা র্যাশনালিজমকেই মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেছেন—এটিই হলো ‘জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ’। তহা লেখেন: ‘সমস্যা বুদ্ধিতে নয়, বরং বুদ্ধির নৈতিক ডিসিপ্লিনে।’ হাল্লাক এই বিতর্কটিকে মূল্যায়ন করে বলেন: আল-জাবরির আরব বুদ্ধির সমালোচনা বিপরীতক্রমে সেই আলোকায়নবাদী জ্ঞানতত্ত্বকেই গ্রহণ করে নেয় যা ঔপনিবেশিক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল (Hallaq, 2019)।
আবদেল-ওয়াহাব এল-মিসরি (১৯৩৮–২০০৮):
মিশরীয় চিন্তক আবদেল-ওয়াহাব এল-মিসরি তাঁর বহুখণ্ডিত মুসাওয়াহ আল-আলাম মিন মানযুর ইসলামি (আরবি মূল গ্রন্থ) এবং সেক্যুলারিজমের সমালোচনামূলক অভিধানে বলেন যে, আধুনিক সেক্যুলারিজম মানুষকে একটি ‘প্রাকৃতিক/বস্তুগত সত্তা’ (natural/material entity)-এ পরিণত করে এবং তার ‘ট্রান্সসেন্ডেন্ট মাত্রা’ বা অতিজাগতিক মাত্রা মুছে দেয়। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ‘মানব ব্যক্তিত্বের নিঃস্বকরণ’ (dehumanization) বলে আখ্যায়িত করেন।
▌ মিলের বিন্দু
ক. সেক্যুলারিজমের নৃতাত্ত্বিক সমালোচনা: এল-মিসরি এবং তহা উভয়েই সেক্যুলারিজমকে কেবল রাজনৈতিক বিভাজন হিসেবে নয়, বরং মানুষের ‘অতিজাগতিক মাত্রা’ মুছে দেওয়ার একটি জ্ঞানতাত্ত্বিক প্রকল্প হিসেবে দেখেন।
খ. মানবিকতার নৈতিক ভিত্তি খোঁজা: উভয়েই মানুষকে কেবল ‘অর্থনৈতিক প্রাণী’ বা ‘জৈবিক সত্তা’ হিসেবে না দেখে একটি নৈতিক-আধ্যাত্মিক সত্তা হিসেবে দেখেন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. দার্শনিক কাঠামোর ঘাটতি: এল-মিসরির সমালোচনা প্রধানত সামাজিক ও সভ্যতামূলক। তহার কাছে এই সমালোচনা যথেষ্ট নয়—প্রয়োজন একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক বিকল্প কাঠামো। তহা ভাষার দার্শনিক স্তরে নেমে সংকটের মূল খোঁজেন, এল-মিসরি সেখানে যান না।
আব্দুল করিম সৌরুশ (জন্ম: ১৯৪৫):
ইরানি দার্শনিক আব্দুল করিম সৌরুশ তাঁর ‘ধর্মীয় জ্ঞানের সংকোচন ও প্রসারণ’ তত্ত্বে যুক্তি দেন যে, ধর্মীয় জ্ঞান অন্য সব মানবিক জ্ঞানের মতো আপেক্ষিক, ভ্রান্তিযোগ্য ও পরিবর্তনশীল—কিতাব নিজে নিখুঁত ও অপরিবর্তনীয় হলেও তার মানবিক পাঠ অসম্পূর্ণ ও সংশোধনযোগ্য। ইসলামি গণতন্ত্র সম্পর্কে তিনি মনে করেন, এর জন্য ধর্মীয় ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতা স্বীকার করতে হবে (Soroush, 1998)।
▌ মিলের বিন্দু
ক. ধর্মীয় জ্ঞানের সমালোচনার প্রয়োজনীয়তা: তহা এবং সৌরুশ উভয়েই মনে করেন, ঐতিহ্যের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি যথেষ্ট নয়—ধর্মীয় জ্ঞানের একটি সমালোচনামূলক পর্যালোচনা প্রয়োজন।
▌ অমিলের বিন্দু
ক. ‘আত্মসমর্পণ’ বনাম ‘তাখলিক’: তহার মতে, সৌরুশ আধুনিকতার কাছে ঐতিহ্যের আত্মসমর্পণ নিশ্চিত করছেন। সৌরুশ ধর্মীয় জ্ঞানের ‘আপেক্ষিকতা’ ও ‘ঐতিহাসিকতা’ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মূলত লিবারেল আধুনিকতার জ্ঞানতাত্ত্বিক মানদণ্ড গ্রহণ করছেন। তহার কাছে, ‘আমানত’ কোনো ঐতিহাসিক আপেক্ষিক বিষয় নয়—এটি কোরআনি ঘোষণার ভিত্তিতে মানুষের কাঁধে অর্পিত চিরন্তন দায়বদ্ধতা।
খ. গণতন্ত্র ও ধর্মের প্রশ্নে মৌলিক ভিন্নতা: সৌরুশ ইসলামি গণতন্ত্রকে ‘ধর্মীয় ব্যাখ্যার ঐতিহাসিক আপেক্ষিকতা স্বীকারের’ মাধ্যমে বৈধ করতে চান। তহা মনে করেন, এই পথে হাঁটলে ইসলামের অধিবিদ্যাগত কর্তৃত্ব খর্ব হয়ে যায়।
গ. লেভিনাস ও সৌরুশ-বিরোধিতায় তহার অবস্থান: লেভিনাস বলেছিলেন ‘Ethics as First Philosophy’—মানুষের মুখের মুখোমুখি দাঁড়ানো, তার দাবির কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। তহা এই ‘অন্যের দাবি’কে কেবল মানব-থেকে-মানব সম্পর্কে সীমাবদ্ধ না রেখে (Levinas, 1969), তাকে স্রষ্টার ‘আমানত’-এর প্রতি দায়বদ্ধতায় উন্নীত করেন। সৌরুশ যেখানে এই দায়বদ্ধতাকে ‘ঐতিহাসিকভাবে নির্মিত’ মনে করেন, তহা সেখানে এটিকে ‘ওহিপ্রদত্ত অপরিবর্তনীয়’ মনে করেন।
তুলনামূলক সারসংক্ষেপ: মূল অবস্থানের পার্থক্য:
নিচের সারসংক্ষেপে মূল দার্শনিক প্রশ্নে প্রত্যেকের অবস্থান তুলনা করা হয়েছে:
আধুনিকতার প্রতি অবস্থান: আজরফ (সমন্বয়), ফারুকি (ইসলামীকরণ), আশরাফ (শিক্ষা-পুনর্গঠন), মুঈনুদ্দীন (সৃজনশীল সংলাপ), আরকুন (বিনির্মাণ), আল-আত্তাস (ধ্রুপদী পুনঃপ্রতিষ্ঠা), নসর (প্রত্যাখ্যান), শরিয়তি (বিপ্লবী মোকাবিলা), সদর (কাঠামোগত বিকল্প), আল-জাবরি (যুক্তিবাদী সংস্কার), সৌরুশ (লিবারেল অভিযোজন), তহা (নৈতিক তাখলিক)।
জ্ঞানের সমস্যা: আজরফ (জ্ঞানের স্তরভেদ), ফারুকি (তাওহিদি সমন্বয়), আশরাফ (জ্ঞানের অবিভাজ্যতা), মুঈনুদ্দীন (বিবেকনিসৃত জ্ঞান), আল-আত্তাস (আদবের বিচ্যুতি), আরকুন (অচিন্তনীয়ের উন্মোচন), নসর (পবিত্র জ্ঞানের পুনরুদ্ধার), আল-জাবরি (যুক্তিবাদ ঘাটতি), সৌরুশ (জ্ঞানের আপেক্ষিকতা), তহা (নৈতিকতা জ্ঞানের ভিত্তি)।
পদ্ধতি: আজরফ (সমন্বয়মূলক দর্শন), ফারুকি (পাঠ্যক্রম সংস্কার), আশরাফ (শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংস্কার), মুঈনুদ্দীন (ইতিহাসভিত্তিক বিশ্লেষণ), আরকুন (ঐতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব), আল-আত্তাস (অধিবিদ্যা পুনর্গঠন), নসর (ঐতিহ্যবাদ), শরিয়তি (সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ), সদর (পদ্ধতিগত দর্শন), আল-জাবরি (যুক্তি-প্রমাণহীনতার সমালোচনা), সৌরুশ (হার্মেনিউটিক্স), তহা (লজিক ও ভাষার নৈতিক পুনর্গঠন)।
ওয়ায়েল হাল্লাকের মূল্যায়ন:
কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ওয়ায়েল হাল্লাক তাঁর Reforming Modernity (2019)-এ তহাকে আধুনিকতার সবচেয়ে গভীর ও মৌলিক মুসলিম দার্শনিক হিসেবে উপস্থাপন করেন: তহার প্রকল্প ইসলামি চিন্তার ভেতর থেকে আধুনিকতার সবচেয়ে মৌলিক ও সার্বিক সমালোচনা—এটি রাজনৈতিক অর্থে নয়, বরং দার্শনিক অর্থে মৌলিক, অর্থাৎ সমস্যার মূলে যায় (Hallaq, 2019)।
হাল্লাক দেখান যে, তহার নৈতিকতা মূলত সার্বভৌম আধুনিক রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর বাইরে এক বিকল্প ‘আমানত’-ভিত্তিক সার্বভৌমত্বের প্রস্তাব দেয় (Hallaq, 2019)।
সমকালীন মুসলিম উম্মার সংকটে তহার প্রাসঙ্গিকতা: দার্শনিক চিকিৎসা না বাস্তব হাতিয়ার?
তহা আবদুর রহমানের দর্শন কি কেবল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনার-কক্ষের বিষয়, নাকি মুসলিম উম্মার বাস্তব জীবনের সংকটে তার কোনো প্রয়োগমূল্য আছে? এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দর্শন যদি জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তাহলে তার মূল্য সীমিত। নিচে সমকালীন মুসলিম উম্মার কয়েকটি প্রধান সংকটের প্রেক্ষিতে তহার দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা বিশ্লেষণ করা হলো।
জ্ঞানতাত্ত্বিক উপনিবেশবাদ ও শিক্ষা-সংকট:
মুসলিম বিশ্বের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে গভীর সমস্যা হলো ‘দুই ধারার’ বিভাজন: একদিকে আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে পশ্চিমা জ্ঞানকাঠামো সর্বোচ্চ মানদণ্ড, অন্যদিকে মাদ্রাসা যেখানে ঐতিহ্যের যান্ত্রিক পুনরাবৃত্তি। এই দুই ধারা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন, ফলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা পরিচয়-বিভ্রান্তিতে ভোগেন। তারা বিজ্ঞান পড়েন পশ্চিমা ভাষায়, নামাজ পড়েন আরবিতে—এই দুই জগৎ কখনো মিলিত হয় না।
তহার প্রাসঙ্গিকতা এখানে সরাসরি। তাঁর ‘নৈতিকতা জ্ঞানতত্ত্বের পূর্বগামী’ থিসিস এবং ‘তাকলিদি বনাম তাজদিদি অনুবাদ’-এর বিভাজন শিক্ষার্থীদের সামনে একটি তৃতীয় পথ খুলে দেয়। পশ্চিমা জ্ঞানকে প্রত্যাখ্যান না করে, অন্ধভাবে গ্রহণ না করে—বরং নিজস্ব নৈতিক মিজানে ‘তাখলিক’ করার এই পদ্ধতি একটি সংহত মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় গড়ে তুলতে সাহায্য করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তির নৈতিক সংকট:
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), জৈবপ্রযুক্তি এবং ডিজিটাল নজরদারি মুসলিম সমাজের সামনে এমন নৈতিক প্রশ্ন তুলছে যার উত্তর প্রচলিত ফিকহশাস্ত্র তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারছে না। কে সিদ্ধান্ত নেবে AI-এর ব্যবহারের সীমা? মুখ-শনাক্তকরণ প্রযুক্তি কি ইসলামি রাষ্ট্রে গ্রহণযোগ্য? জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং মানুষের ‘ফিতরাত’ পরিবর্তন করছে কিনা?
তহার ‘আমানত’-ভিত্তিক নৈতিকতা এখানে একটি কার্যকর কাঠামো দিতে পারে। তাঁর দর্শনে প্রযুক্তি কোনো মূল্য-নিরপেক্ষ হাতিয়ার নয়—এটি ‘আমানত’-এর অধীনস্থ। যে প্রযুক্তি মানুষের রুহানি মাত্রা, পারিবারিক বন্ধন এবং সামাজিক নৈতিকতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তা ‘আমানত’ লঙ্ঘন। এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম প্রযুক্তিবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি ইসলামি প্রযুক্তি-নৈতিকতার ভিত্তি হতে পারে।
পরিচয়-সংকট ও সাংস্কৃতিক আত্মসমর্পণ:
পশ্চিমা সংস্কৃতির বৈশ্বিক আধিপত্যের মুখে মুসলিম তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ দুটি চরমের মধ্যে দুলছে—একদিকে সম্পূর্ণ পশ্চিমীকরণ, অন্যদিকে প্রতিক্রিয়াশীল কট্টরপন্থা। উভয়ই বস্তুত পশ্চিমা আধুনিকতার সংজ্ঞায় আটকে আছে—একটি মেনে নিয়েছে, অপরটি শুধু বিরোধিতা করছে।
তহার ‘রুহানি আধুনিকতা’ এই বিভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসার পথ দেখায়। তাঁর দর্শনে ‘আধুনিক হওয়া’ মানেই ‘পশ্চিমা হওয়া’ নয়—আধুনিকতার রুহকে ধারণ করেও নিজস্ব সভ্যতার পরিচয় বজায় রাখা সম্ভব। এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিম তরুণদের কাছে একটি আত্মসম্মানের ভিত্তি হতে পারে—হীনম্মন্যতা বা প্রতিক্রিয়াশীলতা নয়, বরং সৃজনশীল আত্মবিশ্বাস।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ইসলামি রাজনীতির সংকট:
মুসলিম রাষ্ট্রগুলো একটি দ্বন্দ্বে আটকে আছে: পশ্চিমা গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের ধারণা গ্রহণ করলে মনে হয় ‘সেক্যুলার আত্মসমর্পণ’, প্রত্যাখ্যান করলে মনে হয় ‘স্বৈরতন্ত্র সমর্থন’। ইসলামি আন্দোলনগুলো প্রায়ই পশ্চিমা রাষ্ট্রকাঠামোকেই মানদণ্ড ধরে তাতে ‘ইসলামি’ রং দেওয়ার চেষ্টা করে—যা তহার ভাষায় ‘তাকলিদি’ পদ্ধতি।
তহার ‘আমানত’-ভিত্তিক সার্বভৌমত্বের ধারণা—যা হাল্লাক বিস্তারিত বিশ্লেষণ করেছেন (Hallaq, 2019)—একটি ভিন্ন পথ দেখায়: রাষ্ট্র ও ক্ষমতা ‘আমানত’, অর্থাৎ স্রষ্টার কাছে দায়বদ্ধ একটি দায়িত্ব। এই দৃষ্টিভঙ্গি পশ্চিমা গণতন্ত্রের সঙ্গে সংলাপ করতে পারে, তাকে অন্ধভাবে অনুকরণ না করেও।
সীমাবদ্ধতা: তহার দর্শনের প্রয়োগ কতটা সম্ভব?
তবে সততার সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে তহার দর্শনের প্র্যাকটিক্যাল প্রয়োগে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আছে। প্রথমত, তাঁর দর্শন মূলত অভিজাত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির জন্য সুলভ—সাধারণ মুসলিমের কাছে ‘তাখলিক’ বা ‘আমানত’-এর দার্শনিক ব্যাখ্যা পৌঁছানো কঠিন। দ্বিতীয়ত, তাঁর দর্শন রাজনৈতিক কর্মসূচি, অর্থনৈতিক নীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রোডম্যাপ দেয় না। তৃতীয়ত, গভীর দারিদ্র্য, সশস্ত্র সংঘাত বা কর্তৃত্ববাদী শাসনের মধ্যে বসবাসকারী মুসলিমদের জন্য ‘নৈতিক আত্মশুদ্ধি’র আহ্বান তাৎক্ষণিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে।
তবে তহার সমর্থকরা বলবেন: এই সীমাবদ্ধতাগুলো তাঁর দর্শনের দুর্বলতা নয়, বরং এটি একটি ভিন্ন স্তরে কাজ করে। দ্রুত রাজনৈতিক সমাধান বারবার ব্যর্থ হয়েছে—কারণ ভিত্তির পরিবর্তন হয়নি। তহা সেই ভিত্তি নির্মাণের কথা বলছেন—যা ধীর, কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী।
একবিংশ শতাব্দীর লোগোস ও রুহানি দিগন্ত:
সমকালীন মুসলিম চিন্তকদের জন্মসালের ক্রমে তহা আবদুর রহমানের চিন্তার তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তহার প্রকল্পটি কোনো একটি পূর্বতন অবস্থানের সরল ধারাবাহিকতা নয়, বরং এটি একাধিক ধারার সংশ্লেষণ ও অতিক্রমণ। দেওয়ান আজরফের ‘জ্ঞানের বিভিন্ন স্তর’-এর দার্শনিক অন্তর্দৃষ্টি, সৈয়দ আলী আশরাফের ‘সম্পূর্ণ মানব সত্তার’ শিক্ষাদর্শন, মুঈনুদ্দীন খানের ‘তাফাককুর-তাদাব্বুর’ মডেল এবং ফারুকির ‘তাওহিদি কেন্দ্রীয়তা’—এই সবকিছু তহার প্রকল্পে একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক রূপ লাভ করে।
অন্যদিকে, আরকুনের ‘বিনির্মাণ’, জাবরির ‘ইবনে রুশদীয় যুক্তিবাদ’ এবং সৌরুশের ‘জ্ঞানের আপেক্ষিকতা’—এই সবকিছুকে তহা প্রত্যাখ্যান করেন ‘পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামোর কাছে আত্মসমর্পণ’ হিসেবে। নসরের ‘আধুনিকতা বর্জন’ নয়, শরিয়তি ও সদরের রাজনৈতিক-কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গিও নয়—তহার পথ হলো তাখলিক: আধুনিকতার রুহকে ঐতিহ্যের নৈতিক মিজানে পুনর্গঠন।
তহা আমাদের মনে করিয়ে দেন যে, আধুনিকতা কেবল একটি প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়, বরং এটি একটি গভীরতম নৈতিক দায়বদ্ধতা বা ‘আমানত’ (Abderrahmane, 2014)। তাঁর ‘মুরাকাবা-দর্শন’ আমাদের শেকড়ের দিকে ফেরার তাগিদ দেয়—এবং সেই শেকড় থেকেই একটি নতুন সভ্যতামূলক বিকল্প নির্মাণের পথ দেখায়।
পাদটীকা
১. লুদভিগ ভিটগেনস্টাইন তাঁর Philosophical Investigations গ্রন্থে ‘ল্যাঙ্গুয়েজ গেমস’ ধারণাটি ব্যবহার করেছেন এই বোঝাতে যে, ভাষার অর্থ ব্যবহারের প্র্যাকটিসের ওপর নির্ভরশীল—অর্থাৎ কোনো শব্দের মানে তার প্রয়োগের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট থেকে আলাদা করা যায় না। তহা এই ধারণাকে ইসলামি নৈতিক আমলের প্রেক্ষাপটে পুনর্গঠন করেন: পশ্চিমা পরিভাষা গ্রহণ করা মানে সেই পরিভাষার ‘ল্যাঙ্গুয়েজ গেম’-এ প্রবেশ করা—অর্থাৎ পশ্চিমা জ্ঞানতাত্ত্বিক কাঠামো মেনে নেওয়া।
২. ‘আমানত’ শব্দের আরবি মূল হলো أ-م-ن (আলিফ-মিম-নুন)—যার অর্থ বিশ্বস্ততা, নিরাপত্তা ও দায়িত্বপালন। সূরা আল-আহযাব (৩৩:৭২): ‘আমরা আকাশমণ্ডলী, পৃথিবী ও পর্বতমালার নিকট আমানত পেশ করেছিলাম, তারা তা বহন করতে অস্বীকার করল এবং তাতে শঙ্কিত হলো; কিন্তু মানুষ তা বহন করল—নিশ্চয়ই সে অতিশয় জালিম ও অজ্ঞ।’ তহার সমগ্র দার্শনিক প্রকল্প এই আয়াতের দার্শনিক ব্যাখ্যা হিসেবে পড়া যায়: মানুষ ‘আমানত’ বহন করে—অর্থাৎ স্বাধীন নৈতিক দায়িত্বশীলতা তার অস্তিত্বের মূল বৈশিষ্ট্য।
৩. কান্টের ‘অটোনমি’ (Autonomy) অর্থ হলো নৈতিকতার স্বায়ত্তশাসন—মানুষ নিজেই নিজের নৈতিক আইনের উৎস। কান্ট মনে করেন, বাহ্যিক কর্তৃপক্ষ বা ধর্মের নির্দেশে নৈতিক কাজ করা ‘হেটরোনমি’ (Heteronomy)—যা প্রকৃত নৈতিকতা নয়। তহা এই অবস্থানকে উল্টে দেন: তাঁর কাছে ‘হেটরোনোমাস আমানত’—অর্থাৎ স্রষ্টার কাছে দায়বদ্ধতার নৈতিকতা—কোনো নিম্নস্তরের নৈতিকতা নয়, বরং এটিই মানুষকে আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থ থেকে মুক্ত করে। কান্টের ‘অটোনমি’ আসলে এক ধরনের ‘নৈতিক অহংকার’ যা মানুষকে তার নিজের প্রবৃত্তির দাসে পরিণত করে।
৪. ১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত ‘প্রথম বিশ্ব ইসলামি শিক্ষা সম্মেলন’ (First World Conference on Muslim Education) ইসলামি শিক্ষাদর্শনের ইতিহাসে একটি মাইলফলক। এই সম্মেলনে ফারুকি, আশরাফ, আল-আত্তাসসহ বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুসলিম শিক্ষাবিদরা একত্রিত হয়ে পশ্চিমা শিক্ষাব্যবস্থার বিকল্প একটি ইসলামি শিক্ষাদর্শন প্রণয়নের প্রস্তাব করেন। সম্মেলনের সুপারিশমালা পরবর্তীতে ফারুকির ‘জ্ঞানের ইসলামীকরণ’ আন্দোলনের মূল ভিত্তি হয়ে ওঠে। তবে তহার দৃষ্টিতে এই সম্মেলন ও তার ফলাফল ‘পাঠ্যক্রমকেন্দ্রিক’ সমাধানে আটকে গেছে—ভাষার জ্ঞানতাত্ত্বিক সমস্যাকে স্পর্শ করেনি।
৫. ‘তাফাককুর’ (تفكّر) ও ‘তাদাব্বুর’ (تدبّر) দুটি কোরআনি পরিভাষা। তাফাককুর কোরআনে বহুস্থানে ব্যবহৃত হয়েছে (যেমন: সূরা আন-নাহল ১৬:৪৪; সূরা আর-রুম ৩০:২১)—এর অর্থ গভীরভাবে ভাবনাচিন্তা করা, সৃষ্টির মধ্যে স্রষ্টার নিদর্শন খোঁজা। তাদাব্বুর শব্দটি কোরআনে সুনির্দিষ্টভাবে কোরআন পাঠে গভীর মনোযোগ ও হৃদয়াঙ্গমের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে (সূরা আন-নিসা ৪:৮২; সূরা মুহাম্মদ ৪৭:২৪)। ড. খান এই দুটি ধারণাকে একটি সাধারণ জ্ঞানতাত্ত্বিক মডেলে প্রসারিত করেছেন—যেখানে ইন্দ্রিয়জ পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে নৈতিক উপলব্ধি পর্যন্ত একটি ক্রমবিকাশমান প্রক্রিয়া বর্ণিত হয়।
৬. ‘মুরাকাবা’ (مراقبة) শব্দটি সুফি পরিভাষায় ‘আত্মপর্যবেক্ষণ’ বা ‘আল্লাহর নজরদারির সচেতনতা’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এটি সুফি আধ্যাত্মিক অনুশীলনের একটি উচ্চস্তর—যেখানে সাধক তাঁর নিজের অন্তর্জগৎ পর্যবেক্ষণ করেন এবং স্রষ্টার উপস্থিতি অনুভব করেন। তহা এই ধারণাটিকে দার্শনিক পরিভাষায় রূপান্তর করেন: ‘মুরাকাবা-দার্শনিক’ হলেন তিনি, যাঁর কাছে দর্শন কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক ক্রিয়া নয়, বরং আত্মার অভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষণ ও পরিশুদ্ধির আমল।
৭. আল-জাবরির ত্রিভাগ বিশ্লেষণ: ‘বয়ানি’ জ্ঞানপদ্ধতি কোরআন-হাদিসের পাঠ ও ব্যাখ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত; ‘ইরফানি’ জ্ঞানপদ্ধতি সুফি ও গনোস্টিক অভিজ্ঞতার ওপর প্রতিষ্ঠিত; ‘বুরহানি’ জ্ঞানপদ্ধতি এরিস্টটলীয় যুক্তি ও দার্শনিক প্রমাণের ওপর প্রতিষ্ঠিত। জাবরির মতে, আরব মনন ‘বুরহানি’র পরিবর্তে ‘বয়ানি’ ও ‘ইরফানি’র প্রাধান্যে আটকে আছে—এটিই স্থবিরতার মূল। তহা এই বিশ্লেষণকে ‘পশ্চিমা র্যাশনালিজমকে মানদণ্ড ধরা’ বলে সমালোচনা করেন: কারণ ‘বুরহানি’কে শ্রেষ্ঠ মনে করা আসলে এরিস্টটলীয়-পশ্চিমা জ্ঞানতত্ত্বকে সার্বজনীন মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা।
৮. সৌরুশের ‘ধর্মীয় জ্ঞানের সংকোচন ও প্রসারণ’ তত্ত্বের বিস্তারিত বিশ্লেষণের জন্য দেখুন: Boroujerdi, M. (1996). Iranian Intellectuals and the West. Syracuse University Press, pp. 158–175। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো, ধর্মের ‘মূল’ (কিতাব ও সুন্নাহ) ও ধর্মের ‘জ্ঞান’ (মানবিক ব্যাখ্যা) আলাদা—প্রথমটি অপরিবর্তনীয়, দ্বিতীয়টি যুগে যুগে পরিবর্তনশীল। তহা মনে করেন এই বিভাজন কৃত্রিম এবং শেষ পর্যন্ত ‘আমানত’-এর চিরন্তনতাকে খর্ব করে।
৯. ‘তাখলিক’ (تأصيل) ধারণাটি তহার দর্শনের কেন্দ্রীয় পদ্ধতিগত অবদান। এটি তিনটি প্রচলিত পদ্ধতির বিকল্প: (১) পশ্চিমা জ্ঞানের অন্ধ অনুকরণ (তাকলিদ); (২) পশ্চিমা জ্ঞানের সম্পূর্ণ বর্জন (রফদ); (৩) পশ্চিমা জ্ঞানে ইসলামি প্রলেপ দেওয়া (ইসলামীকরণ)। তাখলিকে পশ্চিমা ধারণার মূল কাঠামো ভেঙে তার যুক্তিসারটুকু নিজস্ব ইসলামি নৈতিক মিজানে পুনর্নির্মাণ করা হয়—এটি ‘সৃজনশীল পুনর্গঠন’, নিছক ‘সমন্বয়’ নয়।
খতিয়ান:
- Abderrahmane, T. (1998). Al-ʿAmal al-Dīnī wa Tajdīd al-ʿ Casablanca: Cultural Center of the Arab World.
- Abderrahmane, T. (2005). Al-Lisān wa al-Mīzā Beirut: Arab Cultural Center.
- Abderrahmane, T. (2006). Rūḥ al-Ḥadātha: Al-Niẓām al-Akhlāqī li-Ḥadāthat al-Islā Casablanca: Cultural Center of the Arab World.
- Abderrahmane, T. (2010). Suʾāl al-Akhlā Beirut: Arab Cultural Center.
- Abderrahmane, T. (2014). Trust and Responsibility in Modern Thought. Rabat: Dar al-Aman.
- Al-Attas, S. M. N. (1979). Aims and Objectives of Islamic Education. Jeddah: King Abdulaziz University.
- Al-Attas, S. M. N. (1980). The Concept of Education in Islam. Kuala Lumpur: ABIM.
- Al-Attas, S. M. N. (1995). Prolegomena to the Metaphysics of Islam. Kuala Lumpur: ISTAC.
- Al-Faruqi, I. R. (1982). Islamization of Knowledge: General Principles and Work Plan. Herndon: IIIT.
- Ashraf, S. A. (1985). New Horizons in Muslim Education. London: Hodder & Stoughton / Islamic Academy.
- Ashraf, S. A., & Hussain, S. S. (1979). Crisis in Muslim Education. Jeddah: King Abdulaziz University / Hodder & Stoughton.
- al-Jabri, M. A. (1990). Critique of Arab Reason [Naqd al-ʿAql al-ʿArabī]. Beirut: Center for Arab Unity Studies.
- Al-Sadr, M. B. (1980). Falsafatuna [Our Philosophy]. Tehran: World Organization for Islamic Services.
- Arkoun, M. (1994). Rethinking Islam: Common Questions, Uncommon Answers. Boulder: Westview Press.
- Arkoun, M. (2002). The Unthought in Contemporary Islamic Thought. London: Saqi Books.
- Boroujerdi, M. (1996). Iranian Intellectuals and the West. Syracuse: Syracuse University Press.
- Hallaq, W. B. (2019). Reforming Modernity: Ethics and the New Human in the Philosophy of Abdurrahman Taha. New York: Columbia University Press.
- Heidegger, M. (1977). The Question Concerning Technology and Other Essays. New York: Harper & Row.
- Levinas, E. (1969). Totality and Infinity: An Essay on Exteriority. Pittsburgh: Duquesne University Press.
- Nasr, S. H. (1981). Knowledge and the Sacred. Edinburgh: Edinburgh University Press.
- Nasr, S. H. (1996). Religion and the Order of Nature. Oxford: Oxford University Press.
- Shariati, A. (1979). On the Sociology of Islam. Berkeley: Mizan Press.
- Soroush, A. K. (1998). Reason, Freedom, and Democracy in Islam. Oxford: Oxford University Press.
- আজরফ, দেওয়ান মোহাম্মদ। (১৯৫৯/২০০৬)। জীবন সমস্যার সমাধানে ইসলাম। ঢাকা: মাওলা ব্রাদার্স। (প্রথম প্রকাশ মার্চ ১৯৫৯; মাওলা ব্রাদার্স প্রথম সংস্করণ নভেম্বর ২০০৬)
- আজরফ, দেওয়ান মোহাম্মদ। (১৯৬৪)। জীবন দর্শনের পুনর্গঠন। করাচি: তমিজউদ্দিন খান।
- খান, মুঈনুদ্দীন আহমদ। (১৯৮০)। ইসলামে দর্শনচিন্তার পটভূমি। ঢাকা: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।